নিরাপদ কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য ২০ দফা

নিরাপদ কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য ২০ দফা

নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য আন্দোলন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন/ছবি: একুশে টেলিভিশন

গত ১৮ জানুয়ারি বেশ কয়েকটি সংগঠন ও আগ্রহী ব্যক্তিবর্গ ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবিগুলো উপস্থিত করেন। গুরুত্ব বিবেচনা করে এর পুরোটা আমরা এখানে প্রকাশ করছি। আমরা মনে করি এসব বিষয় নিয়ে জনপন্থী রাজনৈতিক দল, কৃষক মজুর সংগঠন, শিক্ষার্থী-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিদ্বৎসমাজসহ বিভিন্ন পর্যায়ে বিস্তর আলাপ আলোচনা ও উদ্যোগ দরকার। আমরা এসব বিষয়ে আরও মতামত বিশ্লেষণ প্রকাশে আগ্রহী।

নিরাপদ কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য ২০ দফা

গত ১৮ জানুয়ারি বেশ কয়েকটি সংগঠন ও আগ্রহী ব্যক্তিবর্গ ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবিগুলো উপস্থিত করেন। গুরুত্ব বিবেচনা করে এর পুরোটা আমরা এখানে প্রকাশ করছি। আমরা মনে করি এসব বিষয় নিয়ে জনপন্থী রাজনৈতিক দল, কৃষক মজুর সংগঠন, শিক্ষার্থী-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিদ্বৎসমাজসহ বিভিন্ন পর্যায়ে বিস্তর আলাপ আলোচনা ও উদ্যোগ দরকার। আমরা এসব বিষয়ে আরও মতামত বিশ্লেষণ প্রকাশে আগ্রহী।

ভূমিকা

এক নিরাপদ, ন্যায্য, জলবায়ুসহিষ্ণু, লাভজনক, স্বাস্থ্যকর, দূষণমুক্ত, টেকসই ও সার্বভৌম কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থা অর্জনের লক্ষ্যে এবং বর্তমান কৃষির নেতিবাচক ও পরষ্পর সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো পরিহারের জন্য, আমরা বাংলাদেশের বিভিন্ন কৃষিপ্রতিবেশ অঞ্চলের কৃষক, উদ্যোক্তা, ভোক্তা, গবেষক, শিল্পী, লেখক, কারিগর, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, উন্নয়নবিদ, ব্যবসায়ী, পরিবেশকর্মী এবং অন্যান্য পেশাজীবী প্রতিনিধিরা আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নি¤েœাক্ত প্রস্তাবসমূহ পেশ করছি। আমরা আশা করি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দল এবং প্রার্থীরা নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য বিষয়ক প্রস্তাবসমূহকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার এবং ঘোষণায় যুক্ত করে প্রস্তাবসমূহ বাস্তবায়নে অঙ্গীকার করবেন।

এক নিরাপদ, ন্যায্য, জলবায়ুসহিষ্ণু, লাভজনক, স্বাস্থ্যকর, দূষণমুক্ত, টেকসই ও সার্বভৌম কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থা অর্জনের লক্ষ্যে এবং বর্তমান কৃষির নেতিবাচক ও পরষ্পর সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো পরিহারের জন্য, আমরা বাংলাদেশের বিভিন্ন কৃষিপ্রতিবেশ অঞ্চলের কৃষক, উদ্যোক্তা, ভোক্তা, গবেষক, শিল্পী, লেখক, কারিগর, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, উন্নয়নবিদ, ব্যবসায়ী, পরিবেশকর্মী এবং অন্যান্য পেশাজীবী প্রতিনিধিরা আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নি¤েœাক্ত প্রস্তাবসমূহ পেশ করছি।

১। সমতা ও অধিকার

-কৃষক পরিচয়কে মর্যাদাসহ স্বীকৃতি দিয়ে দেশের সকল বর্গের সকল কৃষক, জেলে ও জুমচাষীর নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থাপনার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

-কৃষক পরিচয়কে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে দৃশ্যমান কাঠামোগত স্বীকৃতি ও মর্যাদা দিতে হবে।

-জেন্ডার, জাতি, শ্রেণি, ধর্ম, ভাষা ও উৎপাদনরীতির বৈচিত্র্যর নিরিখে নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থায় দেশের সকল অঞ্চলের সকল কৃষক, জুমচাষী ও খাদ্য সংগ্রহকারীর সমান অংশগ্রহণ ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

২। জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ

-প্রাকৃতিক শ্রেণি ঠিক রেখে, সীমানা এবং মালিকানা সুস্পষ্ট করে এবং অকৃষি ব্যবহার বন্ধ করে কৃষিজমি সুরক্ষায় আইন বাস্তবায়ন করতে হবে।

-কৃষিজমির সীমানা ও মালিকানা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

-কৃষিজমির অকৃষি ব্যবহার বন্ধ করতে হবে এবং কৃষিজমির প্রাকৃতিক শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না।

-ঐতিহাসিক পরম্পরায় যে অঞ্চলে যেসব ফসল চাষ হয়, সেগুলোর প্রসার করতে হবে এবং এসব অঞ্চলকে কৃষি-ঐতিহ্য অঞ্চল ঘোষণা করতে হবে।

-কৃষকদের মতামতের ভিত্তিতে কৃষিজমির সিলিং নির্ধারণ করতে হবে এবং অনুপস্থিত ভূমি মালিকদের জমি স্থানীয় কৃষকদের সাথে সমন্বয় করতে হবে।

-কৃষিজমি (খাস জমি ও জলাসহ) বরাদ্দের ক্ষেত্রে নারী, আদিবাসী, ভূমিহীন, প্রতিবন্ধী মানুষ এবং দলিত কৃষকদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।

-কৃষিজমির সাথে যুক্ত নদী, জলাশয় এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষিত ও দূষণমুক্ত রাখতে হবে।

-কৃষি, ভূমি, পানিসম্পদসহ কৃষিজমি সংক্রান্ত সকল মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় থেকে জাতীয় পর্যায়ের সকল কমিটিতে কৃষক প্রতিনিধিদের কার্যকর সম্মানজনক অংশগ্রহণ ও সিদ্ধান্তগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

৩। জমি চাষ ও কৃষি যন্ত্র

-কৃষিজমির মাটির গঠন এবং কেঁচোসহ অণুজীব ক্ষতিগ্রস্থ হয় এমন চাষাবাদ এবং উপকরণ নিষিদ্ধ করতে হবে।

-কৃষিজমির মাটির গঠন এবং অণুজীব ও কেঁচোসহ প্রাণীর ক্ষতিসাধন করে এমনভাবে জমি চাষ বা কর্ষণ করা যাবে না। এক্ষেত্রে ভারী ট্রাক্টর বন্ধ করে ক্রমে ছোট পাওয়ার টিলার বা গরুর হালের ব্যবহারের প্রসার করতে হবে।

-উদ্ভিদনাশক বিষ (হার্বিসাইড) নিষিদ্ধ করতে হবে।

-স্থানীয় লোকজ কৃষি প্রযুক্তি বিষয়ক গবেষণা, উদ্ভাবন এবং স্থানীয় কৃষিযন্ত্র ও প্রযুক্তির প্রসারে ভর্তুকির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

৪। বীজ ও প্রাণসম্পদবৈচিত্র্য

-স্থানীয় জাতের বীজবৈচিত্র্য প্রসার ও সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার ও বাজেট নিশ্চিত করতে হবে।

-কৃষির সকল ক্ষেত্রে স্থানীয় ও ঐতিহাসিক জাতের বীজ ও জাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

-সরকারিভাবে স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ, প্রসার ও বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করতে হবে এবং প্রতিটি কৃষি-প্রতিবেশ অঞ্চলের উপযুক্ত বীজ সহজলভ্য করতে হবে

-প্রতিটি গ্রামে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনায় কৃষকদের মাধ্যমে স্থানীয় বীজ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করে স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী বীজ উৎপাদন, বিনিময় ও বিপণন করতে হবে। দেশীয় বীজখাতকে শক্তিশালী করতে তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসাহিত করতে হবে।

-বীজ উৎপাদন ও বিপনণের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও পরিবেশবিনাশী কোন কৃত্রিম রাসায়নিক উপকরণ ব্যবহার করা যাবে না।

-দেশীয় স্থানীয় বীজ কোনো কোম্পানি বা ব্যক্তি কুক্ষিগত করতে পারবে না এবং একতরফাভাবে লাইসেন্স/পেটেন্ট করতে পারবে না। এরকম কোনো ঘটনা প্রমাণিত হলে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আদায়সহ সেইসব পেটেন্ট বাতিল করতে হবে।

-দুর্যোগ, মহামারিসহ যেকোনো সংকটকালীন সময় ত্রাণ বা পুনর্বাসন হিসেবে স্থানীয় বীজ প্রদান করতে হবে।

-স্থানীয় বীজের প্রসারে মাঠ পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তাদের সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।

-স্থানীয় জাতের আদি নাম পরিবর্তন করা যাবে না। প্রমাণিত হলে নতুন নাম বাতিল করে আদি নাম ফিরিয়ে দিতে হবে।  

-জাতীয় বীজ বোর্ডে অঞ্চলভিত্তিক প্রকৃত কৃষক প্রতিনিধি (নারী ও পুরুষ) রাখতে হবে।

৫। সেচ ও ব্যবস্থাপনা

-ভূগর্ভ নির্ভর সেচ ও দূষণ বন্ধ করে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ সুরক্ষা করে নিরাপদ ও ন্যায্য সেচ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।

-কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের সকল স্তরে  ভূগর্ভের পানি ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে কমিয়ে আনতে হবে।

-পারিবারিক ও জরুরি সামাজিক প্রয়োজন ব্যতিত ভূগর্ভের পানি উত্তোলন বা বাজারজাত করা যাবে না।

-ভূউপরিস্থ প্রাকৃতিক পানির দকল ও দূষণমুক্ত করে সংরক্ষণ এবং বৃষ্টির পানির টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

-খরাপ্রবণ, লবণাক্ত ও পানিসংকটাপন্ন অঞ্চলে ও জমিতে পানি কম লাগে এমন ফসল চাষ করতে হবে।

-সহজ পানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গবেষণা এবং সহজলভ্য প্রযুক্তি প্রসার করতে হবে।

-কৃত্রিম রাসায়নিক সিনথেটিক উপকরণ ব্যবহার বন্ধ করে জৈব উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে জমির পানি ধারণ ক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে ঠিক রাখতে হবে।

-সহজ পানি-কার্ডের মাধ্যমে পানি ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করতে হবে।

৬। রাসায়নিক কৃত্রিম সিনথেটিক সার

-জমি ও মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করে জৈব সারের ব্যবহার বাড়িয়ে রাসায়নিক সারের ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে বন্ধ করতে হবে।

-কৃত্রিম সিনথেটিক রাসায়নিক সারের পরিবর্তে স্থানীয় উপাদানে তৈরি সহজলভ্য জৈব সারের ব্যবহারের বাড়াতে হবে।

-রাসায়নিক সারে প্রদত্ত ভর্তুকি হ্রাস করে জৈব সার উৎপাদক ও ব্যবহারকারী কৃষককে ভর্তুকি প্রদান করতে হবে।

-জৈব সারের কার্যকারিতা বাড়াতে গবেষণা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে এবং এক্ষেত্রে তরুণ ও নারী উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে। লাইসেন্স প্রদান সহজীকরণ করতে হবে।

৭। বালাই ব্যবস্থাপনা

-অতি বিপদজনক বিষ নিষিদ্ধ করে ধারাবাহিকভাবে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত সব ধরণের বিষের ব্যবহার, উৎপাদন ও বিপণন বন্ধ করতে হবে।

-বিভিন্ন মেয়াদের সুস্পষ্ট টার্গেট নির্ধারণ করে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে সব ধরনের বিষের ব্যবহার পর্যায়ক্রমে শূণ্যে নামিয়ে আনতে হবে। একইসাথে জাতীয় প্রাণবৈচিত্র্য কর্মকৌশলের (এনবিএসএপি) এ সংক্রান্ত অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হবে।

-বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক তালিকাভূক্ত অতি বিপদজনক বিষ চিহ্নিত করে ২০২৬ সালের ভেতর নিষিদ্ধ করতে হবে।

-প্রতি বছর রাষ্ট্রীয় বাজেটে কৃষিজমিতে ব্যবহৃত কৃত্রিম রাসায়নিক উপকরণের পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্যগত প্রভাব নিরুপণ করতে হবে। কোনো বিষ অনুমোদনের পূর্বে কৃষক সমাজের সম্মতি নিতে হবে।

-বালাইনাশক বিষকে ‘বিষ’ হিসেবেই উল্লেখ করতে হবে, ঔষুধ বলা যাবে না।

-বিষ ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে দোকানের রশিদ এবং সরকারি কৃষি প্রতিনিধির প্রেসক্রিপশন বাধ্যতামূলক করতে হবে।

-বিষ কোম্পানিকে ডিলার ও কৃষকের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সকল স্বাস্থ্য সুরক্ষা উপকরণ (এপ্রোন, গ্লাভস, চশমা, সাবান, মাস্ক, টুপি, গামবুট ইত্যাদি) পণ্য ক্রয়ের সময় বিনামূল্যে বাধ্যতামূলকভাবে সরবরাহ করতে হবে।

-বিষের মোড়ক/বোতল সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে সংগ্রহ করে নিজ দায়িত্বে ধংস করতে হবে।

-বিনামূল্যে কৃষকদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে এবং বিষ ব্যবহারে আক্রান্ত ও অসুস্থ কৃষকদের চিকিৎসার যাবতীয় দায়দায়িত্ব নিতে হবে।

-জৈব বালাইনাশক, সমন্বিত প্রাকৃতিক বালাইব্যবস্থাপনাকে উৎসাহিত করতে গবেষণা, প্রশিক্ষণ, ভর্তুকী, প্রচারণা এবং প্রণোদনা অব্যাহত রাখতে হবে।

৮। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ

-দেশীয় স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাদ্যবৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দিয়ে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করা অতি-প্রক্রিয়াজাতকৃত ও কৃত্রিম উপকরণযুক্ত খাদ্য বন্ধ করতে হবে।

-খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে পরিবেশ, প্রাণবৈচিত্র্য এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক উপাদান ব্যবহার করা যাবে না।

-প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সরাসরি ফসল বিক্রি না করে কৃষক যাতে প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করতে পারে সে বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে।

-প্লাস্টিকের মোড়ক পরিহার করে প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে মোড়কজাত করতে হবে।

-দেশীয় লোকজ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তির বিকাশে নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা দিতে হবে।

-অঞ্চলভিত্তিক কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণাগার স্থাপন করতে হবে।

-অতি-প্রক্রিয়াজাতকৃত ও কৃত্রিম উপকরণযুক্ত খাবার ধারাবাহিকভাবে বন্ধ করতে হবে।

৯। বিপণন ও ন্যায্যমূল্য:

-সকল ফসলের উপযুক্ত মূল্য নির্ধারণসহ এলাকাভিত্তিক কৃষকের হাট গড়ে তুলতে হবে।

-অঞ্চলভিত্তিক দেশের প্রতিটি ফসল উত্তোলনের উপযুক্ত সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে।

-প্রতিটি ফসলের উপযুক্ত ক্রয়-বিক্রয় মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। সকল বাজারকমিটিতে কৃষক প্রতিনিধি রাখতে হবে।

-ফসল বিক্রির ক্ষেত্রে কৃষকের হাট ও স্থানীয় বাজারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

-নিরাপদ খাবারের বিপণন সহজ করতে নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে হবে।

-কৃষি পদক প্রদানের ক্ষেত্রে নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য উৎপাদক এবং উদ্যোক্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

-জিএমও, রাসায়নিক ও জৈব (কৃত্রিম রাসায়নিকমুক্ত) পদ্ধতিতে উৎপাদিত ফসলের লেবেলিং বাধ্যতামূলক করতে হবে।

-কৃষিফসল ও নিরাপদ খাদ্য পরিবহনকে জরুরী সেবা হিসেবে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

১০। কৃষক ও কৃষি শ্রমিক

-কৃষি শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ ও কৃষক পেনশন চালু করতে হবে।

-৬০ বছরের উর্ধে দেশের সকল নারী-পুরুষ কৃষক, জুমচাষী, জেলে ও কৃষি শ্রমিকদের পেনশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

-নিরাপদ কৃষিচর্চারত কৃষক ও কৃষি শ্রমিক পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা ও চিকিৎসার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নিতে হবে।

-ভূমিহীন ও কৃষি শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। এক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সম-মজুরি নিশ্চিত করতে হবে।

-পারিবারিক কৃষিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও সহায়তা প্রদান করে খাদ্যব্যবস্থায় সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে যুক্ত করতে হবে।

১১। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

-কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে স্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিমুক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।

-কৃষি ও খাদ্য বর্জ্য কৃষিজমিতে সার হিসেবে ফেরত দিতে হবে।

-শিল্প ও শহরের বর্জ্য কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশে ডাম্পিং করা যাবে না।

-কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে মিথেনসহ কার্বণ নি:সরণের পরিমাণ পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনতে হবে। 

১২। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনা

-দেশীয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ জাত সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে স্থানীয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ নির্ভর গ্রামীণ গৃহস্থালী খামার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীনির্ভর জলাভূমি ব্যবস্থাপনার প্রসার ঘটাতে হবে।

-মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের ক্ষেত্রে উৎপাদন থেকে বিপণন সকল পর্যায়ে ক্ষতিকারক উপকরণের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। দেশীয় প্রাকৃতিক উপাদান নির্ভর খাদ্য ও ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।

১৩। নগর কৃষি ও ছাদবাগান

-নগর কৃষি ও ছাদবাগানের ক্ষেত্রে স্থানীয় বীজনির্ভর নিরাপদ কৃষির প্রসার করতে হবে।

-নগরীয় কৃষি ও জীবনযাপনের ক্ষেত্রে বৃষ্টির পানির সর্বোচ্চ ব্যবহার (রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং) বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং নগরের অব্যবহৃত স্থান ও উদ্যানে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর জন্য দেশীয় ফল ও ঔষধি গাছ সংরক্ষণ করতে হবে। 

১৪। কৃষি সংস্কৃতি সুরক্ষা

-দেশের সকল অঞ্চলের লোকায়ত কৃষিপ্রথা, এতিহ্য, উৎসব, মেলা ও প্রদর্শনী আয়োজনে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা দিতে হবে এবং অঞ্চলভিত্তিক কৃষি ও খাদ্য সংগ্রহশালা গড়ে তুলতে হবে।

-বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজ কৃষি প্রথা, ঐতিহ্য ও উৎসব এবং কৃষি ও বীজ মেলা-প্রদর্শনী রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রসার, সংরক্ষণ ও আয়োজনের ব্যবস্থা করতে হবে।

-অঞ্চলভিত্তিক আদি ও প্রচলিত কৃষি উপকরণ সামগ্রির সংগ্রহশালা তৈরি করতে হবে।

-কৃষি ও কৃষকের সংস্কৃতি বিষয়ক জ্ঞান অন্বেষণে গবেষণা কার্যক্রম বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার ও প্রসার করতে হবে।

-সরকারি কৃষি ও খাদ্য বিষয়ক অনুষ্ঠানে হাইব্রিড ও জিত্রমও বীজ ও কৃত্রিম রাসায়নিক উপকরণের প্রচার করা যাবে না। স্বাস্থ্য ও পরিবেশবিনাশী কোনো বিষ কোম্পানিতে কোনো সরকারি বিনিয়োগ করা যাবে না। বহুজাতিক কৃষিবাণিজ্য কোম্পানির অনুষ্ঠানে সরকারি প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত করতে হবে।

১৫। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা

-শিক্ষার সকল ক্ষেত্রে নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থাকে যুক্ত করতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের শ্রেণি কার্যক্রম হিসেবে নিরাপদ কৃষিকাজকে অর্ন্তভূক্ত করতে হবে।

-মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে উৎপাদনমূখী নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থা বিষয়ক শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে। কৃষকের গবেষণা, জ্ঞান, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় করতে হবে।

-অঞ্চল ও মৌসুম অনুযায়ী প্রধান ফসল বপন ও কর্তনের সময় কৃষি উৎপাদন অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কৃষিকাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। এই অংশগ্রহণকে শ্রেণিশিক্ষা কার্যক্রম হিসেবে মূল্যায়ণ করতে হবে।

১৬। দুর্যোগ ও জলবায়ু সংকট

-জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় দেশের অঞ্চলভিত্তিক স্থানীয় অভিযোজন এবং লোকায়ত কৌশলগুলিকে অগ্রাধিকার দিয়ে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা করতে হবে এবং কৃষকের ক্ষয়ক্ষতি নিরসনের জন্য সহজে জলবায়ু তহবিল নিশ্চিত করতে হবে।

-বাংলাদেশের ভিন্ন ভিন্ন কৃষি-প্রতিবেশ অঞ্চলের জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি কৃষকদের অভিজ্ঞতার আলোকে চিহ্নিত করে ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করতে হবে।

-বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের চাহিদা ও পরিকল্পনার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন ব্যবহার করতে হবে।

-কৃষক ও প্রকৃতিজীবীদের অংশগ্রহণে স্থানীয় ও জাতীয় অভিযোজন কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।

-জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ন্যাপ) এবং ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিশন (এনডিসি) প্রতিবেদনকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের অভিজ্ঞতা ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে অংশগ্রহণমূলক ও কার্যকর করতে হবে।

-জলবায়ু সংকট সমাধানের নামে ‘সবুজ বিপ্লবের’ মতো কোনো বাণিজ্যিক কার্যক্রম, কোম্পানি নির্ভর নতুন পদ্ধতি কিংবা স্থানীয় পরিবেশ ও কৃষিসংস্কৃতি বিরুদ্ধ কোনো ভ্রান্ত ও মিথ্যা উন্নয়ন প্যাকেজ চাপিয়ে দেয়া যাবে না। 

-জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য উৎপাদকদের ভ’মিকার স্বীকৃতি ও এসব কাজে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জলবায়ু তহবিলের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

১৭। আইনগত অধিকার

-কৃষিকাজ ও খাদ্য উৎপাদন করতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকের আইনগত অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং ক্ষয়ক্ষতি রোধে দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কৃষিখাত গড়ে তুলতে হবে।

-কৃষি উপকরণ ব্যবহার করে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিয়ে উপকরণ উৎপাদক-বিক্রয়কারী এবং কৃষি উপকরণ ব্যবহারের পরামর্শকারীর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে। 

-নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থাপনার সকল ক্ষেত্রে দুনীর্তি বন্ধ করে কৃষিখাতের সাথে জড়িত সকল রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ এবং প্রতিষ্ঠানকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

-জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন, নীতি, সনদ, ঘোষণায় নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থার বিষয়াদি অন্তর্ভূক্ত করতে হবে।

-প্রতি জেলায় কৃষি ও পরিবেশ আদালত গঠন করতে হবে।

১৮। কৃষি বীমা ও ঝুঁকি ভাতা

-কৃষি ফসলের বীমা ও কৃষকের ঝুঁকি ভাতা চালু করতে হবে।

-কৃষকদের ফসলহানি বা অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রে সহজ ও শর্তহীন বীমা চালু করতে হবে।

-দুর্যোগ, অনিয়ন্ত্রিত বাজার, মহামারি এবং অন্যান্য সংকট ও ঝুঁকি সামাল দিয়ে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন অব্যাহত রাখা কৃষকের জন্য ঝুঁকি ভাতা নিশ্চিত করতে হবে।

১৯। কৃষিকার্ড

-কৃষকের মতামতের ভিত্তিতে কৃষিকার্ড তৈরি করে দেশের সকল কৃষকদের কৃষিকার্ড দিতে হবে।

-দেশের সকল কৃষকদের কৃষিকার্ড দিতে হবে এবং কৃষিকার্ডে যেসব তথ্যাদি অর্ন্তভূক্ত হবে তা কৃষকের সিদ্ধান্ত ও মতামতের ভিত্তিতে করতে হবে।

২০। সচেতনতা ও প্রচারণা

নিরাপদ কৃষি উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণন বিষয়ক দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে সচেতনতা ও প্রচারণা বাড়াতে রাষ্ট্র ও গণমাধ্যমকে ভূমিকা নিতে হবে।

—————————————————-

এই ২০ দফা প্রস্তুত ও সংবাদ সম্মেলনের উদ্যোক্তা সংগঠনগুলো হলো- প্রাকৃতিক কৃষক সমাজ, প্রাকৃত সমাজ, বাংলাদেশ অর্গানিক এগ্রিকালচারাল নেটওয়ার্ক, এসপিকে ফাউন্ডেশন, জাতীয় কৃষি আন্দোলন, নিরাপদ কৃষি বলয়, সমন্বিত কৃষি ক্লিনিক, দুনিয়াদারি আর্কাইভ, নয়াকৃষি আন্দোলন এবং সবুজ সংহতি। যোগাযোগ: নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য আন্দোলন। ই-মেইল: nirapod.krishi.2026@gmail.com

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •