নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎচালিত যানবাহন এবং বাজেটে গরিব মানুষের ভাগ
মওদুদ রহমান
গত ১১ জুন নতুন নির্বাচিত সরকার তাদের প্রথম বাজেট উপস্থাপন করেছে এবং ৩০ জুন তা পাশ করেছে। এই বাজেট কি উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গীর কোনো পরিবর্তনের সূচনা করলো? সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্য কি কোনো নতুন বার্তা আছে এতে? এই লেখায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎচালিত যানবাহনের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী মানুষের ভূমিকা আর সেই গরিব জনগোষ্ঠীর প্রতি বাজেট থেকে অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় বৈষম্যমূলক নীতি ও বিধিব্যবস্থার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে।
আমাদের জন্য বছরের জুন মাস হচ্ছে নতুন বাজেট পাবার মাস। বাজারের দামের আগুনে পকেটে থাকা মাসের খরচ সময়ের আগেই শেষ হয়ে যাওয়া যেখানে সাধারণ মানুষের কপালে পরিণত হয়েছে, সেখানে বাজেট নিয়ে আলাপের উত্তাপ সংসদ, টিভির টক-শো আর পত্রিকার পাতার বাইরে খুব একটা ছড়ায় না। অবশ্য বাজেট নিয়ে আলাপ-আলোচনাকে গণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে, বাজেট প্রণয়নের পদ্ধতিকে আরও বেশী জনসম্পৃক্ত করতে সরকারেরও যে আগ্রহ থাকে- তেমনও না।
বাংলাদেশের বাজেট পরিণত হয়েছে এমন এক চক্রে যার মাধ্যমে নানা ধরণের ভ্যাট, ট্যাক্সের খপ্পরে সাধারণ মানুষ আয়ের একটা অংশ বাধ্যতামূলকভাবেই জমা দিতে হয় সরকারী তহবিলে, যা কিনা সাধারণ মানুষের সেবাতেই ব্যয় হবার কথা। কিন্তু সেই কথা কেবল কাগজে লেখা। সাধারণ মানুষের কী আর সাধ্য আছে সরকারী ঝোলার যে ফুটোগুলি দিয়ে গড়িয়ে সর্বজনের টাকা গুটিকয়েকের পকেটে জমা হয় তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জবাব আদায় করার! জনতা আর ক্ষমতার মাঝে বিদ্যমান এই আকাশ-পাতাল পাথর্ক্যের কারণেই সরবরাহ পাইপে পানযোগ্য পানি না পাওয়া গেলে কিংবা সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা না পেলে, কিংবা স্কুল-কলেজগুলোতে মানসম্মত শিক্ষার আয়োজনের ব্যবস্থা না থাকলে তার প্রতিকারের কোনো উপায় থাকে না।
জনতা আর ক্ষমতার মাঝে বিদ্যমান এই আকাশ-পাতাল পাথর্ক্যের কারণেই সরবরাহ পাইপে পানযোগ্য পানি না পাওয়া গেলে কিংবা সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা না পেলে, কিংবা স্কুল-কলেজগুলোতে মানসম্মত শিক্ষার আয়োজনের ব্যবস্থা না থাকলে তার প্রতিকারের কোনো উপায় থাকে না।
‘বড়লোক’দের সরকারি সেবা না পেলেও চলে, কারণ তারা বিদেশি বাজার থেকেই তাদের সন্তানদের জন্য শিক্ষা, নিজেদের জন্য চিকিৎসা, ভবিষ্যতের জন্য থাকার জায়গাটা কিনে থাকেন। অন্যদিকে মধ্যবিত্ত লোকজন সঞ্চয়ের সবটুকু দিয়ে, ধার-দেনা করে হলেও বাড়তি দামে বেসরকারি স্কুল, ব্যক্তিমালিকানাধীন হাসপাতাল, ব্যক্তিগত গাড়ি, বোতলজাত পানি ইত্যাদি উপায়ে সরকারি সেবার অভাব ‘প্রাইভেট’লি মেটানোর চেষ্টা করে। কিন্তু গরিবেরা যায় কই? তাদের কথা কে বলে? তাদের অভিযোগ কে শোনে?
গরিবের এই যে, ‘কোথাও কেউ নেই’ অবস্থা তা বাজেটের এই জুন মাসেও টের পাওয়া যায়। ঝকমারি বাজেটের নানা তথ্য আর উপাত্তের আড়ালে নীচের দিকে থাকা গরিবের ভাগের পিঠাটা যে উপরের দিকেই খাওয়া হয়ে যায় এ লেখায় সেটা আমরা বোঝার চেষ্টা করবো বিদ্যুৎ খাতের কিছু নীতি আর বাজেট বন্টন ব্যবস্থার দিকে মনোযোগ দিয়ে।
অতিকথনের রাজনীতি
নির্বাচনের আগে দেয়া প্রতিশ্রুতির বেলুন ফুটে যেতে দেখার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের মানুষের জন্য নতুন কিছু না। আর এই অলীক স্বপ্নের হাওয়া দিয়ে ফুলানো বেলুনের ফুটে যাওয়া অবস্থার সাম্প্রতিক উদাহরণ হচ্ছে বিদ্যুৎ খাত। বিদ্যুৎ অবকাঠামো গড়ে তোলার নামে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে গত আমলে যার ফলে মোট বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াটের মত, যেখানে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিমাণ এখনও পর্যন্ত ১৮ হাজারের ঘরই পার হয়নি [১]।
অলস বসে থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ন্যায্য দামে বানালেও একটা কথা ছিলো, চুক্তিগুলো ঠিকঠাক মত করা হলেও আদালতে যেয়ে বিচার আদায় করে নেয়ার একটা জায়গা থাকতো। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো করা হয়েছে বিশেষ আইনে। ২০১০ সালে সংসদে পাশ করা এই আইনে উন্মুক্ত এবং প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের লাইসেন্স পাবার প্রক্রিয়া আইনগতভাবেই পাশ কাটিয়ে যাবার পথ তৈরী করা হয়। সেই সাথে ভবিষ্যতে এই প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাথে জড়িত আইন প্রণেতা, ভাড়াটে বিশেষজ্ঞ, দুর্নীতিবাজ আমলাসহ কাউকেই যাতে আদালতে চ্যালেঞ্জ জানানো না যায় সেই আইনী বিধানও পাশ করা হয়। আইনপ্রণেতারা নিজেদের এবং রাজনৈতিক-ব্যবসায়িক সঙ্গীসাথীদের সাথে নিয়ে সাধারণ মানুষের সম্পদ লুটেপুটে খাবার একটা আইন সংসদে বসে টেবিল চাপড়ে পাশ করিয়ে নিচ্ছে এমন কোন দৃশ্য কী দুঃস্বপ্নতেও কল্পনা করা সম্ভব? কিন্তু আমাদের দেশে আমরা সেটাই হতে দেখেছি, ফলে যা হবার তাই হয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে পরবর্তী ১৪ বছরে বেসরকারী বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকেরা অলস বসে থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপরীতে কেবল মাত্র ‘ক্যাপাসিটি চার্জের’ নামেই পকেটে ভরেছেন এক লক্ষ কোটি টাকারও বেশি [২]।
নিশ্চিতভাবেই আগের সরকারের রেখে যাওয়া এই ক্ষত একদিনে সারবার নয়। আবার এমনও নয় যে, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়ার আগে এই চুরি, দুর্নীতি’র খবর জানতো না। বরং বিএনপি এসব কিছু ঠিকঠাক করার প্রতিশ্রুতি দিয়েই মানুষের কাছে ভোট চেয়েছে। বিএনপি’র নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি’তে ছিল এই ঘুণেধরা বিদ্যুৎ ও জ্বালানী ব্যবস্থা পালটে ফেলার কথা, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সর্বোচ্চ কর্মদক্ষতায় চালানোর কথা, স্বল্প দামে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাঠামো গড়ে তোলার কথা, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নের কথা [৩]। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর এখনও পর্যন্ত এসব বিষয়ে বিএনপি সরকারের তাৎপর্যপূর্ণ কোন পদক্ষেপ দেখা যায়নি, বিগত সময়ে যেসব মন্ত্রী, আমলা, বিশেষজ্ঞ, বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীরা মিলে দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে রেখে গেছে তাদেরকে আইনের আওতায় আনার ব্যাপারে বাগাড়ম্বরের বাইরে অন্য কোন আভাস পাওয়া যায়নি। এই কাজগুলো করা শুরু করলে নিশ্চিতভাবেই আইন প্রণেতাদের সাজানো বাগানে ঝড় শুরু হবে। কারণ কে কার কাছে কী দাসখত দিয়েছে, কে কার আত্নীয়, নির্বাচনকালে কে কাকে কত টাকার ফান্ডিং করেছে- এসবের তথ্য তো আমাদের কাছে প্রকাশিত না, আমরা অনুমানই করতে পারি কেবল।
এদিকে নির্বাচনের আগে বিএনপি’র প্রতিশ্রুতি দেয়া চ্যালেঞ্জিং কাজগুলোতে নতুন সরকারের মনোযোগ না দেখা গেলেও জনগণের পকেট কাটার কাজটা ভালোভাবেই শুরু হয়েছে। ক্ষমতায় আসার দুই মাসের মধ্যে গত এপ্রিলে তেলের দাম রকম ভেদে ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়ানোর পর এই জুন মাসে বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম, আর আবাসিক গ্রাহকদের জন্য এই দাম বৃদ্ধির হার হচ্ছে ১৯.৯৫% পর্যন্ত [৪]। যদিও ক্ষমতায় আসার পরপরই এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে সরকার জানিয়েছিল যে আগামী দুই বছরে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে না [৫]।
ক্ষমতায় আসার দুই মাসের মধ্যে গত এপ্রিলে তেলের দাম রকম ভেদে ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়ানোর পর এই জুন মাসে বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম, আর আবাসিক গ্রাহকদের জন্য এই দাম বৃদ্ধির হার হচ্ছে ১৯.৯৫% পর্যন্ত।
প্রশ্ন হচ্ছে দফায় দফায় এই দাম বৃদ্ধির বাড়তি টাকাগুলো কোথায় যায়? আসলে এই টাকাগুলো ফেলা হয় সেই অতল অন্ধকার কুয়ার ভেতর যেখানে সর্বগ্রাসী লুটপাটের ক্ষুধা নিয়ে লোকচক্ষুর আড়ালে বসে আছে সমাজের পরজীবী আর মৃতভোজীরূপে থাকা সম্পদ দখলকারীরা। শূন্য থেকে বাড়তে বাড়তে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় বেসরকারি মালিকানাধীন এই দখল প্রায় ১১ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে যেখানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১২ হাজার ৩০২ মেগাওয়াট [৬]। স্বল্প খরচের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপরীতে ব্যক্তিগত আর কর্পোরেট মুনাফাকেন্দ্রিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের এই দখল ২০১০ সাল থেকে পাকাপোক্ত হওয়া শুরু করলেও, বিএনপি’র বিগত আমলে ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতের ঘনীভূত সংকট আর বিদেশি বিনিয়োগ, বিদেশি কোম্পানি দেশে নিয়ে আসার কাতরতার বিপরীতে ঘন্টার পর ঘন্টার লোডশেডিংয়ের রেখে যাওয়া সংকটটাকেই পরবর্তী আওয়ামী সরকার কাজে লাগিয়েছে একের পর এক রেন্টাল আর কুইক রেন্টাল নামের বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসেন্স দেয়ার মাধ্যমে। ফলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে এক চরম বিপদের গাড্ডায় ফেলে দেয়ার দায়ভার কেবল আওয়ামী লীগের একার নয়, এখানে বিগত বিএনপি-জামায়াত সরকারের দায় আছে, দায় আছে ২০০৭-০৮ সময়কালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারেরও।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে এক চরম বিপদের গাড্ডায় ফেলে দেয়ার দায়ভার কেবল আওয়ামী লীগের একার নয়, এখানে বিগত বিএনপি-জামায়াত সরকারের দায় আছে, দায় আছে ২০০৭-০৮ সময়কালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারেরও।
যাইহোক, বিদ্যুৎ খাতের মৃতভোজী আর পরজীবীদের অনিঃশেষ ক্ষুধার ভয়াবহতা সামান্য হলেও টের পাওয়া যাবে সামিট গ্রুপ আর এই কোম্পানীর অংশিদারিত্বে ব্যবসা করা নানান গ্রুপের লাভের প্রকাশিত অংকের দিকে তাকালে। এই একটি মাত্র গ্রুপের পকেটে গেছে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা [৭]। এই গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিজ খান বিগত বেশ অনেক বছর ধরে সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ধনী ব্যক্তির তালিকায় থাকেন। ২০২৪ সালের ফোর্বস বিলিয়নিয়ার তালিকায় থাকা তার প্রকাশিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা যা কিনা ১৫ বছরে তার মালিকানাধীন কোম্পানির পাওয়া ক্যাপাসিটি চার্জের প্রায় সমপরিমাণ [৮]। বাংলাদেশে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ ইত্যাদি নানা খাত থেকে মুনাফা হাতানোর কাজ শেষ করে, জুলাই পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের অবস্থা বুঝে ২০২৪ সালের শেষের দিকে উনি নাগরিকত্ব পরিবর্তন করেন [৮]।
সামিট গ্রুপ আর এর চেয়ারম্যানের বিষয়টি ব্যতিক্রম নয়, বরং বাংলাদেশে এটাই নতুন বাস্তবতা। আজিজ খান এই তালিকায় একমাত্র নন, বরং অনেকের মধ্যে একজন মাত্র। যেই রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতায় আজিজ খান’রা তৈরী হয় সেই মেশিনের নাটবল্টু-কলকব্জা অক্ষুন্ন রেখে বাংলাদেশে পরিবর্তন আসবে- এমন ধারণার প্রচার অতিকথন ছাড়া আর কিছু নয়।
গরীবেরা কীভাবে বাঁচে?
সংসদে বাজেট প্রস্তাবের আগের সপ্তাহে বাড়ানো হয় বিদ্যুতের দাম। এই দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক হিসেবে প্রচার করতে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন করা হয় জুন মাসের ৬ তারিখে। সেখানে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন দাবি করেন যে, ‘এই মূল্যবৃদ্ধির কোনো চাপ নিম্নআয়ের ও সাধারণ গ্রাহকের ওপর পড়বে না।’ নীচের দিক থেকে এই সংখ্যা নাকি মোট জনসংখ্যার ৬৫ ভাগ [৯]। তিনি মূলত শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্তের দিকে ইংগিত করে এই কথাটা বলেছেন। অর্থাৎ সরকার বলতে চাচ্ছে যে, শূন্য (০) থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীরা হচ্ছে দেশের সমস্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের ৬৫ শতাংশ, যার দাম বাড়ানো হয়নি!
সরকারের এই দাবির ময়নাতদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ এই দাবি সত্য হলে সরকারের উচিত দেশের এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জ্বালানি দারিদ্র্য দূর করতে সরকার কী কী করছে এবং বাজেটে কী পরিমাণ বরাদ্দ থাকছে সেটা সবার সামনে তুলে ধরা। আর যদি মিথ্যা হয়, তাহলে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়া। কারণ একটা পরিবার যদি ১৫ ওয়াটের ২ টা মাত্র লাইট আর ৮০ ওয়াটের ২ টা মাত্র ফ্যান গড়ে ১৬ ঘন্টা করে ব্যবহার করে তাহলেও প্রতি মাসে মোট বিদ্যুতের ব্যবহার দাঁড়ায় ৯১.২ ইউনিট। তার মানে, সরকারী হিসেবে দেশের ৬৫ শতাংশ মানুষের কেবল মাত্র দুইটা লাইট আর দুইটা ফ্যান ব্যবহার করারও সামর্থ্য নাই! অবশ্য গরীবের ঘিঞ্জি এলাকায় থাকা প্রায় আলো-বাতাসহীন ঘরে, দমবন্ধ করা পরিবেশ আর প্রচন্ড গরমে নাভিশ্বাস উঠে যাওয়া জীবনের সাথে যে রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, আমলা, বিশেষজ্ঞদের কোন সম্পর্ক নাই, তাঁদের ক্ষেত্রে বলে ফেলা খুবই সহজ যে গরীবেরা দুইটা লাইট চালায় কেন? বাড়ি-গাড়ি আর অফিসে ২৪ ঘন্টা এসিময় পরিবেশে থাকা সমাজের উপরতলার মানুষেরা বলে ফেলতেই পারেন যে, গরীবের আবার দুইটা ফ্যান লাগে নাকি!
একটা পরিবার যদি ১৫ ওয়াটের ২ টা মাত্র লাইট আর ৮০ ওয়াটের ২ টা মাত্র ফ্যান গড়ে ১৬ ঘন্টা করে ব্যবহার করে তাহলেও প্রতি মাসে মোট বিদ্যুতের ব্যবহার দাঁড়ায় ৯১.২ ইউনিট। তার মানে, সরকারী হিসেবে দেশের ৬৫ শতাংশ মানুষের কেবল মাত্র দুইটা লাইট আর দুইটা ফ্যান ব্যবহার করারও সামর্থ্য নাই!
এবার গরিবী জীবনের আরেক বাস্তবতার গল্প। আগ্রাসী শিল্পায়ন, কলকারখানা আর ইকনমিক জোনগুলোর দূষণ, খাল-বিল-নদী-নালা-বন-জঙ্গল-চাষের জমি দখলের অশ্লীল সব আয়োজনের মধ্যে এখন গরিব মানুষের ভীড়। জমি-জমা হারিয়ে ক্ষেতের কৃষক শহরে এসে হয়ে যায় রিকশাওয়ালা, ফেরিওয়ালা কিংবা ঝালমুড়িওয়ালা, পাড়া-প্রতিবেশিদের নিয়ে নিজের ঘরের উপর বসানো ঢেকিতে নিজের জমির ধান ভানা অজপাড়াগায়ের এক সময়ের কিষাণীরা এখন শহরে এসে খোঁজে বুয়ার কাজ কিংবা গার্মেন্টসের চাকরি। তাঁরা শহরে এসে থাকেন এক কিংবা দুই রুমের ছোট ছোট খুপড়ি ঘরে কিংবা অবিশ্বাস্য রকমের ছোট জায়গার মধ্যেই গরিবের মাথা গোঁজার জন্য তৈরী করা ফ্ল্যাটগুলোতে।
এই পরিবারগুলোর বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব রাখার জন্য অনুমোদিত মিটার অধিকাংশ সময়ই থাকে না। আলাদা মিটার নেয়ার কাগজপত্র-দলিল দস্তাবেজ জোগারযন্ত্রের আয়োজনের মধ্য দিয়ে যাবার সামর্থ্য এই পরিবারগুলোর আওতার বাইরেই থাকে। এই ধরনের আবাসনের মালিকেরাও অধিকাংশ সময়ে এই বাড়তি ঝামেলার মধ্যে না যেয়ে, অনুমোদিত একমাত্র মিটার থেকে প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি ফ্ল্যাটে নিজের উদ্যোগে আলাদা আলাদা মিটার লাগিয়ে দেন, যা সাব মিটার নামে পরিচিত। একটি মেইন মিটারের আওতায় লাগানো সকল সাব-মিটারের সামষ্টিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ রেকর্ড হতে থাকে মেইন মিটারে। কাজেই একটা মেইন মিটারের আওতায় যদি ৯’টা সাব-মিটার থাকে, প্রতিটি সাব-মিটারের আওতায় থাকা একেকটি পরিবার যদি মাসে গড়ে ৭০ ইউনিট করেও বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন তাহলে মেইন মিটারের বিল আসবে সর্বমোট ৬৩০ ইউনিটের হিসাবে। অথচ আবাসিক গ্রাহকদের জন্য ৬০০ ইউনিট কিংবা এর বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীরা বিবেচিত হয় ‘এলিট’ গ্রাহক হিসেবে যাদের জন্য ধার্য করা আছে সর্বোচ্চ রেটের বিদ্যুৎ। অর্থাৎ এমনতর পরিবারগুলোর আয় যত কমই হোক না কেন, হয় বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য তাদের গুনতে হয় সরকারিভাবে ধার্যকৃত সর্বোচ্চ হার কিংবা বাড়িওয়ালার ইচ্ছামত ধার্য করা নির্দিষ্ট পরিমাণ মাসিক হার। কাজেই তথ্যমন্ত্রী যখন বলেন যে, বিদ্যুতের বাড়তি দাম ৬৫ শতাংশ মানুষের জন্য কোন বাড়তি ব্যয়ের বোঝা তৈরী করবে না, তখন জানতে চাওয়া যেতেই পারে যে, উনার হিসাবের খাতায় আদৌ এই গরিব মানুষেরা আছেন কিনা!
একটা মেইন মিটারের আওতায় যদি ৯’টা সাব-মিটার থাকে, প্রতিটি সাব-মিটারের আওতায় থাকা একেকটি পরিবার যদি মাসে গড়ে ৭০ ইউনিট করেও বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন তাহলে মেইন মিটারের বিল আসবে সর্বমোট ৬৩০ ইউনিটের হিসাবে।
গরিবের ঘাড় ভেঙ্গে খায় কে?
বাংলাদেশে প্রথম মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু হয় ২০১৭ সালে। আর বর্তমানে যে মেগাওয়াট স্কেলের সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু আছে সেগুলোর বেশিরভাগই স্থাপিত হয়েছে ২০২০ সাল পরবর্তী সময়কালে। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’র (SREDA) ওয়েবসাইট অনুসারে ১৫ জুন ২০২৬ সাল পর্যন্ত সারাদেশে ১৪’টি মেগাওয়াট স্কেলের সৌর বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে যেগুলোকে সাধারণত ‘সোলার পার্ক’ বলা হয়, যার সর্বমোট সক্ষমতা হচ্ছে ৭৪৫ মেগাওয়াট [১০]। এই সোলার পার্কের বেশিরভাগই বসেছে বাণিজ্যিক উৎপাদনের নিয়তে, যেখানে বিনিয়োগ এসেছে মূলত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে, যারা উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরকারি গ্রীডে বিক্রি করছেন। এরপরের ভাগে রয়েছে নেট-মিটারিং নীতিমালার আওতায় ছাদে বসানো সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা। ১৫ জুন, ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত সারাদেশে নথিভুক্ত নেট-মিটারিং সিস্টেম বসেছে ৪ হাজার ৮৪১ টি যার অর্ধেকই বসেছে গত আড়াই বছরে। নেট-মিটারিং সিস্টেমের আওতায় বসানো সৌর-বিদ্যুৎ উৎপাদনের সর্বমোট ক্ষমতা হচ্ছে ৩১৪ মেগাওয়াট। SREDA’র ওয়েবসাইট অনুসারে যদিও জানা যাচ্ছে যে দেশে প্রথম গ্রীড কানেক্টেড সোলার সিস্টেম বসানো হয়েছে ২০১৬ সালে, কিন্তু এই পদ্ধতিতে সৌর বিদ্যুৎ বসানোর মূল আয়োজনটা গতি পায় মূলত ২০১৮ সাল থেকে। এর বাইরে বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত বসেছে ৩ হাজার ৪০০ টিরও বেশি সৌরচালিত সেচ পাম্প যেগুলোর মোট ক্ষমতা ৬০ মেগাওয়াট। এই সৌরচালিত পাম্পগুলোর বেশিরভাগেরই অর্থায়ন এসেছে সরকারিভাবে কিংবা ইডকলের মাধ্যমে বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংক এবং বিদেশি সংস্থার তহবিল কাজে লাগিয়ে।
বাংলাদেশের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকে বর্তমান পর্যায়ে নিয়ে আসার পেছনে মূল অবদান রেখেছেন মূলত ব্যক্তিগত পর্যায়ে ছোট ছোট সোলার হোম সিস্টেম ব্যবহারকারীরা, যারা কিনা সংখ্যায় ৬০ লক্ষেরও অধিক। এই ছোট ছোট অসংখ্য সোলার সিস্টেমের মোট সক্ষমতা প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট। এই ব্যবহারকারীরা সাধারণভাবে গরিব, যারা কিনা থাকেন গ্রামে, চরে কিংবা প্রত্যন্ত এলাকায়। কমমূল্যের সৌর বিদ্যুতের বর্তমান রমরমা অবস্থা তৈরি হবার বহু আগেই এই গরিব মানুষেরাই শুরু করেছেন সোলার সিস্টেমের ব্যবহার। তাঁরা যেসব এলাকায় থাকতেন সেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়া হয় নি, তাই বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রয়োজন তাদের মেটাতে হয়েছে বাড়তি দামে সোলার প্যানেল, ব্যাটারী আর আনুষঙ্গিক জিনিস কিনে নেয়ার মাধ্যমে। এমন এক সময়ে তাঁরা এই বিদ্যুৎ ব্যবহার শুরু করেছিলেন যখন না ছিল নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রসারে কোন সুস্পষ্ট এবং বাস্তবায়নযোগ্য নীতিমালা, না ছিল কোন মান যাচাইকারী কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
বাংলাদেশের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকে বর্তমান পর্যায়ে নিয়ে আসার পেছনে মূল অবদান রেখেছেন মূলত ব্যক্তিগত পর্যায়ে ছোট ছোট সোলার হোম সিস্টেম ব্যবহারকারীরা, যারা কিনা সংখ্যায় ৬০ লক্ষেরও অধিক। এই ছোট ছোট অসংখ্য সোলার সিস্টেমের মোট সক্ষমতা প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট।
এক সমীক্ষা অনুসারে জানা যায় যে, ২০০২-০৩ সাল থেকে শুরু করে ২০১০ সাল নাগাদ এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের সোলার প্যানেলগুলোর মোট সক্ষমতা দাঁড়ায় ৫০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি আর ২০১৫ সাল নাগাদ এটি অতিক্রম করে ১৫০ মেগাওয়াটের মাইলফলক [১১]। এই ক্ষুদ্র ব্যবহারকারী, মফস্বলের ইলেক্ট্রিক আইটেমের দোকানদার, স্বল্প পুজির সাপ্লাইয়ার, টেকনিসিয়ান- এমন অসংখ্য পরিচয়ধারী মানুষরাই নবায়নযোগ্য জ্বালানী প্রসারে কাজ করেছেন, নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করেছেন। এই মানুষগুলো নিজেদের প্রয়োজনে এমন সময়ে সৌরবিদ্যুৎ প্রসারে কাজ করেছেন যখন রাজনীতিবিদরা সৌরবিদ্যুৎকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করতো, ফসিল ফুয়েল ইন্ড্রাস্ট্রির পয়সা খাওয়া লবিস্ট আর ভাড়াটে বিশেষজ্ঞরা নানান উপায়ে মিথ্যা এবং ভুল তথ্য ছড়াতো যাতে করে চলতি সিস্টেমে কোন পরিবর্তন না আসে।
বর্তমান সরকার ২০৩০ সালের মধ্যেই ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি হতে আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বর্তমানে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভাগ যেখানে ৫ শতাংশেরও কম, সেই পরিপ্রেক্ষিতে আগামী চার বছরের মধ্যে ২০ শতাংশের এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন উচ্চাভিলাষীই বটে। কাজেই এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি আর বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা। আর তা না হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সকল আয়োজন আরেকটি রেন্টাল-কুইক রেন্টালের মত লুটপাটের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। তাই সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষ এবং ক্ষুদ্র ব্যবহারকারী, ব্যবসায়ী এবং টেকনিশিয়ানদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে যারা প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রীয় অবহেলা উপেক্ষা করে নিজেদের আগ্রহ এবং প্রয়োজনে সৌরবিদ্যুতের প্রসারে অবদান রেখে চলেছেন। এই লক্ষ লক্ষ প্রান্তিক মানুষ, ব্যবসায়ী এবং পেশাজীবীদের কেবলমাত্র ক্রেতা হিসেবে ঘাড় ভেঙ্গে খাওয়ার বিষয়ে পরিণত করলে চলবে না। বরং তাঁদের সুবিধা-অসুবিধা, অভিযোগ, দাবি-দাওয়া আমলে নিয়েই ভবিষ্যতের পরিকল্পনা সাজাতে হবে। বাজেটে দেয়া বরাদ্দের প্রকৃত সুবিধা যেন প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছায় সেই নিশ্চয়তার পরিবেশ সরকারকেই তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার কোটিপতি ব্যবসায়ী আর আমদানিকারকদের হাত ধরে আসেনি। কাজেই সৌরবিদ্যুতের প্রতিনিয়ত কমতে থাকা দামের আকর্ষণে জড়ো হওয়া দুধের মাছিদের নিয়ে কর্মপরিকল্পনা সাজানো হলে, তাদেরকেই প্রণোদনা দেয়া হলে, তাদের প্রয়োজন অনুসারে নীতি প্রণয়ন করা হলে কাগজে লেখা লক্ষ্যমাত্রা আলোর মুখ দেখবে না কখনোই।
ব্যর্থ হবার পরিকল্পনা বন্ধ হবে কবে?
এবারের বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সম্প্রসারণ এবং সৌর বিদ্যুতের আরও প্রসারের লক্ষ্যে সরকার ব্যাটারি, ইনভার্টার, সোলার প্যানেল সহ নানান যন্ত্রাংশে ভ্যাট, ট্যাক্স প্রায় মওকুফ করে দিয়েছে, যা কিনা এ খাত প্রসারে অন্যতম বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছিল বহু বছর ধরে। আমদানি করা এসব সামগ্রীর উপর উচ্চহারের কর কাঠামো ধার্য থাকার জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিনিয়ত কমতে থাকা দামের সুফল পুরোপুরিভাবে বাংলাদেশের মানুষ পাচ্ছিল না। ব্যবসায়ীরা যখন সোলার প্যানেল আমদানিতে ২৯ শতাংশ শুল্ক দেয়, ইনভার্টার আমদানিতে ৪০ শতাংশ শুল্ক দেয়, প্যানেল স্থাপনের কাঠামো আমদানিতে ৬২ শতাংশ শুল্ক দেয়, সেই দাম সবশেষে এসে সাধারণ মানুষের পকেট থেকেই কাটা যায়।
ফলে এসব পণ্য আমদানিতে এই বাজেটে সকল প্রকার শুল্কসমেত সর্বমোট কর প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয়া অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে সবকিছুতে ‘কিন্তু’ রেখে দেয়ার সরকারি সংস্কৃতি তো এতো সহজে পাল্টাবার নয়। এক্ষেত্রেও সেটার ব্যতিক্রম হয় নি। বাজেট উত্থাপন হয় ১১ জুন, যেখানে এই এই নতুন শুল্ক, কর কাঠামোর ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু এর তিনদিন আগেই, ৮ জুন, ২০২৬ তারিখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে আগাম বলে দেয় যে, কর অব্যাহতির এই সুবিধা কেবল তারাই পাবে যারা এই সামগ্রীগুলো আমদানি করে হয় নিজস্ব প্রয়োজনে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করবে অথবা উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে বিক্রি করবে [১২]। সেই সাথে এই সুবিধা পাবে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সেবাদাতা কোম্পানিগুলো, যারা কিনা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়ন ও উৎপাদন করে গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করে। এর মানে হলো, সরকারের এই কর ছাড়ের সুবিধা পেতে হলে আপনাকে হয় একজন সম্পদশালী ব্যবসায়ী হতে হবে, নয়তো একজন সুযোগসন্ধানী বিনিয়োগকারী হতে হবে এবং দু’ক্ষেত্রেই আপনাকে সরাসরি আমদানীকারক হতে হবে। যারা এই দুই শ্রেণির আওতাভুক্ত নন—সেটা সোলার সামগ্রীর সাধারণ আমদানিকারক, কিংবা স্বল্প পুঁজির কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক কিংবা পরিবেশক, সরকারের এই করছাড়ের আশীর্বাদ পাবে না। এমন বাছাইমূলক পক্ষপাতিত্ব নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারের জন্য মোটেও সহায়ক নয়; বরং এটি এই খাতে একচেটিয়া আধিপত্য বা মনোপলি তৈরির ঝুঁকি তৈরি করছে।
সোলার সামগ্রীর সাধারণ আমদানিকারক, কিংবা স্বল্প পুঁজির কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক কিংবা পরিবেশক, সরকারের এই করছাড়ের আশীর্বাদ পাবে না। এমন বাছাইমূলক পক্ষপাতিত্ব নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারের জন্য মোটেও সহায়ক নয়; বরং এটি এই খাতে একচেটিয়া আধিপত্য বা মনোপলি তৈরির ঝুঁকি তৈরি করছে।
একই সাথে এ বছরের বাজেটে ইলেকট্রিক গাড়ি, বাস, ট্রাক এবং চার্জিং স্টেশনের ওপর করের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। এই সিদ্ধান্তগুলো ইতিবাচক, তবে এগুলোর মাঝে লুকিয়ে আছে একটি প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা– আপনি যদি উচ্চবিত্ত কিংবা নিদেনপক্ষে মধ্যবিত্ত শ্রেণির না হন, তবে সরকার আপনার পাশে নেই। ঠিক এই কারণেই লক্ষ লক্ষ ইজিবাইক, টমটম, ইলেকট্রিক রিকশার চালক ও মালিকদের প্রতিনিয়ত নানাভাবে অপমানিত ও হেয় করা হয়, হচ্ছে। অথচ তাঁরা নিজস্ব প্রচেষ্টায়, ব্যক্তিগত অর্থায়নে দেশে ইলেকট্রিক থ্রি–হুইলারের এক বিশাল বহর গড়ে তুলেছেন, সেই সাথে বিদেশ থেকে আমদানি করা বিভিন্ন যন্ত্রাংশ যেমন, বডি, মোটর, সুইচ, লাইট ইত্যাদি কিনতে সরকারকে দিচ্ছেন ৩০% থেকে ৬০%-এরও বেশি কর।
তাঁরা নিজস্ব প্রচেষ্টায়, ব্যক্তিগত অর্থায়নে দেশে ইলেকট্রিক থ্রি–হুইলারের এক বিশাল বহর গড়ে তুলেছেন, সেই সাথে বিদেশ থেকে আমদানি করা বিভিন্ন যন্ত্রাংশ যেমন, বডি, মোটর, সুইচ, লাইট ইত্যাদি কিনতে সরকারকে দিচ্ছেন ৩০% থেকে ৬০%-এরও বেশি কর।
অথচ রিকশা চালকদেরকে বিদ্যুৎ চোর, যানজট সৃষ্টিকারী, ট্রাফিক আইন অমান্যকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার এক প্রচ্ছন্ন প্রকল্প চালু আছে। অথচ এক জরিপে দেখা যায় যে, ঢাকায় যানবাহন সেবা প্রদানের দিক থেকে রিকশা চালকেরা প্রথম স্থানে রয়েছেন। অন্য যানবাহনের অভাবে হোক, কিংবা তুলনামূলক সস্তা বাহন হিসেবে সহজপ্রাপ্তির কারণে হোক, ঢাকাবাসীর ব্যক্তিগত যাতায়াতে রিকশা ব্যবহৃত হয় সর্বোচ্চ যা কিনা যাতায়াতে ব্যবহৃত মোট বাহন ব্যবহারের ৩৫%, এরপরে ধারাবাহিক তালিকায় রয়েছে বাস এবং ব্যক্তিগত গাড়ি যা কিনা যথাক্রমে ২১% এবং ১০.৫%। যানজটের কারণে দেখিয়ে যারা রিকশাওয়ালাদেরকে বলির পাঠা বানাতে চান, সড়কে রিকশা, ব্যাটারী চালিত রিকশা আর ইজি বাইক বন্ধ করে দেয়ার ধুয়া তোলেন তাদের জানা দরকার যে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় মাথাপিছু সড়কের দৈর্ঘ্যের পরিমাণ ১ ফুটেরও কম (০.২১৩ মিটার) যেখানে উন্নত শহরের কথা বাদ দিয়ে অন্যান্য অনেক উন্নয়নশীল দেশের উদাহরণ টানলেও দেখা যায় যে, সেখানে মাথাপিছু সড়কের এই দৈর্ঘ্যের পরিমাণ ১৫ ফিট থেকে দেড় ফিট (৪.৫ মিটার থেকে ০.৫ মিটার) [১৩]। অথচ যানজটের কারণ হিসেবে রিকশাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যাতে মনে হয় যে, ঢাকা শহরকে সিঙ্গাপুর কিংবা দুবাই বানানো যাচ্ছে না কেবল এই রিকশাওয়ালাদের জন্যই!
ঢাকার অনেক সড়কই রিকশাচালকদের জন্য চলাচল নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। যেমন, গাবতলী থেকে রাসেল স্কয়ার পর্যন্ত মিরপুর রোড কিংবা রাসেল স্কয়ার থেকে এফডিসি পর্যন্ত পান্থপথ রোডে তো রিকশা চলাচল সেই ২০০২ সাল থেকে বন্ধ। প্রশ্ন হচ্ছে, এই সড়কে কি চলাচলের গতি বেড়েছে? ২০১৭ সালে প্রকাশিত এক রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, ১০ বছরে ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি প্রতি ঘন্টায় ২১ কিলোমিটার থেকে কমে হয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭ কিলোমিটার যা কিনা হাঁটার গতি থেকে সামান্য বেশি [১৪]। সেই গতি আরও কমে ২০২২ সালে হয়েছে ঘন্টায় ৪.৮ কিলোমিটার যা কিনা আমাদের হাটার গতির প্রায় সমান। আরেক জরিপে দেখা যায় যে, ঢাকায় এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে প্রতি দুই ঘন্টায় ৪৬ মিনিট জ্যামে আটকে থাকতে হয় [১৫]। পৃথিবীর ১৫২ টি দেশের ১,২০০ টি শহরে যাতায়াতের গতি পর্যালোচনা করে আরেক গবেষণা অনুসারে ঢাকা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে ধীরগতির শহর [১৬]। ঢাকাকে পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে ধীরগতির শহরে পরিণত করার দায় কি তবে রিকশাচালকদের? অথচ জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকার শ্রাদ্ধ করে যানজট নিরসনের নামে তৈরী করা ফ্লাইওভার, এলিভেটেট এক্সপ্রেস, আর ভিআইপি সড়কগুলোতে তো রিকশার প্রবেশাধিকার নেই। নাকি ক্ষমতার কাঠামোতে এই বিশাল সংখ্যক পেশাজীবীর কোন ভাগ নেই দেখে এই দুর্বলের উপর সবল রাষ্ট্রের দেয়া সকল অপবাদ, অবিচার জায়েজ হয়ে যায়?
ঢাকার অনেক সড়কই রিকশাচালকদের জন্য চলাচল নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। যেমন, গাবতলী থেকে রাসেল স্কয়ার পর্যন্ত মিরপুর রোড কিংবা রাসেল স্কয়ার থেকে এফডিসি পর্যন্ত পান্থপথ রোডে তো রিকশা চলাচল সেই ২০০২ সাল থেকে বন্ধ। প্রশ্ন হচ্ছে, এই সড়কে কি চলাচলের গতি বেড়েছে?
নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের পথে বিদ্যুতায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু যখন নীতিনির্ধারকরা লক্ষ লক্ষ দরিদ্র বিদ্যুৎচালিত রিকশাচালককে অসম্মান করেন, সময়ে সময়ে তাদের পেশাকে নিষিদ্ধ করার হুমকি দেন, আর বিপরীতে ব্যাক্তিগত ইলেকট্রিক গাড়ি আমদানীতে শুল্কছাড় দেন, চার্জিং স্টেশন বসানোতে প্রণোদনা দেন, তখন তা সমাজে একটি নিষ্ঠুর বৈষম্যের বার্তা দেয়। অথচ এই রিকশাচালকেরা নিজেরা উদ্যোগী হয়েই তাদের সীমিত সঞ্চয় দিয়ে, উচ্চ সুদে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে নিজেদের জীবিকার তাগিদে এই খাতে বিনিয়োগ করেছেন। বাংলাদেশে এই গরিব বর্গের মানুষেরাই সর্বাধিক। অথচ সরকারী সকল সুযোগ-সুবিধার আয়োজন থাকে ভিন্নবর্গের মানুষদের জন্য। কিন্তু একটা দেশের সরকার যদি গরিব বিদ্বেষী হয়, গরিব মানুষদের ক্ষমতায়নের পরিবেশ সৃষ্টি না করে, বৈষম্যমূলক আচরণ জারি রাখে তাহলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পাবে কীভাবে?
জুলাই পরবর্তী রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এটা প্রকারান্তরে স্পষ্ট যে ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানে হাজারো শহীদের সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে সাধারণ মানুষ হাসিনা সরকারের পতন ঘটিয়েছে মাত্র, এ বছরের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভোট দিয়ে নতুন একটা দলকে দেশের শাসনভার দিয়েছে মাত্র, যা কিনা আদতে ক্ষমতার খোলসটাই পরিবর্তন করতে পেরেছে কেবল, ভেতরের কিছুই পাল্টায়নি। বিএনপি এখন সেই একই চেয়ারে বসেছে, সেই একই ক্ষমতার লাঠি হাতে নিয়েছে যেই চেয়ারের গরম আর লাঠির চরম ব্যবহারের কারণে আগের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাধারণ মানুষের কোনরকমে প্রাণ নিয়ে টিকে থাকাটাই সৌভাগ্যের ব্যাপারে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। এ কারণেই ২০০৯ থেকে ২০২৪ এর সময়কালটা কারও কাছে একনায়কতন্ত্রী আমল, কারও কাছে স্বৈরাচারের কাল, আর কারও কাছে ফ্যাসিস্ট শাসনের সময় হিসেবে পরিচিত। তবে কথা হচ্ছে, গণঅভ্যুত্থানের পর গত দুই বছরে বাস্তবে আসলে তেমন কিছুরই পরিবর্তন হয়নি যার কারণে নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারা যাবে যে, বিএনপি’র বর্তমান সরকার বাংলাদেশের জন্য নতুন আরেক ফ্যাসিস্ট কিংবা স্বৈরাচারী হিসেবে আবির্ভূত হবে না।
বিএনপি এখন সেই একই চেয়ারে বসেছে, সেই একই ক্ষমতার লাঠি হাতে নিয়েছে যেই চেয়ারের গরম আর লাঠির চরম ব্যবহারের কারণে আগের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাধারণ মানুষের কোনরকমে প্রাণ নিয়ে টিকে থাকাটাই সৌভাগ্যের ব্যাপারে পরিণত হয়ে গিয়েছিল।
সাহিত্যিক জর্জ অরওয়েলের বর্ণনা করা কাল্পনিক ভীতিকর সময় বাংলাদেশের মানুষের জন্য এক যন্ত্রণাদায়ক বাস্তবতা। এখানে সংসদে আইন করে অনিয়মকে বৈধতা দেয়া হয়, দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করার জন্য দায়মুক্তি আইন পাশ করা হয়, বিদেশি রাষ্ট্রের দয়া-দাক্ষিণ্যের উপর ভর করে ক্ষমতার চেয়ার টিকিয়ে রাখতে দেশের মানুষকে না জানিয়ে অসম, অন্যায্য চুক্তি করা হয়, আর প্রতি বছর বাজেট আসলে রঙ্গিন ভবিষ্যতের ঘুম পাড়ানি গান শুনিয়ে নতুন করে সাধারণ গরিব, মধ্যবিত্তের পকেট কাটার আয়োজন করা হয়। শোষণের এই চক্র ভেংগে ফেলতে প্রথমত দরকার এই চক্রটাকে বোঝা আর রাজনীতিবিদ, আইনপ্রণেতা, আমলাতন্ত্রের প্রতিটি কাজে জবাবদিহির সংস্কৃতি তৈরী করা, সাধারণ মানুষের সকল প্রশ্নের উত্তর দিতে তাঁদেরকে বাধ্য করা।
মওদুদ রহমান: প্রকৌশলী, লেখক। ইমেইল: mowdudur@gmail.com
তথ্যসূত্র
[১] BPDB website, accessed on 17 June, 2026, https://bpdb.gov.bd/pages/static-pages/6922db6e933eb65569e0a1bc।
[২] ডেইলী স্টার, ‘১৪ বছরে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ,’ ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৩।
[৩] বিএনপি’র নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬, https://www.bnpbd.org/manifesto
[৪] প্রথম আলো, ‘জ্বালানি তেলের পর বাড়ল বিদ্যুতের দাম,’ ৪ জুন, ২০২৬
[৫] যুগান্তর, ‘আগামী দুই বছর বিদ্যুতের দাম বাড়াবে না সরকার,’ ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
[৬] BPDB website, accessed on 17 June, 2026, https://bpdb.gov.bd/pages/static-pages/6922db6e933eb65569e0a1bc
[৭] বণিক বার্তা, ৫০ বছরের ব্যবসায়ী জীবনে আজিজ খানের সম্পদের উল্লম্ফন ঘটেছে গত এক দশকে, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩
[৮] বণিক বার্তা, বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন সামিটের আজিজ খান, ২৬ ডিসেম্বর ২০২৪
[৯] বাংলা ট্রিবিউন, ‘৬৫ শতাংশ গ্রাহক বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির বাইরে থাকছেন : তথ্যমন্ত্রী’, ৬ জুন, ২০২৬
[১০] SREDA website, accessed on 15 June, 2026, https://sreda.gov.bd/
[১১] World Bank, “Living in the light: the Bangladesh solar home systems story” (2021)
[১২] গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, অর্থ মন্ত্রণালয়, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, এস.আর.ও. নং ১৫৯–আইন/২০২৬/১৪/কাস্টমস, ০৮ জুন, ২০২৬।
[১৩] Mahmud, S. M. S., & Hoque, M. S. (2012). Management of Rickshaw in Dhaka City for Ensuing Desirable Mobility and Sustainability: The Problems and Options, ResearchGate. https://www.researchgate.net/publication/345472109_Management_of_Rickshaw_in_Dhaka_City_for_Ensuing_Desirable_Mobility_and_Sustainability_The_Problems_and_Options
[১৪] Dhaka Tribune, 19 July, 2017, WB: Dhaka’s average traffic speed 7kmph, https://www.dhakatribune.com/bangladesh/dhaka/32349/wb-dhaka%E2%80%99s-average-traffic-speed-7kmph
[১৫] Saadat, S.Y. et al. (2023) Reducing pollution for greening cities, CPD’S GREEN CITIES INITIATIVE. https://cpd.org.bd/resources/2023/09/Presentation-on-Reducing-Pollution-for-Greening-Cities.pdf.
[১৬] Akbar, P., Couture, V., Duranton, G., & Storeygard, A. (2023). The Fast, the Slow, and the Congested: Urban Transportation in Rich and Poor Countries. https://doi.org/10.3386/w31642
