মৌলবাদের সংঘর্ষ: ক্রুসেড, জিহাদ এবং আধুনিকতা-১৩
পাকিস্তানের অনস্বীকার্য গল্প-২
তারিক আলি
২০০২ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসী তৎপরতা অনেক বিস্তৃত এবং ইসলামি মৌলবাদ বিশ্বজুড়ে আলোচিত বিতর্কিত বিষয় তখন তারিক আলির বই The Clash of Fundamentalisms: Crusades, Jihads and Modernity প্রকাশিত হয়। তারিকের এই বই অনুসন্ধান করেছে ধর্মীয় বিভিন্ন মত-পথ, বিভিন্ন ধরনের মৌলবাদী শক্তি, তার ইতিহাস ও রাজনীতি এবং সর্বোপরি তার ভাষায় ‘সবচাইতে বড় মৌলবাদী শক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ’-এর সঙ্গে এর সম্পর্ক। সর্বজনকথার জন্য এই বই (প্রকাশক ভার্সো, 2003)-এর ধারাবাহিক অনুবাদ করছেন ফাতেমা বেগম। এবারে ত্রয়োদশ পর্ব। এখানে আলোচিত হয়েছে গতসংখ্যায় প্রকাশিত পাকিস্তানের কাহিনীর বাকি অংশ।
পাকিস্তান বা এই মুসলিম রাষ্ট্রে গোঁড়া গোষ্ঠীর যুক্তি ছিল খ্রিষ্টান বা হিন্দুদের মতো আহমদিয়াদেরও অনৈসলামিক ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসেবে একই অধিকার দেওয়া হবে। তারা মুসলিম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে না বা নিজেদেরকে মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিতে পারবে না। ধর্মীয় দলগুলো কিছু অসাধু এবং উচ্চাভিলাষী রাজনীতিবিদদের সঙ্গে নিয়ে আহমদিয়াদের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করে। অক্সফোর্ড-শিক্ষিত পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মমতাজ দৌলতানা এই প্রচারণায় বিশেষ ভূমিকা রাখেন। খুব শিগগিরই একটি ন্যাক্কারজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাফরুল্লাহ খান আহমদিয়া সম্প্রদায়ের একজন সদস্য ছিলেন এবং তার সক্রিয়তায় ঐ সম্প্রদায় মৌলবাদী চাপে পিছু হটতে অস্বীকার করে। করাচিতে একটি আহমদি সম্মেলনের বক্তৃতায় তিনি প্রকাশ্যে তার সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেন।
মওদুদী প্রথমে বিষয়টিকে বিরক্তির সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের চাতুর্যে পরাস্ত হওয়ার আশঙ্কায় ভিন্ন পথে কলহ শুরু করেন। তাই তিনি দি আহমাদি প্রবলেম শিরোনামে একটি ভয়ংকর পাঠ্য রচনা করেন। নিষিদ্ধ হওয়ার আগের আঠারো দিনে বইটির ৫৭,০০০ কপি বিক্রি হয়েছিল। এর জ্বালা-ধরানো বার্তা গোঁড়া মুসলিমদের আবেগকে উত্তেজিত করে। ফলস্বরূপ পরবর্তী সময়ে আহমদিয়া-বিরোধী প্রচারে মওদুদী একটি কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
১৯৫৩ সালের গোড়ার দিকে, সতর্কভাবে তৈরি করা ধারাবাহিক-দাঙ্গা পাঞ্জাবকে কাঁপিয়ে তোলে। এটা আমার ধর্মীয় দাঙ্গার প্রথম স্মৃতি। লাহোরে একটি আহমদি পরিবার আমাদের পারিবারিক অ্যাপার্টমেন্টের নিচে জুতার দোকান ভাড়া করেছিল। একদিন স্কুল থেকে ফিরে দেখলাম, দোকানে অতি-হিংস্র একটি দল আক্রমণ করছে, আর পুলিশ তা নিষ্ক্রিয়ভাবে দেখছে। আমার বাবা আমাকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেন। পরদিন আমি লক্ষ করলাম দোকানের সামনের অংশটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। আক্রমণে ম্যানেজার কিছুটা আহত হয়ে পালিয়ে গেছে।
একই সপ্তাহে কেন্দ্রীয় সরকার লাহোরে সামরিক আইন ও কারফিউ জারি করে। সৈন্যরা উত্তেজিত জনতার উপর গুলি চালায়। দুদিনের মধ্যেই বিশৃঙ্খলা প্রশমিত হয়। রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে মওদুদী ও তার সহকর্মী কাউসার নিয়াজিকে গ্রেফতার করা হয়। উভয়কেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল, কিন্তু মওদুদীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও পরে তাকে কেবল কয়েক বছর কারাগারে কাটাতে হয়েছিল। মওদুদীর অপরাধ ছিল তার বই। আর কাউসার নিয়াজি একটি জনসভায় হিংসাত্মক ও অশ্লীল বক্তৃতায় জনতাকে এতটা বিক্ষুব্ধ করে যে তারা কর্তব্যরত একজন পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা করে।[১] মুসলিম লীগে নিজ ক্ষমতা বাড়াতে দাঙ্গা প্ররোচিত করার জন্য মুখ্যমন্ত্রী মুমতাজ দৌলতানাকে অভিযুক্ত করে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়, এবং তার রাজনৈতিক কর্মজীবনের অবসান ঘটে।
রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে মওদুদী ও তার সহকর্মী কাউসার নিয়াজিকে গ্রেফতার করা হয়। উভয়কেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল, কিন্তু মওদুদীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও পরে তাকে কেবল কয়েক বছর কারাগারে কাটাতে হয়েছিল।
‘আহমাদিবিরোধী বিশৃঙ্খলার কারণগুলো’ তদন্ত করার জন্য বিচারপতি মুহাম্মদ মুনিরকে সভাপতি এবং বিচারপতি এম আর কায়ানিকে সদস্য[২] নিযুক্ত করে একটি পাবলিক কোর্ট অব ইনকোয়ারি গঠন করা হয়েছিল। দেশের ইতিহাসে ১৯৫৪ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত এর ৩৮৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি দেশের ইতিহাসে একমাত্র আধুনিকতাবাদী টেক্সট বা পাঠ্য। সংরক্ষণাগারে সমাহিত করার পরিবর্তে, এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের অংশ হওয়া উচিত, বা অন্তত কোয়েটার সামরিক স্টাফ কলেজের লাইব্রেরিতে প্রকাশনাটি সুলভ করা উচিত। মুনির ও কায়ানি তাদের সুপারিশে নির্ভীক ছিলেন। তারা মোল্লাদের বিভ্রান্তিকে উপহাস করতেন এবং ইসলামি রাষ্ট্রে একটি বিপর্যয় হতে যাচ্ছে বলে দেশকে সতর্ক করেছিলেন। পাকিস্তানে এমন কিছু আর কখনো তৈরি হয়নি।
আনুষ্ঠানিকভাবে আহমদিয়াদের একটি অমুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে ঘোষণা এবং এই তৎপরতার সদস্যদের বিরুদ্ধে সরকারকে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে বেশ কয়েকজন ধর্মীয় নেতা (উলামা) উল্লিখিত বিশৃঙ্খলাগুলো তৈরি করেছিল। পাকিস্তানকে সরকারিভাবে ‘ইসলামি’ রাষ্ট্র হিসেবে চালানোর জন্য উলামাদের আহ্বান এবং আহমদিয়াদের বিরুদ্ধে তাদের দাবির কথা উল্লেখ করে উপরোক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে:
সুতরাং, একজন ব্যক্তি মুসলিম কি না, সেই মৌলিক প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বেশিরভাগ নেতৃস্থানীয় উলামাকে মুসলমানের সংজ্ঞা দিতে বলেছিলাম। তার মূল কারণ ছিল, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উলামারা নিশ্চয় কেবল বিশ্বাস থেকে আহমদিদেরকে কাফির (অবিশ্বাসী) বলে বিশ্বাস করে না, অবশ্যই মুসলিমদের একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞাও তারা জানে। যখন কেউ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে বা সম্প্রদায়কে ইসলামের অন্তর্গত নয় এমন দাবি করে, তখন কে একজন মুসলিম সে ব্যাপারে দাবিকারীর সঠিক ধারণা থাকতে হবে। তদন্তের এই অংশের ফলাফল আর যাইহোক, তাকে সন্তোষজনক বলা যাবে না। যদি এত সহজ একটি বিষয়ে আমাদের উলামায়ে কেরামের মধ্যে যথেষ্ট অনৈক্য বিরাজ করে, তাহলে আরও জটিল বিষয়ে তাদের মধ্যে মতভেদ কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। নিচে আমরা প্রত্যেক আলিমের নিজের ভাষায় প্রদত্ত মুসলমানের সংজ্ঞা পুনরুৎপাদন করছি… (পৃ. ২১৫)
প্রতিবেদনটি বিভিন্ন উলামায়ে কেরামের দেওয়া প্রশ্নের উত্তরগুলোকে আক্ষরিকভাবে পুনরুৎপাদন করে: আপনি কীভাবে একজন মুসলিমকে সংজ্ঞায়িত করবেন? এই অংশটি বিচারকদের জন্য স্পষ্টতই উপভোগ্য ছিল। তাদের উপসংহার যথাযথভাবে নির্মোহ ছিল:
উলামায়ে কেরাম প্রদত্ত বিভিন্ন সংজ্ঞাকে সামনে রেখে, আমাদের মন্তব্য হলো, এই মৌলিক প্রশ্নের ঐশী ব্যাখ্যায় কোনো দুই বিদ্বান একমত হননি। যেভাবে প্রত্যেক বিদ্বান ঐশ্বরিক সংজ্ঞা দিয়েছেন, সেভাবে আমরা যদি আমাদের নিজস্ব সংজ্ঞা দিই এবং সেই সংজ্ঞাটি যদি অন্য সবার সংজ্ঞা থেকে আলাদা হয়, তাহলে আমরা সর্বসম্মতভাবে ইসলামের সীমানা থেকে বেরিয়ে যাই। আর যে কোনো একজন আলেম প্রদত্ত সংজ্ঞা গ্রহণ করলে আমরা সেই আলিমের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী মুসলমান থাকব কিন্তু বাকিদের সংজ্ঞা অনুযায়ী কাফির হয়ে যাব। (পৃ. ২১৫)
পরবর্তী সময়ে, ধর্মত্যাগ শিরোনামে, উলামাদের মতামত অনুযায়ী একটি ইসলামি রাষ্ট্রে একজন মুসলিম কাফির হয়ে গেলে তার মৃত্যুদণ্ড হবে, সেই পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনা হয়। প্রতিবেদনটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাফরুল্লাহ খানকে উল্লেখ করে বলে:
এই মতবাদ অনুসারে, যদি চৌধুরী জাফরুল্লাহ খান তার বর্তমান ধর্মীয় বিশ্বাস উত্তরাধিকার সূত্রে না পেয়ে থাকেন তবে স্বেচ্ছায় আহমদি ধর্ম বেছে নেওয়ার জন্য তাকে অবশ্যই মৃত্যুদণ্ড পেতে হবে। এবং যদি মাওলানা আবুল হাসানাত সাইয়্যাদ মুহাম্মদ আহমদ কাদরী বা মির্জা রজা আহমদ খান বেরেলভি, অথবা অসংখ্য উলামার যে কেউ একজন যারা এক্স ডি. ই. ১৪ ফতোয়ার গাছের প্রতিটি পাতায় আসীন, তারা যদি ইসলামিক স্টেটের প্রধান হতেন তাহলে দেওবন্দি ও ওয়াহাবিদের ক্ষেত্রেও একই পরিণতি হতে হবে, যার মধ্যে পাকিস্তান গণপরিষদের সঙ্গে সংযুক্ত তাহমত-ই-ইসলামি বোর্ড-এর সদস্য মাওলানা মুহাম্মদ শফী দেওবন্দি, এবং মাওলানা দাউদ গজনভী অন্তর্ভুক্ত। আর মাওলানা মুহাম্মাদ শফী দেওবন্দি যদি রাষ্ট্রপ্রধান হতেন, তাহলে দেওবন্দিদেরকে যারা কাফের বলে ঘোষণা করেছেন তিনি তাদেরকে ইসলামের পাতা থেকে বাদ দিতেন এবং যদি তারা মুরতাদ-এর সংজ্ঞার মধ্যে আসে, অর্থাৎ যদি তারা তাদের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে এবং উত্তরাধিকার সূত্রে না আসে তাহলে তাদের মৃত্যুদণ্ড দিতেন।
তদন্তের সময়, দেওবন্দিদের ফতোয়া এক্স ডি. ই. ১৩ যা আসনা আশআরী শিয়াদের কাফির ও মুরতাদ বলে, তার যথার্থতার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। মাওলানা মুহাম্মদ শফী এই বিষয়ে একটি অনুসন্ধান করেন। তিনি দেওবন্দ প্রতিষ্ঠানের নথি থেকে দারুল উলুমের সব শিক্ষক এবং নিজের স্বাক্ষরিত একটি ফতোয়ার কপি সংগ্রহ করেন। এই ফতোয়া অনুযায়ী, যারা হজরত সিদ্দিক আকবরের সাহাহিয়াত বিশ্বাস করে না এবং যারা হজরত আয়েশা সিদ্দিকার কাজিফ এবং কোরআনের তাহরিফের অপরাধী, তারা কাফির। এই বিষয়ে গবেষণাকারী জনাব ইব্রাহিম আলী চিশতীও ফতোয়াটি সমর্থন করেছিলেন। নবীর সঙ্গে হজরত আলীর নবুয়ত ভাগে বিশ্বাসী, এই অভিযোগে তিনি শিয়াদের কাফির হিসেবে অভিযুক্ত করেন। তাকে প্রশ্ন করা হয় একজন ব্যক্তি যিনি একজন সুন্নি হয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করেন এবং শিয়া দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত হন তাহলে তিনি ধর্মত্যাগী এবং তাই মৃত্যুদণ্ডের যোগ্য হবেন কি না। তিনি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান। শিয়াদের মতে সব সুন্নিই কাফির। আবার যারা আহলে-কোরআন, তারা সূত্রের বিশ্বস্ততার অভাবে হাদিসকে বাধ্যতামূলক মনে করে না। কাজেই তারাও সর্বসম্মতভাবে কাফির। একইভাবে সব স্বাধীন চিন্তাবিদ কাফির। তাই সবকিছুর চূড়ান্ত ফলাফল দাঁড়ায়, শিয়া বা সুন্নি বা দেওবন্দি বা আহলে হাদিস বা বেরেলভি কেউই মুসলিম নয়। একটি ইসলামিক রাষ্ট্রে সরকার যে দলকে কাফের বলে মনে করে তাদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে হবে। তাই এই মতবাদের পরিণতি সহজেই অনুমেয়। ইতঃপূর্বে মুসলিমের সংজ্ঞা সম্পর্কে আমাদের সামনে কোনো দুই উলামা একমত হতে পারেননি। (পৃ. ২১৯)
তখন দেশটির নতুন জীবন। রাজনীতিবিদ, মোল্লা, সেনা কর্মকর্তা বা ঘুষের প্রভাব থেকে তখন পর্যন্ত বিচারকরা মুক্ত ছিলেন। আধুনিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতিরক্ষায় মুনির রিপোর্ট একটি সাহসী ভূমিকা রাখে। সেখানে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে ‘অবিশ্বস্ত’ বলে নিন্দা করা হয়। অযৌক্তিক হস্তক্ষেপে সহিংসতার মাধ্যমে তৈরি একটি রাজনৈতিক সংকট কেবল নতুন রাষ্ট্রের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই পাকিস্তানের রাজনীতি ও প্রতিষ্ঠানকে সাম্প্রদায়িকতামুক্ত রাখতে হবে। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছিল। তবে মওদুদীর নেতৃস্থানীয় লেফটেন্যান্ট মিয়া তোফায়েল জবাব দিয়েছিলেন: ‘আমাদের ধর্ম আমাদের রাজনীতি, আমাদের রাজনীতি আমাদের ধর্ম।’
তাহলে কে সিদ্ধান্ত নেবে? সুযোগ থাকলে পাকিস্তানের নাগরিকরা সিদ্ধান্ত নিতে পারত। মুসলিম লীগ বাদে দেশের সব রাজনৈতিক দলই অবিলম্বে সাধারণ নির্বাচনের পক্ষে ছিল। কিন্তু সংগত কারণেই সামরিক-আমলাতান্ত্রিক-মার্কিন দূতাবাসের অভিজাত অংশ এ ব্যাপারে স্নায়বিক চাপে ভুগছিল। মওদুদীর নেতৃত্বে ‘পাল্টা লীগ’ একটি ধর্মীয় উপাদান হতে যাচ্ছিল না। মুসলিম লীগ হয়তো পাঞ্জাবে জয়ী হতে পারত। তবে জাতীয়তাবাদী এবং বাম দলগুলোর একটি জোট অন্য সব জায়গায় জয়ী হওয়ার একটি ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি করেছিল।
১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে প্রথম পরীক্ষাটি সম্পন্ন হয়। পশ্চিম থেকে ১,০০০ মাইল দূরে ভারতীয় ভূখণ্ড দ্বারা বিচ্ছিন্ন দেশের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ অধ্যুষিত পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি প্রদেশ অভিজাতদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় ছিল। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব পাকিস্তানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সংখ্যালঘু হিন্দুও ছিল। বাংলা ভাগ হওয়ার পর তারা সবাই ভারতে পালিয়ে যাননি। প্রকৃতপক্ষে, জিন্নাহর নতুন রাষ্ট্রকেন্দ্রিক মূল দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তবতায় পশ্চিম দিকের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তান অনেক কাছাকাছি ছিল। তবে শাসক অভিজাতদের বেশিরভাগই পশ্চিমে বসবাসরত ছিল।
১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানের অভিজাত শাসকদের আশঙ্কা বাস্তবায়িত হয়। পূর্ব পাকিস্তান যুক্তফ্রন্টকে ভোট দেয়। আমলাতন্ত্র এবং দুর্বল রাজনৈতিক কৌশল মুসলিম লীগকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। ৩০৯টি আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ মাত্র ১০টি আসনে জয়লাভ করে। মুখ্যমন্ত্রীসহ সমস্ত প্রাদেশিক মন্ত্রী পরাজিত হয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ১০টি আসনের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টি ৪টি আসনে জয়লাভ করে। মজার ব্যাপার হলো, মুসলিম বংশোদ্ভূত সব কমিউনিস্ট প্রার্থী পরাজিত হয়। জামায়াতে ইসলামীর খুবই শক্তিশালী স্থানীয় শাখা থাকা সত্ত্বেও হিন্দু বংশোদ্ভূত কমিউনিস্টরা সিলেটের একটিসহ চারটি আসনেই জয়লাভ করেছিল। কমিউনিস্টরা অন্যান্য দলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে ২২টি আসন বিজয়সহ মোট ২৬টি আসন লাভ করে। এই সংখ্যা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাতা মুসলিম লীগের বিজিত আসনের দ্বিগুণেরও বেশি ছিল। আর জামায়াতে ইসলামী পুরোপুরি ব্যর্থ হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তান তখন একটি দ্বিপাক্ষিক সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। (পূর্ব পাকিস্তানে) প্রাদেশিক সংসদের প্রথম বিতর্কগুলোতে এই বিষয়টি গুরুত্ব লাভ করে। ১৬২ জন সদস্য প্রস্তাবিত চুক্তির নিন্দা জানিয়ে স্বাক্ষর করেন। এর দুই মাস পর, কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব পাকিস্তানের আইনসভা ভেঙে দেয় এবং প্রদেশে গভর্নর শাসন ঘোষণা করে। এক সপ্তাহ পর মার্কিন-পাকিস্তান সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তান তখন একটি দ্বিপাক্ষিক সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। (পূর্ব পাকিস্তানে) প্রাদেশিক সংসদের প্রথম বিতর্কগুলোতে এই বিষয়টি গুরুত্ব লাভ করে। ১৬২ জন সদস্য প্রস্তাবিত চুক্তির নিন্দা জানিয়ে স্বাক্ষর করেন। এর দুই মাস পর, কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব পাকিস্তানের আইনসভা ভেঙে দেয় এবং প্রদেশে গভর্নর শাসন ঘোষণা করে। এক সপ্তাহ পর মার্কিন-পাকিস্তান সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
প্রবীণ আমলা ইস্কান্দার মির্জা নতুন গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত হন। একটি ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু ইসলামপন্থিদের দমনে তিনি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। এবার দেশের একটি বৃহৎ সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রেক্ষিতে তিনি একই দমন কাজে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন। যুক্তফ্রন্টের কয়েক শতাধিক সদস্যকে গ্রেফতার করা হলো। নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী এবং একাধিক প্রাদেশিক মন্ত্রীকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ করা হলো। এবং কারখানার নিয়োগকর্তারা সমস্ত পরিচিত কমিউনিস্ট কর্মীদের বরখাস্ত করার নির্দেশ দেয়। কর্মীরা এই সিদ্ধান্ত স্বেচ্ছায় মেনে নিয়েছিল। এবং একই সময়ে এই সুযোগটি ব্যবহার করে অ-কমিউনিস্ট ট্রেড-ইউনিয়ন নেতাদেরও বরখাস্ত করা হয়।
একের পর এক অপ্রীতিকর সমঝোতার পর, ১৯৫৫ সালে, প্রাদেশিক পরিষদ পুনরুদ্ধার করা হলেও ঘটনাগুলোর ফলে নতুন রাজ্যে বেশিরভাগ বাঙালির আস্থা নড়বড়ে হয়ে যায়। একই বছর পাকিস্তানের গণপরিষদ দেশের জন্য একটি নতুন সংবিধান নিয়ে আলোচনা করছিল। তারা একজন অতি-রক্ষণশীল বাঙালি নেতারও সতর্কবার্তা শুনে তা উপেক্ষা করে:
স্যার, আমি আসলে গতকাল কাজ শুরু করেছি। পূর্ব বাংলার প্রতি, তার সংস্কৃতি, ভাষা, সাহিত্য এবং পূর্ব বাংলা সম্পর্কিত সবকিছুর প্রতি এখানকার মুসলিম লীগ গোষ্ঠীর অবমাননাকর মনোভাব নিয়ে কথা বলেছি… আসলে, স্যার, আমি আপনাকে বলছি যে পূর্ব বাংলাকে সমান অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা তো দূরের ব্যাপার, মুসলিম লীগের নেতাদের বিবেচনায় আমরা একটি পরাধীন জাতি এবং তারা বিজয়ী জাতি।
মন্তব্যটি সত্য। কিন্তু মুসলিম লীগ পশ্চিম পাকিস্তানেও বিচ্ছিন্ন হচ্ছিল। পরপর উপনির্বাচনে লীগ প্রার্থীরা পরাজিত হলেন। আমলাতন্ত্র আতঙ্কিত হতে থাকে। সিন্ধু, বেলুচিস্তান এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের ছোট প্রদেশগুলো মিলে মুসলিম লীগ বিরোধী একটি জোট তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে তারা সর্বাধিক আতঙ্কিত ছিলেন। কারণ, এই জোট বাঙালিদের সঙ্গে মিলে দেশ শাসনের কর্তৃত্ব অর্জন করতে পারে। স্থানীয়ভাবে এটি পাঞ্জাবি জমিদার, আমলা এবং একটি উদীয়মান নতুন পুঁজিবাদী উদ্যোক্তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে হুমকির মুখে ফেলেছিল। বৈশ্বিক স্তরে নির্বাচিত পাকিস্তান সরকার হয়তো সেনাবাহিনী এবং আমলাতন্ত্রের দ্বারা সমঝোতা করা ঠান্ডা-যুদ্ধের জোট থেকে সরে যেতে পারে। গণতন্ত্রের কথা একেবারে ভুলে যাওয়ার জন্য একটাই সমাধান ছিল।
সিন্ধু, বেলুচিস্তান এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের ছোট প্রদেশগুলো মিলে মুসলিম লীগ বিরোধী একটি জোট তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে তারা সর্বাধিক আতঙ্কিত ছিলেন। কারণ, এই জোট বাঙালিদের সঙ্গে মিলে দেশ শাসনের কর্তৃত্ব অর্জন করতে পারে। স্থানীয়ভাবে এটি পাঞ্জাবি জমিদার, আমলা এবং একটি উদীয়মান নতুন পুঁজিবাদী উদ্যোক্তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে হুমকির মুখে ফেলেছিল।
এরকম একটা সমঝোতা হয় যে, ১৯৫৯ সালের মার্চ মাসে গণপরিষদ দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকার প্রতিষ্ঠার কথা বলে আমলাতন্ত্র এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশে ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে। জেনারেল আইয়ুব খান দেশের প্রকৃত শাসক হন। তার বুদ্ধিবৃত্তিক ঘাটতি পাকিস্তানে অজানা ছিল না। জ্ঞানের স্বল্পতা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তার উদ্বোধনী মন্তব্য নাগরিকদের চমকে দিয়েছিল। রাজনৈতিক ভুবনে এটি একটি অনন্য উপস্থাপন ছিল:
‘আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে গণতন্ত্র একটি উত্তপ্ত আবহাওয়ায় কাজ করতে পারে না। গণতন্ত্র পেতে হলে আমাদের ব্রিটেনের মতো ঠান্ডা আবহাওয়া থাকতে হবে।’
পাঞ্জাবি কবি ওস্তাদ দামান নতুন শাসকদের নিয়ে উপহাস করেছেন:
‘এখন প্রতিটি দিনই সুন্দর ও শান্তিদায়ক /যে দিকেই তাকাও: সেনাবাহিনী।’
এই স্তবক আবৃত্তি করার অপরাধে তাকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি সামরিক উর্দি স্থায়ী হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন। দেশ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছিল।
মূলধারার মার্কিন মিডিয়া এমন কোনো সন্দেহ প্রকাশ করেনি। মার্কিনপন্থি সামরিক স্বৈরশাসকদের প্রতি বরাবরের মতো উদার দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এই মূর্খতার অন্তর্নিহিত হুমকি দেখতে ব্যর্থ হয়েছিল। আইয়ুব প্রকাশ্যে গণতন্ত্রকে বিদায় জানাচ্ছিলেন। ১৯৫৮ সালের ১২ অক্টোবর, সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় পাতা নতুন শাসন সম্পর্কে মন্তব্য করে:
পাকিস্তানে রাষ্ট্রপতি মির্জা এবং সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আইয়ুব খান উভয়ই স্পষ্টভাবে যথাসময়ে একটি উত্তম, সৎ এবং গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাব করেন। তাদের আন্তরিকতায় সন্দেহ করার কোনো কারণ নেই।
চীন ও পশ্চিমাদের সমর্থিত সামরিক একনায়কত্বের অধীন আইয়ুবের ‘নির্ধারিত কার্যধারা’ দশ বছর স্থায়ী হয়েছিল। এক দশকের দমন ও যুদ্ধ এবং একতরফা অর্থনৈতিক উন্নয়ন। তখনকার দিনে পশ্চিমা দুর্বলতম উদারপন্থিরাও বাইরের হস্তক্ষেপ সমর্থন করত না। তারা, এবং অন্য সবাই জানত যে এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকায় পশ্চিমপন্থি একনায়কত্বের কারণ ছিল খুব সহজ: পশ্চিমের উদার গণতন্ত্র অন্য সব জায়গার গণতন্ত্রে ভীত ছিল। বাইরের হস্তক্ষেপে নয় বরং তার নিজস্ব লোকদের দ্বারা পরিচালিত একটি মহাকাব্যিক সংগ্রামের মাধ্যমে অশুভ শক্তিকে অপসারণ করা হয়েছিল।
১৯৬৮ সালের ৭ নভেম্বর যে ছাত্র বিদ্রোহ শুরু হয় তা ব্যাপক দমন-পীড়ন সত্ত্বেও আরও শক্তিশালী হয়ে সমাজের বিভিন্ন অংশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকরা ১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে আন্দোলনে যোগ দেয় এবং সেই সময় পর্যন্ত আন্দোলনটি পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি বড় শহরকে অন্তর্ভুক্ত করে। শিগগিরই আইনজীবী, ডাক্তার, শিক্ষক, বিচারক এবং যৌন কর্মীরা গণতন্ত্রের দাবিতে লড়াইয়ে নামে। নিজেদের সরকার বেছে নেওয়ার অধিকার প্রয়োগ করতে বাধা দেওয়ায় তৃণমূলের জনগণ একত্রিত হয়েছিল। পুরোনো পাকিস্তানের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসে এটিই একমাত্র সময় যখন এর জনগণ একত্রিত হয়েছিল। ১৯৬৯ সালের মার্চ মাসে স্ব-নিযুক্ত ফিল্ড মার্শাল পরাজয় মেনে নিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন। বিজয়ের আনন্দে প্রতিটি শহরের রাস্তায় মানুষ নাচছিল। আমি যখন করাচি বিমানবন্দরে পৌঁছেছিলাম তখন মনে হয়েছিল উল্লাসপূর্ণ পরিবেশ যেন সেনা কর্মকর্তাদেরও প্রভাবিত করছিল।
আমি লাহোরের ফ্লাইট পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আমার মায়ের দূরবর্তী চাচাতো ভাই সেনাবাহিনীর একজন কর্নেল। দীর্ঘদিন পর ইউনিফর্ম পরিহিত সেই ভাইকে দেখে এগিয়ে গেলাম। কোয়েটায় মিলিটারি স্টাফ কলেজে কিছু সময় শেষে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জেনারেল হেডকোয়ার্টারে ফেরার পথে ছিলেন। আমাকে দেখে তিনি উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। আমি ঠাট্টা করে তাকে একটি স্যালুট দিলে তিনি হেসে উঠলেন। ছয় মাস আগে হলে তিনি হয়তো কটমট দৃষ্টিতে তাকাতেন। প্রাতঃরাশের সময় জানলাম, তিনি সবেমাত্র আইজ্যাক ডয়েচারের ট্রাইলজি, ট্রটস্কির তিন খণ্ডের জীবনী পড়া শেষ করেছেন। আমি বিস্ময় প্রকাশ করলাম। এ ছাড়া স্টাফ কলেজ লাইব্রেরি থেকে রেড আর্মি বইগুলো সংগ্রহ করে তাদের পাঠ করতে হয়েছিল। ‘একটা জিনিস আমাকে খুব ধাঁধায় ফেলেছে,’ তিনি স্বীকার করলেন। ‘গৃহযুদ্ধের সময় ট্রটস্কি ছিলেন একজন মেধাবী নেতা। তুখাচেভস্কি একজন মেধাবী সামরিক কমান্ডার ছিলেন। তুমি কি একমত?’ আমি সম্মতি জানালাম। ‘তাহলে ব্যাখ্যা কর কেন তারা স্ট্যালিনকে পরাজিত করতে রেড আর্মি ব্যবহার করেনি।’ আমার ব্যাখ্যার সঙ্গে তিনি একমত হলেন না। ‘রক্তাক্ত স্ট্যালিনের চেয়ে ট্রটস্কি এবং তুখাচেভস্কির অধীন বোনাপার্টিজম অনেক ভালো হতো। তুমি কীভাবে এত নির্বোধ হতে পার?’
আমি হাসতে শুরু করলাম। কিছুটা উন্মত্ত সেই হাসিতে তিনি বিরক্তির সঙ্গে সঙ্গে একটু উদ্বিগ্ন বোধ করছিলেন। ‘তামাশা দেখতে পাচ্ছেন না?’ আমি বললাম। ‘আপনার অধিনায়ক আমাকে এখানে ফিরতে নিষেধ করেছেন। সে চলে গেছে বলেই আমি ফিরে এসেছি। একটি সফল বিদ্রোহ আপনার বসকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছে। আর আপনি আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন কেন ট্রটস্কি ১৯২৩ সালে সামরিক একনায়কত্ব বেছে নেননি?’
কিছুটা আত্মরক্ষামূলক হলেও তিনি তার মত থেকে বিচ্যুত হননি। কয়েক বছর পরে তাকে যৌন বোনাপার্টিজমের জন্য অকালে অবসর নিতে হয়েছিল। তিনি জুনিয়র অফিসারকে একটি মিথ্যা মিশনে পাঠিয়ে তার স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন। যৌন কেলেঙ্কারি প্রকাশিত হয় এবং সেই জুনিয়র অফিসার আমার চাচাতো ভাইয়ের নাক ভেঙে দেয়। তার সামরিক কর্মজীবনের একটি অপমানজনক ইতি ঘটে। দুঃখের বিষয়। টিকে থাকলে সাত বছরের মধ্যে কেউ হয়তো কর্নিলভের বিরুদ্ধে তাকে তুখাচেভস্কির ভূমিকায় উৎসাহিত করতে পারত।
ছয় সপ্তাহব্যাপী আমি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যাপক ভ্রমণ করেছি। নারী-পুরুষ যারা সরকার পতন ঘটিয়েছেন তাদের সঙ্গে দেখা করেছি। রাজনীতিবিদদের সঙ্গে কথা বলেছি। পশ্চিম পাকিস্তানে আমি সাধারণত জনপ্রিয় কবি হাবিব জালিবের সঙ্গে থাকতাম। ওনার কবিতাগুলো আসলে বিভিন্ন শহরে আন্দোলনকে উদ্দীপিত করেছিল। আন্দোলন শুরু হওয়ার কয়েক বছর আগে, জালিব বেশ কয়েকটি মুশাইরাতে সামরিক শাসনের নিন্দা করেছিলেন[৩]:
‘এই ব্যবস্থা, ভোর বিহীন এই রাত/ আমি কখনোই গ্রহণ করব না, মানব না।’ অথবা ‘শুধু একটি স্লোগান, একটি অনুরোধ/প্রেসিডেন্ট, ইউএসএ-কে সর্বাধিক ভালোবাসবেন না।’
জালিবের মতো আর কোনো কবিকে কারাগারের ভেতরে-বাইরে এত টানাটানি করা হয়নি। তিনি আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করেন। আন্দোলনের সময় মওদুদীর সমর্থকরা সম্পূর্ণ কোণঠাসা হয়েছিল। উর্দুতে ছন্দিত তাদের স্লোগান কখনোই জনসাধারণের মনে ঠাঁই পায়নি: ‘পাকিস্তানের অর্থ কী? একমাত্র এক আল্লাহ।’ জালিব রচিত একই প্রশ্নের ছান্দিক একটি উত্তরে লক্ষাধিক মানুষ সমবেত আওয়াজ তুলেছিল: ‘পাকিস্তানের অর্থ কী? খাদ্য, বস্ত্র ও ওষুধ।’ পরবর্তী সময়ে তিনি বেশ প্রকাশ্যে মোল্লাদের ব্যঙ্গ করেন।
আন্দোলনের সময় মওদুদীর সমর্থকরা সম্পূর্ণ কোণঠাসা হয়েছিল। উর্দুতে ছন্দিত তাদের স্লোগান কখনোই জনসাধারণের মনে ঠাঁই পায়নি: ‘পাকিস্তানের অর্থ কী? একমাত্র এক আল্লাহ।’ জালিব রচিত একই প্রশ্নের ছান্দিক একটি উত্তরে লক্ষাধিক মানুষ সমবেত আওয়াজ তুলেছিল: ‘পাকিস্তানের অর্থ কী? খাদ্য, বস্ত্র ও ওষুধ।’
কিছু ব্যানারে, বিশ হাজার বা ততোধিক মানুষের সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি আমার কানে ফিসফিস করে বলতেন: ‘আজ প্রধানত শ্রমিক এবং কৃষকরা উপস্থিত হয়েছেন। ভিয়েতনাম সম্পর্কে বলুন। তাদের দেখান আমরা জিততে পারি।’ আমি তাই করতাম এবং তারপর তিনি ভিয়েতনামস বার্নিং আবৃত্তি করতেন:
‘হে মানবাধিকার প্রেমীরা, তোমরা কোথায়?/মানবতার পিঠ ঠেকে গেছে/ভিয়েতনাম জ্বলন্ত, ভিয়েতনাম জ্বলছে/ আর চুপ করে থাকবেন না, এখনই কথা বলুন/ যুদ্ধের মেঘ এই দিকে ভেসে আসছে’।
জনগণের উত্থানকালে পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলিম লীগ এবং সমস্ত ঐতিহ্যবাহী দল কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। জুলফিকার আলী ভুট্টো একমাত্র জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ ছিলেন। আইয়ুব খানের মন্ত্রিসভা থেকে পদচ্যুত ভুট্টো তখন গণ-আন্দোলনে শীর্ষস্থান অর্জন করেন। তার বক্তৃতা চরম আক্রমণাত্মক ছিল। পুঁজিবাদকে ধ্বংস করার হুমকি, ভূমি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি এবং ‘সবার জন্য খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান’ তার প্রচারণার মূল বক্তব্য হয়ে ওঠে। গণতন্ত্র এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি শক্তিশালী মিশ্রণের প্রচারণার ফলে এটা স্পষ্ট ছিল যে ভুট্টোর দল পাকিস্তানের এই অংশে সহজেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। আইয়ুবের উত্তরসূরি জেনারেল ইয়াহিয়া খান অবিলম্বে ১৯৭০-এর মার্চে সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। সারা দেশ আনন্দে মেতে ওঠে।
পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় এসে আমি একই উচ্ছ্বাস দেখতে পেলেও সেখানে একটি পার্থক্য ছিল। ছাত্র, বুদ্ধিজীবী এবং শ্রমজীবী নেতাদের সঙ্গে আমি কথা বলেছিলাম। তারা বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। জাতীয়তাবাদীরা পাকিস্তানি অভিজাতদের ওপর বিরক্ত ছিল। চীনের সঙ্গে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুবের বন্ধুত্বের কারণে মাওবাদীরা তাকে একজন ‘সাম্রাজ্যবাদবিরোধী’ হিসেবে গ্রহণ করে। এর ফলে আন্দোলনের সময় বাঙালি বামরা বিভক্ত হয়। একসময়ের শক্তিশালী বামদের বিভক্তির ফলে সৃষ্ট দুর্বলতা আওয়ামী লীগের জাতীয়তাবাদীরা সংগ্রামে আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম করে। তারা পশ্চিমের কাছ থেকে সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দাবি করে এবং ছয় দফা দাবিসহ সনদ পূরণ না হলে তারা সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার হুমকি দেয়। যেখানেই গিয়েছি, একই গল্প শুনছিলাম। বাংলার প্রতি এতটাই দুর্ব্যবহার করা হয়েছিল যে তা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে প্রস্তুত ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলার সময় তারা আমাকে ইংরেজিতে কথা বলতে বলে। কেন্দ্র পশ্চিম তাদের ওপর উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তাই তাদের জন্য উর্দু একটি ঘৃণ্য ভাষা, এবং সেই ভাষায় আমাকে কথা না বলতে চাপ প্রয়োগ করে। তাদের কয়েকজন চিৎকার করে বলল: ‘বাংলা শিখুন, প্লিজ।’ ক্যাম্পাসে, যেখানে আন্দোলন শুরু হয়েছিল সেই আমতলা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আমি তাদের বলেছিলাম, সামরিক বাহিনী তাদের ছয় দফা মেনে নেবে এমন কোনো বিভ্রম তাদের থাকা উচিত নয়। যদি তারা ছয় দফা দাবির বাস্তবায়ন চায় তবে তাদের পুরো পথে যেতে প্রস্তুত থাকতে হবে। আমার মন্তব্যে তারা হতবাক হয়ে গিয়েছিল।
আমার বক্তব্য আওয়ামী লীগের ছাত্রদের উৎসাহিত করার অভিযোগে পরে কয়েকজন বামপন্থি এসে তীব্র আপত্তি করে। পরবর্তী কয়েক দিন ধরে উত্তপ্ত আলোচনা চলতে থাকে। কয়েক দিন পর, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে যা বলেছিলাম তা তিনি ঠিকই জানতেন। ‘আপনি নিশ্চিত?’ তিনি জিজ্ঞাসা করেন। ‘আগামী নির্বাচনে আমরা জিতলে কী হবে?’ জবাবে আমি তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলাম যে তারা তো ১৯৫৪ সালেও জিতেছিল। এটা ঠিক যে পরিস্থিতি এখন ভিন্ন, কিন্তু সেনাবাহিনী কখনো ছয় দফা মেনে নেবে কি না, তা নিয়ে আমার ঘোরতর সন্দেহ ছিল। আমি মুজিবকে রক্তপাতের সম্ভাবনার পূর্বাভাস দিয়েছিলাম। তিনি আমার কথায় আস্থাবোধ করেননি। কৃষক নেতা মওলানা ভাসানীর সঙ্গে আমি এক পাক্ষিকেরও বেশি সময় ধরে গ্রামাঞ্চলে ঘুরেছিলাম। তিনিও আমার ভবিষ্যদ্বাণীতে আস্থাশীল হননি। আমার খারাপ আশঙ্কাটি বাস্তবে পরিণত হয়েছিল।
আমি মুজিবকে রক্তপাতের সম্ভাবনার পূর্বাভাস দিয়েছিলাম। তিনি আমার কথায় আস্থাবোধ করেননি। কৃষক নেতা মওলানা ভাসানীর সঙ্গে আমি এক পাক্ষিকেরও বেশি সময় ধরে গ্রামাঞ্চলে ঘুরেছিলাম। তিনিও আমার ভবিষ্যদ্বাণীতে আস্থাশীল হননি। আমার খারাপ আশঙ্কাটি বাস্তবে পরিণত হয়েছিল।
১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তানে একটি বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেন। দেশের সবচেয়ে বড় দল পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগ জনপ্রিয় ভোটের ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পেল। স্বাভাবিকভাবে শেখ মুজিব পরবর্তী সরকার গঠন করবে। কিন্তু ইয়াহিয়া খান এবং তার সহযোগী জেনারেলরা নির্বাচনের রায় মানতে অস্বীকার করেন। ভুট্টো তাদের সঙ্গে চুক্তি করে নিজের অখ্যাতি দীর্ঘস্থায়ী করার একটি সুযোগ তৈরি করলেন। তিনি মুজিবকে সমর্থন করলে গল্পটা হয়তো একটু অন্যরকম হতো। পরিবর্তে, সেনাবাহিনী তার নিজস্ব পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ আক্রমণ ও দখল করার জন্য প্রস্তুতি নিল। পরিস্থিতি চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে গেল। সেনাবাহিনীতে সৈন্যদের মধ্যে জাতিগত বিদ্বেষের বিষ প্রবেশ করানো হলো। তাদের বলা হয়েছিল যে বাঙালিরা কেবল সাম্প্রতিককালে ধর্মান্তরিত মুসলমান, এবং তাই হিন্দুত্ব তাদের রক্তে থাকার কারণেই তারা পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চেয়েছিল। কেউ বলেনি যে, আমরাই কিন্তু তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি।
কথিত হিন্দু বাঙালির বংশানুকে রূপান্তর করার জন্য পাঞ্জাবি অফিসাররা সৈন্যদের গণধর্ষণে প্ররোচিত করেছিল। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণ করে। ধর্ষণ ও গণহত্যার ঘটনা ঘটতে থাকে। এক রাতেই দখলদার সৈন্যরা জামায়াতে ইসলামীর সহযোগীদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হোস্টেলে হামলা চালায়। শত শত শিক্ষার্থী নিখোঁজ হয়। বামপন্থি বুদ্ধিজীবীদের খুঁজে বের করে হত্যা করা হয়। শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে নিয়ে আসা হয়। তার দল পাতালপুরীতে গিয়ে প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেয়। পাকিস্তানের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ লিখেছিলেন ‘eyes washed with blood’ – ‘রক্তস্নাত চোখ’।
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণ করে। ধর্ষণ ও গণহত্যার ঘটনা ঘটতে থাকে। এক রাতেই দখলদার সৈন্যরা জামায়াতে ইসলামীর সহযোগীদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হোস্টেলে হামলা চালায়। শত শত শিক্ষার্থী নিখোঁজ হয়।
দশ বছর পরে, সালমান রুশদি মিডনাইটস চিলড্রেন বইতে পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক আক্রমণের প্রথম দিনটিকে অমরত্ব দান করেন:
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ, মধ্যরাত: বিশ্ববিদ্যালয়ে গোলাবর্ষণ করা হচ্ছিল। বুদ্ধা তার পাশ দিয়ে সেনাদেরকে শেখ মুজিবের আস্তানায় নিয়ে যায়। ছাত্র ও শিক্ষকেরা দৌড়ে হোস্টেল থেকে বেরিয়ে আসেন; বুলেটের আঘাত তাদেরকে স্বাগত জানায়, এবং লনগুলো রক্তাক্ত হতে থাকে।… এবং যখন আমরা শহরের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম, শহীদ জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল এবং অবিশ্বাস্য জিনিস প্রত্যক্ষ করল। সৈন্যরা দরজা না ঠুকেই নারীদের হোস্টেলে প্রবেশ করছে; রাস্তায় টেনেহিঁচড়ে নারীদের এনে গাড়িতে তোলা হচ্ছে।… চিন্তা অত্যধিক বেদনাদায়ক হয়ে উঠলে কর্মই তখন সর্বোত্তম প্রতিকার।… কুকুর-সৈন্যরা শৃঙ্খলে টান দেয়, এবং তারপর, ছেড়ে দিয়ে লাফ দিয়ে আনন্দের সঙ্গে তাদের কাজ করতে থাকে। হে, অনাকাঙ্ক্ষিত নেকড়েদের তাড়া! হে, অধ্যাপক ও কবিদের প্রচণ্ড জব্দ! হে দুর্ভাগ্যজনক গুলি-প্রতিরোধে আওয়ামী লীগ কর্মী ও ফ্যাশন সংবাদদাতাদের গ্রেফতার! শহরে কুকুরের ডাকাডাকি।… ফারুক, শহীদ, আইয়ুবা পালাক্রমে বমি করতে থাকে। কারণ, পোড়া বস্তির দুর্গন্ধে তাদের নাকের ছিদ্র আক্রান্ত হচ্ছিল। কোনো অবাঞ্ছিত আজ রাতে নিরাপদ নয়; লুকানোর জন্য কোনো জায়গা দুর্ভেদ্য। জাতীয় ঐক্যের পলায়নকারী শত্রুদের অনুসরণ করে গোয়েন্দা; শিকারি কুকুরগুলো তাদের হিংস্র দাঁত শিকারের মধ্যে ডুবিয়ে দেয়।…
আমার বেশ কিছু বাঙালি বন্ধু নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল। সর্বত্র বিশৃঙ্খলা। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আমরা বিদেশি কয়েকজন ব্রিটেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগঠিত করেছি: আইজাজ আহমেদ, ফিরোজ আহমেদ, একবাল আহমেদ এবং আমি একসঙ্গে ছিলাম। আমি লিখেছিলাম, কথা বলেছিলাম এবং সমর্থনের জন্য আবেদন জানিয়েছিলাম। কিন্তু পশ্চিম নিশ্চুপ ছিল। নিক্সন কিসিঞ্জারকে (অথবা সম্ভবত বিপরীতভাবে) ‘পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকতে’ নির্দেশ দিয়েছিলেন। বেইজিং একই দিকে কাত। যুদ্ধের কারণে লাখ লাখ শরণার্থীকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশে অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অবশেষে, ভারতীয় সেনাবাহিনী সীমান্ত অতিক্রম করে এবং তার পাকিস্তানি প্রতিপক্ষদের পরাজিত করে। জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিচক্ষণতার পরিচয় দেন। ইতোমধ্যেই প্রচুর রক্তপাত হয়েছিল। বাঙালিরা ভারতীয় সৈন্যদের মুক্তিদাতা হিসেবে অভিবাদন জানায়। পাকিস্তান মৃত্যুবরণ করল। বাংলাদেশের জন্ম হলো।
পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আমরা বিদেশি কয়েকজন ব্রিটেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগঠিত করেছি: আইজাজ আহমেদ, ফিরোজ আহমেদ, একবাল আহমেদ এবং আমি একসঙ্গে ছিলাম।
এই একটি ঘটনা আমাকে ‘নতুন’ পাকিস্তান থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। অতীতে অভিজাতদের বিরুদ্ধে লড়াই ছিল। কিন্তু এবার জনসংখ্যার একটি বড় অংশ কুৎসিত নৈরাজ্যে আক্রান্ত হয়েছে। এটি পাঞ্জাব, একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে সিন্ধু, বেলুচ বা পশতুনের মতো ছিল না। পাঞ্জাবিদের নামে সংঘটিত অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে তাদের ব্যর্থতা তাদেরকে এই অপরাধের সহযোগী করে তোলে। কেউ কেউ নিঃসন্দেহে ভীত হয়ে অপরাধে সংযুক্ত হয়েছিল। কিন্তু যারা অতি সম্প্রতি পাহাড় সরিয়ে ফেলেছে, ভয়কে অস্বীকার করে একটি স্বৈরাচারকে পতন করেছে, তারা কীভাবে ভীতু হতে পারে? এখানে অন্য কারণ কাজ করেছে। আন্দোলনের সময় ভুট্টোকে অনুসরণ করে তাকে ভোট দিয়েছিল। তাই তারা তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারেনি। ভুট্টো অবশ্যই সঠিক হবে ধরে নিয়ে তারা নীরব রইল। তখনই আমি তাদের থেকে দূরে থাকার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। বাংলার রক্তআমাদের বিচ্ছিন্ন করেছিল।
পাকিস্তান এখনো তাদের অপরাধ স্বীকার করে বাংলাদেশের জনগণের কাছে ক্ষমা চায়নি। পাকিস্তানের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসে মিথ্যা তথ্য অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
পাকিস্তান এখনো তাদের অপরাধ স্বীকার করে বাংলাদেশের জনগণের কাছে ক্ষমা চায়নি। পাকিস্তানের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসে মিথ্যা তথ্য অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সেই ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে কীভাবে ভারত পাকিস্তানকে ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু তা মোটেই সত্য নয়। আমলাতন্ত্র দ্বারা সমর্থিত পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বাধীন সংখ্যাগরিষ্ঠ পিপলস পার্টি পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণের ঝুঁকি নিয়েছিল এবং পরাজিত হয়েছিল। তারা পাঞ্জাবি সৈন্যের ‘খাঁটি মুসলিম বীর্য’-এর মাধ্যমে ‘বিশুদ্ধ মুসলিম বংশানু’ রোপণ করতে সফল হয়নি। (চলবে)
আগের পর্ব: মৌলবাদের সংঘর্ষ: ক্রুসেড, জিহাদ এবং আধুনিকতা-১২
ফাতেমা বেগম: লেখক শিক্ষক অনুবাদক। ই-মেইল: fatemaorama@gmail.com
পাদটীকা
১। কাউসার নিয়াজি পরবর্তীকালে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ১৯৭২ সালে ভুট্টোর দলে যোগ দেন। ভুট্টো তাকে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী, এবং ইসলামপন্থিদের মোকাবিলা করার বিষয়ে উপদেষ্টা পদে নিয়োগ দেন। নিয়াজির পরামর্শেই ভুট্টো সরকার আহমদিয়াদের অমুসলিম ঘোষণা করে। ভুট্টো ভেবেছিলেন তিনি মোল্লাদের ধূর্ততার সঙ্গে পরাস্ত করতে পারবেন। কিন্তু এই ভয়ংকর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি তাদের পথ আরও প্রশস্ত করেছিলেন।
২। পাকিস্তানে প্রথম সামরিক স্বৈরশাসনের সময় এম আর কায়ানি, তখন তিনি লাহোর কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি, আইয়ুব শাসনকে সম্পূর্ণরূপে অবমূল্যায়ন করে সিরিজ বক্তৃতা দিতে শুরু করেন। কোনো অনুষ্ঠানে তিনি বক্তৃতা করলে ছাত্রদের ভিড়ে তা ঠাসা থাকত। আমি তিনবার তার বক্তৃতা শুনেছি। তার খুব নরম পশতুন কণ্ঠস্বরে কখনোই দাম্ভিকতার চিহ্ন ছিল না এবং খুব যত্ন সহকারে তিনি প্রতিটি বাক্য গঠন করতেন। ১৯৬৩ সালে তার মৃত্যুতে আমরা সবাই কেঁদেছিলাম।
৩। সর্বজনীন কবিতা পাঠে মানুষের উপস্থিতি। পাকিস্তানে যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতার মাত্রা ছিল খুবই কম, সেখানে হাজার হাজার মানুষ মাঝে মাঝে কবিদের কথা শুনতে হাজির হতো।
