আনসার বিদ্রোহ, ইয়াসমিন, কল্পনা এবং ইলিয়াস

বাংলাদেশের সাথে ৫০ বছর ও তারপর-১৩

আনসার বিদ্রোহ, ইয়াসমিন, কল্পনা এবং ইলিয়াস

আনু মুহাম্মদ

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শেষ প্রান্তে ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানের হানাদার সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এরপর ৫৪ বছর অতিক্রম করছে এই দেশ। এই সময়ে দুইজন রাষ্ট্রপতি খুন হয়েছেন, দুই দফা প্রত্যক্ষভাবে সামরিক শাসন এসেছে, সামরিক বাহিনীর ভূমিকা বেড়েছে, সংবিধান সংশোধন হয়েছে ১৬ বার, নির্বাচনের নানা রূপ দেখা গেছে, শাসনব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে কর্তৃত্ববাদী হয়েছে। ১৯৯০ ও ২০২৪ গণঅভ্যুত্থানে দুবার স্বৈরশাসকের পতন হয়েছে। এই কয়েক দশকে অর্থনীতির আয়তন ক্রমে বেড়েছে, জিডিপি ও বিশ্ববাণিজ্যে উল্লম্ফন ঘটেছে, অবকাঠামো ছাড়াও সমাজে আয় ও পেশার ধরনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন এসেছে। সম্পদের কেন্দ্রীভবন ও বৈষম্যও বেড়েছে, কতিপয় গোষ্ঠীর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কর্তৃত্বে আটকে গেছে দেশ। এই ধারাবাহিক লেখায় আমি ডায়েরী, সাংগঠনিক ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সাথে সাথে ইতিহাসের নানা নথি/ঘটনা পর্যালোচনা করে এই দেশের  রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতির গতিমুখ তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি। ব্যক্তিগত বিষয় সেটুকু এনেছি যেটুকু তৎকালীন পরিস্থিতি বোঝার জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক। ত্রয়োদশ পর্বে ১৯৯৫-৯৬ সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন, আনসার বিদ্রোহ, ইয়াসমিস ধর্ষণ ও হত্যা বিরোধী আন্দোলন, আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন, কল্পনা চাকমা অপহরণ এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গুরুতর অসুস্থতাসহ তৎকালীন ঘটনাবলী ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে।

এরশাদ পতনের পর বিচারপতি শাহাবুদ্দীনের নেতৃত্বে যে সরকার ১৯৯১ সালে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় তাদের ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ বলে অভিহিত করা হলেও তা ছিল তিনজোটের সর্বসম্মত একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা। এরকম সরকারের কোনো বিধান সংবিধানে ছিল না। বিধি অনুযায়ী ১৯৯৬ সালে পরের সাধারণ নির্বাচন হবার কথা। বিএনপি সরকার তখন ক্ষমতায়। তাদের পরিচালনায় নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না তার শক্তিশালী যুক্তি তৈরি হয় মাগুড়া উপনির্বাচনের ঘটনায় । ১৯৯১ সালের নির্বাচনে এই আসনে বিজয়ী হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। তিনি আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করায় সেখানে ১৯৯৪ সালে উপনির্বাচন হয়। তাতে বিজয়ী হন বিএনপির সালিমুল হক কামাল। এই উপনির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ উঠে। আওয়ামী লীগ তা ব্যাপক প্রচারে নিয়ে আসে এবং একে কেন্দ্র করেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন ও তার অধীনে নির্বাচনের বিধান সংবিধানে যুক্ত করার আন্দোলন জোরদার হতে থাকে। 

গত পর্বে বলেছি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে কয়েকটি আসন কম থাকায় বিএনপিকে সরকার গঠনের জন্য জামায়াতের সমর্থন নিতে হয়। কিন্তু এই সম্পর্কে ফাটল দেখা যায় ১৯৯৪ এর দিকে এবং জামায়াত তখন সরকার বিরোধী অবস্থান নেয়। এক পর্যায়ে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াত ও জাতীয় পার্টি ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সূচনা করে। আগেও বলেছি গণআদালত আন্দোলনে বিপর্যস্ত জামায়াতের জন্য এই ঐক্য ছিল বিরাট আশির্বাদ। ১৯৯৪ সালের ২৭ জুন আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলাম যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করে। ১৯৯৪ এর ৬ ডিসেম্বর এই দলদুটো ভিন্ন ভিন্ন সমাবেশ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি পূরণের জন্য ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত আল্টিমেটাম দেয়। দাবি পূরণ না হওয়ায় ২৮ ডিসেম্বর বিরোধী দলীয় ১৪৭ জন সংসদ সদস্য সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন। এতে আন্দোলন কঠিন পর্যায়ে চলে যায়। এই বছরের শেষ থেকে এই আন্দোলন ১৯৯৫ এ পুরো দেশে বিস্তৃত হয়, মিছিল, সভা, সচিবালয় ঘেরাও, সমাবেশ মহাসমাবেশ, অসহযোগিতা বছর জুড়েই ছিল। ২ সেপ্টেম্বর থেকে ৩২ ঘন্টা, ১৬ নভেম্বর থেকে একটানা ৭ দিনসহ বছরের বহুদিন হরতাল ও অবরোধে অচল ছিল।              

১৬.২.৯৫

গত ১২ তারিখ থেকে বেসরকারি পাটকল শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি সংক্রান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন অবরোধ ধর্মঘট হলো। এর মধ্যে পুলিশের গুলিতে ৩ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। বামফ্রন্ট গতকাল হরতাল ডেকেছিল। প্রায় প্রতিদিনই গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট শ্রমিকদের সমর্থনে মিছিল সমাবেশ করেছে। গতকালও হরতালের সময় জোট কর্মীরা খুব সক্রিয় ভ’মিকা নিয়েছিল। যথারীতি এই কয়দিনে জোটের এই তৎপরতা, বক্তব্য কিছুই পত্রিকায় আসেনি। প্রচার মাধ্যমের এই অবরোধ কীভাবে মোকাবিলা করবো?

২৮.২.৯৫

সারা এবং মেঘনার চাপে এই ঘটনা। ওরা আমাকে ৭১ এর শহীদ বুদ্ধিজীবীর ভ’মিকায় অভিনয় করতে যখন প্রস্তাব দিল আমি আকাশ থেকে পড়লাম। এক অসম্ভব ব্যাপার! চরিত্রের কথা জেনে আর ওদের পীড়াপীড়িতে  রাজি হলাম শেষ পর্যন্ত। ৭১ সালে একজন বুদ্ধিজীবীকে আলবদররা জোর করে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, পেছনে স্ত্রী দৌড়ে আসছে এরকম একটা দৃশ্য। সত্য ঘটনা। ডেভিড বার্গম্যান এবং গীতা সায়গাল যুদ্ধাপরাধ নিয়ে চ্যানেল ফোর এর জন্য ডকু বানাচ্ছে, ওয়ারক্রাইমস ফাইল, তার দৃশ্য। শামীম বুদ্ধিজীবীর স্ত্রীর ভ’মিকায় অভিনয় করলো, ওরটা যথারীতি চমৎকার। আমাকে অবশ্য তেমন কিছু করতে হলো না। অনেকবার চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে গেল, সিঁড়ি দিয়ে কয়েকদফা টেনে হিঁচড়ে নামালো, বেশ সময় লাগলো। চোখ বাঁধা, হাত পেছনে বাঁধা, টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া শহীদ বুদ্ধিজীবীর চরিত্র করতে গিয়ে অনুভব করছিলাম আমাদের পূর্বসূরীদের! 

২৯.৩.৯৫

সার নিয়ে তুলকালাম কান্ড হচ্ছে সারাদেশে। উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সারই আছে দেশে। কিন্তু তারপরও সার নেই। বেসরকারিভাবে সার বিতরণ ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হবার পরই সার নিয়ে এরকম ব্যাপক সংকট তৈরি হলো। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিএনপির দলীয় লোকজনদের ডিলার বানানো ও তাদের রক্ষা করবার জন্য প্রশাসনকে ব্যবহার করা। 

সারের দাম কয়েকগুণ বেড়েছে। এরপরও পাওয়া যাচ্ছে না। লুটপাট হয়েছে কয়েক জায়গায়। কৃষকের উপর গুলি চলেছে বহু জায়গায়। সার-কীটনাশক-ভ’গর্ভস্থ পানি সহযোগে ইরির সমৃদ্ধির বিপরীত দিকের একটি চিত্র এখন উন্মোচিত হচ্ছে। ইরি উৎপাদনে এবার বড় ধরনের চাপ পড়বে। 

১৭.৪.৯৫

গলব্লাডারের ব্যথা মনে হয়। যখনই ব্যথা বেশি বাড়ে তখনই ভাবি মেয়েদের প্রতিমাসের পিরিয়ড বা সন্তান জন্মদানের দীর্ঘ যন্ত্রণার কথা। মনে হয় কী প্রচন্ড কষ্ট মেয়েরা সহ্য করে, অথচ কেউ এই কষ্ট সওয়াকে গুরুত্বই দেয় না। যখন সামনে নিজের অপারেশনের কথা মনে করে খারাপ লাগে তখন ভাবি কত সিজারিয়ান হচ্ছে চারিদিকে, তাদের ব্যাপারটা কত সহজ মনে করে মানুষ! আসলে মেয়েদের শরীরী কষ্টের কথা কিছুটা অনুভব করলে পুরুষের শরীরের কোনো কষ্ট আর কষ্ট মনে হবারই কথা না। 

২৪.৪.৯৫

সিলেটে কবি শামসুর রাহমানের সংবর্ধনা কেন্দ্র করে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীরা প্রশাসনের সমর্থনে যে তুলকালাম কান্ড ঘটালো তা নিয়ে খুব পীড়িত বোধ করছি। বিস্ময়কর হলো অসাম্প্রদায়িক পক্ষের ভীরুতা। সংবর্ধনা বাতিল, প্রতিবাদ সভা বা মিছিল না করা। সাদী ফোন করেছিল- ঢাকায় এ ব্যাপারে সভা হবে। সুলতানা কামাল এসেছেন- তাঁর বাসাতেও হামলা হয়েছে। বললাম ঢাকায় এবং বিশেষত সিলেটে এখন লেখক শিল্পীদের একাধিক সভা সমাবেশ করাই প্রধান কাজ। কারা মুখে বড় বড় কথা বলে, কাজে পিছুটান দেয় তাদের চিহ্নিত করাও দরকার। 

২.৫.৯৫

মুশতারী শফির স্বাধীনতা আমার রক্ত ঝরা দিন। একদিকে রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা অন্যদিকে উঠে দাঁড়ানো আর লড়াইএর কাহিনী। পাশাপাশি অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা, সীমান্তের ওপারে মুক্তিযুদ্ধের কথিত ‘নেতাদের’ স্বরূপও এসেছে। বিভিন্ন ঘটনা ও ব্যক্তি সম্পর্কে এরকম স্পষ্ট সাহসী বক্তব্য দেখা যায়। 

২.৬.৯৫

সারাদিন ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটি’র সেমিনার। সংখ্যালঘু জাতিসমূহের সমস্যা ও অধিকার সম্পর্কে ঢাকায় এটাই প্রথম বড় আকারের সেমিনার। অনেকগুলো বিষয় নিয়ে আলোচনা, মুক্ত অধিবেশন, ঘোষণা ও সুপারিশমালা দিয়ে শেষ হলো। আমি সকালে ঘোষণা পাঠ, দুপুরে রাজনৈতিক অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ এবং বিকালে সবমিলিয়ে একটা সুপারিশমালা তৈরির দায়িত্ব পালন করলাম। বাঙালী, বিশেষত রাজনৈতিক কর্মীদের উপস্থিতি তুলনায় কম ছিল, শুধু বাম নেতা কর্মীরা। পাহাড়ী কর্মীরা অনেকেই ছিল। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃবৃন্দকে আহবান জানানো সত্ত্বেও তারা আসেনি। 

২.৮.৯৫

সারাদিন চারটি অনুষ্ঠান, ক্লাশ সেমিনার ও প্রতিবাদ সভা। সকালে স্নাতকোত্তর ক্লাশে ‘উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন তত্ত্ব’, এরপর নৃবিজ্ঞান ক্লাশে ‘গ্রামাঞ্চলে ধর্ম ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান’, দুপুরে তৃতীয় বর্ষের ক্লাশে ‘গ্রাম উন্নয়ন ও গ্রামীন ব্যাংক’। 

আনসার বিদ্রোহের উপর লেখার কারণে ফরহাদ মজহারকে আটক করা হয়েছে। বিকালে লেখক শিবিরের উদ্যোগে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভা। এই উদ্যোগে অনেককে ক্ষুব্ধ দেখলাম। ফরহাদকে নিয়ে ক্ষোভের কারণ থাকলেও বিশেষ ক্ষমতা আইন ব্যবহার এবং লেখার কারণে আটকের প্রতিবাদ অবশ্যই করতে হবে। প্রতিবাদ সভায় আরও কথা বললেন আহমদ ছফা, জাহিদ হায়দার, সাজ্জাদ শরীফ। সভাপতিত্ব করলেন ইলিয়াস ভাই। 

৭.৮.৯৫

কৃষক ও গ্রামীণ মজুর ফেডারেশনের মাধ্যমে গ্রাম বিষয়ক গবেষণার কাজটি শুরু হলো। একাজেই গত ৩ তারিখ ঢাকা থেকে রওনা হয়ে কুষ্টিয়া, যশোর ও খুলনা হয়ে আজ ফিরলাম। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম। আরিচা থেকে লঞ্চে, আকাশ জুড়ে কালো মেঘ, প্রবল ঢেউ নদীতে। আড়াআড়ি পার হবার সময় লঞ্চ অনেক নাকানি চুবানি খাচ্ছিল।…

রাজবাড়ী থেকে কুমারখালির দিকে যাবার বাসে অনেক ভীড়। স্বল্পপথের যাত্রী আর মেয়েদের সংখ্যাই বেশি। রাজবাড়ী থেকে খুলনা পর্যন্ত বিভিন্ন বাসেই মেয়েদের বেশ চলাফেরা দেখলাম। যুদ্ধ করে, বাচ্চা কোলে নিয়ে, দাঁড়ানোকে থোড়াই কেয়ার করে অনেক মেয়ে বাসে যাচ্ছে।…

কুমারখালিতে অনেকদূর হেঁটে বাটিকামারা গ্রামের পাশে দরিদ্র উন্নয়ন স্কুলে গেলাম। স্কুলটি অভিনব, সারাদিনে ৪/৫শ ছাত্রছাত্রী আসে, কোনো বিধিনিষেধ নিয়ন্ত্রণ নেই, আক্ষরিক অর্থেই মুক্ত স্কুল। রবীন্দ্রনাথ দেখলে নিশ্চয়ই খুশি হতেন। কোনো বিদেশি ‘সাহায্য’ বা বড় আওয়াজ দিয়ে করা নয়। ছোট দোকান মালিক হেশামউদ্দীন নিজ উৎসাহেই করেছেন। এলাকার ২০/২৫ জন তরুণ স্বতস্ফ’র্তভাবেই এখানে শিক্ষকতা করেন। অজয় এবং সজীবদা এর অন্যতম শক্তি।…

ট্রেণের অবস্থা যে দিন দিন খারাপ হচ্ছে তা বোঝা গেল। দুপুরে পৌঁছলাম যশোর, পরেরদিন খুলনা। বেশ কয়েকটি বৈঠক হলো যশোর আর খুলনায়…। পরদিন সকালেই, ঢাকা ফিরবার পথে, পত্রিকায় দেখলাম আবার গার্মেন্টসে আগুন- ৭ জন কিশোর বয়সী ছেলে মেয়ে নিহত। কয় বছরে ৬০/৭০ জন হলো। কোনো জোরদার প্রতিবাদ নেই এসব অব্যবস্থা আর দায়িত্বহীনতার। 

১৫.৮.৯৫

সপরিবারে শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছিল এইদিন, ২০ বছর হলো। আওয়ামী লীগ এসব হত্যার বিচারের ইস্যুকে ঠিকমতো ধরছে না। তাদের ভয় নিজেরাই না কি ঝামেলায় পড়ে! এ বিষয়েই লিখলাম জনযুগ-এর জন্য। দৈনিক পত্রিকায় লেখা যাচ্ছে না বলে খুব সমস্যা হচ্ছে।

অবশেষে কম্পিউটর কেনা হলো, এখন আমাদের সবচাইতে দামী সম্পত্তি। কিস্তিতে কেনার সুযোগ পাওয়া গেল বলেই সম্ভব হলো। কাজের জন্য বড় একটা সুবিধা হলো। 

২৫.৮.৯৫

গত তিনদিন এঙ্গেলস মৃত্যুশতবর্ষ উপলক্ষে তাঁর তিনটি গ্রন্থ নিয়ে আলোচনা হলো। প্রথমদিন মার্ক্স-এঙ্গেলস এর কমিউনিস্ট ইশতেহার নিয়ে আলোচনা করলেন উমর ভাই। পরের দুইদিন এঙ্গেলস এর ‘এ্যান্টি-ড্যুরিং’ এবং ‘পরিবার, ব্যক্তি মালিকানা ও রাষ্ট্রের উদ্ভব’ নিয়ে আমি আলোচনা করলাম। এসব জটিল আলোচনাতেও উৎসাহীদের সমাগম ছিল উৎসাহব্যঞ্জক। উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে আবার অধিকাংশই ছিল তরুণ।  

২৮.৮.৯৫

ইয়াসমিন ধর্ষণ ও খুনের প্রতিবাদ করতে গিয়ে দিনাজপুরে এ পর্যন্ত ৬ জন নিহত। এই মৃত্যু দু:খজনক কিন্তু প্রতিরোধ খুব দরকার ছিল। সারাদিনে মানুষ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সবগুলো ক্ষমতার সবগুলো ঘাঁটিতে হামলা করেছে। পুলিশ ফাঁড়ি, ডিসি অফিস ইত্যাদিতে আগুন দিয়েছে। পুরো দিনাজপুর শহরে কাল ছিল রাষ্ট্র এবং জনতার যুদ্ধক্ষেত্র। সরকারি প্রেসনোট শুনে সাথে সাথে একটা লেখা পাঠানোর ইচ্ছ হলো, কিন্তু কোথায় দেব? সাথে সাথে প্রতিবাদ মিছিল করার ইচ্ছা হলো- ইচ্ছা হলো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পেটাই। কিন্তু কীভাবে? 

ইয়াসমিন ধর্ষণ ও খুনের প্রতিবাদ করতে গিয়ে দিনাজপুরে এ পর্যন্ত ৬ জন নিহত। এই মৃত্যু দু:খজনক কিন্তু প্রতিরোধ খুব দরকার ছিল। সারাদিনে মানুষ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সবগুলো ক্ষমতার সবগুলো ঘাঁটিতে হামলা করেছে। পুলিশ ফাঁড়ি, ডিসি অফিস ইত্যাদিতে আগুন দিয়েছে। পুরো দিনাজপুর শহরে কাল ছিল রাষ্ট্র এবং জনতার যুদ্ধক্ষেত্র।

১৮.৯.৯৫

একের পর এক দুইদিন তিনদিন করে করে হরতাল যাচ্ছে আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টি-জামায়াতের। ভালোই। পরিবেশ বিবেচনা করলে অনেক উপকারও হচ্ছে। কালো ধোঁয়া-দূষণের হাত থেকে ঢাকাবাসী বেঁচেছে। বিশ্রামও হয়েছে অনেকের। তার উপর আবার বৃষ্টি। প্রচন্ড জামায়াত বিরোধী আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরাও জামায়াতের সাথে ঐক্য করা নিয়ে আওয়ামী লীগকে ডিফেন্ড করতে ব্যস্ত।   

ইলিয়াস ভাইএর মতো মানুষদের কষ্ট হয়েছে। তাঁর মা অসুস্থ, হাসপাতালে। হেঁটে হেঁটে হাসপাতালে যাতায়াত করতে হয়েছে। তৃণমূল বের হলো এতোদিন পর। ইলিয়াস ভাইএর অসাধারণ গল্প আছে এতে- ‘স্বপ্নের জাল জাল স্বপ্ন’।

৪.১০.৯৫

শামীমের বাসায় শাহীনের মুখেই প্রথম শুনলাম বেজিং এ হিলারীর বক্তৃতার সময়ে সা¤্রাজ্যবাদবিরোধী শ্লোগান হয়েছিল। কিন্তু তা কোনো প্রচার মাধ্যমে দেখিনি। সপ্তাহ ধরে দুটো লেখার কাজ- একটি হলো ‘ইয়াসমিন ও বেজিং নারী সম্মেলন’, আরেকটি ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতি ও শিল্প সাহিত্য’। 

৫.১১.৯৫

গত মাসে দুইদিনের পর চারদিন হরতাল গেল। সামনে আরও আছে মনে হয়। আগামীকাল রাজপথ রেলপথ অবরোধ।  

পরশুদিন পাবনা গিয়েছিলাম। অন্নদাগোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরীতে অক্টোবর বিপ্লব বার্ষিকী নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা। রাশিয়ায় কী হয়েছে, দুনিয়ায় তার প্রভাব, এখন কী পরিস্থিতি, বাংলাদেশে এরকম বিপ্লব হলে তা কী কী পরিবর্তন আনতে পারতো এসব মিলিয়ে লম্বা সময়ে কথা। ভেতরে বাইরে অনেক শ্রোতা ছিলেন। 

আলোচনা শেষে অনেকের সাথেই কথাবার্তা হলো। একজন বয়স্ক ব্যক্তি এবিষয় নিয়ে কথার পর আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা তুললেন। তিনি আমাকে দেখানোর জন্য বাসা থেকে ফাইলপত্র নিয়ে এসেছেন। তিনি ছিলেন আখলাকুর রহমানের বন্ধু। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান ইকনমিক এসোসিয়েশনের সম্মেলনে তিনি প্রথম ইস্ট ওয়েস্ট ডিসপ্যারিটি নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন তিনি ৫৬ সালে টু ইকনমি নিয়ে লিখলেন আর ৬১ সালে এবিষয়ে লিখে রেহমান সোবহান কী করে টু ইকনমি তত্ত্বের প্রবক্তা হন?

৯.১১.৯৫

বিভাগে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে স্থম্ভিত হলাম জেনে যে জাহাঙ্গীরনগরে এতদিন ধরে নিষিদ্ধ ইসলামী ছাত্র শিবিরের ৪০/৫০ জন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আল বেরুণী ও কামালউদ্দীন হল দখল করেছে এবং ঐসব হলের ছাত্রদের মেরে বের করে দিয়েছে। সারা ক্যাম্পাসে প্রথমে একটা আতংকের অবস্থা এলেও সর্বদলীয় ছাত্রদের জমায়েত হতে বেশি সময় লাগেনি। ৪/৫০০ ছাত্রছাত্রী একত্র হয়ে ভিসি অফিস ঘেরাও করেছে। বাস আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। দুপুরের পর পুলিশ এল। শুনলাম স্টেনগানসহ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জামাতীরা পাল্টা আক্রমণও করেছে। এদের প্রস্তুতি নিশ্চয়ই অনেকদিনের। ক্যাম্পাসের জামাতী শিক্ষকেরা নিরাপদ গ্রুপিং এর আশ্রয়ে পেছন থেকে সবকিছু সংগঠিত করছে। 

১৮.১১.৯৫

এর মধ্যে বেশ কয়দিন, আজকেও বিশ্ববিদ্যালয় যাবার পথে শিক্ষক বাসের উপর ইসলামী ছাত্র শিবিরের সন্ত্রাসীরা আক্রমণ চালিয়েছে। পুলিশ নিয়ে যাওয়া আসা লজ্জা আর অপমান। জামাতী শিক্ষকেরা এর মধ্যেও গ্রুপ রাজনীতির নোংরা পানিতে খেলছে। ক্যাম্পাসের বাইরে ছাত্রদল ও ছাত্রলীগ পুরো এলাকায় চুপ। ওরা একটু সক্রিয় থাকলে ছাত্র শিবির এই সাহস পেত না। 

২১.১১.৯৫

হুমায়ূন আজাদ-এর নারী গ্রন্থ নিষিদ্ধ করা হয়েছে! 

রাস্তা, রাজনীতি, সংস্কৃতি সবই এখন ডানপন্থী ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীদের দখলে। রাস্তায় চরমোনাই, জামায়াতের মিছিলই বেশি দেখি। এনজিও, ব্যাংক, শিশু সংগঠন, স্কুল, কলেজ সবকিছুতে তাদের আধিপত্য বাড়ছেই। 

২৮.১১.৯৫

বিশ্ববিদ্যালয় বাসে জামাতীরা সরাসরি গুলি করেছে। এবার শহরের মধ্যেই। ২৪ বছর আগে এরাই শত শত শিক্ষক বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছে।

নারী গ্রন্থ নিষিদ্ধকরণের বিরুদ্ধে লেখক শিবিরের প্রতিবাদ সভা হলো। 

১.১২.৯৫

১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময় সংগ্রামী শিল্পী সংস্থার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে মার্কিন সাংবাদিক ক্যামেরায় যে অসাধারণ দৃশ্যাবলী তুলে রেখেছিলেন তার কোনো খোঁজ ছিল না। তারেক ও ক্যাথরিন এগুলো খুঁজে সম্পাদনা করে প্রায় দুইঘন্টার ছবি- ‘মুক্তির গান’ নামে প্রকাশ করেছেন। অসাধারণ। ক্যামেরার কাজ তো বটেই। দলিল হিসাবেও অমূল্য। 

৭.১২.৯৫

চারিদিকে অস্বস্তিকর অবস্থা, অচলাবস্থা। দুইমন্ত্রীর গন্ডগোলে ময়মনসিংহ সহ ৩১টি জেলার সঙ্গে ঢাকার বাস চলাচল বন্ধ-৮/১০ দিন হলো। উত্তরবঙ্গের সঙ্গেও প্রায়ই বন্ধ থাকছে ফেরীর জন্য। 

ঢাকা শহরেও যখন তখন ভাঙচুর হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ এখন ঐক্যবদ্ধভাবে মিছিল করছে, এই ডিসেম্বর মাসেও। জামায়াতের মিছিলই বরঞ্চ বড়। রাজনৈতিক জটিলতায় বর্তমান আন্দোলনে জামায়াতের লাভই হচ্ছে বেশি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংক খাতে যেভাবে তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে তাতে ভয়াবহ যেকোনো দুর্যোগ ঘটবার সম্ভাবনাই পাকাপোক্ত হচ্ছে। 

এই ইস্যুর আন্দোলনের জোরে ধামাচাপা পড়ছে সামাজিক অর্থনৈতিক জরুরী অনেক বিষয়। ক্ষমতায় থেকেও বিএনপি অনেক দায় থেকে বেঁচে যাচ্ছে।

১৬.১২.৯৫

২৫ বছরে পা দিল বাংলাদেশ। অগ্রগতি কী হবে? যেখানে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দূরের কথা তাদের আস্ফালন আর দম্ভই দেখতে হয়। এবছরের সবচাইতে বড় অর্জন ও ট্রাজেডী হলো- ২৫ বছর পর বীরপ্রতীক তারামন বিবির সন্ধান পাওয়া। এতো বছর তারামন বিবির এভাবে হারিয়ে যাবার মধ্যে লিঙ্গ ও শ্রেণী দুটো মাত্রাই আছে। দ্বিতীয়টি অধিক শক্তিশালী মনে হয়। 

২৮.১২.৯৫

ইনগ্রিড বার্গম্যানের সেভেন্থ সিল ছবিটা দেখলাম। দেখতে দেখতে জীবন মৃত্যু ও ধর্ম নিয়ে কত কথা মনে এলো- পুরো ছবিটাই এই তিনটি বিষয় নিয়ে। জীবনের সঙ্গে মৃত্যুর লড়াই, মৃত্যুর উপর ভর করে জীবিত মানুষদের উপর ধর্ম দিয়ে পৈশাচিক আক্রমণ।

মৃত্যু কেউ এড়াতে পারে না তবুও তা শীতল, প্রাণহীন, সৃষ্টিবিরোধী। জীবন একক সত্ত্বায় সীমাবদ্ধ তারপরও তা সমষ্টিতে মিলে অসীম- প্রাণবন্ত, সৃষ্টিশীল। জীবন সীমাবদ্ধ তারপরও জীবনই শক্তিশালী। জীবন ছাড়া মৃত্যুর অস্তিত্ব কোথায়? মানুষকে জীবনের স্বপ্ন, নিজের-পরের, দেখানোই তো জীবিত মানুষের কাজ। 

মৃত্যুকে জীবনের চাইতে ভারী করে দেবার দর্শন আর শক্তি কীভাবে জীবিত মানুষের প্রাণ, তার স্বতস্ফুর্ততা নষ্ট করে দেয়! মৃত্যু কেউ এড়াতে পারে না তবুও তা শীতল, প্রাণহীন, সৃষ্টিবিরোধী। জীবন একক সত্ত্বায় সীমাবদ্ধ তারপরও তা সমষ্টিতে মিলে অসীম- প্রাণবন্ত, সৃষ্টিশীল। জীবন সীমাবদ্ধ তারপরও জীবনই শক্তিশালী। জীবন ছাড়া মৃত্যুর অস্তিত্ব কোথায়? মানুষকে জীবনের স্বপ্ন, নিজের-পরের, দেখানোই তো জীবিত মানুষের কাজ। 

ইয়াসমিন ও আনসার বিদ্রোহ

১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট থেকে এক সপ্তাহ দিনাজপুর অঞ্চল অসাধারণ এক জনবিদ্রোহে উত্তাল ছিল। ইয়াসমিন নামের এক কিশোরীর বাড়ী দিনাজপুরে, মা থাকতেন সেখানেই। চরম দরিদ্র ভাঙা পরিবার, বাঁচার শেষ চেষ্টায় ইয়াসমিন ঢাকায় এক বাড়ীতে কাজ করছিল। বহুদিন মাকে দেখতে পারেনি, আবার যাবার অনুমতিও নেই। সেজন্য ইয়াসমিন নিজেই বেরিয়ে গিয়েছিল, খুঁজে পেতে দিনাজপুরের বাসও ধরতে পেরেছিল। কিন্তু ভোরবেলা দিনাজপুরে বাস থেকে নামার পর ইয়াসমিন তিনজন পুলিশের হাতে পড়ে। তাদের পৌঁছে দেবার কথা বলে তিনজন পুলিশ ২০ ঘন্টার যাত্রায় ক্ষুধার্ত-শ্রান্ত-ক্লান্ত এবং মার কাছে যাবার জন্য অস্থির কিশোরী ইয়াসমিনকে ধর্ষণ করে এবং খুন করে রাস্তায় ফেলে দেয়। এই ঘটনা জানাজানির পর সরকার প্রশাসনের রুটিন তদন্ত কমিটি ইত্যাদি হচ্ছিলো। কিন্তু জনগণ এতে ক্ষান্ত হয়নি, সেসময় আমার একটি লেখায় দেখছি:

‘জনগণ শাসকশ্রেণীর লুটেরা, কালোটাকার মালিক ও যুদ্ধাপরাধী বা তাদের বি-টিম কোনো রাজনৈতিক দলের ওপর নির্ভর করেননি। এলাকার অঞ্চলে অঞ্চলে সুপ্ত গণশক্তি স্বত:স্ফুর্তভাবেই সংগঠিত হয়েছিল এবং আঘাত করেছিল নিপীড়ন ও শৃঙ্খলের ঠিক জায়গাগুলোতেই- থানা, প্রশাসন, তাদের মুখপাত্র পত্রিকা অফিসে। পুলিশ গুলি করেছে, নির্যাতন করেছে- শিশুসহ ৭ জনকে হত্যা করেছে, আহত করেছে অসংখ্য মানুষকে। কিন্তু কিছুতেই থামানো যায়নি গণরোষ। কিছুই মানেনি মানুষ। পুলিশ পালিয়েছে শহর থেকে, ডিসি-এসপি ভীতসন্ত্রস্থ। পুলিশ যে কদিন শহরে ছিল না, সে-কদিন শহরে কোনো অপরাধ হয়নি- এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক।’ (মুহাম্মদ, ১৯৯৬)

এটা এক গণঅভ্যুত্থানের পরিস্থিতি। অপরাধী ও তাদের রক্ষক প্রতিপালকেরা এই অপরাধেই ক্ষান্ত হয়নি, ইয়াসমিনকে পতিতা হিসেবে প্রচার করে নিজেদের রক্ষা করতে চেষ্টা করেছে, যেন পতিতা হলে তাকে ধর্ষণ ও খুন কোনো অপরাধ নয়। সেসময়েই বেইজিং এ অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব নারী সম্মেলন। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সহ বাংলাদেশ থেকে অনেক প্রতিনিধি সেই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন।

এই বছরেরই শেষ দিকে আনসার বাহিনীর মধ্যে এক প্রবল বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। তিনদিনব্যাপী এই বিদ্রোহের রক্তাক্ত অবসান ঘটে ৪ ডিসেম্বর। এই বাহিনীর প্রধান দপ্তর খিলগাঁয়ে, সেকারণে বাসা থেকেই আমি বিদ্রোহীদের শ্লোগান আর তাদের উপর গলিগালাজ চিৎকার শুনেছি। এই বিষয় নিয়ে আমি সংগঠনের জনযুগ পত্রিকায় যে ছোট্ট লেখা লিখেছিলাম তার শিরোনাম ছিল- ‘আনসার বাহিনীর বিদ্রোহ দমন: বলপ্রয়োগকারী সংস্থার ভেতর শ্রেণীযুদ্ধ?’ এতে এই ঘটনা সম্পর্কে বলা ছিল:

বলপ্রয়োগকারী সংস্থাসমূহের প্রতিটিতেই অফিসার ও সিপাহীদের মধ্যে সুযোগ-সুবিধা ও মর্যাদার তারতম্য অনেক বেশি।… এদের সবার মধ্যে পদমর্যাদায় আনসার সকলের নিচে। শ্রমের বিরাট মজুতবাহিনীর সমাজে এদের বল-শ্রমশক্তির দাম খুব কম। এদিক থেকে যাদের ওপর তাদের বাহাদুরি সেই মজুত শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে পোশাক ছাড়া তাদের খুব তফাৎ নেই। চাকরি তাদের স্থায়ী নয় সে কারণে বর্তমান ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নেই, পেনশন নেই। দিনে ৪৫ টাকা বেতন। 

বহুদিন থেকে উচ্চবেতন ও সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের হাতে পায়ে ধরেও কোনো কাজ না হবার পর এই বিশৃঙ্খল বিস্ফোরণ। তিন দিন পর রাতের আঁধারে যখন তাদের ঘেরাও করে ফেলা হল, ভারী ভারী অস্ত্র থেকে তাদের দিকে গোলাবর্ষণ করতে করতে যখন এগিয়ে আসছিল পুলিশ, বিডিআর কিংবা সামরিক বাহিনী তখন আনসারবাহিনীর মনে অবস্থা কী ছিল আমরা জানি না।…তবে মাইকে তাদের আর্তনাদ শোনা গেছে। তারা বলেছেন, ‘আমরা আমাদের পেটের আন্দোলন করছি। আপনারা আমাদের ভাই, আমাদের প্রাণে মারবেন না।’ কোনো কাজ হয়নি।…বলপ্রয়োগকারী সংস্থার হাত তাদেরই সহযোগীদের রক্তে রঞ্জিত হয়। ‘পেটের’ কথা ‘নির্যাতনের’ বিরুদ্ধে কথা বলার মতো ‘অপরাধ’ যেই করুক না কেন এই রাষ্ট্র তাদের দমন করতে উদ্যত হবেই!! (মুহাম্মদ, ২০০০; ২৩৩-৩৪)    

গোলাবর্ষণ করতে করতে যখন এগিয়ে আসছিল পুলিশ, বিডিআর কিংবা সামরিক বাহিনী তখন আনসারবাহিনীর মনে অবস্থা কী ছিল আমরা জানি না।…তবে মাইকে তাদের আর্তনাদ শোনা গেছে। তারা বলেছেন, ‘আমরা আমাদের পেটের আন্দোলন করছি। আপনারা আমাদের ভাই, আমাদের প্রাণে মারবেন না।’

বিশ্বব্যাংক আইএমএফ এর অর্থশাস্ত্র এবং বিতর্ক

১৯৯৪ সালে বিশ্বব্যাংক আইএমএফ প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পূর্তি হয়। এই উপলক্ষে দেশে দেশে একদিকে এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগেই তাদের সাফল্য উদযাপন হতে থাকে, অন্যদিকে এদের ভ’মিকা এবং পুঁজিবাদী বিশ্বায়নে বহুজাতিক পুঁজির প্রাণবিনাশী উন্নয়ন ধারার কর্তৃত্বের সমালোচনা/বিশ্লেষণও চলতে থাকে। কোথাও কোথাও বিশ্বব্যাংক আইএমএফ এর বিরুদ্ধে গণআদালতও গঠিত হয়। 

বাংলাদেশে এই পর্যালোচনার জন্য একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে আমি মূল প্রবন্ধ উপস্থিত করি। পরে এই বছরে তা বর্ধিত আকারে লিখে সাপ্তাহিক হলিডে-তে পাঠাই। হলিডে সম্পাদক এনায়েতুল্লাহ খান বেশ আগ্রহ নিয়ে তা গ্রহণ করেন। লেখাটা বেশ বড় থাকায় তিনি তা বেশ কয়েকটি কিস্তিতে প্রকাশ করেন (আগস্ট-সেপ্টেম্বর ১৯৯৫)। শিরোনাম ছিল- ‘Economics of the World Bank: Growing Resources and Increasing Deprivation’। এগুলো প্রকাশের পর এর প্রতিবাদ/জবাব আসে বিশ্বব্যাংক থেকে। বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে সম্ভবত কয়েক কিস্তিতে এগুলো যৌথভাবে লেখেন বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লরা জীন। আমি আবার এর জবাব লিখি। সেটাও বোধহয় একাধিক কিস্তিতে প্রকাশিত হয়েছিল (ডিসেম্বর ১৯৯৫)। পরের বছর এই দুটো লেখার বাংলা অনুবাদ প্রথমে সংস্কৃতি এবং অনীকে প্রকাশিত হয়। আর  বেশ কয়েকবছর পরে আমার বই বিশ্বায়নের বৈপরীত্য (প্রথম প্রকাশ ২০০৩)-তে এগুলো সংকলিত হয় যথাক্রমে ‘বিশ্বব্যাংকের অর্থশাস্ত্র: সম্পদের প্রবৃদ্ধি বঞ্চনার বিস্তার’ এবং ‘বিশ্বব্যাংক-এর সঙ্গে সংলাপ’ শিরোনামে।  

                         

১৯৯৬: তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সাফল্য

খালেদা জিয়া সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য আওয়ামী লীগ-জামায়াত-জাতীয় পার্টির আন্দোলনে উত্থাপিত দাবি না মেনে ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ এ সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা করে। উল্লেখযোগ্য সব রাজনৈতিক দলই নির্বাচনটি বর্জন করে। তারপরও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত হন কমপক্ষে ১৫ জন। খুব কম ভোটারের অংশগ্রহণে নির্বাচিত সংসদে বিএনপি ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৭৮টি আসন লাভ করে এবং অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে একমাত্র আসনপ্রাপ্ত দল ছিল  ফ্রিডম পার্টি, তারা আসন পায় ১টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ১০জন বিজয়ী হয়। তবে আন্দোলনের প্রবল চাপে এই সংসদ নিয়ে সরকারের টিকে থাকা সম্ভব ছিল না। লীগ-জামায়াত-জাতীয় পার্টির আন্দোলন এরপরও অব্যাহত থাকে। ২৩ মার্চ সরকারি কর্মকর্তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সচিবালয়ের সামনে সরকারের পদত্যাগের দাবিতে তৎকালীন সচিব মহিউদ্দীন খান আলমগীরের নেতৃত্বে ‘জনতার মঞ্চ’ বসিয়ে অবিরাম  প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু হয়। সচিবালয়ের ভেতরে ১৪৪ ধারা জারি করেও আন্দোলন দমন করা যায়নি। বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন বিভিন্ন সরকারি ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেয়।   

১৯৯৬ সালের ১৯ মার্চ সরকার বিরোধী আন্দোলনে সৃষ্ট চরম অচলাবস্থার মধ্যে এই নবনির্বাচিত সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। তবে তার অধিবেশন স্থায়ী ছিল মাত্র চার কার্যদিবস। এই সংসদ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী পাশ করে। এতে নির্বাচন পরিচালনার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান পাশ করে খালেদা জিয়ার সরকার নতুন নির্বাচনের সিদ্ধান্ত জানায়। সেই অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস ৩০ মার্চ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন, খালেদা জিয়া পদত্যাগ করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সফল হয়। রাষ্ট্রপতি সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। এভাবেই শুরু হয় সাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পর্ব। বাংলাদেশের সর্বপ্রথম সংবিধানসম্মত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টামন্ডলীর মধ্যে আরও ছিলেন ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক,  মুহাম্মদ ইউনুস, ওয়াহিদউদ্দীন মাহমুদ, জামিলুর রেজা চৌধুরী, নাজমা চৌধুরী প্রমুখ। সাপ্তাহিক বিচিত্রা তাদের স্বাগত জানিয়ে প্রচ্ছদ কাহিনী করেছিল।  

২৬.৩.৯৬

মুক্তিযুদ্ধের ২৫ বছর পূর্তি হচ্ছে এবছর। ২৫ বছর আগের ২৫ মার্চ রাত ও পরবর্তী সময় এখনও কত জীবন্ত। ভয়াবহতা, বর্বরতা কতদূর যেতে পারে এবং মানুষের সাহসী প্রতিরোধ কত উঁচুতে উঠতে পারে সবই ১৯৭১ সালে আমরা ব্যাপকভাবে দেখেছি।…

কিন্তু গতকাল দেখেছি প্রেসক্লাব থেকে বায়তুল মোকাররম দুই মাথার একদিকে জামায়াত অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সভা করছে। শ্রোতা দর্শক একাকার। ৭১ এর বর্বর ঘাতক দালাল যারা ২৫ বছরেও কখনো ভন্ডামী করেও অনুশোচনা করেনি তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রধান ধারা বলে দাবিদার আওয়ামী লীগের প্রশ্রয়ে আজ এই অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে।…

প্রেসক্লাব থেকে বায়তুল মোকাররম দুই মাথার একদিকে জামায়াত অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সভা করছে। শ্রোতা দর্শক একাকার। ৭১ এর বর্বর ঘাতক দালাল যারা ২৫ বছরেও কখনো ভন্ডামী করেও অনুশোচনা করেনি তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রধান ধারা বলে দাবিদার আওয়ামী লীগের প্রশ্রয়ে আজ এই অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে।

২০.৪.৯৬

…নির্বাচন সম্পর্কে কড়া বাম যান্ত্রিক একটা দৃষ্টিভঙ্গীর প্রাধান্য আমাদের সংগঠনেও ছিল। ৯৩ সালে প্রথম আমি কৃষক ফেডারেশনের সম্মেলনে এ সম্পর্কে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী উপস্থাপন করি। তত্ত্বের মর্মবস্তু অভিন্ন হলেও উপস্থাপন ও করণীয় সম্পর্কে বক্তব্যে ভিন্নতার কারণেই প্রবল প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। তারপর ৯৪ এর জোট প্রতিনিধি সভাতেও একইরকম। এক পর্যায়ে উমর ভাই সমর্থন করায় সবাই মেনে নিয়েছিল। কিন্তু সংগঠন ঐ বক্তব্য আত্মস্থ করতে পারেনি। পারলে ৯৪ এর সেই সভায় অস্থায়ী সরকারের যে কাঠামো আমি প্রস্তাব করেছিলাম তা গত দুবছরের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পাশাপাশি অন্তত একটা পাল্টা ধারণা হিসেবে প্রচার পেতে পারতো। ৯৬ এ এসে আবারও সেই বক্তব্য আরও সুনির্দিষ্টভাবে উপস্থাপন করেছি। দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় আমার বক্তব্যের মর্মবস্তু সবার বুঝতে সুবিধা হবার কথা। কৃষক মজুরের সভায় রাসায়নিক সার এবং হাইব্রিড বীজ সম্পর্কে জনপ্রিয় ও ক্ষতিকর ধারণা এবং দাবিরও আমি বিরোধিতা করলাম। আপাতদৃষ্টিতে সবাই তা গ্রহণও করলেন। 

২৩.৪.৯৬

গতকাল অর্থনীতি সমিতির সেমিনারে আমার প্রবন্ধ ছিল ‘(অ)গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক (কু)শাসন’। 

২০. ৫. ৯৬

বাংলাদেশের ২৫ বছরপূর্তি কেন্দ্র করে সমাজবিজ্ঞান অনুষদের উদ্যোগে তিনদিনব্যাপী সেমিনার শেষ হলো। ডীন আবদুল বায়েস-এর নেতৃত্বে অনুষদের অনেক শিক্ষকই কাজ করেছেন। বিভিন্ন দিক থেকে অনেকগুলো লেখা এসেছে। ২৫ বছরের পর্যালোচনা করে আমার দীর্ঘ লেখার শিরোনাম- ‘অপঃড়ৎং, ঠরপঃরসং ধহফ ঃযব জযবঃড়ৎরপং: অ ফবপড়হংঃৎঁপঃরড়হ ড়ভ ‘উবাবষড়ঢ়সবহঃ’ বীবৎপরংবং রহ ইধহমষধফবংয’.             

৬.৬.৯৬

বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্লাশের অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ১২টি গ্রামে ১২টি দলে গ্রামীণ ব্যাংক ও ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ে সমীক্ষা চালায়। মোট ১২০০ পরিবারের তথ্য পাওয়া যায়। প্রতিটি দল ১০০ খানার তথ্য নেয়, তাদের মধ্যে ৫০ জন গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ক্ষুদ্রঋণ নিয়েছেন, আর ৫০ জন নেননি। এ থেকে তাদের অবস্থার ধরন, পরিবর্তন হলে তার ধরন, মাত্রা এবং কারণ নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করা সম্ভব। সেটাই করেছিল আমার প্রিয় ছাত্রছাত্রীরা, উৎসাহ নিয়ে অনেক পরিশ্রম করেছে, আনন্দও পেয়েছে। মাঠকর্মের অভিজ্ঞতা ওদের আরও কাজে আগ্রহী করেছে।   

১২.৬.৯৬

বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই নির্বাচন পার হলো। কিছু কেন্দ্রে ভোট স্থগিত আছে। বাকি আসনগুলোতে নির্বাচন হয়ে গেছে। উৎসবের আমেজ চারিদিকে। গত কিছুদিনে টিভিতে, বেতারে নির্বাচনে অংশগ্রহণের পক্ষে খুবই কার্যকর প্রচার হয়েছে। বাইরে নির্বাচনী প্রচারেও হাঙ্গামা হয়েছে কম। এবারের নির্বাচনে অর্থ, ধর্ম ও নানাবিধ কৌশল ব্যবহারে সবাই পারঙ্গমতা দেখাচ্ছে। ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করা যাবে এই হচ্ছে নির্বাচনী বিধি। সবাই জানে- এই টাকা নির্বাচনের কথা ভাবতে ভাবতে, সিদ্ধান্ত নিতে নিতেই অনেকের খরচ হয়ে গেছে। কোটি তো বটেই, ৩/৪ কোটি টাকা খরচের কথা অনেকের বেলাতেই শোনা গেছে। এবারে প্রার্থীদের মধ্যে ধনবানদের আধিক্য আরও স্পষ্ট, আর অব: সামরিক বেসামরিক কর্তাদেরও বটেই। প্রচারে, গোছানো কাজে, লেখক-শিল্পী-আমলা-কর্মচারীদের সমর্থন, বিনয় ও কৌশলে, ধর্ম ব্যবহার সবদিক থেকেই আওয়ামী লীগ এবারে এগিয়ে। আওয়ামী লীগ যে এবারে জিতবে সে ব্যাপারে গোঁড়া বিএনপি সমর্থক ছাড়া আর সকলেই নিশ্চিত।       

২১ বছর পর আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় 

১২ জুন ১৯৯৬ অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৭ আসন লাভ করে। আসন সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কয়েকটি কম থাকায় তারা জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে। বিএনপি এই নির্বাচনে ১১৬টি আসন নিয়ে বৃহৎ বিরোধীদল হিসেবে অবস্থান নেয়। আওয়ামী লীগ পেয়েছিল প্রাপ্ত ভোটের ৩৭.৫৩ শতাংশ, বিএনপি পেয়েছে ৩৩.৪০ শতাংশ। আর এর বাইরে জাতীয় পার্টি ১৫.৯৯ শতাংশ ভোটে আসন পেয়েছে ৩২টি, জামায়াত পেয়েছে ৮.৫৭ শতাংশ ভোট এবং ৩টি আসন। 

সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কিছু পার্থক্য পাওয়া গেছে তবে অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রে দুই দলের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখা যায়নি। দুই দলই মুক্তবাজার অর্থনীতির কথা বলেছে, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-গ্যাট চুক্তি সম্পর্কে নীরব থেকেছে। যুদ্ধপরাধীদের বিচারের কথা কেবল বামফ্রন্ট ছাড়া কেউ বলেনি।

এই নির্বাচনের প্রাক্কালে সব রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে। আমি প্রধান প্রধান দলগুলোর ইশতেহার বিস্তারিত পর্যালোচনা করে লিখেছিলাম তখন। এই দলগুলোর মধ্যে ছিল আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী এবং বামফ্রন্ট। এই পর্যালোচনা বিস্তৃত ছিল, তবে কয়টি বিষয় এখানে উল্লেখ করা যায়। সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কিছু পার্থক্য পাওয়া গেছে তবে অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রে দুই দলের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখা যায়নি। দুই দলই মুক্তবাজার অর্থনীতির কথা বলেছে, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-গ্যাট চুক্তি সম্পর্কে নীরব থেকেছে। যুদ্ধপরাধীদের বিচারের কথা কেবল বামফ্রন্ট ছাড়া কেউ বলেনি। বিভিন্ন নিপীড়নমূলক আইনকানুন সম্পর্কেও বড় দুইদল চুপ ছিল। ভারত সম্পর্কেও কথাবার্তা একইরকম ছিল। আমি লেখার মধ্যে এসব বিষয় আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছিলাম ‘বিএনপি আওয়ামী লীগ নামে ক্ষমতায় গেল’। লিখেছি, 

গত ২৫ বছরে ক্রমান্বয়ে অর্থনীতির যে ধাঁচ গ্রহণের ফলে এদেশে একটি লুটেরা গোষ্ঠীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যে ধাঁচের ফলে উৎপাদনী খাতকে পরাজিত করে ক্রমে শক্তিশালী হয়েছে দোকানদারী অর্থনীতি, যে ধাঁচের ফলে এদেশের অর্থনীতির যাবতীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল কর্তৃত্ব লাভ করেছে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা- সেই ধাঁচ, যাকে রহস্য করে বলা হয় ‘মুক্তবাজার’ অর্থনীতি। আমাদের দেশের বৃহৎ দলগুলোর ঐকমত্যের কেন্দ্রীয় শক্তি এই তিনটি সংস্থাই- সে কারণে জনগণ আন্দোলন করে কোনো সরকার উৎখাত করলেও, এক দলের সরকারের বিরুদ্ধে অন্যদল জেহাদ ঘোষণা করলেও অর্থনৈতিক নীতির ধারাবাহিকতা থাকেই।.. (মুহাম্মদ, ২০০০। পৃ. ২৫৫)

 ১৯৯৬ সালে ক্ষমতাসীন সরকারের মন্ত্রীসভায় আওয়ামী লীগ ছাড়াও ছিল জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) এবং জাসদ (রব) এর প্রতিনিধিরা ছিলেন। কয়েকটি আসনের ঘাটতি থাকায় তাদের সমর্থন নিতে হয়েছিল। এই সরকারকে বলা হতো ‘ঐকমত্যের সরকার’। রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ নির্বাচিত হন। মন্ত্রীসভায় প্রধানত আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতৃবৃন্দই ছিলেন।     

২৭.৬.৯৬

গতকাল গেছে জাহানারা ইমামের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী, সমন্বয় কমিটি ছাড়া কাল আর কোনো অনুষ্ঠান হয়নি। তবে তাদের কাছেও যুদ্ধাপরাধীর বিচার, জামায়াত বিরোধিতা এখন মুখ্য ইস্যু নয়। গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটের আজকের আলোচনা সভায় প্রধান আওয়াজই ছিল যুদ্ধাপরাধীর বিচার। এই ইস্যু দুইবছর থেকে আওয়ামী লীগের পছন্দ নয়। 

কল্পনা চাকমাকে আর্মির লোকজন উঠিয়ে নিয়ে গেছে গত ১১জুন তারিখ রাতে। এখন পর্যন্ত সরকারের কোনো শব্দ নেই। আমরা বিবৃতি স্বাক্ষর সংগ্রহের মাধ্যমে নতুন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেষ্টা করছি।

১.৭.৯৬

গতকাল খুবই ভালো আলোচনা সভা হয়েছে- ‘গণআদালতের অসমাপ্ত কর্মসূচি’। গত রাতেই ক্যাম্পাসে শিবির আবার হামলা করেছে। তবে প্রতিরোধের দৃশ্য অসাধারণ। ছাত্রী হল থেকে কয়েকশো মেয়ে বের হয়ে প্রথম প্রতিরোধ তৈরি করেছে। এরপর হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী। হটে গেছে-পুলিশ বহু কষ্টে শিবিরকর্মীদের বাঁচিয়েছে। কিন্তু তারা খুবই দক্ষতার সঙ্গে অস্ত্র ঠিকই পাচার করে দিয়েছে।

গত রাতেই ক্যাম্পাসে শিবির আবার হামলা করেছে। তবে প্রতিরোধের দৃশ্য অসাধারণ। ছাত্রী হল থেকে কয়েকশো মেয়ে বের হয়ে প্রথম প্রতিরোধ তৈরি করেছে। এরপর হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী। হটে গেছে-পুলিশ বহু কষ্টে শিবিরকর্মীদের বাঁচিয়েছে। কিন্তু তারা খুবই দক্ষতার সঙ্গে অস্ত্র ঠিকই পাচার করে দিয়েছে।

১২.৭.৯৬

কল্পনা চাকমার সন্ধান ও অপহরণকারীদের দাবি নিয়ে গত কিছুদিনে একাধিক সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। কিন্তু নতুন সরকার এ বিষয়ে কিছুই বলছে না, বরং ধামাচাপা দেবার বা নানারকম গল্প বানানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।    

‘সিভিল সোসাইটি’ বিষয় নিয়ে গণসাহায্য সংস্থার মাহমুদ হাসান অনেক কথা বলছেন, তার প্রভাবও বেশ। হাসানের এবিষয়ে যে বক্তব্য ভোরের কাগজ প্রকাশ করেছিল তারই প্রতিক্রিয়া দেয়া জরুরী ছিল। সেই হিসাবে এই বিষয়ে আমি একটা লেখা লিখেছিলাম। আমার লেখা ভোরের কাগজ ছাপে না কিন্তু প্রতিক্রিয়াও ছাপবে না এটা ভাবতে পারিনি। দুমাসেও না ছাপবার পর তা সমাজচেতনায় দিলাম। 

২৫.৭.৯৬

কল্পনা চাকমার ব্যাপারে প্রতিবাদ সমাবেশ করে জাতীয় সংসদের দিকে গেলাম স্মারকলিপি দেবার জন্য। পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতিদিন ২ কোটি টাকা খরচ হয়, একটা দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। অথচ কখনও এই আস্তানায় তা নিয়ে আলোচনা হয়নি। মিনিটে ১৫ হাজার টাকা খরচ করে এখানে হট্টগোল হয- ‘কাজের’ সিদ্ধান্ত হয় অন্যত্র। 

৮.৮.৯৬

মিহির সেনগুপ্তের ‘সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম’ বইটি অসাধারণ। একে উপন্যাস বলা যায়, স্মৃতিচারণ বলা যায়, আবার সমাজতাত্ত্বিক নৃতাত্ত্বিক গবেষণা গ্রন্থও বলা যায়। আবার এগুলোর কোনোটাই যদি কেউ বলতে রাজী নাও হন তাহলেও এর কিছু আসে যায় না। পূর্ববঙ্গ ও পূর্ববঙ্গের মানুষকে খুব গভীরভাবে দেখার এরকম ক্ষমতা আমি খুব কম দেখেছি। ক্ষমতা, সংবেদশীলতা, দায়িত্বশীলতা।

১৫.৮.৯৬

২১ বছর পর রাষ্ট্রীয়ভাবে শেখ মুজিবের মৃত্যু বা হত্যাবার্ষিকী পালিত হচ্ছে। ৭২-৭৫ সময়কালের নৈরাজ্য, সন্ত্রাস, বামপন্থী খুন-নির্যাতন, ঘাতক দালালদের সাধারণ ক্ষমা ইত্যাদি অপরাধের জন্য শেখ মুজিব অভিযুক্ত। তবুও ইনডেমনিটি বিল বাতিল এবং এই হত্যাকান্ডের বিচার আমাদেরও দাবি। বস্তুত ১৫ আগস্টের হত্যাকান্ড বাংলাদেশের ইতিহাস পিছিয়ে দিয়ে গেছে দুইভাবে- (এক) অধিকতর প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি ক্ষমতায় এসেছে- অপশক্তিসমূহ আরও শক্তিশালী হয়েছে। (দুই) শেখ মুজিব শাসন রাজনৈতিকভাবে শেষ না হবার কারণে তাঁকে ভুলভাবে অতিমহিমান্বিত করার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।

২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে জোরপ্রাপ্ত অপশক্তিগুলোকেই ধারণ করেছে এবং শেখ মুজিবকে দেবতার আসনে স্থাপন করার যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এখন এমন অনেকেই শোক-ভক্তি প্রকাশ করছে যাদের আগে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

২৯.৮.৯৬

এনজিও বিষয়ে মর্গান স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং জাহাঙ্গীরনগর যৌথ সেমিনার। আমার লেখার শিরোনাম- ‘Integration, Polarisation and Retreat: Some Observation on the SAP, PAP and NGOs’. গত কয়দিন লেখাটার জন্য বেশ সময় গেছে। অনেকগুলো জরুরী বিষয় এখানে পরিষ্কার করতে পেরেছি ধারণা করি। 

৪.১১.৯৬

ইলামিত্রসহ তেভাগার আন্দোলনের অনেক সংগ্রামী এসেছেন ঢাকায়। ‘তেভাগার আন্দোলন উদযাপন কমিটি’ আয়োজিত সংবর্ধনা সভায়। পশ্চিমবঙ্গের ভ’মি সংস্কারের অনেক সংগঠক তাত্ত্বিকও আছেন সঙ্গে- জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, বিনয় কোঙার, মেহবুব জাহেদী। এত মানুষ হবে বোধহয় উদ্যোক্তারা আশাই করেননি, বহু মানুষ হলের বাইরে। 

৮.১১.৯৬

৫ তারিখ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে অচলাবস্থা। যথারীতি-একই ঘটনা। ছাত্রলীগ এখন ক্ষমতার স্পর্শে এসে হল দখল করছে। ছাত্রদল আন্দোলন করছে। ক্লাশ বন্ধ। 

১.১২.৯৬

কুষ্টিয়া থেকে ফিরলাম, কয়দিন আগে লালাসাহেবসহ গিয়েছিলাম। সেমিনার কর্মীসভা। সংগঠনের অবস্থা আশানুরূপ নয়। কিন্তু এর কারণ এটা নয় যে, কাজ করতে আগ্রহী কর্মী নাই। তাদের অনেকেই সংগঠনের কাজের ব্যাপারে খুবই অঙ্গীকারাবদ্ধ। কিন্তু সর্বত্রই কোথায় যেন সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। দিকনির্দেশনা, কাজের ধরন, লক্ষ্য ইত্যাদি হয়তো খেয়াল করতে হবে। শ্রেণী ও পেশার মধ্যে যেরকম ভাঙচুর হয়েছে, চিন্তা জগতে যেসব উপাদান যোগ হয়েছে, শাসক শ্রেণীর কাজের ধরন যেভাবে বদলেছে তাতে চীন রাশিয়ার ধরনের সংগঠন বা কর্মসূচি চলছে না। বাস্তবতা এখন অনেক ভিন্ন। শাসক শ্রেণী এখন অনেক বেশি জনসম্পৃক্ত। যেমন শেয়ার বাজারের খেলায় অসংখ্য মানুষকে কোম্পানির মালিকের বোধ দেয়া হয় কিন্তু আসল মালিকানা হাতে গোণা কয়জনের হাতে। ঠিক সেরকম রাজনীতির ক্ষেত্রেও ঘটছে। মানুষকে মোহগ্রস্ত করা, গণতন্ত্রের নামে মাদকতা তৈরি করার ব্যবস্থা। এগুলো হিসাবের মধ্যে নিতে হবে। 

৯.১২.৯৬

রোকেয়া নিয়ে আলোচনা সভা। 

আমার খুব পরিশ্রম করে লেখা বইগুলোর এই দশা। নারী, পুরুষ ও সমাজ এক বছর ধরে পড়ে আছে। এনজিও মডেল বইটার এতো চাহিদা। দ্বিতীয় সংস্করণের ভ’মিকা লিখে দিয়েছি দুবছর হলো। এখনও বের হচ্ছে না। বিশ্ব পুঁজিবাদের দ্বিতীয় সংস্করণের ব্যাপারেও একই অবস্থা। শাহেদ একটা পান্ডুলিপি চাইলো, অনেক কষ্ট করে গুছিয়ে দিয়েছি দুবছর হলো। তারও খবর নাই। আরেকজন তো একটা পান্ডুলিপি হারিয়েই ফেলেছিল। 

২৭.১২.৯৬

বাংলাদেশের রজত জয়ন্তী উপলক্ষে উন্নয়ন পরিষদের সিরিজ আলোচনা। আজ বিষয় ছিল অর্থনীতি, মূল প্রবন্ধ আমার। গত কিছুদিনে ২৫ বছরের অর্থনীতির উপর বেশ দীর্ঘ লেখা দাঁড় করিয়েছি গত কিছুদিনে। গত কয়দিন ইলিয়াস ভাইএর হাসপাতালের ফাঁকে ফাঁকে এই লেখার কাজই শেষ করেছি। 

আমার প্রবন্ধ উপস্থাপনের পর আলোচনার জন্য সচিব অর্থনীতিবিদরা ছিলেন- তাদের দায়সারা আলোচনা হয়েছে। লেখা অনুযায়ী আলোচনা কমই হয়েছে। অনেক পরিশ্রম করে লেখা এসব সেমিনারে কাজে লাগবে সেটা আশাও করিনি। এটা ছাত্রছাত্রী রাজনৈতিক কর্মীদের সামনে দেশের প্রকৃত চিত্র ঠিকমতো তুলে ধরতে পারলেই যথেষ্ট। এই লেখা পরে আমার বাংলাদেশের অর্থনীতির চালচিত্র গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।  

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস খোয়াবনামার কম্পোজ শেষ, প্রুফ কপি আসছে। পায়ে প্রচন্ড ব্যথা নিয়ে ইলিয়াস ভাই প্রুফ দেখছেন, মাঝে মধ্যে বসে পারছেন না, শুয়েই দেখতে হচ্ছে প্রুফ- এরকম দৃশ্য দেখছিলাম ৯৫ এর শেষ দিক থেকে। কয়েকদিনের মধ্যে এটা যে এরকম ভয়ংকর দিকে যাবে তা ভাবতে পারিনি, বা ভাবার সাহস পাইনি। 

২৭.৩.৯৬

গত ১৩ জানুয়ারি কামাল লোহানী ফ্যাসিবাদ বিরোধী লেখক শিল্পীদের এক সম্মেলন ডেকেছিলেন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠান, সেখানে যাবার পথে কচির (ডা.মনিরুল ইসলাম) মুখেই প্রথম শুনলাম ইলিয়াস ভাইএর পায়ের ব্যথার মূল কারণ হাড়ের ক্যান্সার। টেস্টে তাই ধরা পড়েছে।… তারপরও কদিন ধরে একটা ক্ষীণ আশা নিয়ে ছিলাম ক্যান্সার না হয়ে হাড়ের টিবি হতে পারে। যদিও পরীক্ষার পর পরীক্ষায় এর পক্ষে কোনোকিছু পাওয়া যায়নি। ফেব্রুয়ারির ৩ তারিখ ইলিয়াস ভাই কলকাতা গেলেন। আশায় থাকলাম কলকাতার পরীক্ষা নিরীক্ষায় ক্যান্সারের খবর ভুল প্রমাণিত হবে। হলো না। সপ্তাহখানেকের মধ্যে পরীক্ষার ফলাফল এলো-ক্যান্সারই হয়েছে এবং তা দ্রুত ছড়াচ্ছে। কয়েকদিনের মধ্যে জানলাম কেমোথেরাপী দেয়া হচ্ছে এবং ইলিয়াস ভাইএর মাথাভরা চুল সব পড়ে গেছে। হঠাৎ করে ২০ মার্চ শুনলাম ঐদিনই অপারেশন হচ্ছে- এবং ডান পা একেবারে গোড়া থেকে কেটে বাদ দিতে হবে। নিজের পা হারানোর যন্ত্রণা যেন! ইলিয়াস ভাইএর মতো প্রাণবন্ত, গতিশীল মানুষকে পা ছাড়া অবস্থায় দেখা যে কী কষ্টের!

২৭.৪.৯৬

খুব কঠিন ইলিয়াস ভাইএর সামনে দাঁড়ানো। কচি, ইকবাল ভাই, বাপ্পী, অনুসহ গেলাম বিমানবন্দরে। মঞ্জু সরকার, শাহাদুজ্জামান, নাইমুল হাসানও ছিলেন। ঠিক সময়েই প্লেন নামলো। প্রথম হুইল চেয়ারে দেখে বড় একটা ধাক্কা খেলাম। অনেকের চোখেই পানি ছিল। বহু কষ্টে নিজেকে সামলাতে হলো। মনে হলো একজন বৃদ্ধ মানুষ, মাথায় চুল নেই। সামনে যেতেই তিনি নিজের পা নিয়ে হাসি ঠাট্টা করে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু খুব সক্ষম হচ্ছিলেন না।

১৭.৬.৯৬

ঢাকায় ক্যান্সার চিকিৎসা সেভাবে দাঁড়ায়নি। কলকাতায় ইলিয়াস ভাইএর চিকিৎসা করেছেন খ্যাতিমান ক্যানসার চিকিৎসক ডা. স্থবির, যিনি শুধু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নন, একইসাথে খুবই মনোযোগী সাহিত্য পাঠক। তাঁর যোগাযোগে ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালের ডা, কামরুজ্জামানের উপর দায়িত্ব বর্তালো নির্দেশমত কেমোথেরাপীসহ চিকিৎসা অব্যাহত রাখতে। এখানেও সবাইকে নতুন করে শিখে একাজ করতে হচ্ছে। ১৩ মে থেকে ইলিয়াস ভাই কমিউনিটি হাসপাতালে ছিলেন। কেমোথেরাপী চলেছে। সেসময় এই হাসপাতাল আমাদের বাসার আরও কাছে ছিল। সেজন্য হাসপাতালে নিয়মিত যাওয়া সম্ভব ছিল।    

পা হারিয়ে এর মধ্যেও এক পা নিয়ে চলাফেরা করার জন্য নিজের উপর জোর করছেন ইলিয়াস ভাই। বলছিলেন নতুন উপন্যাস লেখার জন্য পাহাড়ে যাবার প্রস্তুতি নিতে হবে। সেজন্য বেবী ট্যাক্সিতে বাংলাবাজারে গিয়ে কলেজের বিভাগের জন্য বই কেনা, কলেজে খাড়া সিঁড়ি পারি দেবার মহাকষ্ট করে বিভাগে যাওয়া সবই করতে চেষ্টা করছেন। 

ইলিয়াস ভাইএর বাসায় প্রায়ই যাই, যেতে হয়। আজ আমরা অনেকেই ছিলাম। এসেছিলেন মৌসুমী ভৌমিক, নাজেশ আফরোজ আর ওদের কিশোর ছেলে আরজান। অপূর্ব গাইলেন মৌসুমী। আড্ডা আর মৌসুমীর গানে ইলিয়াস ভাই খুব হাসিখুশি ছিলেন।

     

২৩.১০.৯৬

আগস্ট মাসেও হাসপাতালে ছিলেন। আবার জটিলতা। ইলিয়াস ভাইএর অসুস্থতা থেকে মুক্তির সম্ভাবনা যত অনিশ্চিত হচ্ছে ততই আমরা সবাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছি। বছরের শুরু থেকে অসুস্থতা নিয়ে যা কিছু বিশ্বাস করতে চেষ্টা করেছি সবই ভুল প্রমাণিত হয়েছে। খারাপটাই সত্য হয়েছে। সর্বশেষ আক্রমণ-টিউমার হয়েছে বুকে। 

ক্যাম্পাস থেকে ইলিয়াস ভাইএর বাসায় গেলাম। কথাই বলতে পারছেন না, কাশি-প্রচন্ড কাশি। ওয়াদুদ কচিরাও এলো। একটু একটু কথা বললেন। কষ্টে, বেদনায় এতো শক্ত মনোবলের মানুষও কুলাতে পারছেন না। কী অপূরণীয় অচিন্তনীয় ক্ষতি যে হতে যাচ্ছে!

রাতে ফিরলাম-ক্ষীণ আশা বুকে-বায়োপসি তে যদি ভালো খবর আসে!

২৪.১০.৯৬

সারাদিন খোয়াবনামার উপরই কাজ করলাম। পশ্চিমবাংলায় ইতিমধ্যে এই বই এর বেশ কয়টি রিভিউ বের হয়েছে-আলোচনা হচ্ছে। ঢাকায় এখন পর্যন্ত একটিও নয়। এদেশে ইলিয়াস ভাইএর বই নিয়ে বহু আলোচনা লেখালেখি হবে কিন্তু ততোদিন ইলিয়াস ভাই থাকবেন না। 

২২.১১.৯৬

গত মাসের ৩০ তারিখ আবার বুকে ফাঙ্গাস ধরা পড়েছে। নানা জটিলতা চলছেই। 

কয়েকদিন আগে টিএসসি সেমিনার রুমে খোয়াবনামা নিয়ে লেখক শিবির থেকে সেমিনার হলো। আমি দীর্ঘ একটা লেখা লিখেছি, তার সারকথা বললাম। শওকত আলী সভাপতি ছিলেন। ইলিয়াস ভাই পরে রেকর্ড শুনলেন।  

২৭.১১.৯৬

মহাশ্বেতা দেবী ঢাকায়। আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে এসেছেন। একদিন ইলিয়াস ভাইএর বাসায় গিয়ে দেখি ওনার পাশে সুন্দর বসে আছেন তিনি। এরপর প্রতিদিনই ইলিয়াস ভাইএর বাসায় আসেন। অসাধারণ মমতা, আর ভালোবাসা দিয়ে কথা বলেন। আজ অনেক গান শোনালেন। অসাধারণ তাঁর কথা, বসে থাকা আর গান। ইলিয়াস ভাই এর ভালো লাগছে। ইলিয়াস ভাই তাঁর সাথে লম্বা আলোচনার আয়োজন করলেন, রেকর্ড করে পরে তৃণমূল পত্রিকায় প্রকাশের জন্য।   

২৮.১২.৯৬

কিন্তু ইলিয়াস ভাইএর ফুসফুসে ফাঙ্গাস চিকিৎসা করতে গিয়ে অন্য জটিলতা বেড়েছে। এর মধ্যে আবার ডান হাতটা ভেঙে গেল। বাঁ হাত দিয়ে লেখার প্র্যাকটিস করতে থাকলেন। ডিসেম্বরের শেষ দিকে আবার কঠিন অবস্থা। হাসপাতালে ভর্তি হতে হলো। হাসপাতালে ইলিয়াস ভাইএর দুর্বলতা বাড়ছেই। রক্তের রিপোর্ট এতো উল্টাপাল্টা। হাসপাতালটা অদক্ষ, এসব কাজ জানে এরকম লোকও এখানে নেই। ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আর কোনো নির্ভরযোগ্য স্থানও নেই।

৪.১.৯৭                                                      

৩ তারিখ সারারাতের যথাযথ বর্ণনা দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। 

রাত ১০টার দিকে যখন হাসপাতালে গেছি তখন ইলিয়াস ভাই প্রায় অচেতন, নাকে অক্সিজেন। কষ্টের শব্দ। কথা বলতে চাইছেন, যেন অন্য জগতে, মাঝে মধ্যে মনে হচ্ছে মা-র সাথে কথা বলছেন, আবার পারছেন না। ভাবী পাশে। নারকীয় কষ্ট- মিনিট, ঘন্টা এবং সারারাত।

সারাক্ষণ বিশ্বাস করতে চেয়েছি- কিছু না, ভালো হয়ে উঠছেন।…              

(চলবে)   

আগের পর্ব: বাংলাদেশের ৫০ বছর ও তারপর-১২

আনু মুহাম্মদ: সম্পাদক, সর্বজনকথা। ইমেইল: sarbojonkotha@gmail.com 

নির্দেশিত গ্রন্থ

মুহাম্মদ ১৯৯৬। আনু মুহাম্মদ: ‘ইয়াসমিন, মর্জিনা এবং বেইজিং বিশ্ব নারী সম্মেলন’। আলতাফ পারভেজ সম্পাদিত ইয়াসমিন বিপ্লবহীনতার কালে একটি রক্তপাতের শিরোনাম সংকলন গ্রন্থভুক্ত প্রবন্ধ। সম্মিলিত নারী সমাজ, ঢাকা।   

মুহাম্মদ ২০০০। আনু মুহাম্মদ: রাষ্ট্র ও রাজনীতি- বাংলাদেশের দুই দশক। সন্দেশ, ঢাকা। 

মুহাম্মদ ২০০০। আনু মুহাম্মদ: বাংলাদেশের অর্থনীতির চালচিত্র। শ্রাবণ, ঢাকা। 

মুহাম্মদ ২০০৩। আনু মুহাম্মদ: বিশ্বায়নের বৈপরীত্য। শ্রাবণ (১ম সংস্করণ), ঢাকা।   

 

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •