অভ্যুত্থান-উত্তর বিশ্ববিদ্যালয়: সাম্প্রতিক বাস্তবতা

অভ্যুত্থান-উত্তর বিশ্ববিদ্যালয়: সাম্প্রতিক বাস্তবতা

লায়েকা বশীর, নির্ণয় ইসলাম, মারিয়া ভূঁইয়া

গত ১৬ মে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ‘অভ্যুত্থান-উত্তর বিশ্ববিদ্যালয়: সাম্প্রতিক বাস্তবতা’ শীর্ষক গোলটেবিল আয়োজন করে। এই গোলটেবিল আলোচনায় অভ্যুত্থান-উত্তর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনাসহ ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ জন শিক্ষক। তাদের মধ্যে কয়েকজন ভার্চুয়ালি অংশ নেন। এ ছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীও আলোচনায় অংশ নেন। এখানে তিনজন শিক্ষকের লিখিত বক্তব্য দেওয়া হলো।

লায়েকা বশীর

আমি লায়েকা বশীর, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক (ইউএপি)-এর বেসিক সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক। ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখটি আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমার জীবনের সর্বোচ্চ কর্মক্ষমতার মূল্যবান সময় – প্রায় ১৮ বছর – যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমি নিয়োগ করেছি, সেই ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের কর্তৃপক্ষ অবৈধভাবে চাকরির অবসান ঘটানোর উদ্দেশ্যে আমাকে এই দিন অব্যাহতিপত্র পাঠায়। এই দীর্ঘ সময়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি আমি প্রশাসনিক, সাংস্কৃতিক ও নানাবিধ আনুষ্ঠানিক কর্মে ও পদে যুক্ত ছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনো প্রয়োজনে ব্যক্তিগত স্বার্থত্যাগে ছিলাম অভ্যস্ত।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটে ১০ ডিসেম্বর ২০২৫। ফেসবুক বন্ধুদের উদ্দেশে আমার একটি ব্যক্তিগত পোস্টকে কেন্দ্র করে সম্পূর্ণ অযাচিত ও অপ্রাসঙ্গিকভাবে ইউএপির তথাকথিত প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত কয়েকটি ধর্মীয় ফ্যাসিস্ট ফেসবুক গ্রুপে ও পেজে বেশকিছু ভুয়া ও ছদ্মনামের অ্যাকাউন্ট থেকে আমার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে প্রতিদিন কুৎসিত আক্রমণ ও কুৎসা রটানো হতে থাকে। এসব মিথ্যা অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অকস্মাৎ ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ আমাকে পদত্যাগ করার মৌখিক নির্দেশ দেন। পরদিন আমি ভিসি, প্রো-ভিসি, বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারপারসনসহ অন্য ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে বসি, এর প্রতিবাদ করি ও সুষ্ঠু তদন্তের মৌখিক আবেদন জানাই। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং বিস্ময়করভাবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে google form-এ নতুন করে অভিযোগ আহ্বান করে, যা দুরভিসন্ধিমূলক ও শিক্ষক হিসেবে আমার জন্য চরম মর্যাদাহানিকর। এরপরও কিছু ফেসবুক পেজ ও গ্রুপ থেকে আমার বিরুদ্ধে সাইবার বুলিং অব্যাহত থাকে ও আমাকে ‘ইসলাম-বিদ্বেষী’ ও নানারকম আপত্তিকর ট্যাগ দেওয়া হয়। আমার ধারণা, এই ছাত্রদের ঘুঁটি হিসেবে চালিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন মহলের একটি প্রভাবশালী অংশ। এর প্রতিবাদ করতে গেলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে, শারীরিকভাবে হেনস্তা করে মুখ বন্ধ করা হয়েছে। 

ফেসবুক বন্ধুদের উদ্দেশে আমার একটি ব্যক্তিগত পোস্টকে কেন্দ্র করে সম্পূর্ণ অযাচিত ও অপ্রাসঙ্গিকভাবে ইউএপির তথাকথিত প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত কয়েকটি ধর্মীয় ফ্যাসিস্ট ফেসবুক গ্রুপে ও পেজে বেশকিছু ভুয়া ও ছদ্মনামের অ্যাকাউন্ট থেকে আমার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে প্রতিদিন কুৎসিত আক্রমণ ও কুৎসা রটানো হতে থাকে।

আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগসমূহের বিষয়ে আমার জবাবদানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় তদন্ত কমিটি ২২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করে। কিন্তু সেই তারিখ অতিবাহিত হওয়ার আগেই এবং অভিযোগের জবাবদানের সুযোগ না দিয়েই ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ সেমিস্টারের প্রথম দিন ক্লাস বয়কট-করা মব-সন্ত্রাসীদের চাপে কর্তৃপক্ষ আমার টার্মিনেশনের ঘোষণা দেয় ও রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত টার্মিনেশন লেটার পরদিন আমাকে ই-মেইলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যা শুধু চূড়ান্ত অমানবিক, অন্যায় আচরণই নয়; বরং উপর্যুপরি মানসিক নির্যাতনের শিকার একজন শিক্ষকের ওপর বজ্রাঘাত-তুল্য। টার্মিনেশনের পরও কর্তৃপক্ষ আমাকে ই-মেইল করে অভিযোগের জবাবদানের জন্য তাগাদা দেয়, যা অভিনব মানসিক নির্যাতনের নামান্তরমাত্র।

উল্লেখ্য, চাকরি অবসানের পত্র কেবল আমাকে নয়, আমাকে সমর্থন করার জন্য একই দিনে বিভাগীয় প্রধান ও আমার সহকর্মী ড. এ এস এম মোহসিনকেও পাঠানো হয়।

সোশ্যাল মিডিয়ায় কেবল ব্যক্তিগত মতপ্রকাশের জন্য যে মানসিক নিপীড়ন, সামাজিকভাবে অসম্মান এবং চাকরিচ্যুতির মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে অন্যায় আঘাত আমাকে করা হয়েছে, তার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ইউজিসির পদক্ষেপ ও ভূমিকা দেখবার ভরসায় আমি ইউজিসি চেয়ারম্যান বরাবর দুটি চিঠি দিয়েছি, স্বপদে পুনর্বহালের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন করেছি, কিন্তু কোনো ফল দেখা যায়নি।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান দেশের অন্যান্য ক্ষেত্রের ন্যায় শিক্ষাঙ্গনকে নিয়েও আমাদের আশাবাদী করে তুলেছিল, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্রমেই ‘মবের মুলুক’ হয়ে ওঠে। তাই দেখা যায়, নির্বাচনের ঠিক পূর্বমুহূর্তে এই মব-সন্ত্রাসীরা তড়িঘড়ি করে প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অপেক্ষাকৃত প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ মানুষদের সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্য করে, সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে ও বলপূর্বক সরিয়ে ফেলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তৎপর হয়। দুর্ভাগ্যক্রমে, নির্বাচিত নতুন সরকারের আমলেও এই অন্যায়-কর্মের প্রতিকার দেখা যায়নি।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান দেশের অন্যান্য ক্ষেত্রের ন্যায় শিক্ষাঙ্গনকে নিয়েও আমাদের আশাবাদী করে তুলেছিল, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্রমেই ‘মবের মুলুক’ হয়ে ওঠে।

বিদ্যায়তনে স্বাধীন শিক্ষাচর্চার পরিবেশ তৈরি হোক, বাক-স্বাধীনতা ও মত-প্রকাশের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা পাক। সামাজিক ও পেশাগত অবমাননা এবং ক্ষতিসাধনের প্রতিকার মিলুক। এটাই গভীরতর প্রত্যাশা।

লায়েকা বশীর: শিক্ষক নেটওয়ার্ক-এর সদস্য ও শিক্ষক, ছায়ানট সঙ্গীতবিদ্যায়তন। ই-মেইল: layeqa.bashir@gmail.com

নির্ণয় ইসলাম

প্রথমেই বলে নিতে চাই– যা বলছি এগুলো আমার ব্যক্তিগত মতামত, BRAC University-র না, ইউটিএনেরও না। যেহেতু ব্র‍্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি বিশেষ কোনো পদধারী না, আমি একজন সাধারণ প্রভাষক, তাই ভেতরের অনেক আলাপ নিয়ে বিস্তারিত না-ও জানতে পারি। ট্রান্স অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণার সূত্রে নিজের কিছু অবজারভেশন শেয়ার করব।

ব্র্যাকইউ দিয়ে শুরু করি। অভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক তীব্র আলীর দরজার ওপর রংধনু স্টিকার থাকার কারণে তিনি শিক্ষার্থীদের দ্বারা উৎপীড়ন ও হয়রানির শিকার হন। আরেকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক অধ্যাপক সামিয়া হক, অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থী ও ন্যায়বিচারের পক্ষে সক্রিয়ভাবে অবস্থান নেওয়া সত্ত্বেও আরও অনেকের সঙ্গে তিনিও আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে ট্যাগিং ও অপপ্রচারের শিকার হন।

‘সাধারণ ছাত্র’ পরিচয়টি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ইন্টেরিমের সময় নানা ধরনের আক্রমণাত্মক কাজ চালানোর চেষ্টা হয়েছে। নম্রভাবে বললে এরা ইসলামোফ্যাসিস্ট শক্তি আর শক্তভাবে বললে জঙ্গিবাদী শক্তি। ক্যাম্পাসে তাদের কার্যকলাপে IS-type পতাকা দেখা গেছে, কিন্তু সেটিকে একটি সাধারণ কলেমার পতাকা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একইভাবে, ইসলামি মূল্যবোধের মোড়কে এসব মহল থেকে ঘৃণা আর বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। অথচ আমরা জানি, আল্লাহ তার বান্দাদের মানুষকে ভালোবাসতে আর ক্ষমা করতে বলেছেন। সমস্যাগুলো অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গেও মিলে যাচ্ছে, হিন্দু সহকর্মী ও শিক্ষার্থীসহ সংখ্যালঘুরা ক্যাম্পাসে আরও বেশি উদ্বিগ্ন। Metaphoric অর্থে, মানুষকে সংস্কৃতি দিয়ে পিটিয়ে মানুষ করা হচ্ছে। দুর্ভাগ্যবশত, উপনিবেশ প্রতিরোধের নামে এই কৌশলটি সবচেয়ে ব্যাপকভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে, অথচ সংস্কৃতিকে সভ্য বা ‘পরিষ্কার’ করার সেই একই ঔপনিবেশিক যুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।

ইসলামি মূল্যবোধের মোড়কে এসব মহল থেকে ঘৃণা আর বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। অথচ আমরা জানি, আল্লাহ তার বান্দাদের মানুষকে ভালোবাসতে আর ক্ষমা করতে বলেছেন।

শিক্ষকের প্রধান হাতিয়ার pedagogy বা শিক্ষণ পদ্ধতি বা যেই পদ্ধতিতে ছাত্রদের মনে কিছু প্রশ্ন তৈরি করা সম্ভব। যেমন: সংস্কৃতি কী? সংস্কৃতি কি শুধু সংগীত ও নৃত্য? নাকি এর মধ্যে আচার-অনুষ্ঠান, সম্মিলিতভাবে তৈরি করা মিম বা জ্ঞানও অন্তর্ভুক্ত? সংস্কৃতি, ক্ষমতা এবং ইতিহাস একের অপরের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক? আমি ‘এথিক্স অ্যান্ড কালচার’ নামে একটি কোর্স পড়াই। শেখার প্রক্রিয়াটি কীভাবে ঘটছে, অথবা শিক্ষক হিসেবে আমরা কীভাবে প্রশ্ন ও নতুন ধারণার সুযোগ করে দিচ্ছি? শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে নীতি চর্চায় ভূমিকা রাখতে পারছি? শ্রেণিকক্ষ, নির্ধারিত কাজ এবং পাঠ্যক্রম এমনভাবে সাজানো হয় যাতে শিক্ষার্থীরা নতুন ধারণার সম্মুখীন হতে পারেন, জটিল বা সেনসিটিভ ধারণা নিয়ে গভীরভাবে অনুশীলন করেন এবং সেগুলোকে এমনভাবে ব্যবহার করে যা তাদের প্রশ্ন করার, স্পষ্টভাবে বলার এবং বিতর্ক করার ক্ষমতাকে বাড়িয়ে তোলে। এটা বোঝা জরুরি যে, আমরা অনেক কিছু করার চেষ্টা করতে পারলেও শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী উভয়েই মানুষ, এবং শিক্ষাকে যদি সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার না করা হয়, তবে তা নিপীড়নের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মীরা এবং আমি এখানেই ইনটারভিন করার চেষ্টা করি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা নিয়ে কথা বলতে চাই। কিছুদিন আগে আমি ও আমার বন্ধুরা নববর্ষের প্রস্তুতি দেখতে চারুকলা যাওয়ার পথে জাদুঘরের সামনে একটি চায়ের দোকানে থামলে আজাদি আন্দোলনের ব্যানারে ৭০-৮০ জন আমাদের ৮-৯ জনকে ঘিরে ধরে। এলজিবিটিকিউ হিসেবে চিহ্নিত করে আমাদের খুব খারাপভাবে মারধর করা হয়। আক্রান্তদের মধ্যে আমিসহ দুজন পরিচিত ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি ছিলেন।

জাতীয় পর্যায়ে, আমরা দেখেছি এলজিবিটিকিউ হিসেবে চিহ্নিত করে ছাত্রছাত্রীদের এমনভাবে হয়রানি করা হয় যে, তারা পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। সম্প্রতি খবর পাওয়া গেছে যে, চারজন ছাত্রছাত্রীকে হলে হেনস্তা করে গ্রেফতার করা হয়েছে। একটা কলেজে এক টমবয় ধরনের মেয়েকে উৎপীড়ন ও হয়রানি করে ট্রান্সজেন্ডার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়াই সিলেটে মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রান্স শিক্ষার্থী সাহারার বহিষ্কারের ঘটনা এবং ইউজিসির দুর্বল ফলোআপের কথাও আমরা জানি। এই শিক্ষার্থীদের সবার কী হবে?

জাতীয় পর্যায়ে, আমরা দেখেছি এলজিবিটিকিউ হিসেবে চিহ্নিত করে ছাত্রছাত্রীদের এমনভাবে হয়রানি করা হয় যে, তারা পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। সম্প্রতি খবর পাওয়া গেছে যে, চারজন ছাত্রছাত্রীকে হলে হেনস্তা করে গ্রেফতার করা হয়েছে। একটা কলেজে এক টমবয় ধরনের মেয়েকে উৎপীড়ন ও হয়রানি করে ট্রান্সজেন্ডার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়।

এরইমধ্যে অনেক শিক্ষককে এলজিবিটিকিউ, মানবাধিকার সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করে এবং সেই সূত্রে আওয়ামী দোসর হিসেবে ট্যাগিং করা হয়েছে। এই ধরনের ক্ষতিকর যুক্তি বরং আওয়ামী সরকারের নৃশংসতাকেও আড়াল করে। নারীদের অধিকার, ট্রান্স মানুষের অধিকার বা অন্য সংখ্যালঘুদের মানবাধিকারের কথা বললেই বৈরী ট্যাগিং এই প্রবণতাই ঔপনিবেশিক।

নির্ণয় ইসলাম: প্রভাষক, ব্র‍্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: nirnoyislam00@gmail.com

মারিয়া ভূঁইয়া

আমি খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বা কুয়েট ক্যাম্পাসের বিষয়ে আলোকপাত করব। ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর কুয়েট ক্যাম্পাসকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা কুরুক্ষেত্রে রূপান্তরিত করে, যা কিনা শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ আন্দোলনের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। কুয়েট এখন পর্যন্ত ৫ বার ভিসি বদল দেখেছে। মাঝে ছাত্র-শিক্ষক অনৈক্যের জন্য ৫ মাস বন্ধও ছিল। এই থেকে মোটামুটি আঁচ পাওয়া যায়, ১১০ একরের রাজনীতি নিষিদ্ধ ছোট্ট একটি ক্যাম্পাস রাজনৈতিকভাবে কতটা নাটকীয় অস্থিতিশীলতার শিকার হয়েছে। সারা দেশ তা দেখেছে। 

কুয়েট এখন পর্যন্ত ৫ বার ভিসি বদল দেখেছে। মাঝে ছাত্র-শিক্ষক অনৈক্যের জন্য ৫ মাস বন্ধও ছিল। এই থেকে মোটামুটি আঁচ পাওয়া যায়, ১১০ একরের রাজনীতি নিষিদ্ধ ছোট্ট একটি ক্যাম্পাস রাজনৈতিকভাবে কতটা নাটকীয় অস্থিতিশীলতার শিকার হয়েছে। সারা দেশ তা দেখেছে।

আরেকটু ব্যাখ্যা করতে চাই। ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর অনানুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা দখল করা প্রশাসকের মদতে ছাত্ররা প্রতিবাদ-মিছিল শুরু করে। বলে রাখা ভালো, মন্ত্রণালয় বা রাষ্ট্রপতি আনুষ্ঠানিকভাবে তৎকালীন ভিসি ড. মিহির রঞ্জন হালদারকে অপসারণের আগেই এই ছাত্রদের দিয়ে আন্দোলন করিয়ে তাকে ভিসি পদ হস্তান্তর করাতে দেখা গেছে ড. মোহাম্মদ মাছুদের কাছে। পরবর্তী সময়ে এক-দেড় মাস পর তিনি উপাচার্যের পদে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ পান। ফলে একে একে আওয়ামীপন্থি শিক্ষক-প্রশাসক-কর্মকর্তাদের অব্যাহতি প্রাপ্ত, চাকুরিচ্যুত, বা ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হয়। যা মোটামুটি সব বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের চিত্র ছিল। যা বোধগম্য। যা বোধের বাইরে তা ঘটে ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫। রাজনীতি নিষিদ্ধ ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক আধিপত্যের জবর-দখল শুরু হয় ছাত্রদল ও গুপ্তদের মধ্যে। এরই জের ধরে ক্যাম্পাসের মূল ফটকের সন্নিকটে ছাত্রদলের ফরম বিতরণকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। ১০ মিনিটের ব্যবধানে ৩০০ বহিরাগত জড়ো হয় বিভিন্ন ধারালো অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে। ক্যাম্পাসে শতাধিক ছাত্রের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়।

যারা মূলত আক্রান্ত তারা এই দুই রাজনৈতিক দলের দ্বন্দ্বের মাঝে ভুক্তভোগী। তারা অরাজনৈতিক ক্যাম্পাসের দাবিতেই মূলত অটল ছিল। তার ওপর নিজের সামনে শতাধিক সহপাঠীকে ভয়াবহভাবে রক্তাক্ত হতে দেখা, দীর্ঘ সময় ক্যাম্পাসকে বহিরাগত সন্ত্রাসী আক্রমণ থেকে নিরাপদ রাখতে প্রশাসনের ব্যর্থতা ও দায় অস্বীকার–সবার মনে গভীর ক্ষোভ সৃষ্টি করে। যেটার বহিঃপ্রকাশ ঘটে ভিসিকে আক্রমণ ও অবমাননার মাধ্যমে। ছাত্র-শিক্ষক কোন্দল এখানেই শুরু হয়, তা দীর্ঘ আন্দোলনে রূপ নেয় যখন এই প্রশাসন দ্বারা আহত ও আন্দোলন করা ছাত্ররা শিক্ষক অবমাননা করা ছাত্রদের সঙ্গে অন্যায়ভাবে বহিষ্কৃত হয়। পরবর্তী সময়ে তারাই বারবার স্থানীয় ছাত্রদলের আক্রমণের শিকার হয়েছে, মিথ্যা চেইন চুরির মামলায় দায়ী হয়। ছাত্রদের আন্দোলন তীব্র হয়।

ভিসি ড. মুহাম্মদ মাছুদ স্যারকে ছাত্রদের আমরণ অনশনের মুখে ২০২৫-এর ২৬ এপ্রিল অব্যাহতি দেয় ইন্টেরিম সরকার, দায়িত্বে পাঠানো হয় ভিসি ড. হযরত আলী স্যারকে। তিনি শিক্ষক সমিতির অসহযোগিতা ও চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন ১৯ দিনের মাথায়। পরবর্তী ভিসি, ড. মাকসুদ হেলালী স্যার ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করে সার্বিক অচল অবস্থা নিরসনে সফল হয়েছিলেন, সব প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে তাকে অপসারণ করে ভিসি হিসেবে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ড. মোহাম্মদ মাছুদ স্যারকে পুনরায় ভিসি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

কুয়েটে পাঁচ মাস যে অচল অবস্থা বিরাজ করেছে তা শিক্ষক সমিতির সঙ্গে আন্দোলন করা ছাত্রদের বিরোধী অবস্থানের জেরে হয়েছে। সমিতির মুখপাত্ররা বরাবরই ছাত্রদের ওপর নৃশংস হামলার কথা বিভিন্নভাবে অস্বীকার করে ছাত্রদের আরও খেপিয়ে দেয়। তারা ভিসি মাসুদ ছাড়া অন্য কাউকে প্রশাসনিক পদে বহাল না রাখতে খোলাখুলিভাবে বদ্ধপরিকর ছিল। উল্লেখ্য, একই সদস্য সংবলিত শিক্ষক সমিতি ২০০৭/৮-এর দিকে চার মাস কুয়েট ক্যাম্পাস অচল করে রেখেছিল।

আগে যারা নিজেদের ‘অরাজনৈতিক’ দাবি করতেন, এখন তারাই খোলাখুলি রাজনৈতিকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেন। এখন তারাই ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের রাজনীতি তথা আগের ছাত্রলীগের মতো হল দখলের পথ প্রশস্ত করতে বদ্ধপরিকর। বর্তমানে ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের দুই পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব-রেষারেষির ঘটনা প্রায়ই ঘটতে দেখা যাচ্ছে। 

এক কথায় বলা যায়, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য আমরা পুনরায় ফেরত পেয়েছি বা পেতে যাচ্ছি। 

মারিয়া ভূঁইয়া: সহকারী অধ্যাপক, মানবিক ও ব্যবসায় বিভাগ, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: mariabhuiyan@ymail.com

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •