মানবাধিকারের ব্যবচ্ছেদ

মানবাধিকারের ব্যবচ্ছেদ

আজমাঈন ফারহিন

দেশে এবং বৈশ্বিক ক্ষেত্রে মানবাধিকার প্রতিদিনের আলোচনা ও প্রশ্নের বিষয়। কোন সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনেক লড়াইএর মাধ্যমে অর্জিত মানবাধিকারকে সীমাবদ্ধ এবং ক্ষমতাবানদের হাতিয়ারে পরিণত করে সেবিষয়ে এই লেখায় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

বর্তমান যুগে মানবাধিকারের অবস্থান অনেকটাই মধ্যযুগে রাজার দৈব অধিকারের (Divine Right) মতো। মানবাধিকারের ধারণা আমাদের রাজনৈতিক মননে এতটাই গভীরভাবে শেকড় গেড়েছে যে, এটি ব্যতীত সমাজ কল্পনা করাই প্রায় অসম্ভব। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের (১৭৭৬) দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে লিপিবদ্ধ রয়েছে: 

“এই সত্যসমূহ স্বতঃসিদ্ধ যে, সকল মানুষ সমান হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন এবং সৃষ্টিকর্তা তাদের কিছু অকাট্য অধিকার প্রদান করেছেন।” 

তবে যা কিছু স্বতঃসিদ্ধ ঘোষণা করা হয় তা সম্পর্কে সাবধান থাকা দরকার। অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের কাছে কিছু স্বতঃসিদ্ধ মনে হওয়া সেটি সঠিক বা সত্য হওয়ার কোনো প্রমাণ নয় বরং তা আমাদের ব্যক্তিগত ঝোঁক ও আমাদের স্থান ও কালের প্রভাব নির্দেশ করে। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী লিবারাল রাজনৈতিক দার্শনিক জন রলস (১৯৯৩) দাবি করেন যে, 

“মানবাধিকার কোনো নির্দিষ্ট দর্শনের ফলাফল নয়, কিংবা বিশ্বকে দেখার একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিও নয়। এটি পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, যদিও সেই ঐতিহ্যেই এটি প্রথম রূপ লাভ করে। এটি কেবল ন্যায়ের সংজ্ঞা অনুসরণ করে।” 

মানবাধিকার “কেবল ন্যায়ের সংজ্ঞা অনুসরণ করে” এটি একটি অদ্ভুত দাবি, কেননা “ন্যায়” সম্পর্কে প্রাচীন গ্রিকদের সময় থেকেই তত্ত্বায়ন হয়ে আসছে এবং প্রাচীন ভারতীয় ছয় ধরনের আস্তিক দর্শনের অন্যতম “ন্যায়” দর্শন। অথচ মানবাধিকারের মতবাদ সপ্তদশ শতাব্দীতে এসে প্রথম হাজির হয়। যদি এটি ন্যায়ের সংজ্ঞা থেকেই উদ্ভূত হয় তবে তা এত দেরিতে কেন আত্মপ্রকাশ করল, এই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে।

যখনই কোনো চিন্তা আমাদের কাছে শাশ্বত বা প্রাকৃতিক মনে হতে শুরু করে তখন আমরা একটি টোটকা ব্যবহার করতে পারি, যার নাম হলো ইতিহাস। Nietzsche, Genealogy, History প্রবন্ধে মিশেল ফুকো (১৯৭৭ : ১৪৪) বলেন,উৎপত্তির ভূত তাড়াতে জিনিওলজিস্টদের ইতিহাসের দ্বারস্থ হতে হবে।”  মানবাধিকারের উৎপত্তি ও বিকাশের ইতিহাস খতিয়ে দেখার মাধ্যমে আমরা একে একটি নির্দিষ্ট স্থান ও কালের সৃষ্টি হিসেবে নির্ণয় করতে পারব। প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বোঝা দরকার: অবজেক্টিভ রাইটস (Objective rights) এবং সাবজেক্টিভ রাইটস (Subjective rights)-এর মধ্যে। অবজেক্টিভ রাইটস বলতে বোঝায় যা সাধারণত ন্যায়সংগত বা ‘উচিত’। যেমন, “বড়দের সম্মান করা উচিত” বা “নিজের দেশের সেবা করা উচিত”। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো যে, এই রাইট কোনো ব্যক্তির ওপর বর্তায় না। এখানে বলা হয়নি এগুলো কার রাইট; কেবল বলা হয়েছে যে এগুলো রাইট। অন্যদিকে, সাবজেক্টিভ রাইটস বলতে বোঝায় এমনসব রাইট বা অধিকার যা অর্পিত হয় একজন ব্যক্তির ওপর, অর্থাৎ একজন সাবজেক্ট-এর ওপর। এই ধরনের রাইটের কিছু পরিচিত উদাহরণ পাওয়া যায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে, যেমন: “আমার ব্যক্তিস্বাধীনতার রাইট আছে” কিংবা “আমার সম্পত্তির রাইট আছে” ইত্যাদি। এখানে রাইটকে এমন কিছু হিসেবে দেখা হয় যা একজন ব্যক্তি ধারণ করেন এবং নিজের বলে দাবি করতে পারেন। মূলত এই সাবজেক্টিভ রাইটসের ধারণার ওপরই মানবাধিকারের মতবাদ দাঁড়িয়ে আছে। এটি এমন এক ধরনের অধিকার যা একজন ব্যক্তি মানুষ হিসেবে জন্মানোর সুবাদেই অর্জন করে। বর্তমান সময়ে যখন কেউ রাইটসের কথা বলে তবে ধরেই নেওয়া যায় যে সে সাবজেক্টিভ রাইটসের কথা বলছে।

সাবজেক্টিভ রাইটসের ধারণা অত্যন্ত আধুনিক একটি উদ্ভাবন। যেমন, প্রাচীন গ্রিকরা যখন কোনো কিছুকে ‘দিকাইওস’ (dikaios) বা ন্যায়সংজ্ঞত বলত, তখন তাদের মাথায় একটি বস্তুনিষ্ঠ ও সর্বজনীন চিত্র ছিল। ব্যক্তিগত অধিকার বলতে কিছু হতে পারে তা তারা হয়তো চিন্তাই করতে পারত না। আদতে প্রাচীন গ্রিক ভাষায় “আমার… এর ওপর অধিকার আছে” এমন কোনো বাক্য তৈরিই সম্ভব নয়। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকদের কাছে কোনটি বৈধ তা নির্ধারিত হতো খোদ বিশ্বের নৈতিক শৃঙ্খল দিয়ে। কোনটি রাইট তা ব্যক্তির মধ্যে নয় বরং সৃষ্টিশৃঙ্খলের ভারসাম্যে নিহিত ভাবা হতো। রোমান আইনে ন্যায়ের সংজ্ঞায়ন করা হয়েছে “প্রত্যেককে তার নিজের প্রাপ্য দেওয়া” হিসেবে। আমাদের যুগের চশমা দিয়ে দেখলে হয়তো আমরা ভাবতে পারি যে, “প্রত্যেককে তার নিজের প্রাপ্য দেওয়া”–এর অর্থ প্রত্যেকের ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার রক্ষা করা। কিন্তু সে সময় সাবজেক্টিভ রাইটসের এই ধারণাই তৈরি হয়নি। একজন ব্যক্তির কী প্রাপ্য ছিল তা তার ব্যক্তিগত অধিকার দিয়ে নির্ধারিত হওয়ার পরিবর্তে সমাজে তার অবস্থান ও সমাজের অন্য সদস্যদের সঙ্গে তার সম্পর্কের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতো। ইসলামি শরিয়তেও দুই ধরনের ফরজ (আবশ্যক) কাজ রয়েছে: একটি ফরজে আইন, যা প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর ফরজ এবং ফরজে কেফায়া, যা সমাজের ওপর সমষ্টিগতভাবে ফরজ। এই ধরনের বণ্টনমূলক ন্যায়ের উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখা। ন্যায়বিচারের এই ধারণা কেবল বোঝা সম্ভব বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত অধিকারের বদলে সমাজকে একটি সামষ্টিক একক হিসেবে দেখলে।

ন্যায়বিচারের এই তরিকা পালটে গেল কীভাবে? কীভাবে রাইটকে ব্যক্তিগত ভাবা সম্ভব হলো? পাশ্চাত্যের ইতিহাসের বেশিরভাগ জিনিসের মতোই একটি ব্যাপার এখানে গুরুত্বপূর্ণ: খ্রিষ্টধর্ম। প্রথমত, খ্রিষ্টধর্ম প্রত্যেক ব্যক্তিকে একটি আত্মার অধিকারী হিসেবে চিন্তা করে, যা প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি ঈশ্বরের সম্পর্ক স্থাপন করে এবং ফলে, প্রত্যেক ব্যক্তিই এক ধরনের পরম বা ধ্রুব মূল্য লাভ করে। যেহেতু আত্মা ব্যক্তিগত দোষ-গুণ কিংবা গোষ্ঠী পরিচয় থেকে ঊর্ধ্বে, তাই কাউকে একটির গোষ্ঠীর সদস্যের বদলে একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে দেখা সম্ভব হয়। আত্মা একইসঙ্গে সর্বজনীন ও শাশ্বত, তাই মানুষকে এখন সমাজে তার অবস্থানের বাইরে, স্থান ও কালের ঊর্ধ্বে একটি বিমূর্ত সত্তা হিসেবে দেখা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, কিছু কিছু খ্রিষ্টান পণ্ডিত, যেমন: উইলিয়াম অব ওকহ্যাম একপর্যায়ে দাবি করেন যে, যদি নৈতিক বিধান সৃষ্টিশৃঙ্খলের ওপর নির্ভর করে তবে তা ঈশ্বরের স্বাতন্ত্র্য কেড়ে নেয়, কেননা তাহলে ঈশ্বরও এই সৃষ্টিশৃঙ্খল মেনে চলতে বাধ্য। এর ফলে, ক্রমেই নৈতিক বিধানকে সৃষ্টিশৃঙ্খলে অন্তর্নিহিত কিছু হিসেবে না দেখে ঈশ্বরের অভিপ্রায় থেকে উদ্ভূত ভাবা হয়। শৃঙ্খলের গুরুত্ব স্থানচ্যুত হয় ঐশী অভিপ্রায়ের কাছে। সর্বোপরি, যেহেতু আমরা ঈশ্বরের প্রতিচ্ছবিতে ঈশ্বরের দ্বারা সৃষ্ট, তাই ব্যক্তির অভিপ্রায়কে ঈশ্বরের অভিপ্রায়ের প্রতিফলন হিসেবে দেখা একটি সামান্য ধাপ মাত্র। সুতরাং, এই ধারার যৌক্তিক পরিণতি হলো সর্বজনীন বিমূর্ত অধিকারের ওপর নির্মিত একটি নৈতিকতা, যা একটি অভিন্ন মানবিক সত্তার ভিত্তিতে প্রত্যেক ব্যক্তির অভিপ্রায় থেকে সৃষ্ট।

এরই ধারাবাহিকতায় মানবাধিকার তার পাকাপোক্ত এনলাইটেনমেন্ট সুরত লাভ করে, যা আজ অবধি বিদ্যমান। মানবাধিকারের বিকাশে খ্রিষ্টধর্মের উল্লেখযোগ্য প্রভাবে অনেকে অবাক হতে পারেন। তবে যেসব এনলাইটেনমেন্ট চিন্তকেরা এর তাত্ত্বিক ভিত্তি বিকাশ করেছেন তাদের লেখায় ব্যাপারটি স্পষ্ট। উদাহরণস্বরূপ: যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের অন্যতম প্রধান দার্শনিক প্রভাবক, জন লক, তার থিওরি অব রাইটস শুরু করেন এই দাবি দিয়ে যে, মানুষ ঈশ্বরের সৃষ্টি এবং ঈশ্বর আমাদের কিছু অকাট্য অধিকার প্রদান করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রেই হুবহু উল্লেখ আছে: “মানুষকে তার সৃষ্টিকর্তা কিছু অকাট্য অধিকার প্রদান করেছেন।” ধর্মীয় সাদৃশ্যের এখানেই শেষ নয়। মানবাধিকার ও ঈশ্বরে বিশ্বাস আরও এক দিক দিয়ে অনুরূপ: দুটোই স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, যা কোনো অভিজ্ঞতালব্ধ পরীক্ষার মাধ্যমে আবিষ্কার করা সম্ভব নয়।

এখন পর্যন্ত আমি চিন্তার কথা বলে আসছি তা মূলত খ্রিষ্টান চিন্তা। কিন্তু চিন্তা আকাশে উড়ে বেড়ায় না, কার্যকরী হতে হলে তা রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে বস্তুগতভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। খ্রিষ্টধর্মের বৌদ্ধিক ভূমিকা না-হয় বুঝলাম, কিন্তু মানবাধিকারের মতবাদ এত ব্যাপকভাবে ও দ্রুততার সঙ্গে গৃহীত হলো কী করে? বিশেষ করে ১৭০০ শতাব্দী ও তার পরবর্তী সময়ে, যখন খ্রিষ্টধর্ম তার বহু আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। এই রহস্যের উত্তর হলো: মানবাধিকারের চিন্তাধারা যেমন খ্রিষ্টধর্মের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত, ঠিক তেমনি এর রাজনৈতিক প্রসার অবিচ্ছেদ্যভাবে পুঁজিবাদের উদ্ভবের সঙ্গে জড়িত। 

পুঁজিবাদের শুরুর দিকে, ষোড়শ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের পুঁজিপতিরা সামষ্টিক মালিকানাধীন জমি (common land) কিনে নিতে শুরু করে এবং তাতে বেড়া দিয়ে তা মুনাফার লক্ষ্যে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে পরিণত করে। ইতিহাসে এটি এনক্লোজার মুভমেন্ট (Enclosure Movement) নামে পরিচিত, যেখানে সামষ্টিক মালিকানাধীন জমিতে চাষ করে নিজেদের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানো কৃষকদের জোরপূর্বক ও অনেক ক্ষেত্রেই সহিংসভাবে ওই জমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। বাস্তুচ্যুত হয়ে তারা মজুরির বিনিময়ে নিজের শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হন। যারা একসময়ে সম্মিলিত লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করত ও নিজেদের একটি বৃহত্তর সমষ্টির অংশ হিসেবে চিন্তা করত, তারা বিচ্ছিন্ন ও বিভক্ত হয়ে পড়ে। উৎপাদন প্রক্রিয়া এখন আর সমষ্টির স্বার্থের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং একজন ব্যক্তি পুঁজিপতির স্বার্থের ওপর। ব্যক্তিগত প্রতিযোগিতা সংহতির জায়গা দখল করেছে। শ্রমিকরা সহকর্মী থেকে মজুরির জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ব্যক্তিবিশেষে পরিণত হয়েছে। মানুষ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয় তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থে; শ্রমিকরা মজুরির উদ্দেশ্যে আর পুঁজিপতিরা মুনাফার উদ্দেশ্যে।

এই সামাজিক বাস্তবতা মানবাধিকারের মতাদর্শের জন্য একটি উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে। এটি স্বাধীনতাকে কল্পনা করে মূলত ঋণাত্মক অর্থে: কোনো কিছু ‘থেকে’ স্বাধীনতা হিসেবে। যেমন: নিজের সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ থেকে স্বাধীনতা। এটি আগের ধনাত্মক সামষ্টিক স্বাধীনতার ভাবনাকে স্থানচ্যুত করে, যা মানুষ একটি সম্মিলিত লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যমে অনুভব করত। বাজারভিত্তিক প্রতিযোগিতা মানুষকে এমন একধরনের মনোভাবের দিকে ধাবিত করেছে যেখানে একে অপরকে সবসময় নিজের অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপকারী হিসেবে মনে হয়। এই জন্যই ‘সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব’ এতটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যেখানে বলা হয় যে সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি চুক্তির মাধ্যমে। যখন মানুষকে সহজাতভাবেই স্বতন্ত্র ও বিভক্ত ভাবা হয় যারা শুধু নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থে একত্র হয়, তখন সমাজ প্রতিষ্ঠা করার একমাত্র উপায় চুক্তি সই করা।

এর ফলে, হেগেল যাকে জনসমাজ (civil society) ও রাষ্ট্র (political state) বলে তার মধ্যে একটি সুস্পষ্ট ফারাক তৈরি হয়। জনসমাজ হলো বাজারের পরিসর, যেখানে ব্যক্তিরা নিজেদের ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য হাসিলে লিপ্ত থাকে। অন্যদিকে রাষ্ট্র হলো সেই পরিসর যেখানে সবাই মিলে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়; যেখানে জনপরিসরের দ্বন্দ্ব ও ঝঞ্ঝাট নিয়ন্ত্রণ করা হয়। লিবারাল সমাজ এই মৌলিক বিভাজনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে: ব্যক্তি একদিকে আর রাষ্ট্র, সঙ্গে এর অফিস, আদালত, আর্মি ও পুলিশবাহিনী অন্যদিকে। এই প্রেক্ষাপটে, কার্ল মার্ক্স তার বিখ্যাত প্রবন্ধ On the Jewish Question-এ লেখেন, 

“সর্বোপরি, আমরা এই সত্য লক্ষ করি যে, তথাকথিত মানবাধিকারগুলো জনসমাজের একজন সদস্যের অধিকার ছাড়া আর কিছুই নয়; অর্থাৎ, একজন আত্মকেন্দ্রিক মানুষের অধিকার, যে কিনা অন্য মানুষ এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন।” (১৮৪৪/১৯৭৮ : ৪২) 

জনসমাজ ও রাষ্ট্রের এই ফারাকের ফলে মানুষ দুই ভাগে বিভাজিত হয়ে যায়: একদিকে জনসমাজের একজন স্বতন্ত্র আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তি, হোমো ইকোনমিকাস আর অন্যদিকে রাষ্ট্রের নাগরিক একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি, হোমো পলিটিকাস এটি মানবাধিকারের মতাদর্শেও একটি টানাপোড়েন সৃষ্টি করে, কেননা মানবাধিকার যে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যবস্থার ঊর্ধ্বে থাকার কথা, কিন্তু এগুলো কাউকে প্রদান করা সম্ভব কেবল যদি রাষ্ট্র তাকে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। একটি সর্বজনীন বিমূর্ত মানবসত্তা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নাগরিকসত্তার সঙ্গে নিরন্তর দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়।

মানবাধিকার যেভাবে ব্যক্তিকে সর্বজনীন ও সমাজবিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখে তা পুঁজিবাদী উৎপাদন প্রক্রিয়ার জন্যও মানানসই। কেননা যখন একজন পুঁজিপতি শ্রমিকদের নিয়োগ করে তখন সে তাদের বিমূর্ত ব্যক্তি হিসেবে দেখে, যাদের পরিচয় কেবল তাদের শ্রমশক্তি দ্বারা নির্ধারিত। যেহেতু মানবাধিকার কাগজে-কলমে সবার জন্য সমান, তাই এটি বাস্তবে সমাজে বিদ্যমান ক্ষমতার গভীর অসমতা ঢাকতে সাহায্য করে। যেমন, রাষ্ট্র দাবি করে তার আদালত সুষ্ঠু , কেননা তার সংবিধানে সবার একটি সুষ্ঠু বিচার পাওয়ার সমান অধিকার রয়েছে। কিন্তু এই সমানাধিকার আড়াল করে যে, আপনার বিচার কতটুকু ‘সুষ্ঠু’ হবে তা নির্ভর করে আপনার আর্থসামাজিক অবস্থানের ওপর, আপনার উকিল নিয়োগের সক্ষমতার ওপর। সমানাধিকারের মতবাদ আদতে মানুষকে সমান বানায় না, বরং এটি শুধু মানুষকে যা কিছু একজন ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তোলে তা থেকে বিমূর্ত রূপে দেখতে সাহায্য করে। এটি মানবাধিকারের আরেকটি বিশাল স্ববিরোধ: একদিকে এর কথিত উদ্দেশ্য মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য রক্ষা করা, কিন্তু স্বভাবগতভাবেই এর আমাকে যা কিছু আমি বানায় তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে চিন্তা করতে হয়।

যেমন, রাষ্ট্র দাবি করে তার আদালত সুষ্ঠু , কেননা তার সংবিধানে সবার একটি সুষ্ঠু বিচার পাওয়ার সমান অধিকার রয়েছে। কিন্তু এই সমানাধিকার আড়াল করে যে, আপনার বিচার কতটুকু ‘সুষ্ঠু’ হবে তা নির্ভর করে আপনার আর্থসামাজিক অবস্থানের ওপর, আপনার উকিল নিয়োগের সক্ষমতার ওপর।

কিন্তু এত কিছুর পরও, হতেই পারে যে মানবাধিকারের নিট ইতিবাচক মূল্য রয়েছে, তাই না? আমাদের এখানে কোনো কিছুর মূল্য তার উৎস দেখে নির্ণয় করতে গিয়ে জেনেটিক ফ্যালাসির (genetic fallacy) ফাঁদে পড়া থেকে সাবধান থাকা উচিত। হতেই পারে যে, শুরুতে এগুলো উদীয়মান পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থকে বৈধতা দিলেও এখন মানবাধিকার আমাদের জন্য রক্ষাকবচের ভূমিকা পালন করে। তবু সমস্যাটি অন্যত্র। মানবাধিকারের ধারণার ভেতরেই এক ধরনের অন্তর্নিহিত সমস্যা বিদ্যমান যা অনেক সময়ই উপেক্ষিত রয়ে যায়– অধিকারের বাস্তবায়ন। লিবারাল রাজনৈতিক তাত্ত্বিকরা মানবাধিকার নিয়ে কথা বলার সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর বাস্তবায়নের দিকটি এড়িয়ে যান। কেননা বাস্তবায়নের প্রশ্ন এলেই সেখানে ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রসঙ্গ উঠে আসে, অর্থাৎ কার তা বাস্তবায়নের ক্ষমতা আছে। 

মানবাধিকার ফলপ্রসূ হতে হলে তা বলবৎ করতে হবে, দরকার হলে সহিংস পদ্ধতিতে। এখন প্রশ্ন আসে– কে তা বলবৎ করবে? অবশ্যই যাদের তা বলবৎ করার ক্ষমতা আছে তারাই করে, যারা আদালত, সেনাবাহিনী, পুলিশবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ রাষ্ট্র, যার সহিংসতার ওপর মনোপলি রয়েছে। তা ছাড়া এই অধিকারগুলো বলবৎ করতে হলে তাদের আপনার থেকে বেশি ক্ষমতাধর হতে হবে এবং এমনসব কাজের অনুমতি থাকতে হবে যা আপনি করতে পারবেন না। এখন প্রশ্ন আসে: রাষ্ট্র আসলে কার স্বার্থ রক্ষা করে? যদিও-বা লিবারাল তাত্ত্বিকরা বলেন যে রাষ্ট্র সমাজের সামষ্টিক স্বার্থ রক্ষা করে, সহজাতভাবেই এটি তার স্বার্থই রক্ষা করবে যে তাকে অর্থায়ন করে। অন্যথায়, যে পুঁজি তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে তা আসা বন্ধ হয়ে যাবে। এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয় যে, বেশিরভাগ মানবাধিকার ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে প্রাসাদে।

এখানে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়– মানবাধিকার রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে, তা আপনার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাধর কেউ আপনাকে মঞ্জুর করতে হবে। মানবাধিকার, যা সবাইকে সমান করার কথা বলে, তা বাস্তবে স্বার্থ-সংঘাতময় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে একটি মৌলিক ক্ষমতার অসমতার ওপর নির্ভরশীল। এবং যদি আপনার চেয়ে ক্ষমতাধর কেউ আপনাকে আপনার অধিকার মঞ্জুর করে, তবে সে তা কেড়েও নিতে পারে। কিন্তু তাই যদি হয়, তবে রাষ্ট্র সেই অধিকার মঞ্জুর করেই-বা কেন? এ ক্ষেত্রে, Daybreak: Thoughts On The Prejudices Of Morality বইয়ে ফ্রেডরিক নিৎসের অধিকারের তত্ত্বায়ন বেশ সহায়ক। তিনি লেখেন, 

“আমার অধিকার হলো আমার সেই ক্ষমতার অংশ যা অন্যরা আমাকে কেবল দান করেনি, বরং তারা চায় আমি যেন তা রক্ষা করি। অন্যেরা কেন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়? প্রথমত: তাদের বিচক্ষণতা, ভয় এবং সতর্কতার কারণে–হয় তারা আমাদের কাছ থেকে বিনিময়ে অনুরূপ কিছু আশা করে, অথবা তারা মনে করে যে আমাদের সঙ্গে লড়াই করাটা ধ্বংসাত্মক হবে কিংবা নিরর্থক” (১৮৮১/১৯৯৭ : ৬৭)। 

ধরা যাক, শ্রমজীবী শ্রেণি দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে বঞ্চিত. এই বাস্তবতায় ক্লান্ত হয়ে তারা একটি সশস্ত্র শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলে এবং রাষ্ট্র পতনের হুমকি দেয়। রাষ্ট্র তখন শ্রমজীবী শ্রেণির ক্ষমতাকে স্বীকৃতি দিয়ে কিছু শ্রম অধিকার আইন বাস্তবায়ন করে। এই অধিকারগুলো মঞ্জুর হয় রাষ্ট্র খুব দয়ালু বলে নয় কিংবা কোনো শাশ্বত নৈতিক বিধান বাস্তবায়নের লক্ষ্যেও নয়; বরং দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর মধ্যে একটি আপস হিসেবে, এই আশায় যে এটি অপর পক্ষকে শান্ত করবে-“এভাবেই অধিকারের উৎপত্তি হয়: স্বীকৃত এবং নিশ্চিত ক্ষমতার মাত্রা হিসেবে।” (পৃ. ৬৭)

অধিকারকে দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গিটি সামাজিক ও পার্থিব বাস্তবতার সঙ্গে অনেক বেশি সংগতিপূর্ণ। এটি আমাদের অধিকারকে নিরপেক্ষ শাশ্বত বিধানের বদলে সংগ্রামের ঐতিহাসিক ফলাফল হিসেবে দেখতে সাহায্য করে। নিৎসে (পৃ. ৬৭) আরও লেখেন, 

“যদি ক্ষমতার সম্পর্কের মধ্যে কোনো বস্তুগত পরিবর্তন ঘটে, তবে পুরোনো অধিকারগুলো বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং নতুন অধিকারের জন্ম হয়–যা বিভিন্ন দেশে অধিকারের নিরন্তর বিলুপ্তি এবং পুনর্গঠনের মাধ্যমে প্রমাণিত। যদি আমাদের ক্ষমতা বস্তুগতভাবে হ্রাস পায়, তবে যারা এতদিন আমাদের অধিকারের নিশ্চয়তা দিয়ে আসছিল, তাদের মনোভাবও বদলে যায়: তারা তখন ভেবে দেখে যে তারা আমাদের সেই পুরোনো অবস্থানে ফিরিয়ে নিতে পারবে কি না; যদি তারা মনে করে যে তারা তা করতে অক্ষম, তবে ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই তারা আমাদের ‘অধিকার’ অস্বীকার করতে শুরু করে।” 

আমরা যদি একটু আগের উদাহরণে ফিরে আসি: যদি সেই শ্রমজীবী শ্রেণি দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে যেই রাষ্ট্র তাদের কিছু শ্রম অধিকার মঞ্জুর করেছিল তারা আর সেগুলো প্রয়োজনীয় মনে করে না এবং তা বাতিল করে, যেমনটা আমরা দেখেছি রোনাল্ড রেগান ও মার্গারেট থ্যাচারের কালে যখন ৮০-র দশকে নব্য-উদারবাদের আবির্ভাব হয় তখন। আগে অর্জিত শ্রম অধিকারগুলোর বিলুপ্তি ছিল শ্রমিক আন্দোলনের ক্রমহ্রাসমান শক্তিরই একটি প্রতিফলন। সুতরাং মানবাধিকারের অস্তিত্বই পূর্বানুমান করে যে, সমাজে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে একটি ক্ষমতার লড়াই বিদ্যমান, যেখানে অধিকতর ক্ষমতাবান দুর্বলকে অধিকার মঞ্জুর করে।

জার্মান পত্রিকা GegenStandpunkt (২০১৩) লেখে,“মানুষের এমন এক মালিকের বান্দা হওয়ার অধিকার আছে যে তার দেখাশোনা করে, এটাই হলো প্রাকৃতিক মানবাধিকারের মহৎ এনলাইটেনমেন্ট ধারণার শোচনীয় সারমর্ম।” তাই এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, সর্বপ্রথম যে দুটি দেশ মানবাধিকারের স্বীকৃতি দেয়: যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স, তারাই সবশেষে দাসপ্রথা বিলোপকারী দেশের মধ্যে অন্যতম। শ্রেণিগুলোর মধ্যে আমরা যে ক্ষমতার অসমতা দেখি, তা বৈশ্বিক অঙ্গনে দেশগুলোর মধ্যেও বিদ্যমান। তথাকথিত “মানবিক হস্তক্ষেপের অধিকার”-এর কথাই ধরা যাক। এটি এমন একটি ধারণা যার কোনো ঐতিহাসিক নজির নেই; যা দাবি করে যে একটি দেশ মানবাধিকার লঙ্ঘন ঠেকাতে আরেকটি দেশে আক্রমণ চালাতে পারে। কে এই মানবিক হস্তক্ষেপের অধিকার বাস্তবায়ন করে? আবারও বলতে হয়: যাদের তা বাস্তবায়নের ক্ষমতা রয়েছে, যারা সামরিকভাবে ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান। এটি এমন এক বাস্তবতা তৈরি করে যেখানে ক্ষমতাধররা মানবিক হস্তক্ষেপের নামে একটি দেশকে আক্রমণ ও শোষণ করতে পারে, যেমনটা যুক্তরাষ্ট্র করেছে যুগোস্লাভিয়া, লিবিয়া, সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইরানসহ বিভিন্ন দেশে। অথচ তাদের দেশের অভ্যন্তরীণ ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন, যেমন: বর্ণবাদ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ইত্যাদির জন্য কারো কাছে জবাবদিহির প্রয়োজন পড়ে না।

এটি এমন এক বাস্তবতা তৈরি করে যেখানে ক্ষমতাধররা মানবিক হস্তক্ষেপের নামে একটি দেশকে আক্রমণ ও শোষণ করতে পারে, যেমনটা যুক্তরাষ্ট্র করেছে যুগোস্লাভিয়া, লিবিয়া, সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইরানসহ বিভিন্ন দেশে। অথচ তাদের দেশের অভ্যন্তরীণ ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন, যেমন: বর্ণবাদ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ইত্যাদির জন্য কারো কাছে জবাবদিহির প্রয়োজন পড়ে না।

আমি বলছি না যে আমরা মানবাধিকারের মতবাদ বিসর্জন দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। মানবাধিকারের ধারণা একটি ঐতিহাসিক ফলাফল। এটি একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ও রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আলামত। আমরা আলামতের চিকিৎসা করি না, আমরা রোগের চিকিৎসা করি। আমরা যদি মানবাধিকারের অন্তর্নিহিত সমস্যাগুলো বুঝে থাকি, তবে এটি স্পষ্ট যে, যেই সামাজিক ও রাজনৈতিক বন্দোবস্ত একে তৈরি করেছে তার পরিবর্তন অনিবার্য। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা পুঁজিবাদ ও লিবারাল রাজনৈতিক কাঠামোর অধীন বাস করছি, ততক্ষণ আমাদের মানবাধিকার অবশ্যই প্রয়োজন, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে। কিন্তু আমরা যদি আমাদের লড়াইকে শুধু রাষ্ট্রের কাছে আমাদের অধিকার ভিক্ষা চাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি, তাহলে আমরা কখনোই সেই মৌলিক সমস্যার সমাধান করতে পারব না যার প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই মানবাধিকারের সৃষ্টি। অর্থাৎ সেসব মৌলিক সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অসমতা যার ওপর আমাদের সমাজ দাঁড়িয়ে আছে এবং জনসমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যকার সেই চিড়, যা কিনা অর্থনৈতিক শ্রেণিগুলোর বিভাজনেরই প্রতিফলন।

এই পর্যায়ে আমরা সহজেই বুঝতে পারছি যে মানবাধিকার ও রাজার দৈব অধিকার অনেক দিক দিয়েই সাদৃশ্যপূর্ণ। উভয়কেই শাসক শ্রেণি তাদের শাসনকে বৈধতা দান করতে ব্যবহার করে। এই বৈধতা দান করতে তারা সমাজের ঊর্ধ্বের কোনো শক্তির শরণাপন্ন হয়, যেমন: কোনো অতিপ্রাকৃত বা নৈতিক বিধান। আমরা যদি “হ্যাঁ, আমাদের মধ্যে বিরাট ক্ষমতার অসমতা বিদ্যমান, কিন্তু আমরা সবাই আল্লাহর বান্দা, আমরা রাজারা শুধু আল্লাহর ইচ্ছা বাস্তবায়ন করছি”–এই বাক্যের সঙ্গে তুলনা করি “হ্যাঁ, আমাদের মধ্যে বিরাট ক্ষমতার অসমতা বিদ্যমান, কিন্তু আমরা সবাই কিছু অধিকারের মালিক, আমরা রাষ্ট্র শুধু সেই অধিকারগুলো বাস্তবায়ন করছি”; তবে একটি জিনিস স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, মানবাধিকার ও দৈব অধিকার উভয়ই ঐতিহাসিকভাবে কালসাপেক্ষ রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে প্রাকৃতিক ও অনিবার্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এর ফলে আরেকটি মৌলিক স্ববিরোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে: মানবাধিকারকে রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে দাবি করা হয়, কিন্তু মানবাধিকারের অস্তিত্বই রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে পূর্বানুমান করে।

কিন্তু এমন একটি সমাজ কীভাবে প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে যা মানবাধিকারের মতবাদ উৎপাদন করে না ও এর ওপর আর নির্ভর করে না? এটি এমন একটি সমাজ হতে হবে যেখানে সমষ্টির গুরুত্ব পু্নরুজ্জীবিত করা হয়েছে। এমন একটি সমাজ যেখানে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ শুধু রাষ্ট্রযন্ত্রে সীমাবদ্ধ না থেকে একেবারে স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে সমগ্র সমাজে ছড়িয়ে থাকে। এমন একটি সমাজ যেখানে উৎপাদন প্রক্রিয়া আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তিদের নিজেদের স্বার্থ হাসিলে একত্র হওয়ার ক্ষেত্র নয়, বরং একটি সামাজিকভাবে পরিকল্পিত প্রক্রিয়া। যখন মানুষ তার নিজের জীবনের ওপর ও তার নিজের কর্মের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবে কেবল তখনই তাদের আর রাষ্ট্রের কাছে অধিকার ভিক্ষা চাইতে হবে না। কেননা তাদের ক্ষমতাগুলো রাষ্ট্র দ্বারা হরণ করা হবে না। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া যখন কেবল রাষ্ট্রযন্ত্রের মুষ্টিমেয় কয়েকজনের কাজ না হয়ে সংশ্লিষ্ট সবার কাজে পরিণত হবে, একমাত্র তখনই প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জিত হবে। এটি একজন বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির মেকি স্বাধীনতা নয়, বরং সেই প্রকৃত স্বাধীনতা যা কেবল অন্যের সঙ্গে সংহতির মাধ্যমেই অনুভব করা সম্ভব। 

যখন মানুষ তার নিজের জীবনের ওপর ও তার নিজের কর্মের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবে কেবল তখনই তাদের আর রাষ্ট্রের কাছে অধিকার ভিক্ষা চাইতে হবে না। কেননা তাদের ক্ষমতাগুলো রাষ্ট্র দ্বারা হরণ করা হবে না। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া যখন কেবল রাষ্ট্রযন্ত্রের মুষ্টিমেয় কয়েকজনের কাজ না হয়ে সংশ্লিষ্ট সবার কাজে পরিণত হবে, একমাত্র তখনই প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জিত হবে।

এমন সমাজে আর জনসমাজ ও রাষ্ট্রের বিভাজন থাকবে না; ব্যক্তি-মানব ও বিমূর্ত নাগরিকের বিভাজন থাকবে না। বরাবরের মতোই, মার্ক্সের মতো এত নিখুঁতভাবে আর কেউ বলতে পারেনি 

“যখন বাস্তব ব্যক্তি-মানব তার নিজের ভেতর সেই বিমূর্ত নাগরিক সত্তাকে গুটিয়ে নেবে; যখন একজন ব্যক্তি তার দৈনন্দিন জীবনে, তার কাজে ও তার অবস্থানে নিজেকে এক সামাজিক সত্তা (Species-being) হিসেবে গড়ে তুলবে; যখন মানুষ তার নিজস্ব শক্তিগুলোকে সামাজিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেবে ও সংগঠিত করবে এবং ফলে, যখন সে নিজের ক্ষমতাকে আর নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আলাদা করে দেখবে না, কেবল তখনই প্রকৃত মানবমুক্তি সম্পন্ন হবে” (মার্ক্স ১৮৪৪/১৯৭৮ : ৪৬)। 

এমন একটি সমাজ কল্পনা করা আমাদের জন্য ঠিক ততটাই কঠিন, যতটা কঠিন ছিল একজন মধ্যযুগীয় ভূমিদাসের পক্ষে আমাদের বর্তমান সমাজকে কল্পনা করা। কিন্তু আমাদের সময়ের রাজনৈতিক গোঁড়ামিগুলোকে প্রত্যাখ্যান করার মধ্যদিয়েই আমাদের প্রকৃত মুক্তির পথ উন্মোচন করা সম্ভব।

আজমাঈন ফারহিন: সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: azmainfarhin03@gmail.com

তথ্যসূত্র

অনামা ২০১৩ । The human right. (2013). Gegenstandpunkt: Politische Vierteljahreszeitschrift, 2013(2). https://en.gegenstandpunkt.com/article/human-right

নিৎসে ১৯৯৭। Nietzsche, F. W. (1997). Daybreak: Thoughts on the prejudices of morality (M. Clark & B. Leiter, Eds.; R. J. Hollingdale, Trans.). Cambridge University Press. (Original work published 1881)

ফুকো ১৯৭৭। Michel Foucault. (1977). Nietzsche, genealogy, history. In D. F. Bouchard (Ed.), Language, counter-memory, practice: Selected essays and interviews (pp. 139–164). Cornell University Press.

মার্ক্স ১৯৭৮। Marx, K. (1978). On the Jewish question. In R. C. Tucker (Ed.), The Marx-Engels reader (2nd ed., pp. 26–52). W. W. Norton & Company. (Original work published 1844)

রলস ১৯৯৩ । Rawls, J. (1993, November 30). Débats John Rawls. Le Monde. https://www.lemonde.fr/archives/article/1993/11/30/debats-john-rawls_3968676_1819218.html

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •