বাংলাদেশের ৫০ বছর ও তারপর-১১
টাস্ক ফোর্স, ঘূর্ণিঝড়, গণআদালত এবং লোগাং হত্যাকান্ড
আনু মুহাম্মদ
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শেষ প্রান্তে ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানের হানাদার সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এরপর ৫৫ বছর অতিক্রম করছে এই দেশ। এই সময়ে দুইজন রাষ্ট্রপতি খুন হয়েছেন, দুই দফা প্রত্যক্ষভাবে সামরিক শাসন এসেছে, সামরিক বাহিনীর ভূমিকা বেড়েছে, সংবিধান সংশোধন হয়েছে ১৬ বার, নির্বাচনের নানা রূপ দেখা গেছে, শাসনব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে কর্তৃত্ববাদী হয়েছে। ১৯৯০ ও ২০২৪ গণঅভ্যুত্থানে দুবার স্বৈরশাসকের পতন হয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতে নতুন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় বসেছে। এই কয়েক দশকে অর্থনীতির আয়তন ক্রমে বেড়েছে, জিডিপি ও বিশ্ববাণিজ্যে উল্লম্ফন ঘটেছে, অবকাঠামো ছাড়াও সমাজে আয় ও পেশার ধরনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন এসেছে। সম্পদের কেন্দ্রীভবন ও বৈষম্যও বেড়েছে, কতিপয় গোষ্ঠীর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কর্তৃত্বে আটকে গেছে দেশ। এই ধারাবাহিক লেখায় আমি ডায়েরী, সাংগঠনিক ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সাথে সাথে ইতিহাসের নানা নথি/ঘটনা পর্যালোচনা করে এই দেশের রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতির গতিমুখ তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি। ব্যক্তিগত বিষয় সেটুকু এনেছি যেটুকু তৎকালীন পরিস্থিতি বোঝার জন্য প্রাসঙ্গিক। একাদশ পর্বে এরশাদের পদত্যাগের পর সকল দলের বোঝাপড়ার মাধ্যমে গঠিত প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার, টাস্ক ফোর্স, নির্বাচিত সরকার, ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়, গণআদালত এবং লোগাং হত্যাকান্ডসহ সে সময়ের চিত্র ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে।
১৯৯০ এর ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পদত্যাগের পর নবনিযুক্ত ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। তাঁর নেতৃত্বে সব রাজনৈতিক দলের বোঝাপড়ার ভিত্তিতে নির্বাচন পরিচালনার জন্য গঠিত হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন আট দলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বাধীন সাত দলীয় জোট এবং বামপন্থী পাঁচ দলীয় জোট এই ‘তিন জোটের রূপরেখা’ ছিল এই ক্ষমতা পরিবর্তনের নির্দেশনামা।
স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠলে ১৯৯০ সালের ১৯শে নভেম্বর এই জোটগুলো তিনটি আলাদা সমাবেশ থেকে একযোগে এই রূপরেখা ঘোষণা করেছিল। সেই রূপরেখায় ‘নির্বাচনে ভোট চুরি, ভোট জালিয়াতি, ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালটবাক্স ছিনতাই, এমনকি নির্লজ্জ ভোট ডাকাতি, মিডিয়াক্যু এবং অবশেষে ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশে’র বাস্তবতার অবসান করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের’ ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। রূপরেখায় ক্ষমতা হস্তান্তরের বিস্তারিত পথনির্দেশ করা হয় এভাবে:
“১. হত্যা,ক্যু, চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের ধারায় প্রতিষ্ঠিত স্বৈরাচারী এরশাদ ও তার সরকারের শাসনের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় দেশে পূর্ণ গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাকল্পে :
ক. সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রেখে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী তথা সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের (ক) ৩ ধারা এবং ৫৫ অনুচ্ছেদের (ক) ১ ধারা এবং ৫১ অনুচ্ছেদের ৩ নং ধারা অনুসারে এরশাদ ও তার সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করে স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী আন্দোলনরত তিন জোটের নিকট গ্রহণযোগ্য একজন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে উপরাষ্ট্রপতির নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন।
খ. এই পদ্ধতিতে উক্ত ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে একটি অন্তর্বতীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, যার মূল দায়িত্ব হবে তিন মাসের মধ্যে একটি সার্বভৌম জাতীয় সংসদের অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা।
২. ক. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ হবেন অর্থাৎ তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের অনুসারী বা দলের সাথে সম্পৃক্ত হবেন না অর্থাৎ তিনি রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি বা সংসদ সদস্য পদের জন্য নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করবেন না। তার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো মন্ত্রী নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করবে না।
খ. অন্তর্বতীকালীন এই সরকার শুধুমাত্র প্রশাসনের দৈনন্দিন নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনাসহ অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম ও দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস করবেন।
গ. ভোটারগণ যাতে করে নিজ ইচ্ছা ও বিবেক অনুযায়ী প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীনভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, সেই আস্থা পুন:স্থাপন এবং তার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।
ঘ. গণপ্রচার মাধ্যমকে পরিপূর্ণভাবে নিরপেক্ষ রাখার উদ্দেশ্যে রেডিও-টেলিভিশনসহ সকল রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যমকে স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় পরিণত করতে হবে এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী সকল রাজনৈতিক দলের প্রচার-প্রচারণার অবাধ সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
৩. অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধামে নির্বাচিত সার্বভৌম সংসদের নিকট অন্তর্বতীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন এবং এই সংসদের জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে।
৪. ক. জনগণের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতির ভিত্তিতে দেশে সাংবিধানিক শাসনের ধারা নিরঙ্কুশ ও অব্যাহত রাখা হবে এবং অসাংবিধানিক যে কোনো পন্থায় ক্ষমতা দখলের প্রতিরোধ করা হবে। নির্বাচন ব্যতীত অসাংবিধানিক বা সংবিধানবহির্ভূত কোনো পন্থায়, কোনো অজুহাতে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা যাবে না।
খ. জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষ এবং আইনেরশাসন নিশ্চিত করা হবে।
গ. মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী সকল আইন বাতিল করা হবে।…” (সর্বজনকথা, ২০২৪)
এই রূপরেখা ঘোষণার সতের দিনের মাথায় ওই রূপরেখার ভিত্তিতেই এরশাদ প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়োগ করে তার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নিতে বাধ্য হন।
২৯টি টাস্ক ফোর্স, নতুন সরকার ও সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন
এই অস্থায়ী সরকারে পরিকল্পনা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন সেসময়ের বিআইডিএস-এর মহাপরিচালক অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান। তিনি যথারীতি তাঁর নতুন পদকে কঠিন দায়িত্বে ভরে ফেললেন। দেশে তখন অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, সমাজবিজ্ঞান, পরিবেশ, বিজ্ঞান প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞ বা কাজ করছেন তাঁর পরিচিত এরকম সবাইকে নিয়ে বসলেন। গঠন করলেন দেশের অর্থনীতি রাজনীতি ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নীতিমালা সংস্কারের কাঠামো প্রস্তাবের জন্য ২৯টি টাস্ক ফোর্স। এর মধ্যে আমিও ছিলাম। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারের পতনে সেসময় দেশে নতুন এক উদ্দীপনার পরিবেশ তৈরি হয়। তার উপর দাঁড়িয়েই সম্ভব হয় ২৯টি টাস্ক ফোর্সের মাধ্যমে প্রায় ২৫০ জন অর্থনীতিবিদ গবেষক বিশেষজ্ঞকে বিনা পারিশ্রমিকে দেশের উন্নয়নের একটি সামগ্রিক চিত্র পর্যালোচনা-সম্ভাবনা-লক্ষ্য যাচাই করে দেখায় নিয়োজিত করা। রেহমান সোবহান সঠিকভাবেই বলেছিলেন, ‘এই কাজ বিদেশি তহবিল দিয়ে করতে গেলে কয়েক মিলিয়ন ডলার খরচ হতো।’ (সোবহান, ১৯৯১ )
গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারের পতনে সেসময় দেশে নতুন এক উদ্দীপনার পরিবেশ তৈরি হয়। তার উপর দাঁড়িয়েই সম্ভব হয় ২৯টি টাস্ক ফোর্সের মাধ্যমে প্রায় ২৫০ জন অর্থনীতিবিদ গবেষক বিশেষজ্ঞকে বিনা পারিশ্রমিকে দেশের উন্নয়নের একটি সামগ্রিক চিত্র পর্যালোচনা-সম্ভাবনা-লক্ষ্য যাচাই করে দেখায় নিয়োজিত করা।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই রিপোর্টগুলো তৈরি হয়। পরে ইউপিএল সেগুলো একসাথে চার খন্ডে প্রকাশ করে। এই টাস্কফোর্স রিপোর্টগুলোর গুরুত্ব আমি তখন দেখেছি এভাবে,
‘(১) দেশের উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন ক্ষেত্র সম্পর্কে এ যাবতকালের গবেষণা, মতামত এবং সামগ্রিক চিত্র এগুলো থেকে পাওয়া যায়। (২) দেশের নেতৃস্থানীয় অধিকাংশ গবেষক অর্থনীতিবিদদের বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গীর পরিচয়ও এগুলোতে উপস্থিত।’
তবে যাদের জন্য অর্থাৎ সরকার, বিরোধী দল, প্রশাসন, এগুলো প্রণয়ন করা হয়েছিল তারা এগুলো নিয়ে কোনো আলোচনা পর্যালোচনা করেছে তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় নি। আমি ১৯৯১ ও ১৯৯২ সালে এই সবগুলো রিপোর্ট পর্যালোচনা করে বাংলায় লিখতে থাকি যেগুলো ধারাবাহিকভাবে প্রথমে বিচিত্রায় প্রকাশিত হয়। বিচিত্রা সম্পাদক শাহাদৎ চৌধুরী যথেষ্ট আগ্রহী ছিলেন, সহ-সম্পাদক চন্দন সরকার বরাবর তাগাদা দিয়েছেন। এই সবগুলো অধ্যায় একসাথে কয়েকবছর পরে বই আকারে প্রকাশিত হয়। (মুহাম্মদ, ১৯৯৫)
এতগুলো টাস্কফোর্স রিপোর্ট পর্যালোচনায় আমাকে অনেক সময় ও শ্রম দিতে হয়েছে। দুটি কারণে আমি ইংরেজি ভাষায় প্রণীত এই রিপোর্টগুলো বাংলাভাষায় পর্যালোচনা করা জরুরী মনে করেছি- প্রথমত, সকলের কাছে বাংলা ভাষায় বোধগম্য আকারে এগুলোর বক্তব্য উপস্থিত করা। দ্বিতীয়ত, এগুলোর মধ্যে যে দুর্বলতা, স্ববিরোধিতা, বা অসংলগ্নতা আছে সেগুলোকে স্পষ্ট করে একটি বাস্তবায়নযোগ্য জনপন্থী উন্নয়ন কাঠামো উপস্থিত করার চেষ্টা করা। তাই করেছি।
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন কথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং এতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি বিজয়ী হয়। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। সেবারের নির্বাচন তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ ছিল, অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপক। বিএনপি ৩০.৮১ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৪০টি আসনে জয় লাভ করে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সামান্য ব্যবধানে ৩০.০৮ শতাংশ ভোট পায়, কিন্তু আসন লাভ করে ৮৮টি। জামায়াতে ইসলামী ১২.১৩ শতাংশ ভোট পেয়ে আসন পায় ১৮টি, সদ্য ক্ষমতাচ্যুত জাতীয় পার্টিও আসন পায় ৩৫টি, ভোট পায় ১১.৯২ শতাংশ। সিপিবি সেবারে ৫টি আসন লাভ করে. ভোট পায় ১.১৯ শতাংশ।
বিএনপি ৩০.৮১ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৪০টি আসনে জয় লাভ করে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সামান্য ব্যবধানে ৩০.০৮ শতাংশ ভোট পায়, কিন্তু আসন লাভ করে ৮৮টি। জামায়াতে ইসলামী ১২.১৩ শতাংশ ভোট পেয়ে আসন পায় ১৮টি, সদ্য ক্ষমতাচ্যুত জাতীয় পার্টিও আসন পায় ৩৫টি, ভোট পায় ১১.৯২ শতাংশ। সিপিবি সেবারে ৫টি আসন লাভ করে. ভোট পায় ১.১৯ শতাংশ।
কিন্তু বিজয়ী হলেও বিএনপির সরকার গঠন সহজ হয়নি। সরকার গঠনের জন্য তার ঘাটতি ছিল। সমর্থন দরকার, কে দেবে বা কার কাছ থেকে নেবে বিএনপি? এই নিয়ে কয়দিন অস্থিরতার পর জামায়াতের সমর্থনে সরকার গঠন করলো বিএনপি। সেখান থেকেই রাজনীতির মাঠে জামায়াতের নতুন পর্বের শুরু।
১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট সংসদ অধিবেশন চলে গভীর রাত পর্যন্ত। সেদিন বিএনপি আওয়ামীলীগ সহ সর্বসম্মতিক্রমে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী পাশ হয় যার মধ্য দিয়ে সংসদীয় ব্যবস্থার পুনপ্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার চালু হয়েছিল। সে ব্যবস্থায় প্রথম প্রেসিডেন্ট হন শেখ মুজিবুর রহমান, এরপর যথাক্রমে খন্দকার মোশতাক, বিচারপতি সায়েম, জিয়াউর রহমান এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সংসদে সিদ্ধান্তের পর ১৫ সেপ্টেম্বর একটি সাংবিধানিক গণভোটের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট পদ্ধতি থেকে সাংবিধানিক ব্যবস্থায় রূপান্তর নিশ্চিত হয়।
১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট সংসদ অধিবেশন চলে গভীর রাত পর্যন্ত। সেদিন বিএনপি আওয়ামীলীগ সহ সর্বসম্মতিক্রমে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী পাশ হয় যার মধ্য দিয়ে সংসদীয় ব্যবস্থার পুনপ্রতিষ্ঠা হয়।
১৯৯১ এর ঘূর্ণিঝড় এবং আক্রান্ত এলাকার ছবি
এর মধ্যে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল, নতুন সরকার ক্ষমতাসীন হবার দেড়মাসের মাথায়, ১৯৭০ এর পর সবচাইতে ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড় হয়। আক্ষরিক অর্থেই উপকূল অঞ্চল ছারখার হয়ে যায়। বিভিন্ন হিসাবে দেখা যায় এক রাতের এই ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষ নিহত হন। পশুপাখি গাছপালা অগণিত। ত্রাণসামগ্রীসহ আমি আরও কয়েকজনকে নিয়ে এসব এলাকায় গিয়ে যা দেখি শুনি তা নিয়ে তখন লিখেছিলাম। তার কিছু অংশ:
চট্টগ্রাম থেকে পতেঙ্গা যাওয়ার পথে একটু যেতেই লন্ডভন্ড ঘরবাড়ি- চারদিকে গাছপালা লুটিয়ে আছে.. কাঠগড়া এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি খুব বেশি। এ জায়গা দিয়ে হাঁটাও কঠিন। দুর্গন্ধ, লাশ এখনও আশেপাশে পড়ে আছে। পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত পর্যন্ত এই দুর্গন্ধ কমলো না।…বাঁশখালীর খানখানাবাদ ইউনিয়নের ডোংরা, রাইছটা, কদমরসুল, প্রেমাশিয়া, ডিহিটিগোনা, ছনুয়া. সাধনপুর, বাহারছড়া সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল।…পুকুরের পানি পুরোটাই বিষাক্ত…বিভিন্ন মড়কে মাছ মরে গেলে যেভাবে শতশত মৃত মাছ পুকুরে ভেসে উঠে প্রথম দিকে সেভাবেই এই পুকুরে লাশ ভেসে ছিল।…বাঁধ ভেঙে যাবার কারণে গ্রাম বিরান হয়ে গেছে। একজন গ্রামবাসী সামনের দিকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছিলেন, ‘এই বাড়িতে ৭৫ জন মানুষ ছিল সবাই মারা গেছে’, আমি বাড়ি খুঁজছিলাম কিন্তু চারপাশ সমান, মাঝে মাঝে পানি জমে আছে, ভাঙাচোরা পোড়া গাছ জায়গায় জায়গায়..এ জায়গাটা ঘন জনবসতি ছিল। বাড়ি-ঘর ছিল। এখন সমান। সূর্যাস্ত দেখতে কোন বাধা আসে না।…
দরিদ্র যারা গ্রামাঞ্চলের সেই শতকরা আশি ভাগেরও বেশি পরিবারের মেয়েরা খুব কমই শাড়ির সঙ্গে অন্য কিছু পরতে পারেন। ছায়া ব্লাউজ যদি থেকেও থাকে দুএকটা তাহলে তা উঠানো থাকে বিশেষ কোন দিনের জন্য, আত্মীয় বাড়ি বেড়াতে যাবার জন্য। শাড়ি নামের পুরনো নরম এক খন্ড কাপড় জড়ানো থাকে শরীরে। জলোচ্ছ্বাস আর ঝড়ে..কাপড় ঠিক রাখা ছিল মেয়েদের বাড়তি একটি মনোযোগের বিষয়। প্রচন্ড বাতাস এবং পানির তোড়ে কাপড় চলে যাওয়ায় জলোচ্ছ্বাসে নিজের ভেসে যাওয়া ঠেকানোর চেষ্টাতেও শৈথিল্য এসেছে, ভেসে গেছে নারী- এরকম ঘটনাও শুনেছি অনেক। তাছাড়া শিশু সামলানোর দায়-দায়িত্বও মেয়েদেরই বেশি, সে কারণেও তাদের শিকার হতে হয়েছে বেশি।…
ছায়া ব্লাউজ যদি থেকেও থাকে দুএকটা তাহলে তা উঠানো থাকে বিশেষ কোন দিনের জন্য, আত্মীয় বাড়ি বেড়াতে যাবার জন্য। শাড়ি নামের পুরনো নরম এক খন্ড কাপড় জড়ানো থাকে শরীরে। জলোচ্ছ্বাস আর ঝড়ে..কাপড় ঠিক রাখা ছিল মেয়েদের বাড়তি একটি মনোযোগের বিষয়।
চকোরিয়ার আগেই বাইন্যাছড়া। সেখান থেকে ডানে চলে গেলে ক্রমান্বয়ে পাহাড়ের সারি পার হতে হয়। যাবার রাস্তা খারাপ, সেতুগুলো জরাজীর্ণ। ভারি গাড়ি চলতে পারে না। যাতায়াতের সব চাইতে ভাল ব্যবস্থা হচ্ছে ভিন্ন কাঠামোয় অনেক পুরনো জীপ। ১৫/২০ জন একেকটিতে যাত্রী হন। কেবল সেই গাড়িই এই রাস্তায় চলতে পারে। এই জরাজীর্ণ রাস্তায় এখন প্রায়ই বিভিন্ন সরকারি ও বিদেশি সংস্থাসমূহের গাড়ি দেখা যায়। এই রাস্তা একটানা অনেকগুলো গ্রাম পার হয়ে সমুদ্রের তীর পর্যন্ত চলে গেছে। চকোরিয়া বস্তুত সমুদ্রের তীরের উপজেলা। পাহাড় পার হয়ে সমতল ভূমি যত যাওয়া যায়, যত সমুদ্রের কাছাকাছি হওয়া যায় ততই বিধ্বস্ত জনপদের দৃশ্য গন্ধ স্পষ্ট হতে থাকে। দুপাশে সমান- পানি জমা, ভারি পানি। কোথাও কোথাও এখনও বিভিন্ন ঘরের চালা, গাছ, মৃত গরু, ছাগল পড়ে আছে। এসব জায়গায় সারি সারি মানুষের লাশ ছিল। এখনো ডোবা, নালার মধ্যে আটকে আছে। তোলা মুশকিল। কোথাও কোথাও ভিটার চিহ্ন খাঁ খাঁ করছে। শুধু ভিটাই আছে, আর কিছুই নাই। ধুয়ে মুছে পরিষ্কার। পেকুয়া, মগনামা, পাশিয়াখালী পাশাপাশি গ্রাম। পেকুয়া বাজার এ অঞ্চলের কেন্দ্র। মগনামা হচ্ছে শেষ প্রান্ত। বাইন্যা চর থেকে মগনামা খেয়াঘাট পর্যন্ত দুপাশে অনেক নতুন নির্মাণ, লম্বা উঁচু স্থান-গণকবর।…
প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ছোট বড় যাই হোক, সামনে একটি ছোট বা বড় পুকুর আছে। পুকুরের চারপাশে, পুকুর না থাকলে বাড়ি ঘিরেই আছে নারিকেল গাছ। পাড় উঁচু পুকুরগুলোতে এখন আবর্জনা স্তুপ। আর এই পুকুরগুলোতেই জমে ছিল বেশিরভাগ লাশ।
মগনামা খেয়াঘাটে দাঁড়ালে কুতুবদিয়া দেখা যায়। ঘন্টাখানেক মেশিন নৌকায় চলার পর পৌঁছা যায় কুতুবদিয়া ঘাটে।…মগনামা ঘাট ঘেষে যে বাঁধটি ছিল, পুরোটা ভেঙ্গে গেছে। কোথাও কোথাও তার অবশেষ দেখে বোঝা যায়, এখানে বাঁধ ছিল। এই বাঁধেই জলোচ্ছ্বাস প্রথম আঘাত হানে। বাঁধ ভেঙ্গে যাবার পর একটানে পুরো এলাকা ভেসে যায়। রাতে কুতুবদিয়া পৌঁছে কাদা পাড়ি দিয়ে উঠতে হলো শুকনো জায়গায়।..বিধ্বস্ত, প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়া কুতুবদিয়া দ্বীপটির বিভিন্ন স্থানের অবশিষ্টাংশ দেখেও এ ধারণাটুকু করা যায় যে, দ্বীপটি খুব চমৎকার সাজানো একটি জনবসতি ছিল। প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ছোট বড় যাই হোক, সামনে একটি ছোট বা বড় পুকুর আছে। পুকুরের চারপাশে, পুকুর না থাকলে বাড়ি ঘিরেই আছে নারিকেল গাছ। পাড় উঁচু পুকুরগুলোতে এখন আবর্জনা স্তুপ। আর এই পুকুরগুলোতেই জমে ছিল বেশিরভাগ লাশ। চারপাশের নারকেল গাছগুলোর অনেকগুলো আশ্চর্যজনকভাবে এখনও দাঁড়িয়ে আছে। অনেকগুলোর মাথা ভেঙে গেছে, শরীর পুড়ে গেছে, তবুও।…লেমশাখালীতে এক বাড়ির কয়েকটি শরিক পরিবারের ১০০ জন সদস্যের মধ্যে ৮৭ জনই মারা গেছে এক রাতে।… (মুহাম্মদ, ২০০০খ)
যুদ্ধাপরাধ বিরোধী ক্ষোভ এবং গণআদালত
সরকার গঠনে বিএনপিকে সমর্থন, ক্ষমতার সাথে প্রত্যক্ষ অংশীদারিত্বের এই পরিস্থিতি জামায়াতকে সাহসী করে তোলে। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গোলাম আজমের তখনও নাগরিকত্ব ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে তিনি পাকিস্তান বা অন্য কোথাও ছিলেন। ১৯৭৮ সালে পাকিস্তানি পাসপোর্টে তিন মাসের ভিসা নিয়ে তিনি বাংলাদেশে আসেন আর যাননি। তিনিই ছিলেন জামায়াতের অঘোষিত আমির। তবে কৌশল হিসেবে দলটি তাদের আরেক নেতা আব্বাস আলী খানকে বেশ কয়েক বছর ভারপ্রাপ্ত আমির হিসেবে সামনে রেখেছিল। ১৯৯১ সালের অক্টোবর মাসে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস এবং আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বদরুল হায়দার চৌধুরী দুজনই গোলাম আজমের দোয়া চাইতে যান। এরপর ডিসেম্বরে জামায়াত গোলাম আজমকে দলের আমির হিসেবে খোলাখুলি ঘোষণা দেবার সাহস করে।
পাকিস্তানি পাসপোর্টধারী, ৭১ এর যুদ্ধাপরাধী নেতা, দেশে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন এই ঔদ্ধত্ব সমাজে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। এই ক্ষোভ থেকেই জন্ম হয় যুদ্ধাপরাধী বিচার আন্দোলনের আরেক পর্বের।
পাকিস্তানি পাসপোর্টধারী, ৭১ এর যুদ্ধাপরাধী নেতা, দেশে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন এই ঔদ্ধত্ব সমাজে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। এই ক্ষোভ থেকেই জন্ম হয় যুদ্ধাপরাধী বিচার আন্দোলনের আরেক পর্বের। ১৯৯২ এর জানুয়ারিতে গঠিত হয় ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’। ১৯ জানুয়ারি এক ঐতিহাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার কর্ণেল (অব) কাজী নূরুজ্জামানের বাসায়। প্রাথমিক সভায় আমরা ৩০/৩৫ জন উপস্থিত ছিলাম। অন্য আরও অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করে, পর পর দুদিন দীর্ঘক্ষণ আলোচনার খসড়া বক্তব্য বিবেচনা করে গঠিত হল ১০১ সদস্যবিশিষ্ট ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’। আহ্বায়ক নির্বাচিত হলেন শহীদ রুমীর মা একাত্তরের দিনগুলির লেখক জাহানারা ইমাম, যিনি শহীদ জননী নামে পরিচিত ছিলেন। এরপর ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশ কেন্দ্র’, ১৪টি ছাত্রসংগঠন, ১৩টি রাজনৈতিক দল ও জোট এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন-সব মিলিয়ে ৭২টি সংগঠন ঐক্যবদ্ধ হয়ে ১৯৯২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি গঠিত হয় ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল সমন্বয় কমিটি’ সংক্ষেপে সমন্বয় কমিটি। এখানেও আহ্বায়ক নির্বাচিত হন জাহানারা ইমাম। সিদ্ধান্ত হলো ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে গণআদালত বা প্রতীক বিচার হবে। সব বিধি নিয়ম মেনে গণআদালত করার জন্য ১২ জনের বিচারকমন্ডলী গঠন করা হয়। তাঁরা হলেন- বেগম সুফিয়া কামাল, আহমদ শরীফ, কবীর চৌধুরী, কলিম শরাফী, শওকত ওসমান, গাজীউল হক, মাযহারুল ইসলাম, শফিক আহমেদ, কাজী নূর-উজ্জামান, আবু ওসমান চৌধুরী ও শওকত আলী খান।

গণআদালত সফল করতে পুরো মার্চ মাসে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অনেক সভা সমাবেশে ছিলাম, সংগঠিতও করেছি। তার মধ্যে আমরা গণস্বাক্ষরও সংগ্রহ করেছি। আমি যেমন ব্যক্তি হিসেবে নির্মূল কমিটিতে ছিলাম, আবার সমন্বয় কমিটিতে গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট ছিল। সেই হিসেবে ব্যক্তি ও সংগঠন দুভাবেই আমার দায়িত্ব ছিল। সভাগুলোতে জোটের পক্ষ থেকে সাধারণত আমি, ফয়জুল হাকিম ও বকুল রহমান যেতাম। আর বেশ কয়েকটি সমাবেশে উমর ভাই থেকেছেন।
এখানে সেসময়কার কিছু দিনচিত্র:
২.৩.১৯৯২
কিছুদিন আগে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের আন্দোলন ও মজুরী প্রশ্নে মালিকশ্রেণীর বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে যৌথভাবে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় একটা বিশাল বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়েছিল। শিরোনাম ছিল ‘জাতি কি এই মজুরি বৃদ্ধির ভার বহন করতে সক্ষম?’ অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলা হয়েছে সেখানে। মূল বক্তব্য উৎপাদনশীলতা কম বলে মজুরি বাড়ানোর কোনো উপায় নাই, তাই মজুরি বাড়ালে শিল্পখাত থাকবে না, কর্মসংস্থানও হবে না। আমি তাদের প্রতিটি বক্তব্য ধরে ধরে উত্তর দেয়ার দায় বোধ করেছি। বিস্তারিত তত্ত্ব উপাত্ত দিয়ে ব্যাখ্যা করে বড় লেখা লিখেছি। শিরোনাম ছিল ‘মজুরি, উৎপাদনশীলতা ও শ্রমিক: জাতি ডাকাত লুন্ঠনকারীদের লুটপাটের ভার বহন করতে সক্ষম নয়।’[১]
১৩.৩.১৯৯২
ধাঙরদের আন্দোলন চলছে। সরকার মাস্তান দিয়ে আক্রমণ করেছে প্রথম, পরে পুলিশ।
এদিকে আজ ঢাবিতে ছাত্রঐক্যের সন্ত্রাস বিরোধী মিছিলের উপর গুলি হয়েছে। মারা গেছেন ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী রাজু।
১৪.৩.১৯৯২
রাজুর হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে শোক মিছিলের উপর আবারও সশস্ত্র হামলা। আসলে গণআদালত বানচালের জন্য জন্যই এসব করা হচ্ছে মনে হয়।
বিকালে নির্মূল কমিটির সভা। সন্ধ্যায় কৃষক ফেডারেশন। লালা এখন থেকে এখানেই কাজ করবে। সে হিসেবে আশাবাদী হওয়া যায়।
১৮.৩.১৯৯২
গণআদালতের বিষয়টি ক্রমেই আরও বেশি গতিলাভ করছে। কোনো বড় রাজনৈতিক দলের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়াই সমাজে ইস্যু বিদ্যমান থাকলে তা কীভাবে স্বতস্ফূর্তভাবে গড়ে উঠে তার রূপটি চোখের সামনেই দেখছি। কত ব্যক্তি নিজের উদ্যোগে এগিয়ে আসছেন তার হিসাব নাই। নীরবে সাফল্য কামনা করছেন এরকম মানুষের সংখ্যা অগুণতি। আলেমরাও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় এগিয়ে এসেছেন। তুলনামূলক কম অংশগ্রহণ বড় ব্যবসায়ীদের ও বড় পেশাজীবীদের- সেখানে নানা সমীকরণ আছে।
জামায়াত নানাভাবে হুমকি দিচ্ছে। সশস্ত্র তৎপরতাও চালাচ্ছে। গতকালই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একজনকে খুন করেছে। সরকার ও বিএনপির ভূমিকা দ্বিমুখী। জামায়াতপন্থী বিএনপি অংশ গণআদালত ঠেকানোর চেষ্টা করছে। আর অন্য অংশ দাঁত কামড়াচ্ছে অংশ নিতে না পেরে। তাদের বড় অংশের সমর্থন আছে।
২৩.৩.১৯৯২
নির্মূল কমিটিতে অনেকেই আছেন, তবে মূলত জাহানারা ইমাম, কাজী নূরুজ্জামান, শাহরিয়ার কবির, সাদেক আহমেদ সক্রিয়। এছাড়া আছেন বাদল, সেলিম। সমন্বয় কমিটি তো উল্টো জটিলতা তৈরির জায়গা।
গত কয়েকদিন ঢাকায় কয়েকটি, নয়ারহাটে একটি সমাবেশ হয়েছে। আগামীকাল সাভারে হবে। আজ হলো জাহাঙ্গীরনগর। আমি সভাপতি ছিলাম। যথেষ্ট না হলেও ৩০ জনের বেশি শিক্ষক এবং শ পাঁচেক ছাত্রছাত্রী উপস্থিত ছিলেন। আজও ঢাকাতে বেশ কয়টি সমাবেশ হয়েছে।
২৪.৩.১৯৯২
খালেদা জিয়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে আসার পর গতকাল গভীর রাতে গোলাম আজমের বিরুদ্ধে শো-কজ জারী করা হয়েছে। উত্তর দেবার পর তা গ্রহণযোগ্য নয় বলে আটকাদেশ দেয়া হয়েছে। এদিকে গণআদালতের কারণে সমন্বয় কমিটির ২০ জনের উপরও শো কজ জারী করা হয়েছে। উত্তর প্রস্তুত করা হয়েছে, দেয়া হবে। গণআদালতের প্রস্তুতি ঠিক আছে। সরকারের মধ্যে এখনও দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে। দমনপীড়নের মধ্যে যাবে না বলেই আমার ধারণা।
২৬.৩.১৯৯২
সকালবেলা আমরা যখন মিছিল নিয়ে যাচ্ছিলাম তখনই পুলিশ বাধা দিল প্রেসক্লাবের সামনে। তবে আরও কিছু মিছিল যোগ দিতেই ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সামনে সরকার মঞ্চ করতে দেয়নি, মাইক নিতে দেয়নি। তার ফলে খুব তাড়াহুড়া এবং বিশৃঙ্খলভাবে গণআদালতের কাজ শেষ হলো। তবে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাবেশ ও সমর্থন এগুলোকে ঢেকে দিয়ে সাফল্যকেই প্রধান করে তুলেছে।..আওয়ামী লীগের, ন্যাক্কারজনকভাবে, দখল করার প্রবণতা এবারও অব্যাহত ছিল।
মনে আছে ঢাকায় সেদিন জারি করা হয়েছিল ১৪৪ ধারা। টিভিতে সকাল থেকে জনপ্রিয় সিনেমা চালানো হচ্ছিল- নবাব সিরাজউদ্দৌলা। রাস্তায় রাস্তায় পুলিশের প্রতিবন্ধকতা ছিল। মঞ্চ না থাকায় একটি ট্রাকে দাঁড়িয়ে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণ-আদালত কার্যক্রম শুরু হয়। গণ-আদালতে গোলাম আযমের পক্ষেরও একজন আইনজীবী রাখা হয়েছিল। মাইক নিষিদ্ধ থাকায় হ্যান্ড মাইকে কাজ চালানো হয়। জাহানারা ইমাম প্রতীকী বিচারের রায় পড়ে শোনান। পরদিনই জাহানারা ইমামসহ এর সংগঠক ২৪ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করা হয়। কয়দিন পরে অবশ্য তাঁরা হাইকোর্ট থেকে জামিন পান।
পার্বত্য চট্টগ্রাম, লোগাং হত্যাকান্ড ও মৌলিক অধিকার কমিটি
পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিকীকরণ, বাঙালিদের নিয়ে অন্যান্য জাতি- আদিবাসীদের অনুপাত কমানো, সামরিক অভিযান ও হত্যাকান্ড, জনসংহতি সমিতির ভূমিকা, শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র তৎপরতা ইত্যাদি সম্পর্কে বাঙালি সমাজে খোঁজখবর কমই ছিল। বাম মহলে কিছু কথাবার্তা ছিল তাও সব ঠিকঠাক না। এসবের পরিবর্তন আসতে থাকে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময়। এই আন্দোলনের সূত্রেই পাহাড়ী জাতিসমূহের উপর দমন পীড়ন এবং সমস্যার গভীরতার বিষয়ে বাঙালি সমাজের মধ্যে খবরাখবর আসার জন্য যোগাযোগ স্থাপিত হয়। পাহাড়ী গণ পরিষদ, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন ইত্যাদি প্রকাশ্য গণ সংগঠনের কাজ ঢাকাতেও দেখা যায়। এসব সংগঠনের কেউ কেউ তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ঢাকাতেই থাকেন। নেতৃবৃন্দের সাথে কথাবার্তা হয়। এই সময়েই যা কিছু কাগজপত্র পাই, তা থেকেই ভয়াবহ পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা করতে পারি। ৮০ দশকের শেষ দিকে যা কিছু জানা বোঝা হয় তাতে এ বিষয়ে লেখার তাগিদ বোধ করি। তখন লিটল ম্যাগাজিনে লেখা সম্ভব, প্রধান পত্রপত্রিকায় নানা সমস্যা। সেরকমই কয়েকটি লেখা লিখেছিলাম। তখনও অনেক কিছুই অজানা।
এরশাদ পতনের পর দেশে একটা গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের প্রত্যাশায় নানা তৎপরতা কথাবার্তার পরিবেশ তৈরি হলো। সেসময়ে একটা সাপ্তাহিক পত্রিকা দিকচিহ্ন প্রকাশ শুরু হলো। যতদূর মনে পড়ে মোহন রায়হান ছিলেন এর সম্পাদক। তারা আমার কাছে লেখা চাইলে আমি পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে একটি বড় লেখা দিলাম। শিরোনাম ছিল- ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীরা কি বাংলাদেশের নাগরিক?’। লেখাটি ছাপা হবার কয়েকদিনের মধ্যেই জানলাম সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা এর প্রতিবাদে একটা লেখা দিয়েছেন, বেশ রাগ করে লেখা। সেটা ছাপা হবার পর এর উত্তর দিয়ে আমি আরেকটা লেখা লিখলাম ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীরা কি বাংলাদেশের নাগরিক?’-২। সামরিক কর্মকর্তা আমাকে এলাকা সফরের কথা বলেছিলেন, বলেছিলেন পার্বত্য অঞ্চলে গেলে আমার ধারণা পাল্টে যাবে। আমার নিজেরও ঐ এলাকায় যাবার আগ্রহ বহুদিনের। কিন্তু সংঘাতের পরিস্থিতির কারণেই যাওয়া হয়নি।
সুযোগ এল ১৯৯২ সালে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন জাতির বড় উৎসব হয় চৈত্রের শেষ থেকে ১লা বৈশাখ পর্যন্ত। বৈশালি, সাংগ্রাই ও বিজু একসাথে বলে বৈসাবি। পাহাড়ী গণ পরিষদ এই উৎসবে যোগ দেবার জন্য আমাদের বেশ কয়েকজনকে আমন্ত্রণ জানালে আমরা রাজী হলাম। ১১ই এপ্রিল সকালে আমরা রওনা হলাম। আমাদের দলে আরও ছিলেন- আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, পঙ্কজ ভট্টাচার্য্য, দিলীপ বড়ুয়া, ডেপুটি এটর্নি জেনারেল হাসান আরিফ, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, এডভোকেট আদিলুর রহমান খান, ড. সৈয়দ হাশেমী, মোস্তফা ফারুক, নাসিরুদ্দোজা, বিপ্লব রহমান, আহাদ আহমেদ, প্রিসিলা রাজ, শাজাহান মিয়াসহ বেশ কজন সাংবাদিক। রামগড় হয়ে খাগড়াছড়ি পৌঁছালম বিকালের দিকে। বেশিরভাগ পাহাড় চাছাছোলা, নিরাপত্তার কারণে পরিষ্কার করে সেনাবাহিনী বা বিডিআরের পোস্ট বা ক্যাম্প বসানো হয়েছে। এর মধ্যে আগের দিন লোগাং হত্যাকান্ডের খবর এলো।
সেসময়ের কিছু চিত্র।
১৬.৪.১৯৯২
গত ১১ এপ্রিল দুপুরের পরপর রামগড়ে ঢুকেই পাহাড়ের সঙ্গে দেখা। এরপর অনেক পাহাড়ই দেখেছি কিন্তু প্রায় সবই বৃক্ষহীন। অনেকগুলোরই ছাল উঠানো, ছাল উঠিয়ে মাটির মধ্যে নকশা করে সামরিক বাহিনীর শান্তিপ্রিয় শ্লোগান লেখা। রাস্তার উপর সবসময়ই দেখছি ক্যাম্প, সামরিক বাহিনী অথবা বিডিআর।… খাগড়াছড়ি পৌঁছে সন্ধ্যার পর ইলিয়াস ভাই ও সারার সাথে ঘুরতে বের হলাম। গত কয়েকবছরে সামরিক বাহিনীর কাজের সুবিধার জন্য অনেক পাকা ভবন হয়েছে, পাকা রাস্তা হয়েছে, বিদ্যুৎও এসেছে অনেক জায়গায়। সার্কিট হাউজের পাশে ক্যান্টনমেন্ট। কাটা পাহাড়, শান্তির কথা লেখা। পাশের পাহাড়ের উপরই সেনাবাহিনী বসে আছে। হেঁটে হেঁটে বাজার পর্যন্ত গেলাম। ১/২ জন ছাড়া পুরো বাজারে আর কোনো চাকমা নাই, সবাই বাঙালী। বই পত্রপত্রিকার দোকানে গেলাম, এলাকার নিজস্ব যেসব পত্রপত্রিকা আছে সবই সেনাবাহিনী প্রকাশিত। রাতেই জানলাম সরকার ‘শান্তিবাহিনীর হাতে ১০ জন নিহত’ বলে যে খবর প্রচার করছে প্রকৃত তথ্য এর বিপরীত ও ভয়াবহ। লোগাং গ্রামে কয়েকশো ঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, আক্রমণে বহু মানুষও নিহত হয়েছেন।
পরদিন মানে ১২ এপ্রিল সকালে আমরা ঐ এলাকাতেই যাবার উদ্যোগ নিলাম। কয়েকটি জীপের ব্যবস্থা হলো, এখানে নাম চাঁদের গাড়ী। পানছড়ি উপজেলা পর্যন্ত যাবার পথে গেলাম কয়েকটি গুচ্ছগ্রামে, পাহাড়ীদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলাম। বেশিরভাগই কথা বলতে তেমন আগ্রহী নন। মেট্রিক পাশ এক তরুণীর সাথে কথা বলে বুঝলাম ওরা শিক্ষার কথাও বলতে চায় না। কাজ নাই। অনিয়মিত রেশনের উপর ভরসা। তবুও ওদের ঘরগুলো খুব গোছানো, খুব পরিচ্ছন্ন।
পানছড়ি উপজেলার শেষ মাথায়, যেখানে ঐ গ্রাম লোগাং এ যাবার রাস্তা শুরু হয়েছে সেখানে আমাদের আটকানো হলো। আমাদের বসানো হলো, একজন মেজর রেজা নানা যুক্তিতর্ক অজুহাত নিরাপত্তা শান্তিবাহিনীর হামলার ভয় ইত্যাদির কথা বললেন। যুক্তি না টিকলেও সময় ক্ষয় হলো, যেতে পারলাম না। ফেরার পথে এবং শহরে এসে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু জনের কাছ থেকে জানলাম বুঝলাম যে একটি বড় হত্যাকান্ড হয়েছে নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে। প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করলেন কয়েকশ মানুষ সেখানে হতাহত হয়েছেন, প্রায় সব বাড়ী কুটির ভস্মীভূত হয়েছে। পরে রাডার পত্রিকায় এর বিশদ বিবরণ দেওয়া হয়। সেইসাথে নিহত ও আহতদের তালিকা।
একইদিন বিকালে কলেজ প্রাঙ্গণে নির্ধারিত ছিল বৈসাবি উৎসব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কিন্তু তা পরিণত হলো শোক ও প্রতিবাদ সভায়। বহু মানুষ জমায়েত হয়েছিলেন। মেয়েদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। কাঁদছিলেন অনেকেই। আমরাও বক্তব্য রাখলাম। সমাবেশে সাদা পোশাকে সামরিক ব্যক্তিরাও ছিলেন, ছবি তুললেন। সমাবেশের পর দীর্ঘ মিছিল। সন্ধ্যার পর খাগড়াছড়ির একমাত্র সাপ্তাহিক পার্বতী, সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত, অফিসে গেলাম। সেখানে অনেক বাঙালী নেতার সাথে দেখা হলো।
একইদিন বিকালে কলেজ প্রাঙ্গণে নির্ধারিত ছিল বৈসাবি উৎসব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কিন্তু তা পরিণত হলো শোক ও প্রতিবাদ সভায়। বহু মানুষ জমায়েত হয়েছিলেন। মেয়েদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য।
১৩ এপ্রিল বিকালে ক্যান্টনমেন্টে চা চক্রের দাওয়াত। এরপর সেখানে ব্রিগেডিয়ার সাহেবের নেতৃত্বে সামরিক কর্মকর্তারা স্লাইড শোর মাধ্যমে নিজেদের ভূমিকা, উন্নয়ন ও শান্তি কর্মসূচী, পার্বত্য অঞ্চলে বিদ্রোহী তৎপরতা সম্পর্কে জানালেন। সেই সাথে বাঙালী কারা এসবে ইন্ধন দিচ্ছে এটা দেখাতে গিয়ে আমার লেখার কিছু অংশও দেখালেন।
১৪ এপ্রিল ১লা বৈশাখে রওনা হলাম রাঙামাটির দিকে। প্রধীরের বাড়ীতে ইলিয়াস ভাই ছিলেন, প্রার্থনা হচ্ছিল বর্ষবরণের। প্রধীরের মা নিজ হাতে বানানো একটি চাদর দিলেন। খুব ভালো লাগলো। রাঙামাটিতে বিকালে পৌঁছেই শোক ও প্রতিবাদ সভা। এখানেও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাতিল হয়েছে। প্রচুর উপস্থিতি ছিল।
১৫ই এপ্রিল সকালে কাপ্তাই লেকে ঘুরতে গিয়ে দেখলাম পাহাড়ের গায়ে গায়ে সামরিক বাহিনী। বেশিদূর যাওয়া গেল না। চাকমা রাজার সঙ্গেও দেখা হলো। তারা তেমন কিছুই করছেন না।
যারা পাহাড় দখল আর কোটি কোটি টাকার ব্যবসায় যুক্ত তাদের জন্য এই অজুহাত খুব দরকার। এর শিকার ক্ষুদ্র জাতিগুলো, আর সেইসাথে বাঙালী দরিদ্র ছিন্নমূল মানুষেরা যাদের এখানে জোর করে বা অসহায়ত্বের সুযোগে আনা হয়েছে ঢাল হিসাবে।
এর মধ্যে সরকারের সহযোগী চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাদের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি তারাও তেমন খুশি নন। শান্তিবাহিনীর তৎপরতা আসলে সেভাবে নাই। কিন্তু যারা পাহাড় দখল আর কোটি কোটি টাকার ব্যবসায় যুক্ত তাদের জন্য এই অজুহাত খুব দরকার। এর শিকার ক্ষুদ্র জাতিগুলো, আর সেইসাথে বাঙালী দরিদ্র ছিন্নমূল মানুষেরা যাদের এখানে জোর করে বা অসহায়ত্বের সুযোগে আনা হয়েছে ঢাল হিসাবে।
ঢাকায় ফিরলাম আজ।
ঢাকায় ফিরে পরদিনই আমরা বসলাম। পরিস্থিতি নিয়ে একটা যুক্ত বিবৃতির বিষয়ে ঐকমত্য হবার পর আমি, সারা ও হাশেমী বসে বিবৃতির খসড়া তৈরি করলাম। বেশ কজন স্বাক্ষর করলেন না। ২১ জনের যুক্ত বিবৃতি হিসেবে প্রকাশ করা হলো। আমরা অনেকেই অনুভব করছিলাম যে, একটা যৌথ মঞ্চ থাকা দরকার যেখানে বাঙালি পাহাড়ী একসাথে পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক অধিকার, জননিরাপত্তাসহ সামগ্রিক সমস্যা সমাধানের পথ নিয়ে কথা বলা ও কাজ করায় সক্রিয় থাকতে পারেন। নিজেদের বোঝাপড়ার জন্যও এটা দরকার। এর ধারাবাহিকতায় বেশ কয়েক দফা বহুজনের সাথে কয়েকমাসের আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়ে গঠিত হলো ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটি’। প্রধানত বাম রাজনৈতিক দল ও দলের বাইরের ব্যক্তিবর্গ নিয়ে পাহাড়ী ও বাঙালী সমন্বয়ে এই কমিটি গঠিত হলো। বলা যায় গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে এটাই প্রথম পাহাড়ী ও বাঙালী সম্মিলিত মঞ্চ। আহবায়কের দায়িত্ব নিতে আমরা পেলাম ব্যারিস্টার লুৎফর রহমান শাজাহানকে, আমি যুগ্ম আহবায়ক। আমার, সারা ও ফারুকের উপরই এই সংগঠন পরিচালনার মূল দায়িত্ব। আগস্ট মাসে আমরা কমিটির ঘোষণায় ছয় দফা দাবি উত্থাপন করি যার প্রতি দেশের জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গ একাত্মতা ঘোষণা করেন। এর ভিত্তিতেই কমিটির কাজ চলতে থাকে। কমিটির পক্ষ থেকে প্রচারিত ছয় দফা দাবি হলো নিম্নরূপ:
১.পার্বত্য অঞ্চলে এযাবতকালে সংঘটিত ঘটনাসমূহ, সমস্যার উৎস অনুসন্ধান এবং তার সমাধানের জন্য জনগণকে অবহিত ও সরকারকে পরামর্শদানের জন্য উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি গঠন। এই কমিটিতে সংসদ সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, আইনজীবী, লেখক, সাংবাদিক, পাহাড়ী জনগণের প্রতিনিধি থাকবেন। এরা ইতিপূর্বে গঠিত সমঝোতা কমিটির দায়িত্বও পালন করবেন। এযাবতকালের সংঘটিত হত্যাকান্ড, ধর্ষণ, নিপীড়ন, অগ্নিসংযোগের ঘটনার বিবরণ প্রকাশ করে তার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচার ও শাস্তি প্রদান।
২.প্রশাসনকে সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা, বর্তমান জেলা পরিষদ বাতিল করে এই অঞ্চলে পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু এবং নির্বাচিত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। জনসংহতি সমিতির গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর অনুমতি দান। অন্যদিকে, শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র তৎপরতা বন্ধ করা। ভারত থেকে পাহাড়ী শরনার্থীদের দেশে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করা।
৩.পাহাড়ী জনগণের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া জমি তাদের ফেরত দান। গুচ্ছগ্রাম ভেঙে দিয়ে তাদের নিজ নিজ এলাকায় যাবার ব্যবস্থা করা। এলাকায় শিল্পসহ অকৃষি খাতে উন্নয়নের বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যস্থা করা। বনায়ন ধ্বংস রোধ করা এবং বনায়নের নামে পাহাড়ীদের উচ্ছেদ বন্ধ করা।
৪.পার্বত্য অঞ্চলে বাঙালিদের বলপূর্বক পুনর্বাসন যে জটিলতা সৃষ্টি করেছে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে না পারায় তাদের যে মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে এবং যে সরকারি ভর্তুকি দিতে হচ্ছে তার অবসানের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। থাকতে ইচ্ছুকদের দখলকৃত পাহাড়ীদের ভূমি থেকে সরিয়ে অকৃষি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। এ অঞ্চলে পাহাড়ী জনগণের ভূমিস্বত্ব ও কর্মসংস্থানের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দান।
৫.এই অঞ্চলের ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বাসমূহের ভিন্ন জাতিগত পরিচয় নিয়ে টিকে থাকার অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দান ও নিজ নিজ ভাষা সংস্কৃতি নিয়ে যাতে তারা গণতান্ত্রিক পরিবেশে বিকাশ লাভ করতে পারে তার ব্যবস্থা গ্রহণ। এবং
৬.পাহাড়ী জনগণের প্রতি বিদ্বেষ, অসম্মান ও অশ্রদ্ধার দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তন ও বাঙালী জনগণের সঙ্গে তাদের সাংস্কৃতিক নৈকট্য সৃষ্টির জন্য পাঠ্যসূচিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করা।
সমাজতন্ত্র ফোরাম ও রূপান্তর
সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর বিশ্বজুড়ে দক্ষিণপন্থী বর্ণবাদী সাম্প্রদায়িক নারী বিদ্বেষীসহ সবরকম বৈষম্যবাদীদের উল্লাস শুরু হয়। পাশাপাশি এই পতনে দেশে দেশে বাম বিপ্লবী সংগঠন ও তৎপরতার মধ্যে নানা চাপ দেখা গেল। বাংলাদেশে মস্কোপন্থী হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি এই সময়েই প্রথম একাধিক ভাঙন এবং দলত্যাগের শিকার হয়। বিভিন্ন দলের অনেক বিপ্লবী হঠাৎ করেই আবিষ্কার করতে থাকলেন শোষণ নিপীড়নের দিন শেষ, এখন পুঁজিবাদের মধ্যেই শোষণহীন ব্যবস্থা সম্ভব।
সেসময় পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা ও সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম নিয়ে সারা দেশে লেখক শিবির থেকে সেমিনার বিতর্ক প্রকাশনাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি নেয়া হয়। আমরা সোভিয়েত ও চীনে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলাম না, আমাদের সমালোচনা ছিল বিভিন্নরকম। কিন্তু তার অর্থ এটা নয় যে, আমরা শত্রুপক্ষের দলে যোগ দেব বা হাল ছেড়ে দেব। বাম রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যারা তখনও হাল ছাড়েননি, তারা তাগিদ দিলেন। আমরা বসলাম একাধিকবার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকও ছিলেন। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে গঠিত হলো- ‘সমাজতন্ত্র ফোরাম’। লক্ষ্য হলো সাম্রাজ্যবাদী ভয়ংকর আগ্রাসনের মুখে সমাজতান্ত্রিক চিন্তা ও তৎপরতাকে নতুনভাবে পর্যালোচনা করা এবং সক্রিয় রাখা।
আমরা সোভিয়েত ও চীনে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলাম না, আমাদের সমালোচনা ছিল বিভিন্নরকম। কিন্তু তার অর্থ এটা নয় যে, আমরা শত্রুপক্ষের দলে যোগ দেব বা হাল ছেড়ে দেব।
এদিকে পুঁজিবাদী বিশ্বে তখন উৎসব শুরু হয়েছে। প্রথম বড় উৎসব ১৯৯১ এর শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণ। পিতা বুশ তখন প্রেসিডেন্ট। সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পরে এরকম একটি আলোচনা তখন জোরে সোরে চলছিল যে এখন থেকে ঠান্ডা গরম সব যুদ্ধের অবসান হবে, অস্ত্র প্রতিযোগিতার অবসান হবে, বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে। কারণ সোভিয়েত ইউনিয়ন নাই, তাই যুক্তরাষ্ট্র আর তার দলবলের যুদ্ধেরও প্রয়োজন নাই। এরকম ভাবনা বামপন্থীদের অনেকেরও মধ্যেও দেখা গেছে। স্পষ্টতই যারা এরকম ভেবেছেন বা তত্ত্বায়ন করেছেন তাদের পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার স্বরূপ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা ছিল না। যুদ্ধ, সমরাস্ত্র খাত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাথে অবিচ্ছেদ্য, এর বিশ্বব্যবস্থায় এর ভূমিকা অনিবার্য। যুদ্ধ ধ্বংস ছাড়া পুঁজিবাদ টিকতে পারে না। তাই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে কেউ কেউ এর যৌক্তিকতা শেষ ভাবলেও নতুন ফ্রন্ট খুলে গেল সাথে সাথেই। ইরাক দিয়ে তার শুরু।
নতুন নতুন তত্ত্বের উৎসবও শুরু হলো। ইতিহাসের সমাপ্তি, তত্ত্বের মৃত্যু, মহাবয়ানের অবসান, সভ্যতার সংঘাত, শ্রেণী দ্বন্দ্বের অবসান, সত্য নিয়ে প্রশ্ন ইত্যাদি। পশ্চিমা দেশগুলোতে বর্ণবাদ, ধর্মীয় পরিচয়ে ভর করে সব বৈষম্যবাদী শক্তি এই তাত্ত্বিক উৎসব থেকে পুষ্টি পেতে থাকলো । অন্যদিকে নতুন নতুন রূপে ‘পশ্চিম’ আর ‘আধুনিকতা’ ‘বিরোধিতা’র নামে গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র-সেকুলার রাষ্ট্র-মানবাধিকার-নারীবাদ-সাম্রাজ্যবাদ ধারণা-তত্ত্ব ও লড়াইএর বিরুদ্ধ প্রচার বেড়ে গেল। চারিদিকে ধর্ম-জাতি পরিচয়ের উদযাপন। ভারতে হিন্দুত্ববাদী, বাংলাদেশে ইসলামপন্থী অসহিষ্ণু রাজনীতির বিস্তারে এগুলো খুবই কাজে লাগলো। পশ্চিমের পুঁজিপন্থী বিশ্ববিদ্যালয়, ফাউন্ডেশন, গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল এসব তাত্ত্বিক উৎসবের প্রাণ। সমাজতন্ত্র আর মার্ক্সীয় মতাদর্শকে পচানো, নব্য উদারতাবাদ আর এসব তত্ত্বের বিস্তার ও বদহজম সব মিলিয়ে পুঁজির আগ্রাসন ও সাংস্কৃতিক মতাদর্শিক আধিপত্য বিজয়ী অবস্থানে উঠে বসলো।
সারাদেশে বিভিন্ন কর্মসূচীর মাধ্যমে আমরা এই পরিস্থিতির তাত্ত্বিক মোকাবিলায় অনেক জায়গায় গেছি। এসব আলোচনা বিশ্লেষণ ও লেখালেখিতে আমরা সোভিয়েত ইউনিয়নকে মহিমান্বিত করতে যাইনি, বরং আমরা সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্থান ও পতনের কারণ অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ করতে চেয়েছি। সাথে মার্ক্সীয় দর্শন, লেনিনের চিন্তা ও পার্টিকাঠামো, মাও-এর বিপ্লবের পথ সবই পর্যালোচনার অধীনে আনা কর্তব্য মনে করেছি। আমাদের সাংগঠনিক উদ্যোগে অনেক সেমিনার প্রকাশনা হয়েছে। সংস্কৃতি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে।
পাশাপাশি আমি সেসময় বেশ কয়েকটি বড় লেখায় হাত দিয়েছি।[২] এছাড়া এই বছরই আমি এঙ্গেলসের এ্যান্টি ড্যুরিং এর অর্থনীতি অংশ অনুবাদ শুরু করি। আমার অনুবাদও সংস্কৃতিতেই ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ শুরু হয়। এর আগে সরদার ফজলুল করিম দর্শন অংশ অনুবাদ করেছেন। সেটাও ধারাবাহিকভাবে সংস্কৃতিতেই প্রকাশিত হয়েছে। আখলাকুর রহমানের লেখা মার্ক্সীয় অর্থনীতিও সংস্কৃতিতে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এগুলো প্রায়ই আমিই সংগ্রহ করে আনতাম। ১৯৯২ এর প্রথমদিকেই আখলাক স্যারের ক্যানসার ধরা পড়লো।
‘রূপান্তর’ উদ্যোগ ৮০ দশকের শেষ দিকে, ১৯৯১-৯২ এও তা অব্যাহত থাকে। এর কেন্দ্র চলচ্চিত্রকার লেখক বন্ধু শামীম আখতারের বাসা। কাপ্তানবাজারের পুরনো ধাঁচের সেই বাড়ী বেশ কিছুদিন আমাদের নিয়মিত আড্ডা, বৈঠক এবং নানা তৎপরতার কেন্দ্র ছিল। রূপান্তর নামে একটি পত্রিকাও এই উদ্যোগ থেকে প্রকাশ শুরু হয়। বেশ কয়েকটি সংখ্যাও প্রকাশিত হয়। রূপান্তর পত্রিকা ও পাঠচক্রে আরও অনেকেই সক্রিয় ছিলেন। শামীম সম্পাদক এবং প্রধান উদ্যোক্তা। এ ছাড়াও পত্রিকায় দায়িত্ব বন্টনে বহুজনের নাম ছিল। আমি ছিলাম, আরও যারা ছিলেন তাদের মধ্যে লেখক শাহীন আখতার, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, শিক্ষক গবেষক মেঘনা গুহ ঠাকুরতা ও রেহনুমা আহমেদ, শিল্পী দিলারা বেগম জলি ও ঢালি আল মামুন, লুৎফর রহমান শাজাহান, লীনা রশিদ, খালেদা হেনা অন্যতম।

সেসময়ের কিছু দিনচিত্র:
২.৫.১৯৯২
জনযুগ এর আগামী সংখ্যার লেখাপত্র গোছালাম। সকালে গিয়েছিলাম আখলাক স্যারের বাসায়। ক্যানসার বেশ কিছুদিন। অপারেশন করে কিছুদিন সুস্থ থাকলেও এখন পুরোপুরি পরাজিত। খুব কষ্ট পাচ্ছেন।
৪.৫.১৯৯২
সকালে তিন দলের ঐক্য কংগ্রেসে গেলাম। ওয়ার্কার্স পার্টি, কমিউনিস্ট লীগ ও সাম্যবাদী দল মিলে গঠিত হলো ওয়ার্কার্স পার্টি। বোঝাই যাচ্ছে কমিউনিস্ট শব্দ থেকে তারা নিজেদের মুক্ত করতে চান। কংগ্রেসে বিরুদ্ধ মত ছিল, আলোচনা তেমন হয়নি। এই ঐক্য নিয়ে নতুন কোন আশা বা হতাশার কোন কারণ দেখি না। কেননা এই ঘটনা নতুন কিছুই যোগ করেনি।..
সন্ধ্যায় খবর আখলাক স্যার মারা গেছেন!
৫.৫.১৯৯২
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত স্যারের সাথেই। গর্ববোধ করি, কী অসাধারণ মেধার সঙ্গে ছিলাম; আবার বেদনাবোধ করি তিনি আমাদের যা দিতে পারতেন তার বেশিরভাগই অপচয় হলো। তার লেখাগুলো অসাধারণ মেধারই প্রতিফলন। রাজনীতিতে ব্যর্থ হলেও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কারণেই তাঁর এসব মূল্যবান লেখা সম্ভব হয়েছে। একই কারণে তিনি সরকারের কাছে বিক্রি হননি।
বিকালে মার্ক্সের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা- ‘বিশ্ব পুঁজিবাদ ও বাংলাদেশ’, ‘সমাজতন্ত্র ফোরাম’ থেকে।
১৬.৫.১৯৯২
বিকালে সিপিবি রমনা থানা আয়োজিত আলোচনা সভায়। সিপিবির ইতিহাসে প্রথম তাদের কোনো আলোচনা সভায় আমার অংশগ্রহণ। শুনলাম উচ্চতর কমিটির আপত্তির মুখেই এই কমিটি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সিপিবির মধ্যে এখন মার্ক্সবাদের পক্ষে ও বিপক্ষে দুই ধারা। প্রথম ধারার উদ্যোগেই এই আলোচনা সভা। সেজন্য তারা আমাকে ডেকেছেন এবং গেলাম। সরদার ফজলুল করিমও ছিলেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে সেলিম ভাই ছাড়া আর কেউ ছিলেন না।
১৭.৫.১৯৯২
বিকালে পাটকল সুতাকল শ্রমিকদের এক বিশাল সমাবেশ হলো। প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক ছিলেন। নেতাদের মধ্যে টাউট টাইপের কয়েকজনকে দেখলাম। তবে সবাইকে কথা বলতে হয়েছে সুনির্দিষ্ট ইস্যুতে। পরিস্থিতি সবাইকে বাধ্য করেছে বিশ্বব্যাংক আইএমএফের নীতিকাঠামোর বিরুদ্ধে বলতে।
সন্ধ্যায় একই সঙ্গে আগামীকালের হরতালের প্রস্তৃুতি ছিল। বিশাল মশাল মিছিল হলো।
১৮.৫.১৯৯২
সকালে উঠে রাস্তায় বেরিয়ে পল্টনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম সত্যিই স্বতস্ফুর্ত পূর্ণাঙ্গ হরতাল হচ্ছে। ২১ বছর পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে হরতাল! অফিসে গিয়ে জানলাম জামায়াত ফ্রিডমের মাস্তানেরা হামলা করেছিল, অস্ত্রশস্ত্রও ছিল। কিন্তু মানুষের প্রতিরোধের মুখে দাঁড়াতে পারেনি।… বিকালে সমন্বয় কমিটির জনসভা।
৩০.৫.১৯৯২
গত সপ্তাহে মার্ক্সীয় নন্দনতত্ত্ব নিয়ে ভালো আলোচনা হলো। ইলিয়াস ভাই এবং আজফার। সৌন্দর্য্য, শিল্প, সমাজ বাস্তবতা ইত্যাদি বিষয় এসেছে, এসেছে অনেক লেখক শিল্পীর বিষয়ও। তারপর খোলা আড্ডায় মহাভারত থেকে শুরু করে, জীবননান্দ, রবীন্দ্রনাথ, পপগান, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, হুমায়ূন আজাদ…।
এই সপ্তাহে জাপল সাঁত্রে এবং অস্তিত্ববাদ নিয়ে আলোচনা। মূল আলোচক ছিলেন হাসান আজিজুল হক।
১৪.৮.১৯৯২
১২ তারিখ সকালে বিভাগে ক্লাশ ও পরীক্ষার কাজ শেষ করে দুপুরে পাবনা রওনা হলাম। সাথে লালাসাহেব।…প্রচন্ড গরম। পাবনা শহর হয়ে পরদিন সকালে টেম্পোতে ভাড়ারা ইউনিয়নের ভাউডাঙ্গা গ্রামে। পাশেই পদ্মা। গভীর রাত পর্যন্ত সভার পর ঘরের বাইরে এসে হতবাক হয়ে গেলাম। পূর্ণিমা রাত, প্রচন্ড গরম মাঝে মাঝে বাতাস। নদীর ধার দিয়ে, এরপর বাড়ীর সামনের উঠান জুড়ে শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ, শুয়ে বসে সবাই গল্প করছে, ভেতরের দিকে সব মেয়েরা।
পূর্ণিমার আলোয় সবাইকে নিয়ে উৎসবমুখর ভাব, অসাধারণ দৃশ্য।
আজ শহরে সেমিনার করে ফিরলাম।
২০.৮.১৯৯২
গত ১৭ আগস্ট ওয়ার্কার্স পার্টি অফিস থেকে বের হতে গিয়ে রাশেদ খান মেনন গুলিবিদ্ধ হন। অচেতন আশংকাজনক অবস্থায় তাকে সিএমএইচে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। সেদিন থেকে পরপর কয়দিন প্রতিবাদ ও বিক্ষোভে পুরো দেশই সরব ছিল।
আজ হরতাল হলো। পিকেটিং ছিল না তেমন। স্বতস্ফুর্ত সফল হরতাল। আমি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঐ এলাকাতেই ছিলাম। সামান্য কিছু দৌড়াদৌড়ি হয়েছে। আজকেও যথারীতি রাস্তায় টোকাই, গরীব তরুণদের প্রাধান্য। এসব দিনে ওরা স্বাধীনতার আনন্দ পায়। বহুদিনের জমা ক্রোধ- এই দিনে বদলা নিতে চেষ্টা করে।
এই অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগ ১৫ দলীয় জোট করতে উঠে পড়ে লেগেছে। পিডিএফ ন্যাপ এক পায়ে খাড়া- নিজেদের দুর্বলতা আড়াল করবার মহা সুযোগ। ৫ দলের মধ্যেও কোনো কোনো নেতা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বাঁধতে আগ্রহী।
১৫.৯.১৯৯২
শামীমের প্রধান উদ্যোগে যে নির্মূল কমিটির নারী শাখা কাজ করছে তার প্রথম সমাবেশ। মেয়েদের সংখ্যাই ছিল হাজারের বেশি। মেয়েদের শ্লোগান, গতিশীলতা, ক্রোধ, আবেগ, সারাক্ষণ কর্মব্যস্ততা, শৃঙ্খলা রক্ষা ইত্যাদি ছিল খুবই লক্ষণীয়।
সভা শেষে জাহানারা ইমাম হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন। কথা বললেন, বাসায় নিয়ে গেলেন। তিনি অসুস্থ, ক্লান্ত কিন্তু অক্লান্ত, উদ্দীপ্ত।
১৭.৯.১৯৯২
সন্ধ্যার পর জাহানারা ইমামের বাসায় রাত প্রায় ১২ টা পর্যন্ত। উনি আন্দোলন সম্পর্কে, এর সমস্যা সম্পর্কে অনেক কথা বললেন। ক্ষোভ, অভিযোগ, আনন্দ, বিশ্বাস..! কথা শেষ হয়নি। আবার যেতে হবে। উনি আমাকে বেশ কিছু দায়িত্ব দিতে আগ্রহী।
২৭.৯.১৯৯২
সকালে জাহানারা ইমামকে নিয়ে গিয়েছিলাম। শিক্ষক সমাবেশ।..যাওয়া আসার পথে অনেক কথাই হলো। বর্তমান কাজের বিভিন্ন সমস্যা, বিভিন্ন সংগঠনের ভূমিকা, ভবিষ্যৎ।… এর বাইরে শুনলাম তাঁর স্মৃতিচারণ, স্বামী সন্তানসহ চাঁদনী রাতে বেড়ানো..। সবকিছুই ৭১ এ শেষ হয়ে গেছে।
৩০.৯.১৯৯২
পরশু সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে গিয়ে আমাদের বাস উল্টে গেল। সবাই কমবেশি আহত হলেও একজন শিক্ষক বড় জখম হলেন। তাঁর একটা হাত খুব খারাপ অবস্থায়।
আজ লন্ডন থেকে —র চিঠি পড়ে স্থম্ভিত, মর্মাহত। খুব খারাপ লাগছে। বন্ধুর দ্বারা ধর্ষিত হয়ে ও মানসিকভাবে গত কয়মাস খুব বিপর্যস্ত ছিল, আত্মহত্যারও চেষ্টা করেছিল। ওর সঙ্গে কথা বলা, পাশে থাকার খুব তাগিদ বোধ করছি কিন্তু উপায় কী? ধর্ষণ যে ভয়ংকর- নারী প্রতিনিয়ত শারীরিক মানসিকভাবে নির্যাতিত হতে থাকে। ওর মত এত শক্ত মেয়ে ‘সভ্য’ ইংরেজ যুবক ‘বন্ধু’ কর্তৃক নির্যাতিত হয়ে এরকম পরিস্থিতি, অন্যদিকে সেই যুবক সদম্ভে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারপরও বন্ধুরা ওকেই বলে ক্রেজী।
১৪.১০.১৯৯২
সমন্বয় কমিটির মহাসমাবেশ। উপস্থিতি লক্ষাধিক। ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সস্টিটিউটের সামনের ডান বাম দুদিকের রাস্তাতেই ছড়িয়ে মানুষ। উমর ভাইও বক্তা ছিলেন। তবে এই আন্দোলনের সর্বদলীয় চরিত্র আজ প্রকটভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। আওয়ামী লীগ তার ধারাবাহিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পুরো সমাবেশকে দখল করে নিল, মঞ্চ থেকে তোলা শ্লোগান পর্যন্ত।
২৫.১০.১৯৯২
একটি ছোট সভায় ড. আহমদ শরীফ যে আলোচনা করেছেন তার একটি খন্ডিত অংশ বড় করে উস্কানিমূলকভাবে ইনকিলাব ‘খবর’ প্রকাশ করেছে। তারপর তার ভিত্তিতে শুরু হয়েছে উন্মাদনা, ‘মুরতাদ’ আখ্যা দিয়ে শরীফ স্যারের বিরোধী মিছিল সমাবেশ। ফাঁসির দাবি। ইলিয়াস ভাই ঠিকই বলেছেন, এই মূর্খরা জানে না যে, বাংলা সাহিত্যে সমাজ চিন্তায় মুসলমানদের অবদান নিয়ে সবচেয়ে বড় কাজ এই আহমদ শরীফই করেছেন এবং করে যাচ্ছেন। আর তারই ফাঁসি চায় এরা ইসলামের নামে।
ইলিয়াস ভাই ঠিকই বলেছেন, এই মূর্খরা জানে না যে, বাংলা সাহিত্যে সমাজ চিন্তায় মুসলমানদের অবদান নিয়ে সবচেয়ে বড় কাজ এই আহমদ শরীফই করেছেন এবং করে যাচ্ছেন। আর তারই ফাঁসি চায় এরা ইসলামের নামে।
৩১.১০.১৯৯২
২৮, ২৯ তারিখ কৃষক ফেডারেশনের সম্মেলন হলো পাবনায়। আগে পরে বেশ কয়েকটি সভা। ২৬ তারিখ গিয়ে আজ ফিরলাম। কৃষক ফেডারেশনের অবস্থা হয়েছিল প্রায় বসে পড়ার মতো। কাশেম ভাই মারা যাওয়ায় আরও অনিশ্চিত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। তারপরও অল্প কয়েকজনের চেষ্টায় বিশেষত সজীবদা, লালা, মজিবর ভাই ও সেইসঙ্গে পাবনার কিছু নেতা কর্মীর উদ্যোগে একটি সফল সংগঠিত সম্মেলন করা গেল। এবারের সম্মেলনের একটি বড় ইতিবাচক দিক হলো- মাঠ পর্যায়ের গরীব কৃষক কর্মীদের স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণ এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ পরিণত আলোচনা। সজীবদা এবারে সভাপতি ও লালা সাধারণ সম্পাদক হলেন। ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বদানের পর শ্রমিক কৃষক আন্দোলনে যোগদানে লালা অনুপ্রেরণার কাজ করবে। সংগঠনের নামও বদলানো হয়েছে এবার- ‘বাংলাদেশ কৃষক ও গ্রামীণ মজুর ফেডারেশন’।
৫.১১.১৯৯২
আল মাহমুদের গদ্যও দারুণ! বুঝতে চেষ্টা করছি এরকম একজন মেধাবী মানুষ কেন এই অবস্থায় পড়লেন? অনেক ভুল বোঝা আছে, অভিমান আছে, আবার সত্যকথনও আছে। তিনি এটাও বলছেন যে, মার্ক্সবাদ পড়া থাকার জন্যই তার পক্ষে কুরআন অনুধাবন সম্ভব হয়েছে!
চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সুবাদে মাঝে মধ্যে ভালো কিছু ছবি দেখার সুযোগ হয়। জহির রায়হান চলচ্চিত্র সংসদের খবর নিয়মিত পাই। গত কয় মাসে ফেলিনি, পিটার ব্রুকের ছবি, গৌতম ঘোষের পার, হেমিংওয়ের ওল্ডম্যান এন্ড দ্য সী চলচ্চিত্র দেখতে পেলাম।
৪.১২.১৯৯২
সকাল থেকে কৃষক মজুর ফেডারেশনের সভা ছিল। লালা সম্পাদক হিসেবে ক্রমেই নিজেকে প্রতিষ্ঠা করছে। বিকালে নির্মুল কমিটির সভা। জাহানারা ইমামকে কোণঠাসা করার চেষ্টা ছিল আজ। এই লোকজনদের উদ্দেশ্য ভালো ছিল না। আমি অনেকটুকু বললাম। সম্মিলিত একটা আন্দোলন যেভাবে সামাজিক চুক্তির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হওয়া দরকার সে বিষয়েই গুরুত্ব দিলাম। অনেক রাতে জাহানারা ইমাম ফোন দিলেন, অনেক বিষয় বললেন, আলোচনার জন্য ধন্যবাদ দিলেন। যেতে বললেন। ১৬ তারিখের আগে ৮ ও ১০ তারিখের কর্মসূচি সফল করার ব্যাপারেও কথা হলো।
৫.১২.১৯৯২
এদেশে বিপ্লবী রাজনীতি গড়ে তুলতে গেলে একদিকে যেমন তত্ত্বগত কাজ খুব সুসংগঠিতভাবে গড়ে তোলা দরকার অন্যদিকে তেমনি সাংগঠনিক ফর্ম সম্পর্কেও নতুন চিন্তাভাবনা দরকার। লেনিনীয় পদ্ধতিতে পার্টি গড়ে তোলার নামে কিংবা গোপন পার্টি গড়ে তোলার নামে এদেশে এযাবত আমলাতান্ত্রিক পার্টি কাঠামোই গড়ে তোলা হয়েছে। জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক যেমনই থাক-নেতৃত্ব ও কর্মীর মধ্যেও স্বচ্ছ সম্পর্ক সৃষ্টি হয়নি। জবাবদিহি অংশগ্রহণ খুবই কম।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সৃষ্টিশীল চিন্তা ও কাজে সক্রিয় কর্মীবাহিনী গড়ে তোলার জন্য আমরা বর্তমানে যে সাংগঠনিক কাঠামো বা পদ্ধতিতে কাজ করছি তা যে যথেষ্ট নয় সেব্যাপারে আমি নিশ্চিত। কিন্তু আমি এর বিকল্প সম্পর্কে এখনও খুব স্পষ্ট কোনো ধারণা গড়ে তুলতে পারিনি।
বাবরী মসজিদে হামলা ও জামায়াত
গণআদালত আন্দোলনের বিস্তৃতির মধ্য দিয়ে সারাদেশেই জামায়াতের প্রকাশ্য তৎপরতা একটু থমকে যায়। নানা কৌশলে, বড় দলগুলোর সাথে নানাভাবে সদ্ভাব সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তারা তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা করতে থাকে। এর মধ্যে কিছু সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হামলা হুমকি শুরু করেছিল জামায়াতের পক্ষে। এদের মধ্যে ফ্রিডম পার্টি ছিল অন্যতম।
তবে জামায়াতকে অস্তিত্বের সংকটের বড় বিপদ থেকে রক্ষা পাবার পথ তৈরি করে দিল ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি। পুরো ভারত জুড়ে সাম্প্রদায়িক উন্মাদণা সৃষ্টি করে বাজপেয়ী ও আদভানীর নেতৃত্বে তারা বাবরী মসজিদ অভিমুখে রথযাত্রা শুরু করলো। এবং সবাইকে স্থম্ভিত করে ৬ই ডিসেম্বর হাজার বছরের পুরনো মসজিদ ভাঙতে তাদের উন্মাদ সমর্থকদের লেলিয়ে দিল। এ এক ভয়ংকর দৃশ্য।
তবে জামায়াতকে অস্তিত্বের সংকটের বড় বিপদ থেকে রক্ষা পাবার পথ তৈরি করে দিল ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি। পুরো ভারত জুড়ে সাম্প্রদায়িক উন্মাদণা সৃষ্টি করে বাজপেয়ী ও আদভানীর নেতৃত্বে তারা বাবরী মসজিদ অভিমুখে রথযাত্রা শুরু করলো। এবং সবাইকে স্থম্ভিত করে ৬ই ডিসেম্বর হাজার বছরের পুরনো মসজিদ ভাঙতে তাদের উন্মাদ সমর্থকদের লেলিয়ে দিল। এ এক ভয়ংকর দৃশ্য। এটা খুবই ভালো সুযোগ এনে দিল গর্ত থেকে জামায়াতের মুখ বের করার। আমরা এই দুই গোষ্ঠীর অন্তর্গত সম্পর্ক নিয়ে তখন একটা শ্লোগান দেই- ‘গোলাম আজম আদভানী- দুই দেশের দুই খুনি’। সেসময় ঢাকা শহর সহ বিভিন্ন স্থানের পরিস্থিতি নীচের বিবরণ থেকে কিছুটা বোঝা যেতে পারে।
৭.১২.১৯৯২
কাল দুপুরে যখন আবসার ভাইএর কাছে প্রথম শুনলাম যে বাসস অফিসে ভারতের সংবাদ সংস্থা পিটিআই থেকে খবর এসেছে যে বাবরী মসজিদ ভাঙা হয়েছে তখন প্রথমে বিশ্বাস করিনি। আগে ভেবেছিলাম ইস্যুটি বিজেপি ঝুলিয়ে রাখবে এবং কংগ্রেসও এতদূর যেতে দেবে না। কিন্তু ঘটনা ভয়ংকর দিকে গেল।
জোটের সভার শেষের দিকে আগের কথা অনুযায়ী জাহানারা ইমামের বাসায় গেলাম। দেখলাম তিনি খুবই চিন্তিত, বাবরী মসজিদ ভেঙে জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধী বিরোধী আন্দোলনের উপরই বিজেপি বড় আঘাত হেনেছে।
আজ সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে গেছি, ওখান থেকে ফিরে ইলিয়াস ভাইএর বাসায় গেলাম, শহরে উত্তেজনা, ধর্মীয় বিভিন্ন গোষ্ঠীর মিছিল। ইলিয়াস ভাই জানালেন, লেখক শিবির-জোট অফিসে হামলা হয়েছে, সিপিবি অফিসে তারা আগুন দিয়েছে। ফুটপাথের হকারদের কাছ থেকে বই নিয়ে তারা আগুন দিয়েছে। হিন্দুপ্রধান এলাকায় লুটপাট, মন্দির ভাঙা সবই হয়েছে। সবগুলো ঘটনায় জামায়াত ও ধর্মীয় পরিচয়ের সংগঠনগুলোর ভূমিকাই ছিল মুখ্য। বিএনপি সরকার ও সব রাজনৈতিক দল অনেক সময় পেয়েছে, খবর আসার পর ১৮ ঘন্টা, ২৪ ঘন্টা পরে এগুলো ঘটেছে কিন্তু কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়নি।
জামায়াত বিদ্যমান আন্দোলনকে নষ্ট করা এবং এই সুযোগে এদেশের প্রগতিশীল শক্তিগুলিকে আঘাত করবার সুযোগটাকে বেশ ভালোমতো কাজে লাগিয়েছে। আবসার ভাইকে তারা আজ জখম করেছে। আজকেও বইএ আগুন দেবার চেষ্টা করেছে, পারেনি।
৮.১২.১৯৯২
সকাল থেকে তোপখানা এলাকায়, মিছিল সমাবেশ লাঠিচার্জ টিয়ারগ্যাস ইত্যাদির মধ্যে ছিলাম। সমন্বয় কমিটি থেকে আজকের হরতাল আগেই ডাকা হয়েছিল গণরায় বাস্তবায়নের দাবিতে, সেই সাথে যোগ হয়েছে বাবরী মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার দাবি। অন্যদিকে গতকালই জামায়াত বাবরী মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদে হরতাল ডেকেছে আজকের জন্যই।
ভোরবেলা তোপখানা মোড়ে গিয়ে দেখলাম কয়েকশ জামায়াত ফ্রিডম কর্মী তোপখানা থেকে বায়তুল মোকাররম দখল করে রেখেছে। উল্টোদিকে আমাদের এদিকে সংখ্যা শতাধিক, বেলা ১১ টার দিকে তা হাজার ছাড়িয়ে গেল। সেসময়ই আওয়ামী লীগের মিছিল এল ৩০/৩৫ জন। জামাতীরা যে সশস্ত্র তা তাদের ভাব দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। তবে ওদের দিকে সব দলীয়, স্বতস্ফুর্ত মানুষ নেই, আমাদের এদিকে স্বতস্ফুর্ত মানুষের সংখ্যাই বেশি। মাঝখানে পুলিশ। সারাদিনই টিয়ার গ্যাস খেয়েছি!…
১৬.১২.১৯৯২
বিজয় দিবসে টিভি দেখে মনে হয় ৭১ এ রাজাকার আলবদর বলে কিছু ছিল না, পাক বাহিনীর সহযোগীদের অস্তিত্ব অদৃশ্য এবং বিএনপি ছাড়া অন্য কেউ এদিনে কোন অনুষ্ঠান করছে না।
তবে মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খা যখনই বেশিমাত্রায় আহত হয় তখনই মুক্তিযুদ্ধ প্রবলভাবে আবারও উপস্থিত হয়। যতদিন না বৃহত্তর মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হবে ততদিন ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ আমাদেরকে তাড়িত, শানিত ও জাগ্রত করবে। বস্তুত মুক্তিযুদ্ধের দৃশ্যমান প্রভাব যতটা তার অদৃশ্য প্রভাব তার চাইতে অনেক বেশি। (চলবে)
টীকা:
১। এটি ধারাবহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল তৎকালীন দৈনিক আজকের কাগজ পত্রিকায় (মার্চ ১৯৯২)। পরে এটি আমার বাংলাদেশের অর্থনীতির চালচিত্র গ্রন্থভুক্ত হয়। (মুহাম্মদ, ২০০০)
২। তার মধ্যে একটি- ‘সমাজতন্ত্রের বিকাশ ধারা ও বিরুদ্ধ শক্তির বিকাশ’, সংস্কৃতি প্রকাশনী, ১৯৯১। (মুহাম্মদ, ২০১৯)
তথ্যসূত্র
উমর, ১৯৯৭। বদরুদ্দীন উমর (সম্পাদিত): পার্বত্য চট্টগ্রাম: নিপীড়ন ও সংগ্রাম। সংস্কৃতি প্রকাশনী। (এতে যাদের লেখা ও সাক্ষাৎকার আছে তারা হলেন যথাক্রমে বদরুদ্দীন উমর. আনু মুহাম্মদ, আখতরুজ্জামান ইলিয়াস, ফয়জুল হাকিম, কবিতা চাকমা। এবং রিপোর্ট।)
মুহাম্মদ, ১৯৯৫। আনু মুহাম্মদ: বাংলাদেশের উন্নয়ন কি অসম্ভব? জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন, ঢাকা।
মুহাম্মদ, ২০০০। আনু মুহাম্মদ: বাংলাদেশের অর্থনীতির চালচিত্র, শ্রাবণ, ঢাকা।
মুহাম্মদ, ২০০০খ। আনু মুহাম্মদ: বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজ ও অর্থনীতি। ২য় সংস্করণ, মীরা প্রকাশন, ঢাকা।
মুহাম্মদ, ২০১৯। আনু মুহাম্মদ: অনুন্নত দেশে সমাজতন্ত্র: সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতা। ২য় সংস্করণ, ঢাকা।
সোবহান, ১৯৯১। Rehman Sobhan: Report of the Task Forces on Bangladesh Development Strategies for the 1990s. UPL, (Digitized 2009)
সর্বজনকথা, ২০২৪। ‘তিন জোটের রূপরেখা’, সর্বজনকথা, ৩৪, ফেব্রুয়ারি, ঢাকা
