‘উন্নয়ন’ কর্মকান্ডে বিপন্ন সুন্দরবন

সুন্দরবন নিয়ে ধারাবাহিক লেখার শেষ পর্ব

‘উন্নয়ন’ কর্মকান্ডে বিপন্ন সুন্দরবন

রণজিৎ চট্টোপাধ্যায়

উন্নয়ন কী এবং কাকে বলে? কার জন্যে উন্নয়ন। সার্বিক উন্নয়নের ফলাফল কি মুষ্টিমেয় মানুষ লাভ করবে না দেশের ব্যাপকতম জনসাধারণ উপকৃত হবে? উন্নয়ন কি হতে পারে জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে? রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, দালান-কোঠা, শপিংমল, বহুতল বাড়ি, সুরম্য প্রেক্ষাগৃহ হলেই কি উন্নয়ন হবে? এসব কথার উত্তর না – না, এবং না।

উন্নয়ন বলতে বুঝতে হবে বিদ্যমান সম্পদ ও সক্ষমতাকে বৃদ্ধি করা, জীবনকে বেশি বেশি উপভোগ্য করার যাবতীয় সরঞ্জাম হাতের নাগালে যেন পেতে পারে সাধারণ মানুষ তা নিশ্চিত করা। জনজীবন হতে হবে আরামদায়ক ও নিরাপদ। জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন-ইতিহাস, শিল্প-সাহিত্যের চর্চা ব্যাপক সংখ্যক মানুষের নাগালের মধ্যে যাতে হতে পারে। অর্থাৎ প্রকৃত শিক্ষা সকল মানুষের কাছে যাতে সহজলভ্য হয় তার ব্যবস্থা করা। বিনা চিকিৎসায় যেন কেউ মারা না যায় তা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করা। বিপরীতে যদি দেখা যায় কোটি কোটি মানুষ রয়েছে অভুক্ত, তাদের শিক্ষা নাই, চিকিৎসা নাই কথা বলার অধিকার নাই, কিন্তু বড় বড় রাস্তা, ইমারত প্রভৃতিতে ভরে গেছে দেশ তবে তাকে কোন বিবেচনাতেই উন্নয়ন বলা যায় না।

যদি দেখা যায় কোটি কোটি মানুষ রয়েছে অভুক্ত, তাদের শিক্ষা নাই, চিকিৎসা নাই কথা বলার অধিকার নাই, কিন্তু বড় বড় রাস্তা, ইমারত প্রভৃতিতে ভরে গেছে দেশ তবে তাকে কোন বিবেচনাতেই উন্নয়ন বলা যায় না।


 কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে যদি সুন্দরবনের ক্ষতি হয় তা কি আমাদের মেনে নেয়া উচিত? উচিত নয়। কারণ সুন্দরবনের সাথে আমাদের অস্তিত্ব জড়িয়ে আছে। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা এই জলজ বন, প্রাণ বৈচিত্রে ভরপুর, অতুলনীয় বাস্তুসংস্থান সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক সুরক্ষা বর্মপ্রাচীর সুন্দরবন শত শত বছর ধরে মানুষ ও প্রাণ-প্রকৃতির-সম্পদের সুরক্ষাকারী মহাপ্রাণ হিসেবে অবস্থান করছে। সুন্দরবন না থাকলে উপকূলীয় এলাকার গত ৫০ বছরে যেসব দুর্যোগ হয়েছে তার প্রত্যেকটিতে ৫-৭ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করতো। সহায় সম্পদ সবকিছু ধ্বংসস্তূপে পরিণত হত। সুতরাং সুন্দরবনের বিনিময়ে আমরা কোন তথাকথিত উন্নয়নই মেনে নিতে পারি না।

বাস্তুসংস্থান সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক সুরক্ষা বর্মপ্রাচীর সুন্দরবন শত শত বছর ধরে মানুষ ও প্রাণ-প্রকৃতির-সম্পদের সুরক্ষাকারী মহাপ্রাণ হিসেবে অবস্থান করছে। সুন্দরবন না থাকলে উপকূলীয় এলাকার গত ৫০ বছরে যেসব দুর্যোগ হয়েছে তার প্রত্যেকটিতে ৫-৭ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করতো। সহায় সম্পদ সবকিছু ধ্বংসস্তূপে পরিণত হত। সুতরাং সুন্দরবনের বিনিময়ে আমরা কোন তথাকথিত উন্নয়নই মেনে নিতে পারি না।

সাধারণভাবে ক্ষমতাবান গোষ্ঠী নানা কৌশলে সুন্দরবনের কাঠ-পাতা-মাছ সহ প্রচুর সম্পদ আত্মসাৎ করে থাকে। এসব কাজ তাদের নিত্যনৈমিত্তিক। তারা মৎস্য সম্পদ ধ্বংস করে বিষ দিয়ে। বাঘকে বিষ খাইয়ে মেরে তার চামড়া বিদেশে চালান দেয়। অবৈধভাবে হরিণ মেরে তার চামড়া, শিং পাচার করে। কচ্ছপ প্রভৃতি প্রাণী হত্যা করে। এতকিছু করার পরও দীর্ঘকাল ধরে সুন্দরবন তার নিজস্ব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার ক্ষতিপূরণ পুষিয়ে নেয়। কিন্তু গত দুই দশকে এমন কিছু কর্মকাণ্ড খোদ সরকারিভাবে সংঘটিত হচ্ছে যার ফলে সত্যি সত্যি সুন্দরবন বিনাশের অবস্থা তৈরি হচ্ছে।

এর মধ্যে সবচাইতে বিপজ্জনক সুন্দরবনের সন্নিকটে বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার সাপমারী ও কৈগদ্যদাস কাঠী মৌজায় কয়লা ভিত্তিক রামপাল তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প। এর ফলে লোকালয়ের তো নানাবিধ সমস্যা দেখা দিবেই, সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতি হবে অতি ভয়াবহ। এর মধ্যেই নানা সমস্যা দেখা দিতে শুরু করেছে। এছাড়া সুন্দরবনের কাছাকাছি সিমেন্ট এলপিজিসহ আরো অনেকগুলি শিল্প কারখানা গড়ে তোলা হচ্ছে যা আন্তর্জাতিক বন আইনের পরিপন্থী।

১৮ শতকের শেষ দিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রথম কয়লা ব্যবহার শুরু হলেও বিশ্ববাসী ক্রমে কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্পের ফলে পরিবেশগত, স্বাস্থ্যগত, প্রতিবেশগত বহু ক্ষতির বিষয়ে সচেতন হয়েছে। এই পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কেন্দ্রগুলি হতে নির্গমিত বস্তু ও গ্যাস প্রভৃতির ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা মানবজাতি, অন্যান্য প্রাণীকুল, উদ্ভিদ জগত সর্বত্র মারাত্মক ক্ষতির কারণ হচ্ছে। তাই পরিবেশের উপর গুরুতর প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে। আলোচ্য প্রকল্প মারাত্মকভাবে ভূখণ্ডে, নদী ও জলাশয় এবং সুন্দরবনে গুরুতর বৈকল্য ঘটিয়ে চলবে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান কারণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড ছাড়াও পারদ, নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড, আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম, কোবাল্ট, তামা, ম্যাঙ্গানিজ, জিংক, রেডিও নিউ ক্লাইড (তেজস্ক্রিয় পদার্থ) প্রভৃতি প্রচুর পরিমাণে নির্গত হয় এই প্রকল্প থেকে যার ক্ষয়ক্ষতির ক্ষমতাও পরিমাণ সচেতন নাগরিক মাত্রই জানেন।

ক্যান্সার সৃষ্টিকারী পারদ শত কিলোমিটার দূরের মাছের উপরে এমন ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে যা মানুষ খেলে তার ক্যান্সার হতে পারে। আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠন ‘গ্রিন পিস’ এর মত হল, ‘স্নায়ুবিক গরল’ মার্কারির জন্য প্রতিবছর শত সহস্র শিশু মানসিক প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নেয়। ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ২৫ পাউন্ড মার্কারী নির্গমন করে। রেডিও নিউ ক্লাইড এক প্রকার অস্থির পরমাণু- যা পরিবেশে নির্গত হলে তেজস্ক্রিয় দূষণ ঘটে। এতে মানুষ বা পশু আক্রান্ত হলে বংশপরম্পরায় ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এদের সন্তান ধারণ ক্ষমতা লোপ পায়‌। তদুপরি কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্পে যেকোনো অব্যবস্থাপনার কারণে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

সবার মনে আছে নিশ্চয়ই, ২০১৩ সালের ২৯ শে জানুয়ারি সুন্দরবনের সন্নিকটে ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন একটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশ সরকার ভারতীয় একটি কোম্পানির সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার সাপমারী ও কৈগদ্যদাস কাঠী মৌজায় ১৮৩৪ একর জমি হুকুম দখল করে। কোন প্রকার নোটিশ না দিয়ে, সভা ও সম্মতির শর্ত পূরণ না করে সেখানকার ভূমিহীনসহ অধিবাসীদের উচ্ছেদ করা হয়। ভারত সরকারের একটি সংস্থা ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কোম্পানি এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড যৌথভাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ১৫% ভারত এবং ১৫% বাংলাদেশ বিনিয়োগ করবে। বাকি ৭০% ঋণ করা হবে যার পুরোটাই বাংলাদেশকে সুদে-আসলে পরিশোধ করতে হবে। উৎপাদিত বিদ্যুতের গ্রহীতা বাংলাদেশ। কি দামে বিদ্যুৎ দেওয়া হবে তা চুক্তিতে পরিষ্কারভাবে বলা নাই। তবে খোঁড়াভাবে চালু হবার পর তুলনামূলক বেশি দামই পড়ছে।  

এই প্রকল্প গুরুতর তিনটি সমস্যা নিয়েই যাত্রা শুরু করে। সেগুলি হল- ১) শুরু থেকেই এই প্রকল্প অনিয়ম আর অস্বচ্ছতায় ভরা। সরকার ভূমি আইন, মানবাধিকার আইন, প্রতিবেশ আইন লঙ্ঘন করে এ কাজের উদ্বোধন করেছে। ২) বিশ্ব ঐতিহ্য মহামূল্যবান সুন্দরবনের গুরুতর এবং অনিবার্য ক্ষতিসাধন জেনেও তা অগ্রাহ্য করা হয়েছে। ৩) চুক্তিটি ভারতপক্ষকে উল্লেখযোগ্য লাভবান করে, আর বাংলাদেশ শুধু আর্থিক দিক দিয়েই নয় পরন্তু পরিবেশ-প্রতিবেশসহ জনস্বাস্থ্য, ভূমি দূষণ, বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ, জল দূষণ সহ মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন।

এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে যেসব সমস্যা-সংকট ইতিমধ্যে দেখা দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে দেখা দিবে সেগুলি আমরা একে একে আলোচনা করছি:
       ১) এই প্রকল্প যে ১৮৩৪ একর জমি দখল করেছে সেখানে যথেষ্ট পরিমাণে ফসল ফলত। প্রচুর প্রাকৃতিক মাছের যোগান দিত ওই ভূখণ্ড এবং ওই সংলগ্ন ছোট ছোট খাল এবং জলাগুলি। সেসবই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

       ২) দরিদ্র বহু পরিবার গৃহহারা হয়ে এখন উদ্বাস্তু বা পথের ফকিরে পরিণত হয়েছেন এবং অনেকে অজানা পথে চলে গেছেন।
       ৩) এই বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রচুর ভূগর্ভস্থ মিষ্টি জলের প্রয়োজন। গভীর নলকূপ দিয়ে কোটি কোটি গ্যালন জল উত্তোলন করলে ভবিষ্যতে ভূগর্ভের জলশূন্যতা দেখা দিবে এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মরুপক্রিয়া দেখা দিবে।
       ৪) বর্জ্য নিষ্কাশনের কারণে স্থানীয় নদ-নদী, খাল-বিল প্রভৃতির জল-মাটির দূষণ ঘটতে থাকবে। ফলে ফসল এবং মাছ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
       ৫) বহু ধরনের রাসায়নিক পদার্থের উদগীরণ ঘটবে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে প্রকৃতির নানা ক্ষেত্রে বিষক্রিয়া ঘটবে যার ফলে মানবদেহে বহু রোগ সৃষ্টি হবে। ফুসফুসের অসুখ, স্নায়ুদৈর্বল্য, ক্যান্সার, চর্মরোগ, হার্টের দুর্বলতা প্রভৃতি দেখা দিবে। নারীদের সন্তান ধারণ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যাবে কিংবা মৃত বা বিকলাঙ্গ সন্তান জন্ম দিবে।
       ৬) আর্থিক অসম এই চুক্তি বাংলাদেশকে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত করবে। উপরন্তু প্রয়োজনের সময় পরমুখাপেক্ষী থাকাটা দেশের জন্য অনেক সমস্যা তৈরি করবে।
       ৭) প্রমাণ করা গেছে যে, আর্থিকভাবেও এই প্রকল্প অত্যন্ত অলাভজনক। বাংলাদেশকে বিনিয়োগ ও ঋণ পরিশোধ করতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হবে এবং যে পরিমাণে জমি ব্যবহার হবে তার থেকে অনেক কম অর্থ এবং জমি দিয়ে আরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।
       ৮) সর্বোপরি বিশ্ব ঐতিহ্য ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন ধ্বংসের মুখে পড়ছে। ভবিষ্যতে আরো বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। সুন্দরবনের বৃক্ষলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। বিপুল সংখ্যক মানুষ যারা সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল তাদের জীবনযাত্রা দুরূহ হয়ে পড়বে, আর সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষুদ্র ভূখণ্ডের এই বাংলাদেশটির সর্বত্রই এর নানারূপ বিরূপ প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হবে, নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়বে।

ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন নাম দিয়ে সরকার যে প্রকল্প করছে দেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিত্ব এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংস্থাসমূহ তাকে প্রকৃত উন্নয়ন বলে মনে করছে না। বরং সার্বিক বিশ্লেষণে এইসব ক্রিয়াকর্ম দেশের ক্ষতির কারণ বলে প্রমাণিত হয়েছে। এই বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরোধিতা করে দেশজুড়ে নানা কর্মসূচি পালন করেছে দেশের মানুষ। কিন্তু গত সরকার একগুয়ে অযৌক্তিক অবস্থান নিয়ে জোরজবরদস্তি করে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও এই প্রকল্প অব্যাহত রেখেছে। দেশের জন্য এটা খুবই বড় দুর্ভাবনার বিষয়।

রণজিৎ চট্টোপাধ্যায়: লেখক ও রাজনীতিবিদ। বাগেরহাট।

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •