বাংলাদেশের ৫০ বছর ও তারপর-১২
ফতোয়াবাজদের দাপট, আওয়ামী লীগ-জামায়াত ঐক্য এবং লেখক শিল্পী সমাবেশ
আনু মুহাম্মদ
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শেষ প্রান্তে ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানের হানাদার সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এরপর ৫৪ বছর অতিক্রম করছে এই দেশ। এই সময়ে দুইজন রাষ্ট্রপতি খুন হয়েছেন, দুই দফা প্রত্যক্ষভাবে সামরিক শাসন এসেছে, সামরিক বাহিনীর ভূমিকা বেড়েছে, সংবিধান সংশোধন হয়েছে ১৬ বার, নির্বাচনের নানা রূপ দেখা গেছে, শাসনব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে কর্তৃত্ববাদী হয়েছে। ১৯৯০ ও ২০২৪ গণঅভ্যুত্থানে দুবার স্বৈরশাসকের পতন হয়েছে। এই কয়েক দশকে অর্থনীতির আয়তন ক্রমে বেড়েছে, জিডিপি ও বিশ্ববাণিজ্যে উল্লম্ফন ঘটেছে, অবকাঠামো ছাড়াও সমাজে আয় ও পেশার ধরনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন এসেছে। সম্পদের কেন্দ্রীভবন ও বৈষম্যও বেড়েছে, কতিপয় গোষ্ঠীর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কর্তৃত্বে আটকে গেছে দেশ। এই ধারাবাহিক লেখায় আমি ডায়েরী, সাংগঠনিক ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সাথে সাথে ইতিহাসের নানা নথি/ঘটনা পর্যালোচনা করে এই দেশের রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতির গতিমুখ তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি। ব্যক্তিগত বিষয় সেটুকু এনেছি যেটুকু তৎকালীন পরিস্থিতি বোঝার জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক। দ্বাদশ পর্বে ১৯৯৩-৯৪ সময়কালে জামায়াত-ফতোয়াবাজদের দাপট, ব্ল্যাশফেমি এ্যাক্ট প্রবর্তনের চক্রান্তের বিরুদ্ধে লেখক শিল্পীদের বিরাট সমাবেশ, আওয়ামী লীগ-জামায়াত ঐক্য এবং বৃহৎ বামফ্রন্ট গঠনের ব্যর্থ চেষ্টাসহ তৎকালীন ঘটনাবলী ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে।
গত পর্বে বলেছি ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ ঐতিহাসিক গণআদালতে যুদ্ধাপরাধী নেতা হিসেবে গোলাম আজমকে অভিযুক্ত করা হয়। এই আন্দোলনের চাপে তিনি গ্রেপ্তার হন, কিন্তু আবার জেলমুক্ত হন ১৯৯৩ সালে। অন্য দেশের পাসপোর্টে আসা গোলাম আজমকে নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হয় ১৯৯৪ সালে। আগের পর্বে আরও বলেছি বিজেপি অযোধ্যায় বাবরী মসজিদ ভেঙে কীভাবে এদেশের ধর্মপন্থী উগ্র রাজনীতিকে পুষ্টি জুগিয়েছে। তার ধারায় ১৯৯৩ থেকে ফতোয়াবাজ, যুদ্ধাপরাধী তথা ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীদের দাপট, সহিংসতা, জুলুম অনেক বেড়ে যায়। নূরজাহান ও ফিরোজাদের মত অনেক নারী ফতোয়াবাজ উগ্রবাদীদের আক্রমণের শিকার হয়ে নিহত হওয়া নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনা বিতর্ক হয়। আমি নিজেও তখন এ নিয়ে লিখেছি, বলেছি। এই সময়েই লেখক শিল্পী বুদ্ধিজীবীদের বিশেষ করে আহমদ শরীফ ও তসলিমা নাসরিনকে মুরতাদ ঘোষণা করে, ফাঁসি চেয়ে, বড় বড় মিছিল হতে থাকে। তসলিমার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে উন্মাদনা তৈরি করা হয়। এগুলো সবই শুধুমাত্র লেখা ও কথা বলার জন্য। পরিস্থিতি ভয়ংকর আকার ধারণ করলে এক পর্যায়ে তসলিমা দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
এরকম সময়েই আওয়ামী লীগ জামায়াত ঐক্য দেখা যায়, যা যুদ্ধাপরাধী বিরোধী আন্দোলনকেও দুর্বল করে দেয়। এর মধ্যেই ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা মাথায় নিয়ে ক্যানসারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ওই আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তি জাহানারা ইমাম। দুই বছর পর ১৯৯৬ সালে সাধারণ নির্বাচন পরিচালনার জন্য গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সেই মামলা বাতিল করা হয়।
সেসময়ের কিছু দিন: ঘটনা ও ভাবনা
২৮.৬.৯৩
তারিক আলীর বইগুলোতে অনেক তথ্য, গভীর পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ আছে। গতিও আছে। তবে ট্রটস্কিপন্থী গ্রুপে থাকার কারণে উগ্র স্ট্যালিন বিরোধিতার অনেক অযৌক্তিক কথাবার্তা আছে- এর পরিণতিতেই হয়তো শেষে গরবাচেভের প্রশস্তিও আছে। কিন্তু স্ট্যালিন ও মাওপন্থী বিভিন্ন দেশের পার্টিগুলোর যান্ত্রিকতা, অগণতান্ত্রিক কর্মপদ্ধতির যে সমালোচনা তারিক করেছেন তার অনেকখানিই ঠিক। নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝি।
১৫.৭.৯৩
জানতাম ঘটনাটি ঘটবে। তবুও শোনার পর একদম চুপ হয়ে গেলাম।…শওকত আলী ‘লেখক শিবির চতুর্দশ শতক বক্তৃতামালা’য় বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। এর মধ্যেই আহাদ এসে খবর দিল গোলাম আজম ছাড়া পেয়েছে।
২১.৭.৯৩
শুধু তত্ত্বজ্ঞান থাকলে চলে না, জনগণের মন, সংস্কৃতি, অভিব্যক্তি বোঝার ক্ষমতা থাকতে হয়। শুধু জ্ঞান থাকলে চলে না, থাকতে হয় হৃদয়। আর এই ক্ষমতা না থাকলে তত্ত্বজ্ঞানও অর্থহীন হয়ে যায়।
…ক্ষমতাসীন একটি কমিউনিস্ট পার্টি সোভিয়েত ইউনিয়নে স্ট্যালিনের নেতৃত্বে যেভাবে পার্টি কাঠামো দাঁড় করিয়েছিল সেটা আমাদের দেশে বর্তমান অবস্থায় কি কোনো আদর্শ হতে পারে? তাকে অন্ধভাবে অনুকরণ কি লেনিনীয় হতে পারে?
আমাদের দেশে এবং অন্যান্য অনেক দেশেই অনেক ধাক্কার পরও যেসব কমিউনিস্ট গ্রুপ টিকে আছে তারা এই দুর্বলতা এখনও উপলব্ধি করেনি। করলেও কেউ মনের জোর নিয়ে উচ্চারণ করেনি। আমাদের তো করা উচিৎ।
২৯.৭.৯৩
চোখের সামনে একের পর এক অবিশ্বাস্য ঘটনাগুলো ঘটলো। অপমান, ক্ষোভ আর অনেক প্রশ্ন তারপর থেকে। আজ সিন্ডিকেট নির্বাচন ছিল। সকালে বিভাগ হয়ে ক্লাশে গেছি। ভোট দিয়ে কথা বলছি। এমন সময় হৈচৈ। শুনলাম ছাত্রদলের ছেলেরা ভাঙচুর করছে। দূরে তাকিয়ে দেখলাম কিছু ছাত্র গাছের ডাল ভাঙছে। মনে হলো রুটিন উত্তেজনা। কিন্তু মুখে মুখোশ দেখে মনে হলো বিষয়টি অতটা সহজ নয়। পরে জেনেছি ওরা আগেই সমাজবিজ্ঞান, বিজ্ঞান ও মানবিক অনুষদে প্রশাসনের সাথে যুক্ত বিভিন্ন শিক্ষকের রুম ভেঙেচুরে এসেছে। ভিসির বাসার সামনে কিছু কাঁচ ভাঙলো। মিছিলের সামনে জাকসু ভিপি, তার নেতৃত্বেই মিছিলটি ক্লাবে ভাঙচুর করলো। ফিরে যাবার সময় লাঠি ঢিল ছুড়লো, আঘাত লাগলো বিএনপি সমর্থত হিসেবে পরিচিত এবং সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ইমামউদ্দীন, অধ্যাপক মুস্তাহিদুর রহমানের গায়ে। তেড়ে গেলেন শিক্ষকেরা। তাড়া দিয়ে একেবারে ভিসি অফিস পর্যন্ত। শিক্ষক সমিতির প্রতিবাদ সভা। পরে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ।
রাতে একটা লেখা লিখলাম, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কি মাস্তান ও মেরুদন্ডহীনদের কবলেই থাকবে?’
২১.৮.৯৩
জাবি শিক্ষক সমিতির সভা। সরকার ‘উন্নয়ন সৈনিক’দের রক্ষার প্রাণপণ চেষ্টা করছে, তাদের দিয়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মামলা করিয়েছে। তাও ঠিক দক্ষভাবে করতে পারেনি। হাস্যকর এক মামলা হয়েছে।
৩০.৮.৯৩
২৭ তারিখ সকালে কুমারখালি গেছি। রাজবাড়ী থেকে ট্রেণে। প্রচন্ড বৃষ্টি। এবছর খুব বৃষ্টি হচ্ছে। যাবার পথে একাধিক ছাত্রছাত্রীর সাথে দেখা, কথা। রাতে ইলিয়াস ভাই এলেন বগুড়া থেকে। সকালে উঠে ভ্যানে শিলাইদহ। সজীব রায়ের বাসায়- অসাধারণ মানুষ, শিক্ষক ও সংগঠক। গ্রাম বৈঠকে কিংবা অন্য সাংগঠনিক সভায় জনগণের সামনে তার মতো এতো স্বচ্ছভাবে আমাদের মধ্যে কেউ বলতে পারে না।
বিকালে কুষ্টিয়ায় লেখক শিবিরের সেমিনার। বিষয়বস্তু লম্বা-‘বাজার অর্থনীতি, মৌলবাদ ও সমাজতন্ত্র’। উপস্থিতি তিন শতাধিক। সবাই খুব মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। ওখানে আরেক ছাত্র মুঈদের সাথে দেখা, এখন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সারাক্ষণ অর্ধশিক্ষিত, উন্মাদ ও টাউটদের সাথে লড়াই করে শিক্ষকতা করছে। ওর উপর অনেক চাপ। শিক্ষকতা ছাড়াও লেখালেখিও করছ্।ে ওর বাসায় থাকলাম, ও নিজ হাতে রান্না করে খাওয়ালো।
পরদিন সকালে মীর মোশাররফ হোসেনের গ্রামে গেলাম। এই গ্রামে বসেই মোশাররফ জমিদার দর্পণ লিখেছিলেন। রাস্তার ধারেই তাঁর মেয়েপক্ষের প্রপৌত্রদের বাড়ী, নাতির এক মেয়ের সঙ্গে কথা হলো। মেয়েটি জানালার ভেতর থেকে কথা বলছিল। পরে ওর ভাই এল। ইলিয়াস ভাই ওদের ছবি তুলতে চাইলে জানালো, ছেলেদের ছবি তোলা যাবে মেয়েদের নয়।
সেখান থেকে কুমারখালিতে কাঙাল হরিনাথের বাড়ী। পূর্ব বাংলার প্রথম প্রেস বা ছাপাখানা তিনিই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, প্রথম পত্রিকাও-গ্রাম বার্তা। তিনিই সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন। সেই প্রেস মেশিনটি এখনও আছে কিন্তু ঘর বিধ্বস্ত, ঘরের চাল নাই।… আশ্চর্য্য জাদুঘর বা বাংলা ্একাডেমির কোনো উদ্যোগ নাই। হরিনাথের নাতির ছেলে অশোক মজুমদারকে পেলাম। তিনিও এখন প্রেস ব্যবসা করেন। তিনি নাম ধরেই কয়েকজন গবেষকের নাম বললেন কীভাবে তারা তাকে প্রতারণা করেছেন বা ঠকিয়েছেন। তাঁর কাছ থেকেই শুনলাম এই পত্রিকা বের করে হরিনাথ দেবেন্দ্রনাথ এমনকি রবীন্দ্রনাথের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। কেননা পত্রিকায় অনেক কথা থাকতো যা জমিদার পরিবারের জন্য প্রীতিকর হতো না।
সেখান থেকে কুমারখালিতে কাঙাল হরিনাথের বাড়ী। পূর্ব বাংলার প্রথম প্রেস বা ছাপাখানা তিনিই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, প্রথম পত্রিকাও-গ্রাম বার্তা। তিনিই সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন। সেই প্রেস মেশিনটি এখনও আছে কিন্তু ঘর বিধ্বস্ত, ঘরের চাল নাই।
শুনলাম কাঙাল হরিনাথের প্রায় ১০০০ গান আছে। এখনও প্রায় অব্যবহৃত, কিছু যা ব্যবহৃত হয়েছে তাও ঠিকমতো স্বীকৃতি ছাড়া।
বিকালে ‘শিক্ষা পদ্ধতি ও বেকারত্ব’ বিষয়ক আলোচনা সভা হলো। এখানেও প্রায় দেড়শো মনোযোগী শ্রোতা ছিলেন।
১.৯.৯৩
নূরজাহানদের বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান খুব জরুরী মনে হয় আমার কাছে। ফতোয়া দিয়ে ঢিল ছুঁড়ে একজনকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করলো, আরেকজনকে আগুনে পুড়িয়ে মারলো কিছু লোক। কিন্তু প্রশ্ন হলো এ ঘটনাগুলো গ্রামের মানুষের কাছে কীভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে?
নূরজাহানদের বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান খুব জরুরী মনে হয় আমার কাছে। ফতোয়া দিয়ে ঢিল ছুঁড়ে একজনকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করলো, আরেকজনকে আগুনে পুড়িয়ে মারলো কিছু লোক। কিন্তু প্রশ্ন হলো এ ঘটনাগুলো গ্রামের মানুষের কাছে কীভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে?
৯.৯.৯৩
রাজবাড়ীতে গতকাল আগের কমিউনিস্ট লীগের একজন খুবই জনপ্রিয়, সক্রিয়, নিবেদিত সংগঠক আল্লা নেওয়াজ খাইরুর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ওয়ার্কার্স পার্টির আলোচনা সভা ছিল। রনো ভাই নেতৃত্ব দিয়ে নিয়ে গেলেন। আমাদের ম্যধ্য আরও ছিলেন মুসা আনসারী, নূর মোহাম্মদ, আজফার হোসেন এবং রথীন চক্রবর্তী। সভায় উপস্থিত ৬/৭শ মানুষের মধ্যে তিন চতুর্থাংশই ছিলেন শ্রমজীবী মানুষ। খাইরুর কাজের প্রভাব বোঝা যায়। এই এলাকায় আগের কমিউনিস্ট লীগের শক্ত ভিত্তি আছে। কিন্তু অনেকের কথা থেকে বোঝা গেল রাজনৈতিক শক্তি হিসোবে বিকাশের কোনো প্রক্রিয়া এখানে কার্যকর নাই।… এখন নির্বাচনমুখী দল হিসাবে প্রশাসনকেন্দ্রিক যে তৎপরতা তার আকর্ষণ কম নয়। কেন্দ্রের বিরুদ্ধে কর্মীদের ক্ষোভ স্পষ্টই বোঝা গেল।
পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি
১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৯৩ সালে প্রেরিত একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি, সংবাদদাতার স্বাক্ষর- জেড আই খান পান্না। এটি থেকে সেসময়ের পরিস্থিতি ধারণা করা যাবে-
আজ ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৯৩ কর্ণেল তাহের মিলনায়তনে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটি’র এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। কমিটির যুগ্ম আহবায়ক আনু মুহাম্মদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য রাখেন শরীফ নূরুল আম্বিয়া, এডভোকেট নিজামুল হক নাসিম, এডভোকেট জেড আই খান পান্না, এডভোকেট আদিলুর রহমান খান, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, এডভোকেট করুণাময় চাকমা, মোস্তফা ফারুক, বিজয়া খীসা, বিপ্লব রহমান, রবিশংকর, প্রিসিলা রাজ, রুহুল কুদ্দুস বাবু প্রমুখ।
সভায় গৃহিত প্রস্তাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যমান জটিল ও অশান্ত পরিস্থিতি সমাধানের জন্য সরকার গঠিত কমিটির সঙ্গে জনসংহতি সমিতির দ্বিপাক্ষিক আলোচনা যোগাযোগে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়। একইসঙ্গে সভায় এ মর্মে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় যে, আলোচনা অব্যাহত থাকলেও পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য সরকারের তরফ থেকে এখনও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হয়নি। সভায় বর্তমান পরিস্থিতির নিম্নোক্ত দিকগুলো উল্লেখ করা হয়: (ক) এলাকায় এখনও সামরিক প্রশাসন পূর্ণমাত্রায় বহাল রয়েছে, (খ) পাহাড়ী জনগণের দখলকৃত জমি তাদের ফেরত দেবার ব্যাপারে নানাপ্রকার জটিলতা সৃষ্টি করা হয়েছে, (গ) অঞ্চলে পাহাড়ী জনগণের নিরাপত্তাহীনতা দূর করবার মত প্রয়োজনীয় পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়নি, (ঘ) গত ১০ আগস্ট থেকে ৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পাহাড়ী মেয়েদের উপর নির্যাতনের একাধিক ঘটনার অভিযোগ পাওয়া গেছে। (ঙ) বাঙালী দরিদ্র অসহায় জনগণকে ব্যবহার করে কিছু স্বার্থবাদী মহল অঞ্চলের রাজনৈতিক সমাধানকে বিলম্বিত করছে। সভায় এসব জটিলতা নিরসন করে আলোচনার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজনৈতিক সমাধানের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানানো হয়।
২০.৯.৯৩
রাজশাহী বিশ্ববিদালয়ে জামাতী সন্ত্রাসে আরেকজন নিহত- রিমু! এর মধ্যে গত ১৬ তারিখ খুলনা গেলাম। লেখক শিবির শাখা সম্মেলন আর দুটো সেমিনার।
২২.৯.৯৩
গতকাল সংসদে সরকারের একাংশ ও বিরোধী দলের বড় অংশ ঐক্যবদ্ধভাবে জামায়াতী সন্ত্রাসের প্রতিবাদ করেছে। সুবিধা করতে না পেরে জামায়াতের সদস্যরা ওয়াক আউট করেছে। রাজশাহীর প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংঘাত হয়েছে। খুলনায় দুজন নিহত হয়েছেন।
দুপুরের পর গবি জোট, ৫ দল ও সিপিবিসহ ১০টি সংগঠনের প্রথম যৌথ সমাবেশ। এরপর সমন্বয় কমিটির সমাবেশ।
২৩.৯.৯৩
জাহাঙ্গীরনগর ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পর জামায়াতি সন্ত্রাসে এখন যোগ হয়েছে রাজশাহী। এর বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের মহাসমাবেশ ছিল আজ। আমিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২১ জন বক্তব্য রাখলাম। সব বক্তাই জামায়াতের সন্ত্রাসী চরিত্র চিহ্নিত করলেন এবং অনেকেই ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের আওয়াজ তুললেন। জামায়াতের শিক্ষকেরা কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতিকেই হজম করতে পারেনি বোঝা গেল।
৪.১০.৯৩
মস্কো এখন রক্তাক্ত। রুশ বিপ্লবের পর মস্কো আর কখনো এরকম রক্তাক্ত হয়নি। মস্কোবাসীরা পুলিশ মিলিটারী আর মাস্তানদের হামলা গুলি ট্যাংক এগুলোর মোকাবিলা করতে অভ্যস্ত ছিল না, নিশ্চয়ই চরম অবিশ্বাসের সাথে ট্যাংকের গুলি খেয়ে মরেছেন তারা। এখন পর্যন্ত পাওয়া খবরে সামরিক বাহিনীর এই আক্রমণে পার্লামেন্ট ভবনের সদস্যরাসহ পাঁচ শতাধিক নিহত হয়েছেন। পার্লামেন্ট ভবন পুড়ছে। সাম্প্রতিক ইতিহাসে দেশের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে জনগণের এরকম লড়াই এবং হতাহতের ঘটনা এই প্রথম। ইয়েলিৎসিন বিজয়ী হলো বললে সবটা বলা হবে না, আসলে বিজয়ী হলো দুর্বৃত্ত-৮, মার্কিন নেতৃত্বাধীন জি-৭ ও জাপান গোষ্ঠী। শত শত মানুষ হত্যার পর ঐসব দেশ থেকে ঢালাও অভিনন্দন আসছে ইয়েলিৎসিনের জন্য।
বিদ্রোহী পার্লামেন্ট সদস্যদের সমর্থনে ২০/২৫ হাজার নাগরিক ছিলেন, এদের মধ্যে সম্ভবত কমিউনিস্টরাও ছিলেন। তবে এই পার্লামেন্ট মূলত গরবাচেভের অনুসারী, সেই হিসেবে ইয়েলিৎসিনেরও সমর্থক। কিন্তু ইয়েলিৎসিন যে মাত্রায় সাম্রাজ্যবাদের ভৃত্যে পরিণত হচ্ছিলেন সেটা অনেক সদস্যের পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব হয়নি।
মস্কোবাসীরা পুলিশ মিলিটারী আর মাস্তানদের হামলা গুলি ট্যাংক এগুলোর মোকাবিলা করতে অভ্যস্ত ছিল না, নিশ্চয়ই চরম অবিশ্বাসের সাথে ট্যাংকের গুলি খেয়ে মরেছেন তারা। এখন পর্যন্ত পাওয়া খবরে সামরিক বাহিনীর এই আক্রমণে পার্লামেন্ট ভবনের সদস্যরাসহ পাঁচ শতাধিক নিহত হয়েছেন।
৯.১০.৯৩
গত দুইদিন লেখক শিবিরের সম্মেলন ভালোভাবেই শেষ হলো। কয়েক দফা আমার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন শেষে এবারে নতুন নেতৃত্ব এলো। এবারে সম্মেলন উদ্বোধন করলেন ড. আহমদ শরীফ। সংগঠনের প্রথম দিকে তিনি সভাপতি ছিলেন, ১৯৮১ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। ইদানিং তিনি জামায়াতিদের আক্রমণের লক্ষ্য। উদ্বোধনী অধিবেশনে আরও এসেছিলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সরদার ফজলুল করিম, মামুনুর রশীদ, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, কাজী নূরুজ্জামান। জাহানারা ইমাম আসার কথা ছিল, সেদিন ইলিয়াস ভাইসহ তাঁর বাসায় অনেক সময় খুব ভালো কথাবার্তা হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ায় আটকে গেলেন, এলে খুব ভালো হতো। বিকালে আলোচনা সভায় কথা বললেন খান সারওয়ার মুরশিদ ও সেলিনা হোসেন। বললেন আজফার হোসেন, ্আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক, বদরুদ্দীন উমর। এবারে কেন্দ্রীয় কমিটিতে নতুন করে এলেন আহমদ শরীফ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সেলিনা হোসেন, মামুনুর রশীদ। আরও আছেন- আবদুল কাইউম খোকন, আবরার চৌধুরী, শামীম আখতার। সভাপতি: আবদুল মতিন খান, সাধারণ সম্পাদক- ডা. মনিরুল ইসলাম কচি।
….নানা প্রতিক’লতার মধ্যে এই সম্মেলন যে করতে পারলাম তার জন্য ইলিয়াস ভাই, মুফাদ এবং কচিকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। বিশেষ করে ইলিয়াস ভাইএর উদ্যোগ, উদ্যম ও উৎসাহ না থাকলে আমার পক্ষে সম্ভব হতো না।

১৪.১০.৯৩
প্যারী কমিউনের উপর ছবি দেখলাম। অসাধারণ। কমিউনের আন্দোলন যতো ঘন হচ্ছে ততোই সর্বস্তরের মানুষ তাতে যোগ দিচ্ছেন। এমনকি রাজদরবারের নৃত্যশিল্পী ও ‘পতিতা’রাও এগিয়ে আসছেন। গান হচ্ছে- আন্তর্জাতিক। একটি মেয়ে বলছে- ‘আমাদের আজকের লড়াই সারা পৃথিবীর- আমরা পরাজিত হলেও কেউ আমাদের ভুলবে না। লড়াই চলবে।’ ঠিক!
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নিয়ে লেখক শিবিরের আলোচনা। শওকত আলী বললেন।
১৮.১০.৯৩
তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে জামাতী ও সহযোগীরা যা শুরু করেছে তার বিরুদ্ধে অনেক কিছু করা দরকার। আর কোনো ইস্যু নিয়ে এদের এরকম জোশ দেখা যায়না। তসলিমার এই ইস্যু সমাজের মধ্যবিত্তের এমনকি অনেক রাজনীতিক বুদ্ধিজীবীর চেহারা খুলে দিচ্ছে। পুরুষতন্ত্রের জোর কত!
২৯.১১.৯৩
বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েরা আন্দোলন করছে। হলে মেয়েদের ঢোকার ব্যাপারে প্রশাসন কড়াকড়ি করছে এটাই মুখ্য বিষয় নয়। মুখ্য বিষয় হলো দেলোয়ার হোসেন সাঈদী বা ফতোয়াবাজরা যা প্রচার করে। এর মোদ্দা কথা- ‘মেয়েরা বেশি বেরুবে কেন? ছেলেদের সঙ্গে এত কথা কিসের?’ ‘সতীত্ব শ্ঙ্খৃলা ইত্যাদির দায়ভার মেয়েদের- এবং যাবতীয় বিশৃঙ্খলার উৎসও মেয়েরা।’ সেকারণেই এসবের বিরুদ্ধে আন্দোলনটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছে তাদের সাথে আজ বসেছিলাম। শিক্ষকদের জন্য একটি বিবৃতিও করলাম। জানি না কয়জন এতে সই করবেন।
পরের খবর: ৩১ জন শিক্ষক সই দিয়েছেন। সময় থাকলে আরও পাওয়া যেতো।
৭.১২.৯৩
গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটের সাথে ৫ বামদল, সিপিবিসহ ১০টি বামদল ও জোটের মধ্যে ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনের বিষয়ে ঐকমত্য স্থাপিত হয় এই বছরের প্রথমদিকে। এরপর থেকে বিভিন্ন ইস্যুতে ১০টি বামদল ও জোট ঐক্যবদ্ধভাবে বিভিন্ন সভা সমাবেশ ও মিছিল করে। নভেম্বর মাসে একটি ফ্রন্ট গঠনের ব্যাপারে আলোচনা শুরু হয়। এই আলোচনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যরা ছিলেন খালেকুজ্জামান, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বিমল বিশ্বাস ও আমি। এছাড়া কয়েকটি আলোচনায় হাসানুল হক ইনু এবং মনজুরুল আহসান খান উপস্থিত ছিলেন। আলোচনার এক পর্যায়ে ফ্রন্টের ঘোষণা ও কর্মসূচি লেখার দায়িত্ব গ্রহণ করেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। তাঁর খসড়া নিয়ে আলোচনার পর দ্বিতীয় খসড়া উপস্থিত করেন খালেকুজ্জামান। সেই খসড়া নিয়ে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে সবগুলো শরীক সংগঠন তাদের মতামত লিখিতভাবে জানাবেন। সেই অনুযায়ী আজ আমি জোটের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য জমা দিলাম। জোটের পক্ষ থেকে দেয়া লিখিত বক্তব্যে খসড়ার মৌলিক কিছু বিষয় নিয়ে কথা ছিল আবার ভাষা শব্দের ব্যবহারেরও কিছু সংশোধনী ছিল।
তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অংশ:
বামফ্রন্ট গঠনের উদ্যোগ: খসড়া নিয়ে মন্তব্য
১। ১ নং পৃষ্ঠা, ১ম ও ২য় লাইন: আছে, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংগালি জাতির সুদীর্ঘকালের সংগ্রামের ঐতিহ্যের…’। মন্তব্য: জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির দীর্ঘদিনের সংগ্রাম গৌরবোজ্জল এবং পরবর্তী সংগ্রামের ধারার সঙ্গে তার যোগসূত্র অবিচ্ছেদ্য। তবে এই সঙ্গে এই অঞ্চলে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান শাসন এবং শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে খাসিয়া, হাজং, গারো, সাঁওতাল, চাকমা প্রভৃতি জাতির সংগ্রামও আমাদের ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে। মুক্তিযুদ্ধেও তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। তাদের বিষয়ও এতে উল্লেখ থাকতে হবে।
১০। ….মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তাই শ্রেণীনির্বিশেষে এক নয়। আর বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারাবাহিকতায় একটি গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি পরিষ্কার উল্লেখ থাকা দরকার। এবং ১০ দলের কর্মসূচিতে ‘মুক্তিযুদ্ধের সমাজতান্ত্রিক চেতনা’ কথাটি থাকলে বাগাড়ম্বর থেকে একে আলাদাভাবে সনাক্ত করা সম্ভব। এবং লক্ষ্য নির্দেশও এতে সহজ হয়।…
…মুক্তিযুদ্ধের প্রভাবের মধ্যেই ৭২ এর সংবিধান প্রণীত হয়েছিল বলে তাতে অনেক গণতান্ত্রিক উপাদান ছিল। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও ঠিক যে, বাঙালী শাসক শ্রেণীর ক্ষমতা সংহত হবার প্রক্রিয়ায় তার মৌলিক দুর্বলতাও সৃষ্টি হয়েছিল যার কারণে এই সংবিধান ক্রমান্বয়ে একটি অগণতান্ত্রিক ও সাম্প্রদায়িক দলিলে পরিণত হয়েছে।…
…আর মূলনীতি হিসাবে জাতীয়তাবাদ আমাদের লক্ষ্য ও কর্মসূচীর সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। বলাবাহুল্য যে, সা¤্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের মুখে জাতীয় চেতনার বিকাশ জরুরী বলে আমরা মনে করি কিন্তু জাতীয় চেতনার বিকাশ আর জাতীয়তাবাদী কর্মষূচী এক নয়।…
…সংবিধান প্রশ্নে তাই ৭২ এর সংবিধান এর মোহ পরিত্যাগ করে আরও অগ্রসর, সুসঙ্গতিপূর্ণ গণতান্ত্রিক সংবিধানের লক্ষ্য ঘোষণা করা প্রয়োজন। সংবিধান সংশোধন গণভোট ছাড়া করা যাবে না- এটাও একইসঙ্গে থাকতে হবে।
১১। কর্মসূচীর ৪ নং ধারায় ‘অবৈধ ক্ষমতা’ দখলের বিরুদ্ধে বলা হয়েছে। বোধগম্য যে, অবৈধ ক্ষমতা দখল বলতে এখানে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলকেই বোঝানো হয়েছে। কথাটি সেভাবে স্পষ্টভাবে বলাই ভালো। কেননা ‘অবৈধ’ শব্দটির কোনো সার্বজনীন অর্থনীতি নেই। জনগণের ক্ষমতা দখলের লড়াইও বিদ্যমান আইনের অধীনে অধিকাংশ সময়ে ‘অবৈধ’, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কিংবা সর্বশেষ এরশাদীয় স্বৈরাচার বিরোধী লড়াই অবৈধ…।
১৪। কর্মসূচীতে- ‘৭১ এর ঘাতক দালাল যুদ্ধাপরাধী এবং সেই সঙ্গে স্বৈরাচারের সহযোগী, রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদ আত্মসাৎকারী ও পাচারকারী এবং সিরাজ সিকদার, শেখ মুজিব, কর্ণেল তাহের, জিয়াউর রহমান, নূর হোসেন, ডা. মিলনসহ রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের দায়ে অভিযুক্তদের বিচারের’ ধারা যুক্ত করতে হবে।
২০। ‘পানি উন্নয়ন ও বন্যা সমস্যা’ ধারায় ফ্যাপ ও কাঠামোগত বিদেশি ঋণ-উপদেষ্টা নির্ভর খন্ডিত পরিবেশ বিপর্যযকারী উদ্যোগগুলো প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি সংযুক্ত করতে হবে।
২৪। ‘সংখ্যালঘু সম্প্রদায়’ ধারায় জাতি ও ভাষাগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীসমূহের নাম এবং তাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়টি যুক্ত করতে হবে। পাহাড়ী জনগণের বিরুদ্ধে এযাবতকালের সামরিক শাসন, হত্যাকান্ড, নিপীড়নের বিচার এবং সংখ্যালঘু জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার সম্পর্কে স্পষ্টভাবে বলতে হবে।
এই বক্তব্য জমা দেবার পর আর কোনো সভা ডাকা হয়নি। ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে আকস্মিকভাবে অন্য ৮টি বামদল সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
৯.১২.৯৩
রোকেয়া নিয়ে সকালে জাহাঙ্গীরনগরে আলোচনা হলো। লুনাই প্রধানত আয়োজন করেছে। শামীম, সোনিয়া গিয়েছিলেন। এছাড়া আজফার, হাশেমী ও আমি আলোচনা করলাম। বিকালে এই বিষয়ে লেশির আলোচনা। রোকেয়ার লেখা পড়লে বিস্মিত হতে হয়। কী অপূর্ব দক্ষতা, সাহস ও মেধার সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত অন্ধবিশ্বাসকে ভেঙেছেন, ধর্মের মিথ নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন। নতুন জগতের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, সা¤্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। একইসঙ্গে নারী প্রশ্নকে কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন।
১২.১২.৯৩
গতকাল পূর্ব জার্মানীতে স্থানীয় পরিষদ নির্বাচনে প্রাক্তন ‘কমিউনিস্ট’রা বিজয়ী হয়েছেন। রাশিয়ায় আজ নির্বাচন হচ্ছে। নির্বাচনে স্বৈরতন্ত্রী সংবিধান পাশ না হলে গৃহযুদ্ধ হবে- ইয়েলিৎসিনের হুমকি। গণতন্ত্রের হুমকি!
১৫.১২.৯৩
গতকাল ছিল শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস, সকালে স্মৃতিসৌধ, বিকালে লেশির আলোচনা। আজ সারাদিন ক্লাশের পর বিকালে শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার স্মৃতি পাঠাগারের অনুষ্ঠান। আমি, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আজফার এবং মোস্তফা ফারুক কথা বলেছি। অঞ্চলে অঞ্চলে এসব প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব যে কত তা জুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়।
ডিসেম্বর মাসের এই সময়টাতে একদিকে কপট প্রতারক নানা আয়োজন থাকলেও অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধ, জনগণের লড়াই, ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা, জামায়াতী শক্তিসমূহের আসল চেহারা ইত্যাদি অনেক স্পষ্ট হতে থাকে। টিভি রেডিও অনেক ধামাচাপা দিলেও অনেককিছু ঠিকই বেরিয়ে আসে। মুক্তিযুদ্ধকে কেউ ঢেকে রাখতে পারবে না, এর পরের লড়াইকেও।
১৮.১২.৯৩
সকাল বিকাল দুটো অনুষ্ঠান। সকালে আদিবাসী বর্ষ উপলক্ষে অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ ছিল প্রশান্ত ত্রিপুরার। বেশ ভালো লেখা। ৩২টি সংখ্যালঘু জাতির সমাবেশ ছিল। আমি সকল জাতির সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ভ’মি সমস্যার সমাধান এবং সামরিক বেসামরিক নিপীড়ন বন্ধের দাবিকে জাতীয় দাবিতে পরিণত করার উপর জোর দিলাম।
বিকালে রূপান্তর আয়োজিত রোকেয়া ও লীলা নাগ স্মরণে অনুষ্ঠান। প্রশ্নোত্তরের মধ্য দিয়ে প্রাণবন্ত অনুষ্ঠান। আলোচক ছিলাম আমি, মালেকা বেগম, সুলতানা কামাল, ইলিয়াস ভাই, মোরশেদ, মঞ্জুরুল ইসলাম, শামীম ও সোনিয়া।
২৬.১২.৯৩
সকাল বিকাল ক্লাশ ও পরীক্ষা। এত ভালো ফলাফল, এতরকম বাছাই করে ছাত্রছাত্রী ভর্তি করা হয়। তারপরও এরা এরকম নিস্তেজ, অনাগ্রহী, কৌতুহলহীন কেন হচ্ছে? বেশিরভাগের মধ্যে পড়াশোনা, জানা বোঝার যেন কোনো আগ্রহই নেই। বিস্ময়কর এবং মাঝেমধ্যে হতাশ লাগে।
১০ দলীয় জোট থেকে গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট নিজেদের সরিয়ে নিল।
৩১.১২.৯৩
আমার নতুন বই প্রকাশিত হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ নিরীক্ষণ কেন্দ্র্র থেকে- পুঁজির আন্তর্জাতিকীকরণ এবং অনুন্নত বিশ্ব।’ এটি মূলত উন্নয়ন তত্ত্বের বিভিন্ন ধারা, বিশেষত আধুনিকীকরণ ও নির্ভরশীলতা তত্ত্ব, বেশ কয়েকটি দেশের সা¤্রাজ্যবাদী আধিপত্য থেকে বের হয়ে উন্নয়ন প্রচেষ্টার অভিজ্ঞতা এবং সেই সাথে বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থার পর্যালোচনা। এর তিনটি অধ্যায়ের শিরোনাম-‘অনুন্নত দেশে উন্নয়ন ও পুঁজিবাদের বিকাশ’, ‘অনুন্নত দেশে উন্নয়ন প্রচেষ্টা এবং প্রান্তস্থ সমাজতন্ত্র’ আর ‘পুঁজিবাদী বিশ্ব ব্যবস্থার নিরঙ্কুশ আধিপত্য: উন্নয়ন বিতর্ক ও সম্ভাবনা’।
২৯.৫.৯৪
অধ্যাপক আসহাবউদ্দীন আহমদ মারা গেছেন। বয়স হয়েছিল ৮০। কিন্তু এ বয়সেও তিনি যেরকম উদ্যোগী, উদ্যমী এবং আশাবাদী ছিলেন সেরকম দেখা যায় না। সবসময় নিজে কাজ করছেন, তারপরও আরও কাজ করতে না পেরে নিজের উপর রাগ করছেন, আমাদের তাগাদা দিচ্ছেন। এই সমাজের অসঙ্গতি নিয়ে সবসময় বলছেন, দূর করবার জন্য সংগঠনের তাগিদ দিচ্ছেন। বিপ্লবী আন্দোলনের করুণ দশাতেও ভেঙে পড়ছেন না। ক্রমাগত উৎসাহ দিচ্ছেন অন্যদের। বড় মাপের মানুষ। বাংলা ইংরেজি লেখার হাতও অসাধারণ।
২.৬.৯৪
সকালে গ্যাট, অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে সেমিনার। ভারত থেকে অশোক মিত্রও ছিলেন।
বিকালে অধ্যাপক আসহাবউদ্দীন স্মরণ সভা। শামসুর রাহমান, ফয়েজ আহমদ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী নিজে থেকেই এসেছিলেন। উমর ভাই, ইলিয়াস ভাই তো ছিলেনই।
৫.৬.৯৪
ক্লাশ নিয়ে বের হবার মুখেই শুনলাম তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। আরও ক্ষুব্ধ হলাম যখন জানলাম সরকার নিজে খুঁজে পেতে আমাদের বস্তাপচা আইনের বাক্স থেকে ‘ব্ল্যাশফেমী’ ধরনের আইন বের করে ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগে জামিন অযোগ্য এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। সন্ধ্যায় অফিসে গিয়ে জোট, লেখক শিবির থেকে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ পাঠালাম।
৮.৬.৯৪
ফতোয়াজদের দাপট নিয়ে আরেকটা লেখা শেষ করলাম। কোনো পত্রিকাতে ছাপা হবে কিনা জানি না।…তসলিমার লেখালেখির মধ্যে রাজনৈতিক লেখাগুলো অপরিণত, গল্প উপন্যাস দুর্বল। তবে তাঁর কবিতা ভালো। আর ধর্মীয় বৈষম্য, নিপীড়ন এবং নারী বিষয়ক লেখাগুলো খুবই প্রয়োজনীয়। নারী ্িবষয়ক লেখা ক্ষেপিয়েছে পুরুষতন্ত্র দ্বারা সামান্যও যারা প্রভাবিত তাদের।…বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের মধ্যে একটি ছাড়া আর কেউই তসলিমার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রত্যাহারের জন্য বিবৃতি দেয়নি। আওয়ামী লীগ ইত্যাদি তো নয়ই। ভোটের হিসাব, পুরুষতন্ত্রের প্রভাব।
রাতেই শুনলাম একই আইন দিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে জনকন্ঠ সম্পাদক তোয়াব খান ও বোরহান আহমেদকে। এই আইন দিয়ে আস্তে আস্তে আরও অনেককেই কাবু করা হবে।
৯.৬.৯৪
স্বাক্ষর সংগ্রহের চেষ্টা করছি। কিন্তু দেখলাম তসলিমার ইস্যুতে স্বাক্ষর দিতে অনেকেই রাজী নন, তারা আবার ফতোয়াবাজদের বিরুদ্ধে স্বাক্ষর দিতে রাজী। তবুও সব মিলিয়ে তসলিমার নাম রেখে একটা বিবৃতি তৈরি করলাম।
এদিকে প্রায় প্রতিদিন ফতোয়াবাজ এবং ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী বিভিন্ন গোষ্ঠী লম্ফঝম্ফ করছে, হামলা করছে হুমকি দিচ্ছে।
১১.৬.৯৪
ভর্তি পরীক্ষা।
আজ থেকে ঢাকায় স্কুল শিক্ষকেরা অনির্দিষ্টকাল অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেছেন। প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষক এখন ঢাকা শহরে। সরকার বিশেষত শিক্ষামন্ত্রীর শিক্ষক বিরোধী কথাবার্তা অব্যাহত আছে।
১২.৬.৯৪
আওয়ামী লীগ ৭৩ এ সাধারণ ক্ষমা করে যা করেছিল, ৮০ দশকে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে জামায়াতকে সহযোগী বানিয়ে যা করেছিল এখন তাই আরও বড় আকারে করছে। এখন যুগপতও নয়, ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। একই সঙ্গে শেখ হাসিনা ও জামায়াত নেতা। এই ঐক্য পুরো কাজে লাগাচ্ছে জামায়াত- ব্ল্যাশফেমী আইনের জন্য চাপ দেওয়া, ফতোয়াবাজ নামের ক্ষমতাবানদের সহযোগী নির্যাতকদের উত্থান সবগুলোতে পূর্ণশক্তি নিয়োগ করেছে।
একই সঙ্গে শেখ হাসিনা ও জামায়াত নেতা। এই ঐক্য পুরো কাজে লাগাচ্ছে জামায়াত- ব্ল্যাশফেমী আইনের জন্য চাপ দেওয়া, ফতোয়াবাজ নামের ক্ষমতাবানদের সহযোগী নির্যাতকদের উত্থান সবগুলোতে পূর্ণশক্তি নিয়োগ করেছে।
১৮.৬.৯৪
ইতিহাস বিভাগের সেমিনার। আমার বক্তৃতার শিরোনাম ছিল- ‘ক্রান্তিকালের বিশ্ব ও শক্তির বিন্যাস’। এদেশে এখন যে মুসলিম পরিচয় মুখ্য হয়ে উঠছে তার প্রমাণ সেমিনারেও কিছু পাওয়া গেল।
২২.৬.৯৪
আসহাবউদ্দীন আহমদের স্মরণ সভা হলো বেশ বড় আকারে। অনেকেই ছিলেন।
আজই গোলাম আজমের নাগরিকত্বের পক্ষে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিল। তাই নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনা, পুলিশের সাথে সংঘাত। সারাদেশে যুদ্ধাপরাধী ফতোয়াবাজদের যে বর্বর লম্ফঝম্ফ শুরু হয়েছে তাতে নতুন শক্তি যোগ হলো। এসব ‘আইনের শাসন’ তো সবসময়ই গণবিরোধী, গণশত্রুদের পক্ষে রায় দিয়েছে। এ নিয়ে অবাক হবার কিছু নেই। শক্তি ছাড়া কোনো বড় ঘটনা ঘটেনি। জনগণ সবসময়ই বিদ্যমান আইনের বিরুদ্ধেই বড় ঘটনা ঘটিয়েছেন।
২৬.৬.৯৪
বিকালে শহীদ মিনারের সমাবেশের সময়ও আশংকা হচ্ছিলো কখন না খবর আসে। এই খবর আসবে জানতাম। তারপরও রাতে খবর পেয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। পরদিনের সেমিনারের প্রবন্ধ লেখার কাজ থেমে গেল। সারাক্ষণ জাহানারা ইমামের স্মৃতি।
দায়িত্ববোধ, ইতিহাসবোধ যে একজন ব্যক্তিকে কতটা মনোবল ও শক্তি দিতে পারে জাহানারা ইমাম তার প্রমাণ। গত আড়াই বছর তিনি জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় পার করেছেন। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে এরকম কাজ করা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি এই আন্দোলনে এক প্রবল শক্তি ও প্রতীক হিসেবেই থাকবেন।
দায়িত্ববোধ, ইতিহাসবোধ যে একজন ব্যক্তিকে কতটা মনোবল ও শক্তি দিতে পারে জাহানারা ইমাম তার প্রমাণ। গত আড়াই বছর তিনি জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় পার করেছেন। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে এরকম কাজ করা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।
২৯.৬.৯৪
শহীদ মিনার থেকে জাহানারা ইমামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শোক মিছিল। সন্ধ্যায়ও মিছিল হলো আরও কটি।
যুব কমান্ড অস্ত্র হাতে ঘুরছে, আমাদের হুমকি দিচ্ছে।
গতকালই পত্রিকায় শেখ হাসিনা, নিজামী ও মওদুদের ঐক্যবদ্ধ ছবি।
৩০.৬.৯৪
হরতাল হলো। মালিবাগ এলাকায় কোনো পক্ষই কোনো মিছিল করেনি। দুপুরের পর পল্টনে মুঈনের বাসায় আটকা পড়লাম। চারদিকে মাথায় লালফিতা বাঁধা খুনি চেহারার মানুষেরা দাপট দেখাচ্ছে। কোনোভাবে রাস্তা পেরিয়ে সেগুনবাগিচা দিয়ে প্রেসক্লাব এলাকায় গেলাম। সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী ছাত্রসমাজের সমাবেশ।
৪.৭.৯৪
জাহানারা ইমাম এলেন। আমরা এয়ারপোর্টে। নিজামীর সঙ্গে ঐক্য করেও হাসিনা সেখানে উপস্থিত। জাহানারা ইমামকেও তারা ব্যবহার করবে, নির্বাচনেও করবে। মনে হচ্ছে জাহানারা ইমাম ১০ মিনিটের জন্য বেঁচে উঠলেও হাসিনার গালে চড় লাগাতেন-বকা দিতেন।
সন্ধ্যায় ইলিয়াস ভাইএর বাসায় আজফার, মামুন হুসাইনসহ। লেখক শিল্পীদের বড় সমাবেশ করা দরকার। ব্ল্যাশফেমী এ্যাক্টসহ যাকিছু আক্রমণ সবকিছুর মূল টার্গেট তো লেখা মুক্তচিন্তা বিজ্ঞানমস্কতার সৃজনশীলতার উপর।
৬.৭.৯৪
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরাসরি সমন্বয় কমিটির শোকসভা। …সভার মধ্যেই হৈচৈ। পরে জানলাম বিপ্লবী জোটের লিফলেট যেখানে জামায়াতের সাথে ঐক্য করার জন্য আওয়ামী লীগের সমালোচনা করা হয়েছে তা বিলি করছিল মিঠু আর রবিন। মিঠুর উপর হামলা করেছে আওয়ামী কর্মীরা। অনুষ্ঠান পরিচালনাকারী আওয়ামী লীগ নেতা নূরুল ইসলাম নাহিদ প্রচারপত্র বিতরণকারী কর্মীকে পকেটমার হিসেবে অভিহিত করেন। মনজুরুল আহসান খানকেও গালাগালি করেছে তারা। জামায়াতীদের সাথে ঐক্য করার পর আওয়ামী আক্রমণ শুরু হয়ে গেল বামদের বিরুদ্ধে।
গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটের প্রতিবাদপত্র
আওয়ামী লীগ সমন্বয় কমিটিতেও আছে আবার জামায়াতের সাথে ঐক্য করছে এই দ্বিচারিতার প্রতিবাদ জানিয়ে জোট থেকে আমরা লিখিত প্রতিবাদ জানাই ১০ জুলাই ১৯৯৪ সমন্বয় কমিটির সভায়। যতদূর মনে পড়ে আমার সাথে আরও ছিলেন ফয়জুল হাকিম লালা এবং বকুল রহমান। এর আগের কয়েক মাসে আওয়ামী লীগের জামায়াতপন্থী ভ’মিকার তীব্র নিন্দা করে পত্রের শেষে বলা হয়-
‘…আমরা মনে করি, জামাতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ঐক্যের ফলে দেশব্যাপী ঘাতক দালাল, যুদ্ধাপরাধীরা বাড়তি শক্তি পেয়েছে।…আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি জামায়াতের সাথে ঐক্য, নিজামীর সাথে বৈঠক এবং সমন্বয় কমিটিতে অবস্থান একসাথে চলতে পারে না। সমন্বয় কমিটির আন্দোলনের প্রতি ন্যূনতম আনুগত্য এবং শহীদ জননী জাহানারা ইমামের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধা থাকলে যে কেউ আওয়ামী লীগের এই ভ’মিকার বিরোধিতা করবেন। আওয়ামী লীগকেও এক্ষেত্রে তার যে কোনো একটি অবস্থান গ্রহণ করতে হবে।…’
অন্যরা এবিষয়ে কোনো প্রতিবাদ করেনি, এ ব্যাপারে আর কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি, আওয়ামী লীগও দুই নৌকায় পা রেখেই গলা উচিয়ে কথা বলতে থাকে। ফলে আমাদের এতে যাওয়া বন্ধ্ হয়ে যায়।
১৭.৭.৯৪
সকালে ক্লাশ করে দুপুরে সরাসরি ইলিয়াস ভাইএর কলেজে। আজফারসহ। প্রথমে গেলাম আর্ট কলেজে। শামীম সিকদার ভালো একটা লিফলেট দিয়েছেন। রফিকুন্নবী ভাইএর সাথেও কথা হলো। সমাবেশে শিল্পীদের উপস্থিতি খুব দরকার। মুফাদের বাসা হয়ে একসঙ্গে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র, সময়, ডেইলি স্টার, শাহবাগ, জনকন্ঠ গেলাম। মাঝখানে খালিকুজ্জামান ইলিয়াসের বাসায়।
আজফার বিভিন্ন পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের ব্যাপারে বেশ ভালো গুছিয়েছে। ইলিয়াস ভাইও খুব ভালো যোগাযোগ করছেন।
সবমিলিয়ে লেখক শিল্পী সমাবেশের প্রস্তুতি ভালো। ঘোষণার খসড়ার দায়িত্ব আমার। বক্তব্য ও ৭ দফা কর্মসূচি।
২১.৭.৯৪
আমরা যেরকম আশা করেছিলাম তার থেকে ভালো সমাবেশ হলো। বাংলাদেশের নেতৃস্থানীয় লেখক শিল্পীদের পাশাপাশি তরুণ যারা ঢাকায় আছেন তারা প্রায় সবাই উপস্থিত হয়েছিলেন। সময়ের আগেই অনেকে এসেছেন। আমি পরিচালনা করলাম।…পরিস্থিতি বিবেচনা করে একটু তাড়াহুড়া করেই শেষ করতে হলো। মিছিল খুব ভালো হয়েছে। খুবই প্রয়োজনীয় একটা কাজ হলো। কৃতিত্ব বেশিরভাগ ইলিয়াস ভাই ও আজফারের। মুফাদও অনেক কাজ করেছে।
আবদুল মতিন খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে বক্তব্য রাখেন কয়েকজন- শামসুর রাহমান, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক, আজফার হোসেন, মামুনুর রশীদ এবং সৈয়দ হাসান ইমাম। এছাড়া সহ¯্রাধিক প্রবীণ তরুণ লেখক শিল্পীর মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আবু ইসহাক, খান সারওয়ার মুরশিদ, বদরুদ্দীন উমর, নীলিমা ইব্রাহিম, আনিসুজ্জামান, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, রাবেয়া খাতুন, হায়াৎ মামুদ, সোহরাব হাসান, আহমদ রফিক, কাজী শাহেদ আহমেদ, কামাল লোহানী, ফয়েজ আহমেদ, কাজী নূরুজ্জামান, সাইয়িদ আতিকুল্লাহ, শওকত আলী, সিকদার আমিনুল হক, রশীদ হায়দার, আজিজ মেহের, ঢালী আল মামুন, মকবুলা মনজুর, আহমেদ কামাল, জাহেদা আহমেদ, শামীম আখতার, সোনিয়া নিশাত আমিন, পান্না কায়সার, লুতফর রহমান শাজাহান, শামীম সিকদার, আতাউর রহমান, সারা হোসেন, মওলানা আবদুল আউয়াল, লুৎফর রহমান রিটন, আবুল হাসানাৎ, শামসুজ্জামান খান, মামুন হুসাইন, শাহাদুজ্জামান, প্রশান্ত ত্রিপুরা, আইনুন নাহার, মেঘনা গুহ ঠাকুরতা, খালিকুজ্জামান ইলিয়াস, কায়সুল হক, ত্রিদিব দস্তিদার প্রমুখ। এছাড়া রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা কর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন। পরে খুব ভালো মিছিল হয়েছে।

সমাবেশের ঘোষণা ও দাবিনামা
সারাদেশে, গ্রাম শহর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্র ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ ফতোয়াবাজ যুদ্ধাপরাধীরা যে নৈরাজ্য খুন জখম ও বাক চিন্তার স্বাধীনতা হরণের উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে তাতে আমরা সকলেই উদ্বিগ্ন ও আক্রান্ত বোধ করছি। বিভিন্ন ঘটনা, খবর এবং বক্তব্য থেকে এটা এখন স্পষ্ট যে, এই বর্বর, কুপমন্ডুক, ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিসমূহের আক্রমণের সাধারণ লক্ষ্যবস্তু নারী, লেখক শিল্পী বিজ্ঞানী সাংবাদিকসহ সৃজনশীল মননশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত বিদ্বৎসমাজ, এবং সেইসাথে এইদেশে একটি মানবিক সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক শক্তি বিকাশের জন্য সচেষ্ট প্রগতিশীল রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক সামাজিক শক্তি গোষ্ঠী ও সংগঠনসমূহ। সমাজের অগ্রগতি, গণতান্ত্রিক চিন্তাচেতনা ও শক্তির বিকাশ, মুক্ত ও সৃজনশীল চিন্তা এবং বিজ্ঞানমনস্কতার পক্ষে যাবতীয় কথা কাজ বা উদ্যোগের বিরুদ্ধে তারা খড়গহস্ত। এই অপশক্তিসমূহের নেতৃত্বে আছে একাত্তরের ঘাতক দালাল বা যুদ্ধাপরাধীরা।
ধর্মের নামে সর্বত্র তারাই ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন বিস্তার করেছে। হত্যা, হত্যার হুমকি, সশস্ত্র আক্রমণ, সন্ত্রাস সৃষ্টি তাদের প্রতিদিনের কাজ। নূরজাহান ফিরোজাদের হত্যা, স্কুল ভাঙা, মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভাঙা, লেখক শিল্পীদের মুরতাদ ঘোষণা, সংবাদপত্রে আক্রমণ ও হত্যার হুমকি তাদের সাম্প্রতিক কর্মকান্ডের কিছু উদাহরণ। সরকার ও প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদে তারা প্রচলিত আইন ভঙ্গ করেই এসব কাজ করছে। বলাই বাহুল্য, তাদের বিবেচনায় সকল বিজ্ঞানমনস্ক, সামাজিকভাবে দায়িত্ববান, ইতিহাস সচেতন, সৃজনশীল এবং ঘাতক দালাল বিরোধী ব্যক্তিই মুরতাদ বা ধর্মদ্রোহী।
তারা কথায় কথায় বিভিন্ন ব্যক্তিকে ধর্মদ্রোহী কাফের আখ্যা দিচ্ছে যা অনেক ইসলাম ধর্ম বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিতে ইসলাম ধর্মেও অনুমোদিত নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে কাউকে ধর্মদ্রোহী, কাফের ঘোষণার অধিকার কোনো ব্যক্তি, দল বা রাষ্ট্রের নাই। কিন্তু এই দুর্বৃত্তরা এই কাজটিই করছে ইসলাম ধর্মের নামে।
ইদানিংকালে ধর্মের নামে ফ্যাসিবাদী এসব বর্বর কাজ ও অপচেষ্টাকে বৈধ ও আইনী রূপ দেবার জন্যই উপরোক্ত অপশক্তিসমূহ ‘ব্ল্যাশফেমি এ্যাক্ট’ নামের একটি কালাকানুন জারীর জন্য উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। ইতিমধ্যে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের অনুকরণে এই আইনের একটি প্রস্তাব সংসদে পেশ করেছে। বলাই বাহুল্য, এই আইন এবং বর্বরতা সমার্থক। এই আইন না থাকা অবস্থাতেই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী এবং তাদের সহযোগী শক্তিসমূহের যে বর্বর লম্ফঝম্ফ দেখা যাচ্ছে তাতে এটি জারী হলে এই সমাজ যে আরও ভয়াবহ নৈরাজ্য ও অন্ধকারের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।
যে পাকিস্তানের অনুকরণে এই আইন প্রস্তাব করা হয়েছে সেই পাকিস্তানেই এই আইন যে নৈরাজ্যিক খুনখারাবী হয়রানি ও ফ্যাসিবাদী আবহাওয়ার সৃষ্টি করেছে তা পাকিস্তানের বর্তমান আইনমন্ত্রীই স্বীকার করেছেন। হাজার হাজার ব্যক্তিকে এই আইনের আওতায় জেলে পোরা হয়েছে, সারাদেশে সৃষ্টি করা হয়েছে সন্ত্রাস, আইনমন্ত্রী লেখক শিল্পী এমনকি আখতার হামিদ খানের মতো, ডানপন্থী বর্ষিয়ান সামাজিক সংগঠকের বিরুদ্ধেও হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে।
এই আইন প্রস্তাব করা হয়েছে ইসলাম ধর্মরক্ষার নামে। কিন্তু এই আইন পাশ হলে ইসলাম ধর্ম ব্যবহার করে এই ধর্মের মধ্যেই বহুমত ও পথের অনুসারীদের মধ্যে রক্তাক্ত সংঘাতের সৃষ্টি হবে, পরস্পর কাফের আখ্যাদান-মৃত্যুদন্ড ঘোষণা, পরস্পরবিরোধীদের মসজিদে হামলা ইত্যাদি পাবে আইনগত বৈধতা। এই আইন নারী সমাজকে আরোও বেশি অবরুদ্ধ করবে, নারী নেতৃত্ব নিষিদ্ধ করবে, নারীদের কর্মসংস্থানে বাধাদান করবে। বিজ্ঞান ও আধুনিক শিক্ষাকে এই আইন ধর্মদ্রোহী হিসেবে ঘোষণা করে এ সমাজকে অশিক্ষার গভীর অন্ধকারে নিক্ষেপ করবে। এই সমাজে নিষিদ্ধ হবে শিল্পচর্চা, বুদ্ধিচর্চা, বিজ্ঞানচর্চা। জনগণ মস্তিষ্কহীন, চেতনাহীন জড়বস্তুতে পরিণত হবে এবং বর্বর কুশিক্ষিত ঘাতক দালালদের অধীনে বাস করতে বাধ্য হবে।
এই আইন পাশ হলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনসমূহ আখ্যায়িত হবে ধর্মবিরোধী হিসেবে, এবং এতে অংশগ্রহণকারী ও শহীদ জনগণ রাষ্ট্রদ্রোহী ধর্মদ্রোহী হিসাবে শাস্তির আওতায় আসবে। দেশপ্রেমিক হবে নরঘাতক দুর্বৃত্তরা।
খ্রীষ্টান মৌলবাদী ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীরা এক সময়ে আধুনিক বিজ্ঞান প্রযুক্তি, সৃজনশীলতা ও মুক্তচিন্তাকে প্রতিহত করবার জন্য যে ব্ল্যাশফেমি আইন পাশ করেছিল, এদেশের মুসলমান মৌলবাদী ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীরা সেই আইনই ইসলাম রক্ষার কথা বলে সামনে নিয়ে আসছে। বিশ্বব্যাপী খ্রীষ্টান-ইহুদী-হিন্দু-মুসলমান মৌলবাদী ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীরা এভাবেই পরস্পর ঐক্যবদ্ধ এবং বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ খ্রীষ্টান-ইহুদী-হিন্দু-মুসলমান জনগণের আত্মবিকাশের পথে প্রধান প্রতিবন্ধক।
ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীরা এক সময় ইউরোপে পুড়িয়ে মেরেছিল বিজ্ঞানী ব্রুনোকে, নারীযোদ্ধা জোয়ান অব আর্ককে, শৃঙ্খলাবদ্ধ করেছিল গ্যালিলিওকে। কোপার্নিকাসসহ বহু বিজ্ঞানী এদের জন্যই সামনে অগ্রসর হতে পারেননি। অতীতে এদেশে এই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীরাই নজরুল রোকেয়াকে কাফের আখ্যা দিয়েছে। মীর মোশাররফ হোসেন, কাজী আবদুল অদুদ, আবুল মনসুর আহমদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহও এদের দৃষ্টিতে কাফের বা মুরতাদ। কাজেই এদের ক্ষমতা বৃদ্ধি আর সমাজের গভীর অন্ধকার নৈরাজ্যে পতন যে সমার্থক তা অধিক ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই।
এই পরিস্থিতিতে এই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীদের প্রতিরোধ এবং ব্ল্যাসফেমি আইনসহ যে কোনো নিপীড়নমূলক আইন প্রতিহত করার জন্য বাংলাদেশের জনগণের মুখপাত্র হিসেবে লেখক শিল্পী বিজ্ঞানী শিক্ষক সাংবাদিক সাংস্কৃতিক কর্মী সংগঠক তথা সমগ্র বিদ্ব্যৎ সমাজের দায়িত্বই সব থেকে বেশি। ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী যুদ্ধাপরাধী ফতোয়াবাজদের ধর্মের নামে বর্বর অন্ধকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চক্রান্তের বিপরীতে আলোকোজ্জল মানবিক মুক্ত সৃজনশীল সমাজ প্রতিষ্ঠার পক্ষে বিদ্ব্যৎ সমাজের ভ’মিকাই সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। জনমত সংগঠন সৃজনশীলতায় নেতৃত্ব তাঁদেরই দিতে হবে। এই সমাবেশ থেকে আমরা সারাদেশের লেখক শিল্পী বিজ্ঞানী সাংবাদিক সাংস্কৃতিক সংগঠকদের এই কাজে সমবেত, সক্রিয় ও নেতৃত্ব দানের আহবান জানাই। আমরা দেশের সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনকে ব্ল্যাশফেমি আইন প্রবর্তনের চক্রান্তের বিরুদ্ধে এবং ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী যুদ্ধাপরাধী ফতোয়াবাজদের বিরুদ্ধে সরব, সক্রিয় ঐক্যবদ্ধ ভ’মিকা পালনের আহবান জানাই।
এই সমাবেশ থেকে আমরা সারাদেশের বিদ্ব্যৎ সমাজের পক্ষ থেকে দাবি উত্থাপন করি:
* ১৯৭১ সালের ঘাতক দালাল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তি হতে হবে। প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক বীমাসহ সকল ক্ষেত্র থেকে তাদের অপসারণ করতে হবে। তাদের রাজনৈতিক সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে।
* ধর্মকে রাজনীতি, সন্ত্রাস, খুন, নির্যাতন, কুৎসার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে আইন প্রণয়ন করতে হবে।
* সকল নাগরিকের তার নিজস্ব ধর্ম পালনের পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কারও ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে কটাক্ষ করা কিংবা কাউকে ধর্মদ্রোহী কাফের আখ্যা দেয়াকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ধর্মকে রাষ্ট্র ও রাজনীতির আওতা থেকে মুক্ত করতে হবে।
* সার্বজনীন পারিবারিক আইন চালু করতে হবে। সংবিধান অনুযায়ী সকল ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
* অভিন্ন, বিজ্ঞানভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক সার্বজনীন শিক্ষা চালু করতে হবে।
* লেখক সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে জারীকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। হয়রানি বন্ধ করতে হবে। লেখক শিল্পীর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
* বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, শিল্প সাহিত্য, সাংবাদিকতাসহ সৃজনশীল চিন্তাশীল সকল কাজের ক্ষেত্রকে প্রত্যক্ষ পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করতে হবে। চিন্তার প্রকাশ বাধামুক্ত হলে, মতের আদান প্রদান বিতর্কের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করলেই কেবলমাত্র সকলের পক্ষে সঠিক ও ভ্রান্ত চিন্তাকে সনাক্ত করা সম্ভব হবে। ২১ জুলাই ১৯৯৪
(সূত্র: পাক্ষিক জনযুগ, সম্পাদক: মাহবুবুর রহমান। ঢাকা, আগস্ট ১৯৯৪।)
২৫.৭.৯৪
বিবিসি ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রপন্থী উন্মাদনা সম্পর্কে ইদানিং কিছু কিছু খবর আসছে। কিন্তু খুবই একপেশে। এসব খবর দেখে মনে হবে এদেশে এখন উন্মাদ বর্বরদের অবাধ রাজত্ব, আর কোনো সমস্যা নাই। তসলিমা ছাড়া আর কেউ বলার নেই, কোনো প্রতিবাদ প্রতিরোধ হচ্ছে না!
২৭.৭.৯৪
গতকাল চট্টগ্রামে গোলাম আজমের সমাবেশ ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের সমাবেশ নিয়ে প্রবল উত্তেজনা ছিল দিনভর। শেষ পর্যন্ত বিডিআর পুলিশ প্রহরায় গোলাম আজমদের সভা। কিন্তু সংঘাতে নিহত হয়েছেন ৫ জন!
ক্লাশ এবং বিশ্বব্যাংক নিয়ে সেমিনার প্রবন্ধ লেখার চাপ। মন বসানো মুশকিল।
এদিকে সারাদিন বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের প্রতিবাদ সমাবেশ। আওয়ামী লীগ আসেনি তবে বহু সংগঠন ও মানুষ ছিল। বক্তৃতা দিয়েছেন প্রায় ৫০ জন। মঞ্জু ভাই খুব ভালো সভা পরিচালনা করেছেন।
৩১.৭.৯৪
চট্টগ্রাম সহিংসতার প্রতিবাদে গতকাল হরতাল হয়েছে। এদিকে ছাত্রছাত্রীদের গবেষণা রিপোর্ট প্রায় ৭০টি। সকালে ক্লাশ। বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ নিরীক্ষণ কেন্দ্রে আমার বক্তৃতা- ধর্ম, রাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন।
৬.৮.৯৪
গতকাল বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের ৫০ বছর নিয়ে সেমিনার। তীতুমীরদের উদ্যোগ, আমার মূল প্রবন্ধ। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের প্রতিনিধিরা ছিলেন। জবাব দিতে চেষ্টা করলেন, জমলো না। রেহমান সোবহান সভাপতির ভাষণে ভালই ধোলাই দিলেন। আরও আলোচনা করলেন মোজাফফর আহমদ, স্বপন আদনান, দেবপ্রিয়। রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য আরও সুর্নিদষ্ট হওয়া দরকার ছিল।
আজফার আজ লেখক শিবিরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব নিল। অল্পদিনেই ও সবার আস্থা অর্জন করেছে।
১০.৮.৯৪
তসলিমা দেশ ছেড়ে সুইডেন চলে গেলেন, যেতে বাধ্য হলেন। একজন লেখককে লেখার জন্য দেশ ছাড়তে হচ্ছে এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সরকার দুইক’ল-ঘরে ধর্মান্ধ ফ্যাসিস্ট, বাইরে আন্তর্জাতিক চাপ- রক্ষার ব্যবস্থা করলো। বাইরের চাপকে যেভাবে অনেকে ‘সা¤্রাজ্যবাদী চক্রান্ত’ হিসেবে দেখছে আমার ঠিক সেরকম মনে হয় না। বিভিন্ন দেশে নারী আন্দোলনের চাপ ও শক্তির প্রভাব, মানবাধিকার আন্দোলনের প্রভাবও এতে কাজ করেছে। …তসলিমার বেশ খিছু লেখায় অপরিণত বা উস্কানির উপাদান আছে ঠিকই কিন্তু ফ্যাসিবাদীরা তার উপর ক্ষেপেছে প্রয়োজনীয় নারী বিষয়ক পরিণত লেখার জন্য। তসলিমা নারী বিষয়ক লেখাতে হয়তো সমাজ অর্থনীতির সাথে যুক্ত করে কোনো তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করতে পারেননি কিন্তু ব্যক্তি, পরিবার, ধর্মীয় কর্তাব্যক্তিদের পর্যায়ে নারীর অবস্থান সম্পর্কে ওর পর্যবেক্ষণ এতই সহজ ও তীব্র যে তা বেশিরভাগ মানুষকে নাড়া দিয়েছে।…একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পর্যায়ে সমাজের নারী বিষয় এবং মেয়েদের ধরে একটা বড় ঝাঁকি দেয়ায় ওর কৃতিত্ব অবশ্যই স্বীকার করতে হবে।
তসলিমা দেশ ছেড়ে সুইডেন চলে গেলেন, যেতে বাধ্য হলেন। একজন লেখককে লেখার জন্য দেশ ছাড়তে হচ্ছে এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সরকার দুইক’ল-ঘরে ধর্মান্ধ ফ্যাসিস্ট, বাইরে আন্তর্জাতিক চাপ- রক্ষার ব্যবস্থা করলো।
তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে বিবৃতি
লেখক ও কবি তসলিমা নাসরিনের দেশে প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে দেশে আবার এক ফ্যাসিবাদী উন্মাদনা তৈরির পাঁয়তারা চলছে। দৈনিক পত্রিকায় তসলিমা নাসরিনের দেশে ফেরত আসার ব্যাপারে অনির্দিষ্ট খবর ছাপার পর থেকে যুদ্ধাপরাধী ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী দলগুলো আক্রমণাত্মকভাবে মিছিল সমাবেশ শুরু করেছে এবং ফ্যাসিবাদী হুংকার দিচ্ছে।
আমরা দৃঢ়ভাবে একথাটি জানিয়ে দিতে চাই যে, বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে এদেশে তসলিমা নাসরিনের ফেরত আসা ও বসবাসের পূর্ণ অধিকার আছে, তাঁর পূর্ণ অধিকার আছে এদেশে বসে লেখার ও নিজস্ব মত প্রকাশের। এ ব্যাপারে যারাই বাধা সৃষ্টি করবে তাদের বিরুদ্ধেই আমরা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।
আমরা মনে করি, যুদ্ধাপরাধী ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীরা ধর্মের বর্ম গায়ে দিয়ে ৭১এ গণহত্যা করেছিল, তারপরও একের পর এক শাসক শ্রেণীর বিভিন্ন সরকারের প্রশ্রয়ে এবং পৃষ্ঠপোষকতার কারণে উচ্ছেদ হবার পরিবর্তে এমনভাবে বেড়ে উঠেছে যে, এখন লেখক শিল্পী সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান কর্মীদের মুরতাদ ইত্যাদি বলে ফ্যাসিবাদী হুমকি ধামকি আক্রমণ চালাচ্ছে।
আমরা অবিলম্বে এসব অপতৎপরতার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি এবং এদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ সৃষ্টির জন্য সকল গণতান্ত্রিক শক্তির প্রতি আহবান জানাচ্ছি।
২৬.৮.৯৪
গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটের জাতীয় প্রতিনিধি সভা। কয়েক বছরের মধ্যে এবারই সবচাইতে সংগঠিতভাবে এই সভা হলো। এর জন্য কৃতিত্বের প্রধান দাবিদার লালা, আহাদ, হাসিব, উদয় এবং রবিন। আলোচনা খুব গোছানো ছিল, অংশগ্রহণও ভালো হয়েছে।
বুর্জোয়াদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিপরীতে অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার বা বিপ্লবী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা ও রূপরেখা উপস্থিত করতে গিয়ে আমি প্রায় সবারই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি। ‘সংস্কারবাদী’ হয়ে গেলাম কিনা এই নিয়ে অনেকের প্রশ্ন। ঠিক যেভাবে চিন্তার গঠন এর একটু বাইরে গেলেই মাথায় প্রশ্ন আসে। কিন্তু এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে বোঝাতে পেরেছি মনে হয়।
২৭.৮.৯৪
সকাল থেকে কৃষক মজুর ঢেপারেশনের সভা করে বিকালে নারায়ণগঞ্জ। সেখানে তরুণদের গড়ে তোলা সংগঠন ‘আরজ আলী স্মৃতি পরিষদ’ এবং ‘ধাবমান’ সহ কয়েকটি সংগঠনের উদ্যোগে অনুষ্ঠান। আরজ আলী ও নজরুল নিয়ে আলোচনা। বিভিন্ন বয়সের ছেলেমেয়েরা ছিল। ওখানে নিয়মিত পাঠচক্র, গান, কবিতার চর্চা হয়। আলোচনার পর ওরা আলাদা করে বসলো। এসব জায়গায় গেলে ভরসা পাই। ফিরতে ফিরতে অনেক রাত।
১.৯.৯৪
ইসলামী ছাত্র শিবির জাহাঙ্গীরনগর বাসে হামলা করেছে। ক্যাম্পাসে ঢুকবার জন্য তারা এখন মরিয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গুলিতে এক ছাত্র নিহত। আরেক ছেলে মা-র উপর অভিমান করে আত্মহত্যা করেছে!
১১.৯.৯৪
পরপর তিনদিন হরতাল অবরোধ। আওয়ামী লীগ, জামায়ত ও জাতীয় পার্টির কর্মসূচি। অন্যদিকে আগের দিন থেকে বিএনপির উদ্যোগে বাস ট্রাক ধর্মঘট ছিল।
১৫.৯.৯৪
ড. আনিসুর রহমান আজ সমাজবিজ্ঞান অনুষদ আয়োজিত ‘আখলাকুর রহমান স্মারক বক্তৃতা’ দিলেন। খুব সমৃদ্ধ বক্তৃতা। নিও ক্ল্যাসিকাল অর্থনীতির সমালোচনা, তৃণমূল-স্বনির্ভর উন্নয়নের ধারণা, সেই সাথে মার্কসীয় আন্দোলন সম্পর্কে কিছু চিন্তা। মূলধারার অর্থনীতিবিদদের মতো প্রাণহীন গতানুগতিক ভাষা ছিল না, সাহিত্যবোধ- দায়িত্ববোধ ছিল- এসব কারণে অনেক জীবন্ত হয়েছে।
বিকালে লেখক শিবিরের সাপ্তাহিক আলোচনা। আশীষ খন্দকারের ‘থিয়েটার’।
১.১০.৯৪
কয়দিন কিউবার প্রতিনিধিদের সাথেই গেল। ২৯ তারিখ প্রেসক্লাবে কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধিদের আলোচনা। সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা থাকলেও মার্কিন অবরোধের বিরুদ্ধে বিশ্বজনমত গঠনের জন্য পার্টি বিভিন্ন দেশে প্রতিনিধি পাঠাচ্ছে। প্রচার মাধ্যমের একচেটিয়া আধিপত্যের মধ্যে আচ্ছন্ন লোকজন এ থেকে কিছু সত্যের খোঁজ পেতে পারেন। আমাদের প্রচার মাধ্যমের শেকড়ও একই জায়গায়। তারাও এসব বক্তব্য প্রচার করতে চায় না।
গতকাল কিউবার সংহতি কমিটির সাথে সভা হলো। তাঁরা তাঁদের সাফল্য, ব্যর্থতা, সমস্যা সম্ভাবনা, দুর্বলতা শক্তির কথা বললেন। প্রশ্ন, মন্তব্য হলো। সহজ, নিরাভরণ, গণচরিত্রসম্পন্ন মানুষ তাঁরা। কিউবার পাশে এক দানবের ৩০ বছরের বেশি সময়ের অবরোধ, হুমকি, আক্রমণ, চক্রান্ত সত্ত্বেও কী করে টিকে থাকছে সেটা খুবই বিস্ময়কর মনে হবে। কিন্তু খোঁজ নিলে দেখা যাবে মূল কারণ জনগণের মধ্যে পার্টি ও রাষ্ট্রকাঠামোর শেকড়। জনগণ থেকে পার্টি সোভিয়েত বা পূর্ব ইউরোপীয় পার্টিগুলোর মত বিচ্ছিন্ন হয়নি।
আজ আমাদের অফিসে তাঁদের বক্তৃতা আলোচনা হলো। আজকের আলোচনা অনেক গোছানো হয়েছে।
১৮.১০.৯৪
প্রগতিশীল রাজনীতি, বিদ্যাচর্চা, নারী আন্দোলন সবক্ষেত্রে একটি পেশার মানুষদের সম্পর্কে, মুখ্যত নারী, প্রকট নীরবতা আছে। এরা হলো- ‘বুয়া’, ‘ছেমরি’, ‘বেটি’, ‘মাতারি’..। মধ্যবিত্তের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় কিন্তু সামাজিকভাবে হেয় এই পেশার মানুষদের সাথে মধ্যবিত্তের প্রয়োজন-অবিশ্বাস-র্ঘণার সম্পর্ক। একেবারে ভেতরে গিয়ে এখানে প্রাকপুঁজিবাদী অবশেষ, আধুনিক দাসপ্রথা। কাজের সময়সীমা নেই, ব্যক্তিগত সম্পত্তির মত ব্যবহার, অনেক ক্ষেত্রে মাগনা শ্রম, যৌন শারীরিক নির্যাতন সবই চলে। সাংস্কৃতিক দিকটি যেন জাতিভেদ বা দাসত্ব দেখায়। খাট থাকলেও নীচে থাকতে হবে, চেয়ারে বসতে পারবে না, জোরে হাসতে পারবে না, ব্যক্তিগত জীবন পরিকল্পনা করতে পারবে না। এবং যেকোনো কিছু হারানো গেলে প্রথম সন্দেহভাজন হবে সে।
এই নিয়ে রূপান্তরে লিখেছি।
প্রগতিশীল রাজনীতি, বিদ্যাচর্চা, নারী আন্দোলন সবক্ষেত্রে একটি পেশার মানুষদের সম্পর্কে, মুখ্যত নারী, প্রকট নীরবতা আছে। এরা হলো- ‘বুয়া’, ‘ছেমরি’, ‘বেটি’, ‘মাতারি’..। মধ্যবিত্তের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় কিন্তু সামাজিকভাবে হেয় এই পেশার মানুষদের সাথে মধ্যবিত্তের প্রয়োজন-অবিশ্বাস-র্ঘণার সম্পর্ক।
১০.১১.৯৪
আজ বামফ্রন্টের হরতাল হলো। বেশ ভালোই হয়েছে।
আলীগ জামায়াত জাতীয় পার্টির জোরজবরদস্তির আন্দোলন চলছে। ওরা আবার ১২/১৩ হরতাল ডেকেছে। তাদের হরতাল এখন হচ্ছে কোনো পরিশ্রম না করে কোনো কর্মসূচি পালনের নাম।
১.১২.৯৪
গত কয়েকদিনে অসুস্থ থাকার সুবাদে এই সময়ের বেশ কয়েকটি বই পড়া হলো। এর মধ্যে আছে নাওয়াল আল সাদাইএর হিডেন ফেস অব ইভ, মার্গারেট রানডেল এর গেদারিং রেজ, গীতা সেহগাল এর রিফিউটিং হোলি অর্ডারস, রায়া দানিয়াভাস্কার রোজা লু´েমবুর্গ এন্ড উইমেন লিবারেশন, তসলিমার নির্বাচিত রচনাবলী, উর্মির অতিথি, মীনাক্ষীর জেল থেকে জেল, মার্লিন স্টোন এর হোয়েন গড ওয়াজ উইম্যান। এখন পড়ছি আরব্য উপন্যাস, ভাই গিরিশচন্দ্রের অনূদিত কোরান শরীফ, টফলারের পাওয়ার শিফট।
৬.১২.৯৪
এবারের বিজয়ের ডিসেম্বরে পরাজিতদের লম্ফঝম্ফই প্রধান ঘটনা। এরশাদের জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী আজ খুব আওয়াজ দিয়ে জনসভা করলো। জাপা বিনা বাধায়, জামায়াত ঢাকঢোল পিটিয়ে গোলাম আজমকে নিয়ে। আওয়ামী লীগ এ দুটো পার্টিকে ভালো সার্ভিস দিচ্ছে!
১২.১২.৯৪
কোর্সের অংশ হিসাবে ছাত্রছাত্রীদের মাঠ গবেষণায় যুক্ত করায় ওরা খুবই উৎসাহী। এতে আমার অনেক সময় যাচ্ছে ঠিকই কিন্তু এগুলো তো খুবই দরকার। ওদের মাঠকর্ম নিয়ে বেশ কয়েকটি সেমিনার হলো গত কিছুদিনে। এগুলো হলো- ‘মাদ্রাসা শিক্ষা ও সংস্কৃতি’, ‘গারো সমাজ ও সংস্কৃতি’, ‘গ্রামীণ সমাজ ও তাঁতী’, ‘মাজার’, ‘ফতোয়াবাজ’, ‘জেলে’, ‘তাঁতী’, ‘চরের মানুষ’, ‘ছিন্নমূল মানুষ’, ‘গার্মেন্টস শ্রমিক’, ‘ঢাকার আদিবাসী’।
১৮.১২.৯৪
কবিরাজ শ্রী নিকেতন চক্রবর্তী ব্যবসায়ী নন। সাধক, বিজ্ঞানী। আয়ুর্বেদকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে চেষ্টা করছেন। এদেশে এব্যাপারে আগ্রহ নেই। আগ্রহ করে যখন বহুজাতিক কোম্পানিগুলি এ নিয়ে ব্যবসা শুরু করবে। এখন আছে প্রধানত ফটকা ব্যবসা।
২৫.১২.৯৪
আইজাজ আহমদ বর্তমান সময়ের গুরুত্বপূর্ণ লেখক ও তাত্ত্বিক। গতকাল ইংরেজি বিভাগে তাঁর বক্তৃতা শুনলাম। বিষয় ছিল ‘ভারতে সাম্প্রদায়িকতা’। আজ লেখক শিবিরের অফিসে আলোচনা ছিল। বিষয়- ‘মার্ক্সবাদের ভবিষ্যৎ’। দুদিনে তিনি যে আলোচনা করলেন তার সাথে এ বিষয়ে গত কিছুদিনে বেড়ে উঠা আমার চিন্তারও মিল পেলাম। অবশ্যই তাঁর বক্তব্য অনেক বিন্যস্ত, সেখানে সাম্প্রতিক অনেক লেখালেখির রেফারেন্স আছে। গতকাল ভারতে সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গে তিনি বললেন কেন একে মৌলবাদ না বলে ফ্যাসিবাদ বলা উচিৎ। কীভাবে হিন্দু ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ বর্ণহিন্দুদের সাথে সম্পর্কিত, যারা আদতে সংখ্যালঘু। কীভাবে বিশ্বব্যাপী মার্ক্সবাদী আন্দোলনের দুর্বলতার মধ্যে দিয়ে ফ্যাসিবাদী প্রবণতা বিভিন্ন রূপে বেড়ে উঠছে। কেন তাদের প্রধান টার্গেট নিছক মুসলিম নয়- যদিও মুসলমানরাও সেখানে নির্যযাতিত হচ্ছে। বিশ্ব পুঁজিবাদী বিকাশধারার সঙ্গে তার সম্পর্ক।
আজকের আলোচনা আরও গভীর এবং বিস্তৃত ছিল। গণতান্ত্রিক চিন্তাচেতনার উন্মেষকাল থেকেই কীভাবে মার্ক্সীয় মতাদর্শের উপাদান বিকশিত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী মার্ক্সবাদী আন্দোলন কীভাবে মানব সমাজকে সরাসরি বিপ্লবী পরিবর্তনের মাধ্যমে অথবা বুর্জোয়াদের উপর চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে অনেক অর্জন সম্ভব করেছে। কেন বর্তমান সময়ে নারী, লিঙ্গীয় প্রশ্ন এবং পরিেেবশ প্রশ্ন মার্ক্সবাদীদের গুরুত্বের সঙ্গে চিন্তা ও তৎপরতার মধ্যে আনতে হবে।
আজকের আলোচনায় এত লোক হবে আমরা ভাবিনি। ৫০ জনের ঘরে ২০০ জন! ঢাকার অগ্রসর চিন্তাশীল অধিকাংশ মানুষই আজ উপস্থিত ছিলেন।
৩১.১২.৯৪
বছরের শেষ দিনে চমৎকার একটা ছবি দেখলাম। মহাশে^তা দেবীর গল্প, চন্ডাল ও ডোমদের নিয়ে, ‘ডাইনী’ বানানোর কাহিনী। মনে পড়ছিল হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘বেনের মেয়ে’ বইটার কথা। ব্রাহ্মণ আগ্রাসনের মুখে বৌদ্ধদের পরাজয়, কীভাবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশার মানুষ অচ্ছুৎ হয়ে গেলেন!
বছর শেষ। আর কয়েক মুহূর্ত। বাইরে প্রচুর পটকা ফুটছে। ১৯৯৫ আসছে।
‘আমেরিকা’ দখলের ৫০১ বছর
১৪৯২ সালে কলম্বাস এবং তার দল ভুল করে আমেরিকার খোঁজ পায়, যাকে আমেরিকা ‘আবিষ্কার’ বলা হয়। এর আগ পর্যন্ত এশিয়া আফ্রিকা ও ইউরোপ বর্তমান উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা নামে অভিহিত বিশাল অঞ্চলের কথা জানতো না। তারাও বাকি বিশে^র কথা জানতো না। ১৪৯২ সালে সংঘটিত এই যোগাযোগের ৫০০ বছর হলো ১৯৯২ সালে। এই ৫শ বছর উদযাপনে ভিন্ন স্বর নিয়ে উপস্থিত হয় এই অঞ্চলের আসল আদিবাসীদের উত্তরসূরী ও প্রগতিশীল চিন্তার মানুষেরা। তারা বলেন এটা আবিষ্কার নয়, বরং এই বিশাল সভ্যতাগুলোতে ইউরোপীয়দের আক্রমণ, প্রতারণা, দখল ও গণহত্যার প্রতিবাদে এই ৫০০ বছর স্মরণ করতে হবে। ১৯৯৩ সালের মার্চ মাসে আমি নিউইয়র্কে গিয়ে প্রথম যে বইটা কিনি তার নাম ইয়ার ৫০১, কনকোয়েস্ট কন্টিনিউজ। এই বছরেই প্রকাশিত হয়েছে, লেখক নোয়াম চমস্কি। এটি ছাড়াও ম্যালকম এক্স-এর আত্মজীবনী সহ বেশ কিছু বই পাই যেগুলো এই ঢেকে রাখা রক্তাক্ত ইতিহাস উন্মুক্ত করেছে।
আমি ১৯৯৩ সালের মার্চের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে যাই কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান ই্ন্সটিটিউটের ভিজিটিং স্কলার হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে। ওদের ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলে অবস্থানকালে তিনমাসে আমার কাজ ছিল কলাম্বিয়াসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা, সেমিনার ও সংলাপে অংশগ্রহণ। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম এবং বাংলাদেশ ও বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে বক্তৃতা দিলাম, প্রশ্নোত্তর হলো, সেগুলোর মধ্যে ছিল- পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটি, ডিউক ইউনিভার্সিটি, নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটি, নিউইয়র্ক স্টেট ইউনিভার্সিটি, সাঙ্গামন স্টেট ইউনিভার্সিটি, ওহাইয়ো স্টেট ইউনিভার্সিটি। এর বাইরে গেছি সিরাকিউস স্টে ইউনিভার্সিটি, টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটিতে।
এই সুযোগে নিজের আগ্রহে আরও অনেক সভা সমাবেশ ও প্রতিষ্ঠানে গেছি ও বহু মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি, কথা বলেছি। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য নিউ স্কুল ফর সোশ্যাল রিসার্চ এবং মান্থলি রিভিউ জার্ণাল অফিস। রাজনৈতিক দল ও গ্রুপগুলোর মধে উল্লেখযোগ্য হলো- কমিউনিস্ট পার্টি অব দ্য ইউএসএ, কমিউনিস্ট পার্টি অব দ্য ইউএসএ (মার্কসবাদী লেনিনবাদী), রেভলুশনারী কমিউনিস্ট পার্টি অব দ্য ইউএসএ, ওয়ার্কার্স ওয়ার্লড পার্টি, মার্কসিস্ট হিউম্যানিস্ট সোসাইটি, নিউইয়র্ক মার্কসিস্ট স্কুল। এসব সংগঠনের নেতা কর্মীদের সাথে অনেক কথা হয়েছে। তাদের সভা সমাবেশে গেছি। আমি যেম জার্ণালকে বিশেষ গুরুত্ব দেই সেই মান্থলি রিভিউ অফিসে একাধিকবার গেছি, বক্তৃতা শুনেছি, বক্তৃতা দিতেও হয়েছে। সেখানে আমার প্রিয় লেখক তাত্ত্বিক পল সুইজি এবং হ্যারী ম্যাগডফের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। পল সুইজীর সাক্ষাৎকারও নিয়েছি। এছাড়া জগদীশ ভগবতী, আনোয়ার শেখ, পিটার গুডিসের সঙ্গেও দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন শহরের বইএর দোকান ছিল আমার বিশেষ আনন্দের জায়গা।
কম সময়ে অনেক কথা অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। বুঝতে চেষ্টা করেছি বিশে^র সবচাইতে শক্তিশালী সা¤্রাজ্যবাদী দেশের ভেতরের কাঠামো, বুঝতে চেয়েছি তার ইতিহাস, নতুন চিন্তার ক্ষেত্রগুলো, জনগণের বিভিন্ন অংশের জীবন, সমাজ ও প্রতিষ্ঠান। সেই সঙ্গে সমাজের ভেতর বিভিন্ন সংঘাত ও লড়াই, বিপ্লবী চিন্তা ও সংগঠনের কাজ।
যুক্তরাষ্ট্রে বসতি গড়া বাংলাদেশের মানুষের সংখ্যাও ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশের এই মানুষদের অনেকের সঙ্গে কথা হয়েছে, ঘুরেছি, সভা সমাবেশ করেছি তাদের বিভিন্ন সংগঠনের সাথে, এগুলোর মধ্যে নির্মূল কমিটিও ছিল। দেশে ফিরে এসব বিষয় নিয়ে আমি বিস্তারিত লিখেছি। বৈচিত্রময় এই জগত বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি। ধারাবাহিকভাবে বিচিত্রায় বিভিন্ন অধ্যায় প্রকাশের পর তা ১৯৯৫ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেছে জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন।

গ্রন্থের শিরোনাম কলম্বাসের আমেরিকা ‘আবিষ্কার’ এবং বহুজাতিক মানুষেরা। গ্রন্থের অধ্যায়গুলো হলো- ‘মার্কিনীরা কোন জাতি’, ‘কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার এবং বর্ষ ৫০১’, ‘ক্যাসিনো সোসাইটি এবং দেড় কোটি দরিদ্র শিশুর জমি’, ‘শিক্ষা স্বাস্থ্য মিডিয়া: বিতর্ক এবং নিয়ন্ত্রণ’, ‘ম্যাডোনা এবং এঞ্জেলা ডেভিস: মার্কিন নারীর প্রতিনিধি কে?’, ‘যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের দ্বীপগুলি’, ‘কিছু ঘটনা কতিপয় মানুষ’, ‘মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ নিয়ে কথা’, ‘জগদীশ ভগবতী পল সুইজী ও আনোয়ার শেখ এর সঙ্গে আলোচনা’ এবং ‘যুক্তরাষ্ট্রের বিপ্লবী বন্ধুরা’। (চলবে)
আগের পর্ব: বাংলাদেশের ৫০ বছর ও তারপর-১১
আনু মুহাম্মদ: সম্পাদক, সর্বজনকথা। ইমেইল: sarbojonkotha@gmail.com
