বাংলাদেশের ৫০ বছর ও তারপর-১০
স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন থেকে ৯০ এর গণঅভ্যুত্থান
আনু মুহাম্মদ
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শেষ প্রান্তে ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানের হানাদার সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এরপর ৫৪ বছর অতিক্রম করছে এই দেশ। এই সময়ে দুইজন রাষ্ট্রপতি খুন হয়েছেন, দুই দফা প্রত্যক্ষভাবে সামরিক শাসন এসেছে, সামরিক বাহিনীর ভূমিকা বেড়েছে, সংবিধান সংশোধন হয়েছে ১৬ বার, নির্বাচনের নানা রূপ দেখা গেছে, শাসনব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে কর্তৃত্ববাদী হয়েছে। ১৯৯০ ও ২০২৪ গণঅভ্যুত্থানে দুবার স্বৈরশাসকের পতন হয়েছে। এই কয়েক দশকে অর্থনীতির আয়তন ক্রমে বেড়েছে, জিডিপি ও বিশ্ববাণিজ্যে উল্লম্ফন ঘটেছে, অবকাঠামো ছাড়াও সমাজে আয় ও পেশার ধরনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন এসেছে। সম্পদের কেন্দ্রীভবন ও বৈষম্যও বেড়েছে, কতিপয় গোষ্ঠীর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কর্তৃত্বে আটকে গেছে দেশ। এই ধারাবাহিক লেখায় আমি ডায়েরী, সাংগঠনিক ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সাথে সাথে ইতিহাসের নানা নথি/ঘটনা পর্যালোচনা করে এই দেশের রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতির গতিমুখ তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি। ব্যক্তিগত বিষয় সেটুকু এনেছি যেটুকু তৎকালীন পরিস্থিতি বোঝার জন্য প্রাসঙ্গিক। দশম পর্বে এরশাদ আমলে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন থেকে ৯০ এর গণঅভ্যুত্থান সময়ের চিত্র ও সেসময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে।
১৯৮৭ সালে এরশাদের পদত্যাগ ও সাধারণ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন ঘনীভূত হতে থাকলে ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নিবাচিত সংসদে বিরোধী দলসমূহ নভেম্বর মাসে একযোগে সংসদ থেকে পদত্যাগ করে। এরপর ৬ ডিসেম্বর এরশাদ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন। পরের বছর, ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ নতুন সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা হয়। আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ প্রধান বিরোধী দলসমূহ এ নির্বাচন বয়কট করে। ফলে তা এক প্রহসনে পরিণত হয়। নির্বাচন কমিশনের ফলাফল অনুযায়ী এতে এরশাদের জাতীয় পার্টি ২৫১টি আসন পেয়ে বিজয়ী এবং আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন সরকার অনুগত সম্মিলিত বিরোধী দল ১৯টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় স্থান লাভ করে। বাকি আসনের ৩টি জাসদ (সিরাজ), ২টি (ফ্রিডম পার্টি) এবং ২৫টি স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পান বলে দেখানো হয়।
আগেই আলোচনা করেছি যে, এরশাদ শাসনামলের পুরো সময় স্বৈরশাসন বিরোধী গণআন্দোলন ক্রমেই ছড়িয়েছে এবং তীব্রতাও ক্রমাগত বেড়েছে। এ আন্দোলনে রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ডাক্তার, আইনজীবী, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, সাংবাদিক, বেতার- টিভি শিল্পী, লেখক শিল্পী সংস্কৃতি কর্মী, নারী, কৃষক-মজুর, শ্রমিক-কর্মচারী প্রভৃতি শ্রেণি- পেশার জনগণ শামিল হয়েছেন। গড়ে ওঠেছে রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে এরশাদবিরোধী বিভিন্ন জোট। গড়ে উঠেছে শ্রেণী ও পেশাজীবীদের আন্দোলনের নতুন নতুন সংগঠন বা মঞ্চ। পাহাড়ে যে লড়াই তার মধ্যেও এই আন্দোলন নতুন ভাষা দেয়। গড়ে উঠে পাহাড়ী গণ পরিষদ। যারা বাঙালীদের সাথে যোগাযোগ বাড়িয়ে সম্মিলিত লড়াইএ যুক্ত হতে চেষ্টা করে।
আন্দোলনে ছিল ১৯৮৩ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত ১৫-দলীয় জোট (যা ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে বিভক্ত হয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ৮ দল ও ৫ বামদল গঠিত হয়), পাশাপাশি ছিল বিএনপির নেতৃত্বে ৭- দলীয় জোট। এর বাইরে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ (১৯৮৩), আন্দোলনের শেষের দিকে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য পরে ২২টি ছাত্রসংগঠন (যার মধ্যে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ অন্তর্ভুক্ত হয়), শ্রমিক- কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ), আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ, ১৭টি কৃষক সংগঠন বিশেষ ভূমিকা পালন করে। সাংস্কৃতিক জগতেও নতুন নতুন কাঠামো তৈরি হতে থাকে। উপর্যুপরি আন্দোলন ও কর্মসূচি ঘোষণার ফলে এরশাদ বারবার পিছু হটতে বাধ্য হন। বিভিন্ন নির্বাচনের তারিখ একাধিকবার ঘোষণা এবং পরে তা বন্ধ বা পরিবর্তন, একাধিকবার জরুরি অবস্থা ঘোষণা ও প্রত্যাহার, বিভিন্ন সরকারি নীতি বা পদক্ষেপ ঘোষণার পর তা প্রত্যাহার করে নিতে দেখা যায়। তার চাতুরীও কম ছিল না।
১৯৮৮ ও ১৯৮৯ সালের বিবিধ চিত্র
১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮
গত মাস ছিল ঘটনাবহুল। ২৪ জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থান দিবসে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ ও ১৫ দল আয়োজিত সমাবেশের উপর পুলিশ ও বিডিআরের হামলা গুলিবর্ষণে কমপক্ষে ২৪ জন মারা গেছেন। শেখ হাসিনাও ছিলেন সেখানে। সারাদেশে এর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছে। বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক সমাবেশে এরকম রাষ্ট্রীয় হামলা আগে কখনো হয়নি। এই হত্যাকান্ড সবাইকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে। সমাবেশ হরতাল আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ সবই হয়েছে। আমরা জাবিতে শিক্ষক সমিতির নির্বাচন স্থগিত করে প্রতিবাদ সভা করেছি। অবশ্য তিন জোটের লিয়াঁজো কমিটি শোক দিবস মৌন মিছিল শহীদ মিনারে শোক সমাবেশ করে সবকিছু ঠান্ডা করে ফেলেছে।
গত মাসেই আমাদের উপাচার্য় আফম কামালউদ্দীন মারা গেছেন। মারা গেছেন শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস, অমলেন্দু বিশ্বাস ও রাজনীতিবিদ শান্তি সেন।
২ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮
বড় ক্ষতি হয়ে গেল। কিছুক্ষণ আগেই খবরটা শুনলাম। কবিতা পরিষদের মঞ্চে বসে এরশাদ স্বৈরাচার নিয়ে ছবি আঁকা মোটামুটি শেষ করবার পরেই মৃত্যুবরণ করেছেন শিল্পী কামরুল হাসান।
৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮
ট্রটস্কির মাই লাইফ পড়া শেষ করলাম। অক্টোবর বিপ্লব ও গৃহযুদ্ধে তাঁর অসাধারণ ভূমিকা, স্ট্যালিনের সঙ্গে তাঁর বিরোধ এবং স্ত্রীপুত্র সহ চরম দুর্ভোগের মধ্যেও তাঁর অব্যাহত রাজনৈতিক কাজের অসাধারণ বিবরণ। তাঁর লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এতে কুৎসা নেই। এবং বিভিন্ন তথ্যসূত্র দিয়েই লেখা। রাজনৈতিক অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গীতে ভ্রান্তি থাকতে পারে কিন্তু তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন ধ্বংসের জন্য ফ্যাসিবাদীদের চর হিসেবে কাজ করেছেন স্ট্যালিনের এই অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য নয়। আসলে বিষয়গুলো কখনোই একতরফা এবং সরলীকৃত ভাবে দেখা ঠিক নয়।
৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮
সারাদিন গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা। আগামীকাল হরতাল।
৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮
কথা বলা ও চিন্তার এই ধরন আমার পছন্দ না। আন্দোলন সম্পর্কে কথা বলার সময় মনে হয় যেন বাইরে থেকে কথা বলছেন। প্রয়োজন নিজেদের অবস্থান নিয়ে স্পষ্ট ও সক্রিয় থাকা। কর্মী ও মানুষের সামনে নতুন পথ পরিষ্কার করা।
জাবিতে সাংস্কৃতিক জোটের আহবায়কের দায়িত্ব নিতে হলো।
১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮
হরতাল। আমাদের সভা।
১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮
লেখক শিবির জাবি শাখা একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায় বইটা নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। প্রাক্তন বামপন্থী এক সিনিয়র শিক্ষক নেতাকে আলোচনায় আসার আমন্ত্রণ জানালে তিনি বললেন, ‘ভিসি নির্বাচনে আমাদের প্রার্থী নিশ্চিত করতে গেলে এতে অংশ নেয়া ঠিক হবে না।’ উঁচু পদে অনেক ঘাতক দালাল আছে এই জন্য। দেশে এখন ক্ষমতার অংশীদার হতে ঘাতক ও দালালদের তুষ্ট করতে হয়!
ফেব্রুয়ারি বইমেলায় স্টল নিয়ে অংশগ্রহণ। এবারের মেলাতেই প্রকাশিত হলো আমার বাংলাদেশে উন্নয়ন সংকট এবং এনজিও মডেল। কোনো বড় প্রকাশনী নয়, ফিরোজ ভাই আগ্রহ করে নিলেন, এই বই দিয়ে তিনি তাঁর প্রকাশনার যাত্রা শুরু করলেন।

ছবি: বাংলাদেশে উন্নয়ন সংকট এবং এনজিও মডেল পুস্তকের প্রচ্ছদ
২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮
সৈয়দ শফিউল্লাহ-র নেতৃত্বে একটা বিজ্ঞান গবেষণা দল যাচ্ছিল বঙ্গোপসাগরে। আমাকে আমন্ত্রণ জানালে সানন্দে রাজি হলাম। ২৪ তারিখ সকালের ট্রেনে চট্টগ্রাম, বিকালে শহরে সভা। পরদিন সকালে নেভীর ছোট জাহাজ সংকেত-এ আমাদের যাত্রা শুরু। প্রথম থেকেই আবহাওয়া খুব খারাপ ছিল। সমুদ্রের অবস্থা বেশ খারাপ হবে সেটা নেভীর লোকজনই বলছিলেন। প্রথম দিকে খুবই ভাল লাগছিল সমুদ্র যাত্রা। কিন্তু সেটা সইল না। এক পর্যায়ে ছোট্ট জাহাজ এত উঠানামা করতে থাকলো যে অসুস্থ হয়ে গেলাম। অবস্থা খারাপ দেখে শফিউল্লাহ স্যার নিজেই হাতে পায়ে মালিশ করতে থাকলেন। এসওএস পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হলো। পরদিন দুপুরে জাহাজ চাঁদপুর পৌঁছালে আমি নেমে গেলাম। সেখান থেকে ব্রাহ্মনবাড়িয়া কবি জয়দুলসহ সবার সাথে কথা বার্তা হলো।
জাহাজে থাকাকালে নেভীর লোকজনই বলছিলেন কীভাবে রওশন এরশাদ, কাজী জাফর, মওদুদসহ চাঁইরা চোরাচালানীর সাথে যুক্ত। তাদের কেস ধরা পড়লে চাকরি যাওয়ার ঘটনাও শুনলাম। সম্প্রতি ২৫ কোটি টাকার চোরাচালানীর সঙ্গে এরশাদ সরাসরি যুক্ত থাকার কথাও শুনলাম। এক অফিসারের ভাষায়, ‘আমরা যাদের ধরি তারা বেতনভুক কর্মচারী, দিনমজুর মাত্র।’ ভারত থেকে নীলগিরি উদয়গিরি নামে যে দুটি ফ্রিগেট এসেছিল সেটাও নাকি আনানো। মনোযোগ অন্য দিকে নেয়ার জন্য।
৩ মার্চ ১৯৮৮
নির্বাচন! ১% লোকও ভোট দেয় নাই। কিন্তু ফলাফল বেরিয়ে গেল। সবাই জানে-শিশুরাও হাসে। চরম ঘৃণা এবং প্রত্যাখ্যান- তারপরও এরশাদ সরকার টিকে আছে। রাজনীতির দেওলিয়াত্ব কোন পর্যায়ে গেছে!
১২ মার্চ ১৯৮৮
পরশু পাবনা গেছি। কাল কৃষক ফেডারেশনের সভা ছিল। সভা সকালে শুরু হয়ে গভীর রাত পর্যন্ত। জানালা দরজা ছাড়া ঘরে, শীতের কাপড় ছাড়া শুয়েছিলাম- নড়ার উপায় ছিল না জায়গার অভাবে।..
২৪ মার্চ ১৯৮৮
‘শ্রমিকদের অর্থনৈতিক ও আইনগত অধিকার’ এর উপর কয়দিন ধরে লিখলাম।
৭ এপ্রিল ১৯৮৮
বিশ্ববিদ্যালয় ডাইনিং বয়-সিকবয়দের ধর্মঘট শুরু হয়েছে। তাদের দাবি একটাই, খুবই প্রাথমিক এবং সাধারণ, ১০/১৫ বছর চাকুরি করলেও স্থায়ীকরণ হয় না, দাবি-স্থায়ীকরণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের অধিকাংশ এদের দাবির বিপক্ষে-স্থায়ী করলে এরা কাজ করবে না, পয়সা নাই ইত্যাদি!
১২ এপ্রিল ১৯৮৮
সকাল দুপুরে ক্যাম্পাসে অনেক ভাংচুর করেছে ছাত্ররা। হঠাৎ করে সাইনে ডাই বা অনির্দিষ্টকাল বন্ধ ঘোষণা করায় সাংঘাতিক প্রতিক্রিয়া হয়েছে। বিভিন্ন বাসায় হামলা করেছে ছাত্ররা। প্রশাসন ও কিছু শিক্ষকের দীর্ঘ অথর্ব ও অসঙ্গত ভূমিকার প্রতিফলন।
ভোটার ছাড়া গঠিত সংসদে রাষ্ট্রধর্ম সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। টিএসসিতে রাষ্ট্রধর্ম করার বিরুদ্ধে সমাবেশ।
২ মে ১৯৮৮
২৯ তারিখ থেকে সিলেট এবং সুনামগঞ্জে বিভিন্ন সভা করে আজ ফিরলাম। যেদিন ট্রেণে গেলাম তার আগের এক সপ্তাহ ধরে একটানা বৃষ্টিতে এই অঞ্চলে অকাল বন্যা শুরু হয়েছে। সেদিন থেকে বৃষ্টি বন্ধ হওয়ায় আগে ঠিক করা কর্মসূচী করা গেল। সুনামগঞ্জে হলো সম্মেলন। সিলেটে সেমিনার- ‘রাষ্ট্রীয় ধর্ম ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি’।
জামাতী সংগঠন যে কীরকম ফ্যাসিস্ট হিসেবে দাঁড়াচ্ছে এবং এর কর্মীরা যে কীরকম খুনী ও যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে তার পরিচয় আবারও পেলাম।
২২ জুন ১৯৮৮
‘লিঙ্গ ধর্ম রাষ্ট্র’ নিয়ে সেমিনার ছিল পরশু। রেহনুমার প্রবন্ধ, আমি আলোচনা করেছি। ইনকিলাব পত্রিকা এই সেমিনার ধরে ব্যাপক অপপ্রচার চালাচ্ছে। প্রতিদিন আমাদের বিরুদ্ধে বিবৃতি ছাপছে।
২৬ জুন ১৯৮৮
গত ২৩ তারিখ রাজশাহী। হাসান আজিজুল হকের সাথে দীর্ঘ আলোচনা। তারপর রংপুর। ওখানে সম্মেলন। শাখাটা ভেঙে যেতে যেতেও আবার দাঁড়িয়েছে।
১১ জুলাই ১৯৮৮
গত প্রায় ২৫ দিন কঠিন পরিশ্রম গেল। একদিকে টাকা পয়সা, চাঁদা ইত্যাদির জন্য দৌড়াদৌড়ি, অন্যদিকে পোস্টার, লিফলেট, সংকলন কার্ড আমন্ত্রণ অনুষ্ঠান মঞ্চ শিল্পী এসব কিছু।… এত পরিশ্রম একটানা বৃষ্টির জন্য অনেক ক্ষতি হলো। প্রায় ১৪ টা শাখা থেকে কেউ আসতে পারেনি। সম্মেলনের আগে এক সপ্তাহ একটানা বৃষ্টি-পোস্টার লাগানো, যোগাযোগে অনেক সমস্যা হয়েছে। কজনের ভরসায় কাজ এগিয়ে নিতে পেরেছি, তারা হলেন অধ্যাপক আসহাবউদ্দীন আহমদ, আবদুল মতিন খান এবং কাইয়ুম।
ঢাকায় হলের বাস্তব অভাব। ক্রীড়া সমিতি মিলনায়তনে হলো। এত বাধা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত ভালই হয়েছে। কার্টুন, ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার দিয়ে ভালো সাজানো হয়েছিল সাম্মলন স্থল। শেষ অধিবেশনে কিছু জটিলতা ছাড়া ভালো হয়েছে। সাংগঠনিক আলোচনা অনেক প্রাণবন্ত হয়েছে। হাসান ভাইএর এবারে সভাপতি হওয়াটা খুবই ভালো হলো।
সম্মেলন শেষে ফিরলাম। এখন শুরু হবে ভর্তি পরীক্ষার কাজ।
৩ আগস্ট ১৯৮৮
বিশ্ববিদ্যালয় খুললো। এমএসসি, তৃতীয় বর্ষ ও দ্বিতীয় বর্ষে তিনটা কোর্স পড়াচ্ছি। প্রথম দুটো শেষ করতে হবে শীঘ্রই। দীর্ঘ বন্ধের জন্য ঝুলে আছে। ছাত্রছাত্রীদের কী ভোগান্তি! বিভাগের বেশিরভাগ শিক্ষক ক্লাশ শিক্ষাদানকে কোনোভাবেই গুরুত্ব দেন না।
১৮ আগস্ট ১৯৮৮
‘স্ট্যালিন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন’ বিষয়ে সেমিনার হলো। আমার মূল বক্তব্য। আরও আলোচনা করলেন বদরুদ্দীন উমর, হায়দর আকবর খান রনো, মাহবুবুল হক এবং শরদিন্দু দস্তিদার।
সোভিয়েত পেরেস্ত্রয়কা ও গ্লাসনস্ত নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা হচ্ছে। ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত সোভিয়েত বিরোধী চক্রান্ত পড়ছি।
৩০ আগস্ট ১৯৮৮
এসব খবর এরকম হঠাৎ করেই আসে। এরকমই যেন হবার কথা ছিল। সম্পূর্ণ নি:সঙ্গ অবস্থায় একাকীত্বের মধ্যে মাহমুদ স্যার (ডক্টর আবু মাহমুদ) মারা গেছেন। গতকাল। আমার জীবনে মাহমুদ স্যার একটা উজ্জ্বল সময় জুড়ে ছিলেন, যে কজনকে সত্যি শিক্ষকের মত ভাবি তিনি তার অন্যতম। এমন বিশাল ব্যক্তিত্ব, আপোষহীন মানুষ এরকম যন্ত্রণা আর কষ্টের মধ্যেই জীবনের দায়দায়িত্ব শেষ করলেন। অনেক স্মৃতি মাথায় ভীড় করে আসছে। অসুস্থ অবস্থায় আমি যখন হাসপাতালে ছিলাম তখন তিনি একটি বই নিয়ে গিয়েছিলেন, পড়তে দিয়েছিলেন। বইটা এখনও আমার কাছেই আছে। এটাই তাঁর স্মৃতি। আর স্মৃতি তাঁর শিক্ষা। অসাধারণ বাগ্মীতা। আক্ষেপ এটাই, তাঁর শেষ সময়ে একবারও তাঁর সাথে দেখা হলো না। যতবার ভেবেছি যাবো, যাওয়া হয়নি। এই আক্ষেপ আমাকে এখনও যন্ত্রণা দিচ্ছে।
যেসব পন্ডিত তাঁর চাঁছাছোলা কথা সহ্য করতে না পেরে তাঁকে একঘরে করেছিল তাদের ক্ষুদ্রত্ব এখন দাঁত বের করে আছে। ক্ষুদ্রদের চাপে অনেক সময় বিশালও থেঁতলে যায়!!
৩১ আগস্ট ১৯৮৮
এই সময়ে আকস্মিক বন্যা। সারা দেশ প্লাবিত। ৭৪ ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এরকম আর কখনো ঘটেনি। জাহাঙ্গীরনগরের বিভিন্ন রাস্তায় এখন পানি। পানি এখনও বাড়ছেই। শুনছি কিছুদিন আগের ভূমিকম্পের প্রতিক্রিয়া এটা।
২ সেপ্টেম্বর ১৯৮৮
পানি বাড়ছেই।
সকালে শিক্ষক সমিতি, অফিসার সমিতি, কর্মচারী ইউনিয়ন এবং সকল ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিদের সভা হলো। আমিও ছিলাম। সম্মিলিত ত্রাণ কমিটি গঠিত হলো। অঞ্চল ভাগ করা হলো তিনটি। একটি অঞ্চলের দায়িত্ব পড়লো আমার উপর। বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে বন্যাদুর্গত লোকজনের সংখ্যা বাড়ছে। ক্যাম্পাসে গরু, ভেড়া, ছাগলে ভর্তি। পথেঘাটে লোকজন। স্বচ্ছল, দরিদ্র সবই। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি ভবন তাদের জন্য ছেড়ে দেয়া হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে দিয়ে এখন নৌকা চলছে!
৫ সেপ্টেম্বর ১৯৮৮
টিভিতে একটানা ভাবে ‘আল্লাহর গজব’ দূর করা, ‘পরীক্ষা করা’ শেষ করে ‘গুনাহ মাপ’ করে বন্যা থেকে মুক্তির জন্য দোয়া, কুরআন পাঠ, মিলাদ হচ্ছে। নিয়মিত সব প্রোগ্রাম বন্ধ।
কিন্তু বন্যার কারণ, এর দায়দায়িত্ব নিয়ে কোনো আলোচনা নাই। এগুলো হলে তো দেশি বিদেশি ক্ষমতাবানদের বিপদ!
৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮৮
নৌপথে ঢাকা গেলাম, যেতে তিন ঘন্টা। সাভার থেকে নৌকায় উঠে কলেজ গেট, মিরপুর সড়কের উপরে নামতে হয়। অবিশ্বাস্য! ঢাকা শহরের প্রধান রাস্তায় এখন যন্ত্রচালিত নৌকা চলছে। ঢাকা শহরের তিন চতুর্থাংশ এখন বন্যা কবলিত। শুকনা জায়গায় ত্রাণ সংগ্রহের ব্যস্ততা। জোটের সভা, প্রস্তৃতি বিশেষ বুলেটিনের কাজ একটানা শেষ করে ফিরতি যাত্রা বেলা সাড়ে ৪টায়।
১২ সেপ্টেম্বর ১৯৮৮
গত কয়দিন ত্রাণ কাজ চলেছে। গতকাল ঢাকায় প্রস্তুতি বুলেটিন সহ ঢাকা এবং আশেপাশে ত্রাণ তৎপরতা চলছে। ঢাকায় এমন কোনো সংগঠন নেই যারা চুপ করে বসে আছে। প্রত্যেকেই সাধ্যমত কাজ করছে। পাড়ার মাস্তান ছেলেরাও। তবে এর মধ্যেও সরকারি রিলিফ চুরি হচ্ছে। টিভিতে শুধু এরশাদ, মন্ত্রী আর বাহিনীত্রয়ের খবর।
হাসান ভাই ঢাকায়। কাঁচপুর ব্রিজ পর্যন্ত গেলাম। সেখানে কয়েক হাজার পরিবার। হাসান ভাই, ইলিয়াস ভাই, উমর ভাই এবং আমি। স্বামীবাগের পর থেকে পানি। যাত্রাবাড়ীর পর রাস্তা একদম ধ্বসে গেছে।
জাহাঙ্গীরনগরে বন্যা বিশেষ বুলেটিন প্রস্তুতি ৫০০ কপি বিক্রি হয়েছে।
১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৮৮
আজ সকালে ঢাকায়। প্রতিবার নৌকায় উঠার সময় অনিশ্চয়তায় থাকি, শেষ পর্যন্ত যেতে পারবো কিনা। ক্ষমতার চাইতে বেশি লোক উঠায়। ট্রাফিক পুলিশকে প্রতিদিন প্রতিটি নৌকা ১০০ টাকা দেয়। বিনিময়ে অবাধ লাইসেন্স। বেশ কয়টি নৌকাডুবি হয়েছে। ক্যাম্পাসের খুব কমজনই এর মধ্যে ঢাকা গেছেন। আমাকে যেতে হয়েছে সাংগঠনিক ও ত্রাণ কাজের জন্য।
২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৮৮
কয়দিন আগে ক্যাম্পাস থেকে সড়কপথে রওনা হয়েছিলাম। গাড়ী চলছে না। মামুন ভাই ও বাপ্পীসহ পরীক্ষামূলকভাবেই গেলাম। কয়েক ধাপে রিকশা নিয়ে বলিয়ারপুর পর্যন্ত। আশ্রয় যে কতরকম হতে পারে তার চেহারা দেখলাম। ট্রাকের নীচে উপরে, বাসের ভেতর, ভাঙা জীপের ভেতর, ব্রীজ রাস্তা সর্বত্র ছাউনি দিয়ে পরিবার। অনেক স্বচ্ছল পরিবারও গরু, ছাগল, ফসল নিয়ে উঠেছে। পথে অনেকের সাথে আলাপও হলো। সরকারি ত্রাণ কার্যক্রমের উপর কোনো আস্থা নাই। শহরের বাইরে কোনো রিলিফ যাচ্ছে না।
এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার ক্লাশ শুরু হয়েছে, যোগাযোগ স্বাভাবিক।
১৪ অক্টোবর ১৯৮৮
বাজিতপুরে আমাদের কর্মীদের উপর পুলিশী সন্ত্রাস চলছে।
…সংগঠনের বিকাশের সম্ভাবনা আটকে দিচ্ছে অর্থনৈতিক সমস্যা। সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল কর্মীরা অর্থনৈতিক সংকটে যেভাবে কাজ করছেন এভাবে কতদিন সম্ভব? মাহবুবের বাসে চড়ার পয়সা নাই, নবী এক কাপ চা খেতে পারে না, লালা দিনের পর দিন হোটেলে রুটি ডাল খাচ্ছে, বকুলদা দিন দিন অসুস্থ হচ্ছেন, পয়সার অভাবে ফিরোজ ভাই মাইলের পর মাইল হাঁটছেন, মজিবর ভাই কাশেম ভাই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, কাইয়ুম চাকরিতে ঢুকছে না পয়সাও নাই। এদের প্রত্যেকেরই স্বচ্ছলভাবে জীবন যাপনের সুযোগ আছে। কিন্তু সংগঠন বিপ্লবের খাতিরে তারা কোনো পেশা নিচ্ছেন না। আবার সংগঠন থেকে তাদের ন্যূনতম খরচও দেয়া যাচ্ছে না। এই অবস্থায় কদ্দিন একজন কর্মী সুস্থ থাকতে পারেন, কাজ করতে পারেন?
২৩ অক্টোবর ১৯৮৮
১৯ তারিখ অসুস্থ অবস্থাতেই যেতে হলো খুলনায়। তারমধ্যে সারাদিন ঝড়বৃষ্টি, দুতিন দফা ভিজেছিও। প্রথমে মিজানুর রহিম এবং আজমলের সঙ্গে বৈঠক। সাংগঠনিক কিছু জটিলতা নিয়ে। পরদিন সকালে গেলাম শ্রমিক অঞ্চলে। সভা চলতে চলতেই জানলাম তাদের অফিসে হামলা হয়েছে। পরে রওনা হলাম মোংলা। নুতন শাখা। আলোচনা সভার পরে গণসঙ্গীতের সময় জানলাম এখানকার গণসঙ্গীত দলের কেউ গান লেখেন কেউ কবিতা, কেউ সুর দেন। পরদিন সকালে খুলনার দৌলতপুর গেলাম। এখানেও নতুন শাখা, হাই ভাই সংগঠিত করছেন। আলোচনা সাংগঠনিক কমিটি। বিকালে খুলনা শহর শাখার আলোচনা সভা।
রাতেই খবর পেলাম খুলনা অঞ্চলের কৃষক ফেডারেশন নেতা সুভাষ সাহা গ্রেপ্তার হয়েছেন। পরদিন সকালে মিকশিমিল এলাকায় এক গ্রন্থাগারের আলোচনা সভায় গেলাম। ওখান থেকে সুভাষ সাহার বাড়িতে, তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে। কমবয়সী, কিন্তু দৃঢ়চিত্ত শান্ত সাহসী তরুণী। খুব ভালো লাগলো। সুভাষদার মুক্তির দাবিতে মিছিল, সমাবেশ, পোস্টারসহ বিভিন্ন কর্মসূচী নেয়া হলো। বিকালে খুলনায় জোটের সভা ও মিছিল।
২৭ নভেম্বর ১৯৮৮
সকালে অশোক মিত্রের সেমিনারে গেলাম। সন্ধ্যায় তাঁর সঙ্গে ঘরোয়া আলোচনা। আমার নানা প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন- ‘একটি দেশের একটি অংশে বিচ্ছিন্নভাবে ক্ষমতায় যাওয়া আদতে ঠিক হয়েছে কিনা সেটাই এখন ভাবি’। বললেন পার্টিতে অধপতনের কথা, বললেন কেন্দ্র কীভাবে নানারকম ঝামেলা করে কর্মসূচি বাস্তবায়ন ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। জ্যোতিবসু বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বলেছিলেন-তোমাদের উৎখাত করতে পারছি না। কিন্তু এখানে যা মুনাফা করো তা এখানে আমাদের মত মতো পুনর্বিনিয়োগ করতে হবে। পারা যায় নি। এখানে বাঙালী পুঁজিপতি নেই-ই। বহুজাতিক কোম্পানি ১০%, বাকি সবই মারোয়াড়ি।
অশোক মিত্র সোভিয়েত পেরেস্ত্রয়কায় সন্তুষ্ট নন। এক ধরনের হতাশা এবং দিকনির্দেশহীনতায় ভুগছেন তিনি।
এদিকে আমার কয়েক দিন ধরে পরীক্ষার খাতা দেখা চলছে।
১৪ ডিসেম্বর ১৯৮৮
১২, ১৩ ও ১৪ই ডিসেম্বর শিক্ষা বিষয়ক সেমিনার হলো। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল ও মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন দিক থেকে খুবই সমৃদ্ধ আলোচনা হলো। লিখিত প্রবন্ধ আর আলোচনা। প্রবন্ধ পাঠ ও আলোচনায় অংশ নিলেন যথাক্রমে শহিদুল ইসলাম, মনিরুল ইসলাম, আলী আনোয়ার, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আনু মুহাম্মদ, আবদুল মতিন খান, হাসান আজিজুল হক, বদরুদ্দীন উমর এবং অধ্যাপক আসহাবউদ্দীন আহমদ। প্রবন্ধ ও আলোচনা নিয়ে বই প্রকাশের পরিকল্পনা আছে। কিন্তু ব্যবস্থাপনা ও উপস্থিতি বেশ খারাপ ছিল, পত্রিকাগুলোও অসহযোগিতা করলো।
আজ সকালে বুদ্ধিজীবী স্মৃতি সৌধে।
২৩ জানুয়ারি ১৯৮৯
বছরের শুরুতেই হাতিয়া ও নিঝুম দ্বীপ সফর হলো। ইলিয়াস ভাইসহ সাতদিনের কর্মসূচি। ইলিয়াস ভাইএর সঙ্গে সফর যেমন আনন্দদায়ক তেমনি কাজের। তার ওপর নতুন প্রান্ত হাতিয়া যাওয়া! আমরা গুলিস্তানের ওপার থেকে মাইজদীর উদ্দেশ্যে একটা মিনিবাসের মতো বাহনে উঠলাম, যেখানে ঠিকমতো বসা যায় না, কোমর পা সবই ঝামেলায় থাকে। আমার যতটা তার চাইতে বেশি সমস্যা হলো ইলিয়াস ভাইএর। কিন্তু যথারীতি তাঁর ভাবসাব দেখে সমস্যা বোঝার উপায় ছিল না। তিনি সারাপথ নানা মানুষের সঙ্গে এমন গল্প হাসি ঠাট্টা দিয়ে পার করলেন যে মনে হলো আমরা খুবই আরামে আর আনন্দে আছি। মাইজদী পৌঁছাতে বেশ রাত, সেদিন আর হাতিয়া যাবার উপায় নেই, থাকতে হবে শহরেই। হোটেলে থাকলাম। পরদিন সকালে উঠে হাতিয়ার উদ্দেশ্যে আরও অতিশয় দুর্বল ভাঙাচোরা বাসে উঠে গেলাম সোনাপুর ঘাট। সেখান থেকে আরেক বাহনে উঠলাম পানিপথ অতিক্রম করতে, তার নাম সি ট্রাক। ছোট্ট বাহন, মাত্র কজন মানুষ আর গরু ছাগলেই ভরে গেলো। গাদাগাদির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন, দুলতে দুলতে, ধাক্কা খেতে খেতে আমরা পারি দিলাম সমুদ্রের এক কোণা। হাতিয়ায় পৌঁছানোর পর ঘাটেই দুদিনের সফরের ক্লান্তি চলে গেল শিক্ষক সাংস্কৃতিক সংগঠক ইরাক সাহেব আর তাঁর দলবলের আন্তরিক অভ্যর্থনায়।
এরপর যে কয়দিন হাতিয়ায় ছিলাম ইরাক সাহেবের তত্ত্বাবধানেই ছিলাম। তাঁর বাড়ী হয়ে দাঁড়িয়েছিলো আমাদের প্রিয় ঠিকানা। শুধু ইরাক নন, তাঁর জীবনসঙ্গী কোহিনূর, তাঁদের পাঁচ ছেলে মেয়ে তারিক, ইলা, শীলা, দিশা …সবাই সামাজিক সাংস্কৃতিক নানা তৎপরতায় সক্রিয়। ওদের বাড়ী তখন হাতিয়ার সাংস্কৃতিক বুদ্ধিবৃত্তিক অন্যতম কেন্দ্র। দেখলাম শুনলাম যে, বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে নাটক রিহার্সাল থেকে শুরু করে গান, কবিতা আবৃত্তি, বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা, পাঠচক্র, ওয়ার্কশপ সবকিছুতেই ইরাক সাহেবদের পুরো পরিবার জড়িত থাকে। আমাদের দেশে জনপন্থী নানা কাজে যারা যুক্ত থাকেন তাঁদের অনেকের জন্য একটা বড় সংকট হলো পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, নিজে অনেক বড় কাজ করছেন কিন্তু পরিবারের কোনো সদস্যের তার সাথে যোগ নেই। ইরাক সাহেব কোহিনূর বেগম এবং তারিক, ইলা, শীলা, দিশাসহ সবাইকে নিয়ে এই সংকট তুড়ি মেরে উড়িয়ে এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। হাতিয়ায় কয়দিন যাদের সঙ্গে কথা বলে, অনুষ্ঠান করে, আড্ডা দিয়ে, বেড়িয়ে খুবই ভালো সময় কেটেছিল তাঁরা সবাই ইরাক সাহেবের সাথেই ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতেন। তিরমিজীর নাম মনে পড়ছে, নাম সবার মনে নাই কিন্তু উজ্জ্বল স্মৃতি আছে। দাহারও ইরাক পরিবারসহ এদের পেয়েই এতদূরে গিয়েও প্রাণ ফিরে পেয়েছিলো, শুধু তাই নয় নতুন উদ্দীপনায় সবাইকে নিয়ে অনেক নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করতে সক্ষমও হয়েছিল।
ইলিয়াস ভাইএর মানুষ প্রকৃতি ঘরবাড়ী হাসি ঠাট্টা জীবন যাপন ঝগড়াঝাটি প্রবাদ গল্প জ্বীন ভূত সবকিছু নিয়েই আগ্রহ। আমরা তাই হাতিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে গেলাম, লেখক শিল্পীসহ বহু মানুষের সাথে কথা হলো। কথা হলো জেলে মাঝিদের সাথে, কথা হলো চরে যাদের থাকতে দিয়ে প্রভাবশালী লোকজন ক্রমে তা দখল করে তাদের সঙ্গেও। শেষের এই দুই সম্প্রদায়ের মানুষই এই অঞ্চলে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচাইতে নাজুক অবস্থায়। একজন জেলে যার পদবী জলদাস, বসে ছিলেন সমুদ্র তীরে, ছেলে মাছ ধরতে গেছে কবে আসবে জানা নাই। কেমন আছেন জিজ্ঞাসা করতে বললেন, ‘ওপরে ভগবান আর নীচে কালাম সাব যেমন রাখছে..’!
মনে আছে বাজারের ভেতর বিভিন্নজনের সাথে কথা বলতে বলতে আমি ইলিযাস ভাইসহ আরও কয়েকজন হাঁটছিলাম। সেসময় বাজারের এক দোকানে রেডিওতে খবর হচ্ছিলো, তখনই একটা ভয়ংকর দু:সংবাদ শুনে আমরা স্তব্ধ হয়ে গেলাম- আমাদের আপনজন চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবীর এক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। হাতিয়ার স্মৃতির সাথে এই খবরও অবিচ্ছেদ্য হয়ে গেছে।
হাতিয়ার পাশেই নিঝুম দ্বীপ নামে পরিচিত বাংলাদেশের শেষ প্রান্তের এক নতুন জেগে উঠা দ্বীপ। যতদূর জানি এই দ্বীপে ঢাকা থেকে প্রথম এসেছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলবিদ এম আই চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল। তাঁরা দ্বীপ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছিলেন, দ্বীপের অবস্থা দেখে তাঁরাই এই নামকরণ করেছিলেন। হাতিয়া থেকে নৌকায় বেশ কিছুক্ষণ যেতে হয় নিঝুম দ্বীপের আরেক প্রান্তে পৌঁছতে। সমুদ্রের কারণে জোয়ার ভাটায় এই অঞ্চলের নৌচলাচল নিয়ন্ত্রিত হয়। নিঝুম দ্বীপে যেতে তাই সকালে ঘাটে গিয়েও জোয়ারের অপেক্ষায় বেশ কয়েক ঘন্টা বসে থাকলাম। মানুষজন দোকানপাট নাই। যার নৌকায় আমাদের যাবার কথা তিনিই সবকিছু বুঝিয়ে বললেন, ভরসা দিলেন। সেই মাঝির নৌকায় রান্না হলো। আমরা মহানন্দে নদীর পারে বসে মাঝির রান্না করা খাবার খেলাম। কয়েক ঘন্টা অপেক্ষার পর জোয়ার এলো। আমাদেরও যাত্রা শুরু হলো বাংলাদেশের শেষ প্রান্তে জেগে উঠা মাটির দিকে। আমরা হেঁটে বেড়ালাম নতুন এই দ্বীপে, মানুষ আছে, ওষুধ ডাক্তার স্কুল কিছু নাই। ওখান থেকে সামনে বিশাল সমুদ্র, ভাটা হলে আরও জমির নিশানা পাওয়া যায়। শুনলাম ৭০ এর জলোচ্ছ্বাসের সময় এক নারী লম্বা এক গাছের অনেক উপরে উঠে বেঁচে গিয়েছিলেন। বাকি আর কেউ বাঁচেনি। জলোচ্ছ্বাসের পানি যেখানে যেখানে গেছে পুড়ে গেছে সব। সেই নারী এখন বৃদ্ধা। দেখা করতে চাইলাম কিন্তু পাওয়া গেল না।
২৫.২.১৯৮৯
ফেব্রুয়ারি বইমেলায় এবারেও আমাদের ‘সংস্কৃতি প্রকাশনী’ স্টল বেশ ভালো অবস্থায় ছিল। নিয়মিতই বসতাম, প্রতিদিনই বহুজনের সাথে দেখা সাক্ষাৎ কথাবার্তা হতো। ২০ তারিখ সারারাতই ছিলাম। লেখক শিবির থেকে ‘প্রতিরোধ ও চেতনার ফেব্রুয়ারি’ শিরোনামে নানা কর্মসূচি হলো। ২১ এর পর তিনদিনের আলোচনা সভা হলো। এর মধ্যে বের্টল ব্রেখট, আইনস্টাইন ও ডারউইন নিয়েও আলোচনা ছিল। ডারউইন নিয়ে আলোচনা করাও এখন ঝুঁকির ব্যাপার। সেজন্যই আরও করতে হলো।
২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৯
সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণভাবে জাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ জিতলো।
২১ মার্চ ১৯৮৯
কৃষক সম্মেলন শেষ করে গতকালই ফিরলাম। গিয়েছিলাম ১৫ তারিখ সন্ধ্যার লঞ্চে। ঢাকা থেকে ৩০/৩৫ জনের দলে আরও ছিলেন উর্মি রহমান, গোলাম মোস্তফা, হুমায়ূন ফরীদি। বরিশালে ঢাকার লঞ্চ থেকে নেমে সেখান থেকেই ছোট লঞ্চে যাত্রা। খালের মত সরু নদীতে কয়েক ঘন্টার পথ, অসম্ভব সুন্দর যাত্রা। তবে সম্মেলন স্থান প্রত্যন্ত এলাকায় হবার ফলে এখানে আসা যাওয়া ধরে কমপক্ষে ৫ দিন সময় লাগে। সেজন্য গরীব কৃষক বা ক্ষেতমজুরদের পক্ষে এতদিন কাজ বাদ দিয়ে আসা খুব কঠিন ছিল। বিভিন্ন এলাকা থেকে তাই খুবই কম প্রতিনিধি এসেছেন। ১৬ থেকে ১৮ সম্মেলন, এর পর বরিশালে জোটের সমাবেশ। মাহফুজ জ্যোতির ক্যাডেট কলেজ বাসা হয়ে ফিরলাম।
এদিকে আজ সালমান রুশদীর বই কেন্দ্র করে ধর্মবাদী গোষ্ঠীগুলো সফল হরতাল করলো।
১ এপ্রিল ১৯৮৯
বিভাগে সেমিনার। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অধ্যয়ন, অনুসন্ধান, বিশ্লেষণ, লেখালেখির আগ্রহ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে আমি ওদের নিয়েই একটি কেন্দ্র গঠন করেছি। তার থেকেই এটা হলো। ছাত্র থাকাকালেও এরকম একটি কেন্দ্র করেছিলাম। আমার ছাত্রত্ব শেষ হবার পর সেটা আর টেকেনি। এখন বেশ কয়জন ছাত্রছাত্রী আগ্রহী আছে।
৮ এপ্রিল ১৯৮৯
রোজা শুরু হলো। এই মাস এলে বার্ষিক নিয়মেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়- এই বৃদ্ধি আর কমে না। এই মাসে দেড় লক্ষ হোটেল রেস্তোঁরা শ্রমিকদের জীবন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পতিত হয়- বেতন সুবিধা তো বটেই চাকুরিই অনিশ্চিত হয়ে যায়। এই মাসে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী, শিশু, অসুস্থ নারী পুরুষ, গর্ভবতী নারী, ভিন্ন মতাবলম্বী সবাইকে অনেকরকম সমস্যায় পড়তে হয়। নারীর উপর ঘরে বাইরে চাপ বেড়ে যায়।
১৬ এপ্রিল ১৯৮৯
এরশাদের রাজকবির সংখ্যা এবছর আরও কজন বাড়লো।
বিভাগে ভর্তি কমিটির কাজ শুরু হলো।
তেভাগা আন্দোলন নিয়ে এড্রিয়ান কুপারের পিএইচডি থিসিস। অনুবাদ শুরু করেছি।
২২ এপ্রিল ১৯৮৯
এই সমাজ প্রতিদিন কত নারকীয় ঘটনার জন্ম দেয়্। মার্কেট করার জন্য না জানিয়ে বস্তি ভাঙা। বুলডোজারের নীচে চাপা পড়ে এক শিশু মারা গেল।
স্কপের ২৪ তারিখের ধর্মঘটের সমর্থনে জোট থেকে মশাল মিছিল।
৩০ এপ্রিল ১৯৮৯
চট্টগ্রামে, মহানগর ট্রেণে। আমি হেলালী ভাইএর বাসায়, চট্টগ্রাম শাখার সম্পাদক। চাপা স্বল্পভাষী মানুষ কিন্তু সংগঠনের কাজকে খুব গুরুত্ব দেন।
সন্ধ্যাতেই অধ্যাপক আসহাবউদ্দীন সাহেবের বাসায়। অসাধারণ মানুষ, এই বয়সেও, প্রায় ৭৫, প্রচুর কাজ করেন। লেখেন, সংগঠনের জন্য ছোটাছুটি করেন। দারিদ্রের মধ্যে আছেন, কিন্তু কোনো অভিযোগ নাই। নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি কেন আরও কাজ করতে পারছেন না! শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গীর দিক থেকে স্বচ্ছ। তির্যক দৃষ্টিতে সমাজকে তুলে আনেন। অনর্গল চমৎকার বলেন, বাংলা এবং ইংরেজিতে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষক মহিবুল আজিজই দায়িত্ব নিচ্ছেন। কথা হলো।
৪ মে ১৯৮৯
উত্তরবঙ্গে এখনও প্রচন্ড খরা। সাটুরিয়াকে এনজিওগুলো কুমিরের ছানা বানানোর সুযোগ পেয়েছে। সরকার তাদের জায়গা ছেড়ে দিয়েছে।
১৯ মে ১৯৮৯
‘বর্তমান যুগে মার্ক্সবাদ ও বাংলাদেশ’ শিরোনামে আমাদের সেমিনার হলো গতকাল। হাসান ভাই, আসহাব ভাই, হারুণ, উমর ভাই এবং আমি আলোচনা করেছি। বস্তুত সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনে এখন যেসব ঘটনা ঘটছে তাতে এসব আলোচনা খুবই দরকার।
আজ সারাদিন লেখক শিবিরের সভা হলো। সাহিত্য সম্মেলন, ‘হুমায়ূন কবির স্মৃতি পুরস্কার’-‘…স্মৃতি বক্তৃতা’, কেন্দ্রীয় সফরসূচী সবই চূড়ান্ত হলো। তত্ত্বগত সংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একটি সংগঠন হিসাবে এর বিস্তৃতি দরকার।
২০ মে ১৯৮৯
নারী প্রশ্ন নিয়ে আমাদের সংগঠনে এর আগে বিস্তৃত কোনো আলোচনা হয়নি। সংগঠনের কর্মীদের মধ্যেও নানা অস্পষ্টতা আছে। আজই প্রথম ‘নারীমুক্তি ও সমাজতন্ত্র’ শিরোনামে দিনব্যাপী কর্মশিবির হলো। বাপ্পী প্রবন্ধ পড়লো, শামীম ভালো আলোচনা করলো। উপস্থিতি, অংশগ্রহণ, উৎসাহের দিক থেকে এটি সফল হয়েছে বলতে হবে।
৫ জুন ১৯৮৯
গত ২২ তারিখ থেকে একটানা ভর্তি পরীক্ষা চলছে। আজকেই শেষ হলো। একধরনের প্রহসন ছাড়া আর কী? প্রায় ১৫ হাজার ছেলেমেয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে। ভর্তি হতে পারবে ৩৫০। এরপর ধরাধরি তো আছেই।
১৬ জুন ১৯৮৯
পরীক্ষার খাতা দেখছি। অধিকাংশ খাতারই খারাপ অবস্থা, শতকরা ৯০ ভাগ খাতা ১০০ তে ৫০ও পায়নি। কিন্তু এই না পাওয়া তাদের শিক্ষার সাথেই সম্পর্কিত। কিন্তু রচনাগুলোতে তাদের মনের কথা বোঝা যায়। প্রায় সকলেই ছাত্র রাজনীতির পক্ষে কিন্তু ছাত্র রাজনীতির বর্তমান- না বোঝা, অন্তসারশূণ্য, সন্ত্রাসী ধারার উপর তারা ভয়ানক ক্ষুব্ধ। ‘আদর্শ শিক্ষক’ তারা কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না। ক্লাশ ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেট টিউশনি করা ব্যক্তিদের তারা শিক্ষক হিসেবে মেনে নিতে রাজী নয়।
২৭ জুন ১৯৮৯
শামীমের সঙ্গে অনেকক্ষণ আলোচনা হলো। মেধাবী, পরিশ্রমী এবং অঙ্গীকারাবদ্ধ মানুষ। পড়াশোনা এবং চিন্তায় নারীমুক্তি আন্দোলনে নতুন যোগ সৃষ্টিতে একা একা একটানা কাজ করছে-লিখছে-লেখাচ্ছে, নতুন চিন্তা নিয়ে যাচ্ছে।
২৮ জুন ১৯৮৯
হাসান ভাই আমাদের এরকম বিপদে ফেলবেন ভাবিনি। ফিলিপস পুরস্কার পাবার লোভ তাকে কাবু করবে- বিশ্বাস হয়নি প্রথম। ইলিয়াস ভাই প্রথম থেকেই নিশ্চিত ছিলেন, আমি তবুও কী এক আশায় ছিলাম- চিঠিও লিখেছি।…
২২ জুলাই ১৯৮৯
বিশ্ববিদ্যালয় আবার খুললো। ঢাকা রাজশাহী চট্টগ্রাম তিনস্থানেই প্রায় অচলাবস্থা। চট্টগ্রাম জামায়াতের হাতে, রাজশাহীতে তারা একের পর এক হামলা করছে। জাবিতেও ওদের তৎপরতা বাড়ছে। …কোনো রাজনীতি নেই, মতাদর্শিক লড়াইএর ভাবনা নেই, শারীরিক প্রতিরোধও নেই।..
২৩ জুলাই ১৯৮৯
ধানমন্ডি শাখার ‘বই পড়া প্রতিযোগিতা’য় এসএসসি পরীক্ষা দেয়া কয়েকটি ছেলের কথা শুনে খুব ভালো লাগলো। এদের মধ্য দিয়েই ক্ষুরধার ধারা বেড়ে উঠবে।
২৬ জুলাই ১৯৮৯
হরিপুর তেল নিয়ে ৫ বামদলের সেমিনার। লুটপাটের আয়োজন নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করলেন বিশেষজ্ঞরা। জানা গেল সংবাদপত্রগুলো সব অসহযোগিতা করছে। সিমিটার কোম্পানির কত লম্বা হাত। রাতে এর উপর একটা লেখা তৈরি করলাম।
২৮ জুলাই ১৯৮৯
সারাদিন প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। পানি উঠেছে অনেক জায়গায়। ঢাকা শহর রক্ষার জন্য এবার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। অবাস্তব ছেলেভুলানো খেলা। লুটপাটের আয়োজন। এই আয়োজন ঢাকার ভিআইপি এলাকাগুলোকে হয়তো বাঁচাবে কিন্তু পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোকে আরও দ্বিগুণ মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
১৬ আগস্ট ১৯৮৯
হল খালি করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেল ১ সপ্তাহের জন্য। গত রাত প্রায় ২ টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। এক পর্যায়ে ছাত্রদলের সঙ্গে সাধারণ ছাত্ররা যোগ দেবার ফলে ইসলামী ছাত্র শিবিরের সকল নেতা কর্মী ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই একজন গুলিবিদ্ধ, গুরুতর আহত।
২১ আগস্ট ১৯৮৯
বামপন্থী দলগুলোর ডাকা আজকের হরতাল। যতটা ভেবেছিলাম তার চাইতে ভালো হয়েছে। এর মধ্যে আমরাও এর প্রচারে সভা সমাবেশ ও মিছিল করেছি। গত পরশু আমাদের মশাল মিছিল শুরু করতে লজ্জাই লাগছিল। কারণ আমাদের চাইতে পুলিশের সংখ্যা বেশি ছিল। তবে মিছিল জঙ্গী ছিল, পায়ে ফোসকা পড়ে গেছে।
জাহাঙ্গীরনগরে শিবিরের হাতে গুলিবিদ্ধ ছাত্রদলের কবির মৃত্যুর মুখে। দেখতে গিয়েছিলাম। অসহ্য!
২৬ আগস্ট ১৯৮৯
সকাল থেকেই মেডিক্যালে। ছাত্রদলের কর্মী গুলিবিদ্ধ কবির মারা গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জানাজা।
যদিও আওয়ামী লীগ, বিএনপি উভয়েই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জামায়াতকে আশ্রয় দান করে তবুও বিএনপিকে জামায়াত সারাদেশে নিজেদের রক্ষবর্ম হিসেবে ব্যবহার করে।
গ্রামের ছেলে কবির। ও কোনো মারামারিতে নিহত হয়নি, ওকে খুন করা হয়েছে। সব ছাত্র সংগঠন ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচী নিচ্ছে।
১২ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯
সর্বহারা পার্টির কর্মীদের উপর গত কিছুদিনে ধরপাকড়, দমন পীড়ন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে। আজ দেখলাম তাদের গণসংগঠনের কর্মীদেরও ধরা হচ্ছে। এঁদের রাজনৈতিক মর্যাদাও দেয়া হয় না। অপরাধী, খুনী হিসেবে নির্যাতন করা হচ্ছে। সারা দেশে খুনী ছিনতাইকারীদের ছেড়ে রেখে দিয়ে এদের পেছনেই সব পুলিশী শক্তি নিয়োগ করা হয়েছে।
লিখছি ‘বাংলাদেশে সমাজ বিশ্লেষণে লেনিনীয় পদ্ধতি’। বিতর্কের অংশ।
২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯
রাত প্রায় ২টা বাজে। সকাল থেকেই এই টেবিলে বসে তেভাগার উপর অনুবাদের কাজ করছি। গত কয়েক ঘন্টা ধরে দূর থেকে কোনো গ্রামের বাড়ী থেকে গান ভেসে আসছে। বিভিন্ন ধরনের গান। দূর থেকে ভেসে আসা গান, চারদিকের নিস্তব্ধতা, একা একা কাজ করা সব মিলিয়ে কঠিন বিষয়ে কাজ করবার মধ্যেও নিজের মধ্যে আলাদা পৃথিবী তৈরি হয়ে যায়। কোনো অতীতের, কৈশোরের, কোনো প্রিয় মানুষের সঙ্গে, কোনো বিলের ধারে, কোনো রাস্তায়, কোথাও কোনো গাছের নীচে, কোনো এক সময়ের কোনো অনুভূতি হঠাৎ হঠাৎ মনে আসে। এগুলোর কোনো ধারাবাহিকতা নেই, হঠাৎ হঠাৎ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন।
২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯
চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও আলোচনা। মূলত শামীমের উৎসাহে। এই কর্মসূচীকে যদি আস্তে আস্তে চলচ্চিত্র নির্মাণের দিকে নেয়া যায় এবং শামীম যদি এর মূল দায়িত্ব নেয় তাহলে এ কর্মসূচী সার্থক হবে।
৩ অক্টোবর ১৯৮৯
বগুড়া এবং রাজশাহী থেকে গতকালই ফিরলাম। দুস্থানেই ফরাসী বিপ্লবের দ্বিশতবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা হলো। বগুড়াতেও হাসান ভাই এসেছিলেন। মানুষের দীর্ঘসময় আলোচনায় মনোযোগ দেখে ভালো লেগেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাড়তি ছিল সফদর হাশমীর লেখা নাটক ‘হল্লাবোল’। হাশমীর লেখা নাটক আর কোথাও মঞ্চস্থ হয়েছে বলে জানিনা। রাজশাহীতে হাসান ভাইএর বাসাতেই ছিলাম। তাঁর ফিলিপস পুরস্কার গ্রহণ আমাদের সবাইকে আহত করেছে এবং সংগঠনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এটা তিনি জানেন। এখন অবশ্য তিনি সাংগঠনিক কাজে আগের চাইতে বেশি সক্রিয়।
ছবি: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনারে আলোচনা করছেন আনু মুহাম্মদ, মঞ্চে বসে আছেন কথা সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক
৬.১০.১৯৮৯
মুশতাক খানের থিসিস পড়ছি। গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইস্যু তুলেছেন কিন্তু প্রান্তস্থ দেশে পুঁজিবাদী অর্থনীতি বিকাশে মৌলিক সমস্যাকে ধারণ করতে পারেন নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী সাউথ কোরিয়ান মডেলে সরকারি দক্ষ হস্তক্ষেপই শিল্পায়ন সম্ভব করেছে। ঠিক, কিন্তু সেখানে আন্তর্জাতিক শ্রম বিভাজন, সাম্রাজ্যবাদের কৌশলগত ভূমিকার প্রভাব কিছুই আসেনি।
১৮.১০.১৯৮৯
স্কপের দুদিনব্যাপী ধর্মঘটের সমর্থনে গবিজোর মশাল মিছিল হয়েছে পরশু।
এই ধর্মঘট বানচাল করবার জন্য সরকার অনেকরকম প্রচারণার আশ্রয় নিয়েছে, পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই ধর্মঘট অন্তত শতকরা ৬০ ভাগ সফল হয়েছে বলতে হবে।
২.১২.১৯৮৯
হাসান ভাই ইলিয়াস ভাইসহ চট্টগ্রাম গেছি গত মাসের ২৫ তারিখ। চট্টগ্রাম শহরে ফুলকিতে লেখক শিল্পীদের সাথে সভা, বিকালে প্রেসক্লাবে ‘আন্তর্জাতিক পরিসরে সমাজতন্ত্র’ শিরোনামে আলোচনা সভা। পরদিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনা সভা। ২৭ তারিখ আমরা রওনা হলাম গ্রামের দিকে। আসহাব ভাই মাইক্রোবাস জোগাড় করেছিলেন, সবাই মিলে যেতে সুবিধা হলো। প্রথম গেলাম বাঁশখালী। চট্টগ্রাম থেকে সাতকানিয়া হয়ে ভেতরে ঢুকতে হয়। পাহাড়ের ভেতর দিয়ে, রাস্তা বেশ খারাপ। পরদিন সকালে দুই মাইল হেঁটে সাধনপুর, পাহাড়ী অঞ্চলই বলতে হবে। সেখানেই প্রথম সভা-সাধনপুর পল্লী উন্নয়ন বালিকা বিদ্যালয়। যোগেশ সিংহের এলাকা, তাঁর পৌত্রী ঐ বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। আসহাব সাহেবের চেষ্টাতেই এই অঞ্চলে বেশ কটি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দুপুরের পর রিকশায় গেলাম কালীপুর, ৬ মাইল খুব খারাপ রাস্তা। এসব এলাকায় হরতালের আওতায় রিকশা পড়ে না। আওয়ামী লীগের হরতাল সেদিন।
কালীপুরে উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আলোচনা সভা। সাধনপুরের মতো এখানেও শিক্ষকরাই ছিলেন প্রধান অংশ। ঢাকায় গন্ডগোলের সূত্র ধরে পরদিন বিএনপি আবার হরতাল ডাকায় কর্মসূচিতে আরও পরিবর্তন আনতে হলো। রাতে রওনা হলাম চকোরিয়া, চিরিঙ্গা বাজারে পৌঁছলাম রাতে। ভোরে উঠে রিকশায় গেলাম বাইন্যাছড়া। সেখান থেকে পাবলিক জীপে উঠে মেহেরনামা এবং সেখান থেকে সীলখালী জনতা বাজার। এখানেই আলোচনা সভা। রাতে আরও দুমাইল হেঁটে পাহাড়ের উপরে ঘরোয়া আলোচনা। এরপর আবার ৫ মাইল হেঁটে থাকার জায়গায়। এই অঞ্চল পাহাড়ী। কিন্তু মানুষের জীবন ও সমস্যার অনেককিছুই সমতলের মতই। বহু পরিবার আছে যাদের থাকার জায়গা নাই। থাকেন ওয়াপদার জায়গায় খাজনা দেন প্রভাবশালী লোকদের। সবগুলো অঞ্চলেই চোরাচালান ব্যাপক মাত্রায় হয়। এসব এলাকায় রাজনৈতিকভাবে জামায়াতের প্রভাব বেশি।
১৪.১২.১৯৮৯
শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ। যারা ঘাতক দালালদের ক্ষমা করেছে, যারা তাদের পুনর্বাসন করেছে তাদের ন্যাক্কারজনক লম্ফঝম্ফ শহীদ মিনার, জাতীয় স্মৃতিসৌধ এবং বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের পরিবেশই নষ্ট করে দেয়। তাদেরই প্রবল প্রতাপ।
৩১.১২ ১৯৮৯ থেকে ৬.১.১৯৯০
কুষ্টিয়া, কুমারখালী এবং সিলেট সুনামগঞ্জ। বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন নিয়ে আলোচনা। বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদ ‘সমাজতান্ত্রিক’ বলে পরিচিত দেশগুলোর আভ্যন্তরীণ মিত্রশক্তির সহযোগে সমাজতান্ত্রিক চিন্তা ও আন্দোলন বিরোধী যে আগ্রাসী প্রচার চালাচ্ছে তার বিপরীতে বস্তুনিষ্ঠভাবে পুরো বিষয় উপস্থিত করা দায়িত্ব মনে করছি। এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে আলোচনা ও বিতর্কে যাচ্ছি। প্রকাশনাও হচ্ছে। এককালে সিপিবির নেতা ছিলেন এরকম কেউ কেউ এসব বিতর্কে আলোচনায় এসেছেন। তাদের কথা- এখন আর শ্রেণীশোষণ নাই, শ্রেণীদ্বন্দ্ব নাই অতএব বিপ্লবের প্রয়োজন নাই!
প্রকাশনা ও সাহিত্য সম্মেলন
এর মধ্যে লেখক শিবির থেকে কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এগুলো হলো বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত, এতে লেখা আছে বদরুদ্দীন উমর, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং আমার। সেমিনারের প্রবন্ধ ও আলোচনা নিয়ে একাধিক বই আছে। এগুলো হলো- বাংলাদেশের অর্থনীতি: সংকটকাল, বাংলাদেশের উৎপাদন পদ্ধতি, বাংলাদেশের শিক্ষা: অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ। এছাড়া সাংস্কৃতিক আন্দোলন নামে পত্রিকা নিয়মিতই প্রকাশিত হয়েছে।


ছবি: “বাংলাদেশের শিক্ষা: অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ” পুস্তকের সূচীপত্র
১৯৯০ এর ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে এক শিক্ষা সফরে ভয়ংকর বিপদের মধ্যে পড়ার অভিজ্ঞতা হয়। সমুদ্র, পূর্ণিমা, ট্রলার, সমুদ্রে পথ হারানো, জলদস্যু- অনেক লম্বা কাহিনী। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরে বইমেলায় গেলাম। ইলিয়াস ভাই সব শুনে বললেন এরকম একটা অভিজ্ঞতা তো হওয়াই দরকার কিন্তু নিশ্চয়তা দিতে হবে যে ফিরতে পারবো!
এবছর ২৩, ২৪ ও ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় লেখক শিবিরের প্রথম সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি সেমিনার রুম ও সড়ক দ্বীপে তিন দিন ধরে এই অনুষ্ঠান কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লেখক শিল্পীদের সমাবেশ ঘটলো। ইলিয়াস ভাই ও হাসান ভাই এই সম্মেলন নিয়ে খুবই উৎসাহিত ছিলেন। আয়োজনে ইলিয়াস ভাই সময় দিয়েছেন অনেক। তিনদিনে কবিতা ও ছড়া, ছোটগল্প, উপন্যাস, কথাসাহিত্য, নাটক, গান নিয়ে বিভিন্ন অধিবেশন ছিল। এছাড়া নাটক মঞ্চায়ন, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হয়েছে। বিভিন্ন অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন শামসুর রাহমান, শওকত আলী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস।
১৯৯০-এর শেষ দিকে লেখক শিবিরের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো চট্টগ্রামে। আসহাব ভাইএর আগ্রহেই হলো চট্টগ্রামে। হাসান ভাই ইলিয়াস ভাইসহ দুদিন আগেই গেলাম। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ভালো সংখ্যায় প্রতিনিধিদল এলেন। অধিবেশনগুলো খুব প্রাণবন্ত হলো। তর্ক বিতর্কও কম হয়নি। তবে শেষে আমার মন খারাপ, চতুর্থবার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেবার একেবারেই ইচ্ছা ছিল না। এতবার নেয়া ঠিক না। হারুণ বা কাইয়ুম নিলে ভালো হতো। কিন্তু বাধ্য হতে হলো।
১৯৯০: এরশাদের পতনের বছর
বছর জুড়ে বিভিন্ন দিক থেকে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে। এর আগের দুই বছরে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা খুব গতিশীল ছিল না। এই সময়ে বরং দেখা যায় বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশাভিত্তিক সংগঠন ও আন্দোলনের বিস্তার যা একভাবে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের ঘাটতি পূরণ করে অনেকখানি। কারণ লুটপাট, মেগা দুর্নীতি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান লোকসানি দেখিয়ে বিলবন্টন, কতিপয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সার্থে সরকারি সব নীতি নির্ধারণ, শিক্ষা স্বাস্থ্য খাতের অব্যাহত বেসরকারিকরণ- বাণিজ্যিকীকরণ, সাম্প্রদায়িকীকরণ, রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে সামরিক বেসামরিক আমলাদের স্ফীত করা ইত্যাদি নিয়ে দলগুলো স্পষ্ট ভূমিকা না নিতে পারলেও বিভিন্ন শ্রেণী পেশার আন্দোলনে এসব বিষয় বিশেষভাবে উঠে আসে। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, পথ নাটক পরিষদ এই আন্দোলনের পরিবেশ থেকেই গড়ে উঠে। লেখক শিল্পীদের স্বৈরাচার বিরোধী ভূমিকা গ্রহণে এসব সাংগঠনিক প্রক্রিয়া উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। স্বাস্থ্য নীতি নিয়েও সরকার প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। এটা যতটা স্বাস্থ্যনীতির বিরোধিতা তার থেকে বেশি এরশাদ শাসন বিরোধিতা। ডাক্তারদের পাশাপাশি আইনজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিকদের সাথেও এরশাদ সরকারের দ্বন্দ্ব স্পষ্টরূপ নিতে থাকে। বাসভাড়া বৃদ্ধি কেন্দ্র করে দেশজুড়ে প্রতিবাদ সংঘাত শুরু হয়।

ছবি: বিচিত্রার প্রচ্ছদে ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের ছাত্র নেতৃবৃন্দ
১০ অক্টোবর থেকে ২৬ নভেম্বর একটানা আন্দোলনের মধ্যে পুলিশ ও সরকারি সন্ত্রাসীদের হাতে অনেক মানুষ নিহত হন, অধিকাংশই শ্রমজীবী মানুষ। ২৭ নভেম্বর ছিল বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) এর ডাকা চিকিৎসক ধর্মঘটের দিন। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মোড়ে গুলিবিদ্ধ হন বিএমএ নেতা ডা. শামসুল আলম মিলন, পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। এতে এরশাদবিরোধী আন্দোলন আরও জঙ্গী আকার ধারণ করে। বিক্ষোভ ব্যাপক আকার নিলে ঐদিন রাত থেকে জরুরী অবস্থা এবং একটানা কারফিউ ঘোষণা করা হয়।
কিন্তু ফল হয় উল্টো। কারফিউ ঘোষণা মাত্র প্রতিবাদ মিছিল শুরু হয়। পরদিন সকাল থেকেই ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কারফিউ ও জরুরী অবস্থা প্রত্যাখ্যান করে একের পর এক মিছিল সমাবেশ হতে থাকে। এর ঠিক তিন বছর আগে ১৯৮৭ সালের এই ২৭ নভেম্বরেই জরুরী অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছিল। তা দিয়ে তখন সামলে নিয়েছিল এরশাদ সরকার। কিন্তু এবার আর তা হয়নি। আমার একটি লেখায় সেসময়ের যে বর্ণনা আছে তার ছোট অংশ এরকম:
এই সময়ে এই স্বতস্ফুর্ত, স্থানীয়ভাবে সংগঠিত বিক্ষোভ সমাবেশ মিছিলে যারা অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মীদের তুলনায় শ্রমজীবী জনগণের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। কারফিউ সময়ে তাদেরকে ঘরের মধ্যে থাকতে বলা হয়েছে কিন্তু তাদের ঘরই নেই। ফুটপাত থেকে প্রচন্ড ক্ষোভ নিয়ে তারা রাস্তায় নেমে এসেছেন। শিশু টোকাই থেকে বয়স্ক মানুষ পর্যন্ত। টোকাইরা এ সময়েও অস্বীকার আর প্রত্যাখ্যানের স্বাধীনতা বুকে নিয়ে প্রাণ দিয়েছে। শিশু মায়ের বুকের দুধ খেতে গিয়ে খেয়েছে মায়ের বুকের রক্ত। যারা সেসময় আন্দোলন সংগ্রামে নিহত হয়েছেন তাদের কেউই খুব স্বচ্ছল পরিবারের নন, অধিকাংশ খুবই গরীব। একটু ভালো অবস্থা যাদের তারা অনেক কষ্টে বাবা-মার আশা ও ভরসা হিসাবে লেখাপড়া করছিলেন। (‘স্বৈরশাসনবিরোধী লড়াই এবং ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান’ পুনপ্রকাশ-গণঅভ্যুত্থানের বাংলাদেশ ১৯৬৯ ১৯৯০ ২০২৪, মাওলা ব্রাদার্স, ২০২৫)
২৯ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা সবাই আন্দোলনের সমর্থনে একযোগে পদত্যাগ করেন। এরপর এর সাথে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দও একে একে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। প্রতিরোধ যখন সর্বব্যাপী, কারফিউ জরুরী অবস্থা যখন প্রত্যাখ্যাত তখন সব বাহিনীও অকার্যকর। এই অবস্থায় সাম্রাজ্যবাদী মুরুব্বীরা চুপ হয়ে গেল। এরশাদের আর উপায় থাকলো না। ৪ ডিসেম্বর ঘোষণা এল এরশাদ পদত্যাগ করবেন। এর মধ্যে তিন জোটের সাথে পদত্যাগের পথ, পরবর্তী সরকারের গঠন এবং নির্বাচন পরিচালনা কালীন সরকারের রূপরেখা নিয়ে ঐকমত্য হলে ৬ তারিখ এরশাদ পদত্যাগ করেন। সেইসাথে, তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত ‘নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক’ সরকারের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। শুরু হয় আরেক পর্ব।
কয়দিন সরকারের সকল প্রতিষ্ঠান অচল হয়ে গিয়েছিল। দিনের পর দিন রাস্তায় মানুষ, মিছিল সমাবেশ শ্লোগান গুলি টিয়ার গ্যাস গান নাটক। কর্তৃত্ব মানুষের হাতে। এরকম এক বিকালে আমরা পল্টনে হাঁটছি, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ ও শিল্পী ওয়াহিদুল হকও ছিলেন। চারিদিকে উদ্দীপ্ত মানুষ আর মানুষ। অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে জনতার লড়াইএর সম্মিলিত উৎসব যেন। মানুষের এই আত্মবিশ্বাসী উচ্ছল উদ্দীপ্ত চেহারা খুব কমই দেখা যায়। সেসময় ওয়াহিদুল ভাইএর একটা কথা এখনও মনে আছে- ‘এরকম দৃশ্য এরকম মুহূর্ত দেখার জন্যই বেঁচে থাকা সার্থক।’ (চলবে)
আনু মুহাম্মদ: সম্পাদক, সর্বজনকথা। ইমেইল: sarbojonkotha@gmail.com
আগের পর্ব: বাংলাদেশের ৫০ বছর ও তারপর-৯
