বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা: বিশ্বব্যাংকের প্রভাব, ইউজিসির ভূমিকা এবং বিদ্যাকর্মীর অস্তিত্ব

মানস চৌধুরী

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা: বিশ্বব্যাংকের প্রভাব, ইউজিসির ভূমিকা এবং বিদ্যাকর্মীর অস্তিত্ব

বাংলাদেশের পাবলিক বা সর্বজন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন পুরোপুরি বিশ্বব্যাংকের থাবার মধ্যে। এই থাবার কাজ বাস্তবায়ন সমন্বয় করছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন।  বাংলাদেশের মানুষ জানেনও না কীভাবে তাদের প্রতিষ্ঠান কাঠামো, বিদ্যাচর্চার সীমা, প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিকীকরণ এবং শিক্ষকদের রূপান্তর ঘটে যাচ্ছে। এসব বিষয়ের সূত্র ধরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও লেখক মানস চৌধুরী বিদ্যায়তনিক জগতে পুঁজিবাদী প্রবণতা, বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা, নিউলিবারেল রাষ্ট্রীয় মতাদর্শ, অগণতান্ত্রিক শিক্ষাগত দর্শন, বিদ্যা বিষয়ক গ্রান্ট মেকিং পলিসি, প্রকাশনার দুনিয়ায় চালিয়াতি আর অলিগোপালি নিয়ে কথা বলেছেন। প্রায় এক মাসে পাঁচদিন ধরে নেয়া এই সাক্ষাৎকারটি সম্পন্ন হয়েছে গুগল ডকের মাধ্যমে ভার্চুয়াল জগতে প্রশ্ন ও উত্তর বিনিময়ের মধ্য দিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মারজিয়া প্রভা।

মারজিয়া প্রভা: সম্প্রতি দেশরূপান্তরে আপনার প্রকাশিত ‘শিক্ষাবিদগণে আমি সদাই প্রণমি’ লেখা থেকে আজকের এই সাক্ষাৎকার গ্রহণে আমার আগ্রহের ভিত্তি। আমি বিদ্যাজগতের ব্যক্তি নই, কিন্তু বিশ্বব্যাংক যখন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে মাথা ঘামায়, তখন তাতে আমার প্রশ্ন তৈরি হয় সঙ্গত কারণেই। আপনার কাছ থেকে প্রথমেই উচ্চশিক্ষায় ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ফান্ডেড প্রকল্পগুলো নিয়ে জানতে চাই এবং সেই সাথে ইউজিসির ভূমিকাও। 

মানস চৌধুরী: আপনাকে ধন্যবাদ। বিশ্বব্যাংকের জ্যান্ত ও প্রকাশ্য প্রকল্পগুলোই কেবল জানা যায়। তাও সেটা সংশ্লিষ্ট কেউ আগ্রহী হলেই। নাহলে এসব প্রকল্প এমন নর্ম্যালাইজড হয়ে আছে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে দিনের পর দিন কাটিয়েও আপনার মনে না পড়তে পারে যে এগুলো চলছে। আমি সকল-সময়ে-সরকারের-অনুগামী শিক্ষকদের কথা বাদই দিচ্ছি। যে বর্গটার পরিচয় ‘ক্রিটিক্যাল’ বা সমালোচনামনস্ক তাঁদের কাজকর্ম-চলাফেরাতেও আমার বিশেষ মনে হতো না যে দুর্ভাবনাগুলো প্রকাশিত হচ্ছে। আমি আজকে অন্তত ধরে নিতে রাজি আছি যে সেটা আমার দেখার ব্যর্থতা। তবে তার আগে একটা বিষয়ে বলে নিই। আমার ওই রচনাটা নানান মাত্রার অপেক্ষার পরের রচনা। রাজনীতিতে অপেক্ষা চলে। এমনকি অপেক্ষা করা, ঘাপটি-মেরে-থাকা, ইত্যাদিকে সাধারণভাবেই আমি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অত্যাবশ্যক সব প্রস্তুতি হিসেবে দেখি। অন্যদিকে, আমরা রাজনীতি নিয়ে ভাবলেও পরিশেষে রাজনীতিক নই, আমরা চাকরিজীবী। আমাদের অপেক্ষার বৈশিষ্ট্য আবার সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। আমরা কেবল মওকার অপেক্ষা করি না। আমরা অপেক্ষা করি কণ্ঠস্বর দানা-বাঁধবার, সঠিক কণ্ঠস্বরের সঠিক জায়গাটা নেবার। ইত্যাদি। বাস্তবে, নানান মাত্রার অপেক্ষার পরও সেই কাজগুলো করা যাচ্ছিল না, সেই আওয়াজগুলো তোলা যাচ্ছিল না। এই মৃদু ছোট রচনাকে দেখতে হবে সেই অসহায়বোধের একটা আশু-উপশম হিসেবে। 

বিশ্বব্যাংকের জ্যান্ত ও প্রকাশ্য প্রকল্পগুলোই কেবল জানা যায়। তাও সেটা সংশ্লিষ্ট কেউ আগ্রহী হলেই। নাহলে এসব প্রকল্প এমন নর্ম্যালাইজড হয়ে আছে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে দিনের পর দিন কাটিয়েও আপনার মনে না পড়তে পারে যে এগুলো চলছে।

বিশ্বব্যাংকের ফান্ডেড প্রকল্প হিসাব করবার জটিলতা আছে। রচনাটিতেও সেই প্রসঙ্গে আমি কথা বলেছি। প্রথমত, এই ফান্ড হলো ঋণ। পরিষ্কার সুদে-নেওয়া ঋণ। দ্বিতীয়ত, প্রকল্পে সরকারের অংশগ্রহণ আছে। এটা বর্তমানে অত্যন্ত পরিচিত ভাষামালা পিপিপি বা পাবলিক-প্রাইভেট-পার্টনারশিপের সমান্তরালে দেখার সুযোগ আছে। যেভাবে বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পগুলো প্রণীত হয়েছে, তাতে আপনি হৈহৈ করে ‘চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে’ বলেও পার পাবেন না। বাংলাদেশের সরকার ও বিবিধ দপ্তরের পরিচালকবর্গের পর্যাপ্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েও এগুলো হয়েছে। সেসব দপ্তরের পরিচালকবৃন্দ আবার নিছকই আমলা নন। তাঁরাও পর্যাপ্তহারে শিক্ষাবিদদের সাথে-নিয়ে-আগিয়েছিলেন। সব মিলে, আত্মদংশনের সব উদাহরণ হবে। 

এই মুহূর্তে, চালু প্রকল্প অন্তত দুটো হিট (HEAT – Higher Education Acceleration and Transformation) এবং ICSETEP (Improving Computer and Software Engineering Tertiary Education Project)। দ্বিতীয়টা তো নামেই স্পষ্ট যে এটার টার্গেট শাস্ত্র-এলাকা কী। প্রথমটা হলো উচ্চশিক্ষা ত্বরান্বিতকরণের একটা চার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প। এই ত্বরান্বিতকরণটা আবার হেকেপ (HEQEP – Higher Education Quality Enhancement Project) নামের প্রকল্পের ল্যাজ হিসেবে বিকশিত হয়েছিল। যদিও হেকেপ শুরু হয় ২০০৮/৯ সালে (সনটা স্পষ্ট হওয়া সম্ভব নয় এর চরিত্রের কারণেই), এবং সেটা ২০ বছরের প্রকল্প হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছিল। ২০১৮তে আসতেই ইউজিসি ঘোষণা দেয় যে এটা শেষ হয়ে গেছে। তারা নতুন প্রকল্প আমদানি করলেন। শেষ হবার কারণ টাকা শেষ হয়ে যাওয়া। ওদিকে হেকেপ বিকশিত করবার জন্য একটা ‘স্টাডি ফেইজ’ ছিল। সেটার নাম ছিল ‘উচ্চশিক্ষার কৌশলগত পরিকল্পনা’ বা SPHE (Strategic Plan for Higher Education)। এই পর্যায়ে বা ফেইজেই হেকেপ চালু করবার যুক্তিভিত্তি সরবরাহ করা হয়। তারও আগে বিশ্বব্যাংকের একটা জেনেরিক কাজ ছিল। জেনেরিক বলতে, ওদের ভাষায় ‘উন্নয়নশীল’ কয়েকটা দেশের (উচ্চ)শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তারা দুশ্চিন্তিত হয়ে ‘পেরিল এন্ড প্রমিজ’ নামে একটা পরিপত্র প্রকাশ করে (Higher education in developing countries : peril and promise)। 

এই মুহূর্তে, চালু প্রকল্প অন্তত দুটো হিট (HEAT – Higher Education Acceleration and Transformation) এবং ICSETEP (Improving Computer and Software Engineering Tertiary Education Project)। দ্বিতীয়টা তো নামেই স্পষ্ট যে এটার টার্গেট শাস্ত্র-এলাকা কী। প্রথমটা হলো উচ্চশিক্ষা ত্বরান্বিতকরণের একটা চার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প। এই ত্বরান্বিতকরণটা আবার হেকেপ (HEQEP – Higher Education Quality Enhancement Project) নামের প্রকল্পের ল্যাজ হিসেবে বিকশিত হয়েছিল।

বলা বাহুল্য, বাংলাদেশকে ‘গুরুত্ব’ দিয়ে মানহীন শিক্ষার কাতারে রাখা হয়েছিল। সেটাকে দেখতে হবে তাহলে আরও আগের সূচনাবিন্দু হিসেবে। এর সবটাই কিন্তু উচ্চশিক্ষা বা টারশিয়ারি এডুকেশন নিয়ে কথা হচ্ছে। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে সমধরনের মাথাব্যথা, পরামর্শ ও প্রকল্পের খোঁজ পাওয়া যাবে। 

মারজিয়া প্রভা: আমরা যারা রাজনৈতিক কর্মী আমরা আমাদের পাঠ ও সংগ্রাম দিয়েই বুঝি যে বিশ্বব্যাংকের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এত ‘উন্নয়ন’ করার আকাঙ্ক্ষা কেন? সেই জায়গা থেকেই জিজ্ঞেস করছি, একাডেমিক জগতে যারা ক্রিটিকালি এইসব ঋণ নির্ভর অর্থনীতির ফাঁক নিয়ে বোঝেন ও জানেন, তারাও কেন শিক্ষাক্ষেত্রে এই বিশ্বব্যাংক প্রকল্পগুলো নিয়ে বিস্তর পর্যালোচনা করেননি? নাকি করা হয়েছে আমি জানি না। যদি আসলেই কম পর্যালোচনা হয়ে থাকে তাহলে দেখাদেখির এই অনীহাটা কেন?

মানস চৌধুরী: বিশ্বব্যাংক নিয়ে গড়গড়া বা জেনেরিক সমালোচনা যে আছে তা তো আপনি জানেনই। জেনেরিক সকল অর্থেই। একে সাধারণ্যে ভাবাই হয় বামপন্থীদের মুখস্ত কথাবার্তা হিসেবে। আবার সমালোচনাটাও খাত ধরে-ধরে, অনুবর্তী ক্ষয়ক্ষতির পর্যালোচনা সমেত সবসময়ে যে বামপন্থীরা করে থাকেননি তাও সত্য। সেই অর্থেই বললাম জেনেরিক বা গড়গড়া। কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে, বিশেষে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের ম্যানিপ্যুলেটিভ/চালিয়াতিমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে যেরকম বিশদ পর্যালোচনা দরকার ছিল তা অবশ্যই হয়নি। যে ধরনের শক্তপোক্ত প্রতিরোধ হবার কথা ছিল তা অবশ্যই গড়ে-তুলবার চেষ্টা হয়নি। এই প্রশ্নটিতে ঢুকবার জন্য আমি তিন ধরনের চরিত্র বা প্রসঙ্গসূত্র হাজির করতে চাই। বিশ্বব্যাংকের এই কর্তৃত্বপরায়ণতা, চালিয়াতি, মানদণ্ড নিরূপণের একচ্ছত্র-একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি, সুপারিশমালাতে সম্ভাব্য দেশজ-শিক্ষাদর্শনকে বিবেচনায় না আনা এবং সর্বোপরি, আশঙ্কার কথা যা আগেও বলেছি, এসবে দেশীয় চিন্তাবিদ ও প্রশাসকদের নিবিড়ভাবে অংশগ্রহণ সবই অত্যন্ত প্যাঁচানোভাবে একই সাথে ঘটে চলেছে। 

শিক্ষাক্ষেত্রে, বিশেষে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের ম্যানিপ্যুলেটিভ/চালিয়াতিমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে যেরকম বিশদ পর্যালোচনা দরকার ছিল তা অবশ্যই হয়নি। যে ধরনের শক্তপোক্ত প্রতিরোধ হবার কথা ছিল তা অবশ্যই গড়ে-তুলবার চেষ্টা হয়নি।

বিশ্বব্যাংকের ভূমিকাকে বুঝবার জন্য তিনটা চরিত্র বা প্রসঙ্গসূত্রের কথা বলছিলাম। সেগুলো হচ্ছে: কর্তৃত্বের সোপান বা হায়ারার্কিগত প্রসঙ্গ; আর্থিক দুর্নীতি-অনিয়মের প্রসঙ্গ; এবং শিক্ষাদর্শন বা পেডাগোজিক্যাল প্রসঙ্গ। একেবারে মিলেমিশে থাকা সত্ত্বেও এভাবে যে আলাদা করে নিলাম সেটা আমার দিক যথেষ্ট কারণ আছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়ে আলাপেই দুর্নীতি-অনিয়মের প্রসঙ্গ কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে। কখনো কখনো অদক্ষতার প্রসঙ্গও আপনি পেতে পারেন যাকে অনিয়মের মধ্যেই হয়তো ফেলা যাবে। প্রায় যে-কোনো আলাপেই দুর্নীতি কেন্দ্রীয় জায়গা নিয়ে নিলে দর্শনসংক্রান্ত আলাপসূত্র আনাই সম্ভব নয়। দুর্নীতি মানেও হচ্ছে আর্থিক অনাচার, তথা টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে কিনা, প্রকল্পব্যয় যথাযথ অডিটেড কিনা এসবই মোটামুটি ঘুরে ফিরে আসতে থাকবে। সব মিলে, কিছুতেই আপনি শিক্ষাদর্শনের যে জায়গাগুলোতে ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে সেখানে আলাপ শুরুই করতে পারবেন কিনা সন্দেহ। আমার বক্তব্য এই নয় যে, উচ্চশিক্ষায় বিশ্বব্যাংকের প্রভাব নিয়ে তথাকথিত পর্যালোচনাতে আর্থিক দুর্নীতি আলোচিত হচ্ছে। মানে, হিট বা হেকেপের আর্থিক দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি হয়নি সেই বিষয়ে আমার মন্তব্য নয় এটা। আমি সাধারণভাবেই পর্যালোচনাহীন পরিবেশে এমনকি আলাপ-সূত্রপাতেরও অসুবিধাগুলোর কথা বলছি। সর্বোপরি, অনীহা আছে। একটা স্থিতাবস্থার মধ্যে নতুন ধরনের প্রতিরোধী বা বিপ্রতীপ প্রসঙ্গ বা যুক্তি তুলবার লোক বিপজ্জনকভাবে কম। 

দুর্নীতি মানেও হচ্ছে আর্থিক অনাচার, তথা টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে কিনা, প্রকল্পব্যয় যথাযথ অডিটেড কিনা এসবই মোটামুটি ঘুরে ফিরে আসতে থাকবে। সব মিলে, কিছুতেই আপনি শিক্ষাদর্শনের যে জায়গাগুলোতে ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে সেখানে আলাপ শুরুই করতে পারবেন কিনা সন্দেহ।

২০০৩ বা ২০০৪ সালের কথা, স্পষ্ট মনে নেই। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিস চৌধুরী বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে একটা চিঠি পাঠান। সেই চিঠিতে তিনি পরামর্শ দেন (বা মতান্তরে, অনুরোধ করেন) যেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষাদানের ভাষামাধ্যম হিসেবে ইংরেজিকে ক্রমাগত বাড়ানো হতে থাকে। হারিস চৌধুরী আসলে অনুরোধ করেছিলেন নাকি পরামর্শ দিয়েছিলেন নাকি হুকুম করেছিলেন এ নিয়ে আমার মাথাব্যথা কম। এমনকি তখনও আমি তাঁর চিঠির স্বরপরীক্ষা করবার মুডে ছিলাম না। অনেকটা শেখ হাসিনার শেষের দিকে শিক্ষকদের ‘তুই-তোকারি’ বলেছিলেন কিনা সেই তর্কটার মতই অকেজো একটা ভেদবিচার বলতে পারেন। প্রসঙ্গ হবার দরকার ছিল অন্তত দুইটা: হারিস চৌধুরীর কর্তৃত্ব ও ঔদ্ধত্য। এবং, এই পরামর্শ/হুকুম/অনুরোধের প্রাসঙ্গিকতা। 

দেখুন, শিক্ষাদানের ভাষামাধ্যমের বিষয়ে আমার সুস্পষ্ট পক্ষপাত আছে। আমার পরিচিতরা জানেন যে আমি বাংলায় শিক্ষাদানের পক্ষে। সেটা আমি ইংরাজি কম পারি বলেই কেবল নয়, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশে লিখিত-সুপারিশকৃত আছে বলেই নয়, বরং, আমি এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল চিন্তায় তালিম দেবার জন্য এই অঞ্চলের ভাষাপ্রয়োগের উপযোগিতাকে দেখতে পাই বলে। কিন্তু বিষয়টা আমি কী চাই তার নয়, বরং দরকার হলে সকলের সাথে আমিও নতুন নীতিপ্রণয়নের জন্য বসতে সম্মত আছি, তখনও সম্মত ছিলাম। যদি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দ্বিভাষিক বন্দোবস্ত চালু হতো, একদম দুইটা স্ট্রিমে, তাতেও আমি পরিশ্রম বাড়াতে আগ্রহী ছিলাম। প্রসঙ্গটা হলো, কেন, কীভাবে এবং কোন পরিপ্রেক্ষিতে হারিস চৌধুরী ভাবলেন এরকম একটা চিঠি তিনি ভিসিদের পাঠাতে পারেন। আমি তাঁর চিঠিটাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখি না। তখনও দেখিনি। বিশেষত, পরে যখন বিশ্বব্যাংকের ভূমিকার একটা ধারাবাহিক পাঠ নেবার চেষ্টা করেছি, তখন তো বিচ্ছিন্ন ভাববার সুযোগই নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষসমূহ হারিস চৌধুরীকে তাঁর ‘পেশাসীমানা’ মনে করিয়ে দিতে পারতেন। তা করেননি। জাহাঙ্গীরনগরের উপাচার্যও করেননি। কানে এসেছিল যে, কেবল রাজশাহীর উপাচার্য ওই ধৃষ্টতার উত্তরে কিছু মানানসই দৃঢ়তা দেখিয়েছিলেন। বাস্তবে তিনি কী করেছিলেন তা আমার জানা নেই, কিংবা মনে নেই। তবে এই অধ্যায়টা নিয়ে উপাচার্যবৃন্দ বা বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ভূমিকা প্রসঙ্গে আমার জানাশোনায় ভুল থাকলে অবশ্যই আশা করব কোনো পাঠক তা ধরিয়ে দেবেন। 

এই ঘটনাটাও উল্লেখ করলাম সাধারণভাবেই অনীহা বোঝাতে। হারিস চৌধুরী নিছক একটা উদাহরণ মাত্র। উত্তরকালের বাংলাদেশে, শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে, আমলা-মন্ত্রী-আওয়ামী নেতৃবৃন্দ এবং খোদ প্রধানমন্ত্রী লাগাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদানাশক সব কথাবার্তা বলতে থেকেছিলেন। শিক্ষক-সমাজের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া ভীষণ দুর্বল ছিল, যদি আদৌ কিছু খুঁজে পান। আপনি বরং খুঁজে পাবেন কীভাবে আমলাদের সাথে হাস্যকর পদমর্যাদার তুলনা করেছেন শিক্ষকনেতৃবৃন্দ, কিংবা বেতন বাড়ানোর দাবিকে কীভাবে তাঁরা তোয়াজ-তদ্বিরের রাস্তায় নিয়ে গেছেন। বলতে চাইছি, এই অনীহাটার ব্যাকরণ বোঝা আমাদের দরকার। সেটা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্বব্যাংকের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের তথা শিক্ষক-সম্প্রদায়ের সম্পর্কেই সীমিত নয় কেবল, বরং নানান কিছুতে আত্মমর্যাদানাশক, কর্তব্যবোধরহিত, দার্শনিক গভীরতাহীন, পেডাগোজিক্যাল মীমাংসার অভাবী কর্মকাণ্ড দেখতে পারা যাবে। দেখে আসছি। উদাহরণটা মর্যাদাহীন হায়ারার্কির যেমন, তেমনি শিক্ষাদার্শনিক প্রসঙ্গে শিক্ষকদের বোঝাপড়ার অভাবেরও। 

আপনি বরং খুঁজে পাবেন কীভাবে আমলাদের সাথে হাস্যকর পদমর্যাদার তুলনা করেছেন শিক্ষকনেতৃবৃন্দ, কিংবা বেতন বাড়ানোর দাবিকে কীভাবে তাঁরা তোয়াজ-তদ্বিরের রাস্তায় নিয়ে গেছেন।

মারজিয়া প্রভা: আপনি শিক্ষাদর্শন বা পেডাগোজিক্যাল সংকটের কথা বলছেন। হারিস চৌধুরীর শিক্ষাদানের মাধ্যম হিসাবে ইংরেজি ভাষাকে প্রচলন করার যে অনুরোধ বা হুকুম সেইটি একটি উদাহরণ। একটু নির্দিষ্ট করে বলবেন কি—বিশ্বব্যাংকধর্মী প্রকল্পগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান উৎপাদনের ক্ষেত্র কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করে? 

মানস চৌধুরী: হারিস চৌধুরীর চিঠিটাকে একটা রূপক বা লক্ষণ হিসেবেই দেখছি আমি। যে অপরাধ তিনি করেননি তাঁর দায় তাঁকে দেব না। একটা সর্বব্যাপী দার্শনিক-সাংগঠনিক নতজানু দুর্দশার একটা উপসর্গ হিসেবেই দেখছি তাঁর ওই হুকুমপত্রটিকে। অন্তত তিনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, যদি নিয়ন্ত্রণ শব্দটাই ব্যবহার করতে চাই। নিয়ন্ত্রণ শব্দটার অর্থকল্পনার মধ্যে ইংরেজি ম্যানিপ্যুলেশনের অর্থটাও ভরে দিতে চাই এক্ষেত্রে আমি। কিন্তু বাংলায় ‘নিয়ন্ত্রণ’ কথাটার অত স্পষ্ট দ্যোতনা নেই। তবে বাংলায় ‘কারসাজি’ বা ‘চালিয়াতি’ শব্দ দিয়ে হয়তো কাছাকাছি কিছু বলবার সুযোগ থাকে। সারাংশে, নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াটিকে একটা সুগভীর-বিস্তৃত-মনস্তাত্ত্বিক-জাল অবধি ভাবতে পারলে এই শব্দে কাজ চালানো যেতে পারে। তবে গোড়াতেই আমি স্পষ্ট থাকতে চাই যে প্রকল্পগুলো খোদ নিয়ন্ত্রণের জন্য পরিচালিত প্রকল্প নয়। বরং বেশ নিরীহ চেহারার সাধারণ স্টাডি-প্রকল্প বা বাস্তবায়ন-প্রকল্প যাতে পয়সাপাতি খরচ করে-করে কিছু একটা হাসিল করার উদ্যোগ নেয়া হয়। প্রকল্পে বড়জোর আপনি দুটা-চারটা তথাকথিত অনিয়ম-অনাচারের দোষই কেবল খুঁজে পাবেন। সমস্যাটা হচ্ছে প্রকল্পগুলো যে প্রিমাইজ/তর্কপ্রস্তাব বা হাইপোথেসিস/অনুকল্প বা পারসেপশন/বোঝাবুঝির উপর দাঁড়ানো তা নিয়ে।

এই প্রকল্পসমূহের (এর ইনসেপশন/অনুধাবনসমেত) প্রারম্ভিক নিয়ন্ত্রণকারী এবং নিয়ন্ত্রণকামী বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নিখিল বিশ্বের জন্য সর্বজনীন প্রমিতকরণ বা ইউনিভার্সাল স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন। সর্বঘটে কাঁঠালি কলা। একটা প্রতিষ্ঠান বা একটা প্রক্রিয়া চাইছে উগাণ্ডা থেকে উরুগুয়ে, ইন্দোনেশিয়া থেকে ইতালি, বলিভিয়া থেকে ব্রিটেন, কেনিয়া থেকে কানাডা সব জায়গায় শিক্ষার মানদণ্ড থাকবে অখণ্ড-অটুট। এই চিন্তা থেকে মফস্বলের ক্রীড়াশিক্ষকও স্মার্ট থাকেন। তিনিও অন্তত ৪৫ কেজির বাচ্চাকে ২৫ কেজির বাচ্চার সাথে কুস্তি লড়তে দেন না। এই চাওয়া নিছক আশাবাদে কিংবা বিমূর্ত কিছু মূল্যায়নেই সীমিত থাকেনি। এগুলোর গাণিতিক সব অনুবাদ হয়েছে, সেগুলোকে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সরকারের জন্য অবশ্যপালনীয় কর্তব্য সাব্যস্ত করা হয়েছে। অতি অবশ্যই স্বীয় স্বীয় রাষ্ট্রের কর্ণধারদের নতজানু নীতি এবং আহাম্মুকির উপর ভরসা করেই তা করা হয়েছে। উৎকর্ষ বা এক্সেলেন্সের ধারণাগুলোকে সরল-স্থূলভাবে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। আর এই প্রক্রিয়ায় একাডেমিক প্রকাশনাসংস্থা আর গবেষণাতে অনুদান দেবার কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে অমিত শক্তির সব নির্ধারক বানানো হয়েছে। 

এর মাধ্যমে বিভিন্ন রাষ্ট্রসমাজের নিজস্ব জ্ঞানজগতের ভেদাভেদকেই কেবল অস্বীকার করা হয়নি, বরং বিভিন্ন শাস্ত্রের মধ্যকার অনুশীলন ভিন্নতাকেও পুরোদস্তুর গায়েব করে দেয়া হয়েছে। কঠোর বিজ্ঞান আর বাণিজ্য অধ্যয়ন শাস্ত্রগুলোর বিকাশ এবং লিবারেল পাঠ এবং সমাজ-সংস্কৃতি অনুশীলনের শাস্ত্রসমূহের বিকাশ গুরুতরভাবে আলাদা। সেই ভেদকে উধাও করে এসব মানদণ্ড প্রণীত হয়েছে। এই অনাচার কেবল গুণগত বা ব্যাখ্যা ও বিবরণীমূলক শাস্ত্রসমূহকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, ঠাণ্ডা মাথায় বিবেচনা করলে কঠোর বিজ্ঞানের জগতের মধ্যেও ধ্রুপদী বিজ্ঞানের সাথে ফলিত বিজ্ঞানের শাস্ত্রগুলোর উদ্ভট পাল্লাপাল্লির সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

কঠোর বিজ্ঞান আর বাণিজ্য অধ্যয়ন শাস্ত্রগুলোর বিকাশ এবং লিবারেল পাঠ এবং সমাজ-সংস্কৃতি অনুশীলনের শাস্ত্রসমূহের বিকাশ গুরুতরভাবে আলাদা। সেই ভেদকে উধাও করে এসব মানদণ্ড প্রণীত হয়েছে।

একটা অদ্ভুত গল্প শোনাই বরং। বাংলাদেশ ভারতের ভিসা সম্পর্ক নিয়ে টানাপড়েনের আগ পর্যন্ত গত এক দশকে কয়েকবার জানা গেছে যে, বাস ভরে ভরে বাংলা সাহিত্যের কিংবা কিছু ললিতকলার শিক্ষক পশ্চিম বাংলা থেকে বাংলাদেশের কোনো না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সেমিনার করতে’ আসছেন। বাংলাদেশে এরকম সেমিনার আয়োজক কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ও আমার মনোযোগে এসেছিল। বাংলাদেশে ভারতের বিদ্যাকর্মীরা সেমিনার করতে আসছেন, তাও প্রায় পিকনিকের মত করে, এতে হয়তো আমার গর্বিত হওয়াই উচিত ছিল। কিন্তু এই উদ্যোগগুলোর কিছু একটা ছিল যা আমাকে কৌতূহলী করে তোলে। আমি বুঝতে চেষ্টা করলাম। ঘটনা হলো, বিশ্বব্যাংকের এই ওয়ান-সাইজ-ফিটস-অল একাডেমিক-এক্সেলেন্স দাওয়াই ভারতের ইউজিসি খেয়ে ফেলবার কারণে সকল শাস্ত্রের শিক্ষকদের জন্যই ‘আন্তর্জাতিক’ কনফারেন্সে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক জার্নালে রচনা প্রকাশকে পদোন্নতির অত্যাবশ্যক শর্ত বানিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন পশ্চিম বাংলার কোনো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক ‘আন্তর্জাতিক’ সম্মেলন আর ‘আন্তর্জাতিক’ প্রকাশনা করবেন কীভাবে বা কোথায়! সকলেই তো আর মরহুম আনিসুজ্জমান কিংবা পবিত্র সরকারের মত প্রফাইল ধারণ করেন না (এটুকু বলার মাধ্যমে আমি তাঁদের পাণ্ডিত্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছি না, বরং তাঁদের উচ্চকিত আন্তর্জাতিক কানেকশন সৃষ্টি করতে পারার সামর্থ্যকে নির্দেশ করছি কেবল)। এই নিয়মটাকে বাস্তবিক অনুকূলে ব্যবহার করবার জন্য এক ধরনের সম্পর্ক তৈরি করলেন কিছু উদ্যোক্তা। তাঁরা বাংলাদেশকে ‘আন্তর্জাতিক’ সাব্যস্ত করে, স্থানীয় হোস্টদের উদ্যোগ খরচের প্রায় পুরোটাই জোগান দিয়ে কিছুমিছুর আয়োজন করেছিলেন। অস্বীকার করা যাবে না যে, ভারতে বসে এদিক-ওদিক তাকালে বাংলাদেশ অবশ্যই একটা ‘আন্তর্জাতিক’ এলাকা। এটাও অস্বীকার করা যাবে না যে, সড়ক পথে কম খরচে বাংলাদেশে আসা যায়; এবং মোটামুটি কম খরচে সড়ক পথে নেপাল, ভূটান বা মিয়ানমারে যদি যাওয়াও যায়, পশ্চিম বাংলার বাংলা সাহিত্যের শিক্ষকদের পক্ষে ওসব দেশে প্রাসঙ্গিক একটা সেমিনার করতে যাওয়া অসম্ভবপ্রায়। এই উদাহরণটাতে (ঘটনা একটা নয়, গড় একটা কাহিনিতে বলা হলো) কৌতুক বোধ না করবার উপায় নেই। কিন্তু উদাহরণটা পর্যাপ্ত বিষাদেরও। ইউনিভার্সাল স্ট্যান্ডার্ডাইজেশনের ক্ষতিটার পাশাপাশি নেগেশন বা নেতিকরণ বা লঘুকরণের ক্ষতির কথা বলতে চেয়েছি। যেটা আপনার প্রশ্নের নিরীখে বললে দ্বিতীয় নিয়ন্ত্রণ। আগের অংশের আলাপেই বিবিধ শাস্ত্রের মধ্যকার, বিভিন্ন অঞ্চলের ভূমিজ জ্ঞানপ্রবাহের নেতিকরণের প্রসঙ্গ এসেছে।

বিশ্বব্যাংকের এই ওয়ান-সাইজ-ফিটস-অল একাডেমিক-এক্সেলেন্স দাওয়াই ভারতের ইউজিসি খেয়ে ফেলবার কারণে সকল শাস্ত্রের শিক্ষকদের জন্যই ‘আন্তর্জাতিক’ কনফারেন্সে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক জার্নালে রচনা প্রকাশকে পদোন্নতির অত্যাবশ্যক শর্ত বানিয়ে দেয়া হয়েছে।

আপাতত আর বিশদ না করে বরং তৃতীয়, সম্ভবত সবচেয়ে ভয়াবহ, নিয়ন্ত্রণটার কথা বলতে পারি। সেটাকে মনস্তাত্ত্বিক বলা চলে। হীনমন্যতার বোধে শিক্ষাকর্মীদের আক্রান্ত করতে থাকা। আমার কোনো কোনো আলাপে আমি এটাকে ‘ইনসিক্যুরিটি ইনজেক্টিং’ বলে থাকি। ওই যে, ইংরাজি পদমালাতে বললে যদি আরেকটু ভারী শোনায় বা আরেকটু মনোযোগ দিয়ে সহকর্মীরা গ্রহণ করেন সেই আশায় আরকি! টয়লেট্রিজ বা প্রসাধনীর বাণিজ্যজগত এই পদ্ধতিতে বিপণন করে থাকে। অর্থাৎ, সম্ভাব্য খরিদকারীকে প্রথমে পর্যাপ্তভাবে নিজরূপ বিষয়ে সংশয়ী করে তুলতে পারে এসব বিজ্ঞাপন, পরে সম্ভাব্য রূপবান-রূপবতী হবার লোভকে সজীব করে তুলতে পারে। তারপর অবশ্যই একটা নির্দিষ্ট বিউটি-প্রডাক্ট কিনতে তিনি ব্রতী হবেন। কিন্তু মোটের উপর তাঁর জীবন কাটবে রূপসংশয়ী থেকেই। একটা নার্ভাস-নিরুপায়-মরিয়া জীবন। জীবনবীমা কোম্পানিগুলোও মোটাদাগে এই নার্ভাসকরণ প্রক্রিয়া অবলম্বন করে থাকে। সমকালীন পুঁজিবাদে এরকম আরও কিছু পরিক্ষেত্র বের করা সম্ভব। কিন্তু অস্বীকার করব না যে, অল্পবয়সে যত খারাপ শিক্ষক দেখার অভিজ্ঞতাই থাকুক না কেন, দল বেঁধে, গুষ্টিসুদ্ধা, তামাম শিক্ষকপ্রজাতি মরিয়া হয়ে নিজেদের ‘এক্সেলেন্স’ প্রদর্শনের কুস্তি লড়তে নামবেন এই সর্বাত্মক দুর্দশার আশঙ্কা আমি আগে করিনি। আমি শিক্ষকতার শুরুর কাল থেকেই নানান আসর-আড্ডাতে শিক্ষকদের মনোজগত বদলে দিতে বিবিধ প্রতিষ্ঠান কীভাবে কাজ করছে তা বলতাম। তারপরও, এই মুহূর্তের অনিশ্চয়তাবোধ, নিরাপত্তহীনতা, সাইটেশনকাতরতা, ইমপ্যাক্টজার্নালের জন্য পাগল-বেশে-ঘুরে-বেড়ানো, কিংবা প্রকাশ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে সাইবারে নিজের নতুন মুকুটের প্রজ্ঞাপন—এসব এই মাত্রায় কল্পনা করা আমার পক্ষেও সম্ভব হয়নি। একটা সর্বগ্রাসী ফল-উদ্বিগ্ন, সাফল্যকাতর, মানদণ্ডপূজারী, যশোলোভী বাতিকগ্রস্ত পেশাজীবী হিসেবে শিক্ষকদের বানিয়ে-ফেলতে-পারা সবচেয়ে ভয়ানক ক্ষতি। সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রণ। বিশেষত নিখিল দক্ষিণের সমাজগুলোতে। 

টয়লেট্রিজ বা প্রসাধনীর বাণিজ্যজগত এই পদ্ধতিতে বিপণন করে থাকে। অর্থাৎ, সম্ভাব্য খরিদকারীকে প্রথমে পর্যাপ্তভাবে নিজরূপ বিষয়ে সংশয়ী করে তুলতে পারে এসব বিজ্ঞাপন, পরে সম্ভাব্য রূপবান-রূপবতী হবার লোভকে সজীব করে তুলতে পারে। তারপর অবশ্যই একটা নির্দিষ্ট বিউটি-প্রডাক্ট কিনতে তিনি ব্রতী হবেন।

মারজিয়া প্রভা: বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে এনজিও সেক্টর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে—গবেষণা, ফান্ডিং, কারিকুলাম, ট্রেনিং—এটাকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করেন? 

মানস চৌধুরী: এনজিও সেক্টরের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্বন্ধের কারিগরি শুরু হয়েছে অন্তত ৮০’র দশকের শেষভাগে। খুবই প্রাথমিক ধরনের ছিল সেটা, একই সাথে পরোক্ষও ছিল। এনজিও বলতে তখন আইএনজিও বুঝতে হবে। আমার হিসেবে, বিশ্বব্যাংক এবং জাতিসংঘের প্রকল্পগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের কী-কী শর্তে কোন কোন ধরনের কাজে/চাকরিতে নেওয়া হবে সেসব প্রকল্পচরিত্র ও নীতিমালা-প্রণয়নের মাধ্যমে এটা শুরু হয়েছিল। উদাহরণ হিসেবে, বিশ্বব্যাংক যে ফ্লাড একশন প্ল্যান (Flood Action Plan) গ্রহণ করে তার আওতাধীন সেসব প্রকল্পে একদিকে দেশিয় অধ্যাপকদের বিশেষজ্ঞের চাকরি দেওয়া শুরু হয়; আবার সদ্যস্নাতকদের বাজারবিচারে উচ্চবেতনে চাকরিতে নেওয়া হয়। চাকরিগুলো প্রায়শই চুক্তিভিত্তিক ছিল। কিন্তু সরকারী বেতনকাঠামোর তুলনায় তা বেখাপ্পা ধরনের বেশি বেতনের ছিল। এত বেশি ছিল যে সরকারী চাকরির মোহ বা মায়া কাটাতে সমর্থ হতে পারতেন সদ্যস্নাতকেরা। কিছু কিছু শাস্ত্রের স্নাতক এখানে অনায়াসেই বাড়তি সুযোগ পেতেন। যেমন, ভূগোল, পরিসংখ্যান, অর্থশাস্ত্র ইত্যাদি। ততদিনে উন্নয়ন দর্শনের বিপণন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শুরু হয়ে গেছে যাকে কিছু তাত্ত্বিক নিওলিবেরেল আমলের সাথে মিলিয়ে দেখতে উৎসাহী হবার কথা। তার মানে, ইউএনডিপি-ইউনিসেফও কিছু প্রকল্প শুরু করেছে। সেগুলোতেও চটজলদি স্নাতকদের নিয়োগ শুরু হলো, যেমন হলো বিশেষজ্ঞদের নিয়োগদান। এই পুরা বন্দোবস্তের মাধ্যমে চাকরির জগতে (বা বাজারে) সরকার ও বৃহৎ কর্পোরেশনের যে একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ছিল তা আর রইল না। পাশাপাশি প্রকল্পের নিজস্ব যুক্তিমালার সুবিধাতে চাকরিতে ‘হেড-হান্টিং’ শুরু হলো এসব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ফলে চাকরিজগতের পূর্বতন ‘ভারসাম্য’ বে-আনুপাতিক হারে বিনষ্ট হলো। বে-অনুপাত দুই অর্থেই। বেতনের কাঠামোর দিক থেকেও নিয়োগপ্রণালীর দিক থেকেও। সবচেয়ে বড় বদলটা হলো স্নাতকদের মনোকাঠামোতে। আগের প্রশ্নটাতে শিক্ষকদের বা বিদ্যাকর্মীর মনোগত বদল নিয়ে স্বতন্ত্র আলাপ করেছি বলে সেটা আবার বলছি না। সম্বন্ধটাকে যে পরোক্ষ বলছিলাম সেটাও এগুলো বিচার করেই। 

একটা সর্বগ্রাসী ফল-উদ্বিগ্ন, সাফল্যকাতর, মানদণ্ডপূজারী, যশোলোভী বাতিকগ্রস্ত পেশাজীবী হিসেবে শিক্ষকদের বানিয়ে-ফেলতে-পারা সবচেয়ে ভয়ানক ক্ষতি। সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রণ।

এমন নয় যে বিশ্বব্যাংক বা ইউএনডিপি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসমূহকে পিটায়ে কারিকুলাম বদলাতে শুরু করেছিলেন। বরং, হঠাৎ করে প্রথম শ্রেণির সরকারী চাকুরির ১৬৫০/২৮৫০ টাকার স্কেলের বাস্তবতার মধ্যে নিয়োগ পেলেই ন্যূনতম ১০০০০ টাকার বন্দোবস্ত সদ্যস্নাতকদের মনোকাঠামোকে প্রভাবিত করেছে পরোক্ষভাবে। কিছু ডিসিপ্লিনও আচমকা নতুনভাবে মহিমান্বিত হতে শুরু করেছিল। আমি এই আপাত-সূক্ষ্ম বিরাট পটভূমিটার দিকে মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছি বটে। আমি এমনকি একে বিশেষ একটা সূক্ষ্ম হিসেবেও দেখি না। রীতিমত আমার সাধারণ পথচারীর চোখেই পড়ে গেছে এই ধরনের স্থূলই ছিল প্রক্রিয়াটি, এতটাই প্রকট ছিল প্রবণতাটা।

এনজিও তথা উন্নয়ন সেক্টরের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্কে, আপনার ভাষায় ঘনিষ্ঠতায়, মনোযোগ দিতে চাইলে পাবলিক আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে যে তা বিভিন্নভাবে কাজ করে তা মনে রাখতে সুপারিশ করব আমি। ভিন্নতা রয়েছে মহানগরের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আর মফস্বলের সদ্যনির্মিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও; কিংবা কোনো কোনো বিশেষ শাস্ত্রের বিন্যাসের সাথে অন্যান্য শাস্ত্রের। আবার, ব্র্যান্ডেড প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে তিন বিল্ডিংয়ে জোড়াতালি-দিয়ে-দাঁড়-করানো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও বেশুমার পার্থক্য রয়েছে। এটা নিছক কাকতাল যে, আপনার প্রশ্নের উত্তর দেবার আগেই একজন প্রতিমন্ত্রী পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটা বেফাঁস ধরনের তুলনা করে বসেছেন এবং ব্যাপক নিন্দার মধ্যে পড়েছেন। 

আমি যতটা বুঝলাম, মন্ত্রী মহোদয় হালকাচালেই কথাটা বলেছেন এবং নিছক তাঁর মাস্টারির গৌরববাচক একটা প্রাইভেট অধ্যায় না থাকলে হালকাভাবেই উড়িয়ে দেয়া যেত। সন্দেহ নেই, হালকাভাবে হলেও তিনি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সেলস-রিপ্রেজেন্টেটিভের ভূমিকা নিয়ে ফেলেছেন। দীর্ঘদিনের লয়্যালটির কারণে তিনি এটা নিতেই পারেন। মন্ত্রী হওয়াতে একটু ঝামেলা হয়েছে আরকি। যাহোক, যথেষ্ট পরিমাণ সাইবার-ট্রোলিংয়ের মধ্যেও যে প্রশ্নটা একেবারেই কেউ তুলছেন না তাহলো “স্যার, টকিং এবাউট কোচিং সেন্টার, কোচিং সেন্টার কেন? এত কেন? কে বানায়? কারা অনুমোদন দেয়? কীভাবে চলে? আপনার কী টেইক? আপনি না প্রাথমিক আর গণশিক্ষার মন্ত্রী? গণশিক্ষার দর্শনে সিদ্ধ করতে আছেন কি কোচিং সেন্টার?” 

“স্যার, টকিং এবাউট কোচিং সেন্টার, কোচিং সেন্টার কেন? এত কেন? কে বানায়? কারা অনুমোদন দেয়? কীভাবে চলে? আপনার কী টেইক? আপনি না প্রাথমিক আর গণশিক্ষার মন্ত্রী? গণশিক্ষার দর্শনে সিদ্ধ করতে আছেন কি কোচিং সেন্টার?” 

সন্দেহ নেই যে আমি বিরক্ত হয়ে কথাগুলো বলছি, এবং সেই বিরক্তির পুরা হক আমার আছে। মনে হতে পারে, প্রসঙ্গ থেকে সরে গেছি। তা যাইনি আসলে। কোচিং সেন্টারের এই বিপুল বিস্তৃতি শিক্ষার প্রাইভেটাইজেশন এবং শিক্ষার মান বিষয়ক গাণিতিক ফর্মুলার সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। মাত্র ৪০ বছর আগে কোচিং সেন্টার ছিল বড়জোর বিশেষায়িত দুয়েকটা স্ট্রিমের জন্য পরিচালিত। তার মধ্যেও অলাভজনক/মাগনা/দাতব্য প্রতিষ্ঠানও ছিল। যেমন, স্থাপত্যবিদ্যার জন্য ‘উঠোন’। এই বদলগুলো পলিসি পর্যায়ে, দার্শনিক পর্যায়ে, মুনাফাব্যবস্থাপনা পর্যায়ে সর্বগ্রাসী বদলের উপসর্গ। বিচিত্র নয়, এনজিও উত্থান, প্রাইভেট উত্থান, কোচিং সেন্টার উত্থান সবই ঘটেছে কাছাকাছি সময়ে। তাত্ত্বিকরা হয়তো নিওলিবেরেল কাল বলে একটা থিউরিটিক্যাল মডেল প্রস্তাবনার সান্ত্বনা দিতে পারবেন। 

এনজিও উত্থান, প্রাইভেট উত্থান, কোচিং সেন্টার উত্থান সবই ঘটেছে কাছাকাছি সময়ে। তাত্ত্বিকরা হয়তো নিওলিবেরেল কাল বলে একটা থিউরিটিক্যাল মডেল প্রস্তাবনার সান্ত্বনা দিতে পারবেন।

বাংলাদেশে এরকম প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আছে যেখানে  উন্নয়নপ্রকল্প আর বিশ্ববিদ্যালয়/ডিগ্রি প্রকল্প এমনভাবে পেঁচিয়ে বানানো হয়েছে যাতে ‘দারিদ্র্যবিমোচনের’ বিশ্বব্যাংক বিশেষজ্ঞকে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য এনে ক্লাসরুমে এক সেমিস্টার ঢুকিয়ে দেয়া যায়। বলতে চাইছি, এরকম বন্দোবস্ত থাকবার কারণে ওই বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয়টি এমনকি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অলিগোপলির মধ্যেও মাস্টারস্ট্রোক দিতে পারছে। ফলে, পরিস্থিতিটা বহুবিধ, নানানস্তরীয় এবং যথেষ্ট জটিল। পাশ্চাত্যের ক্ষেত্রে পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাজনটা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, আর তার আলাপও স্বতন্ত্র হতে হবে। তবে সাধারণভাবেই, পাশ্চাত্যের একটা ব্রান্ডেড বা সেমিব্রান্ডেড বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিশেষত উত্তর আমেরিকীয় এবং ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার ফান্ড প্রায়শই আসে মহাক্ষমতাধর সব কর্পোরেশনের কাছ থেকে। নানাবিধ পার্টনারশিপের মোড়কে সেগুলো রাখা হয়। গ্রাজুয়েট ফান্ডিং/বৃত্তি নিয়ে যাঁরা পড়তে যান তাঁদের বড় একটা অংশই যান কর্পোরেট কোম্পানির সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্টনারশিপ থেকে উপজাত ‘গবেষণা প্রকল্পের’ বৃত্তি নিয়ে। ফলিত বিজ্ঞানে তো বটেই। অবাক হব না যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১০০ ভাগ ফলিত উচ্চশিক্ষা বৃত্তিই কমবেশি এই চরিত্রের হয়ে থাকে। 

ওদিকে ইউরোপে এই তৎপরতারগুলোর বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে পড়ালেখাকেই ‘চাকরি’ হিসেবে বর্গীকরণ ও বিজ্ঞাপন দেবার মাধ্যমে। ৩/৪ বছর মুখ্যত চাকরি করলেন, আন্দাজ করতে পারেন যে বাজারমূল্যের চেয়ে কমদামে, এবং সেই পরিষেবার বিনিময়ে বেতনের অধিকন্তু একটা ডক্টরাল ডিগ্রিও পেলেন। এই বন্দোবস্তে বিশ্ববিদ্যালয় যদি ঘটক হয়ে থাকে, প্রফেসর হলেন কাজী। আর তাতেই সকলে রাজী। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এর অভিঘাত আবার আরেক ধরনের। সমর্থ্/স্মার্ট অধ্যাপকদের ফান্ডিংগুলো গ্রান্টমেকিং এজেন্সির ওই বিদ্যামার্কা পরিচয়টাও দরকার পড়ে না। এই বন্দোবস্তে ডিরেক্ট এনজিওর ‘ইভ্যালুয়েশন’ বা তথাকথিত ‘গবেষণা’ ফান্ডই স্মার্ট এবং/বা কম্পিটেন্ট/যোগ্য অধ্যাপক পেয়ে থাকেন। শিক্ষার্থীরা আন্ডারগ্রাজুয়েট দ্বিতীয় পর্বে উঠতে না উঠতেই জানেন দবির স্যার বা খগেন স্যারের কাছে “চাকরি” আছে। সম্পূর্ণ নতুন ধরনের একটা স্তরবিন্যাস তৈরি করেছে এগুলো। তবে, দুখঃপ্রকাশ করেই বলি, আলোচনার প্রান্ত বেড়ে যাচ্ছে। গড়গড়াও হচ্ছে। আরও চুলচেরা বিন্দুগামী প্রশ্নেই কেবল সূক্ষ্মভাবে নির্দিষ্ট এলাকায় উত্তরকে রাখা যাবে। অবশ্যই যদি আমার সামর্থ্যে কুলায়।

মারজিয়া প্রভা: এই পুরো প্রক্রিয়ায় ইউজিসিকে আপনি কীভাবে দেখেন? একটি স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে, নাকি বিশ্বব্যাংক-রাষ্ট্রের মধ্যবর্তী বাস্তবায়নকারী আমলাতান্ত্রিক কাঠামো হিসেবে? 

মানস চৌধুরী: দুইটাই কেবল অপশনের মধ্যে আলবৎ মধ্যবর্তী বাস্তবায়নকারী আমলাতান্ত্রিক কাঠামো হিসেবে দেখি। এমনিতেও স্বশাসিত বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান নিয়ে আমার আলাদা করে কোনো বাতিকগ্রস্ততা নেই। ফলে মানুষের বা সংগঠনের এজেন্সিকেন্দ্রিক অধুনা যান্ত্রিক একাডেমিক উত্তেজনাও আমার অত্যন্ত কম, যদি আদৌ থেকে থাকে। স্বশাসন আখেরে অনেকটা স্বমেহনের মত। নৈতিক আপত্তি আমার নেই, কিন্তু প্রায়োগিকতার পর্যালোচনা আছে। ছোটবেলায় মেহেরপুরে একটা প্রবাদ শুনতাম। ‘যার ছাগল সে ইচ্ছা হলে নিতম্ব দিয়ে জবাই করুক।’ ওই বয়সে আমার রুচিতে বেশ বাধত। এখনও লিখতে গিয়ে পাছা শব্দটাকে নিতম্ব শব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপন করলাম। তাতে জোরটা বোঝা গেল না। যাহোক, এই প্রবাদটিতে ছাগল-মালিকের এজেন্সিকে পুরাপুরি স্বীকার করে নেয়া হয়, হয়তো একটু রাগ বা বিরক্তিসমেত। ছাগলটির যে কোনো এজেন্সি নেই সেই সত্যটাও প্রকাশ করা হয়ে থাকে। কিন্তু সবচেয়ে তীব্র যেটা সেটা হচ্ছে ছাগল-মালিকের কাণ্ডজ্ঞানের উপর অনাস্থাজ্ঞাপন করা হয়ে থাকে। তাহলে দেখুন, একটা গ্রামীণ প্রবাদে পর্যন্ত স্পষ্ট যে স্বশাসনের সাথে কাণ্ডজ্ঞানের সম্পর্কটা অবিচ্ছেদ্য। ইউজিসি বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর (সবগুলোর নয় কিন্তু) স্বায়ত্তশাসন প্রসঙ্গটাও কাণ্ডজ্ঞানের (বা তার অভাবের) সাথে মিলিয়ে পাঠ করতে হবে। 

এই প্রবাদটিতে ছাগল-মালিকের এজেন্সিকে পুরাপুরি স্বীকার করে নেয়া হয়, হয়তো একটু রাগ বা বিরক্তিসমেত। ছাগলটির যে কোনো এজেন্সি নেই সেই সত্যটাও প্রকাশ করা হয়ে থাকে। কিন্তু সবচেয়ে তীব্র যেটা সেটা হচ্ছে ছাগল-মালিকের কাণ্ডজ্ঞানের উপর অনাস্থাজ্ঞাপন করা হয়ে থাকে।

আমি প্রথম ইউজিসির অস্তিত্ব সম্পর্কে জ্ঞাত হই যেভাবে সেটা দারুণ এক অভিজ্ঞতা। আপনার মনে পড়বে যে আগে একটা প্রশ্নের জবাবে আমি ভারতের ইউজিসি-প্রণীত বিধানের কুৎসিত ফলাফলের উদাহরণ দিচ্ছিলাম। সেটা নিছক কাকতাল নয়, আবার বাংলাদেশের ইউজিসিকে নিয়ে বলতে আমার বিশেষ সতর্কতা বা ভীতি আছে তাও নয়। ১৯৮৬ সালের কোনো একটা সময়ে বাসায় একটা টেলিভিশন আসে। আমার খুব রাফলি মনে পড়ে যে, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার কিছু আগে সেটা ঘটে। ফলে তখন থেকে ঢাকায় ভর্তি হবার আগ পর্যন্ত সময়টা যতভাবে পারা যায়, বিদ্যুৎ থাকলে, টিভিটা চালানোর চেষ্টা করতাম। যেহেতু সীমান্ত এলাকায় ছিলাম, বিটিভির থেকে দূরদর্শনই ভাল দেখা যেত। তাতেও রাকেশ রোশনের গোঁফ ছাড়া রাজেশ খান্নার সাথে পার্থক্য করতে পারার মত যথেষ্ট স্পষ্ট ছবি ছিল না। বিটিভি চালু হতো সন্ধ্যা থেকে। মাঝে মধ্যে দুপুরে ওই টিভির আলো দেখার উত্তেজনাতেই খুলতে গিয়ে কোনো না কোনো রবিবারে অনুষ্ঠান চলতে দেখি দূরদর্শনে। পরে বুঝেছি ওগুলো ডকুমেন্টারি ছিল। শেষ হবার পরে প্রযোজকের নামে প্রথম পাই ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন। এই অনুষ্ঠানগুলো আমার দারুণ পছন্দের হয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশে ততদিনে রবিবার ছুটি বন্ধ হয়ে গেছে। কলেজ থেকে কোনোমতে ক্লাস শেষ করে এসেই হুমড়ি খেয়ে খুলতাম রবিবার, সম্ভবত শনিবারও, দুপুরের ওই অনুষ্ঠানগুলো। সেসব জ্ঞানমূলক অনুষ্ঠানের কন্টেন্ট তেমন মনে নেই। কিন্তু মনে আছে যে কিশোর মনে ইউজিসির প্রযোজনার অনুষ্ঠানগুলো রেখাপাত করেছিল। কেবল মনে আছে নাসিরুদ্দীন শাহকে উপস্থাপক করে, নাকি গিরিশ কারনাডকে, কিছু বিজ্ঞান-ম্যাগাজিনধর্মী ডকুমেন্টারি বানানো হয়েছিল। ফলে ইউজিসির একটা দীর্ঘমেয়াদী রেখাপাতমূলক ইমেজ নিয়ে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসি। বছর আষ্টেক পর কর্মচারী হিসেবে ইউজিসিকে পাই। ভারতের সেই একই ইউজিসিকে এই বোকাবোকা মানদণ্ডশাসিত আমলাদের আখড়া হিসেবে আবিষ্কার করি আরও পরে। একজন মানুষের জৈবচক্রের কথা ভাবলেও খুবই বিষাদের এই রূপান্তর। 

বিশ্বব্যাংকের এই দাম্ভিক, যান্ত্রিক, মোড়লীপনাসর্বস্ব, হীনমন্যতা উৎসারী কর্মকাণ্ডকে চ্যালেঞ্জ করবার কোনো উদ্যোগই নেয়া হয়নি। আনুষ্ঠানিক আলোচনা পর্যন্ত তো যেতেই পারবেন না, যদি অনানুষ্ঠানিকভাবে এসব শিক্ষাবিদের মোড়কে থাকা আমলাদের সাথে কথা বলতে বসেন, হেন বাহানা নাই যা তাঁরা হাজির করবেন না।

বিশ্বব্যাংকের এই দাম্ভিক, যান্ত্রিক, মোড়লীপনাসর্বস্ব, হীনমন্যতা উৎসারী কর্মকাণ্ডকে চ্যালেঞ্জ করবার কোনো উদ্যোগই নেয়া হয়নি। আনুষ্ঠানিক আলোচনা পর্যন্ত তো যেতেই পারবেন না, যদি অনানুষ্ঠানিকভাবে এসব শিক্ষাবিদের মোড়কে থাকা আমলাদের সাথে কথা বলতে বসেন, হেন বাহানা নাই যা তাঁরা হাজির করবেন না। এর একটা ফ্রেমওয়ার্ক হলো ‘বৈশ্বিক’ মানদণ্ড। আদ্যোপান্ত কমজোরী অনুগতের অজুহাত হিসেবে দেখি আমি। তাঁরা আর যা বলতে পারেন তা হলো: ‘সকলেই তো করছে’। সেটাও সর্বৈব মিথ্যাচার। আফ্রিকা মহাদেশে এবং দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের বহু রাষ্ট্রই এসব সুপারিশকে প্রত্যাখ্যান করেছে। পেডাগজিক্যাল নানান বিষয়ে পুংখানুপুংখ প্রতিরোধ না হলেও, আরও বড় জায়গায় প্রতিরোধ হয়েছে। মেক্সিকো, ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া, ব্রাজিল সমেত অনেক রাষ্ট্রেই শিক্ষাকে প্রাইভেটখাতে দেবার সুপারিশকে সরকার পর্যায়েই মোকাবিলা করা হয়েছে। জনসাধারণের প্রতিবাদ ভাবলে আরও কিছু উদাহরণ বাড়বে। কিছু রাষ্ট্রে মানদণ্ডের বিষয়েও পর্যালোচনা চলেছে। সম্ভবত কেনিয়া, তাঞ্জানিয়া ইত্যাদি। এগুলো খোঁজাখুঁজি করলেই বের হবে। আমি ইচ্ছে করেই ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রে শিক্ষাকে কীভাবে দেখা হচ্ছে তার মধ্যে গেলাম না। তাদের সংকটটাও এক নয়। তাদের প্রসঙ্গটা বিশ্বব্যাংকের চাপের থেকে অনেক বেশি পাবলিশিং ইন্ডাস্ট্রির মনোপলি বা অলিগোপলি। সরকার পর্যায়ে না হলেও একাধিক রাষ্ট্রের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট পণ্ডিতেরা এই সর্বগ্রাসী মানদণ্ড প্রণয়নকে পুনর্বিবেচনা করছেন। বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় বিপদের কথা হলো, এখানে শিক্ষাবিদবৃন্দ নিজেরাই শিকার হবার জন্য খুশিমনে রাজি হয়ে আছেন। যাঁরা এই মানদণ্ডে কামিয়াব ও বৈশ্বিক প্রফাইল হাসিল করেছেন, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে স্পন্সর্ড ভ্রমণ করছেন তাঁরা তো বটেই, যাঁরা কামিয়াব হন নি তাঁদেরও বড় অংশ খা’ব দেখেন কামিয়াব হবারই। 

মেক্সিকো, ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া, ব্রাজিল সমেত অনেক রাষ্ট্রেই শিক্ষাকে প্রাইভেটখাতে দেবার সুপারিশকে সরকার পর্যায়েই মোকাবিলা করা হয়েছে।

মারজিয়া প্রভা: গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ৫ জানুয়ারি, ২০২৫ এ আপনি ‘প্রশ্নাতীতভাবে ও পর্যালোচনা ব্যতিরেক বিগত রেজিমের প্রকল্পগুলো অব্যাহত রাখতে আমার দুর্ভাবনা’ উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের প্রধান বরাবর একটি চিঠি প্রেরণ করেছিলেন। জানতে ইচ্ছে হচ্ছে, এই চিঠির কোন উত্তর বা প্রতিক্রিয়া বা সাড়া পেয়েছিলেন কি না? 

মানস চৌধুরী: উত্তর, প্রতিক্রিয়া আর সাড়া অভিধানে প্রায় একই অর্থে ব্যবহার করা হয়, আপনি জানেন। তবে আপনার এই তিন শব্দের সমান্তরাল ব্যবহারে আমি আমোদ পেয়েছি। এবং আমি তিনটাকে আলাদা রেখে বলতে চাই। প্রথমত, প্রতিক্রিয়া অবশ্যই পেয়েছি। যতদূর মনে পড়ে, মার্চ মাস নাগাদ তদানীন্তন ইউজিসি চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে দুইটা সভাতে আমাকে ডাকা হয়, যেন আমি মতপ্রকাশ করতে যাই। পক্ষ থেকে বলতে বোঝাচ্ছি যেসব কারণিক পদের মানুষ ফোন দিয়েছিলেন তাঁরা এই ভাষা ব্যবহার করেছিলেন: “স্যার বলেছেন”। আর আমিও না-বুঝে থাকতে চাইনি যে আমাকে ডাকবার হেতু কী যেহেতু আমি কোনো পদাধিকার বলে ওসব কী-যেন সভাতে যাবার যোগ্যতা রাখিনি। আমি সঙ্গত কারণেই যাইনি। এই বন্দোবস্ত ওই চিঠির কোনো ‘উত্তর’ নয় বলে। এ ছাড়াও, হিট প্রজেক্টের খান দুই প্রকল্প-পর্যালোচনার জন্যও আমাকে ডাকা হয়। যতদূর মনে পড়ে, সেগুলোও ফোনমাধ্যমে ছিল। সম্ভবত, ফোনে সম্মতির ভিত্তিতেই চিঠি পাঠানো হয়ে থাকে। আমি কোনো চিঠি পাবার কথা মনে করতে পারি না। ফোনে আমি যেতে অসম্মত হই বটে; এবং একই কারণে। 

বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় বিপদের কথা হলো, এখানে শিক্ষাবিদবৃন্দ নিজেরাই শিকার হবার জন্য খুশিমনে রাজি হয়ে আছেন। যাঁরা এই মানদণ্ডে কামিয়াব ও বৈশ্বিক প্রফাইল হাসিল করেছেন, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে স্পন্সর্ড ভ্রমণ করছেন তাঁরা তো বটেই, যাঁরা কামিয়াব হন নি তাঁদেরও বড় অংশ খা’ব দেখেন কামিয়াব হবারই।

দ্বিতীয়ত, একটা লিখিত-টাইপকৃত উত্তরও আমি পেয়েছি। প্রকল্প পরিচালকের (আমার ধারণা, হিট প্রকল্প হবে) স্বাক্ষরিত চিঠিখানি আমি ইমেইল এটাচমেন্টে পাই ১৭ই মার্চ ২০২৫। চিঠিখানিতে টাইপে তারিখ দেয়া আছে ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ এবং প্রকল্প-পরিচালক স্বাক্ষর করেছেন দেখা যায় ১৩ই ফেব্রুয়ারি। এই চিঠিখানির বিষয়বস্তু কিংবা তার অভাব একটা দর্শনীয় আলামত বটে। কোনো চিন্তাশীল পাঠক আমার চিঠির উত্তরে ইউজিসির পক্ষ থেকে আসলে কী বলা হলো সেই সিদ্ধান্ত সহজে নিতে পারবেন বলে আমার মনে হয় না। আমলাতান্ত্রিক পেঁচাইন্যা স্বভাব নিয়ে বাংলাদেশে বহু জনগল্প চালু আছে। কিন্তু গম্ভীরমুখে যদি কোনো কৌতুক বোধ করতে চান তাহলে আমার চিঠির উত্তর হিসেবে এই বস্তুখানি আপনারা পাঠ করতে পারেন। আমি আপনাকে অন্তত চিঠিখানা এগিয়ে দেব। হতে পারে এসব চিঠির রচয়িতাদের আলাদা করে দক্ষ বানানো হয় এমন চিঠি লিখতে যাতে সম্ভাব্য কোনো বিতর্ককারী বা আলাপকারী প্রসঙ্গের মুখ বা সুতো কিছুতেই বের করতে না পারেন। আমিও পারিনি। তৃতীয়ত, সাড়া বলতে ধরা যাক বৃহত্তর সহকর্মী এবং অপেক্ষাকৃত নিকট-সহকর্মীদের মধ্যকার চিন্তাজোয়ারকে বোঝাচ্ছি। সেটা একটা পারলৌকিক নিস্তব্ধতার পর্যায় বটে। এখানে আমার ০৫ তারিখের চিঠির প্রেক্ষাপটটাও জানানো দরকার মনে করছি। 

ইমেইল এটাচমেন্টে পাই ১৭ই মার্চ ২০২৫। চিঠিখানিতে টাইপে তারিখ দেয়া আছে ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ এবং প্রকল্প-পরিচালক স্বাক্ষর করেছেন দেখা যায় ১৩ই ফেব্রুয়ারি।

বিশ্বব্যাংকের মোড়লীপনা নিয়ে তো বটেই, কতগুলো প্রবণতার সাধারণভাবেই আমি বিরোধী ছিলাম। এর মধ্যে রয়েছে ঢালাওভাবে উচ্চশিক্ষাকে বিপণনকৃত করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যক্তিমালিকানাকরণ, সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের আনক্রিটিক্যাল মানমর্যাদা সৃষ্টি, এক ধরনের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ক্রেডিট-ট্রান্সফার’ প্রলোভন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থকড়ির মাধ্যমে ডিগ্রিপ্রদান তথা ‘প্রফেশনাল’ কোর্সবৃদ্ধি, কোচিং সেন্টারের রাজত্ব, জেলায় জেলায় ঐতিহ্যবাহী কলেজগুলোর প্রায়-প্রতিপক্ষ হিসেবে একটা আঁৎকা ‘সরকারী’ বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়ে দেয়া, সেসব বিশ্ববিদ্যালয়কে হরেদরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নাম দিতে থাকা – সব মিলে বেশ বড় দীর্ঘ তালিকা। আমার ধারণা, আমার এই প্রায় তাৎক্ষণিক-বানানো তালিকাও আপনাকে ধারণা দিচ্ছে যে আমার মাথাটা কতটা প্রস্তুত এই আলোচ্য বিষয়ে। 

নতুন প্রশাসকদের একটা টোকা দেবার জন্য ২০২৪-এর আগস্ট মাসের পর আমার ৫ মাস দেরি হবার কথা নয়। হয়েছে যে, সেটার কারণ খোদ প্রশাসনিক পদে-থাকা আমার সহকর্মীদের সাড়ার অভাবে। পদ্ধতিগতভাবে, নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত আইকিউএসি’র (IQAC: Institutional Quality Assurance Cell – আলোচ্য সব প্রকল্পের আওতাতেই সৃষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান নিশ্চিত করবার একটা দপ্তর) পরিচালকের কাছে আমি জানতে চেয়েছিলাম যে এসব সমস্যা তাঁরা দেখেন কিনা, এতদিন দেখেছিলেন কিনা, এ্খন অন্তত অনেক কিছু আমূল বদলানোর দাবি ও প্রতিশ্রুতি যেহেতু দেখা দিয়েছে, সেই দেখাদেখি সমেত ইউজিসির কাছে একটা দাবিদার ভঙ্গিতে তাঁরা আগাতে ইচ্ছুক কিনা। 

প্রশাসকদের হালচাল, ভাবভঙ্গি, বুদ্ধি-রাজনীতি নিয়ে আমার বুদ্ধি যাই বলুক না কেন, পদক্ষেপ হিসেবে আমি স্থানীয় আইকিউএসি’র অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে জেনেই আগানোর পক্ষপাতি ছিলাম। এটা আমার জন্য পদ্ধতিগত বিষয়। ফোনালাপে আমাকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইকিউএসি-পরিচালক ধন্যবাদ জানালেন এসব অত্যন্ত জরুরি প্রশ্ন আমি তুলছি বলে; এবং ‘আশ্বস্ত’ করলেন যে তাঁরা এই বিতর্কে আমার চিন্তানুগ অবস্থান নিয়ে শামিল হবেন। ফলে, আমার অপেক্ষা করতে হয়েছিল। বাস্তবে, যেমনটা আমি আশঙ্কা করছিলাম তাই ঘটেছে। তিনি আমাকে প্রশমিতকরণের জন্য তথা চুপ-করানোর জন্য প্রতারণা হিসেবে ওই আশ্বস্তিদান করেছিলেন। ফলে, অন্তত একটা চিঠি লিখে আমার আপত্তিকে লিপিবদ্ধ রাখবার সামান্য উদ্যোগটুকু নিতেও আমার দেরি হয়ে যায়। 

মারজিয়া প্রভা: আপনার চিঠিটা কিন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তৎকালীন সময়ের মুখের বুলি বা ইন্টেনশন যাই বলেন না কেন, সেইটির পক্ষেই ছিলো। কেননা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিগত ফ্যাসিবাদী রেজিমের প্রকল্পভিত্তিক লুটপাট উন্মোচন ও বাতিলের কথা বলেছে। আবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সহযোগী রাজনৈতিক শক্তি ও তাদের ছাত্র-গণসংগঠনগুলো (ডাকসুকেও এই বর্গে রাখছি) ১৯৪৭-এর দেশবিভাগকে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সফলতা হিসেবে ‘দিল্লী না ঢাকা? ঢাকা ঢাকা’ শীর্ষক ঐতিহাসিক অবস্থান নিয়েছে। এই রাজনৈতিক-তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে একধরণের উপনিবেশবিরোধিতা জ্ঞানচর্চার প্রসঙ্গকে সামনে এসেছে। যার ফলাফল আমরা দেখতে পাই, নির্দিষ্ট কালচারাল সেন্টার তৈরির প্রয়োজন বোধ করা। প্রশ্ন হলো এই উপনিবেশবিরোধী রাজনৈতিক জোয়ারে কিংবা ফ্যাসিবাদী প্রকল্প হটানোর কালে কেন বিশ্বব্যাংকনির্ভর HEAT ও ICSETEP-এর মতো একই প্রকল্প কাঠামো বহাল রইল? স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—আসলে এটি কী ধরনের উপনিবেশবিরোধিতা? কিংবা কী ধরণের ফ্যাসিবাদবিরোধিতা? 

এই উপনিবেশবিরোধী রাজনৈতিক জোয়ারে কিংবা ফ্যাসিবাদী প্রকল্প হটানোর কালে কেন বিশ্বব্যাংকনির্ভর HEAT ও ICSETEP-এর মতো একই প্রকল্প কাঠামো বহাল রইল? স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—আসলে এটি কী ধরনের উপনিবেশবিরোধিতা? কিংবা কী ধরণের ফ্যাসিবাদবিরোধিতা?

মানস চৌধুরী: আপনার এই প্রশ্নটিতে নিজগুণে এতগুলো জিজ্ঞাসা সাজানো আছে যে আমার ধারণা এটা নিয়ে এক রাত কাটিয়ে দেয়া যাবে। এমনকি হয়তো আরব্য রজনীর সহস্র-এক রাতের প্রথমটিও হওয়া সম্ভব। আপাতত, আমি তিনচারটা জায়গা বাছাই করে টুকরো আলোকপাত করি – প্রকল্পভিত্তিক লুটপাট, অন্তর্বর্তী সরকারের বুলি, ১৯৪৭-এর দেশবিভাগ এবং ‘কী ধরনের উপনিবেশবিরোধিতা!’। 

প্রকল্পভিত্তিক লুটপাটের প্রতি শেখ হাসিনা-উত্তরকালের বাংলাদেশ সরকার ও সরকারের বাধ্যবাছুর প্রশাসনগুলো কীভাবে তাকাবে তা বুঝবার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠান হিসেবে খুবই সুবিধাজনক জায়গায় ছিল। এর আগের বছরগুলোতে শয়ে শয়ে কোটি টাকা বার্ষিক বাজেটের বাইরে, আচমকা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া হয় যে তা আপনারা জানেন। জাহাঙ্গীরনগরে তা ১৪০০ কোটির অধিক, কুমিল্লাতে সম্ভবত ১৯০০’র অধিক, ইত্যাদি। এগুলো প্রকাশ্য অংক। ফলে জরুরি মনে হলে, অনায়াসেই পাওয়া যাবে। বিভিন্ন ক্যাম্পাসের প্রশাসকেরা তখন এসব টাকাপ্রাপ্তির ব্যাখ্যা-অযোগ্য গৌরবে নতুন ধরনের রাজনৈতিক বাহাদুরি করছিলেন। ব্যাখ্যা-অযোগ্য কারণ এটা প্রায় ঘাড়ে-ধরে-টাকা-দেয়ার ঘটনা ছিল। স্বীয় স্বীয় প্রশাসনের এমনকি কোনো দরকষাকষির কৌশলেরও ফলাফল ছিল না। 

যাহোক, সেসব টাকাতে যত্রতত্র অপরিকল্পিত, প্রায়শই অপ্রয়োজনীয় ভবন নির্মাণের (তথা লুটপাটের) কুৎসিত গল্প প্রায় সকল ক্যাম্পাসেই মুখে মুখে ছিল। যাঁরা ভুলে গিয়ে থাকতে পারেন, একদম ন্যূনতম উদাহরণ হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বলতে পারি: দুইটা প্রশাসনিক ভবন থাকবার পরও তৃতীয় প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ, পূর্ব-ইউরোপে শ্রমিক কলোনি হিসেবে চলতে-পারে ধরনের ডিজাইনে একটার পর একটা ১০-১২ তলার ছাত্রী হল বানানো যেসব হলের বাসিন্দাদের মহাসড়ক থেকেই দেখা যায়, পুরান জিমন্যাসিয়াম ও ৪ দশক ধরে পানি না-থাকা সুইমিং পুলের ব্যাপারে কোনো নীতিমালা ছাড়াই স্পোর্টস কম্প্লেক্স নির্মাণ, আর সেই স্পোর্টস কম্প্লেক্স বানাতে গিয়ে সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন হলটার পার্সপেক্টিভ লোপাট করে দেয়া, এমনকি চান্সমত সেই দৃষ্টিনন্দন হলটাকেই ভেঙে ফেলবার আলাপ তুলে ফেলা, এক একাডেমিক ভবনের ঘেডির উপর আরেক একাডেমিক ভবন বানানোর নকশা। এসবের মধ্যে টয়লেটের মাপে শিক্ষকদের রুমের ডিজাইন কিংবা এয়ারপোর্টের মত নামানো-প্যান্ট আর জুতা-দেখানো টয়লেটের ডিজাইন প্রসঙ্গ যদি তুলি তাহলে আর বলে শেষ করতে পারব না। 

তো, শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়বার পর প্রথমেই এত-নিন্দিত টাকার-শ্রাদ্ধ-প্রকল্পগুলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রিভিউ হবে সেটাই সবচেয়ে সাধারণ বোধবুদ্ধির পদক্ষেপ ছিল। তাই তো? তার মধ্যে আমার মত নাছোড়বান্দা শিক্ষক সকল ক্যাম্পাসেই দুয়েকজন থাকবার কথা। বাস্তবে, এখনকার শিক্ষানেতারা প্রশাসনিক দায়িত্ব পাবার জন্য অপেক্ষা করেছেন মাত্র। একেকটা ক্যাম্পাসে বদল ঘটেছে শুধু প্রকল্পের সাথে যুক্ত লোকজন। যখন কেউ মহা-অপরিকল্পিত শ্রাদ্ধ-ঘটানো অর্থপ্রকল্পের বছরের পর বছর নিন্দা করছেন এবং হাতে ক্ষমতা/দায়িত্ব পেয়েই সেই প্রকল্পগুলোই বেগবান করবার চেষ্টা করছেন, তখন সেটা প্রতারণা তো বটেই, একই সাথে সংকেত যে ‘লুটপাটের’ হাল এখন কী হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করি বলে আমি নিজ কর্মক্ষেত্র থেকে প্রসঙ্গটা তুললাম। বড় বড় ‘উন্নয়নপ্রকল্প’ কিংবা ‘স্বাস্থ্যপ্রকল্প’ কিংবা এমনকি জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট বা এয়ারপোর্টের তিন নম্বর টার্মিনাল প্রকল্প সবকিছুরই সমরূপ চিত্র অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পাওয়া গেছে। মিলিটারি যে সর্বাত্মক একটা ঠিকাদার বাহিনি, জানের মায়া বাদ দিলেও, সেটা বিস্তার করে আলাপ করবার জন্য স্বতন্ত্র প্রসঙ্গসূত্রও লাগবে। 

কেউ মহা-অপরিকল্পিত শ্রাদ্ধ-ঘটানো অর্থপ্রকল্পের বছরের পর বছর নিন্দা করছেন এবং হাতে ক্ষমতা/দায়িত্ব পেয়েই সেই প্রকল্পগুলোই বেগবান করবার চেষ্টা করছেন

অন্তর্বর্তী সরকারের বুলি তথা রাজনীতি নিয়ে, যেমনটা বলছিলাম, একটা স্বতন্ত্র আলাপই হতে পারে। বিজ্ঞাপনের মত শোনায় তা সত্ত্বেও জানাই যে এই বিষয়ে অপেক্ষাকৃত বিশদে আমি আরেকটা সংলাপ করেছি রাজশাহীর ম্যাজিক লণ্ঠন পাঠচক্রের সাথে। তবে কেবল সেই কারণেই নয়, এখানে এই প্রসঙ্গটা খোদ একটা কথামালার ঝাঁপি হবার আশঙ্কা আছে বলেও আমি একটু পাশ কাটাচ্ছি আপাতত। শুধু মনে করিয়ে দিই, সরকারের প্রাথমিক বড় বুলির মধ্যে ছিল যে পাচার-করা টাকা তাঁরা ফেরৎ আনবেন। মনে পড়ে তো? 

এই প্রশ্নের আলাপে যেটা বলা আমার দিক থেকে জরুরি তা হচ্ছে, অন্তবর্তী সরকারের বুলি আর ১৯৪৭-এর দেশবিভাগকে আমি সম্পর্কিত করে দেখি। বিশেষত, ১৯৪৭-এর সাংস্কৃতিক চৈতন্য যেভাবে পুনর্গঠিত আর পুনর্লিখিত হচ্ছে গত বছর দুয়েকে, সেটার উপর দাঁড়িয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনপ্রণালী বিকশিত হয়েছে বলে আমি মনে করি। সেটাই একটা মস্ত কারণ যে তাঁরা রাস্তাঘাটের-জনপদের হিংসাত্মক পরিস্থিতিগুলো সামলাতে পারেননি (বা কাঠামোগত নির্ভরশীলতার কারণেই, চাননি)। এমনকি আমি মনে করি, বিএনপি নির্বাচিত হয়ে সংসদে আসবার পর এখন অবধি ওই সাংস্কৃতিক চৈতন্যের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান কোথায় রাখবে তা নিয়ে যথেষ্ট অস্বচ্ছ বা দ্বিধাগ্রস্ত আছে। ১৯৪৭-এর ধর্মপরিচয়বাদী চৈতন্যটার কারিগর হিসেবেও আমি বিএনপিকে দেখি। তার ঐতিহাসিক সব সূত্র আছে। ফলে এখনকার তাদের দ্বিধাটাকে আমি দেখি এর নব-নব বেনেফিশিয়ারির ফেঁপেফুলে যাবার সাথে সম্পর্কিত হিসেবে। ঠিক দার্শনিক-রাজনৈতিক দ্বিধা হিসেবে নয়। এগুলো সব স্বতন্ত্র-বিভিন্ন অথচ সম্পর্কিত আলাপ। এটার সাথে আবার উপনিবেশবিরোধিতার জিজ্ঞাসাটিও পেঁচানো বটে। 

আমার মনে পড়ে, বদরুদ্দীন উমরের শেষের দিকের একটা বক্তৃতা তিনি জাহাঙ্গীরনগরে দিয়েছিলেন। সেটা সম্ভবত, ২০২৩ সালে ছিল। যাহোক, জানা বিষয় যদিও তবুও তাঁর বলবার গুণে প্রসঙ্গটা মনে আছে। তিনি বলছিলেন যা তার একটা সারাংশ এরকম ছিল: ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ স্লোগান শুনে মনে হয় বুঝি বা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে মুসলমানরা লড়ে নিজেদের রাষ্ট্রটা বানিয়ে নেবেন, কিন্তু বাস্তবে এই লড়ালড়িটা ছিল খোদ ভারতের হিন্দুদের সাথে কুস্তি। বলাই বাহুল্য, সেই লড়াইয়ের পর্যাপ্ত রাজনৈতিক কারণ মজুত ছিল, তিনিও তা বিবৃত করেছেন বক্তৃতাতে। কিন্তু যে প্রসঙ্গে আমার মনে পড়ল তা হচ্ছে, একটা স্থানকালপাত্র বদলের মধ্যে এরকম একটা স্লোগানও আমাদের মধ্যে এমন দ্যোতনা তৈরি করতে পারে যার সাথে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে উপনিবেশবিরোধিতার অনেকগুলো প্রবণতার প্রসঙ্গেই কথাটি মনে পড়ল। অনেক বছর আগে চা খেতে-খেতে লঘু মুহূর্তে আমার সাবেক শিক্ষক ও তখনকার সহকর্মী রেহনুমা আহমেদ বলছিলেন ‘আমাদের শাস্তি হওয়া উচিত যেহেতু ক্লাসে আমরা লাগাতার রাষ্ট্র আর মতাদর্শ শব্দগুলো ব্যবহার করি।’ এরকম ফয়সালার কারণ হলো, পরীক্ষার খাতায় যত্রতত্র প্রশ্নাতীতভাবে ঢিলামিসমেত আবোলতাবোল লেখাতে আমরা তখন ‘রাষ্ট্র’ আর ‘মতাদর্শ’ পদদুটোকে পাচ্ছিলাম। আবোলতাবোল লেখাতে ভারী চিন্তাসূত্রের এসব শব্দ পিঁয়াজ-বেরেস্তার মত ছিটিয়ে দেয়া দেখে আমরা পেরেশান হয়েছিলাম।

পরীক্ষার খাতায় যত্রতত্র প্রশ্নাতীতভাবে ঢিলামিসমেত আবোলতাবোল লেখাতে আমরা তখন ‘রাষ্ট্র’ আর ‘মতাদর্শ’ পদদুটোকে পাচ্ছিলাম। আবোলতাবোল লেখাতে ভারী চিন্তাসূত্রের এসব শব্দ পিঁয়াজ-বেরেস্তার মত ছিটিয়ে দেয়া দেখে আমরা পেরেশান হয়েছিলাম।

পরিচয়বাদী এবং ঘৃণাত্মক রাজনীতি উত্থানে উপনিবেশবিরোধী ঝাণ্ডাধারী এত পক্ষ মদদ দিচ্ছেন যে তাঁদের উপনিবেশবিরোধিতা বড়জোর নিজপক্ষের হিংস্রতার একাডেমিক-সাফাইদানকারী একটা বর্ম মাত্র। এতটাই যে, যাঁরা উপনিবেশবিরোধী তত্ত্বচর্চার প্রথম দিকের যাত্রী, তাঁরা অনেকেই নিজনিজ ঘরে বসে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। এই ঘটনা ভারতেও ঘটেছে। আরও প্রবলভাবে, আরও লম্বা সময় ধরে। বাংলাদেশে উপনিবেশবাদবিরোধী তত্ত্বচর্চার বর্তমান অধ্যায়টা কমবেশি আমার মাস্টারির কালের সাথে সমান্তরাল। ৯০ দশকের মধ্য/শেষভাগ থেকে। কোনো সন্দেহ নেই যে এক্ষেত্রে জাহাঙ্গীরনগরের নৃবিজ্ঞান বিভাগের একটা স্পষ্ট জোরালো ভূমিকা ছিল। যে হালিখানেক শিক্ষক সেই চর্চায় শামিল ছিলেন, তাঁদের দায়িত্ব নিয়ে বলতে আমি পারি না। তবে আমার প্রসঙ্গে বলতে পারি, যতই আমার ইচ্ছানিরপেক্ষভাবে ঘটুক না কেন, নিজেকে ছাতু-মাখাতে-গিয়ে-বিষ্ঠা-চটকানোর কারক হিসেবে আবিষ্কার করাটা শরমের। ইংরাজিতে বলে যেটাকে এমবারাসিং। 

তবে উৎসুক পাঠককে আমি সজাগ করে দিতে চাই যে, বাংলাদেশে এর আগে যত্নবান একটা উপনিবেশবিরোধী পড়ালেখা শুরু হয়েছিল। প্রায় একক-পদযোদ্ধা হিসেবে সেটা শুরু করেছিলেন অধ্যাপক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর এবং তাঁর পাঠচক্র সমাজ নিরীক্ষণ কেন্দ্র (সনিকে); সত্তর দশকের শেষভাগে। বিদ্যাঙ্গনে সেই উপনিবেশবিরোধিতার পাটাতন গভীরভাবে বৈশ্বিক বৈষম্য, মুক্তিকামী রাষ্ট্রাকাঙ্খা এবং দক্ষিণী বিশ্বের ভগ্নিত্বের সাথে সম্পর্কিত ছিল। প্রসঙ্গটা তুললাম যাতে পেশাজীবী ‘সমমনস্ক’দের কেউই-না-তুলবার বা কৃতিত্ব-দেবার-উদ্বেগে-ধামাচাপা-দেবার একটা সমবেত পাপের দায় আমারও না নিতে হয়। ১৯৯২-পরবর্তী কালে জাহাঙ্গীরের হঠাৎ আওয়ামী-জাতীয়তাবাদী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা আরেকটা প্রসঙ্গ। আমি সজাগ আছি সে বিষয়ে। 

মারজিয়া প্রভা: বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর এবং তাঁর পাঠচক্র সনিকে নিয়ে আপনার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে ২০২২ সালে মে মাসে প্রকাশিত তত্ত্বতালাশ-এর চতুর্থ সংখ্যায় প্রকাশিত “বাংলাদেশের বিদ্যায়তনিক রচনা এবং ভাষামাধ্যমের প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক প্রকাশনা নিয়ে সহকর্মীদের স্থুল বোঝাবুঝি প্রসঙ্গে” প্রবন্ধে। এককথায় স্থানীয় ভাষায় বিদ্যা জার্নাল প্রকাশ করার ৩০ বছর ধরে অবিচল এক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা সনিকে-কে দেখতে পেয়েছি আপনার লেখায়, যেখানে আপনি জানিয়েছেন বিদেশী গবেষকরাও আগ্রহী ছিলো, এখানে প্রকাশনা প্রকাশ করার জন্য। এই তাগিদ কি এখন বিদ্যাকর্মীরা কেউ অনুভব করছেন না? না করে থাকলে, কেন? 

মানস চৌধুরী: এখনকার বিদ্যাকর্মীরা তাগিদ বোধ করছেন না যে তা বলবার বিপদ হলো, লোকজন হারেরেরে করে কে কী করছেন তা বলতে শুরু করে দিতে পারেন। আমার উদ্দেশ্য মানুষজনের উদ্যোগকে খাটো করা নয় বা তাঁদের কর্মকাণ্ডের গুরুত্ব থাকলে তা ধামাচাপা দেবার নয়। বাংলা মাধ্যমে বিদ্যাজাগতিক পত্রিকা তথা জার্নাল প্রকাশে এই কেন্দ্রটির ভূমিকাকে স্বতন্ত্র করে দেখবার অবশ্যই কারণ আছে আমার। আলোচ্য রচনাটিতে তা বিশদ করে আলোচনা করেছি। এমনকি ওটা লিখবার সময়ে, বা আগে-পরে, আমি বিস্মৃত নই যে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন সম্পাদকের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা বাংলায় থেকেছিল বাংলাদেশে। এখনও আছে। বদরুদ্দীন উমর সম্পাদিত সংস্কৃতি হোক, ফরহাদ মজহার সম্পাদিত চিন্তা বা প্রতিপক্ষ হোক, মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা হোক, বাংলা একাডেমির উত্তরাধিকার হোক, কিংবা বিগত কয়েক বছর আনু মুহাম্মদ সম্পাদিত সর্বজনকথা হোক। বৃহত্তর ‘ছোটকাগজ’ বিবেচনায় আনলে তালিকাটা আরও বাড়বে। 

কিন্তু জাহাঙ্গীরের উদ্যোগ কয়েকটা কারণে সবগুলোর থেকে স্বতন্ত্র ও অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিদ্যাচাকুরে হিসেবে সেটা না-দেখতে পারার আমার দিকে কোনো কারণ নেই। খুব সংক্ষেপে বলতে পারি। জাহাঙ্গীরের পত্রিকা বিবিধ শাস্ত্রের চর্চাকারী, নিখিল বিশ্বের প্রবণতা লক্ষ্যকারী, দক্ষিণী বিশ্বের তাত্ত্বিক ধারার মর্মস্থলের প্রতি আগ্রহী ছিল তাই-ই নয় কেবল, বরং পত্রিকাটা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গোঁয়ারের মত বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যকার পদোন্নতি ও অন্যান্য পেশাগত প্রবৃদ্ধিতে অনুঘটক থাকবার সামর্থ্য অর্জন করতে প্রচেষ্ট ছিল। যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাকাঠামো ও নিয়োগ-পদোন্নতি ব্যবস্থা এতটুকু লক্ষ্য করেছেন, এমনকি সেই ৭০ বা ৮০র দশকের বাংলাদেশেও, তাঁদের সনিকে ও এর পত্রিকা নিয়ে আমি যা বলছি তা বুঝতে পারার কথা।

অধ্যাপক জাহাঙ্গীরের লম্বা সময় ধরে নিউলিবেরেল ব্যবস্থার পুনর্গঠিত বিদ্যাকর্মীদের অতটা মুখোমুখি হতে হয়নি। একদম বয়স বিচারেই বলছি। বা বলা যায়, এই্ পুনর্গঠিত ইংরাজি-লিপ্সু বিদ্যাকর্মী ভুরিভুরি সমাজে বাড়তে থাকার মধ্যে জাহাঙ্গীরের একান্ত মনুষ্যচক্রের মধ্যে এর বাড়াবাড়ি বা গড়াগড়ি কম দেখার সুযোগ হয়েছে। যে যাই করুন, তাঁর প্রতিষ্ঠানে লিখতে-থাকার লোকজন, এমনকি ইংরাজিতে পাকা লোকজনও, তিনি কমবেশি পাচ্ছিলেনই। হয়তো সার্কেলটা পূর্বনির্দিষ্ট। কিন্তু ছিল। উপরন্তু, ততদিনে তাঁর নিজের বিশাল বদল ঘটে গেছে। আন্তর্জাতিকতাবাদী মার্ক্সবাদী থেকে তিনি ক্রমাগত বাঙালি জাতীয়তাবাদী, আরও পরে চিহ্নের-মায়ায়-থাকা-এক-শিল্পবোদ্ধা বৃদ্ধে পরিণত হয়েছিলেন। ফলে নতুন বন্দোবস্তে তাঁর মানসিক সংকটটাকে, যদি আদৌ থেকে থাকে, আমি পাশ কাটাচ্ছি। বিদ্যাবৃত্তিকভাবে, পেশাগতভাবে আমার ততটা সমবেদনা ছিল না বলেই। তবে আপনার প্রশ্নের অভিমুখ ভুলিনি। অভিঘাত অবশ্যই শক্তিশালী হচ্ছিল, অধ্যাপক জাহাঙ্গীরের প্রত্যয়ও বদলে বা দুবলা-হয়ে যেতে পারে। কিন্তু মূল বিষয় হলো, উত্তরকালে সেই প্রতিরোধী স্বভাষী বিদ্যাকর্মী তৈরি্ই হয়নি তেমন। আমি সতর্ক করছি, আমার বলার অর্থ এই নয় যে কেউ বাংলা লিখতে পারেন না বা চান না বা লেখেন না, আমি বলছি কোন রচনাকে গুরুত্ব দেবেন বিদ্যাচাকুরেরা তার সর্বাত্মক মনোজাগতিক বদলের কথা। 

যদি প্রশ্নটার একটা লক্ষ্য হয়ে থাকে বিদেশী গবেষকদেরও তাগিদ পরে কমে গেছিল কিনা তা বোঝা, তাহলে আমার উত্তর হবে হ্যাঁ কমে গেছিল। এগুলো অনেকগুলো কাঠামোগত বদলের প্রসঙ্গ। সনিকের জৌলুস কমা যেমন, পাশ্চাত্যের অ-ইংরেজিভাষী দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়োগ-পদোন্নতি নীতিমালার বদলও বটে। আবার বিদ্যা প্রকাশনা কারখানার ‘এগ্রেসিভ’ মার্কেটিংও কারণ। বিশদ ব্যাখ্যা এড়াচ্ছি, দৈর্ঘ্যের স্বার্থেই। তবে উদাহরণ দিতে পারি এভাবে: ভেলাম ভ্যান সেন্ডেল বা সারাহ হোয়াইটের একদম আনকোরা পাণ্ডুলিপি ছেপেছিল সমাজ নিরীক্ষণ কেন্দ্র কিংবা ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড। এর মধ্যে সারাহ হোয়াইট কিন্তু খাঁটি-ইংরাজিভাষী দেশেরও বটে। এই ধরনের বিষয় হবার আর পরিবেশ ছিল না পরে। নেই আর। সনিকে এখন বন্ধ অধ্যাপক জাহাঙ্গীর মারা যাবার পর থেকে; কিংবা সনিকে ও ইউপিএলের মধ্যে প্রতিষ্ঠান হিসেবে কোনো কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন তুলনা চলে না — এসব সত্ত্বেও বলতে পারি, এখন বড়জোর দয়ালু লেখক ব্রান্ডেড প্রতিষ্ঠানের ইংরাজি বইয়ের একটা সমান্তরাল সংস্করণ ইউপিএলকে পাইয়ে দিতে পারতে পারেন। তাও ‘তারকা’ বিদ্যালেখক না হলে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে। আসলে বিদ্যাচাকুরে এভাবে চাইবেনই না। 

মারজিয়া প্রভা: আপনি খুব গুরুত্বপূর্ণভাবে উল্লেখ করেছেন, ‘এরিয়া স্টাডিজ কোন শাস্ত্রীয় পরিকাঠামো না, বরং এইটি গভর্ন্যান্স ফ্রেমওয়ার্ক’। ব্যাপারটা কি অনেকটা এরকম আন্তর্জাতিক প্রকাশনাগুলো স্থানীয় কোন কন্ঠস্বরদের পুস্তক প্রকাশ করবে বা তাদের কোন পুস্তকটি বা রচনাটিকে কোনো ফান্ডদাতা প্রকাশপূর্ব লগ্নি (ফান্ড করবে) করবে, তা পুরোটাই একটি ভুরাজনৈতিক জ্ঞান ব্যবস্থার অংশ? আমার খুব বোকা প্রশ্ন, তাহলে যেসব প্রকাশনা কট্টর নিউলিবারেলবিরোধী, উপনিবেশবিরোধী, তা আন্তর্জাতিক প্রকাশনায় স্থান পাবে কি করে? আর যদি স্থান না পায়, তবে আমাদের মধ্যকার জ্ঞানগত আন্তর্জাতিক সংহতি সম্ভব কি? (অনুবাদ, প্রকাশনা বিনিময় ইত্যাদি ইত্যাদি)। 

মানস চৌধুরী: আলবৎ ভূরাজনৈতিক জ্ঞানব্যবস্থার অংশ। একটা গল্প বলি বরং। অন্যের টাকায় বা ফান্ডারের টাকায় উড়োজাহাজে আমি চড়েছি খুবই অল্প। এত অল্প যে জ্বলজ্বল করে মনে আছে সেক’টা। ২০০৭ সালে তখনকার খুবই নিকটজন একজন সাংবাদিকতার অধ্যাপক তাঁর নিমন্ত্রণ ছিল এমন এক জায়গায় আমার নাম সুপারিশ করেছিলেন। এগুলো খুবই জটিল। কে কোথায় ডাক পান, বা পেলে আরেকজনের নাম কীভাবে সুপারিশ করতে পারেন তা যদি আমাকে ব্যাখ্যা করতে বলেন আমি ঘেমে যাব; এবং পারব না। কিন্তু অসলো যাবার টিকেট পাব শুনে খুশি হয়েছিলাম অস্বীকার করি না। আমাকে আপনি টাকা দিয়েও যদি বলতেন ‘ঘুরে আয়’, আমার মাথায় অসলো আসত না যে তাও স্বীকার করি। আমার কেবল চিন্তা ছিল সাংবাদিকতার অধ্যাপকের জুতা আমার পায়ে হবে কিনা। দুশ্চিন্তাই ছিল। সেটা বলি অধ্যাপককে। তিনি আশ্বস্ত করেন যে আমার ‘প্রফাইল’ তিনি আয়োজকদের জানিয়ে দিয়েছেন। ইত্যাদি। বিদঘুটে শীত বাদ দিলেও, দিনরাতের মাথা-আউলানো হিসাব এসবে আমার মাথা আউলানোই ছিল। তার মধ্যে হোটেলে দুবার এলেভেটরে চড়েও আমি বুঝি না যে আমার ঘরটা মাটির নিচে। তিনবারের বারে বুঝি। তবে আমার এসব মাথা-আউলানি নিমেষের মধ্যে কেটে গেল মিটিংয়ে বসে। 

সভাটা ছিল ডেনমার্কে নবীজির কার্টুনের ঘটনার পরকার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বিষয়-আশয় নিয়ে। যদিও কার্টুন প্রকাশের পর দুই বছর কেটে গেছে। কিন্তু প্রজেক্টের আয়ু বলেন, কিংবা পরিস্থিতির তীব্রতা ছিল। কিংবা অন্তত এই প্রকল্প সেভাবে দেখেছে। সভাতে বসে দেখি ইউরোপীয় অধ্যাপকদের বাইরে আমরা তিনজন। অনেক দিন হয়ে গেছে। তাও আমার মনে পড়ে আরেকজন ইন্দোনেশিয় আসবার কথা ছিল। তিনি আসেননি। তো এই তিনজন — ঘানা-উদ্ভূত এবং কানাডার ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য মাস্টারির চাকরি নেয়া এক তরুণ, পাকিস্তানের এমফিল এক শিক্ষার্থী যিনি তখন নরওয়েতেই পড়ছিলেন, আর আমি। আমার যতটা মনে পড়ে ঘানা-কানাডার ওই লোকটি নামাজ পড়েছেন। পাকিস্তানের নরওয়ে-থাকা শিক্ষার্থীর নাম দেখে এবং ঘানা-কানাডার শিক্ষককে প্রার্থনায় দেখে আমি তাঁদের ধর্মীয় পরিচয় বুঝি। এখন, আশা করি আপনি আমাকে সংকীর্ণমনা এক জঘন্য শিক্ষক ভাববেন না যে, আমি এই তিনজনের স্যাম্পলকে নিছকই অইউরোপীয় প্রতিনিধি ভাবতে পারিনি; আমরা একই সাথে ছিলাম মুসলিম বিশ্বের প্রতিনিধি। এখন এই আয়োজনের উদ্যোক্তারা আমার গলায় ছাগলের মত বাঁশের ত্রিভুজটি ঝুলিয়ে দেননি বলে আমি বুঝব না যে আমি এখানে কী? 

আমার জন্মপরিচয়ের কারণে অত্যাবশ্যক আয়রনিটা যদি বাদও দিই, এই সভাতে মুসলিম বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব করার যন্ত্রণা ছিল অত্যধিক, আর বৌদ্ধিক পরিবেশ ছিল বলেই আমি মনে করতে পারিনি। লক্ষ্য করবেন, আমি এমন একটা বিদ্যাচক্রের কথা বলছি যেটা ইউরোপের যে কোনো বিচারেই সংবেদনশীল অংশ, এবং কার্টুন-অধ্যায়টিকে তাঁরা পশ্চিম ইউরোপের ছকে-বাঁধা চোখে দেখবেন না বলেই এই আয়োজন। আয়োজনটির অবধারিত দক্ষিণবিশ্বের প্রতি মায়ালু বৈশিষ্ট্যের কারণেই উদাহরণটা আরও গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো দীর্ঘদিনের পেডাগজিক্যাল সব প্রবণতার প্রকাশ। একটা সংঘের ‘ভাল মনে’র বা সদিচ্ছার বিষয় দিয়ে বোঝা যাবে না। 

প্রশ্নের পরের অংশটা আমার একদমই বোকা লাগল না। বরং খুবই স্পষ্ট প্রশ্ন। আমিও স্পষ্ট উত্তর দিই। নিউলিবেরেলবাদবিরোধী বা উপনিবেশবিরোধী রচনা অবশ্যই আন্তর্জাতিক প্রকাশনা তালিকায় স্থান পাবে। নিয়মিত পাচ্ছে। কিন্তু তার কারিগরিটা কী সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন। প্রকল্পটা গঠিত হবে বস্টন বা ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ে, কলম্বিয়া বা কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে, ইয়েল বা ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার অর্থদাতা থাকবে ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন বা ইকনমিক এন্ড সোশ্যাল রিসার্চ কাউন্সিল; ফোর্ড ফাউন্ডেশন বা ওয়েলকাম ট্রাস্ট; ইত্যাদি। গবেষণা প্রকল্পের মুখ্য পরিচালক হবেন ওসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকেরা। আপনি সঠিক যোগাযোগ-মোগাযোগ করে এরকম একটা প্রকল্পে ডক্টরেট করবার চেষ্টা করতে পারেন; কিংবা পোস্টডক। মোটের উপর এই হলো বন্দোবস্ত। সারাংশে, এসব বিষয়বস্তু বিপণনযোগ্যতায় সামাজিক বিদ্যায় উন্নয়ন অধ্যয়ন বা পরিবেশ অধ্যয়নের সাথে বর্তমান কালে পেরে উঠতে না পারে, কিন্তু একদম বরবাদ নয়। তবে বন্দোবস্তটার একটা সুনির্দিষ্ট কাঠামো আছে। আছে বলেই, উপনিবেশবাদবিরোধিতা এখানে কাঁঠালের আমসত্ত্বের মত একটা ব্যাপার। চরম শ্লেষময় এক বাস্তবতা।

আমি বারংবার চেষ্টা করছি কীভাবে সংক্ষেপে উত্তর করা যায়। কিন্তু জ্ঞানজগতের সংহতির প্রশ্নের জবাব আরম্ভ করলে সেটা সম্ভব হবে না। আমি আপাতত এটুকু বলব যে, আমাদের মত দেশে অনেকগুলো সুযোগ আমরা হারিয়েছি। আমাদের সুযোগ ছিল, লাতিন আমেরিকার অনেকগুলো দেশ, আফ্রিকার কিছু দেশ, এমনকি কিছুকাল পর্যন্ত চীন-ইরানের মত দেশগুলোর বিদ্যাজগতের প্রণালীর সাথে বন্ধুতা পাতানো। আমাদের ভাষা বিভিন্ন বটে, তাতেও নতুন প্রযুক্তি যেখানে যাচ্ছে একটা পেডাগোজিক্যাল মৈত্রী কাজের রাস্তা দেখাতে পারত। আন্তর্জাতিক সংহতি, যদি আদৌ হবার হয়, কোনো না কোনোভাবে দক্ষিণী বিশ্বের আনুভূমিক সম্পর্কের মধ্যেই হওয়া সম্ভব, এই মুহূর্তে তা যতই দূরবর্তী লাগুক না কেন। 

মারজিয়া প্রভা: এই সাক্ষাৎকারে শেষ দুইটি প্রশ্ন একবারে করছি। ‘ওপেন একসেস’ এর মতো বিদ্যাজগতের গণতান্ত্রিক আন্দোলন যখন প্রকাশনা কারখানায় অধিক মুনাফাভোগী চালিয়াতিমূলক হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন এর বিপরীতে Sci-hub এর ফ্রি ডকুমেন্টসের আন্দোলনকে কিভাবে দেখেন? জানতে ইচ্ছে করছে, আপনার এই লেখার পর আপনার সহকর্মীদের ‘নতুন জ্ঞান স্থানীয় কণ্ঠস্বর হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার বাস্তববিবর্জিত আকাঙ্ক্ষায়’ বাস্তবিক আঘাত লেগেছিলো কি? সেইটার অভিজ্ঞতা জানতে চাই। 

মানস চৌধুরী: ‘ওপেন একসেস’ যে চালিয়াতি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে সেটা আপনি লক্ষ্য করবার কারণে খানিকটা শান্তি পেলাম। যে রচনাটির কথা বললেন সেখানেও আমি এটা স্পষ্ট করেই দেখিয়েছি। যাঁরা কেবল এই সাক্ষাৎকারটাই পড়বেন তাঁদের জন্য অত্যন্ত সংক্ষেপে এভাবে বলতে পারি: ‘নামীদামী’ আন্তর্জাতিক বিদ্যাপ্রকাশকেরা ‘ওপেন একসেস’ বানানোর বিজ্ঞাপনগুলো এমনভাবে দেন যেন ‘জ্ঞান ছড়ানোর কর্তব্যপালন’ হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে তাঁরা টার্গেট করেন দক্ষিণী বিশ্বের এবং নিখিল বিশ্বের বিদ্যারচয়িতাদের ইনসিক্যুরিটির বোধকে, উস্কে দেন ‘সাইটেশন’ বাড়ানোর লোভ। আর এই পুরো কাজটির জন্য একটা দাম ধার্য করেন। দামটা বাংলাদেশের কোনো শিক্ষকের ২ মাসের বেতন থেকে ৮ মাসের বেতন হতে পারে। বলাই বাহুল্য, প্রজেক্টের টাকায় হোক, আর বাপের টাকায় হোক সেই ফিস দিয়েই রচনাটাকে ‘ওপেন’ করা হচ্ছে। প্রজেক্টের টাকা বা বাপের টাকা যেটাই খরচ হোক, বিদ্যাজগতের পলিটিক্যাল ইকোনমি নিয়ে ভাবলে সহজেই বোঝার কথা যে এটা পাঠকের উপর দিয়ে যাবে। পুরা বন্দোবস্তটা নিবিড় বদমায়েশির, এবং সেটা সম্ভব হচ্ছে কাঠামোগত ইনসিক্যুরিটি সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারার মধ্য দিয়ে। এই হলো আমার উপলব্ধি যা আমি দ্বিধাহীন ও বেশরমভাবেই বলতে থাকতে পারি। শান্তি পেলাম কারণ এই কথাগুলো আমার সহকর্মীদের বলবার কথা ছিল, চায়ের আসরে পর্যালোচিত হবার কথা ছিল। বিশেষত সেসব সহকর্মীদের যাঁরা অন্যদের তুলনায় দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক প্রকাশনা জগতের প্রজা। এমনকি মুরুব্বি সহকর্মীদের এসব অংক কষে দেখিয়ে দিতে পারার কথা ছিল।

বাস্তবে তাঁরা টার্গেট করেন দক্ষিণী বিশ্বের এবং নিখিল বিশ্বের বিদ্যারচয়িতাদের ইনসিক্যুরিটির বোধকে, উস্কে দেন ‘সাইটেশন’ বাড়ানোর লোভ। আর এই পুরো কাজটির জন্য একটা দাম ধার্য করেন। দামটা বাংলাদেশের কোনো শিক্ষকের ২ মাসের বেতন থেকে ৮ মাসের বেতন হতে পারে।

সাই-হাবের মত ফ্রি ডকুমেন্টেসের আন্দোলনকে আমি কীভাবে দেখি তা বরং আরেকটা গল্প বলে জানাই। আমার তথাকথিত ডক্টরাল থিসিসটা আমি বহু বছর প্রকাশ করিনি। প্রথমত, বাংলায় করবার আগ্রহ ছিল। দ্বিতীয়ত, সনিকের পরিচালক নিজে থেকে বইটা প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন এমনকি আমি ডিগ্রি করবার আগেই। কয়েক বছর পরে সেটা তাঁকে মনে করিয়ে দেবার পর, হয়তো অধ্যাপক জাহাঙ্গীরের প্রতিষ্ঠানের তখনকার আর্থিক দুরবস্থার কারণেই, তাঁকে মনে হলো বিস্মৃত এবং পেরেশান। তৃতীয়ত, অনুবাদে বসতে আলসেমি ছিল। ইত্যাদি মেলাকিছুর পর, অনেক বছর বাদে, আমি এটা সত্যি সত্যিই ইংরেজিতে প্রকাশের ব্যাপারে ‘সিরিয়াস’ হয়েছিলাম। এর আগে যদি কখনো পাঠিয়ে থাকি কোনো প্রকাশকের কাছে, স্পষ্ট মনে নেই, তেমন কোনো হোমওয়ার্ক ছাড়াই, অযত্ন ছিল। তবে করোনা-কালে, পরবর্তীকালে প্রকাশে আমি আগ্রহী হই, নানান রকমের পরিস্থিতি এবং বৃহত্তর সহকর্মীদের প্রতি পর্যাপ্ত বিরক্তিসমেত। আমি কিন্তু সাই-হাবের পরিচালককে চিঠি মানে ইমেইল লিখি। সার্ফ করে আলেকজান্দ্রা এলবাকিয়ানের ইমেইল বের করি। তাঁকে বলি, প্রকাশিত পুস্তক ‘নথিভুক্ত’ করতে পারলে তিনি পুস্তক প্রকাশও করতে পারেন। আমার পুস্তক যেন তিনি আপলোড করার মাধ্যমে প্রকাশ করেন। আমি এমনকি একটা প্রচ্ছদও বানিয়ে দেব। খুবই উত্তেজনাকর ঘটনা হলো যে, তিনি উত্তর করেছেন। তিনি তাঁর কর্মপরিধি সম্বন্ধে খুবই স্পষ্ট। তিনি লিখলেন পুস্তক প্রকাশের কাজ তাঁর নয়, সেটার জন্য ডেজিগনেটেড সব প্রকাশক আছে। তাঁর কাজ প্রকাশিত পুস্তককে সুলভ করে দেয়া লোকজনের জন্য। আমি তাঁর স্পষ্টতাতে আরেকবার মুগ্ধ হই। খুশি হতাম যদি তাঁর সাথে একটা যোগাযোগ থাকতো। কিন্তু তাঁর চিঠিতে এমন একটা স্বর ছিল যাতে বেহুদা যোগাযোগ করার বিশেষ উদ্যম পাইনি। 

এই পর্যন্ত বলবার পর আমার কর্তব্য মনে হচ্ছে মনে করিয়ে দেয়া যে, এসব মুক্তজ্ঞান বা মুক্ততথ্যের আন্দোলনের গুরুত্ব বুঝতে গিয়ে আমরা যেন উদ্যোক্তাদের স্বীয় স্বীয় রাষ্ট্রকাঠামোর রাজনৈতিক অবস্থান গুলিয়ে না ফেলি। লিবজেন (Library Genesis/LibGen) বা জেড-লাইব্রেরির (Z-Library/Z-lib) মত সমবৈশিষ্ট্যের প্রতিষ্ঠানগুলোর থেকে সাই-হাবের পার্থক্যটা বিরাট ভিন্ন। সাই-হাব এই ধরনের প্রায় একমাত্র উদ্যোগ যেখানে উদ্যোক্তাকে চেনা যায়। আপনার মনে পড়বে যে আর্জেন্টিনা থেকে জেড-লাইব্রেরির দুই উদ্যোক্তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গ্রেপ্তার করেছে কপিরাইট আইনের লংঘনের দায়ে। কোনো একটা বৈশ্বিক পত্রিকায় সেই লোকদুটোর হাল পর্যন্ত জানতে পারবেন না। সারাক্ষণ ওসব উদ্যোগের পোর্টাল বদলাতে হচ্ছে। অন্যান্য কারণের মধ্যে এটা অবশ্যই আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে যে কাজাখস্তানের রাষ্ট্রব্যবস্থা আলেকজান্দ্রাকে প্রাথমিক সুরক্ষা দিচ্ছে। কেবল তাই-ই নয়, আলেক্সজান্দ্রা সেখানে অত্যন্ত সম্মানিত এবং এই উদ্যোগের কারণে পুরস্কৃত বলেও জানি। 

আমি যতদূর জানি, লিবজেন, জেড-লিব এবং সাই-হাব একটা অখণ্ড লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার চেষ্টাতেও আছে। যদিও জেড-লিব লিবজেনের আয়না-প্রতিষ্ঠান, তবু এদের প্রত্যেকের এনটিটি ডিজিটালি আলাদা বলে এই ধরনের উদ্যোগ আরও অধিক পাঠককে আরও অধিক বইয়ের নাগাল পেতে সাহায্য করবে। আর্জেন্টিনার ওই গ্রেপ্তারের পর আন্ডারগ্রাউন্ড উদ্যোক্তারা এমনকি এই চ্যালেঞ্জও জানিয়েছেন যে আগামীতে তাঁদের কোনো পোর্টালই কেউ বন্ধ করতে পারবে না। আমার যা প্রাযুক্তিক জ্ঞান সেদিক থেকে এটা আমার জন্য বিশ্বাস বা অবিশ্বাস কোনোটাই সহজ নয়। বরং, আমি বুঝি একটা চোরপুলিশ বা ইঁদুর-বেড়াল খেলার মত করে এসব উদ্যোক্তা তাঁদের চেষ্টা আমৃত্যু চালিয়ে যাবেন। এসব বৈপ্লবিক শক্তিকে না চিনবার কারণ নেই আমার। বলতে চাইলাম, প্রত্যেক উদ্যোক্তার পরিমণ্ডল ও প্রতিকূলতা আকাশ-পাতাল ভিন্ন হতে পারে। তাঁদের রাজনৈতিক লক্ষ্যের কারণে তাঁরা একীভূত। আর সে কারণেই আমার অতিশয় প্রিয়। 

আমার সহকর্মীদের নিয়ে প্রশ্নের অংশটুকু নিয়েই বরং ছোট উত্তর হবে। নৈঃশব্দ্য দিয়ে সামলানোর রাস্তা রাজনীতিবিদেরাই কেবল নেন না, বরং রাজনীতিবিদদের সমান দক্ষতাসম্পন্ন হিসেবেই আমি বিদ্যাকর্মীদের মনে করি। এটা বিদ্যাজগতের ট্রেনিংয়ের মধ্যেই আছে। সাধারণ্যে যা তিন বাক্যে বলার দক্ষতা অর্জন করা যায়, বিদ্যাকর্মীরা তা তিন লক্ষ ডলারের তিন বছরের রিসার্চ-প্রজেক্ট শেষে তিন হাজার পৃষ্ঠায় লিখতে অভ্যস্ত। এই অনুশীলনেরই কাঠামোগত উপাদান হলো প্রয়োজনীয় বিষয়ে চুপ-থাকতে পারার সামর্থ্য। আমি বিশেষ কোনো সহকর্মীর, বা বিশেষ ধরনের বিপ্লবী-পরিচয়ে-পরিতৃপ্ত সহকর্মী গোষ্ঠীর কোনো স্বতন্ত্র নিন্দা করবার জন্য কথাটা বলিনি, স্রেফ একটা পরিস্থিতি বোঝাতেই বলা। ফলে, বাস্তবে আমি তেমন একটা টেরই পাইনি যে রচনাটি আমি লিখেছিলাম। আমার নিজের লিখে এক ধরনের স্বস্তি হয়েছে, সন্দেহ নেই। সেটুকুই পাওনা। কপাল ভাল যে তত্ত্বতালাশ-এর সম্পাদক তখনও মহাপরিচালক হননি। আমার মনে হয় না, মহাপরিচালক হিসেবে তিনি তত্ত্বতালাশ আর প্রকাশ করতেন, বা করে থাকেন, বা করলেও রচয়িতা হিসেবে আমাকে যোগাযোগের ফুরসত করতে পারতেন; কিংবা পারলেও আমাদের কোনো কার্যকরী যোগাযোগ হতো আর। দেবী সরস্বতী আমাকে ভালবাসেন যে তা আমি শিশুকাল থেকেই জানি। সেজন্যই হয়তো, ২০২৪-এর আগেই রচনাটা লিখবার ও প্রকাশ করতে পারার তৌফিক দিয়েছেন তিনি আমাকে। 

মারজিয়া প্রভা: এই সাক্ষাৎকারের যে অবস্থা তা এখন জোর করে থামানোর অবস্থায় এসেছে। এবারকার মতো এখানে ফুলস্টপ দিচ্ছি। আপনাকে ধন্যবাদ।

মানস চৌধুরী: আপনাকে ধন্যবাদ দিলেও যথেষ্ট হবে না। এই বস্তুটির ভবিষ্যৎ যাই হোক, এই আলাপটা আপনার সাথে করতে পেরে আমি প্রশমিত বোধ করছি। 

————————-

মারজিয়া প্রভা: সদস্য, গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি। ইমেইল: marzia.hassan1992@gmail.com

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •