তিস্তা সংকট নিরসনের জন্য কী ধরনের মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন-২
কীভাবে সৃষ্টি হলো তিস্তার সংকট
নজরুল ইসলাম
বিভিন্ন কারণে তিস্তা নদী আজ সংকটে নিপতিত। এই সংকট নিরসনের জন্য যেই মহাপরিকল্পনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা নিয়ে বিতর্ক হলো, এই মহাপরিকল্পনাটি কী ধরনের হওয়া প্রয়োজন। তিস্তা সংকট সমাধানের জন্য চীনের পাওয়ার-চায়না নামক কোম্পানি ‘তিস্তা নদী সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ (ইংরেজিতে– তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট এবং রেসটোরেশন প্রজেক্ট) নামক একটি প্রকল্প প্রণয়ন করেছে, যেটা সাধারণভাবে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ নামে পরিচিত। প্রশ্ন হলো– এই প্রকল্প কি তিস্তা সংকটের সমাধান দিতে পারবে, নাকি ভিন্ন ধরনের মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন? এই প্রশ্নের আলোচনার জন্য এই প্রবন্ধের প্রথম পর্বে নদ-নদীর প্রতি সাধারণভাবে যে দুই ধরনের পন্থা অনুসরণ করা যেতে পারে তার মধ্যে বাংলাদেশের জন্য তার কোনটি বেশি উপযোগী, তা তুলে ধরা হয়েছিল। ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিতব্য এই প্রবন্ধের দ্বিতীয় পর্বে তিস্তার সংকট কীভাবে সৃষ্টি হলো তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
২। তিস্তা নদীর সংকট
২.১ তিস্তা নদী – সংক্ষিপ্ত পরিচয়
তিস্তা নদী ভারতের সিকিম রাজ্যের প্রায় ৭,০৬৮ মিটার উচ্চতায় পাহুনরি (কিংবা কাংসে) হিমবাহ থেকে উৎপন্ন। পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন খাঁড়ির মধ্য দিয়ে এটি দক্ষিণে প্রবাহিত হয় এবং পথে বহু উপনদী এর সঙ্গে মিলিত হয়ে এর প্রবাহ বৃদ্ধি করে। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরের সেভকে তিস্তা নদী পার্বত্য এলাকা থেকে সমতলে প্রবেশ করে এবং প্রথমে দার্জিলিং ও কালিম্পং এবং তারপর জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার জেলার মধ্যে সীমান্ত হিসেবে কাজ করে। ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এই নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলার মধ্য দিয়ে চিলমারীর নিকট ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলিত হয়। তিস্তা নদীর মোট দৈর্ঘ্য ৪১৪ কিলোমিটার, যার মধ্যে ১৩৩ কিলোমিটার বাংলাদেশে অবস্থিত। তিস্তা নদীর পানি-উৎস (ক্যাচমেন্ট) এলাকার মোট আয়তন ১২,১৫৯ বর্গমাইল; এবং এর ৮৩ শতাংশ ভারতে এবং বাকি ১৭ শতাংশ বাংলাদেশে অবস্থিত। তবে তিস্তা অববাহিকার প্রায় অর্ধেক (দুই কোটি) জনগণ বাংলাদেশে বসবাস করেন।
তিস্তা নদী একটি ‘হড়কা’ (ফ্ল্যাশি) নদী, যার প্রবাহ হঠাৎ কমে ও বাড়ে। এই নদী পার্বত্য এলাকা থেকে সমতলে অবতরণ করায় হিমালয়ের পাদদেশে একটি ‘পাখাভূমি’ (ফ্যান) সৃষ্টি করেছে। হড়কা নদী হওয়ার কারণে তিস্তার গতিপথ প্রায়ই পরিবর্তিত হয়। চিত্র-২.২ দেখায় যে, আগে এই নদী দক্ষিণ মুখে প্রবাহিত হয়ে গঙ্গা নদীর সঙ্গে মিলিত হতো। কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীতে এই নদী দক্ষিণ-পূর্ব মুখে প্রবাহিত হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মেশে। কেন এই পরিবর্তন সংঘটিত হয় তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। অনেকের মতে, ১৭৮৭ সালে সংঘটিত ভূমিকম্পের ফলে ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পূর্বমুখী (মধুপুর গড়ের উত্তর-পূর্ব পার্শ্ব হয়ে মেঘনার সঙ্গে মিলিত) হওয়ার পরিবর্তে সরাসরি দক্ষিণ মুখে (বর্তমানের যমুনা নদীর দিকে) প্রবাহিত হয়। এই অভিমত অনুযায়ী, এই ভূমিকম্প তিস্তা নদীর গতিমুখও পরিবর্তিত করে। অন্য একটি অভিমত অনুযায়ী, ১৭৮৭ সালের ভূমিকম্প কিংবা অন্যান্য ভূতাত্ত্বিক কারণে প্রথমে তিস্তা নদীর গতিপথ দক্ষিণ থেকে পূর্ব অভিমুখে পরিবর্তিত হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে সংযুক্ত হয় এবং তার ফলে এই নদের প্রবাহ পূর্ব থেকে দক্ষিণমুখী হয়। যা-ই হোক-না কেন, অতীতে তিস্তা নদীর গতিপথ বহুবার পরিবর্তিত হয়েছে। সুতরাং, ভবিষ্যতেও এর পরিবর্তনের সম্ভাবনা একেবারে বাতিল করা যায় না।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী গজলডোবা বাঁধ নির্মাণের আগে ডালিয়ায় শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদীর গড় প্রবাহের পরিমাণ ছিল আনুমানিক ২৮৩ কিউমেক (১০,০০০ কিউসেক)। তবে বর্ষাকালে এই পরিমাণ ৪,৫০০ কিউমেকে (১,৫৮,৯১৮ কিউসেক) পৌঁছাতে পারে। তিস্তা নদীর পানিতে বিপুল পরিমাণ পলিবালি থাকে। অনুমান করা হয় যে, তিস্তা নদী দ্বারা বাহিত পলিবালির গড় বার্ষিক পরিমাণ ৪.৯ কোটি টন। নদীখাতের বিভিন্ন স্থানে এই পলিবালি পড়ে চরের সৃষ্টি হয় এবং তার ফলে তিস্তা ক্রমেই একটি বেনুনি নদীতে পরিণত হয়। বাংলাদেশের অন্যান্য নদীর তুলনায় তিস্তা নদীর ঢাল বেশি, আনুমানিক (১ অনুপাত ২০০০)। তিস্তার প্রশস্ততা ০.৭ কিলোমিটার থেকে ৫.৫ কিলোমিটার (গড়ে ৩ কিলোমিটার)। আমরা আগেই লক্ষ করেছি, তিস্তার বহু শাখা এবং উপনদী আছে; অর্থাৎ, তিস্তা শুধু একটি নদী নয়, এটা একটি নদী-ব্যবস্থা (সিস্টেম)।
২.২ তিস্তা নদী সংকটের কারণ: ভারত কর্তৃক তিস্তা নদীর ওপর বাণিজ্যিক পন্থার প্রয়োগ
তিস্তা নদীর বহুমুখী সংকটের মূল কারণ হলো এই নদীর ওপর বাণিজ্যিক পন্থার প্রয়োগ। এ ক্ষেত্রে প্রধান দায়ভার বর্তায় ভারতের ওপর। ইতঃপূর্বে আমরা লক্ষ্য করেছি, নদ-নদীর প্রতি বাণিজ্যিক পন্থার প্রয়োগের ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যে ভারত সর্বাপেক্ষা আগ্রাসী দেশসমূহের অন্যতম। গোটা বিশ্বের বৃহৎ বাঁধের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই ভারতে। পৃথকভাবে একেকটি নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করেই ভারত ক্ষান্ত নয়। বর্তমানে ‘আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প’ নামক এক বিশাল প্রকল্প নিয়ে ভারত অগ্রসর হচ্ছে, যার লক্ষ্য হলো ব্রহ্মপুত্র এবং অন্যান্য পূর্বাঞ্চলীয় নদ-নদী থেকে পানি ভারতের পশ্চিম ও দক্ষিণে নিয়ে যাওয়া। তিস্তা সংক্রান্ত ভারতের কার্যক্রম এই ‘আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প’র অংশে পরিণত হয়েছে।
তিস্তা নদীর বহুমুখী সংকটের মূল কারণ হলো এই নদীর ওপর বাণিজ্যিক পন্থার প্রয়োগ। এ ক্ষেত্রে প্রধান দায়ভার বর্তায় ভারতের ওপর। ইতঃপূর্বে আমরা লক্ষ্য করেছি, নদ-নদীর প্রতি বাণিজ্যিক পন্থার প্রয়োগের ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যে ভারত সর্বাপেক্ষা আগ্রাসী দেশসমূহের অন্যতম। গোটা বিশ্বের বৃহৎ বাঁধের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই ভারতে। পৃথকভাবে একেকটি নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করেই ভারত ক্ষান্ত নয়। বর্তমানে ‘আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প’ নামক এক বিশাল প্রকল্প নিয়ে ভারত অগ্রসর হচ্ছে, যার লক্ষ্য হলো ব্রহ্মপুত্র এবং অন্যান্য পূর্বাঞ্চলীয় নদ-নদী থেকে পানি ভারতের পশ্চিম ও দক্ষিণে নিয়ে যাওয়া।
১৯৮৭ সালে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে উজানে গজলডোবা নামক স্থানে ভারত তিস্তার ওপর ব্যারাজ (কপাটবাঁধ) নির্মাণ সম্পন্ন ও চালু করে। ভারত এই কপাটবাঁধ শুধু তিস্তা অববাহিকায় সেচের জন্য ব্যবহার করছে না, বরং তিস্তার পানি পূর্বদিকে জলঢাকা এবং তোরসা নদীতে এবং পশ্চিমদিকে মেচী, মহানন্দা ও গঙ্গা নদীতে স্থানান্তরিত করার লক্ষ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে (চিত্র-২.১)। লক্ষণীয়, ভারত সরকার ২.১ নম্বর চিত্রের শিরোনাম দিয়েছে ‘যোগীঝোপা-তিস্তা-ফারাক্কা সংযোগ প্রকল্প’। যোগীঝোপা হলো ব্রহ্মপুত্রের প্রধান উপনদী মনাসের সঙ্গে ব্রহ্মপুত্রের সংযোগস্থলের নাম। কাজেই স্পষ্ট যে, গজলডোবা বাঁধের মাধ্যমে ভারত প্রথমে ব্রহ্মপুত্র থেকে তিস্তা, তারপর তিস্তা থেকে মেচী-মহানন্দা, তারপর মহানন্দা থেকে গঙ্গা, এবং সবশেষে গঙ্গা থেকে ভারতের পশ্চিম ও দক্ষিণে পানি সরানোর মহাপ্রয়াসের অংশ।
চিত্র-২.১: ভারতের গজলডোবা ব্যারাজ এবং সেচ প্রকল্প |
![]() |
সূত্র: National Water Development Agency, Ministry of Water Resources, Government of India |
ভারত শুধু গজলডোবা কপাটবাঁধ নির্মাণ করেই সন্তুষ্ট নয়, বরং তিস্তার উজানে আরও প্রায় ১৬টি বাঁধ নির্মাণ করেছে, করছে, কিংবা করার পরিকল্পনা করছে (চিত্র-২.২)। বলা বাহুল্য, এসব বাঁধ নির্মিত হওয়ার পর তিস্তার সংকট আরও ঘনীভূত হবে এবং শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে তিস্তা নদীর আর কোনো পানি অবশিষ্ট থাকবে না।
চিত্র-২.২: তিস্তার উজানে ভারতের আরও বহু বাঁধ |
![]() |
সূত্র: Noolkar-Oak, Gauri (2017) |
২.৩ বাংলাদেশ কর্তৃক তিস্তা নদীর ওপর বাণিজ্যিক পন্থার প্রয়োগ
তিস্তার ওপর বাংলাদেশও বাণিজ্যিক পন্থা প্রয়োগ করে। উপরে আমরা লক্ষ করেছি, বাণিজ্যিক পন্থার দুটি রূপ আছে – আড়াআড়ি রূপ এবং পার্শ্বস্থ রূপ, যেটাকে আমরা ‘বেষ্টনী পন্থা’ বলে থাকি। ভারতের মতো অত আগ্রাসীরূপে না হলেও বাংলাদেশও তিস্তার প্রতি আড়াআড়ি ও পার্শ্বস্থ–উভয় ধরনের বাণিজ্যিক পন্থা অনুসরণ করে।
তিস্তার ওপর বাংলাদেশের আড়াআড়ি হস্তক্ষেপের প্রতিভূ হলো ডালিয়ায় নির্মিত তিস্তা ব্যারাজ। ১৯৫০-এর দশকে তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার সেচ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তিস্তা নদীর ওপর একটি ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং ভারত সরকারকে সে বিষয়ে অবহিত করে। সে অনুযায়ী ১৯৬০ সালে বিদেশি পরামর্শক সংস্থা প্রাক-সম্ভাব্যতা-সমীক্ষা সম্পাদন করে।
২.৩.১ তিস্তার ওপর বাংলাদেশের ডালিয়া ব্যারাজ
তিস্তার ওপর বাংলাদেশের আড়াআড়ি হস্তক্ষেপের প্রতিভূ হলো ডালিয়ায় নির্মিত তিস্তা ব্যারাজ। ১৯৫০-এর দশকে তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার সেচ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তিস্তা নদীর ওপর একটি ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং ভারত সরকারকে সে বিষয়ে অবহিত করে। সে অনুযায়ী ১৯৬০ সালে বিদেশি পরামর্শক সংস্থা প্রাক-সম্ভাব্যতা-সমীক্ষা সম্পাদন করে। পরবর্তী সময়ে, ১৯৬৮-৭০ সালে, আরেক বিদেশি পরামর্শক সংস্থা আরেকটি প্রতিবেদন প্রণয়ন করে এবং তাতে ভারতের সীমান্ত থেকে ১৫ কিলোমিটার অভ্যন্তরে ডিমলা উপজেলার ডালিয়া নামক স্থানে এই ব্যারাজ নির্মাণের প্রস্তাব করে। তবে কাজ তেমন এগোয় না। পরবর্তী সময়ে ভারত গজলডোবা বাঁধের প্রকল্প নিয়ে অগ্রসর হলে বাংলাদেশের ডালিয়া ব্যারাজ প্রকল্পের কাজ ত্বরান্বিত হয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর প্রকৌশলীদের সহযোগিতায় এই ব্যারাজের নকশা চূড়ান্ত হয় এবং তা অনুযায়ী ১৯৯০ সালের আগস্ট মাসে (ভারতের গজলডোবা ব্যারাজ চালু হওয়ার দুই বছর পর) নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। এই ব্যারাজের আকৃতি ছিল অত্যন্ত বৃহৎ। প্রতিটি ১২.১৯ মিটার প্রশস্ততাসম্পন্ন মোট ৪৪টি কপাটসহ এই ব্যারাজের মোট দৈর্ঘ্য ৬১৫ মিটার; এবং এর প্রবাহ নির্গমনের মোট ক্ষমতা ১২,৭৫২ কিউমেক (৪৫০,১৪৬ কিউসেক), যা এই নদীর এযাবৎ পরিদৃষ্ট সর্বোচ্চ প্রবাহের চেয়ে বহুগুণ বেশি। ব্যারাজের উজান থেকে পানি সেচের উদ্দেশ্যে প্রবাহিত করার জন্য নির্মিত খালের মুখে প্রতিটি ১২.১৯ মিটার প্রশস্ততাসম্পন্ন ৮টি কপাটসহ মোট ১১০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি নিয়ন্ত্রক (রেগুলেটর) স্থাপিত হয়েছে, যার সর্বোচ্চ প্রবাহ নির্গমন ক্ষমতা ২৮৩ কিউমেক (৯,৯৯০ কিউসেক)। খালের মুখে পলিবালি আটকানোর জন্য ৪৫ হেক্টর (১১১ একর) আয়তনের একটি পলিবালি ‘ফাঁদ’ (ট্র্যাপ) নির্মিত হয়েছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত প্রবাহ নির্গমনের জন্য ৬১০ মিটার দীর্ঘ একটি ‘বন্যা পার্শ্বপথ’ (ফ্লাড বাইপাস) এবং নদীর পানি খালের দিকে প্রবাহিত করার জন্য ২,৪৭০ মিটার দীর্ঘ একটি ‘বদ্ধ বাঁধ’ (ক্লোজার ড্যাম) নির্মিত হয় (চিত্র-২.৩)।
চিত্র-২.৩: বাংলাদেশের ডালিয়াস্থ তিস্তা প্রকল্পের ব্যারাজ এবং খালের মুখের নিয়ন্ত্রক |
![]() |
সূত্র: বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড |
তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী এর ‘অধীনস্থ এলাকা’ (কমান্ড এরিয়া)-র মোট আয়তন ৭৪৯,০০০ হেক্টর, যার মধ্যে ৫৪০,০০০ হেক্টর সেচযোগ্য। বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর এবং বগুড়া জেলা জুড়ে এই এলাকা বিস্তৃত। এই প্রকল্প এলাকার উত্তরে তিস্তা নদী; পশ্চিমে আত্রাই নদী; দক্ষিণে শান্তাহার-বগুড়া রেলপথ; এবং পূর্বে বগুড়া-কাউনিয়া রেলপথ। সেচের পাশাপাশি এই প্রকল্পের আরও লক্ষ্য ছিল বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং নিষ্কাশন। দুটি পর্যায়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়ার কথা ছিল (চিত্র-২.৪)। অপেক্ষাকৃত ছোট আকারসম্পন্ন প্রথম পর্যায়ে মোট অধীনস্থ এলাকার আয়তন ১৮২,০০০ হেক্টর, যার মধ্যে ১১১,৪০৬ হেক্টর সেচ (বিশেষত খরিফ মৌসুমে সম্পূরক সেচ)-এর আওতায় আসার কথা। এই সেচের উদ্দেশ্যে ৩০৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের প্রথম পর্যায়ের খাল; ১,৪৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দ্বিতীয় পর্যায়ের খাল; ২,৭৩৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের তৃতীয় (টারশিয়রি) পর্যায়ের খাল; এবং ৮,০০০টি বিতরণ মুখ (আউটলেট) নির্মিত হয়। এই বিস্তীর্ণ খাল-ব্যবস্থাকে নিম্নরূপ নামসম্পন্ন তিনটি ভাগে বিভক্ত করা হয়: ‘তিস্তা খাল ব্যবস্থা’, ‘দিনাজপুর খাল ব্যবস্থা’ এবং ‘রংপুর খাল ব্যবস্থা’। ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে এর প্রথম পর্যায়ের কাজ শুরু হয় এবং ১৯৯০ সালের আগস্ট মাসে তা সম্পূর্ণ হয়। একই সময়ে ব্যারাজ নির্মাণের কাজও সম্পন্ন হয়। ১৯৯৩ সালে এই ব্যারাজ এবং খাল ব্যবস্থা ব্যবহার করে সেচ দেওয়া শুরু হয়।
চিত্র-২.৪: বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্পের দুই পর্যায় |
![]() |
সূত্র: পানি উন্নয়ন বোর্ড |
তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (একনেক)-এর ২০০৪ সালের জানুয়ারির বৈঠকে অনুমোদিত হয়। এই পর্যায়ের অধীনস্থ এলাকার আয়তন ৬২৩,৬৯০ হেক্টর, যার মধ্যে ৪৪৮,৭৭৪ হেক্টরে সেচ সুবিধা প্রদান করা হবে। এই দ্বিতীয় পর্যায়কে আবার তিনটি ইউনিটে বিভক্ত করা হয় এবং তা ২০০৩-২০০৭, ২০০৭-২০১০ এবং ২০১১-২০১৩ সময়কালে নির্মিত হওয়ার কথা ছিল। এই পর্যায়ে মোট ১,৬২৮ কিলোমিটার সেচ-খাল, ৬১০ কিলোমিটার নিষ্কাশন-খাল এবং ৯,৯০৭টি বিভিন্ন ধরনের পানি-কাঠামো (হাইড্রোলিক স্ট্রাকচার) নির্মিত হওয়ার কথা ছিল, যার মধ্যে ২,০২৫টি সেচের জন্য, ১০৫টি নিষ্কাশনের জন্য, ১,৪০৫টি সেতু ও কালভার্ট এবং ৬,৩৭২টি টার্ন-ওভার। এ ছাড়া ১০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণও প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এই সকল ভৌত কাঠামো নির্মাণের জন্য মোট ৫,৪০০ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করার পরিকল্পনা করা হয়।
শেষ পর্যন্ত তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের সেচ পরিধি শুধু অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র প্রথম পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকে। তবে সেখানে ইতঃপূর্বে বিরাজমান খাল, নালা, ছড়া ইত্যাদির পরিবর্তে নতুন করে সেচ-খাল নেটওয়ার্ক নির্মাণের ফলে এই এলাকায় বর্ষাকালের পানি ধারণের সক্ষমতা বিপুলভাবে হ্রাস পায়। চিত্র-২.৫ দেখায় যে, নতুন চ্যানেলসমূহের মোট দৈর্ঘ্য পুরাতন চ্যানেলসমূহের মোট দৈর্ঘ্যের চেয়ে ১.২ গুণ বেশি হলেও, পুরাতন চ্যানেলসমূহের গড় প্রস্থ নতুন চ্যানেলসমূহের গড় প্রস্থের চেয়ে প্রায় ২.৬ গুণ বেশি। অর্থাৎ, আয়তনের বিচারে পুরাতন চ্যানেলসমূহের তুলনায় নতুন চ্যানেলসমূহের পানিধারণ ক্ষমতা অর্ধেকেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে। এ বিষয়টির প্রতি পরে আমরা ফিরে আসব।
চিত্র-২.৫: তিস্তা অববাহিকার পুরাতন খাল-নালা-ছড়ার সঙ্গে নতুন খননকৃত খালের তুলনা |
![]() |
সূত্র: খালেকুজ্জমান (২০২৩) |
তথ্য
১) ১২টি উপজেলায় মোট সেচ এলাকা = ৩,৩০৭ বর্গকিলোমিটার
২) সেচ খালের মোট দৈর্ঘ্য = ৬৪৯ কিলোমিটার
৩) পরিত্যক্ত চ্যানেলের মোট দৈর্ঘ্য = ৫৩২ কিলোমিটার
৪) পরিত্যক্ত চ্যানেলের ঘনত্ব = ০.১৬ কিলোমিটার/বর্গকিলোমিটার
৫) বাংলাদেশে চ্যানেলের ঘনত্ব = ০.১২ কিলোমিটার/বর্গকিলোমিটার
দ্রষ্টব্য: http://www.bwdb.gov.bd/index.php?option=com_content
&view=article&id=132&Itemid=119
২.৩.২ তিস্তার ওপর বাংলাদেশের কর্তৃক বেষ্টনী পন্থার প্রয়োগ
তিস্তার ওপর বাংলাদেশ বেষ্টনী পন্থাও প্রয়োগ করে। প্রথম দফায় এটি সংঘটিত হয় ব্রহ্মপুত্র ডান তীর প্রকল্পের অংশ হিসেবে। সুবিদিত, ষাটের দশকে দক্ষিণের সিরাজগঞ্জ থেকে উত্তরের বেলকা পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র (যমুনা) নদীর ডান তীর ধরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মিত হয়। তবে এই বাঁধ বেলকাতেই শেষ হয় না। বেলকা থেকে এই বাঁধ তিস্তার ডান তীর ধরে কাউনিয়া পর্যন্ত অগ্রসর হয়। ফলে কাউনিয়া থেকে ভাটিতে চিলমারী পর্যন্ত তিস্তার ৩৯ কিলোমিটার অংশ ডান পাড়ের প্লাবনভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই সঙ্গে তিস্তার এই অংশ ডানপার্শ্বস্থ শাখা নদীসমূহ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় দফায় ডালিয়া ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেও তিস্তার তীরে বাঁধ নির্মিত হয়। সে সময় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীতীরবর্তী বাঁধ এবং ১০ কিলোমিটারব্যাপী তীররক্ষা স্থাপনা নির্মিত হয়। লক্ষণীয়, ডালিয়া থেকে ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত তিস্তার দৈর্ঘ্য ১০৪ কিলোমিটার। সুতরাং, বলা যেতে পারে যে, তিস্তার পুরো ডান তীর ধরেই বেড়িবাঁধ নির্মিত হয়।
তিস্তার ওপর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে উপর্যুক্ত বাণিজ্যিক পন্থা প্রয়োগের একাধিক নেতিবাচক ফলশ্রুতি ঘটে। প্রথমত, শুষ্ক মৌসুমে গজলডোবা বাঁধ কর্তৃক অপসারণের পরও যেটুকু তিস্তার পানি বাংলাদেশে প্রবেশ করে তার বড় অংশ ডালিয়া ব্যারাজ দ্বারা সেচের জন্য অপসারিত হয়। ফলে ডালিয়ার ভাটিতে তিস্তার প্রবাহ আরও হ্রাস পায়। দ্বিতীয়ত, উপরে আমরা লক্ষ করেছি যে, বাংলাদেশের তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের ফলে তিস্তার শাখা-প্রশাখাসমূহ বেষ্টনী দ্বারা পরিবেষ্টিত হয় এবং মূল তিস্তা নদী থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তৃতীয়ত, তিস্তার অববাহিকায় যেসব খাল, ছড়া ইত্যাদি ছিল সেগুলোর আয়তন প্রায় অর্ধেক হ্রাস পায়। ফলে প্লাবনভূমির পানি ধারণ ক্ষমতা হ্রাস পায়। চতুর্থত, তিস্তার তীরবর্তী বাঁধ নির্মাণের ফলে তিস্তা নদীখাত এবং তিস্তার প্লাবনভূমি উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২.৪ তিস্তা নদীর সংকটের স্বরূপ
ভারত কর্তৃক তিস্তার পানি অপসারণ এবং তিস্তা প্রবাহের ওপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তিস্তার ওপর বাণিজ্যিক পন্থা প্রয়োগের ফলে তিস্তা বর্তমানে বহুমুখী সংকটে নিপতিত। এই সংকটের মূল তিনটি দিক চিহ্নিত করা যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ হ্রাস (চিত্র-২.৬)। এর ফলে বাংলাদেশে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদী এখন প্রায় সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়। যে কোনো নদীর জন্য একটি ‘ন্যূনতম বাস্তুরক্ষাকারী প্রবাহে’র প্রয়োজন, এবং প্রবাহ তার নিচে চলে গেলে নদীর এবং নদী-নির্ভর জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর স্থায়ী ক্ষতি হয়। বর্তমানে তিস্তায় শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ হ্রাসের মূল কারণ হলো উজানে ভারত কর্তৃক তিস্তার পানি অপসারণ।
ভারত কর্তৃক তিস্তার পানি অপসারণ এবং তিস্তা প্রবাহের ওপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তিস্তার ওপর বাণিজ্যিক পন্থা প্রয়োগের ফলে তিস্তা বর্তমানে বহুমুখী সংকটে নিপতিত। এই সংকটের মূল তিনটি দিক চিহ্নিত করা যায়।
চিত্র-২.৬: শুষ্ক মৌসুমে তিস্তাপ্রবাহ হ্রাস |
![]() |
সূত্র: Mukherjee and Saha (2013) এবং Fakrul and Higano (2013) |
তিস্তা সংকটের দ্বিতীয় দিক হলো বর্ষাকালের বন্যা এবং তার সঙ্গে যোগ হয়েছে হড়কা বন্যার সংখ্যা ও প্রকোপের বৃদ্ধি। ভারত তিস্তার শুষ্ক মৌসুমের পানি অপসারণ করলেও স্বীয় ব্যারাজসমূহের কপাট খুলে দেওয়ার মাধ্যমে বর্ষাকালের উচ্চ প্রবাহ বাংলাদেশের দিকে ছেড়ে দেয় (চিত্র-২.৭ ক, খ); ফলে বর্ষাকালে বাংলাদেশে বন্যা দেখা দেয়। এর সঙ্গে আরও যোগ হয়েছে হড়কা বন্যা। এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদ-নদীর প্রবাহের ঋতুভেদ আরও বাড়ছে। তার সঙ্গে যোগ হয় ভারতের ব্যারাজসমূহের পানি-সংরক্ষণাগার থেকে ছেড়ে দেওয়া পানি। ফলে হড়কা বন্যার আপতন সংখ্যা (ফ্রিকোয়েন্সি), পরিধি এবং তীব্রতা বাড়ছে।
চিত্র-২.৭(ক): বিভিন্ন বছরে ডালিয়া স্টেশনে তিস্তা নদীর সর্বোচ্চ প্রবাহ |
![]() |
চিত্র-২.৭(খ): বিভিন্ন বছরে ডালিয়া স্টেশনে তিস্তা নদীর সর্বনিম্ন প্রবাহ |
![]() |
সূত্র: Mondal and Islam (2017) |
তিস্তা নদীর সংকটের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পাড়ভাঙন এবং নদীর গাঠনিক চরিত্রের অবাঞ্ছিত পরিবর্তন ও বিকৃতি। যেহেতু শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি থাকে না, সেহেতু নদীতে বেশি চর পড়ে এবং নদীর (পানি) ধারণক্ষমতা হ্রাস পায়। তদুপরি শুষ্ক মৌসুমে নদীর তলদেশ শুকিয়ে কঠিন হয়ে যায় এবং তলদেশ ক্ষয়ের মাধ্যমে বর্ষাকালের প্রবাহ ধারণক্ষমতাও হ্রাস পায়। নদী বরং পাড় ভেঙে আরও প্রশস্ত হওয়ার মাধ্যমে প্রবাহ ধারণে সচেষ্ট হয়। ফলে একদিকে নদী অগভীর হয় এবং অন্যদিকে নদীর প্রশস্ততা বৃদ্ধি পায়। পাড়ভাঙন এখন তিস্তাপাড়ের জনগণের মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে (চিত্র-২.৮(ক), ২.৮(খ)।
চিত্র-২.৮(ক): কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুরে তিস্তার ভাঙন |
![]() |
সূত্র: The Business Standard, জুলাই ৩, ২০২৩ |
চিত্র-২.৮(খ): লালমনিরহাটে তিস্তার ভাঙন |
![]() |
সূত্র: The Daily Star, জুন ২৮, ২০২২ |
(চলবে)
ড. নজরুল ইসলাম: অধ্যাপক, এশীয় প্রবৃদ্ধি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং জাতিসংঘের উন্নয়ন গবেষণার সাবেক প্রধান। ইমেইল: nislam13@yahoo.com.










