উগ্রবাদ, বিদ্বেষ ও জুলুম প্রতিরোধের ডাক

আক্রান্ত ব্যক্তি ও সম্প্রদায়ের সভা

উগ্রবাদ, বিদ্বেষ ও জুলুম প্রতিরোধের ডাক

গত জুলাই ঢাকার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতেসৌহার্দ্যের বাংলাদেশ“-এর আয়োজনেআক্রান্ত ব্যক্তি সম্প্রদায়ের করণীয়শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এবং সঞ্চালনা করেন হাসান শাহ সুরেশ্বরী দিপু নূরী।  আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন জাকের পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের মনীন্দ্র কুমার নাথ, বাংলাদেশ সুপ্রীম পার্টির যুগ্ম মহাসচিব মো. ইব্রাহিম মীর, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-এর সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল কাফী রতন, বাংলাদেশ সনাতনী পার্টির সাধারণ সম্পাদক সুমন কুমার রায়, হেযবুত তাওহীদএর ইমাম হোসাইন মো. সেলিম, উদীচীর সাধারণ সম্পাদক জামশেদ আনোয়ার তপন, আশেকানে আওলিয়া ঐক্য পরিষদের মহাসচিব আল্লামা হানিফ নূরী এবং দেশবরেণ্য বাউল শিল্পী আবুল সরকার, বিশ্ব সুফী সংস্থার উচ্চ পরিষদের সদস্য বেনজিন নূরী সুরেশ্বরী আনোয়ার আহমেদ শিবলী, ইউপিডিএফ নেতা অমল ত্রিপুরা, বাংলাদেশ তরিকত পরিষদএর প্রেসিডিয়াম সদস্য আলী রেজা পাহলেভি রয়েল হায়দারী সাধারণ সম্পাদক শামসুল আলম চিশতি, এনপিএএর কেন্দ্রীয় নেতা অনিক রায়, সুফীবাদ সার্বজনীন ফাউন্ডেশনএর চেয়ারম্যান তৌহিদুল ইসলাম চিশতি, ভাবনগরের প্রতিষ্ঠাতা সাইমন জাকারিয়া, বিশ্ব সুফী ঐক্য পরিষদএর মো. বেলাল নূরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোশাহেদা সুলতানা, কবি সৈয়দ তারিক এবং দরগা মাজার সুরক্ষা কমিটির সভাপতি সৈয়দ আমিনুল এহসান ফেরদৌস। সভার শুরুতেই লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন লেখক সাংবাদিক মাহাথির মুহাম্মদ। এখানে এই অবস্থানপত্রটি প্রকাশ করা হলো। 

পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র তথা সহস্র সুপ্রাচীন নদীর অববাহিকায় তাদের পলি দ্বারা গঠিত বনভূমি কৃষিজমির নিকটবর্তী স্থলভাগ আমাদের বঙ্গভিটা, আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশ, আজ এক গভীর ক্রান্তিলগ্নের মুখোমুখি। আমাদের এই নদী বিধৌত ভিটেমাটিতে, ঐতিহাসিকভাবেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, পরমত সহিষ্ণুতা, বহুমত, বহুপথ মিলন মিথষ্ক্রিয়ায় গড়ে উঠেছে আমাদের ভাষা, সঙ্গীত, সাহিত্য,উপকথা, মূল্যবোধ সংস্কৃতি। মুক্তজীবনের মন্ত্রে বিকশিত একটি জনপদের ভূমিপুত্র আমরা। 

নদীর জল যেমন ভাটি অঞ্চলে সৃষ্টি করেছে নদীরই শব্দের ছন্দের মতো ভাটিয়ালি লহরী, তেমনই খরা প্রধান উত্তরবাংলার মানুষের জীবনের প্রকাশ ঘটে ভাওইয়া গানের সরলিয়া টানে। অর্থাৎ সুর সঙ্গীত আমাদের জীবনের সহজাত প্রকাশের ভাষা

কিন্তু আমাদের চিরচেনা সেই প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ এর চেহারা আজ আর চেনা যায়না! সাম্প্রতিক সময়ে দেশে যা হচ্ছে এই ভূমির হাজার বছরের ইতিহাসে তার দৃষ্টান্ত বিরল! যা ঘটছে বাংলাদেশে, যে সময় আজ আমরা পার করছি ঘটছে তাতে যেকোনো বিবেকবান সংবেদনশীল মানুষের আত্মায় রক্তক্ষরণ হতে বাধ্য।

সমাজ বিজ্ঞানীরা বিস্মিত হয়ে ভাবছেন কখন, কীকরে আর কী প্রক্রিয়ায় ভেতরে ভেতরে এতোটা পালটে গেল আমাদের সমাজ? কী ভুলে, কোন পাপে, কার ষড়যন্ত্রে সমাজে প্রবেশ করেছে এমন ঘৃণার বিষ? এমন অত্যাচারী, স্বৈরাচারী এবং বিষাক্ত ধর্মতত্ত্ব কীভাবে এমন প্রভাব বিস্তারকারী হয়ে উঠলো এই হাসন লালন, চন্ডীদাসের দেশে?

কখন, কীকরে আর কী প্রক্রিয়ায় ভেতরে ভেতরে এতোটা পালটে গেল আমাদের সমাজ? কী ভুলে, কোন পাপে, কার ষড়যন্ত্রে সমাজে প্রবেশ করেছে এমন ঘৃণার বিষ? এমন অত্যাচারী, স্বৈরাচারী এবং বিষাক্ত ধর্মতত্ত্ব কীভাবে এমন প্রভাব বিস্তারকারী হয়ে উঠলো এই হাসন লালন, চন্ডীদাসের দেশে?

যেই বাউল ফকির সন্ন্যাসীরা এক দিন তাদের একতারা সুরে মায়াময় লহরী বিস্তার করতেন এদেশের নদী ধোয়া বাতাসে, যারা একদিন একতারার সঙ্গীতে এবং মরমিয়া সুরে ছড়িয়ে দিতেন গভীর আধ্যাত্মিক ভাব আর দার্শনিকতা আজ সেই বাউলের একতারা ভাঙার দিন এসেছে দেশে আমাদের বাংলাদেশে। 

রাস্তায় ফেলে জোর করে ধরে কেটে দেয়া হচ্ছে বাউল সাধু ফকিরের চুলের জটা! শোনা হচ্ছে না কোন আপত্তি, যেন বাউলের, ফকিরের, জটাধারী হিন্দু সাধুদের কিংবা মাজারে মাজারে ঘুরে বেড়ানো আধ্যাত্মবাদী পাগলপন্থী সুফিরা আর মানুষ নয়! যেন তারা কোনো বৈরী জন্তু বা জানোয়ার! তাদের নিজের দেহের উপরে যেন আর তাদের কোনো অধিকার নেই, তাদের দেহও যেন ওহাবি মোল্লার ক্ষমতা আকীদা চর্চার জায়গা। তাই  আধ্যাত্মিকতার প্রতীক তাদের চুলের জটা কেটে দিয়ে তাদের চেহারাকে দেয়া হচ্ছে তথাকথিত সুন্নতি রূপ, যেখানে তাদের চুলের জটা কেটে, গোঁফ কেটে শুধু অক্ষত রাখা হচ্ছে তাদের দাড়ি। এমনকি হিন্দু সাধুরা তাদের হিন্দু পরিচয় দেয়ার পরেও তাদের জটা কেটে দিয়ে রাখা হচ্ছে তাদের দাড়ি। ওই অপশক্তি আসলে কাটছে মহাগুরু সিরাজ সাইজির জটা, তারা আসলে হাত দিচ্ছে ভগবান শিবের উপরে কেননা হিন্দু ধর্মে জটা শিবেরই প্রতীক।

বন্ধুগন, প্রাচীন গ্রীসের আকাদেমিতে যেমন ধর্ম দর্শন নিয়ে মুক্তভাবে তর্ক বিতর্ক হতো, এই মরমিয়া সুরের দেশ বাংলাদেশে সেই জ্ঞানতাত্ত্বিক বিতর্কই বিখ্যাত হয়ে আছে বিচার গান নামে।

অথচ এমন দূর্দিন আজ আমাদের যে, সেই বিচারগাণের আসর থেকে বিচার গান করবার অপরাধে গ্রেপ্তার হয়ে যান বাউল! এক শ্রেণীর মোল্লা যখন শ্লোগান তোলে, “রশি লাগলে রশি নে, বাউলের ফাঁসি দেতাদের দাবী ধরন এমন, যেন বাউল হওয়াটাই মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ!  

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী কিশোরী ধর্ষণের ঘটনায় যে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনা, তাদেরকেই দেখা যায় সক্রিয় হয়ে ওঠে ঢাকার রাজপথে আদিবাসীদের অধিকারের আন্দোলন দমনে! ঢাকার রাজপথে আদিবাসী ছাত্রদের উপরে হামলা করে রক্ত ঝরানোয় সমান তালে হাত লাগিয়েছিল ছাত্র শিবির ইন্টেরিম সরকারের পুলিশ!

এদিকে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের উপরে অত্যাচারের ইতিহাস পুরনো! ১৯৪৭ এর বাংলা ভাগের পর থেকেই হিন্দুরা নির্যাতিত হয়েছেন  দশকে দশকে! সকল রাজনৈতিক অস্থিরতার বলি হতে হয়েছে হিন্দুদের! কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে হিন্দুদের উপরে যে ব্যাপক সামাজিক ঘৃণার উলম্ফন দেখা যাচ্ছে, তা ইতিহাসে বিরল। দিপু চন্দ্র দাস নামে এক নিরীহ হিন্দু যুবককে,  কথিত ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে হত্যা করা হয়েছে পুড়িয়ে। সেদিন শুধু দিপু চন্দ্র দাসকেই পোড়ানো হয়নি, তার সাথে পুড়ে গেছে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের বিশ্বাস নিরাপত্তার বোধও। বহু হিন্দু বাড়িতে লুটপাট ভাঙচুর হয়েছে, ভাঙ্গা হয়েছে বহু হিন্দু মন্দির প্রতিমা! সোশ্যাল মিডিয়ায় TMD বা টোটাল মালাউন ডেথ নামে একটা হ্যাশট্যাগ এর প্রচলন দেখা গেছে যেখানে স্পষ্টতই হিন্দুদের গণহত্যার ঘোষণা দিচ্ছে একদল উগ্রবাদী গোষ্ঠী! সর্বোপরি এসব ঘটনা খবরে এসেছে,কিন্তু খবরে আসেনি যা, তা হল নিজ ভূমে টিকতে না পেরে হিন্দু সম্প্রদায়ের নীরব দেশত্যাগ!  বছরে বছরে, দশকে দশকে! অথচ একদিন হিন্দু সম্প্রদায়ের তরুণ যুবকেরা এই ভূমিকে নিজের মাতৃভূমি জেনে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে গেছে ইতিহাসের প্রতিটি কাল পর্বে, এই জাতির প্রতিটি দুর্দিনে। অথচ রবীন্দ্রনাথের দুই বিঘা জমির উপেনের মতো নিজের সাত পুরুষের ভিটা মাটিতেই এদেশের হিন্দুদের দেগে দেয়া হচ্ছেইন্ডিয়ান’ বলে

একদিন যে সুফি সাধকরা এদেশে সর্বজনীন মানবতাবাদ, প্রেম ভ্রাতৃত্বের মহান আদর্শকে সামনে নিয়ে গভীর আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছিলেন আজ তারাও বিপন্ন। চার শতাধিক মাজারে হামলা,  ভাংচুর অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। মাজার এবং অলি আউলিয়া ভক্ত মানুষদের ধর্ম যেন ধর্ম নয়, তাদের বিশ্বাস যেন বিশ্বাস নয়, তাদের যেন ধর্মের অনুভূতি নেই

তাই ইচ্ছা করলেই পুড়িয়ে দেয়া যায় তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান! আইন শৃঙ্খলা বাহিনী থাকে নীরব দর্শকের ভূমিকায়! সুফি সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব হল তাদের ওরশগুলো, যা বিভিন্ন মাজারে অনুষ্ঠিত হয়, অথচ কখনো তৌহিদী জনতা নামক জঙ্গী গোষ্ঠীর হামলায় কখনো রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নিষেধাজ্ঞায় কত ওরশ যে পন্ড হয়ে গেছে আর কত উৎসব যে পরিণত হয়েছে যাপিত দুঃস্বপ্নে তার হিসেব কেউ রাখেনি! কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে সূফী সাধক নূরাল পাগলের লাশ। কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে সুফী সাধক শামীম আল জাহাঙ্গীর আল সুরেশ্বরীকে। পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে সুন্নী সুফী আলেম রইস উদ্দিনকে। রক্ত ঝরেছে ঐতিহাসিক শাহ পরান মাজারেও। আর সেইসব হত্যাকে বৈধতা দেয়া হয়েছে মাজার পূজারী, বেদাতি, শিরকি বলে! অনেক সুফী সাধকই ঘাতকের হাত থেকে বেঁচে গেছেন মরতে মরতে

কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে সূফী সাধক নূরাল পাগলের লাশ। কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে সুফী সাধক শামীম আল জাহাঙ্গীর আল সুরেশ্বরীকে। পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে সুন্নী সুফী আলেম রইস উদ্দিনকে। রক্ত ঝরেছে ঐতিহাসিক শাহ পরান মাজারেও।

 আর এইসব হত্যা হত্যা চেষ্টার সময়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোকে দেখা গেছে যথারীতি দর্শকের ভূমিকায়! হামলা করা হয়েছে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানে। ইসলামের নবীর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশকেও স্বতঃস্ফূর্ত হতে রাজি নয় এক শ্রেণীর উগ্র জঙ্গীবাদী গোষ্ঠী

আর এই জঙ্গীদের চোখে নারী জন্ম যেন পাপ! নারী মাত্রই যেন ভোগ্য বস্তু! তাই নারীদের অবাধ চলাচলকে ক্ষতিগ্রস্ত করে রাস্তা ঘাটে এই সন্ত্রাসী দল মেয়েদের উপরে হামলে পড়েছে! রাস্তায় নারীকে উত্যক্তকারী বদমাশকে ফুলের মালা দিয়ে তার হাতে ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে কোরান শরীফ। এই উগ্রবাদীদের বার্তা ছিলো স্পষ্ট! তাদের ইসলামে নারীকে তার পোশাকের জন্য রাস্তায় নিপীড়ন উত্যক্ত করা বৈধই নয় শুধু, ফুলের মালা পাওয়ার মতো কাজ! এই গোষ্ঠীটি এদেশের নারীদেরকে বন্দী করতে চায় আফগানিস্তান কিংবা সৌদি আরবের ওহাবি মতাদর্শের ঘেরাটোপে! বাংলার শাড়ি পরিহিতা মায়েদেরকে বেপর্দা বলেই আখ্যা দিতে চায় এই দল!

এদিকে দেশের সঙ্গীত শিল্প চর্চাও রয়েছে ভয়াবহ হুমকিতে। দেশের বহু গ্রামে এক শ্রেণির উগ্রবাদী নিষিদ্ধ করেছে সঙ্গীত বাদ্যযন্ত্র! উদীচী ছায়ানট এর মত দেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্প সংগঠন এর কেন্দ্রীয় অফিস পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে ভয়াবহ পাশবিক উৎসবের সাথে। কতিপয় ব্যক্তি গোষ্ঠীকে ঘোষণা দিতে দেখা যাচ্ছে সংগীত নির্মূলের। ভেঙে ফেলা হয়েছে সশীলজের সমস্ত ভাস্কর্য! কবি লেখকদেরকে কথিত ধর্মঅবমাননার অভিযোগে কতলের ডাক দেয়া দেশের নিয়মিত চর্চায় পরিণত হয়েছে গত কয়েক দশকে।

সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা আমাদের দেশে সবসময়ই স্বল্প ছিলো। কিন্তু আজ বাংলাদেশে যা হচ্ছে তা ইতিহাসে বিরল! প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারের মতো দুইটি প্রধান সংবাদমাধ্যমকে শুধু পুড়িয়েই ফেলা হয়নি, ডেইলি স্টার অফিসে সাংবাদিকদেরকে ভেতরে রেখেই আগুন জ্বালানো হয়েছে। অর্থাৎ হামলাকারীরা শুধু আগুন দিয়ে পুড়িয়েই দেয়নি পত্রিকা অফিস, সাংবাদিকদেরকেও পুড়িয়ে হত্যার লক্ষ্য ছিলো এদের!

পরিশেষে যে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশ, সেই মুক্তিযুদ্ধই যেন এক অপরাধে পরিণত হয়েছে। সারা বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের প্রায় সমস্ত ভাস্কর্য এবং স্মৃতি চিহ্ন ভেঙে ফেলা হয়েছে! মুক্তিযোদ্ধার গলায় জুতার মালা পরানো হয়েছে আর মুক্তিযোদ্ধাদের উপরে করা হয়েছে আক্রমণ।  

মব কিংবা তৌহিদী জনতা নামের আড়ালে সারাদেশে সংগঠিত এই ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক সারাদেশের মানুষের আত্মাকে কঠিন শেকলে বন্দী করেছে। বাউল ফকির হিন্দু সুফি আদিবাসী লেখক সাংবাদিক শিল্পী সাহিত্যিক এই সকল ঘরোনার মানুষের উপর আক্রমণকারী গোষ্ঠীটি কিন্তু একই

মব কিংবা তৌহিদী জনতা নামের আড়ালে সারাদেশে সংগঠিত এই ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক সারাদেশের মানুষের আত্মাকে কঠিন শেকলে বন্দী করেছে। বাউল ফকির হিন্দু সুফি আদিবাসী লেখক সাংবাদিক শিল্পী সাহিত্যিক এই সকল ঘরোনার মানুষের উপর আক্রমণকারী গোষ্ঠীটি কিন্তু একই!

এদের ভয়াবহ উগ্রবাদী আগ্রাসী মনোভাব, শক্তিশালী নেটওয়ার্ক, ব্যাপক সাংগঠনিক শক্তি,  অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তির ষড়যন্ত্রমূলক সহযোগিতা এবং রাষ্ট্র শক্তির মদতকে ব্যবহার করে এরা বাংলাদেশের সমস্ত ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, এদের সাথে ভিন্নমত রাখে এমন সকল সম্প্রদায় তথা যা কিছুকে আমরা বাংলাদেশ বলে জানি, বিশ্বাস করি এবং নিজের দেশ সংস্কৃতিজ্ঞানে ভালোবাসি অর্থাৎ যা কিছু আমাদেরকে আমরায় পরিণত করে তার সবকিছুকেই মুছে দিতে চায়, নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায় তারা। যেভাবে তারা করেছে আফগানিস্তান, সৌদি আরব, সিরিয়া, লিবিয়া প্রভৃতি দেশে।

আমরা যারা এখানে একত্র হয়েছি তারা এদেশের পলিমাটির প্রেম সৌহার্দের সন্তান। প্রতিরোধের চেয়ে প্রেমই আমাদের অধিকতর সহজাত। কিন্তু অস্তিত্বের সংকটে পলিমাটির মানুষও গড়ে তোলে ইস্পাত কঠিন প্রতিরোধ। 

সুধী, সাম্প্রতিক সময়ে যে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এবং নৃতাত্ত্বিক লিঙ্গীয় নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে তা নিছকই কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এক সুপরিকল্পিত সুদুরপ্রসারি সর্বনাশা ষড়যন্ত্রের অংশ, যার মূল লক্ষ্য বাংলাদেশকে একটা ফ্যাসিবাদী-উগ্রবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করা এবং বাংলাদেশের সমাজ থেকে যা কিছু বাংলাদেশ তার সবকিছুকেই নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে একে এক প্রকার অসহিষ্ণু সাংস্কৃতিক উপনিবেশে পরিণত করা। তাই এই অপশক্তিকে পরাজিত করতে না পারলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের যে গণতান্ত্রিক চরিত্র এদেশের জনগণের দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে, বাংলার যে সভ্যতা সংস্কৃতি আমাদের কাছে আমাদের পূর্বপুরুষের পবিত্র আমানত, তার কিছুই রক্ষা করা যাবেনা। 

কিন্তু এই অপশক্তি যে বিপুল অর্থনৈতিক, সামাজিক সাংগঠনিক শক্তি অর্জন করেছে তাদেরকে আমাদের কারো পক্ষেই একা পরাজিত করা সম্ভব নয়, আবার নিষ্ক্রিয়তা কিংবা হাহুতাশেও এদেরকে পরাজিত করা সম্ভব নয় আর আত্মরক্ষাও সম্ভব নয়। প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ, সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক, সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। 

তাই সমস্ত মত পথ বিশ্বাসের উর্ধ্বে দাঁড়িয়ে সকল আক্রান্ত সম্প্রদায় গোষ্ঠীর মানুষের একতাবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা আজকের মতো বেশি সম্ভবত আর কখনো ছিলোনা। পরিশেষে স্মরণ করছি একটি প্রাচীন আফ্রিকান প্রবাদ

বিপদের দিনে বোকারা বেড়া তোলে আর জ্ঞানীরা সেতু তৈরি করে

যোগাযোগ: হাসান শাহ সুরেশ্বরী দিপু নূরী। ইমেইল: dipunuri5@gmail.com

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •