বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র: ক্ষমতা, দুর্নীতি এবং ঔদ্ধত্যের ধারাবাহিকতা

বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র: ক্ষমতা, দুর্নীতি এবং ঔদ্ধত্যের ধারাবাহিকতা

সফিক ইসলাম

সব দেশের জন্যই প্রশাসনিক বা রাষ্ট্র পরিচালনার একটা ব্যবস্থা দরকার হয়। কিন্তু এই প্রশাসনিক ব্যবস্থা বাংলাদেশে যে আমলাতন্ত্র তৈরি করেছে তা পুরো দেশের ওপর একটা জগদ্দল পাথরের মতো। অস্বচ্ছ, জাতীয় ও জনস্বার্থবিরোধী সকল নীতি ও চুক্তির মূল কারিগর এই আমলাতন্ত্র। এর সুবিধাভোগী দেশি বিদেশি বৃহৎ ব্যবসায়ী থেকে রাজনীতিবিদ, কনসালট্যান্ট, ঠিকাদার প্রভৃতি। এর মধ্য দিয়ে আমলাতন্ত্রের সাথে তৈরি হয় স্থায়ী দুর্নীতিভরা ব্যবস্থা। সরকার পরিবর্তনে এর ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে না। এই লেখায় তারই কিছু প্রামাণ্য চিত্র উপস্থিত করা হয়েছে। সন্দেহ নাই এটি অসম্পূর্ণ। অনেক সরকারি কর্মকর্তাও এই বদ্ধ কাঠামোর শিকার। বলাই বাহুল্য যে, এই আমলাতন্ত্রের পরিবর্তন ছাড়া দেশে কোনো ধরনের পরিবর্তনই সম্ভব নয়।

আমলাতন্ত্রের সাধারণ সংজ্ঞা অনুযায়ী, আমলা হলো এমন এক সংগঠিত কর্মীগোষ্ঠী যারা নির্দিষ্ট বিধিবিধান ও নিয়মের প্রতি আনুগত্য রেখে সুসংহত কর্মবিভাজনের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করে থাকে। এই কাঠামোয় প্রতিটি স্তরে স্পষ্ট পদক্রম (hierarchy), নির্ধারিত দায়িত্ববণ্টন এবং স্থিতিশীল বেতন কাঠামো বিদ্যমান থাকে। ওয়েবারের আমলাতন্ত্রের ধারণায় গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো স্তরভিত্তিক কর্তৃত্ব কাঠামো যেখানে প্রতিটি স্তরের ক্ষমতা ও দায়িত্ব নির্ধারিত এবং উচ্চস্তর নিম্নস্তরকে তদারকি করতে পারে। তবে স্তরবিন্যাস ও তদারকি ব্যবস্থায় উচ্চস্তরের কর্মকর্তারা নিম্নস্তরের দক্ষতার সঙ্গে গৃহীত যৌক্তিক সিদ্ধান্তকে ইচ্ছামতো বাতিল করতে পারেন না। এতে সরকারি দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত স্বার্থের মধ্যে কঠোর পৃথকীকরণ বজায় রাখা হয়। কর্মকর্তারা পূর্ণকালীনভাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সরকারি কাজই তাদের প্রধান পেশা হিসেবে বিবেচিত হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো– কর্মকর্তাদের যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদোন্নতি দেওয়া হয়; ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা রাজনৈতিক প্রভাব এখানে মুখ্য নয়।১ অন্যদিকে অধ্যাপক কার্ল জে. ফ্রেডরিকের দেওয়া আমলাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো হলো– নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির কেন্দ্রীকরণ, কর্ম বিভাজন, পদে নিয়োগের জন্য যোগ্যতা নির্ধারণ, নিরপেক্ষতা, নির্ভুলতা ও ধারাবাহিকতা এবং গোপনীয়তা। 

 বাস্তবতা এই তাত্ত্বিক সংজ্ঞার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। হয়তো পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রেই আমলাতন্ত্র সম্পূর্ণরূপে তাত্ত্বিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে না। এ কারণে পৃথিবীর প্রায় সব রাষ্ট্রেই ‘আমলা’ ও ‘আমলাতন্ত্র’–এই শব্দদ্বয় ইতিবাচক ধারণা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত না হয়ে একটি নেতিবাচক শব্দ, এমনকি একটি গালিবাচক শব্দেও পরিণত হয়েছে। লুডিগ ভন মিস তাঁর বিখ্যাত পুস্তিকা আমলাতন্ত্র-এ এ কথা স্বীকার করেন। গ্রন্থের শুরুতে তিনি বলেন–

‘আমলাতন্ত্র’, ‘আমলাতান্ত্রিক’, এবং ‘আমলা’–এই শব্দগুলো প্রকৃতপক্ষে গালি হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। কেউ নিজেকে ‘আমলা’ বলে পরিচয় দেয় না, কিংবা তার পরিচালন-পদ্ধতিকে ‘আমলাতান্ত্রিক’ বলে স্বীকার করে না। এই শব্দগুলো সবসময়ই অবজ্ঞাসূচক অর্থে ব্যবহৃত হয়, যা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা প্রক্রিয়ার সমালোচনাকেই নির্দেশ করে। কেউই সন্দেহ করে না যে আমলাতন্ত্র একান্তভাবে ক্ষতিকর এবং একটি আদর্শ সমাজে তার কোনো স্থান থাকা উচিত নয়।২

 বাস্তবতাও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের আমলা এবং আমলাতন্ত্রও একটি নেতিবাচক শব্দ হিসেবে পরিচিত। কেন এটি একটি নেতিবাচক বা গালিবাচক শব্দে পরিণত হয়েছে তার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন ড. হুমায়ুন আজাদ। তিনি মনে করেন, ‘আমলা’ শব্দটির অর্থের পতন ঘটেছে, নিন্দাসূচক হয়ে উঠেছে শব্দটি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘শব্দের নিজের কোনো দোষ নেই, গুণও নেই; যার সঙ্গে জড়িত থাকে শব্দ, তারই সংস্পর্শে শব্দ দূষিত হয়, প্রশংসাসূচকও হয়।৩ কাজেই আমলা শব্দটি যে একটি গালিবাচক শব্দ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত–এর মূল দায় আমলাদের ওপরই বর্তায়। সংগত কারণেই আমলা ও আমলাতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানা থাকা জরুরি। আর বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এই বৈশিষ্ট্যের প্রকৃতিও পর্যালোচনা করা দরকার।

 হয় বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার বহন করে।৪ এখানে ‘ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার’ বলতে কেবল প্রশাসনিক কাঠামো বোঝায় না; বরং একটি বিশেষ মানসিকতা ও ক্ষমতাচর্চার সংস্কৃতিকে বোঝায়। ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির মূল কথা হলো শাসন ও শোষণ। জনগণকে সেবা দেওয়ার পরিবর্তে তাদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাই এর মূল উদ্দেশ্য। লা পলোম্বারার মতে, শাসন ও নিয়ন্ত্রণে দক্ষতাই হলো ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।৫ কেউ কেউ মনে করেন, ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যগুলো হলো, 

ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, বহুস্তরীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া, সেবামূলক না হয়ে নিয়ন্ত্রণমূলক চরিত্র, কঠোর প্রশাসনিক কার্যপদ্ধতি, আস্থার অভাব, জবাবদিহিতার ঘাটতি, অঙ্গীকারের অভাব এবং উদ্যোগ ও উৎকর্ষতাকে উৎসাহিত করার মতো প্রণোদনা কাঠামোর অভাব। এ ছাড়া দুর্নীতি, অভিজাততন্ত্র, পরিবর্তনের প্রতি প্রতিরোধ এবং নাগরিকদের শিশুসম আচরণের পাত্র হিসেবে বিবেচনা করাও বাংলাদেশি আমলাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।’৬

 ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথমে বাণিজ্য পরিচালনার উদ্দেশ্যে এই অঞ্চলে আমলাতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলে। পরবর্তীকালে শাসনক্ষমতা লাভের সঙ্গে সঙ্গে তা আরও সম্প্রসারিত হয়। ব্রিটিশরা এই অঞ্চলে প্রায় দুইশ বছর তাদের শাসনকার্য চালু রাখে। এই দীর্ঘ সময়ে তারা এই অঞ্চলে একটি দৃঢ় প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলে। এই প্রশাসনিক কাঠামোর গোড়াপত্তন ঘটে ওয়ারেন হেস্টিং-এর হাতে। তিনি রাজস্ব প্রশাসনের পুনর্গঠন করেন, বিচার ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজান। এর পরে ব্রিটিশ শাসনের অধীন আমলাতন্ত্রের কিছুটা রূপান্তর ঘটে বটে, তবে তাতে আমলাতন্ত্রের চরিত্রের বড় রকমের কোনো ইতরবিশেষ ঘটেনি।

ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের প্রধান কাজগুলো ছিল ভারতবর্ষে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখা, ভারতবর্ষ থেকে সম্পদ আহরণ করে ব্রিটেনে নিয়ে যাওয়া, রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের ধনসম্পদ বৃদ্ধি করা, জনপ্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করা ও সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের এদেশীয় দালালশ্রেণি ও সুবিধাগোষ্ঠী তৈরি করা। এই লক্ষ্যে স্থানীয় শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়। কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থাকে স্তরভিত্তিক শাসন ব্যবস্থায় বিভক্ত করা হয়। কেন্দ্র, প্রদেশ ও জেলা–এই তিন স্তরের শাসন ব্যবস্থার প্রচলন করা হয়। জেলার প্রধান ছিলেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা কালেক্টরেট। প্রদেশের প্রধান ছিলেন গভর্নর ও তার পরিষদ। আর কেন্দ্রের প্রধান ছিলেন গভর্নর জেনারেল ও তার পরিষদ। ঔপনিবেশিক সংস্কৃতিতে জেলা কালেক্টরেট ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ। বলা হয় জেলা কালেক্টরেটই ছিল ব্রিটিশ প্রশাসনের মেরুদণ্ড। ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টরেটের প্রধান কাজ ছিল রাজস্ব আদায়। এর সঙ্গে তারা ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন।৭

১৯৭৯ সালে কর্মবিভাজনের ওপর ভিত্তি করে আমলাতন্ত্রকে ২৮টি ক্যাডার সার্ভিসে বিভক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে সচিবালয় ক্যাডার ও ইকোনমিক ক্যাডার প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে আত্তীকৃত হয়ে যায়। ফলে বর্তমানে মোট ছাব্বিশটি ক্যাডার সার্ভিস নিয়ে ‘আমলাতন্ত্র’ বিদ্যমান।

 বর্তমানে যে আমলাতন্ত্র বিরাজমান তার মূলে রয়েছে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের সদস্যরা। অর্থাৎ, সিভিল সার্ভিসের সদস্যরাই আমলাতন্ত্রের প্রধান অনুষঙ্গ। সাধারণের কাছে এরা বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা নামেই সমধিক পরিচিত। ১৯৭৯ সালে কর্মবিভাজনের ওপর ভিত্তি করে আমলাতন্ত্রকে ২৮টি ক্যাডার সার্ভিসে বিভক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে সচিবালয় ক্যাডার ও ইকোনমিক ক্যাডার প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে আত্তীকৃত হয়ে যায়। ফলে বর্তমানে মোট ছাব্বিশটি ক্যাডার সার্ভিস নিয়ে ‘আমলাতন্ত্র’ বিদ্যমান। তবে ‘আমলা’ বলতে আসলে যা বোঝায় বাংলাদেশের সব ক্যাডারের মধ্যে সেই বৈশিষ্ট্য সমানভাবে বিদ্যমান নয়। বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রে ক্ষমতার কাঠামো, সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও দায়িত্ববণ্টন, তদারকির ব্যবস্থাপনা সব সার্ভিসে সমান নয়। কাজেই ক্ষমতা, কার্যপ্রক্রিয়া, প্রথাগত এবং ঐতিহ্যগত বিবেচনায় বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। এর একটি হলো সক্রিয় আমলাতন্ত্র (active bureaucracy); আর অন্যটি হলো সুপ্ত বা পরোক্ষ আমলাতন্ত্র (latent বা passive bureaucracy)। সক্রিয় আমলাতন্ত্রের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো স্বশাসন। এর সঙ্গে রয়েছে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও নিয়ন্ত্রণের সুযোগ। অন্যদিকে আমলাতন্ত্রের যে অংশের নীতি তৈরিতে সুযোগ না থাকে, এমনকি স্বনিয়ন্ত্রণেরও সুযোগ থাকে না, কেবল নির্দেশ পালনই তাদের প্রধান দায়িত্ব হয়ে ওঠে–তাদের সুপ্ত বা পরোক্ষ আমলাতন্ত্র বলা যায়।

সাবেক আমলা মোস্তফা কামাল হায়দার তাঁর স্টিলফ্রেমের বিবর্তন: বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র গ্রন্থে আমলাতন্ত্রের যে বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছে তা প্রণিধানযোগ্য। তাঁর মতে–

এই ব্যবস্থাটি অনমনীয়, অনড়, অনিচ্ছুক, রুগ্‌ণ, স্থবির, গতিশীল নয়, ধীরগতি, জটিল, বিধিবিধানে আবদ্ধ, কাগজের প্রাধান্য, অনুৎপাদনশীল, সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে, নির্ভরশীল ইত্যাদি। তা ছাড়া এতে উদ্যোগ নেই, উদ্ভাবন নেই, কাজ ছড়ানো-ছিটানো, অস্পষ্ট কর্তৃপক্ষ, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ইত্যাদি।

এ ব্যবস্থায় কর্মরত আমলাদের দৃষ্টিভঙ্গি আভিজাত্য, কৌলীন্য, ক্ষমতাকাঙ্ক্ষী, কর্তৃত্ববাদী, সব কাজের কাজি, অঙ্গীকারবদ্ধ নন, দায়িত্ব নিতে অনাগ্রহী, দায়বদ্ধ হতে অনিচ্ছুক, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা, অন্যের ঘাড়ে দায় চাপানো, ঊর্ধ্বতনদের প্রতি একান্ত অনুগত ও অধীনস্থদের প্রতি অমনোযোগী, ভীতু, ঝুঁকি নিতে অক্ষম, পরিবর্তনে অনীহা, চিন্তা-চেতনায় সীমিত পরিধি, উদ্যোক্তা নন, ঔদ্ধত্য, আত্মকেন্দ্রিক, সাধারণ মানুষের সঙ্গে দূরত্ব ইত্যাদি।৮

মনে করেন, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে আমলাতান্ত্রিকতার চিহ্নিত বৈশিষ্ট্যগুলো হলো ঘুষ, তোষামোদ, তোষণনীতি ও চাটুকারিতা, অতিমাত্রায় বড় সাহেব প্রীতি, তদবির, রাজকীয় সম্মান, হয়রানি, রাজনৈতিক এলিট ও ব্যবসায়ীপ্রীতি, আইনের ফাঁক, পুরাতন দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা, লাল ফিতার বন্ধন, প্রভুসুলভ মনোভঙ্গি ও দায়িত্বহীনতা।৯ সাবেক আমলা আন্দালিব রাশদী আমলাতন্ত্রের কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন। তাঁর মতে, আমলা শব্দটি উচ্চারণ করলেই সাধারণ মানুষের চোখে ভেসে ওঠে কিছু নির্দিষ্ট নেতিবাচক দৃশ্য–‘জনগণের ভোগান্তি’, ‘দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী’, ‘নথিপত্রের শম্বুকগতি’, ‘অদক্ষতা’, ‘সহজ কাজকে জটিল করে তোলা’, ‘উদ্ধত আচরণ’, ‘সৃজনশীল বা ব্যতিক্রমী ভালো কাজ না করা’, ‘দপ্তরকে কার্যত অকার্যকর করে রাখা’, ‘অফিসের সময় ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহারের প্রবণতা’, এবং সর্বোপরি ‘অবিচার করা’। শেষ পর্যন্ত আমলাদের part of the solution না হয়ে part of the problem-এ পরিণত হওয়া’১০। আমলাতন্ত্র সম্পর্কে প্রায় একই রকম মূল্যায়ন করেছেন সাবেক আমলা জনাব সিরাজ উদ্দিন সাথী। তাঁর বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র শীর্ষক গ্রন্থে তিনি আমলাদের কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রভুসুলভ আচরণ, রাজনৈতিক এলিটদের প্রতি নতজানু মনোভাব, মর্যাদা সংক্রান্ত প্রতিযোগিতা, দায়িত্বহীনতা, নাগরিক হয়রানি, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য, পূর্ব নজিরের বৃত্তে আবদ্ধ থাকা, অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভবন, ‘বড় সাহেব’ সংস্কৃতি, তোষামোদ ও চাটুকারিতা, তদবির নির্ভরতা এবং ঘুষ ও দুর্নীতি১১। আমলাতন্ত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আদেশ-নির্দেশের সঙ্গে দ্বিমত বা ভিন্নমত পোষণ করা বারণ। এখানে শেখানো হয় Boss is always right.১২

বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রভুসুলভ আচরণ, রাজনৈতিক এলিটদের প্রতি নতজানু মনোভাব, মর্যাদা সংক্রান্ত প্রতিযোগিতা, দায়িত্বহীনতা, নাগরিক হয়রানি, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য, পূর্ব নজিরের বৃত্তে আবদ্ধ থাকা, অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভবন, ‘বড় সাহেব’ সংস্কৃতি, তোষামোদ ও চাটুকারিতা, তদবির নির্ভরতা এবং ঘুষ ও দুর্নীতি।

 কাছে আমলা ও আমলাতন্ত্র যতই ঘৃণ্য হোক-না কেন, ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রে আমলারা নিজেদের রাজার প্রতিনিধি মনে করে, আর সাধারণ জনগণকে তারা মনে করে তাদের অনুগত প্রজা। এর ফলাফল হিসেবে প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা নয়, ক্ষমতার একচেটিয়া প্রয়োগ, ঔদ্ধত্য ও কর্তৃত্ববাদী আচরণ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। সাধারণভাবে আমলা ও আমলাতন্ত্র নিন্দাবাচক গালি হিসেবে বিবেচিত হলেও ঔপনিবেশিক সংস্কৃতিতে আমলা ও আমলাতন্ত্রকে অত্যন্ত গৌরবজনক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাদের কাছে আমলা মানে রাজপুরুষ। রাজার প্রতিনিধি। সাবেক আমলা সিরাজ উদ্দিন সাথী তাঁর ‘আমলা পুরাণ’ গ্রন্থের শুরুটা করেন এভাবে–

আমলা। রাজপুরুষ। গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক গোষ্ঠী।

ব্রিটিশ আমলে সাহেব সিভিলিয়ানরা তো রাজপুরুষই ছিলেন। আইসিএস ফিলিপ মেসন (১৯০৬–১৯৯১) তাঁর স্মৃতিকথা নিয়ে বই লিখেছেন ‘দি মেন হু রুলড ইন্ডিয়া’। রাজপুরুষের স্মৃতিমন্থন। পরবর্তীকালের পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস এবং বাংলাদেশ আমলের হরেক নামে, পরিচয়ে নিয়োগ পাওয়ারাও আচার-আচরণ আর স্বভাবে সেভাবেই প্রতিষ্ঠিত।১৩

 বক্তব্যে আমলা কে তা একেবারেই স্পষ্ট। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরাই নিজেদের রাজ-প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। জনগণকে শাসন ও শোষণ করার সব রাজকীয় উপকরণও তাদের হাতেই ন্যস্ত। রাজা যেমন রাজ্যের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, রাজাকে কোনো আইনকানুন মানতে হয় না, রাজা সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করে থাকেন–বাংলাদেশে কেবল প্রশাসনের কর্মকর্তারাই এমন স্ব-স্বাধীনতা ভোগ করে থাকে। এখানে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও নিয়ন্ত্রণের প্রায় সমগ্র প্রক্রিয়াই এই গোষ্ঠীর হাতেই কেন্দ্রীভূত। মাঠ প্রশাসনে ইউএনও, ডিসি থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় প্রশাসনে উপসচিব থেকে সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা এই ক্ষমতা কাঠামোর মূল নিয়ন্ত্রক। প্রশাসনের কর্তারাই মাঠপর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন, সচিবালয়ে তারা প্রকল্পের জন্য বাজেট প্রণয়ন করেন, প্রকল্পের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেন, প্রকল্পের জন্য বাজেটের অর্থ বরাদ্দ করেন, প্রকল্প কার্যক্রম তদারকি করেন। তারাই নীতি তৈরি করেন এবং নীতি বাস্তবায়ন করেন। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে আমলা বলতে প্রধানত প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদেরই মনে করা যায়। এরাই সক্রিয় আমলা। আর অন্যরা সুপ্ত বা পরোক্ষ আমলা বলে বিবেচিত। আর অন্য সব ক্যাডার, সার্ভিস বা পেশার কর্মকর্তাদের সুপ্ত বা পরোক্ষ আমলাতন্ত্র হিসেবে অভিহিত করা যায়। কারণ, অন্যদের নীতিমালা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, প্রকল্পের অগ্রাধিকার নির্ধারণ, প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দের সুযোগ নেই বললেই চলে। সুযোগের অভাবেই মূলত এদের ঔপনিবেশিক মনোবৃত্তি সুপ্ত রাখতে হয়। এবং সুযোগ পেলেই তারা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতোই নিপীড়ক হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের জীবনের লক্ষ্যই হয়ে ওঠে আমলা হওয়া। এখানে ‘আমলা-হওয়া’ একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এই সংস্কৃতি কতটা গভীর তার একটি চমকপ্রদ কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে সাবেক আমলা ও নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের জবানিতে। তিনি কেন আমলা হলেন সেই বিবরণ দিয়েছেন তাঁর ‘বঙ্গভবনে পাঁচ বছর’ গ্রন্থে। এতে তিনি বলেন– 

একটি ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া ছিল আমার জীবনের এক স্বপ্ন। সম্ভবত এই স্বপ্নই আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা থেকে আমলাতন্ত্রের পথে নিয়ে এসেছিল। ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন একটি ফিয়াট ৬০০ গাড়ি কিনেছিলাম। বেশ কিছুকাল ওটা চালিয়েছি এবং কোনো দুর্ঘটনা ব্যতিরেকেই। তবু অনেক সাধ্যসাধনা করে তখন একটা ড্রাইভিং লাইসেন্স জোগাড় করতে পারিনি। চট্টগ্রাম কোর্টহাউসে গিয়ে কয়েকবার ধরনা দেওয়ার পরও কোনো লাভ হয়নি। শেষবার যখন গেলাম, ট্রাফিকের ডিএসপি সাহেব বললেন, পরীক্ষায় পাস করতে না পারলে আমি কী করব? আমাকে বসতে বলার সৌজন্যটুকু পর্যন্ত তিনি প্রকাশ করেননি। আমি যখন তাঁর অফিসে কথা বলছিলাম, তখন একজন কমবয়সী তরুণ এলেন। ডিএসপি সাহেব তাকে দেখে শশব্যস্ত হয়ে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে বললেন, আপনি এখানে কেন স্যার?

আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স দরকার।

আমাকে স্যার আপনি ডেকে পাঠালেই পারতেন। ঠিক আছে, আমি আজই আপনাকে লাইসেন্স পৌঁছে দিয়ে আসব।

শুনে ভদ্রলোক খুশি হয়ে চলে গেলেন। উনি চলে যাওয়ার পর আমি ডিএসপিকে বললাম, ওনাকে পরীক্ষা দিতে হবে না?

আরে সাহেব, প্রায় ধমকে উঠলেন ডিএসপি, উনি হলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার। ওনার আবার পরীক্ষা কী?

সেদিন মনে হয়েছিল, এ দেশে আসলে মানুষের দুটো জাত। একটি সরকারি মানুষ, অন্যটি বেসরকারি মানুষ। ঐ সহকারী কমিশনার হয়তো আমার ছাত্রও হতে পারতেন। কিন্তু তিনি তিনিই, এবং আমি আমিই। সেদিনই মনে হয়েছিল, যদি কোনোদিন সরকারি চাকরিতে ঢোকার সুযোগ পাই, তাহলে একটা ড্রাইভিং লাইসেন্স বানিয়ে ফেলব। তা না হলে লাইসেন্স ছাড়াই গাড়ি চালাব। কপালে যা ঘটে ঘটুক।১৪

কর্মচারীদের ক্ষমতার অপব্যবহার, আইন না মানার রীতি এবং অন্যায় সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের সংস্কৃতির কথা সবারই জানা। জনাব তালুকদার এখানে যদিও সরকারি চাকরির কথা বলেছেন, তবে আসলে তিনি সরকারি চাকরি বলতে প্রশাসনকেই বুঝিয়েছেন। কিন্তু মাহবুব তালুকদারের মতো একজন ব্যক্তি, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত ছিলেন, তিনিও কি আমলা হয়ে ভিন্নতর কিছু করেছিলেন? তার লেখনীতেই জানা যাক–

বঙ্গভবনে এসে প্রথমেই ঠিক করলাম, একটা ড্রাইভিং লাইসেন্স করা প্রয়োজন। গ্যারেজ সুপারভাইজার খুরশীদুল ইসলামকে জানাতেই তিনি বললেন, স্যার। বঙ্গভবনে এতজন ড্রাইভার থাকতে আপনার ড্রাইভিং লাইসেন্সের প্রয়োজন কী? ড্রাইভাররা কাজ না পেলে বরং ছাঁটাই হয়ে যেতে পারে।

বললাম, আমার ড্রাইভিং লাইসেন্সের সঙ্গে বঙ্গভবনের ড্রাইভারদের কোনো সম্পর্ক নেই। চিরকাল এখানে থাকব না, সুতরাং ওটা করে নেওয়াই ভালো।

খুরশীদ আর দ্বিরুক্তি করেননি। আমার পাসপোর্ট সাইজের ছবি নিয়ে চলে গিয়েছিলেন।

দিন কয়েক পরে ট্রাফিকের ডিএসপি এলেন অফিসে। ড্রাইভিং লাইসেন্স তুলে দিলেন আমার হাতে। বললেন, যে কোনো প্রয়োজনে আমাকে বলবেন স্যার। আপনাদের খেদমত করার জন্য আছি।

তাঁকে বসিয়ে আপ্যায়ন করলাম। লাইসেন্সখানা পেয়ে মনে মনে আবেগে আপ্লুত হলাম। এটা পাওয়ার জন্য আমি কম চেষ্টা করিনি। আজ কত সহজে এটা হাতে এসে গেল। কোনো পরীক্ষা দিতে হলো না, টাকা-পয়সাও নয়। তাঁকে বিদায় দিয়ে আমার ব্যক্তিগত সহকারী আবদুল গণি হাওলাদারকে ডাকলাম। বললাম, একজন মানুষের কী কী লাইসেন্স সার্টিফিকেটের দরকার হয়?

গণি কথাটা প্রথমে বুঝতে পারেননি। পরে বললেন, পাসপোর্ট, বন্দুক-রিভলবারের লাইসেন্স, বার্থ সার্টিফিকেট, ডেথ সার্টিফিকেট–

বললাম, সবগুলোর ফরম জোগাড় করুন। আমি সবকিছুর জন্যই দরখাস্ত করতে চাই।

ডেথ সার্টিফিকেট স্যার? গণি প্রশ্ন করলেন।

ঐ একটা জিনিস বাদ থাকবে। আমি বললাম, যদিও ওটা জোগাড় করে রাখতে পারলেই ভালো হতো। মৃত্যুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লাশ জোগাড় করা ও ডেথ সার্টিফিকেট পাওয়া যে কী ঝকমারি, তা ভুক্তভোগী অনেকেই জানেন। যদি অগ্রিম ডেথ সার্টিফিকেট পাওয়ার বিধান থাকত এবং মৃত্যুর পর কেবল তারিখ ও সময় বসিয়ে নেওয়া যেত, তাহলে আত্মীয়-স্বজনকে হাসপাতাল বা পুলিশের ভোগান্তি থেকে রক্ষা করার জন্য আমি তা-ই করতাম।১৫

 তালুকদারের এই বক্তব্য থেকে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের এক জটিল মনস্তত্ত্বের সন্ধান পাওয়া যায়–যা তাদের দারুণ নৈতিক সংকটের স্বরূপকেই উন্মোচন করে। বাংলাদেশের অধিকাংশ আমলার জীবনীগ্রন্থে এই নৈতিক সংকটের চিত্র পাওয়া যায়। ক্ষমতার অপব্যবহার করা এবং এর মাধ্যমে নিজে লাভবান হওয়া ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ক্ষমতার অপব্যবহারকে তারা লজ্জাজনক বিষয় বলে মনে করেন না, বরং একে তারা তাদের অধিকার মনে করেন।

ক্ষমতার অপব্যবহার করা এবং এর মাধ্যমে নিজে লাভবান হওয়া ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ক্ষমতার অপব্যবহারকে তারা লজ্জাজনক বিষয় বলে মনে করেন না, বরং একে তারা তাদের অধিকার মনে করেন।

আমলাতন্ত্রের প্রবাদপুরুষ বলে খ্যাত আকবর আলি খানের স্মৃতিকথা ‘পুরোনো সেই দিনের কথা’ থেকে কেবল একটি ঘটনার উল্লেখ করা যায়। স্মৃতিকথায় তিনি উল্লেখ করেন এক আইসিএস অফিসার এম খুরশিদের কথা, যিনি হবিগঞ্জে মহকুমা প্রশাসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। 

“খুরশিদের জনপ্রিয়তা কেবল উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে ছিল না, বরং তাঁর সামন্ততান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী আচরণও তাঁকে ‘জনপ্রিয়তা’ এনে দিয়েছিল। একটি কিংবদন্তি অনুসারে, একবার এক কৃষক তার ছোট ভাইকে রাগের মাথায় হত্যা করে খুরশিদের বাড়িতে এসে ক্ষমা প্রার্থনা করে। খুরশিদ তাকে ‘ক্ষমা’ করে দেন এবং পুলিশকে কোনো আইনি পদক্ষেপ নিতে দেননি”১৬। 

 প্রশাসক কর্তৃক বিচারবহির্ভূতভাবে একটি হত্যাকাণ্ডকে ‘ক্ষমা’ করে দেওয়া, ক্ষমতার কতটা স্বেচ্ছাচারী ও নৈতিকতাবর্জিত প্রয়োগ হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। এটি ন্যায়বিচার নয়, বরং ঔপনিবেশিক স্বেচ্ছাচারিতার নিদর্শন। অথচ জনাব খান এই ঘটনাকেই গৌরবজনক বলে আত্মতৃপ্তি পেতে চেষ্টা করেছেন। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো– তিনি মনে করেন, এই স্বৈরাচারী আচরণই তার জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পেছনের মূল কারণ। এর মাধ্যমে ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের আরেকটি বৈশিষ্ট্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তা হলো– এরা কেবল ক্ষমতার অপব্যবহারই করেন না, বরং এরা এটাকে গৌরবজনক বলেও মনে করেন।

প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা স্বেচ্ছাচারিতা সবই করা হয় ‘জনস্বার্থে’র নামেই। এমনকি কারো বিরুদ্ধে ক্ষোভ কিংবা প্রতিশোধ নিলেও তা করা হয় ‘জনস্বার্থে’র নামে। প্রশাসনের বিপক্ষে কেউ কোনো কথা বললে তাকে নানাভাবে অপমান-অপদস্থ করা হয়। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া হয়। অনেক সময় শারীরিক নির্যাতনও করা হয়। কাউকে মানসিকভাবে অপমান ও অপদস্থ করা হয়। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের এই ক্ষমতার অপব্যবহারের নজির অসংখ্য। তারা কেবল ক্ষমতার অপব্যবহারই করেন না, বরং একে তারা তাদের অধিকার বলে মনে করেন। এবং অনেক ক্ষেত্রেই এ নিয়ে তারা গর্বও অনুভব করেন। তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার, ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও আক্রোশ এবং প্রতিশোধের অস্ত্রকে তারা ‘জনস্বার্থে’ ব্যবহার করেন। সম্প্রতি সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মুনমুন নাহার আশাকে ‘আপা’ বলে সম্বোধন করায় বনফুল অ্যান্ড কোম্পানির তাজপুর শাখার কর্মচারী আব্দুল মান্নান-এর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি বলেন, ‘তুমি আমাকে চিনো? আমাকে আপা ডাকছ কেন? আমি ম্যাজিস্ট্রেট। তোমাদের বাসি মিষ্টি বিক্রির অভিযোগ বালাগঞ্জের ইউএনওসহ অনেকেই আমার কাছে দিয়েছে। আমি এখন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করব। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত ইউএনও বনফুল-এর ওপর ৫০ হাজার টাকার জরিমানা ধার্য করে। এই অর্থ উক্ত কর্মচারীর বেতন থেকে কেটে নেওয়া হবে বলে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।১৭ 

 আগে ২০২০ সালের কুড়িগ্রামের ডিসি মোছা. সুলতানা পারভীনের ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে রিপোর্ট করায় বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলামের বাড়িতে ঢুকে তার ওপর হামলা চালানো হয়। তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। ডিসি অফিসে নিয়ে বিবস্ত্র করে শারীরিক নির্যাতনের পর প্রশাসনের মোবাইল কোর্ট বসিয়ে তাকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।১৮ ২০১৫ সালে পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া সরকারি কলেজ পরীক্ষা কেন্দ্রে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে কলেজ শিক্ষকের বাগ্‌বিতণ্ডার জের ধরে কলেজের সহকারী অধ্যাপক মোনতাজ উদ্দীনকে ম্যাজিস্ট্রেটের পা ধরে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়।১৯ এরা জনস্বার্থের কথা বলে সব অন্যায়, অপকর্ম করে যাচ্ছে। অথচ ‘জনস্বার্থ’-এর কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা কোথাও দৃশ্যমান নয়। তাদের আচরণ, বৈশিষ্ট্য এবং দৈনন্দিন কর্মতালিকায় ‘জনস্বার্থে’র ছিটেফোঁটাও লক্ষ করা যায় না। ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্র কেবল শাসন ও শোষণই করে না; শাসন ও শোষণকেই এরা এদের অধিকার বলে মনে করেন।

 অপব্যবহারের অবারিত সুযোগ থাকায় বাংলাদেশে প্রশাসন ক্যাডারের চাহিদা ও জনপ্রিয়তা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই ক্ষমতার অপব্যবহারের স্বার্থেই অন্য পেশা থেকে এই পেশায় যোগদানের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাবেক আমলা জনাব আবদুল আজিজ তার ‘আমলা কাহিনি’ গ্রন্থে জানিয়েছেন কেন তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিয়েছেন। জনাব আজিজ সাহেবের স্ত্রীর পছন্দ ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরি। এমনকি শ্বশুরও চেয়েছিলেন তার মেয়ের জামাই বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরিতেই থাকুক। কিন্তু জনাব আজিজ প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিতে আগ্রহী। কিন্তু কেন? তার কাছে, 

‘ম্যাজিস্ট্রেট মানে ক্ষমতা। বিচার-আচার, মোবাইল কোর্ট, গাড়ি-ঘোড়া, পিয়ন, চাপরাশি, বয়-বেয়ারা, সালাম-আদাব–এতসব ব্যাংকে নেই।’২০ 

 এই ঔপনিবেশিক মনোবৃত্তি কেবল সাধারণ আমলাদের মননে নয়, প্রায় সব আমলার মননেই জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতসারে প্রোথিত। প্রশাসনের অবাধ ক্ষমতা, প্রভাব, প্রতিপত্তি আর জৌলুসের মোহে তারা এই পেশায় আসেন। আর এই পেশায় একবার ঢুকতে পারলে চূড়ান্তভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করার সুযোগ ঘটে। জনাব আজিজের গ্রন্থ থেকে এমন একটি ঘটনার বর্ণনা দেওয়া যাক–

১৯৮৪ সালে দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রে উচ্ছৃঙ্খল জনতার আকস্মিক হামলার সময় আমাকে বাঁচাতে গিয়ে মারাত্মকভাবে আহত হন থানার ওসি। আমি এবং ওসি দুজনেই আক্রমণকারী এক তরুণকে বারবার সাবধান করে দিচ্ছিলাম। প্রতিবার সেই তরুণ আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং আমাদের দিকে ইট-পাটকেল ছোড়ে। এরই এক পর্যায়ে ওসি আহত হন। আঘাতপ্রাপ্ত হই আমিও। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জনের নামে থানায় মামলা হলেও ওই উচ্ছৃঙ্খল তরুণের নাম বা ঠিকানা পাওয়া যায়নি। কিন্তু তার সুদর্শন চেহারা আমাদের কাছে পরিচিত হয়ে গিয়েছিল। শুধু জানা যায় সে জার্মানিতে থাকে।

এসএসসি পরীক্ষা শেষ। থেমে যায় ছাত্রছাত্রীদের টেনশন আর কোলাহল। প্রশাসনও হাফ ছাড়ে। শুধু আহত ওসি সাহেব ও পুলিশের শরীরের ক্ষত শুকায় না। দুঃসহ স্মৃতি ভুলতে পারি না আমিও। কয়েক দিনের মধ্যে দিনাজপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সামসুজ্জামানের নেতৃত্বে গুলিবর্ষণ ঘটনার নির্বাহী তদন্ত সম্পন্ন হয়। এ নিয়ে টেনশন কাজ করে মনের মাঝে।

ঘটনায় দায়ের করা মামলায় কয়েকজনকে সুনির্দিষ্ট আসামি করে অভিযোগপত্র দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। গ্রেফতার হওয়া প্রায় সবাই উচ্চ আদালত থেকে জামিন নেয়। জেল থেকে মুক্তি পাওয়া ছেলেদের সেতাবগঞ্জ ডাকবাংলো মাঠে সংবর্ধনা দেয় স্থানীয় তরুণ সমাজের একাংশ। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।

এর কিছুদিন পর মাসিক জুডিশিয়াল সভায় যোগ দিতে দিনাজপুর সদরের উদ্দেশে ট্রেনে চেপেছি। তখন ট্রেনে করে দিনাজপুর সদরে আসা-যাওয়া করত বোচাগঞ্জের লোকজন। আমার সঙ্গে একজন পিয়ন। মুস্তাকিম। সে আবার হাঁটতে পারে না। হাঁটলেও মনে হয় দৌড়ায়। সহজ-সরল স্বভাবের।

ট্রেনের কম্পার্টমেন্টে বসতেই দৃষ্টি পড়ে যায় চেনা এক যুবকের প্রতি। খুবই চেনা মনে হয়। কোথায় যেন দেখেছি। ভাবতে ভাবতে পরীক্ষা কেন্দ্রে হামলাকারী বিশেষ সেই তরুণের মুখচ্ছবি ভেসে ওঠে। ভালো করে তাকিয়ে নিশ্চিত হই যুবকটি আর কেউ নয়, হামলাকারী সেই তরুণ। আমাকে দেখে সেও চিনে ফেলে। পায়ের ওপর পা তুলে সিগারেট ফুঁকছে সে। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ভাব আমার প্রতি।

চট করে ট্রেনে মোবাইল কোর্ট করার সিদ্ধান্ত নিই। পিয়ন মুস্তাকিমকে থানায় খবর দিতে বলি। স্টেশন মাস্টার, ট্রেনের গার্ডকে আমার সিদ্ধান্ত জানাই। ট্রেন থেমে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যে থানা থেকে পুলিশ আসে। আসেন আমার কোর্টের জিআরও। আমি তখনও বসে আছি। যুবকের মধ্যে কোনো চাঞ্চল্য লক্ষ করলাম না। তার ভাবটা এমন যে, টিকিট তো আছেই। আমাকে আটকায় কে! আমাকে দেখিয়ে একটার পর একটা সিগারেট টেনে চলে সে।

জিআরও, পুলিশ, ট্রেনের গার্ড আমার হুকুমের অপেক্ষায়। কম্পার্টমেন্টের যাত্রীদের টিকিট চেক শুরু করি। দু-একজন গরিব শ্রেণির মানুষের কাছে টিকিট ছিল না। হতদরিদ্র। হয়তো এভাবে প্রতিদিন বিনা পয়সায় যাতায়াত করে। ওদেরকে কম্পার্টমেন্ট থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। বিনা টিকিটধারী দু-একজনকে জরিমানাও করি। এরপর টার্গেট যুবকের কাছে গিয়ে দাঁড়াই। সে তখনও সিগারেট টানছিল। আয়েশি ভাব তার। আমাকে দেখে বাঁ হাতটা পকেটে ঢুকিয়ে টিকিট বের করে দেয়।

‘নেন’। বেশ বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলে।

‘ধন্যবাদ। ঠিক আছে। কিন্তু আপনি যে সিগারেট টানছেন পাশের যাত্রীদের অনুমতি নিয়েছেন কী?’ শান্ত কণ্ঠে যুবককে প্রশ্ন করি।

‘হোয়াট অনুমতি? আমাকে অনুমতি নিতে হবে কেন? আমার টাকায় সিগারেট খাচ্ছি। সমস্যাটা কী?’ উত্তেজিত হয়ে ওঠে সে।

‘রেলওয়ে আইনে ধূমপান করতে হলে সহযাত্রীদের সম্মতি নিতে হয়। নিয়েছেন কি?’

‘ওসব আইন-টাইন জানার দরকার নেই। ফাইন করলে করেন।’

যুবক পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করতে উদ্যত হয়। আমি যুবককে রেলওয়ে আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় জরিমানা না করে ১৪ দিনের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়ে গ্রেফতার করার নির্দেশ দিই। তাকে ট্রেন থেকে নামিয়ে নেয় পুলিশ।

যুবক অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে। সে বুঝতে পারে তার অপরাধের মাত্রাটা সীমা অতিক্রম করেছিল পরীক্ষা কেন্দ্রেই। অবশ্য আহত পুলিশ ধৃত অপরাধীকে থানা হাজতে কীভাবে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল তা অজ্ঞাত থেকে যায় আমার কাছে।’২১

 কর্তাব্যক্তিরা কীভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থে, প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে অবলীলায় প্রয়োগ করে থাকেন এই ঘটনা তার একটি ছোট্ট নিদর্শন।

বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রে প্রশাসন ক্যাডারের এককেন্দ্রিক ভারসাম্যহীনতা তাদের নিরপেক্ষ আমলা হিসেবে নয়, বরং একটি স্বার্থকেন্দ্রিক ক্ষমতা কাঠামোতে পরিণত হয়েছে। এই ক্ষমতা তাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ করে তুলেছে; তাদের স্বেচ্ছাচারী করে তুলেছে। তাদের স্বেচ্ছাচারিতা এমন যে তারা চাইলে বড় অপরাধীকে ক্ষমা করে দিতে পারেন, আবার নিরপরাধ কাউকে জেলে পুরতে পারেন। সম্প্রতি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ইউএনও আমিনুল ইসলামের এমন একটি আস্ফালনমূলক বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রজাতন্ত্রের এমন চাকর যে মালিককে জেলে ভরে শাস্তি দিতে পারি।’২২ এটি নিছক আত্মম্ভরিতা নয়; বরং আমলাতান্ত্রিক ঔদ্ধত্যের বহিঃপ্রকাশ। এই ঔদ্ধত্যের কারণেই যশোরের মনিরামপুর উপজেলার এসিল্যান্ড ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাইয়েমা হাসান মাস্ক না পরায় তিন বৃদ্ধকে কান ধরিয়ে ওঠবস করিয়েছিলেন২৩।

 বিদ্যমান বাস্তবতায় প্রশাসনের কর্তাদের মননে ও মগজে ঔপনিবেশিক সংস্কৃতি প্রবলভাবে বিদ্যমান। ঔপনিবেশিক সংস্কৃতি ধারণ ও লালনের প্রশিক্ষণটা তারা চাকরিতে ঢোকার দিন থেকেই পেতে থাকেন। কিছুটা পান তাদের সিনিয়র সহকর্মীদের কাছ থেকে অপেশাদারভাবে, আর কিছুটা পান নানা রকমের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে–অনেকটা পেশাদারভাবে। সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে তাদের যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় তার মূল কথা হলো–তোমরা শাসক।২৪ সিভিল সার্ভিস একাডেমির প্রশিক্ষণের বাইরেও তাদের নিত্যদিনকার জীবনাচারের মাধ্যমেও এটা তাদের মগজে প্রোথিত করা হয়। এমন কিছু ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায় সাবেক আমলা হারুন রশীদের ‘আমলাবেলা’ গ্রন্থে। এই গ্রন্থে তিনি দেখাচ্ছেন কী করে তার সিনিয়র সহকর্মীরা তার মনে এই ঔপনিবেশিক সংস্কৃতি ঢুকিয়ে দিয়েছেন। ১৯৮৬ সালের চাকরির শুরুর দিকেই একজন সিনিয়র সহকর্মী তাকে সতর্ক করে দিলেন, ‘এসপিকে যেন আবার স্যার বলো না।’ এরপর তিনি জানতে চান, ‘সিভিল সার্জন? নির্বাহী প্রকৌশলী?’ এই প্রশ্নের জবাবে ওই সিনিয়র বলেন, ‘প্রশ্নই ওঠে না।’ এবার তিনি আবার জানতে চান, ‘তাহলে ওনাদের কী সম্বোধন করব?’ এর উত্তরে উক্ত সিনিয়র বলেন, ‘এই বলবে আর কী। আমাদের ঐতিহ্যও ঠিক থাকল, ওনারাও বেজার হলেন না।’২৫ এরপর তিনি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করেন কী করে প্রশাসনের কর্মকর্তারা অন্য পেশার কর্মকর্তাদের অসম্মান করে থাকে। তিনি তার সেই অভিজ্ঞতার কথাই লিখেছেন এভাবে–

 লক্ষ করলাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কর্মরত কেউ কেউ এসপি, সিভিল সার্জনসহ জেলা প্রশাসকের সমান বা প্রায় সমান মর্যাদাধারী অন্যদের সঙ্গে ভাববাচ্যে কথা বলেন। যেমন: পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জন বা সিনিয়র অন্য কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা হলে বলেন: ‘স্লামালেকুম। এখানে বসেন প্লিজ। চা দেবে?’

প্রশাসন ক্যাডারের খুবই জুনিয়র কোনো কোনো কর্মকর্তাকে দেখেছি এসপিকে এসপি সাহেব, সিভিল সার্জনকে সিএস সাহেব সম্বোধন করছে। আবার তারাই এডিশনাল এসপি-ডিসিকে কেন স্যার বলছে না, সিনিয়র এএসপি-এডিসিকে কেন স্যার বলছে না, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছে। সহকর্মীদের এক আড্ডায় আমি একদিন বললাম: ‘সিভিল সার্জন, নির্বাহী প্রকৌশলীদের আমরা কেন খাটো করে দেখব? আমাদের দেশের সাধারণ রীতি হলো ভালো ছাত্র-ছাত্রীরাই ডাক্তারি-ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে।”

‘নিজের সার্ভিসকে নিয়ে প্রাইড করতে শেখো।’ গম্ভীর হয়ে যে সহকর্মী আমাকে এ পরামর্শ দিলেন, তিনি কিছুদিন আগেও কলেজে শিক্ষকতা করেছেন।২৬

 ক্যাডারের ঔপনিবেশিক সংস্কৃতি কতটা গভীরতর হতে পারে তার প্রমাণ পাওয়া যাবে জনাব হারুন রশীদ সাহেবের পরবর্তী ঘটনায়। তিনি বলেন–

১৯৮৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি জয়েন করেছি বাগেরহাট বিভিন্ন শাখায় সংযুক্তি (প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে)। বিকেলে ডাকবাংলোয় ফিরি। তারপর অখণ্ড অবসর। সহকর্মীদের সঙ্গে তেমন সখ্য গড়ে ওঠেনি। ঢাকার জীবন, পরিচিত মানুষ, কাজ ও পরিবেশ ছেড়ে আসায় মনটাও বেশ খারাপ থাকে। জানলাম সরকারি পি.সি. কলেজে সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের আমার এক শিক্ষক এসেছেন পোস্টিং নিয়ে। অধ্যাপক ওয়াসিফুর রহমান। সম্পর্কে তিনি আবার আমার দূর সম্পর্কের খালাতো ভাই। থাকেন কলেজের শিক্ষক হোস্টেলে। একদিন তার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম।

‘বিকেলের দিকে কলেজে আসতে পারিস। সময়টা কেটে যাবে।’ বললেন ওয়াসিফুর স্যার।

মাঝে মাঝেই বিকেলে বা সন্ধ্যায় আমি পি.সি. কলেজে যাই। সঙ্গে সহকর্মী ও ব্যাচমেট সাইদও কখনো কখনো যায়। সেখানে টিচার্সরুমে দাবা খেলি। ক্যারমবোর্ড খেলি। সময়টা কাটিয়ে আসি। এরকমই চলছিল। এইচএসসি পরীক্ষার ডিউটি দেওয়া হলো আমাকে পি.সি. কলেজে। সঙ্গে আর এক ব্যাচমেট। এর মধ্যে বিকেলে টেনিস খেলতে শুরু করেছি। প্রথম দিন পরীক্ষার পর টেনিস খেলে রাতে ডাকবাংলোয় ফিরে খাওয়া-দাওয়া সেরে নিজের রুমে যাচ্ছি। আমাদের এক সিনিয়র সহকর্মী বললেন, ‘বারান্দায় চল। কথা আছে তোমার সঙ্গে।’

ডাকবাংলোয় আমরা ছয়-সাতজন সহকারী কমিশনার থাকি। দেখি, আগে থেকেই অন্যরা ব্যালকনিতে বসে আছে। আমি গিয়ে বসলাম তাদের সঙ্গে।

‘তুমি পি.সি. কলেজের প্রিন্সিপালকে স্যার অ্যাড্রেস করেছো?’ জানতে চাইলেন সিনিয়র সহকর্মী প্রাক্তন কলেজ শিক্ষক।

‘হ্যাঁ।’ জবাব দিই আমি।

‘ম্যাজিস্ট্রেটরা কাউকে স্যার বলে না।’ গম্ভীর হয়ে বললেন আর একজন। তিনিও এক কলেজে অধ্যাপনা করেছেন।

‘কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও না?’ জানতে চাই আমি।

‘না, কাউকেই না।’ সিদ্ধান্তের মতো করে বললেন একজন।

‘শিক্ষকদের আমি স্যার বলি। বলবও।’

‘না বলবে না। পি.সি. কলেজের প্রিন্সিপাল এমন কোনো বড় অফিসার না।’

জনাব হারুন রশীদ এরপরে কী করেছেন সেই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু এই ঘটনা থেকে এটা স্পষ্ট বোঝা যায় যে, যোগদানের পর থেকেই প্রশাসন ক্যাডারের সদস্যদের স্লো পয়জনিং করা হয়। অনেক সময় সরাসরি নির্দেশনা দেওয়া হয় কীভাবে অন্যদের সঙ্গে মুনিবীয় আচরণ দেখাতে হবে! ১৯৮৩ ব্যাচের কর্মকর্তা জনাব আবদুল আজিজ ও তার ব্যাচমেটরা যখন প্রথমবারের মতো কুষ্টিয়া ডিসি অফিসে যোগদান করেন, ঠিক সেই দিনই কুষ্টিয়ার ডিসি জনাব ফজলুল হক মিয়া তাদের নির্দেশ দেন কাউকে যেন ‘স্যার’ না বলা হয়। জনাব আজিজের জবানিতে বক্তব্যটি ছিল এমন–

ডিসি মহোদয়ের ইঙ্গিতে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ভারী নাশতা আসে। নাশতাপর্ব শেষে সিনিয়র অফিসারদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের পরামর্শ দেন। চিরকুটে কিছু একটা লিখে আমাদেরকে পড়তে বলেন। চিরকুটে লেখা ছিল, ‘Meet with the important head of different district offices, but don’t address anybody as sir except district and session judge.’২৭ 

 ঘটনায় অন্তত দুটি বিষয় পরিষ্কার হয়। একটি হলো অন্য সবাইকে অসম্মান করার ঔপনিবেশিক সংস্কৃতি তারা আয়ত্ত করেন অত্যন্ত দৃঢ়ভাবেই। কাজেই প্রশাসনের এই ক্ষমতার অপব্যবহার ও ঔদ্ধত্যপনা কেবল ব্যক্তিনির্ভর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি তাদের সামষ্টিক বৈশিষ্ট্যেরই অংশ।

প্রশাসনের কর্তারা সাধারণ জনগণকে অসম্মান করে, অন্য পেশার লোকজনদের অসম্মান করে, এমনকি জনপ্রতিনিধিদেরও অসম্মান করে। উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা উপজেলা চেয়ারম্যানদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উপজেলা চেয়ারম্যানদের ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করেন না; অনেক সময় ভাববাচ্যে কথা বলেন, সরাসরি ‘চেয়ারম্যান সাহেব’ বলার সংস্কৃতিও অনুপস্থিত২৮।

 এই প্রবণতা নতুন নয়। ঔপনিবেশিক আমল থেকেই আমলাতন্ত্রে এই মনোভঙ্গির পরিচয় মেলে। এমন একটি ঘটনার কথা জানা যায় আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর ‘বাংলাদেশ সিভিল ও আর্মি ব্যুরোক্রাসির লড়াই’ গ্রন্থে। সেখানে উল্লেখ করা হয়– পাকিস্তান আমলে মন্ত্রী আফজাল (শেরে বাংলার ভাগনে ও অভিজ্ঞ মোক্তার) মন্ত্রীর মর্যাদা পেলেও তাঁর পাঞ্জাবি সেক্রেটারি জিএ ফারুকী তাঁকে ‘মুখটিয়ার সাহেব’ বলে সম্বোধন করতেন, দাঁড়িয়ে সম্মান করতেন না, এমনকি একবার তাঁর মুখে ফাইল ছুড়ে মারেন–কিন্তু এর জন্য কোনো শাস্তিও হয়নি২৯। স্বাধীনতার পরেও এই ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক মানসিকতার মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি; বরং এটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে আরও গভীরভাবে শিকড় গেড়েছে। ফলে তারা কেবল নিজেরা ক্ষমতায়িত হয়, পক্ষান্তরে তাদের এই অসীম ক্ষমতা অন্যকে দুর্বল করে তোলে। 

 পরে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কিছু অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের ফলে সমগ্র বাংলাদেশে প্রশাসন ক্যাডারকেন্দ্রিক একটি ভারসাম্যহীন, কর্তৃত্বপরায়ণ আমলাতন্ত্র তৈরি হয়েছে। আর এই একচেটিয়া কর্তৃত্বপরায়ণ বৈশিষ্ট্য তাদের জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়। এবং এর মাধ্যমে একটি স্বয়ংক্রিয় স্বার্থরক্ষাকারী এলিট শ্রেণি তৈরি হয়েছে। অন্য সব ক্যাডার ও পেশাজীবীরা এই এলিট শ্রেণির কাছে জবাবদিহিমূলক অধস্তন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়। যা প্রশাসন ক্যাডারকে আরও কর্তৃত্বশালী ও স্বেচ্ছাচারী করে তোলার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। আর এই স্বেচ্ছাচারিতা প্রশাসনযন্ত্রকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে তুলেছে। 

আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতির একটি বহুল আলোচিত প্যাটার্ন রয়েছে। প্রথমে তারা রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বিভিন্ন সুবিধা বা প্রলোভনের মাধ্যমে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি সেই প্রস্তাব গ্রহণ করে, তাহলে তাদের সেই সম্পৃক্ততাকেই পরবর্তী সময়ে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। একবার রাজনৈতিক নেতৃত্ব কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে, সেই অবস্থাকে পুঁজি করে আমলাতন্ত্র আরও বড় পরিসরে দুর্নীতি পরিচালনার সুযোগ পায়। ধরা যাক একটি মন্ত্রণালয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বই কেনার উদ্যোগ নিল। শুরুতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পছন্দ বা সুপারিশ অনুযায়ী কিছু বই তালিকাভুক্ত করা হবে। এবার সেই অনুমোদনকে ভিত্তি করে আমলারা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী আরও বহু বই তালিকায় যুক্ত করবে। নিয়োগ, বদলি বা পদায়নের ক্ষেত্রেও একই প্যাটার্ন কাজ করে। শুরুতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দু-একটি সুপারিশ বা অনুরোধ বাস্তবায়ন করা হয়। এরপর সেই নজিরকে কাজে লাগিয়ে প্রশাসনের ভেতরে আরও ব্যাপক মাত্রায় অনিয়ম, প্রভাব বাণিজ্য এবং দুর্নীতি বিস্তার লাভ করে। বড় আর্থিক প্রকল্পের ক্ষেত্রেও অনুরূপ পদ্ধতি কার্যকর থাকে। কোনো বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আকৃষ্ট করার মতো একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়। যদি সেই প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়, পরবর্তী সময়ে সেটিকেই ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে প্রকল্পের বিভিন্ন স্তরে আরও বড় পরিসরের অনিয়ম, অতিরিক্ত ব্যয় এবং আর্থিক দুর্নীতি সংঘটিত হয় এবং এই দুর্নীতির প্রধান কারিগর আমলাতন্ত্র। আমলাতন্ত্রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া বাস্তবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষে কোনো দুর্নীতিই করা সম্ভব হয় না। রাষ্ট্রের সব দুর্নীতির সঙ্গে আমলাতন্ত্র জড়িত থাকলেও প্রশাসনের কর্তারা অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে প্রায়ই নিজেদের বের করে নিচ্ছে। এ কারণে সরকার বদল হলে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অনেক সময় আইনের কাছে জবাবদিহি করতে হয়, কিন্তু প্রশাসনের কর্তারা সবসময়ই রয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। 

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাট পৌরসভার চেয়ারম্যান জনাব আবদুল কাদের মির্জা তাঁর লেখা গ্রন্থ ‘সত্য যে কঠিন’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে বলেন–

আমরা প্রায়ই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দুর্নীতির খবর পড়ি। দুর্নীতির দায়ে সাবেক মন্ত্রী, এমপি পর্যন্ত শাস্তি ভোগ করেন। কিন্তু কোনো সরকারি আমলাকে শাস্তি ভোগ করতে দেখি না বা খবর পাই না। কোনো সাবেক মন্ত্রী যদি দুর্নীতির দায়ে জেল খাটেন, তাহলে ওই মন্ত্রণালয়ের সচিবেরও জেল হওয়া উচিত। কারণ, সচিব ছাড়া একজন মন্ত্রীর পক্ষে দুর্নীতি করা সম্ভব নয়। আমি মনে করি, আমলারাই রাজনীতিবিদ অথবা জনপ্রতিনিধিদের দুর্নীতি শেখান।৩০

, ‘সরকারের পরিবর্তন হলে সচিবরা খোলস পাল্টে সরকারের খাস লোক হওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে সচিবরা বেঁচে যান।’ জনাব কাদের মির্জার কথার সত্যতা আছে। আমলারা অন্যায় অপকর্ম ও দুর্নীতি করেও পার পেয়ে যান। কারণ, তারা অত্যন্ত সুকৌশলে দুর্নীতি করে। আর এর বাইরেও তারা এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে যেন কোনো রকমের ব্যবস্থা নেওয়া না যায়, সেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও করে রাখে। কিন্তু তবুও এই নিশ্ছিদ্র প্রতিরক্ষা বলয় থেকে যে ক্ষুদ্র পরিমাণ দুর্নীতির খবর বাইরে প্রকাশ পায়, তাতেই সবার চক্ষু চড়কগাছ হয়ে ওঠে।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের কথাই ধরা যাক। এই প্রকল্পে দুর্নীতির প্রসঙ্গটি সামনে এলে বিশ্বব্যাংক এই প্রকল্প থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংকের ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়নের প্রতিশ্রুতির পর পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তোলপাড় শুরু হলে ২০১২ সালে দুদক একটি মামলা দায়ের করে। এই মামলায় সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, তৎকালীন সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াসহ মোট সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। যদিও ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বজনপ্রীতির আশ্রয়ে দুদক ২০১৪ সালে মামলার কার্যক্রম গোপনে বন্ধ করে দিয়েছিল বলে মনে করা হয়। দুদক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনও একই কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘পদ্মা সেতু নিয়ে আওয়ামী আমলের দুর্নীতি মামলা তৎকালীন কমিশন জোর করে বন্ধ করে দেয়। সে সময় যথেষ্ট প্রমাণ ছিল। তবুও কমিশন পিছু হটে।৩১ 

, ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলে, ২০২৪ সালে দুদক এই মামলাটি নতুন করে সচল করে। পদ্মা সেতু প্রকল্পে কেবল পরামর্শক নিয়োগ নিয়েই দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেনি। দফায় দফায় প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি নিয়েও সমালোচনা হয়। ২০০৭ সালে এই প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ হাজার ১৬১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বা ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। পরে ২০০৯ সালে প্রথম সংশোধনীতে তা বাড়িয়ে ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা, এরপর ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে দ্বিতীয় সংশোধনীতে ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। সবশেষ বিশেষ সংশোধনী নামে আরেক দফা ব্যয় বাড়িয়ে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা বা ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয়।৩২ মূল সেতু নির্মাণের সঙ্গে ভূমি অধিগ্রহণ, অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুর্নীতির মাধ্যমে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আর এর প্রতিটি পর্বেই প্রশাসনের ব্যক্তিরা জড়িত বলে ধারণা করা হয়। ভূমি অধিগ্রহণে স্থানীয় ডিসি অফিস, ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তাসহ অনেকের জড়িত থাকার প্রমাণও পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদার পেটি অফিসারসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধেই ১০ কোটি টাকা অর্থ আত্মসাতের মামলা দায়ের করেছে দুদক।৩৩ বাংলাদেশের ইতিহাসে পদ্মা সেতু দুর্নীতির ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে সবচেয়ে কলঙ্কিত ও সমালোচিত একটি ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। কেবল পদ্মা সেতুই নয়, বাংলাদেশের প্রায় সব বড় দুর্নীতির সঙ্গেই প্রশাসনের কর্মকর্তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

, খবরদারি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে দেশের সব সেক্টরেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এর ফলে রাষ্ট্রের ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে এবং মানুষের জীবনমান নিম্নমুখী হচ্ছে। উন্নয়ন কীভাবে ব্যাহত করে তার একটি নমুনা পাওয়া যাবে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেটরো) পরিচালিত এক জরিপে। বাংলাদেশে কর্মরত ২১৪টি জাপানি কোম্পানির ওপর তারা জরিপ করে দেখিয়েছেন যে প্রায় ৭১ শতাংশ কোম্পানিই বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়ে অসন্তুষ্ট। এই অসন্তুষ্টির মূল কারণ দুটি। এক. নিবন্ধন ও আইনি অনুমোদন প্রাপ্তিতে বিলম্ব এবং দুই. আমলাতান্ত্রিক জটিলতা৩৪। একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে খুব সহজেই বোঝা যাবে যে আসলে সমস্যা একটিই। প্রশাসন ক্যাডারের অসহযোগিতা। কারণ, এই দুটি প্রতিষ্ঠানই প্রশাসন ক্যাডারের সদস্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

দর্শন হলো কক্সবাজারে বন বিভাগের ৭০০ একর জমি দখল করে তথাকথিত ‘প্রশাসন একাডেমি’ বানানোর উদ্যোগ নেওয়া। এমনকি সংসদীয় কমিটির আপত্তি থাকার পরও প্রশাসন এই জায়গা দখল করে একাডেমি বানানোর কাজ শুরু করে। এতে বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির তৎকালীন সভাপতি জনাব সাবের হোসেন চৌধুরী বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যেখানে বেদখলে থাকা বনভূমি উদ্ধার করছি, সেখানে সরকারের আরেকটি সংস্থা সংরক্ষিত বনভূমি নিয়ে নেয়, এটা তো ঠিক নয়।’৩৫ এই সংরক্ষিত জমিতে কোনো রকমের স্থাপনা না করার জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, রয়েছে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও। কিন্তু এসবের তোয়াক্কা না করেই প্রশাসন ক্যাডার এই জমি দখল করেছে কেবল একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ও স্বেচ্ছাচারিতার ক্ষমতার কারণে। কারণ, ভূমি মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরই রয়েছে প্রশাসন ক্যাডারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে।

ত্ম্য আমলাতন্ত্রে একটি বহুল প্রচলিত বৈশিষ্ট্য। অথচ প্রতিটি ফাইল নিষ্পত্তির জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বিদ্যমান। যেমন- সহকারী সচিবদের জন্য ৭২ ঘণ্টা, উপসচিবদের জন্য ৪৮ ঘণ্টা এবং তার ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের জন্য ২৪ ঘণ্টা–এটি নিয়মিত পরিদর্শন, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিগত দৃষ্টান্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।৩৬ কিন্তু বাস্তবে এই নিয়ম কদাচিৎ মানা হয়। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা রাষ্ট্রের প্রয়োজনের চেয়ে নিজের স্বার্থকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। নিজেদের স্বার্থকে তারা অনায়াসে রাষ্ট্রের স্বার্থ বলে চালিয়ে দিতে পারে। যেখানে নিজের স্বার্থ নেই–এমন কোনো কাজে কদাচিৎ তাদের আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়। অন্যের বৈধ ও ন্যায়সংগত অধিকারকে তারা অগ্রাহ্য করেন, অন্যদিকে নিজেদের অন্যায় ও অবৈধ স্বার্থও অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। 

এমন অনেক দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্য পেশার অনেক কর্মকর্তা বিদেশের অর্থায়নে প্রশিক্ষণের সুযোগ পেলেও তাদের নানা বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। অন্যদিকে প্রশাসনের কর্মকর্তারা রাষ্ট্রের অর্থে অপ্রয়োজনে বিদেশ ভ্রমণের নামে বিশাল অঙ্কের অর্থের অপচয় করে থাকেন। কেউ খিচুড়ি রান্না করতে৩৭, কেউ আলু চাষ শিখতে,৩৮ কেউ আবার অন্য কোনো সাধারণ ও তুচ্ছ কাজে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় করে বিদেশ ভ্রমণ করে থাকেন। প্রশাসনের অনেক উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা নিয়মের বাইরে গিয়ে অবসরের কিছুদিন আগেও বিদেশ ভ্রমণে গিয়ে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় করেন। নির্বাচন কমিশনের সাবেক সচিব জনাব হেলাল উদ্দীন অবসরের মাত্র কিছুদিন আগে সরকারি খরচে শিক্ষা সফরে নেদারল্যান্ডস ও স্পেনে যান। মজার বিষয় হলো– কথিত এই শিক্ষা সফর শেষ করে দেশে ফিরে আসার পরদিনই তিনি অবসরে যান।৩৯ 

শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্য পেশার অনেক কর্মকর্তা বিদেশের অর্থায়নে প্রশিক্ষণের সুযোগ পেলেও তাদের নানা বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। অন্যদিকে প্রশাসনের কর্মকর্তারা রাষ্ট্রের অর্থে অপ্রয়োজনে বিদেশ ভ্রমণের নামে বিশাল অঙ্কের অর্থের অপচয় করে থাকেন। কেউ খিচুড়ি রান্না করতে, কেউ আলু চাষ শিখতে, কেউ আবার অন্য কোনো সাধারণ ও তুচ্ছ কাজে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় করে বিদেশ ভ্রমণ করে থাকেন।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার সচিতে অ্যাস্ট্রো অলিম্পিয়াড হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতিপত্র ইস্যু করা হয় অলিম্পিয়াড শুরু হওয়ার এক দিন পরে, অর্থাৎ, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪। বিস্ময়কর বিষয় হলো– ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ছিল শুক্রবার। ঠিক সময়ে মন্ত্রণালয় থেকে অফিস আদেশ না পাওয়ায় সেবার রাশিয়ার অ্যাস্ট্রো অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে। ঠিক একই ঘটনা আগেও ঘটেছিল। ২০২০ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য গণিত উৎসবে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বর্তমান লেখকের যাওয়ার কথা ছিল। নিয়ম মেনে যথাসময়ে আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে যখন সরকারি আদেশ জারি করা হলো, তখন গণিত উৎসব শেষ হয়ে গেছে। উল্লেখ্য, কলকাতায় গণিত উৎসবের দিন ধার্য করা হয়েছিল ৮-৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। আর মন্ত্রণালয় থেকে ইস্যুকৃত সরকারি আদেশ দেওয়া হয়েছিল ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে এমন ইচ্ছাকৃত অপরাধের জন্য প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তাকে শাস্তি পেতে হয়নি। উপরন্তু এর জন্য তারা অন্যদের কাছ থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা আশা করে। যেমন: ২০২৪-এর অ্যাস্ট্রো অলিম্পিয়াডের সরকারি আদেশ (জিও) জারির দিন ডেস্কের সেকশন অফিসার ফোনে জানালেন, ‘যুগ্ম সচিব ম্যাডাম অনেক পরিশ্রম করেছেন আপনার জিওর জন্য। ম্যাডামকে একবার ধন্যবাদ দিয়ে ফোন করবেন স্যার।’

নিজেদের অপকর্ম ও স্বেচ্ছাচারিতার কোনো জবাবদিহিতা না থাকলেও এরা অন্যদের কারণে অকারণে হেনস্তা করতে পিছপা হন না। সচিবালয়ে তাদের একক ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব থাকার কারণে মাঠপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা এমনকি জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধেও তারা অন্যায্যভাবে ‘শাস্তিমূলক’ ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন। কাউকে বরখাস্ত করা হয়, কাউকে অপসারণ করা হয়, কাউকে বদলি করা হয়। প্রতিশোধমূলক এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয় ‘জনস্বার্থে’র নামে। ফেসবুকে মন্তব্য করার কারণে কেবল ২০২৫ সালেই বিভিন্ন ক্যাডারের বহু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। অনেককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়, অনেককে বদলি করা হয়। যেমন: ফেসবুকে একটি পোস্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে শিক্ষা ক্যাডারের সদস্য জনাব ড. মুহম্মদ মফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দেওয়া হয় এবং তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো– তিনি ফেসবুকে আক্রমণাত্মক ও ঘৃণাসূচক কথা লিখেছেন। কিন্তু তিনি কী লিখেছেন? তিনি লিখেছেন–

বাজারে গেলে কলমি শাক বেশি কিনি, কারণ সবাই বুঝেন (ভিটামিন সি বেশি); ওদিকে আমার একই গ্রেডের একজন চাকুরিজীবীর বদলির খোলা চেক এ টাকার শেষে ‘মাত্র’ নিয়ে অনেক চিন্তায় পড়ে আছি। কারণ বাসাভাড়া দেবার জন্য টাকা উঠাতে গিয়ে শুনলাম একবারে বেশি ওঠানো যাবে না। সেই ‘বেশি’ এই ‘মাত্র’ এর নিকট সমুদ্রে বিন্দু ফোঁটার মত; সম্ভবত ২০০২ সাল। একটা স্কলারশিপের জন্য আবেদন করতে চাই। সার্কুলার দেখে মেইল করলাম। পয়সা কড়ি কত দিবে জানতে চাইলাম। জীবনে প্রথম k দিয়ে জবাব পেলাম, তখন জিজ্ঞেস করেছিলাম What is k? k দিয়ে হাজার বলায় তাদেরকে বোকা সেই আমি এখনো বোকা-ই রয়ে গেলাম। তাই C দিয়ে ছিঃ বুঝি এখনো। স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও জাতি পেলোনা একটা ছিঃ মুক্তি সমাজ। ভবিষ্যতে পাবে বলে এখনো কিছু দৃশ্যমান নয়।

এই পোস্টে কোনো আক্রমণাত্মক কথা নেই, কোনো প্রত্যক্ষ ঘৃণা উদ্রেককারী বক্তব্য নেই। কিন্তু তবুও তাকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। অথচ প্রশাসন ক্যাডারের অনেক সদস্য মারাত্মক আক্রমণাত্মক ও ঘৃণাসূচক বক্তব্য দিয়েও পার পেয়ে যাচ্ছেন কেবল সচিবালয়ে তাদের একচ্ছত্র ক্ষমতা ও আধিপত্যের কারণে। পুলিশ কর্মকর্তা গোলাম সাকলায়েন শিথিলের কথা ধরা যাক। চিত্রনায়িকা পরীমণির সঙ্গে ‘সম্পর্কে’ জড়িয়ে পড়েন তিনি। একে অসদাচরণ আখ্যা দিয়ে সরকারি কর্মচারী বিধিমালা মোতাবেক তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ‘গুরুদণ্ড’ দেওয়া হয়।৪০ যদিও এই ঘটনায় পরীমণির পক্ষ থেকে প্রতারণার কোনো অভিযোগ করা হয়নি। তথাপি গোলাম সাকলায়েন শিথিল-কে গুরুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে একই ধরনের অপরাধে জামালপুরের ডিসি আহমেদ কবীরের চাকরিচ্যুতি ঘটেনি। আরও মারাত্মক ঘটনার হোতা নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলাউদ্দিনকে ওএসডি করা হয়েছে।৪১

 ‘ঝোপ বুঝে কোপ মারা’র অপূর্ব দক্ষতা। অনেক আমলাই ‘সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়’ নীতিকে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির কার্যকর উপায় হিসেবে দেখে থাকেন। তাই তারা সবসময় উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায় থাকেন এবং সুযোগ পেলেই তা কাজে লাগান। উদাহরণ হিসেবে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার তৎকালীন ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ঘটনার কথা বলা যেতে পারে। ২০২০ সালের ২ সেপ্টেম্বর ইউএনও ওয়াহিদা ও তাঁর বাবার ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার ঘটনা ঘটে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারা দেশের ইউএনওদের জন্য দশজন সশস্ত্র নিরাপত্তা কর্মীর ব্যবস্থা করা হয়।৪২ যদিও ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার ঘটনার সঙ্গে তার দুর্নীতি এবং স্বেচ্ছাচারিতা জড়িত বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু তবুও ওয়াহিদার দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে এরা এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে সারা দেশে ইউএনওদের জন্য সশস্ত্র নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগের ব্যবস্থা করে। এই ঘটনা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। ইউএনওদের জন্য বাড়তি নিরাপত্তার এই ব্যবস্থা একটি বিশেষ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে করা হলেও এর পেছনে প্রশাসন ক্যাডারের প্রস্তুতি ছিল দীর্ঘদিনের। তৎকালীন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য থেকেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘ডিসি সম্মেলনে একটা দাবি ছিল যে, ইউএনওদের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা যাতে আরও জোরদার করতে পারি। সেটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসনেও আছে। ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র সচিব ও জননিরাপত্তা সচিবের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। অর্থ সচিবের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।’ এর আগে ২০১৮ সালের ডিসি সম্মেলনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক ব্যক্তিগত এবং বাসভবনের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ আনসার ফোর্স বা সশস্ত্র গার্ড নিয়োগের দাবি জানান। ইউএনও ওয়াহিদার ওপর হামলার ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে তারা ঝোঁপ বুঝে কোপটি মারলেন। অথচ বাংলাদেশে শিক্ষক, ডাক্তার থেকে শুরু করে অন্য অনেক পেশাজীবী প্রতিনিয়ত দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন। এমনকি রাজনৈতিক নেতাদের ওপরও নিয়মিত হামলার ঘটনা ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান কিংবা সংসদ সদস্যের ওপরও এমন হামলার নজিরও বিরল নয় এই দেশে। কিন্তু সেসব ঘটনা প্রতিকার কিংবা প্রতিরোধে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ থাকে না।

 কটি সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন করা হয়েছে রাষ্ট্রের এক বিপর্যয়কর কিংবা উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে। যেমন: ১৯৯২ সালের ১৭ মার্চ সচিবালয় ক্যাডার প্রশাসনের সঙ্গে আত্তীকৃত করা হয়। এর আগে ১৯৯১ সালের ১৯ আগস্ট এসএসবি গঠন করে সব ক্যাডারের পদোন্নতির একচেটিয়া অধিকার নিজেদের করায়ত্ত করে এমন এক সময়ে যখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন স্থিতিশীল হয়ে ওঠেনি। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে প্রধানমন্ত্রী শাসিত ব্যবস্থায় উত্তরণের আয়োজন চলছিল–ঠিক এমন একটি অস্থির সময়কেই তারা বেছে নিয়েছিল তাদের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার নিরঙ্কুশ করার সুযোগ হিসেবে। ঠিক একই অবস্থা দেখা যায় ইকোনমিক ক্যাডার আত্তীকরণের বেলায়ও। ইকোনমিক ক্যাডার আত্তীকৃত করা হয় ২০১৮ সালের ১৩ নভেম্বর। এর এক মাস পর ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনী ডামাডোলের মধ্যেই প্রশাসন ক্যাডারের সদস্যরা ইকোনমিক ক্যাডারটিকে আত্তীকৃত করে। এসব ঘটনায় আমলাতান্ত্রিক ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির নিদর্শন পাওয়া যায়, তবে এর পেছনে রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রশাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তাদের স্বার্থপরতা। তারা নিজেদের স্বার্থের বাইরে এক চুলও নড়ে না। আবার নিজেদের স্বার্থে তাদের বন্ধন অটুট থাকে। নিজেদের স্বার্থে প্রশাসন কতটা নির্লজ্জ রকমের স্বেচ্ছাচারী হতে পারে, তার নমুনা পাওয়া যায় ২০২৩ সালের বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। এই নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী জনাব সাদিক আবদুল্লাহর মনোনয়ন বাতিল করা হয়। মনোনয়ন বাতিলের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় তাঁর দ্বৈত নাগরিকত্ব৪৩। উল্লেখ্য, জনাব সাদিক আবদুল্লাহ হলেন আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনার নিকটাত্মীয় এবং বরিশাল অঞ্চলে এই পরিবার ভীষণ ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এমন একজন ক্ষমতাধর ব্যক্তির মনোনয়ন বাতিল করে নির্বাচন কমিশন আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেছে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ, এর আগের নির্বাচনে একই প্রার্থীর, দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনে অংশ নেন এবং নির্বাচিত হন। কী করে সম্ভব! আসল ঘটনা হলো– স্থানীয় ইউএনওর সঙ্গে সাদিক আবদুল্লাহর বিরোধ। ২০২১ সালে, বরিশালে একটি ব্যানার অপসারণকে কেন্দ্র করে তৎকালীন ইউএনও মুনিবুর রহমানের সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধে জড়িয়ে পড়েন বরিশাল সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ। এই ঘটনায় বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার একাট্টা হয়ে মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহর বিপক্ষে অবস্থান নেন। এই বিরোধের জের ধরেই সাদিক আবদুল্লাহর মনোনয়ন বাতিল করা হয়। প্রশাসনের পেটি অফিসারের সঙ্গে বিতণ্ডার জেরে একজন প্রভাবশালী প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। প্রশাসন এই কাজটি করতে পেরেছে কেবল স্থানীয় পর্যায় থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সর্বত্র তাদের কঠোর নজরদারি ও খবরদারি করার সুযোগ থাকার কারণে। 

ওয়া হয় প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের। ফলে নির্বাচনকেন্দ্রিক সব সিদ্ধান্তে রয়েছে প্রশাসন ক্যাডারের একচ্ছত্র ক্ষমতা। নির্বাচন কমিশন পুরোপুরি প্রশাসননির্ভর হওয়ায় নির্বাচন কমিশনকে জবাবদিহির আওতায় আসতে হয়নি–কেন আগেরবার তার মনোনয়ন বাতিল করা হলো না! এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে প্রশাসনের কর্তারা নিজেদের ঔপনিবেশিক স্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তাদের কাছে রাষ্ট্র, সরকার বা জনগণ বড় কথা নয়; বড় কথা হলো নিজেদের ইগো, অহংকার ও স্বার্থকে রক্ষা করা।

বাংলাদেশের প্রশাসনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এরা সংস্কারবিরোধী। আমলাতন্ত্রের যে কোনো ইতিবাচক সংস্কারের বিপক্ষে তাদের অবস্থান সবসময় দৃঢ় থাকে। স্বাধীনতার পর থেকে যতগুলো সংস্কার কমিশন গঠিত হয়েছে এর প্রায় প্রতিটিতেই কিছু ইতিবাচক সুপারিশ দেওয়া হয়েছিল। প্রশাসনের তীব্র বিরোধিতায় তা সংস্কার করা যায়নি। যেমন: স্বাধীনতার পর থেকে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করার বহু উদ্যোগ কেবল প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অসহযোগিতার কারণে নস্যাৎ হয়ে গেছে। সবশেষ ২০০৭ সালে সেনাবাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার যখন বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করে, প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা তখন স্পষ্টতই ‘জিহাদে’ নেমে পড়ে। বিয়াম মিলনায়তনে এক সেমিনারে প্রশাসনের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের বিরোধিতা করে। এক্ষেত্রে তারা যে যুক্তি দেয় তা কেবল অগ্রহণযোগ্যই নয়, বরং সংবিধানের অপব্যাখ্যাও। 

পৃথকীকরণের বিরুদ্ধে তাদের যুক্তি হলো– ‘বিচার বিভাগ পৃথক করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সরকারকে। সংবিধানের মূলনীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো আদালত নির্দেশনা দিতে পারেন না।’ তাঁরা মনে করেন, বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের মাধ্যমে প্রশাসনকে অকেজো করে দেওয়া হবে। প্রশাসনের একজন আলোচিত-সমালোচিত কর্মকর্তা জনাব রোকন-উদ-দৌলা বলেন, ‘তিনি ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার জন্য বক্তৃতা দিচ্ছেন। তিনি বলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও সচিব দুর্নীতি করলে তা ছাপা যাবে কিন্তু বিচারক দুর্নীতি করলে ছাপা যাবে না, আদালত অবমাননার জুজুর ভয়ে–এটা হতে পারে না।’ তিনি আদালত অবমাননার আইন বাতিলের দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের মাধ্যমে একজন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তাঁকে অপমান করা হয়েছে। ২০২১ সালের আগে পৃথকীকরণ হতে পারে না বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।৪৪ উল্লেখ্য, জনাব রোকন-উদ-দৌলাসহ প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তার বক্তব্যই ছিল স্পষ্টতই রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো– তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসব রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যথেষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়। উপরন্তু সরকার প্রশাসনের কর্মকর্তাদের চাপে তাদের সঙ্গে আপসরফা করতে বাধ্য হয়। ‘নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেসি’ নামক এক উদ্ভট প্রথার মাধ্যমে প্রশাসনের হাতে বিচারিক ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বহাল রাখে।৪৫ এর মাধ্যমে একদিকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব হয় এবং অন্যদিকে প্রশাসনের অন্যায় আবদারের কাছে সরকারের নতি স্বীকারের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ফলে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ফলে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল তা সুদূর পরাহতই থেকে যায়। তবে এই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেসি যে কেবল বিচার বিভাগের ক্ষমতাকেই দ্বিভাজিত করেনি, বরং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারী ও অপরাধপ্রবণ করে তুলেছে। প্রশাসনের হাতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা থাকায় সমাজে ও রাষ্ট্রে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন তো আসেইনি, বরং প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা সারা দেশে ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে ক্ষমতার অপব্যবহার করার অবারিত সুযোগ পাচ্ছে।

এই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেসি যে কেবল বিচার বিভাগের ক্ষমতাকেই দ্বিভাজিত করেনি, বরং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারী ও অপরাধপ্রবণ করে তুলেছে। প্রশাসনের হাতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা থাকায় সমাজে ও রাষ্ট্রে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন তো আসেইনি, বরং প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা সারা দেশে ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে ক্ষমতার অপব্যবহার করার অবারিত সুযোগ পাচ্ছে।

ধিতার নির্লজ্জ দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে এসএসপি ও উপসচিব পদে সংরক্ষিত কোটা সংস্কার বিষয়ে। অতীতের প্রায় সব সংস্কার কমিশনই উপসচিব পদে এসএসপি প্রথা চালুর পক্ষে সুপারিশ করেছে। কেবল প্রশাসনের বিরোধিতার কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারটির বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। উল্টো উপসচিব পদে প্রশাসন ক্যাডার তাদের জন্য ৭৫% শতাংশ কোটা বরাদ্দ করে নেয়। ১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে উপসচিব পদে প্রশাসন ক্যাডারের জন্য ৭৫% কোটা রেখে অন্যান্য ক্যাডারের জন্য ২৫% কোটা বরাদ্দ রাখা হয়। এই প্রজ্ঞাপনের কারণে সচিবালয়ে প্রশাসন ক্যাডারের কর্তৃত্ব নিরঙ্কুশ হতে থাকে। সংগত কারণেই অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে উত্তেজনা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে খাদ্য ও তথ্য ক্যাডারের কয়েকজন কর্মকর্তা উচ্চ আদালতে সরকারের এই বৈষম্যমূলক প্রজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে রিট দায়ের করেন। 

দীর্ঘদিন পর ২০০২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালত কোটা সংরক্ষণকে সম্পূর্ণ বেআইনি বলে রায় দেন। উচ্চ আদালতের মামলার রায় থাকা সত্ত্বেও প্রশাসন নানা ছল-চাতুরীতে এই কোটাপদ্ধতি বাতিল করেনি। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়। পরবর্তী সময়ে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে, ২০১০ সালে আদালতের রায়ে আবার সেই রায় বাতিল হয়ে যায়।৪৬ অনেকে মনে করেন, আদালতের এই রায় বাস্তবতার নিরিখে নয়, বরং প্রশাসন ক্যাডার ও আওয়ামী সরকারের পক্ষে ফরমায়েশি রায় দেওয়া হয়েছে। বলা বাহুল্য, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আদালত স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি বলে ব্যাপক প্রচার আছে এবং এ সময়ে আদালতের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ ছিল। এবং এই নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করার প্রধান মাধ্যম হলো প্রশাসন ক্যাডার। আদালতের ওপর সরকার ও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ সরকারকে কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে সহায়তা করে যা ক্রমেই ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করে।

-অভ্যুত্থানের পরেও এই কোটা বাতিল করা যায়নি। জনাব মুয়ীদ কমিশনের নেতৃত্বে যে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল সেই কমিশনের সুপারিশে বলা হয়, “সকল সার্ভিস থেকে মেধাবী ও দক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে সচিবালয়ের উপসচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পর্যন্ত পদগুলো নিয়ে একটি ‘সুপিরিয়র এক্সিকিউটিভ সার্ভিস’ (এসইএস) গঠনের সুপারিশ করা হলো।” কিন্তু এই সুপারিশের পরেই বলা হয়, ‘বাস্তবতার নিরিখে প্রশাসনিক সার্ভিসের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় বর্তমানে উপসচিব পদের ৭৫% ভাগ উক্ত সার্ভিসের জন্য সংরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা রাখা আছে। সকল সার্ভিসের সমতা বজায় রাখার স্বার্থে এবং জনপ্রশাসনের উচ্চতর পদে মেধাবীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কমিশন প্রশাসনিক সার্ভিসের ৭৫% কোটা হ্রাস করে ৫০% করার বিষয়টি অধিকতর যৌক্তিক মনে করছে। অবশিষ্ট ৫০% পদ অন্যান্য সার্ভিসের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।’ প্রশাসনের জন্য ৫০% কোটা সংরক্ষণের পরেও প্রশাসনের কর্মকর্তারা এই প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান নেয় এবং তারা সমাবেশ করে এর বিরুদ্ধাচারণ করে। “রাজধানীর বিয়াম ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে প্রশাসন ক্যাডারের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তারা যৌথ প্রতিবাদ সভা করেন। সেখানে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান আবদুল মুয়ীদ চৌধুরীর পদত্যাগ বা অপসারণ দাবি করা হয়। কমিশন যদি কোনো ‘অযাচিত’ সুপারিশ করে, তাহলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।”৪৭ সবশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা জনপ্রশাসন সংস্কার নিয়ে সচিবালয়ের আমলাদের বিরোধিতা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। 

 চর্চা প্রশাসন ক্যাডারের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। সব পেশা ও ক্যাডারেরই কিছু সুনির্দিষ্ট কাজ রয়েছে। কিন্তু প্রশাসন ক্যাডারের কাজ কী, সে বিষয়ে জনগণের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। সুনির্দিষ্ট কোনো বিশেষায়িত কাজ না থাকায় তাদের প্রধান কাজ হয়ে পড়ছে খবরদারি করা। আর এই খবরদারি করতে গিয়ে তারা প্রতিনিয়ত সীমা অতিক্রম করেন। অন্যদিকে প্রশাসনের কর্তারা যেহেতু নিজেদের রাজার প্রতিনিধি মনে করেন, কাজেই তারা মনে করেন রাষ্ট্রের সব বিষয়ে তাদের অবলীলায় প্রবেশাধিকার রয়েছে। তারা রাষ্ট্রের সব অঙ্গে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান। বিশেষায়িত জ্ঞান না থাকলেও তারা এমনসব পদে পদায়িত হন, যেখানে বিশেষায়িত জ্ঞানের প্রয়োজন। যেমন: কোনো রকমের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ও চাকরির অভিজ্ঞতা ছাড়াই তারা রাষ্ট্রের সব মন্ত্রণালয়ের একক নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রেখেছেন। আজ হয়তো কেউ বন ও পশু সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, আগামীকাল তিনিই হয়ে ওঠেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ভাগ্য নিয়ন্ত্রক। আজ যিনি কোনো মন্ত্রীর পিএস, কাল তিনি কোনো প্রশিক্ষণ একাডেমির কর্ণধার। আজ যিনি ডেইরি ফার্মের দায়িত্বে নিয়োজিত, কাল তিনি হয়ে ওঠেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের মাননীয় ডিজি। এভাবে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ও কর্মকালীন অভিজ্ঞতা ছাড়াই তারা রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংস্থার নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন। 

কোনো রকমের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ও চাকরির অভিজ্ঞতা ছাড়াই তারা রাষ্ট্রের সব মন্ত্রণালয়ের একক নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রেখেছেন। আজ হয়তো কেউ বন ও পশু সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, আগামীকাল তিনিই হয়ে ওঠেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ভাগ্য নিয়ন্ত্রক। আজ যিনি কোনো মন্ত্রীর পিএস, কাল তিনি কোনো প্রশিক্ষণ একাডেমির কর্ণধার। আজ যিনি ডেইরি ফার্মের দায়িত্বে নিয়োজিত, কাল তিনি হয়ে ওঠেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের মাননীয় ডিজি। এভাবে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ও কর্মকালীন অভিজ্ঞতা ছাড়াই তারা রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংস্থার নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন।

এই প্রবণতা এবং সুযোগ তাদের ক্রমাগত অনধিকার চর্চায় উৎসাহী করে তুলেছে। ফলে তারা অনেক সময়েই হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে ওঠেন। তারা প্রকৌশলশাস্ত্র বিষয়ে নিজেদের জাহির করেন, আবার শিক্ষা কিংবা আইসিটি বিষয়েও তারা নিজেদের কর্তৃত্ব ও খবরদারি দেখানোর চেষ্টা করেন। একটি স্টেডিয়াম, ভবন কিংবা অন্য কোনো স্থাপনার নকশা ও নকশার নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব, বৈজ্ঞানিক গবেষণার পদ্ধতি, তথ্যপ্রযুক্তির অবস্থা, কৃষি বা প্রাণিসম্পদের বিশেষায়িত ব্যবস্থাপনা কিংবা শিক্ষাব্যবস্থার একাডেমিক মান নির্ধারণ–এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান প্রয়োজন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এসব বিশেষায়িত বিষয়েও প্রশাসন ক্যাডারের আধিক্য রয়েছে। 

একটি ছোট্ট উদাহরণ দিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। সরকার সম্প্রতি ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছে।৪৮ এই উপদেষ্টা পরিষদের ২৬ সদস্যের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী ছাড়া নয়জন সচিবকে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সচিব, অর্থ বিভাগ, সচিব, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ, সচিব, খাদ্য মন্ত্রণালয়, সচিব, শিল্প মন্ত্রণালয়, সচিব, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, সচিব, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, সচিব, বিদ্যুৎ বিভাগ, সচিব, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, চেয়ারম্যান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে রাখা হয়েছে। এর সঙ্গে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকেও রাখা হয়েছে। সব কটি পদই রাখা হয়েছে আমলাতান্ত্রিক দিক থেকে। কিন্তু ঔষধ শিল্প নিয়ে যারা প্রকৃত অর্থে গবেষণা করেন তাদের রাখা হয়নি। কমিটিতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে আমলাদের আধিক্য রাখা হয়েছে। ফলে নীতিমালায় তাদের বক্তব্য, সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে জনস্বাস্থ্য কিংবা জনগণের প্রয়োজনের বিষয়টি অগুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এমন অবস্থা কেবল এই একটি ক্ষেত্রেই নয়; রাষ্ট্রের যতগুলো বিশেষায়িত কমিটি আছে এর প্রায় প্রতিটিতেই রয়েছে আমলা তথা প্রশাসন ক্যাডারের মাত্রাতিরিক্ত আধিক্য। ফলে প্রশাসনের স্বার্থের বাইরে কোনো সিদ্ধান্তই এ দেশে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

 কর্তাব্যক্তিরা তাদের ক্ষমতাকে সর্বগ্রাসী করার নতুন কৌশল হলো তথাকথিত ডিসি সম্মেলন। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা ডিসি সম্মেলনের মাধ্যমে অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে রাষ্ট্রের সব বিভাগে তাদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও খবরদারি সম্প্রসারণ করে চলছে। এই সম্মেলনে এমনসব প্রস্তাবও উত্থাপন করা হয়, যা উত্থাপন করার কোনো নৈতিক ও আইনগত এখতিয়ার তাদের নেই। যেমন: ২০২৬ সালের ডিসি সম্মেলনে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে তারা, ‘জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ, ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো পুনর্নির্মাণ বা মেরামত, জনবল নিয়োগ, পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ করাসহ স্বাস্থ্য খাত নিয়ে ৪৪টি প্রস্তাব দিয়েছেন।’৪৯ আপাতদৃষ্টিতে এই প্রস্তাবগুলো জনবান্ধব মনে হলেও বাস্তবে এর পেছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী এক ষড়যন্ত্রমূলক প্রক্রিয়া। 

 গভীরভাবে পর্যালোচনা করলেই এর দুর্বলতা ও দুরভিসন্ধিমূলক উদ্দেশ্যের কথা স্পষ্ট হয়। স্বাস্থ্য সেবার মূল দায়িত্বটি স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত পেশাজীবীদের। কাজেই স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে জড়িত পেশাজীবীরা এই পেশার অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করতে সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। কিন্তু এই প্রস্তাবগুলো স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে জড়িত ডাক্তার ও পেশাজীবীদের সঙ্গে সমন্বয় করে তৈরি করা হয়নি। তাদের পাশ কাটিয়ে প্রশাসন ক্যাডারের কতিপয় সদস্য কর্তৃক তৈরি করা প্রস্তাব এবং এর বাস্তবায়নে আদৌ কোনো সফলতা আসবে না। তা ছাড়া বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার মূল চ্যালেঞ্জ ইউনিয়ন পর্যায়ে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র পুনর্নির্মাণ ও জনবল নিয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর মানোন্নয়ন না করে ইউনিয়ন পর্যায়ে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র পুনর্নির্মাণ ও জনবল নিয়োগে প্রশাসন ক্যাডারের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বাড়তে পারে, তাদের দুর্নীতির সুযোগও তৈরি হতে পারে, কিন্তু স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন হতে পারে না বলেই অনেকে মনে করেন।

২০২৩ সালের ডিসি সম্মেলনে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে গণিত ও বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড আয়োজনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।৫০ অথচ এই কাজ জেলা প্রশাসনের পরিবর্তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা শিক্ষা বিভাগের করার কথা। একই সম্মেলনে তারা দণ্ডবিধির ১৭০, ১৭১ ও ৪১৯ ধারা ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনের তফসিলভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন। দণ্ডবিধির ১৭০ ধারা হলো, ‘যে ব্যক্তি নিজে ঐ পদে অধিষ্ঠিত না হওয়া সত্ত্বেও জেনেশুনে কোনো সরকারি কর্মচারীর নির্দিষ্ট পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার ভান করে, অথবা ঐ পদে অধিষ্ঠিত অন্য কোনো ব্যক্তির মিথ্যা পরিচয় ধারণ করে, এবং সেই ভানকৃত পরিচয়ে উক্ত পদের ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব দেখিয়ে কোনো কাজ করে বা করার চেষ্টা করে, সে ব্যক্তি অনধিক দুই বছর পর্যন্ত যে কোনো ধরনের কারাদণ্ডে অথবা অর্থদণ্ডে, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।’৫১ দণ্ডবিধির ১৭১ ধারা অনুযায়ী, প্রতারণামূলক বা বেআইনি উদ্দেশ্যে কোনো সরকারি কর্মচারীর ব্যবহৃত পোশাক বা কোনো নির্দিষ্ট প্রতীক পরিধান করা বা বহন করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আর ৪১৯ ধারায় মূলত ছদ্মবেশ ধারণ বা অন্য কোনো ব্যক্তির পরিচয় নকল করে প্রতারণা করার শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে। 

 স্পষ্ট যে, এই অপরাধগুলো সরাসরি বিচার বিভাগের আওতাভুক্ত। কিন্তু ডিসি সম্মেলনের মাধ্যমে তারা বিচার বিভাগের কার্যক্রম ও এখতিয়ারকে নিজেদের আওতাভুক্ত করতে চাইছে। এমনকি ২০২৩ সালের ডিসি সম্মেলনে ডিসিরা জেলা পর্যায়ে উন্নয়ন প্রকল্প তদারকিতে কমিটি গঠনের প্রস্তাব পর্যন্ত দিয়েছিলেন। তবে সরকারের তরফ থেকে কমিটি ছাড়াই আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ‘তদারকি’ চালিয়ে নিতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।৫২ বিশিষ্ট গবেষক হাবিব জাফরুল্লাহ সঠিকভাবেই প্রশাসনের প্রকৃত স্বরূপটি ধরতে পেরেছেন। তিনি মনে করেন, ‘প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের প্রশাসন ক্যাডার সম্পূর্ণরূপে ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। পাকিস্তান আমলে সিএসপি যেমন একটি ‘বন্ধ গোষ্ঠী’ (closed arena) হিসেবে নিজেদের মধ্যে নিয়ম ও মূল্যবোধ বিনিময় করত, তেমনি প্রশাসন ক্যাডারও নিজেদেরকে বহিরাগতদের থেকে আলাদা রাখে। তারা আনুভূমিক অন্তর্ভুক্তি (horizontal integration) বা বাইরের লোককে সরাসরি উচ্চপদে অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধী এবং উলম্ব অন্তর্ভুক্তি (vertical integration)-এর মাধ্যমে শুধু নিজেদের সদস্যদের ধাপে ধাপে উচ্চপদে উন্নীত করতে আগ্রহী।৫৩

 কর্তাব্যক্তিরা রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রে তাদের একক নিয়ন্ত্রণ চায়। এরইমধ্যে সব অঙ্গে তাদের একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তারা এই নিয়ন্ত্রণ আরও নিরঙ্কুশ করতে চায়। অথচ প্রশাসনের নেতৃত্বে কোনো প্রতিষ্ঠান সফল ও কার্যকর হয়েছে এমন কোনো দৃষ্টান্ত বাংলাদেশে নেই। প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাই যথার্থই মনে করেন– ‘আমলাতন্ত্রের স্বভাব এই যে, সে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে সহ্য করতে চায় না–হয় গ্রাস করে নেয়, নয়তো নষ্ট করে দেয়।’৫৪ বাংলাদেশের প্রশাসনিক বাস্তবতায় প্রফেসর চৌধুরীর এই বিশ্লেষণ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক বলে প্রতীয়মান হয়। বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, প্রশাসন ক্যাডারের প্রভাব ও আধিপত্যের কারণে বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে। বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক (BSB) এর একটি আলোচিত দৃষ্টান্ত হতে পারে। স্বাধীনতার পর থেকে এই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন প্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন কর্মকর্তা। সাধারণের দৃষ্টিতে তারা নির্ভরযোগ্য, দক্ষ এবং সৎ সিএসপি হিসেবে পরিচিত ছিল। অথচ এঁদের হাতেই এই ব্যাংকটির ভরাডুবি ঘটেছে।৫৫ প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরুর পর থেকে যেসব প্রকল্পে ঋণ দিয়েছে, তার ৭৫ ভাগ প্রতিষ্ঠানই আলোর মুখ দেখেনি। ২০০৭ সালের জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির ৩২ দশমিক ২৬ ভাগ মন্দ ঋণ, হিসাববিজ্ঞানের ভাষায় যে ঋণকে আর আদায়যোগ্য নয় বলে অভিহিত করা হয়। উল্লেখ্য, এই ব্যাংকের এমডি হিসেবে যেসব কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন: আবিদুর রহমান, ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরীর মতো ডাকসাইটে সিএসপি কর্মকর্তা। এ ছাড়া এই তালিকায় আরও ছিলেন আবদুল করিম, ড. এ কে এম আবদুল মুবিন, সোহেল আহমদের মতো প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিরা।

বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, প্রশাসন ক্যাডারের প্রভাব ও আধিপত্যের কারণে বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে। বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক (BSB) এর একটি আলোচিত দৃষ্টান্ত হতে পারে। স্বাধীনতার পর থেকে এই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন প্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন কর্মকর্তা। সাধারণের দৃষ্টিতে তারা নির্ভরযোগ্য, দক্ষ এবং সৎ সিএসপি হিসেবে পরিচিত ছিল। অথচ এঁদের হাতেই এই ব্যাংকটির ভরাডুবি ঘটেছে।

 নেতৃত্বে কোনো প্রতিষ্ঠান কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পেরেছে এমন একটি দৃষ্টান্তও পাওয়া যায় না। ভূমি ব্যবস্থাপনার কথাই ধরা যাক। স্বাধীনতার পর ভূমি ব্যবস্থাপনা এককভাবে প্রশাসনের হাতে ন্যস্ত রয়েছে। (অনেকে মনে করেন, ১৯৮০ সালের অক্টোবর মাসে নজিরবিহীন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সিভিল সার্ভিস (ভূমি)-কে সিভিল সার্ভিস (এডমিন) রূপে গঠন করা হয়।৫৬) এমন একক কর্তৃত্ব আর কোনো ক্ষেত্রে কোনো পেশাজীবীদের নেই। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ যথার্থই বলেছেন, 

জেলার সব সরকারি ভূ-সম্পত্তির কার্যত মালিক জেলা প্রশাসক। ভূমি রাজস্ব আদায় ও জমির রেকর্ড তার জিম্মায়। এই ভূ-সম্পত্তির মধ্যে খাল-বিল, নদী-নালা, হাওড়-বাঁওড় ইত্যাদি রয়েছে। এ দেশে জলাভূমি বেদখল, অপদখল বা ভূমিদস্যুতা সর্বজনবিদিত। জেলা প্রশাসকরা সরকারের ভূ-সম্পদ রক্ষা করতে পারেনি।’৫৭ 

 এই একটি প্রতিষ্ঠান নয়, প্রশাসনের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও অন্যায়-অযৌক্তিক আচরণে অনেক প্রতিষ্ঠানই ধ্বংস হয়ে গেছে। বিএসবির মতো যেসব প্রতিষ্ঠান সরাসরি প্রশাসনের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়, সেসব প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে। এসব প্রতিষ্ঠান ধ্বংসে প্রশাসনের দায় প্রত্যক্ষ। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানের পেছনে প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ দায় রয়েছে বলে অনুমান করা অনুচিত নয়। কারণ, বাংলাদেশের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের পেছনেই প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। যেমন: আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সঙ্গে প্রশাসনের ভূমিকা রয়েছে। মাঠপর্যায়ে পুলিশের ওপর প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আর কেন্দ্রীয়ভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পুলিশের ঊর্ধ্বতন সব পদে তাদের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। নিম্ন আদালত দীর্ঘদিন সম্পূর্ণভাবেই ছিল প্রশাসনের এখতিয়ারে। ২০০৯ সালে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ফলে এই নিয়ন্ত্রণ কিছুটা কমলেও আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিচার বিভাগের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ চালু আছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, প্রকৌশলসহ সব ক্ষেত্রেই রয়েছে প্রশাসনের প্রবল নিয়ন্ত্রণ। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান সফল না হওয়ার দায় প্রশাসন এড়াতে পারে না।

এত ব্যর্থতা সত্ত্বেও প্রশাসনের আগ্রাসী দখলদারী মনোভাবের কমতি নেই। তারা বছর বছর তাদের ক্ষমতা প্রসারিত করেই চলেছে। প্রশাসনের একমাত্র লক্ষ্য হলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা। নিজেদের অর্থবিত্ত ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করা। তাদের কাছে ভালো পোস্টিং, মন্দ পোস্টিং নির্ভর করে নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে। তাদের কাছে ‘ভালো পোস্টিং’ মূলত নির্ভর করে বিদেশ গমনের অবারিত সুযোগ, উপরি অর্থ উপার্জনের সম্ভাবনা এবং সর্বোপরি ক্ষমতার দম্ভ দেখানোর সুযোগ। সাবেক আমলা সোহেল এ চৌধুরীর স্মৃতিকথা ‘আমলাতন্ত্র ও আমার জীবন’ গ্রন্থ থেকে এমনই একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি। সোহেল এ চৌধুরী যখন যুব মন্ত্রণালয়ে পোস্টিং পেলেন, তখন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ছিলেন ড. এ টি এম শাসসুল হুদা। এ টি এম শামসুল হুদা জনাব চৌধুরীকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘ভালো কর্মকর্তা হিসেবে তাকে এখানে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে। এখান থেকে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ আছে’৫৮। লক্ষণীয় জনাব হুদার মতো একজন কর্মকর্তার কাছে ‘ভালো পোস্টিং’-এর মানে হলো ‘বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ আছে এমন পোস্টিং’, ‘ব্যক্তিগত লাভালাভের সুযোগ রয়েছে এমন পোস্টিং’।

 সরকারি কর্মকর্তাদেরই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ও লেজুড়বৃত্তি করার সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মনে করতেন– প্রশাসনিক প্রশ্ন রাজনৈতিক প্রশ্ন নয়, একে রাজনীতির বাইরে রাখতে হবে৫৯। কর্মচারী আচরণ বিধিমালায় আইন করে সরকারি কর্মচারীদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বাইরে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ২৫ ধারায় সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে– ‘কোনো সরকারি কর্মচারী কোনো রাজনৈতিক দলের বা রাজনৈতিক দলের কোনো অঙ্গসংগঠনের সদস্য হইতে অথবা অন্য কোনোভাবে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করিতে বা কোনো প্রকারেই সহায়তা করিতে পারিবেন না।’ ৬০ একই সঙ্গে সরকারি চাকরির ১৯৭৯ এর ৩০ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কোনো সরকারি কর্মচারী তাঁহার চাকরি সংক্রান্ত কোনো দাবির সমর্থনে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে সরকার বা সরকারি কর্মচারীর ওপর কোনো রাজনৈতিক বা অন্য কোনো বহিঃপ্রভাব খাটাইতে পারিবেন না।’৬১ কিন্তু বাস্তবে এসব লিখিত নিয়মকানুন আর বিধিনিষেধ কদাচিৎ মানা হয়। বাস্তবে অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সরাসরি রাজনৈতিক ও দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন। ২০০৬ সালে তথাকথিত জনতার মঞ্চে সরকারি কর্মকর্তাদের সরাসরি অংশগ্রহণ দেখা গিয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালের পর থেকে প্রশাসনে দলীয়করণ অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে আমলাতন্ত্র মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। সরকার বদল হয়, কিন্তু আমলাতন্ত্রের চরিত্র বদল হয় না। তারাও রং বদলায়। এ প্রসঙ্গে জেনারেল মইন ইউ আহমেদ তার একটি গ্রন্থে বলেন– 

 আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার কথাও সর্বজনবিদিত। জরুরি অবস্থার ভেতরেও আমরা জনস্বার্থের বিভিন্ন বিষয়কে প্রত্যাশিত গতি দিতে ব্যর্থ হয়েছি। বিভিন্ন বিষয়ে উদ্যোগ নিলেও লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে তা থেমে থেকেছে বিভিন্ন স্তরে। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত এক ব্রিটিশ ডিপ্লোম্যাটের একটি উক্তি আমার মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, তোমাদের দেশের ব্যুরোক্রেসি উপনিবেশ আমলের আমাদের সব ঐতিহ্যকে পুরোপুরি ধারণ করে আছে, শুধু একটি ছাড়া। আর আমরা সবকিছু পরিবর্তন করে শুধু একটি জিনিস ধরে রেখেছি। আমি উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম কী সেটা? তিনি উত্তরে বলেছিলেন, সময়ের সাথে সাথে আমরা সবকিছু পরিবর্তন করেছি শুধু ব্যুরোক্রেসিকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার বিষয়টি ধরে রেখেছি আর তোমরা বর্তমান সময়ে অচল সেসব নীতিমালা সবই ধরে রেখেছো কিন্তু ব্যুরোক্রেসিকে রাজনীতি থেকে মুক্ত রাখার বিষয়টি পরিবর্তন করে ফেলেছো।৬২

 বছরগুলোতে আমলাতন্ত্রের ওপর সরকারের মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা, আমলাদের দলীয় কর্মীর মতো ব্যবহার করা এবং আমলাতন্ত্রে জবাবদিহিতাহীন সংস্কৃতি তৈরি করার মাধ্যমে আমলাতন্ত্রের মধ্যে ঔপনিবেশিক সংস্কৃতি আরও দৃঢ় ভিত্তি লাভ করেছে। এর ফলে আমলাতন্ত্র সামগ্রিকভাবে একটি জনবিরোধী সংগঠনে পরিণত হয়েছে। ড. আকবর আলী একে দেখছেন গ্রেশাম ল সিনড্রোমের নতুন রূপ হিসেবে। যদিও খান এই গ্রেশাম ল সিনড্রোমের জন্য রাজনীতিকে দায়ী করেছেন৬৩। কিন্তু প্রকৃত অর্থে এর দায় প্রশাসনের কর্তাদেরও কম নয়। এর জন্য দায়ী হলো আমলাতন্ত্রের সুবিধাবাদী প্রবণতা। জনাব সাথী বলেন, ‘সুবিধাবাদ যেন এই কাঠামোর রক্তনালিতেই প্রবাহিত হয়’৬৪। এই সুবিধাবাদের বলয় রক্ষার্থেই আমলারা ঐক্যবদ্ধ থাকেন। ডিসি সম্মেলন থেকে সচিব কমিটি–প্রশাসনের এসব কার্যক্রমের মূলে রয়েছে নিজেদের আধিপত্যবাদকে বজায় রাখা। বলা বাহুল্য, নিজেদের ভেতরে যত অন্তর্দ্বন্দ্বই থাকুক-না কেন, সেই অন্তর্দ্বন্দ্ব থেকে তারা সামগ্রিকভাবে নিজেদের সংহত করে জাতীয় জীবনে আধিপত্য বিস্তার করতে সমর্থ হয়েছেন৬৫। এই প্রবণতা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অন্য সব পেশা থেকে আলাদা ও স্বার্থপর করে গড়ে তুলেছে। আমলাদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে প্রখ্যাত লেখক, গবেষক ও অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদ বলেন–

 একটি স্বার্থপরায়ণ সুবিধাভোগী শ্রেণি; যদিও তাদের জন্ম দেওয়া হয়েছিল জনগণের সেবার জন্যে, কিন্তু সেবার বদলে শক্তিকেন্দ্রে বসে তারা শোষণপীড়ন করেছে জনগণকে। তবে তারাও সেবা করে, তারা সেবা করে শক্তিমানদের; যারাই ক্ষমতা দখল করে আমলারা হয়ে ওঠে তাদেরই একান্ত বিনীত সেবক। আমলারা বিবেকে বিশ্বাস করে না, বিশ্বাস করে স্বার্থে ও শক্তিতে। নানা শক্তিকেন্দ্রে থাকার ফলে তারা উপভোগ করে বিপুল ক্ষমতা। যে-ক্ষমতা তাদের দেওয়া হয়, তা তো তারা উপভোগ করেই, এমনকি যে-ক্ষমতা তাদের দেওয়া হয় না, তা-ও সম্ভোগ করে তারা। ক্ষমতার অপব্যবহারই শক্তি, সদ্ব্যবহার কোনো শক্তি নয়। আমাদের আমলারা ক্ষমতার অপব্যবহারেই দক্ষ। সব ক্ষেত্রে তারা অহমিকাপরায়ণ, উদ্ধত, কিন্তু শক্তিমানদের কাছে তারা বিনীত ভৃত্যের মতো; এবং তারা দুর্নীতিপরায়ণ, পীড়নবাদী, তারা বিলাস ও ইন্দ্রিয়পরায়ণ। এমন কোনো দোষ নেই, যাতে তারা অলংকৃত নয়। শ্রেণিচরিত্রে তারা সবাই এক, যদিও দু-একটি খাপ না-খাওয়া আমলা থাকা অস্বাভাবিক নয়। আমলারা শক্তিমান, তাই জনগণ তাদের সমীহ করে; কিন্তু শ্রদ্ধা করে না।৬৬

 সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার প্রতি লোভ থাকা অস্বাভাবিক নয়। প্রশাসনের রয়েছে একদিকে অবাধ ক্ষমতা, প্রভাব, প্রতিপত্তি আর অন্যদিকে অবাধ সুযোগ-সুবিধা– এই দুইয়ের সম্মিলনে প্রশাসন এখন একটা রাজকীয় পেশা হয়ে উঠেছে। ফলে সংগত কারণেই এই ক্যাডারের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যেও প্রশাসন ক্যাডারে আসার প্রবণতা আগের চেয়ে অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে অল্প কিছু ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত বাদে মেধাবী শিক্ষার্থীরাই বিজ্ঞান নিয়ে পড়ে থাকে। শিক্ষা জীবনে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং বিজ্ঞান অনুষদে পড়ার প্রতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের আগ্রহ থাকে সবচেয়ে বেশি। এই মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিসিএস প্রশাসনের প্রতি আগ্রহ মাত্রাতিরিক্তভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৯০ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত সময়কালে অনুষদভিত্তিক অন্তর্ভুক্তি উল্লেখযোগ্য হারে পরিবর্তিত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯০ সালে কলা ও বিজ্ঞান অনুষদ থেকে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে যোগদানের হার ছিল যথাক্রমে ৭৬.৮১ ও ১৩.৪ শতাংশ। কিন্তু ২০০১ সালে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। এ সময়ে বিজ্ঞান অনুষদের কর্মকর্তার হার বেড়ে ৭৪.৬ শতাংশ হয় এবং কলা অনুষদের হার কমে ১৬.৯ শতাংশে নেমে আসে। ২০১২ ও ২০১৭ সালেও বিজ্ঞান অনুষদের প্রাধান্য বজায় থাকে। ২০০১-২০১৭ সময়কালে গড়ে ৭৩.৪ শতাংশ কর্মকর্তা বিজ্ঞান অনুষদ এবং ১৯.৭৫ শতাংশ কর্মকর্তা কলা অনুষদ থেকে এসেছেন।৬৭ এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম একবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, 

আমাদের দেশে কোনো বিজ্ঞানী নেই, গবেষক নেই, দার্শনিক নেই; যেদিকে তাকাই শুধু দেখি প্রশাসক। আমাদের দেশেও মহাকাশ গবেষণা হয়, তার নেতৃত্বে আছেন একজন ক্যাডার অফিসার।’ 

অন্য পেশা থেকে প্রশাসনে আসার প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক ক্যাডারের অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা নিম্নতম পদে উপসচিব হিসেবে যোগদান করেন। অতীতে শিক্ষা ক্যাডারের সর্বোচ্চ পদ অধ্যাপক পদের কর্মকর্তা উপসচিব পদে যোগদান করেছেন। সম্প্রতি শিক্ষা ক্যাডারের সর্বোচ্চ পদ অধ্যাপক পদমর্যাদার সদস্যও সদস্য প্রশাসনের সর্বনিম্ন গ্রেডে যোগদান করার মতো মন্দ দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন।

জনাব সিরাজ উদ্দিন সাথী তাঁর একটি গ্রন্থে প্রশাসন ক্যাডার দুরাচারী সংগঠন হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘সকল পেশায় দুরাচারী ব্যক্তি আছে। ডাক্তার, উকিল-মোক্তার, জজ-ব্যারিস্টার, প্রকৌশলী, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ীসহ কমবেশি সকল পেশায়। তাই বলে সেই পেশাটাই দুরাচারী বলে গণ্য হয় না। অথচ সরকারি প্রশাসনযন্ত্রে কর্মরতদের বেলায় ব্যাপারটা যেন তেমনই ঘটে’৬৮। জনাব সাথীর সমগ্র পেশাকে দুরাচারী আখ্যা দেওয়াকে কিছুটা অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে। তবে যে সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, প্রশিক্ষণ, আবহ এবং পরিমণ্ডলে একজন নবীন কর্মকর্তা ধীরে ধীরে ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হয়ে ওঠে, তা নিঃসন্দেহে দুরাচারীই বটে। এই দুরাচারী আমলাতন্ত্রের কারণেই ‘মন্ত্রণালয়’ হয়ে উঠেছে আজ ‘সচিবালয়’। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনামলে সচিবালয় অধিষ্ঠান ও ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেছিল ‘প্রেসিডেন্সি অব ফোর্ট উইলিয়াম ইন বেঙ্গল’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান, যা আদতে ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করার জন্য ইংরেজদের একটি কুঠি মাত্র’৬৯। এই কুঠিরই নবতর সংস্করণ হলো আজকের ‘সচিবালয়’। সচিবালয়ে তাদের একচ্ছত্র ক্ষমতার কারণে তারা নিজেরা রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের ওপর একক কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পেরেছে। সামগ্রিকভাবে প্রশাসন ক্যাডার একক কর্তৃত্বশীল একটি সংগঠনে পরিণত হয়েছে আর সমগ্র বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে তাদের শাসন ও শোষণের প্ল্যাটফর্ম।’ এই রকমের শক্তিশালী একটি আমলাতন্ত্র বা প্রশাসন শক্তিশালী নির্বাহী নেতৃত্ব (executive); কার্যকর রাজনৈতিক দল; সক্রিয় আইনসভা (legislature); স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন (voluntary associations); এবং গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য অপরিহার্য অন্যান্য রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের বিকাশে বাধাগ্রস্ত করে।’৭০ ফলে চূড়ান্ত বিচারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সমগ্র দেশ ও দেশের মানুষ।

 পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র তথা প্রশাসনের যে বৈশিষ্ট্যগুলো সবার নজরে আসে তা হলো– প্রশাসনের ঔপনিবেশিক সংস্কৃতি, কর্তৃত্বপরায়ণতা, স্বার্থপরতা ও জনবিরোধী প্রবণতা। ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির কারণে শাসনের প্রতি তাদের যতটা আগ্রহ থাকে, জনসেবার প্রতি ততটা আগ্রহ থাকে না। ঔপনিবেশিক সংস্কৃতি তাদের আচরণকে ঔদ্ধত্যময় করে তোলে, তাদের মধ্যে প্রভুসুলভ প্রবণতা তৈরি হয়। এটা কেবল জনগণের ভোগান্তিই বাড়ায় না, তাদের মর্যাদাহীন করে তোলে। স্বার্থপরতার কারণে নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে তারা অপরের স্বার্থ তথা জনগণের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করে না। প্রশাসনের এই স্বার্থপরতা তাদের একদিকে ক্ষমতার কাছে নতজানু করে তুলছে আবার অন্যদিকে তাদের দুর্নীতিগ্রস্ত করে তুলছে। আর এই বৈশিষ্ট্যগুলো নিঃসন্দেহে তাদের জনবিরোধী শক্তিতে পরিণত করছে।

সফিক ইসলাম: শিক্ষক, লেখক। ইমেইল: shafiq71bd@gmail.com 

তথ্যসূত্র:

১। Paulin, A. A., Anthopoulos, L. G., & Reddick, C. G., Beyond bureaucracy: Towards sustainable governance informatisation. Springer, 2017, p. 29.

২। Ludwig von mises, Bureaucracy, published by Liberty Fund, USA, 1972, p. 1.

৩। হুমায়ুন আজাদ, জলপাই রঙের অন্ধকার, হুমায়ুন আজাদ রাজনৈতিক প্রবন্ধসমগ্র, আগামী প্রকাশনী, ২০২২, পৃ. ৫০২

৪। সিরাজ উদ্দিন সাথী, আমলা পুরাণ, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ঢাকা, প্রকাশকাল ২০২৪, পৃ. ১৫।

৫। Joseph La Palombara, An Overview of Bureaucracy and Political Development, Research in Public Policy Analysis and Management, Elsevier, 2006, Volume 15, 193–220

৬। Dr. Md. Awal Hossain Mollah, Administrative Reforms and Governance in Bangladesh: How Far The Dream Of Success?, Global Journal of Arts Humanities and Social Sciences, Vol.2, No.4, pp.26-52, June 2014, p. 26-42.

৭। সিরাজ উদ্দিন সাথী, আমলা পুরাণ, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ঢাকা, প্রকাশকাল ২০২৪, পৃ. ৪৭-৪৮.

৮। মোস্তফা কামাল হায়দার, স্টিলফ্রেমের বিবর্তন: বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র, নয়নজুলি, ঢাকা, প্রকাশকাল ২০২৪, পৃ. ৩৮২-৩৮৩।

৯। মুস্তফা মজিদ সম্পাদিত বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র, দেশ প্রকাশ, প্রকাশকাল ১৯৯৮, পৃ. ৬৫-৭০।

১০। আন্দালিব রাশদী; আমলা শাসানো হুকুমনামা ও বিচিত্র গ্রন্থ; ঐতিহ্য প্রকাশনী, প্রকাশকাল ২০১৩, পৃ. ১৫।

১১। সিরাজ উদ্দিন সাথী, বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ঢাকা, প্রকাশকাল ২০১৭, পৃ. ২৬২-৬৭

১২। মোস্তফা কামাল হায়দার, স্টিলফ্রেমের বিবর্তন: বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র, নয়নজুলি, ঢাকা, ২০২৪, পৃ. ৪১৬.

১৩। সিরাজ উদ্দিন সাথী, আমলা পুরাণ, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ঢাকা, প্রকাশকাল ২০২৪, পৃ. ১১।

১৪। মাহবুব তালুকদার, বঙ্গভবনে পাঁচ বছর, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা, প্রকাশকাল ২০২২, পৃ. ১৬-১৭।

১৫। মাহবুব তালুকদার, বঙ্গভবনে পাঁচ বছর, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা, প্রকাশকাল ২০২২, পৃ. ১৬-১৭।

১৬। আকবর আলী খান, পুরানো সেই দিনের কথা, প্রথমা প্রকাশ, ঢাকা, প্রকাশকাল ২০২২, পৃ. ২২৪।

১৭। দৈনিক আমার দেশ, ৩ জুন ২০২৬

১৮। https://www.banglatribune.com/national/639138/সাবেক–ডিসি–সুলতানার–নির্দেশেই–মধ্যরাতে–মোবাইল

১৯। https://www.jagonews24.com/country/news/33413

২০। আবদুল আজিজ, আমলা কাহিনি, রোদেলা, ঢাকা, প্রকাশকাল ২০২৩, পৃ. ১৩।

২১। আবদুল আজিজ, আমলা কাহিনি, রোদেলা, প্রকাশকাল ২০১৩, লেখার শিরোনাম ‘প্রশাসনের হাত অনেক লম্বা’, পৃ. ৪৬-৪৭। 

২২। দৈনিক যুগান্তর, ২০ মে ২০২৫

২৩। https://dbcnews.tv/articles/মাস্ক-না-পরায়-তিন-বৃদ্ধকে-কানে-ধরালেন-ম্যাজিস্ট্রেট

২৪। জয়ন্তকুমার রায় ও মুনতাসীর মামুন, প্রশাসনের অন্দরমহল: বাংলাদেশ, কলকাতা, প্রকাশকাল ১৯৮৭, পৃ. ৩৫।

২৫। হারুন রশীদ, আমলাবেলা, সূচীপত্র প্রকাশনী, ঢাকা, ২০২৪, পৃ. ৩৪

২৬। হারুন রশীদ, আমলাবেলা, সূচীপত্র প্রকাশনী, ঢাকা, ২০২৪, পৃ. ৩৪

২৭। আবদুল আজিজ, আমলা কাহিনি, রোদেলা, প্রকাশকাল ২০১৩, লেখার শিরোনাম ‘প্রশাসনের হাত অনেক লম্বা’, পৃ. ৪১।

২৮। Nizam Ahmed, Public Service Delivery in Bangladesh: Parliament, Public Policy and Local Government, The University Press Limited, Dhaka, published in 2020, p. 231.

২৯। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী, বাংলাদেশ সিভিল ও আর্মি ব্যুরোক্রাসির লড়াই, আগামী প্রকাশনী, ২০২২, পৃ. ২১-২২

৩০। দৈনিক প্রথম আলো, ১৩ জানুয়ারি ২০২২

৩১। The Daily Star, 15 May, 2026 

৩২। দৈনিক যুগান্তর, ২২ জুন ২০২৩

৩৩। Voice7news, 5 March, 2025

৩৪। দৈনিক বণিক বার্তা, ৩১ আগস্ট ২০২৩

৩৫। The Daily Star, 19 September 2021

৩৬। Kamal Siddiqui. Towards Good Governance in Bangladesh: Fifty Enpleasant Essays, The University Press Limited, Dhaka, published in 2012, p. 116

৩৭। https://www.jagonews24.com/national/news/610693

৩৮। https://www.arthosuchak.com/archives/631766/

৩৯। দৈনিক প্রথম আলো, ২৫ মে ২০২২

৪০। বিডিনিউজ২৪.কম, ১৮ জুন ২০২৬

৪১। দৈনিক আমার দেশ, ১৭ মার্চ, ২০২৬।

৪২। বাংলাট্রিবিউন, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

৪৩। দ্য ডেইলি স্টার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৩

৪৪। দৈনিক প্রথম আলো, ২২ অক্টোবর, ২০০৭

৪৫। দৈনিক প্রথম আলো, ২৪ অক্টোবর, ২০০৭

৪৬। The Daily Star, 24 May 2010.

৪৭। দৈনিক প্রথম আলো, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫

৪৮। স্মারক নম্বর- ০৪.০০.০০০০.০০০.৬১১.০৬.০০০৩.২৬.১৭৭, ঢাকা, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ/১৯ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

৪৯। দৈনিক প্রথম আলো, ২ মে ২০২৬

৫০। দৈনিক প্রথম আলো, ২৪ জানুয়ারি ২০২৩

৫১। http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-11/section-2907.html?lang=bn

৫২। প্রতিদিনের সংবাদ, ১৯ জানুয়ারি ২০২২ 

৫৩। Habib Zafarullah, Bureaucratic Elitism in Bangladesh: The Predominance of Generalist Administrators, Asian Journal of Political Science, 2007. p. 164-165. http://www.informaworld.com/smpp/title~content=t741771145

৫৪। মুস্তফা মজিদ সম্পাদিত বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র, দেশ প্রকাশ, প্রকাশকাল ১৯৯৮, পৃ. ৯৩।

৫৫। দৈনিক প্রথম আলো, ২১ অক্টোবর, ২০০৭

৫৬। মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, ঔপনিবেশিক প্রশাসন কাঠামো, প্রেক্ষিত বাংলাদেশ, চন্দ্রছাপ, ঢাকা, প্রকাশকাল ২০১৮, পৃ. ৪১।

৫৭। তোফায়েল আহমেদ, সংস্কার সংলাপ, (সূচনা পত্র) সূত্র: রাষ্ট্র, নির্বাচন, শাসন-প্রশাসন ও সংবিধান, গ্রন্থিক প্রকাশন, প্রকাশকাল ২০২৩, পৃ. ৭৭ 

৫৮। সোহেল এ চৌধুরী, আমলাতন্ত্র ও আমার জীবন, ঐতিহ্য প্রকাশনী, ঢাকা, ২০২০, পৃ. ৬৬

৫৯। David H. Rosenbloom, et al. Public Administration: Understanding Management, Politics, and Law in the Public Sector, McGraw-Hill, New York, published in 2015, p. 4.

৬০। মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া, চাকরির বিধানাবলী, বর্ধিত ও সংশোধিত তেত্রিশতম সংস্করণ, রোদ্দুর প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০৭, পৃ. ২৩

৬১। মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া, চাকরির বিধানাবলী, বর্ধিত ও সংশোধিত তেত্রিশতম সংস্করণ, রোদ্দুর প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০৭, পৃ. ২৭

৬২। জেনারেল মইন ইউ আহমেদ, শান্তির স্বপ্নে: সময়ের স্মৃতিচারণ, এশিয়া পাবলিকেশনস, ঢাকা, ত্রয়োদশ মুদ্রণের প্রকাশকাল ২০১৭, পৃ. ৩৬৩।

৬৩। Akbar Ali Khan, Gresham’s Law Syndrome and Beyond: An Analysis of the Bangladesh Bureaucracy, The University Press Limited, 2015.

৬৪। সিরাজ উদ্দিন সাথী, আমলা পুরাণ, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ঢাকা, প্রকাশকাল ২০২৪, পৃ. ১৪।

৬৫। জয়ন্তকুমার রায় ও মুনতাসীর মামুন, প্রশাসনের অন্দরমহল: বাংলাদেশ, কলকাতা, প্রকাশকাল ১৯৮৭, পৃ. ৫৭।

৬৬। হুমায়ুন আজাদ, জলপাই রঙের অন্ধকার, হুমায়ুন আজাদ রাজনৈতিক প্রবন্ধসমগ্র, আগামী প্রকাশনী, ২০২২, পৃ. ৫০৩।

৬৭। Dr. Rahima Khaton and others, The Socio-economic background of Bangladesh Civil Service (Administration) Cadre Officials, Bangladesh Journal of Administration and Management, 2018.

৬৮। সিরাজ উদ্দিন সাথী, আমলা পুরাণ, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ঢাকা, প্রকাশকাল ২০২৪, পৃ. ১৩।

৬৯। কাবেদুল ইসলাম, বাংলাদেশ সচিবালয়: উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, প্রকাশকাল ২০২০, পৃ. ২৮

৭০। Joseph La Palombara, An Overview of Bureaucracy and Political Development, Research in Public Policy Analysis and Management, Elsevier, 2006, Volume 15, 193–220,

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •