সম্পাদকীয়
এই সংখ্যা যখন প্রকাশিত হচ্ছে তখন ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি হচ্ছে। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের বড় সময় গেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পর এখন নতুন সরকার ক্ষমতায়। কিন্তু এর মধ্যেই প্রত্যাশাভঙ্গ ঘটছে প্রায় সবক্ষেত্রেই, বৈষম্যহীন বাংলাদেশের দিকে যাত্রার পরিবর্তে বৈষম্যবাদী শক্তিসমূহের দাপট বৃদ্ধির অবস্থা দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি হাসিনা সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের পথেই চলছে অনেককিছু, এমনকি তাদের করা সব জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তিও অব্যাহত রাখা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কালে খুবই অস্বচ্ছ ও অযৌক্তিকভাবে বন্দর চুক্তি, স্টারলিংক, জাপানের সাথে বাণিজ্য চুক্তি করা হয়েছে; বোয়িং ও এলএনজি আমদানি চুক্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সবচাইতে ভয়াবহ হলো নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে স্বাক্ষরিত মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি নামে ট্রাম্পের আদেশনামা। এর বিস্তারিত গত সংখ্যায় আলোচিত হয়েছে। এবিষয়ে সংসদের সরকারি ও বিরোধী সবগুলো দল গভীর নীরবতায় ডুবে আছে, কিন্তু সেই সাথে এর বাস্তবায়নও চলছে। এর মধ্যে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি, সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট, গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটসহ বিভিন্ন সংগঠন এই চুক্তি বাতিলের দাবিতে ধারাবাহিক কর্মসূচি নিয়েছে।
গত দুবছরে দেশে উগ্রবাদ, বিদ্বেষ ও জুলুম কীভাবে বেড়েছে তার একটি চিত্র ‘উগ্রবাদ, বিদ্বেষ ও জুলুম প্রতিরোধের ডাক’ শিরোনামে এই সংখ্যায় পত্রস্থ বক্তব্যে পাওয়া যাবে। এটি গত ৬ জুলাই ‘সৌহার্দ্যের বাংলাদেশ’-এর আয়োজনে ‘আক্রান্ত ব্যক্তি ও সম্প্রদায়ের করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থাপিত হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতায় হামে আক্রান্ত হয়েছে হাজার হাজার শিশু। গত কয়মাসে সাত শতাধিক শিশুর মৃত্যুর খবর সরকারিভাবেই স্বীকার করা হয়েছে। হাম নিয়ে কেন অনিয়ম হয়েছে, কারা এর জন্য দায়ী তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের দাবিও উঠেছে। এর পাশাপাশি মনোযোগী পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ছে আরও কাঠামোগত কারণ। দারিদ্র, বৈষম্য, অপুষ্টি, চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রকট দুর্বলতাসহ শিশুদের স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে বিশ্লেষণ আছে এই সংখ্যায়।
‘অভ্যুত্থান-উত্তর বিশ্ববিদ্যালয়: সাম্প্রতিক বাস্তবতা’ শীর্ষক লেখায় বিশ্ববিদ্যালয় পরিস্থিতির কিছু চিত্র পাওয়া যাবে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনাসহ ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ জন শিক্ষক এ বিষয়ে কথা বলেন। এর মধ্যে তিনজন শিক্ষকের লিখিত বক্তব্য এই সংখ্যায় প্রকাশ করা হলো।
গত কয় দশকে বিভিন্ন সরকারের পাটশিল্পবিনাশী নীতির ধারাবাহিকতা গত দুবছরেও একইভাবে রক্ষা করা হয়েছে। ‘রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল রক্ষা পরিষদ’ আয়োজিত মতবিনিময় সভায় উপস্থাপিত মূল বক্তব্যে পাটশিল্পবিনাশী সরকারের নীতির ধারাবাহিকতা এবং শিল্পরক্ষার পথ বিস্তারিত তথ্য যুক্তিসহ উপস্থিত করা হয়েছে।
নতুন সরকার এবছরের বাজেট উপস্থাপন করেছে গত ১১ জুন, পাশ করেছে ৩০ জুন। ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎচালিত যানবাহন এবং বাজেটে গরিব মানুষের ভাগ’ শীর্ষক লেখায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎচালিত যানবাহনের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী মানুষের ভূমিকা আর সেই গরিব জনগোষ্ঠীর প্রতি সম্প্রতি ঘোষিত বাজেট (২০২৬-২৭) থেকে অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় বৈষম্যমূলক নীতি ও বিধিব্যবস্থার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।
‘রেড ফেমিনিস্ট ব্লক’ নামে সদ্যগঠিত বাংলাদেশের একটি কর্পোরেটবিরোধী এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নারীবাদী রাজনৈতিক প্লাটফর্ম ‘জেন্ডার বাজেট: লিঙ্গ ও শ্রেণী বৈষম্যের দূরীকরণ না নব্যউদারনীতির ভাষা?’ শিরোনামে বাজেট দর্শন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
এই সরকারও যথাযথ পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়া, স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের উত্থাপিত প্রশ্ন মোকাবিলা না করে একতরফাভাবে মেগাপ্রজেক্ট গ্রহণের পথে হাঁটছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে সর্বজনকথায় ‘তিস্তা সংকট নিরসনের জন্য কী ধরনের মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন?’ শিরোনামে ধারাবাহিক লেখা প্রকাশিত হচ্ছে। এর তৃতীয় পর্বে চীনের কোম্পানি ‘পাওয়ার চায়না’ প্রস্তাবিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’র বিভিন্ন দিক উপস্থাপন করা হয়েছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিপুল আর্থিক বোঝা, ভয়াবহ বিপদ ও ঝুঁকি নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ এর আগে সর্বজনকথায় প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৩ সালে ইউপিএল পারমাণবিক বিদ্যুৎ: বাংলাদেশে রূপপুর প্রকল্প ও বিশ্ব অভিজ্ঞতা শিরোনামে একটি সম্পাদিত গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। কিন্তু নানারকম ঝুঁকি এবং অস্বচ্ছতা নিয়েই এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ অব্যাহত রাখা হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বাসস্থানচ্যুতি, তাদের কর্ম ও পেশাজীবন এবং পারিপার্শ্বিক ও পরিবেশগত পরিবর্তন বিষয়ে মাঠ গবেষণার ভিত্তিতে রচিত লেখা এই সংখ্যায় প্রকাশ করা হলো।
‘২৪-এর গণআন্দোলনের গান’ ধারাবাহিকের অষ্টম পর্ব প্রকাশিত হচ্ছে এই সংখ্যায়। ‘বাংলাদেশের ৫০ বছর ও তারপর’ ধারাবাহিকের দ্বাদশ পর্বে ১৯৯৩-৯৪ সময়কালে জামায়াত-ফতোয়াবাজদের দাপট, ব্ল্যাশফেমি এ্যাক্ট প্রবর্তনের চক্রান্তের বিরুদ্ধে লেখক শিল্পীদের বিরাট সমাবেশ এবং বৃহৎ বামফ্রন্ট গঠনের ব্যর্থ চেষ্টাসহ তৎকালীন ঘটনাবলী ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। আয়েশা সিদ্দিকার ‘পাকিস্তানের সামরিক অর্থনীতির অন্দরমহল’ গ্রন্থভিত্তিক আলোচনার দ্বিতীয় পর্বে বিভিন্ন দেশে সামরিক বাহিনীর সাথে বেসামরিক প্রশাসন ও সরকারের সম্পর্কের ছয়টি ধরন চিহ্নিত করা হয়েছে। ‘মৌলবাদের সংঘর্ষ: ক্রুসেড, জিহাদ এবং আধুনিকতা’- অনুবাদ ধারাবাহিকের চতুর্দশ পর্বে পাকিস্তানের তালেবান ও সামরিক শাসনের অভিজ্ঞতা আলোচনা করা হয়েছে।
ডি.ডি.কোসাম্বী (১৯০৭- ১৯৬৬) দক্ষিণ এশিয়ায় প্রাচীন ইতিহাসচর্চার একটি নতুন ধারা প্রবর্তন করেছিলেন এবং বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা পদ্ধতি প্রয়োগ করে পথিকৃত ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁকে নিয়ে লেখার অনুবাদ প্রকাশিত হলো এই সংখ্যায়।
আনু মুহাম্মদ
২০ জুলাই ২০২৬
