সংক্রামক রোগ থেকে শিশুর সুরক্ষা পেতে কী কী বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে 

সংক্রামক রোগ থেকে শিশুর সুরক্ষা পেতে কী কী বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে

বনানী চক্রবর্তী

গত কয়মাসে হামে আক্রান্ত হয়ে সাত শতাধিক শিশুর মৃত্যুর খবর সরকারিভাবেই স্বীকার করা হয়েছে। এবছরের মার্চ থেকে জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগী ১,১৩,২৪৪ জন এবং সন্দেহজনক হামে ৬৭১ জন নিশ্চিত হাম ৯৫ জন সহ মোট ৭৬৬ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাম নিয়ে কেন অনিয়ম হয়েছে, কারা এর জন্য দায়ী তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের দাবিও উঠেছে। এর পাশাপাশি মনোযোগী পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ছে আরও কাঠামোগত কারণ। দারিদ্র, বৈষম্য, অপুষ্টি, চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রকট দুর্বলতা। সেইসাথে সমাজে শিক্ষা সংস্কৃতিসহ নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়দায়িত্বের প্রশ্নটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। রোগের কারণ এবং শিশুদের স্বাস্থ্য সমস্যাসহ এসব বিষয়ে বিশ্লেষণ করেছেন শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. বনানী চক্রবর্তী।   

জীবাণু সংক্রমণ এখনও পর্যন্ত শিশু মৃত্যুর বড় কারণ। নবজাতকের সংক্রমণ, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এগুলো উল্লেখযোগ্য। পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া জনিত মৃত্যু (২৪%) বছরে প্রায় ২৪,০০০।[১] সারাদেশে দৈনিক নিউমোনিয়ায় মৃত্যু প্রায় ৬০ জন। বর্তমান সময়ে প্রতিদিন তার সাথে যুক্ত হয়েছে হামজনিত মৃত্যু। যার বেশীরভাগ হামের জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়ায়। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর হার পরিংখ্যান অনুযায়ী গড়ে হাজারে  ৩৩। কিন্তু নিম্ন বিত্ত, দরিদ্র পরিবারগুলোতে এই হার বেশী।[২]  অস্বাস্থ্যকর বসবাস, অপুষ্টি, সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়া, প্রাথমিক চিকিৎসা সুবিধার অভাব, চিকিৎসা খরচ এগুলোই মূল কারণ হিসেবে বিবেচ্য। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালনের ৫ বছর পরও বাংলাদেশের সব মানুষের দৈনন্দিন টিকে থাকার শর্ত পূরণ হয়নি, এমনকি নিশ্চিত হয়নি জীবিকা এবং মজুরি। 

শিশু কীভাবে জীবাণুর বিরুদ্ধে সুরক্ষা পায়

শরীরের ভেতরে বাইরে জীবাণুর বাস। বলা যায় জীবাণুকে সাথে নিয়ে জীবাণুর ভেতর আমাদের বসবাস। এদের মধ্যে কেউ কেউ মিথোজীবী অর্থাৎ শরীরে টিকে থাকার পাশাপাশি শরীরের উপকার করে। আবার কেউ কেউ বাইরে থেকে এসে বাসা বাঁধে, বংশবৃদ্ধি করে শরীরকে ব্যবহার করে, রোগ সৃষ্টি করে, অন্যজনের শরীরেও ছড়িয়ে পড়ে। জন্মের পর পর প্রথম ৫ বছর খুব ঝুঁকিপূর্ণ সময় কারণ এই সময় শিশুর জীবাণু প্রতিরোধী ক্ষমতা পুরোপুরি সক্ষম থাকে না। সংক্রামক রোগ থেকে শিশু প্রাকৃতিক ভাবে কিছু সুরক্ষা পায়। 

প্লাসেন্টার মাধ্যমে মায়ের শরীর থেকে কিছু রোগের বিরুদ্ধে এন্টিবডি সরাসরি শিশুর শরীরে যায়। বাংলাদেশে সময়ের আগে শিশু জন্মের হার ১৬.১% যা বিশ্বে সর্বোচ্চ।[৩] সময়ের আগে জন্ম নেয়া শিশুদের এক্ষেত্রে ঘাটতি থাকে। আবার এই এন্টিবডিগুলো সময়ের সাথে সাথে কমতে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে মায়ের কাছ থেকে পাওয়া হামের এন্টিবডি ৩/৪ মাস বয়সের দিকে কমতে থাকে। 

জন্মের পর শাল দুধকে বলা হয় শিশুর প্রথম টিকা। মায়ের বুকের দুধে থাকা lactalbumin, immunoglobulins, lysozyme, lactoferrin বিভিন্ন সক্রিয় কোষ, microbiota, ইত্যাদি শিশুকে জীবাণুর বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়।  বাংলাদেশে প্রায় অর্ধেকের বেশী শিশু মায়ের দুধের এই সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত। 

সরাসরি জীবাণু আক্রমণের ফলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ তন্ত্র (immune system) জীবাণুকে চিনে নেয়, প্রশিক্ষিত হয় বিভিন্নভাবে। পরবর্তীতে কিছু কিছু জীবাণু থেকে দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা দেয়। কিন্তু জীবাণুর ধরন অনুযায়ী সংক্রমণ মারাত্মক হলে বিভিন্ন জটিলতা থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। পাশাপাশি দ্রুত জনগোষ্ঠীতে জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই এধরনের প্রাকৃতিক সুরক্ষা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কাজেই স্বাস্থ্যকর বসবাসের সুযোগ থাকা জরুরি যা নিম্নবিত্ত পরিবারে অসম্ভব বলা চলে যেখানে ঘিঞ্জি পরিবেশে এক কামরায় গাদাগাদি করে থাকাটাই সাধারণ চিত্র। নিম্নবিত্ত এলাকা ছাড়াও শহর উপশহরে জলাবদ্ধতা,খোলা ড্রেন, পলিথিনের স্তূপ, একই সাথে সুয়ারেজ এবং ওয়াসা লাইনের চলাচল যা ডেঙ্গু, চর্মরোগ, বিভিন্ন পানিবাহিত জীবাণু সংক্রমণের পরিবেশ।

শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পরিপূর্ণভাবে কাজ করার জন্য পুষ্টিকর খাবার প্রয়োজন। বুকের দুধ থেকে শুরু করে পরবর্তীতে প্রোটিন, বিভিন্ন ভিটামিন যুক্ত ফল, শাকসবজি বিশেষ করে আয়রন,ভিটামিন এ, ভিটামিন ডি, জিংক এর উল্লেখ করা যায়। যে শিশুরা অপুষ্টিতে ভোগে তাদের জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি বেশী। বৈষম্যের সমাজে শিশুদের দৈনিক খাদ্যে এগুলোর নিয়মিত উপস্থিতি অনিশ্চিত। বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম শিশুদের মধ্যে ৪৩.৬% বিভিন্ন মাত্রার রক্তস্বল্পতায় ভোগে, দুই বছরের নিচের শিশুদের ক্ষেত্রে যা আরও বেশী। WHO নির্দেশনা অনুযায়ী ন্যূনতম পুষ্টিকর ( minimum acceptable diet) খাবার খায় গড়ে ২৯.৫% শিশু।[৪] রাস্তার খোলা খাবার, সস্তার কেক জুস এগুলো টাইফয়েড, জন্ডিস ডায়রিয়া সংক্রমণের জন্য দায়ী- যেগুলোর গ্রাহক মূলত নিম্নবিত্ত। বছরে দুবার শিশুদের ভিটামিন এ পাবার কথা। দীর্ঘ ব্যবধানে জুন ২৬ এ আবার ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন আয়োজন করা হয়েছে।

শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পরিপূর্ণভাবে কাজ করার জন্য পুষ্টিকর খাবার প্রয়োজন। বুকের দুধ থেকে শুরু করে পরবর্তীতে প্রোটিন, বিভিন্ন ভিটামিন যুক্ত ফল, শাকসবজি বিশেষ করে আয়রন,ভিটামিন এ, ভিটামিন ডি, জিংক এর উল্লেখ করা যায়। যে শিশুরা অপুষ্টিতে ভোগে তাদের জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি বেশী। বৈষম্যের সমাজে শিশুদের দৈনিক খাদ্যে এগুলোর নিয়মিত উপস্থিতি অনিশ্চিত।

এর পর আসে টিকা। কিছু নির্দিষ্ট ঘাতক জীবাণুর বিরুদ্ধে টিকা দেয়া হয় যা অল্প সময়ের মধ্যে সুরক্ষা দেয়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হবার যে শর্তগুলো টিকা তার বিকল্প নয়, বরং বলা চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিপূরক। অপুষ্টিতে শরীরে টিকার কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হতে পারে। তবে সংক্রমনের ক্ষেত্রে টিকা মারাত্মক ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে সংক্রমণ কম হওয়ায় অপুষ্টির ঝুঁকি কম হয়। 

কোনো একটা রোগের বিরুদ্ধে জনগোষ্ঠীর হার্ড ইমিউনিটি শিশুকে সাময়িক সুরক্ষা দেয়। হার্ড ইমিউনিটি প্রাকৃতিক সংক্রমণ বা গণটিকা দেবার মাধ্যমে তৈরি হয়। হার্ড ইমিউনিটি স্থায়ী কোনো বিষয় নয়। যতক্ষণ রোগ জীবাণু নির্মূল না হয় টিকা দিয়ে হার্ড ইমিউনিটি চলমান রাখার দরকার হয়। 

চলমান হামের সংক্রমণ

হাম একটি ভাইরাস জনিত রোগ যা বেশীরভাগ ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা ছাড়াই ৭ থেকে ১০ দিনে ভালো হয়ে যায় কিন্তু সংক্রমণের হার করোনা ভাইরাসের তুলনায় বেশী। সংক্রমিত হলে ৯০% ক্ষেত্রে রোগাক্রান্ত হবার সম্ভাবনা। পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের জন্য হাম খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে যদি টিকা সম্পূর্ণ না থাকে, অপুষ্টি বা অন্য কোনো কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে তাদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি বেশী। চোখের জটিলতা যা অন্ধত্ব পর্যন্ত যেতে পারে। কানের সংক্রমণ, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ, এসব হওয়ার সম্ভাবনাও উল্লেখযোগ্য। এদের মধ্যে ১০০০ জনে ৩ জন মৃত্যু ঝুঁকিতে থাকে, বেশীরভাগ ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া এবং মস্তিষ্কের প্রদাহ মৃত্যুর কারণ। হাম পরবর্তী সুস্থ হলেও এই শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা সাময়িক কমে যায় ফলে অন্যান্য জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে (immune amnesia) কখনওবা ৫ বছর পর্যন্ত। ফলে শিশু অপুষ্টি আর সংক্রমণের দুষ্টচক্রে ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা।

পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের জন্য হাম খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে যদি টিকা সম্পূর্ণ না থাকে, অপুষ্টি বা অন্য কোনো কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে তাদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি বেশী।

আপাতত সুস্থ হলেও ৫০০০ এ ১ জন শিশু হামের দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা subacute sclerosing panencephalitis বা SSPE তে ভুগতে পারে। হাম হবার ১০ বছর পরও যা প্রকাশিত হতে পারে, এতে শিশুর মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে যার কোনো চিকিৎসা এখন পর্যন্ত নেই। এছাড়া গর্ভবতী নারীরা তাদের গর্ভস্থ শিশু সহ মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকে। হামের প্রথম টিকা ৮৫% এবং দুই ডোজ দেয়া থাকলে ৯৭% সুরক্ষা দেয়। 

হাম কিনা নিশ্চিত হবার আগেই যেহেতু এটি ছড়ায় বাড়িতে রেখেই চিকিৎসা করা দরকার। হাম হলেই সব শিশুর হাসপাতালে ভর্তির দরকার নেই। জ্বরের ওষুধ দিয়ে জ্বর কমিয়ে রাখা, ভিটামিন এ, চোখের ড্রপ, চোখ মুখ পরিষ্কার রাখা, তরল খাবার দেয়া এগুলো প্রাথমিক চিকিৎসার অংশ। শিশু যদি খেতে না পারে,  শ্বাসপ্রশ্বাসের অসুবিধা মনে হয়, নিস্তেজ হচ্ছে মনে হয়, তাহলেই ভর্তি প্রয়োজন। বিপদের লক্ষণ বুঝে নিয়ে হাসপাতাল পর্যন্ত সময় মতো  পৌঁছানো সব এলাকা থেকে সবার পক্ষে সহজ কোনো ঘটনা নয়। প্রায়ই প্রাথমিক চিকিৎসা ফার্মেসিতে হয়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই মুমূর্ষু অবস্থায় শিশুকে নিয়ে আসা হয়। এসব কারণে প্রয়োজন চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর সমন্বয়ে, রেফারেল এর প্রস্তুতিসহ এলাকাভিত্তিক অস্থায়ী চিকিৎসা কেন্দ্র। অন্যদিকে প্রয়োজন এই শিশুদের নেবার জন্য কেন্দ্রীয় হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি যেখানে দৈনন্দিন রোগীদেরই সেবা দেয়া হয় অজস্র সীমাবদ্ধতার মধ্যে। একই বিছানায় কয়েকজন শিশু চিকিৎসা পায়। হাম রোগীর জন্য আলাদা জায়গা করা হলেও, বর্তমান ব্যবস্থাপনায় সংক্রমণ প্রতিরোধ সম্ভব নয়। যদিও measles corner বা measles hotspot আলাদা করা হয়েছে, কিন্তু চিকিৎসা লোকবল যেমন বাড়েনি তেমনি দৈনিক চিকিৎসা নিতে আসা শিশুদের সংখ্যাও কমেনি, শুধু যুক্ত হয়েছে হামের রোগী। 

প্রয়োজন চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর সমন্বয়ে, রেফারেল এর প্রস্তুতিসহ এলাকাভিত্তিক অস্থায়ী চিকিৎসা কেন্দ্র। অন্যদিকে প্রয়োজন এই শিশুদের নেবার জন্য কেন্দ্রীয় হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি যেখানে দৈনন্দিন রোগীদেরই সেবা দেয়া হয় অজস্র সীমাবদ্ধতার মধ্যে।

গত মার্চ থেকে চলমান হাম সংক্রমণে ১৪ জুন, ২০২৬ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগী ১,১৩,২৪৪ জন এবং সন্দেহজনক হামে ৬৭১ জন নিশ্চিত হাম ৯৫ জন সহ মোট ৭৬৬ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।[৫] সংবাদপত্রে মৃত্যুর খবর, রাষ্ট্রের পরিসংখ্যান, মায়ের হাহাকার, সর্বস্বান্ত পরিবার- এর মধ্যে জরুরি উদ্যোগ হিসেবে এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে গত ২০ মে সারাদেশে ৬ মাস থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুদের জন্য মাস ব্যাপী হাম ক্যাম্পেইন সম্পন্ন হয়েছে । এতে ১ কোটি ৮৪ লক্ষ শিশু টিকা পাবার কথা, সরকারি দাবি অনুযায়ী যা সফল হয়েছে। কিন্তু এখনও শিশুরা আসছে যারা ইপিআই এর নিয়মিত হামের টিকা যেমন পায়নি, আবার হাম ক্যাম্পেইন থেকেও বাদ পড়েছে। তাহলে সমস্যা কোথায়? প্রশ্ন থেকে যায় টিকা থেকে বাদ পড়া কি এই শিশুদের পরিবারের ব্যর্থতা? যারা আক্রান্ত হচ্ছে, আরও বেশ কিছুদিন হবে তাদের জন্য ব্যবস্থা কী হচ্ছে? সব ধরনের টিকার ঘাটতি দীর্ঘায়িত হওয়ায় ফলে ভবিষ্যৎ কোনো জরুরি পরিস্থিতির জন্য কোনো ধরনের পরিকল্পনা আছে? 

এই সময়ের কিছু চিত্র

১। গার্মেন্টস শ্রমিক মায়ের সন্তান ৫ বছর বয়সী কুলসুম হাম নিয়ে এসেছে। ৬ মাসের পর টিকা দেয়নি। সরকার যে আবার হামের টিকা দিয়েছে মা জানতেন না। 

২। রাব্বির বয়স ৩ বছর। হামের টিকা দেয়নি। মা বিশেষ ডোজ দিতেও রাজি না। করোনার টিকা নিয়ে অনেক কিছু শুনেছেন তাই।

৩। ফুলে গৃহকর্মী। মেয়ের বয়স ১২, ছেলের বয়স ছয়। হামের কথা শুনে ভয় পেয়ে জানতে আসলো এখন টিকা দেয়া যাবে কি না। দুই বাচ্চাকেই ৬ মাস বয়সের পর টিকা দেয়া হয়নি। তার ভাষায়, ছোট বাচ্চা নিয়ে কাজের জন্য কখন কোথায় থেকেছে ঠিক ছিল না, কখনও বাপের বাড়ি কখনও শ্বশুর বাড়ি, কখনও শহরে, কাজেই কীভাবে টিকা দেবে।

৪। রোজামনি ২ বছর বয়স। আপাতত সুস্থ। মায়ের বয়স ১৮। ৬ মাসের পর কোনো টিকা দেয়া হয়নি প্রতিবার টিকার সময় ঠান্ডা কাশি ছিল। পরে আর খোঁজ নেয়া হয়নি, বাড়িতেও কেউ খোঁজ করতে আসেনি। 

৫। উর্মি ৪ মাস বয়স। মায়ের বয়স ১৬। দুজনেই হাম নিয়ে ভর্তি আছে। নানিকে জিজ্ঞেস করে জানা গেলো তিনি চাকরি করেন মেয়ে ছোট থাকতেই। কাজেই তাকে শেষের দিকের টিকাগুলো দিতে পারেননি। দুঃখ করলেন যে এই বয়সে হাম হয়ে গেলো। এদিকে বাচ্চাটার হামের টিকার বয়সই হয়নি।

৬। ইসমাইল ১১ মাস বয়স, কৌটার দুধ খায়, ৬ মাসের পর টিকা দেয়নি। হামের সাথে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া। অক্সিজেনের মাত্রা কমের দিকে যেতে থাকায় যেকোনো সময় আইসিইউর প্রয়োজন হতে পরে বলে ধারণা দেয়া হলো। অভিভাবক তখনই নিয়ে যেতে চাইলেন। সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন জায়গা ঘুরে আবার ফেরত আসলেন। ঝুঁকি নিয়েই চিকিৎসা চালানো হলো। ৭ দিন পর শিশুটি সুস্থ হয়ে বাড়ি গেলো দরিদ্র তহবিলের সহায়তায় বিল পরিশোধ করে।

৭। ১৪ মাস বয়সী আরমান জ্বর নিয়ে এসেছে। মা ফার্মেসিতে চিকিৎসা নিয়েছেন। কিন্তু হামের লক্ষণ মনে হওয়ায় নিয়ে এসেছেন। হামের টিকার কথা জানতে চাইলে অপরাধীর মতো মুখ করে ফেললেন। জামালপুর থেকে এই এলাকায় এসেছিলেন দুইমাস বয়সের বাচ্চাকে নিয়ে। কার্ড পাননি, কাগজে লিখেও দেয়নি। পরের টিকা দিতে পারেননি। 

৮। প্রাইভেট আইসিউর খরচ পোষাতে না পেরে ১১ মাস বয়সী শিশুকে নিয়ে এসেছেন অভিভাবক। মানসিকভাবে তারা খারাপের জন্য তৈরি। শিশুটি কৌটার দুধ খায়। টিকা না থাকায় টিকা হামের প্রথম টিকা দেরি হয়েছিল। শিশুটি বাঁচেনি।

৯। ৬ বছর বয়সী ছেলেকে জ্বরের জন্য দেখাতে এনেছেন মা। তিন ছেলে, কাউকেই টিকা দেননি। পরিবার এবং মা নিজে বিশ্বাস করেন এগুলো ইহুদিদের জিনিস।

৬ বছর বয়সী ছেলেকে জ্বরের জন্য দেখাতে এনেছেন মা। তিন ছেলে, কাউকেই টিকা দেননি। পরিবার এবং মা নিজে বিশ্বাস করেন এগুলো ইহুদিদের জিনিস।

বাংলাদেশে শিশুদের টিকাদান : শুরু থেকে বর্তমান

বাংলাদেশে ১৯৭৯ সালে WHO, UNICEF-এর (২০০৩ সালে যুক্ত হয় GAVI) সমন্বিত পৃষ্ঠপোষকতায় টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয় যক্ষ্মা, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, টিটেনাস, পোলিও – এই পাঁচটি মারাত্মক সংক্রামক রোগের টিকা নিয়ে। ১৯৮৯ সালে যোগ হয় হামের টিকা। এরপর একে একে যোগ হয় এইচ ইনফ্লুয়েঞ্জি, হেপাটাইটিস বি, নিউমোকক্কাল ভ্যাকসিন, হামের সাথে রুবেলা যোগ করে  হাম রুবেলা যা ৯ মাস পূর্ণ হলে (measles, rubella – MR 1) এবং দ্বিতীয় ডোজ (MR 2) ১৫ মাস পূর্ণ হলে দেয়া হয়। 

১৯৮৫ থেকে ৯০ সালের মধ্যে ১ বছরের কম বয়সী শিশুদের টিকা দেয়ার হার ২% থেকে বেড়ে ৬০% হয় যা ২০০৭-এ ৭৫% এ পৌঁছায়। বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে ইপিআই কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ইপিআই রিপোর্ট ২০২৩ এর হিসাব মতে ১২ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের valid FVC (full vaccination coverage) ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৮৩.৯%-এ পৌঁছালেও ২০২৩-এ কমে ৮১.৬% হয়। দেখা যায় শহর (৭৯%) এলাকায় গ্রামের (৮৪.৬%) তুলনায় কম।[৬] ইউনিসেফ এর প্রেস বিজ্ঞপ্তি মতে এখানেও শহর এলাকার নিম্নবিত্ত শিশুরা ভুক্তভোগী।[৭] বিসিজি টিকা অর্থাৎ জন্মের ৬ সপ্তাহ পরে প্রথম টিকা দেবার হার দেখা যাচ্ছে ৯৮%-এর উপর। কাজেই বোঝা যাচ্ছে সব শিশু ১৫ মাস বয়স পর্যন্ত (হাম রাবেলা টিকার ডোজ পর্যন্ত) টিকা দিতে আসেনি। ইপিআই এর ভাষায় drop out বেশী হয়েছে। সাড়ে তিন মাস বয়স পর্যন্ত টিকাগুলো দেবার পর পরবর্তী ৯ মাসের টিকা দেয়া পর্যন্ত প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস ব্যবধান। দেখা যাচ্ছে এই সময়েই ঝরে পড়ার হার বেশী। প্রতিটি শিশুর সম্পূর্ণ টিকা শেষ করতে মোট ৫ বার টিকা কেন্দ্রে আসার কথা। তারা ফিরে না আসার কারণগুলো কী?

কোনো একটা জনগোষ্ঠীতে কোনো রোগের বিরুদ্ধে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি করে সুরক্ষা দেয়ার জন্য ৯৫% টিকা কভারেজ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জাতীয় পর্যায়ে হামের দুই ডোজ টিকার জন্য ২০২৩ সালের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৯৫%, লক্ষ্য- হাম নির্মূলের দিকে যাত্রা। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৩ সালে অর্জিত লক্ষ্যমাত্রা MR 1 (৯ মাস) এর ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে ৮৬.১% এবং MR 2(১৫ মাস) পর্যন্ত  ৮১.৬। পরিসংখ্যানের সব হিসাব নিকাশ পুরোপুরি বুঝে ওঠা কঠিন তবে এটা বোঝা যাচ্ছে যে পরিসংখ্যানের হিসেবেই লক্ষ্যমাত্রা বেশ দূরে আছে । এই পর্যায়ে যেকোনো প্রতিবন্ধকতা শিশু স্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলারই কথা যখন এমনিতেই সুরক্ষার অন্যান্য শর্তগুলো দুর্বল।

কোভিড মহামারির সার্বিক আর্থ-সামাজিক বিপর্যয়, অপ্রতুল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, স্বাস্থ্যকর্মী সংকট, লকডাউন, মাইগ্রেশন, জনমনে আশ্বাসবিহীন আতঙ্ক, পরবর্তীতে বন্যা এসব কারণে টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। ২০২০-এর এপ্রিলে ২০১৯-এর তুলনায় হামের প্রথম ডোজ নেওয়ার হার ৫০% কমে যায়। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী ৩,৮০,০০০ শিশু বাদ পড়ে। এই সময়ও শহর এলাকায় অবস্থা বেশী খারাপ হয়। ভুক্তভোগী বসতি এবং নিম্নবিত্ত শিশুরা। জুন মাস থেকে আবার টিকা কার্যক্রম নিয়মিত করার চেষ্টা করা হয়, যদিও তখন পর্যন্ত জনজীবনে স্থিতিশীলতা আসেনি। ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি ২০২১, দুইমাস measles catch up campaign আয়োজন করা হয়।[৮] ২০২৪-এ আবারও বাদ পড়া শিশুদের উদ্দেশ্যে গণ টিকা দান কর্মসূচি হবার কথা থাকলেও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পিছিয়ে যায়। তার রেশ এখনও কাটেনি। এর মধ্যে টিকা কেনার চুক্তি নিয়ে বড় ধরনের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণে টিকার সরবরাহ দেরিতে হয় এবং আবারও বাধাগ্রস্ত হয় টিকা কর্মসূচি। ফলে আগে থেকেই নাজুক পরিস্থিতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, যার ফলশ্রুতি হাম সংক্রমন। 

মহামারির পর অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য, বিশেষ করে শিশু স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে পড়ে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করার জন্য প্রণোদনা সহ বিভিন্ন পদক্ষেপ দেখা গেলেও গত পাঁচ বছরে covid পরবর্তী জনস্বাস্থ্য পর্যালোচনা বা স্বাস্থ্য লোকবল, স্বাস্থ্য অবকাঠামো, বিষয়ে কোনো বিশেষ পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য  বিপর্যয় ঠেকানোর জন্য, যেকোনো জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কার্যকর পরিকল্পনা অনুপস্থিত তখনও, এখনও। নাগরিকের জন্য রাষ্ট্র, কিন্তু ক্ষমতার পালা বদলের খেলায় সাধারণ মানুষ গৌণ হয়ে পড়ে বারবারই।

অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করার জন্য প্রণোদনা সহ বিভিন্ন পদক্ষেপ দেখা গেলেও গত পাঁচ বছরে covid পরবর্তী জনস্বাস্থ্য পর্যালোচনা বা স্বাস্থ্য লোকবল, স্বাস্থ্য অবকাঠামো, বিষয়ে কোনো বিশেষ পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

দৈনিক টিকা কার্যক্রম চলে স্থায়ী কেন্দ্র অর্থাৎ উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্র, সদর হাসপাতাল, জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এছাড়া আছে প্রতিটি ওয়ার্ডে ৮টি করে আউট রিচ সেন্টার যেখানে মাসে একবার টিকা কার্যক্রম চালানো হয়। বাড়ি বাড়ি গিয়ে কার্ড দেয়া, টিকা পাওয়ার বয়সী শিশুদের নিবন্ধন করার কথা। এর বাইরে বেসরকারি কিছু হাসপাতাল যেখানে শুধু শিশু বা মা ও শিশুদের চিকিৎসা দেয়া হয় সেখানে নিয়মিত টিকা দান কর্মসূচি আছে যেগুলো শহর কেন্দ্রিক প্রায়ই। আর আছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় এনজিও যারা সরকারের সাথে টিকা কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।

শিল্প এলাকায় একটি প্রাইভেট হাসপাতালে টিকা কেন্দ্রে কথা বলে জানা গেছে মাসের শেষের দিকে টিকার ঘাটতি মাঝে মাঝেই হয়েছে, তবে ২৫ সালের শেষ দিক থেকে প্রায়ই ঘাটতি ছিল। সরকারি টিকার কার্ড মাসে ২০০/৩০০ পাওয়া যায় কিন্তু টিকা নিতে আসে হাজারের বেশী। বাকি কার্ড হাসপাতাল থেকে ছাপানো হয়। দৈনিক টালি খাতার সংকট নিয়মিত বিষয়। ফটোকপি করে চালাতে হয়। সম্প্রতি রেজিস্টার খাতারও সংকট দেখা দিয়েছে।

ইপিআই কার্ড দেখিয়ে দেশের যে কোনো জায়গায় টিকা দিতে পারার কথা। অনেক শিশু আসে যারা টিকা পেয়েছে কিন্তু কার্ড বা কোনো রেকর্ড নেই, অনেকের কার্ড হারিয়ে গেছে। কেউবা দুই আঙুল সমান একটা স্লিপ নিয়ে আসে টিকা দেওয়ার জন্য। কারো আবার সেই স্লিপও হারিয়ে গেছে। এসব ক্ষেত্রে পরবর্তী টিকা কীভাবে দেয়া যাবে সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা না থাকায় অনেককেই ফিরিয়ে দেয়া হয়। আবার অন্য এলাকা থেকে আসা শিশুদের টিকা দিতে গিয়ে দেখা যায় যে, এই এলাকার শিশুদের জন্য আসা হিসাবের টিকা কম পড়ে যায়, তাদের পরের দিন আসতে বলা হয়। অনেকেই ছুটি পান না, দেরি হয় বা শেষ পর্যন্ত আর আসেন না। 

মায়েদের সাথে কথা বলে জানা গেছে ইউনিয়নে যেহেতু মাসে একবার টিকা দেয়া হয় কার্ড না থাকলে পরের মাসে নিতে বলা হয়। কখনও স্লিপ দেয়া হয়, কখনও হয় না। কিন্তু ততদিনে শিশু অন্য এলাকায় চলে এসেছে। মা হয়তো শিশু নিয়ে চাকরির জায়গায় চলে আসেন বা শিশুকে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেন।

মায়েদের সাথে কথা বলে জানা গেছে ইউনিয়নে যেহেতু মাসে একবার টিকা দেয়া হয় কার্ড না থাকলে পরের মাসে নিতে বলা হয়। কখনও স্লিপ দেয়া হয়, কখনও হয় না। কিন্তু ততদিনে শিশু অন্য এলাকায় চলে এসেছে। মা হয়তো শিশু নিয়ে চাকরির জায়গায় চলে আসেন বা শিশুকে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেন। জানা গেলো, টিকা দেওয়ার জন্য জন্মনিবন্ধন সাময়িক ভাবে আবশ্যিক করা হয়েছিল। তাতে বেশ কিছু শিশু ফিরে গেছে। মায়েদের কথা  মতে, শিশুকে সময়মতো টিকা দেওয়ার জন্য জন্ম নিবন্ধন জোগাড় করতে গিয়ে কেউ কেউ দুই তিন হাজার টাকা খরচ করেছেন, কিন্তু পেতে দেরি হওয়ায় প্রথম টিকা দিতেই ৩ মাস দেরি হয়ে গেছে। তাদের বাড়িতে কেউ কখনও খোঁজ নিতে আসেনি।

বুকের দুধ না খাওয়া, অপুষ্টি, প্রাথমিক চিকিৎসার অপ্রতুলতা, জরুরি চিকিৎসার অভাব, জীবিকার কারণে প্রতিনিয়ত স্থানান্তর, এগুলো নতুন কিছু নয়। নতুন করে শুধু স্পষ্ট হয়েছে শিশুদের টিকা পাওয়া নিয়ে আগে থেকেই চলতে থাকা বিভিন্ন সমস্যা, টিকা কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা, কাগজে কলমে থাকলেও কার্যত স্পষ্ট নির্দেশনার অভাব, তার উপর যোগ হয়েছে শিশুর টিকা কেনা নিয়ে রাজনীতি। যেখানে  তথাকথিত শিক্ষিত জনগোষ্ঠীতেই স্বাস্থ্য বিষয়ক অনেক ধরনের অযৌক্তিক চিন্তার চর্চা চলে সেখানে শ্রমজীবী, প্রান্তিক, ভাসমান জনগোষ্ঠীতে অসচেতনতা, অশিক্ষা, কুসংস্কার খুব স্বাভাবিক কারণেই বর্তমান। জীবন চালাতে গিয়ে স্বাস্থ্যের খোঁজ খবর খুব একটা নেবার সময় থাকেনা তাদের, শহরের বস্তিতে থাকেন বা গ্রাম, মফস্বলে। শিশু অসুস্থ হলে নিজের সাধ্য মতো ব্যবস্থা নেন। রোগ জটিল হলে কোথায় যাবেন অনিশ্চিত। এছাড়া আছে প্রত্যন্ত গ্রাম, নদী, পার্বত্য এলাকা। পথে যারা বড় হচ্ছে তাদের কী অবস্থা জানা নেই। প্রত্যেকটা নাগরিকই আসলে দিনশেষে নিজে বাঁচতে চাওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় জিডিপিতে,‘উন্নয়নে’ অবদান রাখছে, তাহলে তার স্বাস্থ্যের জন্য, তার শিশুর জীবনের জন্য, ঋণ করে এম্বুলেন্স ভাড়া করে অনিশ্চিত পথে পথে ঘুরতে হবে কেনো?

বুকের দুধ না খাওয়া, অপুষ্টি, প্রাথমিক চিকিৎসার অপ্রতুলতা, জরুরি চিকিৎসার অভাব, জীবিকার কারণে প্রতিনিয়ত স্থানান্তর, এগুলো নতুন কিছু নয়। নতুন করে শুধু স্পষ্ট হয়েছে শিশুদের টিকা পাওয়া নিয়ে আগে থেকেই চলতে থাকা বিভিন্ন সমস্যা, টিকা কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা, কাগজে কলমে থাকলেও কার্যত স্পষ্ট নির্দেশনার অভাব, তার উপর যোগ হয়েছে শিশুর টিকা কেনা নিয়ে রাজনীতি।

শেষ কথা 

কিছুটা কমলেও হাম সংক্রমন এখনও চলমান। এরমধ্যে ডেঙ্গু সংক্রমণ শুরু হয়ে গেছে। আবারও হাসপাতালে ডেঙ্গুর জন্য আলাদা জায়গা করতে হবে, হামের ওয়ার্ডে আলাদা চিকিৎসা লোকবল রাখার জন্য যেমন সরকারি নির্দেশনা এসেছিল ডেঙ্গুর জন্য ও আসা স্বাভাবিক এবং প্রয়োজন। সেই হিসেবে সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় প্রয়োজনীয় লোকবল আছে কি না? জরুরি প্রয়োজনে রেফারেল সুবিধা কোথায়? এই শিশুদের দৈনন্দিন জীবন, পুষ্টি পরিস্থিতি কী? তাদের পরিবারের স্বাস্থ্য পুষ্টি, আর্থ – সামাজিক অবস্থা কী? তার চারপাশে হাম এবং অন্যান্য সংক্রমণ পরিস্থিতি কী? যারা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছে পরবর্তীতে তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়ে পরিকল্পনা কী? কাজেই সময়মতো প্রতিষেধকসহ সব শিশুর জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রাথমিক শর্তগুলো পূরণ, স্বাস্থ্য বিপর্যয়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং সংক্রমণ পরবর্তী তত্ত্বাবধান- এর কোনো বিকল্প নেই। এই পর্যায়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, রোগতত্ত্ববিদ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং নীতিনির্ধারকদের সমন্বয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রাথমিক চিকিৎসা, জরুরি চিকিৎসার সুবিধা সহ এই জনসমাজের উপযোগী করে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস যা মহামারীর জরুরি অবস্থার পরও হয়ে ওঠেনি।

বনানী চক্রবর্তী: শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ। ইমেইল: cbanani24@gmail.com

তথ্যসূত্র

  1. Childhood Pneumonia: Are we doing enough? Icddrb news.nov 9. 2023. 
  2.  Child deaths higher among the poor, little care for mothers. Daily star. Dec 6.2025
  3. Bangladesh has the highest preterm birth rate in 103 countries. 
  4. Bangladesh multiple indicator cluster survey 2025. Preliminary report. Bangladesh bureau of statistics. 
  5. হাম প্রেস রিলিজ। ১৪ জুন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। 
  6. Routine  EPI Coverage  Evaluation  Survey (CES) 2023. 
  7. Nearly half a million Children in Bangladesh miss full immunization, despite 81.6 % coverage: Gavi, UNICEF, & WHO urge immediate action for equity. 25 April 2025. 
  8. Routine Immunization in Bangladesh set to get back on track amidst COVID-19 pandemic and massive flooding. 31 August 2020.  
Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •