জ্বালানি সংকট এবং বাংলাদেশের জন্য সমাধানের পথ
মোশাহিদা সুলতানা
দেশে বহুবিধ জ্বালানি সংকট চলছে। একদিকে ইরানে মার্কিন আক্রমণের কারণে তেল সংকট, অন্যদিকে আমদানি নির্ভর ব্যয়বহুল প্রাণবিনাশী বিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে সৃষ্ট অবধারিত বিদ্যুৎ সংকট। যখনই এরকম সংকট দেখা যায় তখনই দেশি বিদেশি কোম্পানির দালালচক্র সক্রিয় হয়ে যায়। এদের তৎপরতার সঙ্গী হয়ে বর্তমান সরকারও আগের সর্বনাশা পথেই যাবার চেষ্টা করছে। সংকট থেকে টেকসই পথে বের হতে গেলে যে ধরনের চিন্তা ও উদ্যোগ দরকার এই লেখায় সেটাই স্পষ্ট করা হয়েছে।
জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ গত ১৯ এপ্রিল সংসদে বলেন, “দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির উত্তর ও দক্ষিণাংশে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লাখনি নির্মাণের ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সমীক্ষা), নওগাঁ ও জয়পুরহাটজুড়ে বিস্তৃত জামালগঞ্জ কয়লাখনির উত্তর-পশ্চিমাংশের ১৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় একটি ভূগর্ভস্থ খনি উন্নয়নের জন্য ফিজিবিলিটি স্টাডি এবং রংপুরের খালাসপীর কয়লাখনির ভূগর্ভস্থ খনি উন্নয়নের জন্য ফিজিবিলিটি স্টাডি পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ ছাড়া দিনাজপুরের দিঘিপাড়া কয়লাখনি থেকে কয়লা উত্তোলনের জন্য ভূগর্ভস্থ খনি উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।”[১]
পুরো ২০১০-এর দশক জুড়ে সারা পৃথিবী যখন কী করে কয়লা থেকে সরে আসবে সে উপায় বের করতে ব্যস্ত এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, তখন বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকার একে একে ছয়টি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তুলেছে। বর্তমানে বড়পুকুরিয়ার ৫২৫ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র যুক্ত করলে ৭২৫৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যা দেশের স্থাপিত মোট বিদ্যুৎ সক্ষমতার প্রায় ২৫ শতাংশ। এর পাশাপাশি ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করার চুক্তি করা হয়েছে। অর্থাৎ গত এক দশকে বাংলাদেশে কয়লার ওপর নির্ভরশীলতা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার অজুহাত দেখিয়ে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পে জাপানি, ভারতীয় ও চীনা কোম্পানিকে সুযোগ করে দিয়েছিল সরকার। শেখ হাসিনার পতনের পর আশা করা হয়েছিল যে এই কয়লার ওপর নির্ভরতা কমানোর জন্য একটি পরিকল্পনা করা হবে। অথচ আমরা দেখলাম নির্বাচিত হয়ে বিএনপি সরকার এই ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ তো নিচ্ছেই না, বরং নতুন করে ফিজিবিলিটি স্টাডি করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
এখন যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট শুরু হয়েছে তখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রীর কয়লা উত্তোলনের কথা জানান দিচ্ছে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে উঠেছে কয়লা উত্তোলনের পথে হাঁটতে। অথচ এ ধরনের সমাধান অনেক আগেই অগ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
অনেকেই প্রকল্পের ব্যয় হিসাবের সময় সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষতি হিসাবের মধ্যে রাখে না, জমির দামের সঙ্গে মানুষের সামাজিক ক্ষতি যোগ করে না, ভবিষ্যৎ কৃষি আয়ের হিসাবও করে না। তাই দেশীয় কয়লাকে অনেকের কাছে সস্তা বিকল্প মনে হয়। কিন্তু এসব ক্ষতি যোগ করলে দেখা যায়, কয়লা তুলতে যাওয়া শুধু পরিবেশ নয়, জাতীয় আয়, খাদ্যনিরাপত্তা ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি।
জ্বালানি খাতে কোনো সংকট হলেই কিছু গোষ্ঠী এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বিদেশি কোম্পানির স্বার্থ এগিয়ে নিতে চায়। এখন কয়লা উত্তোলনের কথা বলা মানে সেই স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেওয়া। অথচ আমাদের হাতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত সংস্কারের আরও উপায় রয়েছে যেগুলো স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে বাস্তবায়ন করে কয়লার ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।
জ্বালানি খাতে কোনো সংকট হলেই কিছু গোষ্ঠী এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বিদেশি কোম্পানির স্বার্থ এগিয়ে নিতে চায়। এখন কয়লা উত্তোলনের কথা বলা মানে সেই স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেওয়া। অথচ আমাদের হাতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত সংস্কারের আরও উপায় রয়েছে যেগুলো স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে বাস্তবায়ন করে কয়লার ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।
কয়লা ও এলএনজি নির্ভরতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশকে কী ধরনের সংকটের সম্মুখীন হতে হয়েছে তা আমরা প্রত্যক্ষ করলাম। এর আগেও সংকট মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নিতে গিয়ে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। এবারও একই পথে হাঁটলে এই নির্ভরতা থেকে মুক্তি আসবে না।
গত দুই দশকে গ্যাসের কূপ খননে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। বিএনপি সরকার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নতুন কূপ খননের কাজ শুরু করবে বলে তাদের ১৮০ দিনে কর্মপরিকল্পনায় উল্লেখ করেছে। আশু সংকট সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও এই উদ্যোগ সময়সাপেক্ষ। সবারই প্রশ্ন– এই সময় বাংলাদেশ দ্রুত আর কোন সমাধানের দিকে যেতে পারে? দ্রুত সমাধান হিসেবে এখনই বড় আকারে সৌর বিদ্যুৎ বাস্তবায়ন জরুরি। এর মধ্যে আছে জমিভিত্তিক বড় সৌর প্রকল্প, ছাদভিত্তিক (ছাদে) সৌর বিদ্যুৎ, আর সেচের জন্য সৌর পাম্প। সৌর বিদ্যুৎকে সমাধান হিসেবে হাজির করা হলে প্রশ্ন ওঠে– সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প কি এত দ্রুত শেষ করা সম্ভব? আমি ২০২১ সাল থেকে ভিয়েতনাম কেন দ্রুত সৌর বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করায় এগিয়ে গেল–এই নিয়ে গবেষণা করছি। বুঝতে চেয়েছি আদৌ এত দ্রুত সৌর বিদ্যুৎ সক্ষমতা বাড়ানো কি সম্ভব? সম্ভব হলে কীভাবে?
সবারই প্রশ্ন– এই সময় বাংলাদেশ দ্রুত আর কোন সমাধানের দিকে যেতে পারে? দ্রুত সমাধান হিসেবে এখনই বড় আকারে সৌর বিদ্যুৎ বাস্তবায়ন জরুরি। এর মধ্যে আছে জমিভিত্তিক বড় সৌর প্রকল্প, ছাদভিত্তিক (ছাদে) সৌর বিদ্যুৎ, আর সেচের জন্য সৌর পাম্প।
আমাদের কাছে ভিয়েতনাম এরইমধ্যে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করে রেখেছে। করোনার সময় ২০২০ সালে মাত্র এক বছরের মধ্যে ভিয়েতনাম প্রায় ১১ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করেছিল। এর মধ্যে ৪৮ শতাংশ ছিল রুফটপ সোলার।[২] ২০১৮ সালে একেবারে শূন্য থেকে শুরু করে ২০২০ সালের শেষে ভিয়েতনামের সৌর বিদ্যুৎ সক্ষমতা ১৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়, যা তাদের মোট সক্ষমতার ২৫ শতাংশ ছিল। সেসময় এর পেছনে কারণ কী তা অনুসন্ধান করতে ভিয়েতনামে গিয়েছিলাম। সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং বিনিয়োগকারীদের। ভিয়েতনামের এই সফলতার পেছনে কারণ ছিল সরকারের হস্তক্ষেপ – ফিড ইন ট্যারিফ প্রণোদনা। আমার অনুসন্ধানে উঠে এসেছিল যে এই ফিড ইন ট্যারিফ প্রণোদনা অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য দিলে এত দ্রুত লক্ষ্য অর্জন হতো না। বেঁধে দেওয়া হয়েছিল সময়। ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল এক বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে যারা সোলার গ্রিডে যুক্ত করতে পারবে তারাই ২০ বছরের জন্য নির্দিষ্ট দামে তা বিক্রি করতে পারবে। এই প্রণোদনা শুধু লক্ষ্যই অর্জন করেনি, লক্ষ্য ছাড়িয়ে অভাবনীয় মাত্রায় বিনিয়োগকারীদের উদ্বুদ্ধ করেছিল।
করোনার সময় ২০২০ সালে মাত্র এক বছরের মধ্যে ভিয়েতনাম প্রায় ১১ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করেছিল। এর মধ্যে ৪৮ শতাংশ ছিল রুফটপ সোলার।
সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ তখন প্রতিদিন একটু একটু করে কমছে। যত দেরিতে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাবে, তার খরচ তত কমে আসবে – এ রকম অবস্থায় বিনিয়োগকারীরা সাধারণত স্পেকুলেশন করতে থাকে। খরচ কমার অপেক্ষায় থাকে। ঠিক সেসময় সরকার যখন উৎপাদন খরচের ওপর একটা নির্দিষ্ট দাম বেঁধে দেয় তখন বিক্রয়ের নিশ্চয়তা বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে থাকে। দেখা গেছে এইটুকুই অনেক কাজ করেছে। একটা এক্সপেরিমেন্ট এত সফল হয়েছে যে যা টার্গেট করা হয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশি বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করেছিল বিনিয়োগকারীরা। ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে একটা বাড়তি সুবিধা ছিল বেশিরভাগ ঋণ দেওয়া হয়েছিল দেশীয় ব্যাংকগুলো থেকে। চায়না ও থাইল্যান্ডে যারা সদ্য সৌর বিদ্যুতে বিনিয়োগ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তারা মুহূর্তেই এই প্রণোদনা পেয়ে ভিয়েতনামে এসে হাজির হয়। ব্যাংকগুলো যখন বুঝতে পেরেছিল এই প্রকল্পগুলো থেকে মুনাফা করতে সরকার সহায়তা দিচ্ছে তখন তারাও ঋণ দিতে দ্বিধা করেনি। এতে ঝুঁকি কমে গিয়েছিল।
এমনকি দুই বছর আগেও নির্দিষ্ট ফিড ইন ট্যারিফ ঘোষণা করে রুফটপ সৌর বিদ্যুৎ বাস্তবায়নের কথা শুনলে অনেকেই এটাকে বাস্তবায়নযোগ্য মনে করতেন না। ১৫ বছর ধরে উৎপাদন খরচের ওপর ফিড ইন ট্যারিফ নির্ধারণ করার কথা বললে শুনতে হতো সরকার কেন এত আর্থিক বোঝা নেবে। অথচ আমরা দেখলাম যতটুকু আর্থিক বোঝা তৈরি হতো তার চেয়ে অনেক বেশি আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে এলএনজিভিত্তিক, কয়লাভিত্তিক প্রকল্পগুলো। এমনকি নিউক্লিয়ার প্রকল্প নির্মাণে বিলম্বের সঙ্গে সঙ্গে খরচও দিন দিন বেড়ে চলেছে। সবদিক বিবেচনা করে সরকার সৌর বিদ্যুতে এখন যদি যথাযথভাবে প্রণোদনা দেয়, তাহলে দ্রুত তিন থেকে চার হাজার মেগাওয়াটের বেশি সৌর বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটা বড় সমস্যা হলো– মুখে সবুজ বিনিয়োগের কথা বলা হলেও বাস্তবে আর্থিক ঝুঁকি বিবেচনায় ব্যাংক ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। বাংলাদেশে নানান ধরনের অনিশ্চয়তা যেই ঝুঁকি তৈরি করে তাতে ঋণ আদায়ের ব্যাপারে আস্থার সংকট থেকে যায়। জানুয়ারি মাসে সিপিডি আয়োজিত একটি সেমিনারে সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার সংকটের একটা চিত্র উঠে আসে। সেখানে পিডিবির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলেন, কীভাবে ক্রয়চুক্তি করে পিডিবি দিনের পর দিন আর্থিক বোঝা বহন করে চলেছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলেন, কেন চুক্তির মাধ্যমে বিক্রির নিশ্চয়তা না পেলে তাদের জন্য উৎপাদনে যাওয়া কঠিন। তারা প্রকল্প শেষ করে যদি নির্দিষ্ট দামে বিক্রয়ের নিশ্চয়তা না পান, তাহলে তাদের বিনিয়োগের প্রবণতা কমে যায়।
অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত জ্বালানি আইন ২০১০ বাতিলের সঙ্গে সঙ্গে শেখ হাসিনার সরকারের সময় এই আইনের আওতায় লেটার অব ইনটেন্ট (LoI) পাওয়া ২৯৪২ মেগাওয়াট মোট ক্ষমতাসম্পন্ন ৩১টি নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থগিত করা হয়। এর মধ্যে অনেক বিনিয়োগকারী ততদিনে জমি অধিগ্রহণ ও অর্থায়নের ব্যবস্থা এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। এলওআই বাতিলের পর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় (MoPEMR) মোট ৫৫টি সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র (৫৫০০ মেগাওয়াট) স্থাপনের জন্য কয়েক দফায় দরপত্র আহ্বান করে। এসব দরপত্র আহ্বান করা হয় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট ২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস ২০০৮-এর অধীন, বিদ্যুৎ খাতে ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যাশায়। তবে ১৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র প্যাকেজে কোনো দরপত্রই পাওয়া যায়নি।
আগের পরিকল্পিত প্রকল্পগুলো কমিটি নতুন করে পুনর্মূল্যায়ন করে। পুনর্মূল্যায়নের পর দেখা গেল গড়ে প্রকল্পের প্রস্তাবিত দাম ২৪.৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছে। কীভাবে এই দাম কমে গেল তা নিয়ে বিনিয়োগকারী ও সরকারি বিভিন্ন মহলের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ব্যবসায়ীরা ও তাদের পরামর্শকরা বলছেন প্রযুক্তির উন্নয়নের কারণে এই দাম কমেছে। অন্যদিকে সরকারি বিভিন্ন মহল থেকে বলছে আগের মূল্যায়নের মধ্যে স্বচ্ছতার অভাব ছিল, প্রতিযোগিতামূলক বিডিং হয়নি। বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বের কারণে এই দাম বেশি ছিল। পুনর্মূল্যায়নের কারণে এই দাম কমিয়ে আনা গেছে। দুটোই হয়তো এখানে সৌর বিদ্যুতের প্রস্তাবিত দাম কমিয়ে আনতে ভূমিকা রেখেছে। যে কারণেই দাম কমুক, এখন এই দাম কমে যাওয়া এবং অন্যদিকে তেল, কয়লা ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে সৌরশক্তি অন্যান্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎসের তুলনায় প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রয়েছে। এই সময়টাকে দ্রুত কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি সাশ্রয় করতে পারে।
সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্যানেল বেশিরভাগ আসে চীন থেকে। অনেক প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ, যাচাই-বাছাই, দাম পুনর্মূল্যায়ন এগুলো হয়েই আছে। এখন দ্রুত এগুলো বাস্তবায়নের জন্য সরকারের দিক থেকে কিছু প্রণোদনা দিতে হবে।
দেশজুড়ে ছাদভিত্তিক প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, কারখানা, বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক ভবনের ছাদে রুফটপ সোলার স্থাপন করে জ্বালানি সাশ্রয় করা যায়। রুফটপ সোলারের সম্ভাবনা নিয়ে এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকটি গবেষণা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে রক্ষণশীল হিসাব অনুযায়ী ন্যূনতম ৪০০০ মেগাওয়াট রুফটপ[৩] সোলার স্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। ১০ শতাংশ ছাদে স্থাপন করলে ১০ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি উৎপাদন করা সম্ভব। সৌর সেচেও বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ৩৫২৪টি সিস্টেম স্থাপন করে ৬০.৭ মেগাওয়াট সাশ্রয় করেছে।[৪] মাঠপর্যায়ে অর্থনৈতিক ও ব্যবস্থাপনাগত প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করে সৌর সেচেও জরুরি ভিত্তিতে প্রণোদনা দেওয়া উচিত।
বর্তমান সংকটে আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে পাকিস্তানের সৌর বিদ্যুৎ। বাংলাদেশের মতো পাকিস্তানও কয়লা ও এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছিল। তারাও তাদের গ্যাস উত্তোলনের ব্যাপারে পিছিয়ে রয়েছে। এলএনজি ও কয়লার ওপর নির্ভরতা, অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি চার্জ, পাকিস্তানি রুপির দরপতন পাকিস্তানের বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে গিয়ে সেই খরচ বহুলাংশে কমে গেছে। বিদ্যুতের সংকট থেকে রক্ষা পেতে ও অর্থ সাশ্রয় করতে গিয়ে জনগণ নিজ উদ্যোগে সোলার রুফটপ স্থাপন শুরু করে। এতে দ্রুত সৌর বিদ্যুতের সক্ষমতা বাড়তে থাকে। হিসাব করে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে পাকিস্তান এলএনজি ও তেল আমদানির খরচ প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার বাঁচিয়েছে। শুধু পাকিস্তান নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন: ভারত ও শ্রীলঙ্কাও দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে।
বিদ্যুতের সংকট থেকে রক্ষা পেতে ও অর্থ সাশ্রয় করতে গিয়ে জনগণ নিজ উদ্যোগে সোলার রুফটপ স্থাপন শুরু করে। এতে দ্রুত সৌর বিদ্যুতের সক্ষমতা বাড়তে থাকে। হিসাব করে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে পাকিস্তান এলএনজি ও তেল আমদানির খরচ প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার বাঁচিয়েছে। শুধু পাকিস্তান নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন: ভারত ও শ্রীলঙ্কাও দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষিত পাকিস্তানের চেয়ে ভিন্ন। এখানে সৌর বিদ্যুতের ওপর জনগণের আস্থার ঘাটতি রয়েছে। দেশে প্রায় ৬ মিলিয়ন সোলার হোম সিস্টেম রয়েছে। এর একটা বড় অংশ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকেজো হয়ে গেছে। লাখ লাখ টাকা খরচ করে ভোক্তারা উপকৃত হয়নি, এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রতারিত হয়ে সৌর বিদ্যুতের ওপর আস্থা হারিয়েছে। ঢাকা শহরে আবাসিক ভবনগুলোতে সোলার রুফটপ করা আবশ্যক বহুদিন ধরে। কিন্তু দেখা গেছে এই সোলার রুফটপ স্থাপনের নামে নানান অসাধু কর্মকাণ্ড ঘটে। মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব এবং প্রযুক্তি সম্পর্কে অজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সরকার প্রদত্ত শর্ত পূরণের জন্য একটা সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। এই সিন্ডিকেট সস্তা নিম্নমানের প্যানেল বসিয়ে লাখ লাখ টাকা আয় করে। কিন্তু সেগুলো কোনো কাজে আসে না। আবার কখনো দেখা গেছে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঠিকমতো কাজ করে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে প্যানেল বসানো হলেও নেট মিটারিং চালু থাকে না।
এ জন্য পাড়ায় পাড়ায় রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে বার্ষিক সার্ভিসের বিনিময়ে। এতে সোলার প্যানেলগুলো যেমন চালু রাখা যাবে, তেমনি সৌর বিদ্যুৎ সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণকে কেন্দ্র করে তরুণদের নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। নষ্ট সোলার প্যানেল ভাড়া দিলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিটি নতুন সংযোগের তথ্য ডিজিটাল আর্কাইভ করে সংরক্ষণ করতে হবে। এ ধরনের নজরদারি ও জবাবদিহির মেকানিজম চালু করলে এই অসাধু তৎপরতা বন্ধ হবে এবং ভোক্তার আস্থা ফিরে আসবে। এভাবে একটি সামাজিক আন্দোলন পারে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে।
দ্রুত সৌর বিদ্যুতের সক্ষমতা বাড়ানো কোনো কল্পকাহিনি নয়, এগুলো বাস্তবেই ঘটছে। প্রয়োজন শুধু সঠিক প্রণোদনা, প্রতিবন্ধকতাগুলোকে চিহ্নিত করা, সমাজে এর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা, নাগরিকদের দরজা পর্যন্ত সেবা দিয়ে আস্থার সংকট থেকে বের করে আনা, সৌর সরঞ্জামের ওপর ট্যাক্স তুলে নেওয়া, খরচ কমিয়ে আনা। সোলারের ক্ষেত্রে একটা বড় সুবিধা হলো এতে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয় না। বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়ে গ্রিডে সরবরাহ হলে শুধু যেটুকু সরবরাহ হবে ততটুকুই সরকার কিনতে পারে।
দ্রুত সৌর বিদ্যুতের সক্ষমতা বাড়ানো কোনো কল্পকাহিনি নয়, এগুলো বাস্তবেই ঘটছে। প্রয়োজন শুধু সঠিক প্রণোদনা, প্রতিবন্ধকতাগুলোকে চিহ্নিত করা, সমাজে এর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা, নাগরিকদের দরজা পর্যন্ত সেবা দিয়ে আস্থার সংকট থেকে বের করে আনা, সৌর সরঞ্জামের ওপর ট্যাক্স তুলে নেওয়া, খরচ কমিয়ে আনা। সোলারের ক্ষেত্রে একটা বড় সুবিধা হলো এতে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয় না।
সরকার নিজেও উদ্যোগ নিয়ে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাদে এবং পড়ে থাকা অকৃষি জমিতে বড় সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নিতে পারে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশেই দ্বিতীয় ইউনিটের জমিতে অনেক আগেই সৌর প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু জমি অধিগ্রহণের পর ১৪ বছর হয়ে যাওয়ার পরও সেখানে প্রকল্প গড়ে ওঠেনি। এ রকম অনেক ফেলে রাখা জমিতে দ্রুত সৌর বিদ্যুৎ বাস্তবায়নের প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। এর সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ থেকে আয় করার কারণে যেসব তেলভিত্তিক এবং গ্যাসভিত্তিক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আইপিপি এতদিন ধরে মুনাফা করেছে এবং যেগুলোর কারণে খরচ অত্যধিক বেড়ে গেছে ও অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে বাংলাদেশের জনগণকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে এবং ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সেগুলোকে শনাক্ত করে ধীরে ধীরে বন্ধ করার পরিকল্পনা করতে হবে।
কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নির্মাণ করে আমরা একটি চক্রের মধ্যে আটকে গেছি বা লকড-ইন হয়ে গেছি। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তৈরি হয়ে গেছে বলে সেগুলোর জন্য দেশীয় কয়লা উত্তোলন করার অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ আর সৌরশক্তি নিয়ে এগোতে পারবে না। কয়লার ওপর নির্ভরতা কমাতে প্রয়োজন কয়লা থেকে বের হয়ে আসার পরিকল্পনা (ফেজ-আউট) প্রণয়ন করা এবং সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে ডলার সাশ্রয় করা। এই সংকটে বাংলাদেশ কোন পথে যাবে তা নির্ধারণ করার সময় এখনই। নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশ মোক্ষম সময় এখনই।
কয়লার ওপর নির্ভরতা কমাতে প্রয়োজন কয়লা থেকে বের হয়ে আসার পরিকল্পনা (ফেজ-আউট) প্রণয়ন করা এবং সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে ডলার সাশ্রয় করা। এই সংকটে বাংলাদেশ কোন পথে যাবে তা নির্ধারণ করার সময় এখনই। নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশ মোক্ষম সময় এখনই।
সংকট শুরুর পর দেখা যাচ্ছে, যে দেশ যত বেশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করছে, তারা তত বেশি নিজেদের অর্থ সাশ্রয় করতে পারছে। ইউরোপের দেশগুলো ছাড়াও চীন, ভারত, ভিয়েতনাম ও পাকিস্তান সাশ্রয়ের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়িয়ে পাকিস্তান ১২ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করেছে। যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন মোকাবিলা করতে হলে আমদানি নির্ভরতা কমানো ছাড়া উপায় নেই।
কয়লা উত্তোলন করে দেশের মানুষের জীবন-জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত করে, পরিবেশ দূষিত করে, সামাজিক নিরাপত্তা থেকে মানুষকে বঞ্চিত করে যে ‘স্বনির্ভরতা’, সেটা টেকসই সমাধান নয়। বিদেশি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে থাকা কয়লা এবং নিউক্লিয়ারের ক্ষেত্রেও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কম না। কয়লার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে ‘কার্বন’ ট্যাক্স আরোপিত হলে, আবার বৈদেশিক মুদ্রা হারানোর ঝুঁকিই রয়ে যাবে।
এলএনজি কিনতে বছরে যে ছয় বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, সেই অর্থ দিয়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে গ্যাস উত্তোলনে নিজেরা বিনিয়োগ করলে এতদিনে গ্যাস উত্তোলনের সক্ষমতা বাড়ত। এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে প্রণোদনা দিলে শুধু অর্থ সাশ্রয়ই হবে না, ভূরাজনীতিতে দরকষাকষির ক্ষেত্র আরও মজবুত হবে।
অন্যদিকে এলএনজি কিনতে বছরে যে ছয় বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, সেই অর্থ দিয়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে গ্যাস উত্তোলনে নিজেরা বিনিয়োগ করলে এতদিনে গ্যাস উত্তোলনের সক্ষমতা বাড়ত। এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে প্রণোদনা দিলে শুধু অর্থ সাশ্রয়ই হবে না, ভূরাজনীতিতে দরকষাকষির ক্ষেত্র আরও মজবুত হবে। তাই ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
মোশাহিদা সুলতানা: শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: moshahida@du.ac.bd
তথ্যসূত্র:
১. প্রথম আলো ২০২৬ ‘পাম্পগুলোতে কৃত্রিম তেলসংকট তৈরি হচ্ছে: সংসদে জ্বালানিমন্ত্রী’ নিজস্ব প্রতিবেদক, ১৯ এপ্রিল।
২. IRENA (2021) World Adds Record New Renewable Energy Capacity in 2020, Press Release, April 5, 2021, International Renewable Energy Agency,
৩. দ্য ডেইলি স্টার (২০২২) “Rooftop solar panels can produce 4,000MW” 9th September 2022
৪. SREDA (2026) Sustainable Renewable Energy Development Authority National Database, Website: https://www.renewableenergy.gov.bd
