মৌলবাদের সংঘর্ষ: ক্রুসেড, জিহাদ এবং আধুনিকতা-১২
পাকিস্তানের অনস্বীকার্য গল্প
তারিক আলি
২০০২ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসী তৎপরতা অনেক বিস্তৃত এবং ইসলামি মৌলবাদ বিশ্বজুড়ে আলোচিত বিতর্কিত বিষয় তখন তারিক আলির বই The Clash of Fundamentalisms: Crusades, Jihads and Modernity প্রকাশিত হয়। তারিকের এই বই অনুসন্ধান করেছে ধর্মীয় বিভিন্ন মত-পথ, বিভিন্ন ধরনের মৌলবাদী শক্তি, তার ইতিহাস ও রাজনীতি এবং সর্বোপরি তার ভাষায় ‘সবচাইতে বড় মৌলবাদী শক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ’-এর সঙ্গে এর সম্পর্ক। সর্বজনকথার জন্য এই বই (প্রকাশক ভার্সো, 2003)-এর ধারাবাহিক অনুবাদ করছেন ফাতেমা বেগম। এবারে দ্বাদশ পর্ব। এখানে আলোচিত হয়েছে পাকিস্তানের কাহিনী।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের তত্ত্বাবধানে গর্ভধারণ, এবং শেষ মুহূর্তে, ১৯৪৭ সালের আগস্টে তাড়াহুড়ো করে ডাক্তারদের সিজারিয়ানের মাধ্যমে অকালপ্রসবে পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্মলাভ করে। জন্মকালে ব্যাপক রক্তপাত ঘটে। প্রথম বছরে, নতুন রাষ্ট্রটি একটি অঙ্গ (কাশ্মীর) হারায়। এবং তারপর সে পিতৃহারা (মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ) হয়। এরপর, আরও কঠোর এবং আরও নির্মম তার যমজ ইসরায়েলকে অনুসরণ করে একটি স্থায়ী নার্সের প্রস্তাব গ্রহণ করে। প্রাণ রক্ষার জন্য পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের স্থায়ী তত্ত্বাবধানে শীতল যুদ্ধের রোগী হয়ে থাকা একমাত্র উপায় হিসেবে বিবেচ্য হয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ক্ষমতা খর্ব হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের উত্তরাধিকারিত্ব লাভ করে।
এই উত্তরণের অল্প সময়ের মধ্যে দেশের সবচেয়ে প্রতিভাধর উর্দু ছোটগল্প লেখক, সাদাত হাসান মান্টো, ১৯৫৫ সালের জানুয়ারিতে তেতাল্লিশ বছর বয়সে লিভার সিরোসিসে মারা যান। জীবনের শেষ বছরে ‘জন বুল টু আঙ্কেল স্যাম’ পরিবর্তন করে নয়টি ব্যঙ্গাত্মক খোলা চিঠি ‘লেটারস টু আঙ্কেল স্যাম’ প্রেরণ করেন। ইসলামাবাদে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের কয়েক সপ্তাহ আগে সাংবাদিক খালিদ হাসান খোলা চিঠিগুলোর প্রথম ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন। ১৯৫৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি লেখা ‘ফোর্থ লেটার’-এ কাকতালীয় ব্যাপার লক্ষণীয়:
প্রিয় চাচা: কিছু দিন আগে আমি একবার আপনাকে লিখেছিলাম। আজ আবার লিখছি। পাকিস্তানকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্তে আপনি যত অগ্রসর হচ্ছেন, আপনার প্রতি আমার প্রশংসা এবং শ্রদ্ধা ততই বাড়ছে। প্রতিদিন আপনাকে একটি চিঠি লিখতে ইচ্ছা করে। ভারত যা-ই হট্টগোল করুক-না কেন, আপনাকে অবশ্যই পাকিস্তানের সঙ্গে একটি সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে। কারণ, আপনি তো বিশ্বের বৃহত্তম ইসলামিক রাষ্ট্রে স্থিতিশীলতা স্থাপনে যারপরনাই উদ্বিগ্ন। এবং আমাদের মোল্লারা রাশিয়ান কমিউনিজমের সেরা প্রতিষেধক। তাই সামরিক সাহায্যের প্রবাহ শুরু হলে এই মোল্লাদেরকে অস্ত্রায়ন করতে হবে। তাদের জন্য আমেরিকার তৈরি তসবিহ এবং জায়নামাজেরও প্রয়োজন হবে। আর ভুলে যাবেন না যে প্রকৃতির আহ্বানে সাড়া দেওয়ার পর তাদের ছোট পাথরেরও প্রয়োজন হয় … আমি মনে করি মোল্লাদের হাতে অস্ত্র দেওয়া এই সামরিক সাহায্যের একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। আপনার গতিবিধি সম্পর্কে সম্যক অবগত আমি একজন পাকিস্তানি ভাতিজা। আপনার রাজনৈতিক খেলার কৌশলের কারণে সবাই এখন চৌকষ হয়ে উঠতে পারে।
এই মোল্লাদের দল আমেরিকান কায়দায় সশস্ত্র হলে, কমিউনিজম ও সমাজতন্ত্রের বাহক সোভিয়েত ইউনিয়নকে আমাদের দেশ থেকে তাদের তল্পিতল্পা গুটাতে হবে। আমি মোল্লাদেরকে কল্পনা করতে পারি। তাদের চুল আমেরিকান কাঁচি দিয়ে ছাঁটা এবং তাদের পায়জামা আমেরিকান মেশিন দ্বারা সেলাই করা যা শরীয়তের সঙ্গে কঠোরভাবে সংগতিপূর্ণ। তারা তাদের [প্রস্রাবের পর] ফোঁটার জন্য যে পাথরগুলো ব্যবহার করবে তা-ও আমেরিকান হবে, মানুষের হাত দ্বারা স্পর্শ করা যাবে না এবং তাদের জায়নামাজগুলোও হবে আমেরিকান। আপনার প্রতি আনুগত্যের কারণে সবাই তখন আপনার অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের অনুসারী হয়ে যাবে। …
১৯৫১ সাল থেকে ১৯৮৯-৯০ সালে স্নায়ুযুদ্ধের শেষ পর্যন্ত, পাকিস্তানের অভিজাতদের দায়িত্বে কেবল কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের অধিকার দেওয়া হয়েছিল। এর ব্যতিক্রম ঘটল যখন দেশটির প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো তার ক্ষমতাসীন (১৯৭১-৭) সময়কালে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৯৭৬ সালের আগস্টে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার লাহোর সফরে এলেন। তিনি ভুট্টোকে সমস্ত পারমাণবিক পরিকল্পনা পরিত্যাগ করার শর্তে পাকিস্তানকে আর্থিক ও রাজনৈতিক সমর্থনের প্রস্তাব দেন। ভুট্টো, কিসিঞ্জারকে উদ্দেশ্য করে একজন তৃতীয় ব্যক্তিকে বলেন: ‘এটি নির্লজ্জভাবে মূলা ঝুলিয়ে রাখার ব্যবস্থা।’ প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত নীতির বিষয়ে মার্কিন শাসন মেনে নিতে অস্বীকার করলেন। তার জবাবে, কিসিঞ্জার বলেছিলেন: ‘তাহলে আমরা আপনার সরকারকে অস্থিতিশীল করে আপনার পরিণতিরএকটি ভয়ংকর উদাহরণ তৈরি করতে পারি।’ কিসিঞ্জার তার হুমকি কার্যকর করেছিলেন। হুমকির ছয় মাসের মধ্যে, ভুট্টো সরকার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। তারপর একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তার সরকারকে অপসারণ করা হয়। হত্যা, কারচুপির অভিযোগে ভুট্টোকে বিচারের সম্মুখীন হতে হয়। এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের দ্বারা তাকে ৪-৩ রায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। বিচারকরা আইনের পূর্ববর্তী নজির ব্যবহারের পরিবর্তে সামরিক আইন ব্যবহার করেন। এর দুই বছর পর পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এটি ছিল পাকিস্তানি গণতন্ত্রের দ্বিতীয় মৃত্যু। প্রথম মৃত্যু হয়েছিল ১৯৭১ সালে। গণতন্ত্রের তৃতীয় মৃত্যু ঘটে ১৯৯৯ সালে। যাইহোক, সেই ঘটনাগুলো পুনর্বিবেচনা করার আগে একটি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
কিসিঞ্জার বলেছিলেন: ‘তাহলে আমরা আপনার সরকারকে অস্থিতিশীল করে আপনার পরিণতিরএকটি ভয়ংকর উদাহরণ তৈরি করতে পারি।’ কিসিঞ্জার তার হুমকি কার্যকর করেছিলেন। হুমকির ছয় মাসের মধ্যে, ভুট্টো সরকার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। তারপর একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তার সরকারকে অপসারণ করা হয়। হত্যা, কারচুপির অভিযোগে ভুট্টোকে বিচারের সম্মুখীন হতে হয়।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ব্রিটিশরা শহুরে জনসংখ্যার মেজাজের পরিবর্তন লক্ষ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের উদার ধারণা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। সংবিধানবাদী, ধর্মনিরপেক্ষ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস বেশিরভাগ শিক্ষিত ভারতীয়কে আকৃষ্ট করেছিল। অস্ট্রেলিয়ান ও কানাডিয়ান মডেলে ভারতে স্বায়ত্তশাসনের জন্য কংগ্রেস দাবি জানায়। স্বায়ত্তশাসনের দাবি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করা হলেও কিছু সংস্কার মেনে নেওয়া হয় যা ভারতের শাসকদের চিন্তিত করে তোলে। এত যত্ন সহকারে যে জোটগুলো তারা তৈরি করেছিল তা একদিন ভেঙে যেতে পারে ভেবে সাম্রাজ্যের অধিনায়কেরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়।
এটা প্রায়ই ভুলে যাওয়া হয় যে ভারতে প্রকৃত ব্রিটিশ উপস্থিতি কখনোই মোট জনসংখ্যার ০.৫ শতাংশের বেশি ছিল না: ১৮০৫ সালে তাদের সংখ্যা ছিল ৩১,০০০ জন, ১৯১১ সালে ছিল ১৬৪,০০০ জন, এবং ১৯৩১ সালে সংখ্যা সামান্য বেড়ে ১৬৮,০০ জনে পৌঁছেছিল। কিন্তু কোটি কোটি ভারতীয়র তুলনায় অতি নগণ্য সেই সংখ্যায় বেশিরভাগই ছিল সৈন্য। এই ক্ষুদ্র লাল-নীল উপস্থিতি টিকিয়ে রাখার জন্য স্থানীয় জোট নীতি আবশ্যক ছিল। এই স্থানীয় মিত্র জোট ছাড়া ব্রিটিশ রাজত্ব ১৫০ বছর স্থায়ী হতে পারত না, বা ১৮৫৭ সালে বিদ্রোহের পতাকা উত্থাপনকারী দেশীয় শাসকদের জোটকে পরাজিত করতে পারত না।
ব্রিটিশ রাজত্বের স্বাভাবিক সহযোগী ছিল উপজাতীয় প্রধান, শাসক, ও পুরোনো মুঘল অভিজাততন্ত্রের অবশিষ্টাংশ। ব্রিটিশ শাসন নিজেদের স্বার্থে প্রতিকূল প্রভাব না পড়ার শর্তে অনেক রাজাকে তাদের প্রজাদের অপশাসন করার অবাধ অধিকার প্রদান করেছিল। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের স্তম্ভ হিসেবে কাজ করতে পারার জন্য ব্রিটিশ ভারত উপজাতীয় প্রধানদের ভূমিসম্পন্ন ভদ্র ব্যক্তিতে রূপান্তরিত করেছিল। গম, আখ, তুলা এবং প্রধান খাদ্য চালের অবিরাম উৎপাদন নিশ্চিত করতে এবং ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ভারতীয় কৃষকদের নিয়োগের সুবিধার্থে কৃষকদের ওপর তাদের আধিপত্য অত্যাবশ্যক ছিল।
কংগ্রেসের গঠন এতদিন তাদের জন্য শুধু বিরক্তিকর ছিল। কিন্তু সাম্রাজ্যের অধিকতর দূরদর্শী সেবকেরা এর অন্তর্নিহিত বিপদ অনুভব করতে শুরু করেন। অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি এড়াতে কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আবশ্যকীয়তা অনুভূত হয়: একটি নতুন রাজনৈতিক হাতিয়ার আবশ্যক যা কংগ্রেসের একক রাজনৈতিক আধিপত্যকে খর্ব করতে পারে। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তার অনুগত, বিচ্ছিন্নতাবাদী একটি মুসলিম সংগঠন গঠনের বিষয়ে বিশিষ্ট মুসলিম ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এ ব্যাপারে ধনী মুসলমান ইসমাইলি সম্প্রদায়ের একজন স্থূলকায় নিষ্কর্মা প্রধান আগা খান ভাইসরয়ের প্রধান মাধ্যম হতে পেরে আনন্দিত হন। আগা খানকে উপাসনার অংশ বাদ দিলে এই সম্প্রদায় তুলনামূলকভাবে আধুনিক ছিল। নিছক লোভ তার স্থূলতার কারণ ছিল। প্রতিবছর, তার জন্মদিনে, একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে ওজনের স্কেলের ওপর একটি আরামদায়ক চেয়ারে আগা খানকে বসানো হতো। ইসমাইলিদের প্রতি আনুগত্য প্রমাণ করার জন্য ভক্তরা হীরা, সোনা ও রুপা দান করত। ওজনের স্কেলটিতে চেয়ারের ওজনের তুলনায় সোনা ও রৌপ্যের বারগুলো মাপা হতো। ওজন করার পর এগুলো তাকে উপহার দেওয়া হতো। অনুদান সংগ্রহের এই প্রক্রিয়ায় খুব কমই স্বচ্ছতা থাকত।
একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে ওজনের স্কেলের ওপর একটি আরামদায়ক চেয়ারে আগা খানকে বসানো হতো। ইসমাইলিদের প্রতি আনুগত্য প্রমাণ করার জন্য ভক্তরা হীরা, সোনা ও রুপা দান করত। ওজনের স্কেলটিতে চেয়ারের ওজনের তুলনায় সোনা ও রৌপ্যের বারগুলো মাপা হতো। ওজন করার পর এগুলো তাকে উপহার দেওয়া হতো।
ভাইসরয়ের পক্ষ থেকে, আগা খান ১৯০৬ সালে কিছু অবসন্ন, দাসত্বপূর্ণ এবং অলস মধ্যপন্থা ব্যক্তির সমন্বয়ে মুসলিম লীগ তৈরি করেন। মেরুদণ্ডহীনতায় এরা প্রত্যেকে অসামান্য ছিলেন। দলটির প্রতিনিধিদল নিজস্ব শ্রেণিকে নিখুঁত হিসেবে দাবি করেছিল: ‘আমরা অভিজাত, জায়গিরদার, তালুকদার, জমিদার, আইনজীবী এবং বণিকরা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে মহামান্য রাজা সম্রাটের সেবক।’ নতুন সংগঠনটি তার প্রধান লক্ষ্য লুকানোর কোনো চেষ্টা করেনি: ‘ভারতের মুসলমানদের মধ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতি আনুগত্যের অনুভূতি জাগিয়ে তোলা।’ এটি ইংরেজ কমিশনার, ডেপুটি কমিশনার, ম্যাজিস্ট্রেট ইত্যাদির সঙ্গে একটি স্থায়ী জোট বানানোর লক্ষ্য অর্জন করেছিল।
পরবর্তী দশকগুলোতে, সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতীয়তাবাদী মুসলমান মুসলিম লীগকে তিরস্কার করে এবং তারা কংগ্রেসের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়। এই পরিবর্তনে উল্লেখযোগ্য নাম হলো কাশ্মীরি শেখ আবদুল্লাহ এবং একজন মেধাবী মুসলিম আইনজীবী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। একদিন তিনি পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা হবেন সেই সময় জিন্নাহর কাছে তা অকল্পনীয় ছিল। বিশের দশকে তিনি ‘হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত’ হিসেবে সমাদৃত হন। তিরিশের দশকে তিনি কংগ্রেস ছেড়ে মুসলিম লীগে যোগ দেন। চল্লিশের দশকে তিনি ‘দ্বিজাতি’ তত্ত্ব উত্থাপন করেন এবং মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্র দাবি করেন। একত্রিত একটি মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জিন্নাহ সফল হন এবং এই সফলতার এক বছর পর তিনি মারা যান।

কেন তিনি এসব করলেন? তিনি ছিলেন উদার সংবিধানবাদী, এবং চালচলন, পোশাক ও রাজনীতিতে একজন রুচিবাগীশ ব্যক্তি। দাম্ভিক অজ্ঞেয়বাদী জিন্নাহ সমস্ত ধর্মীয় মৌলবাদকে অবজ্ঞা করতেন। কংগ্রেসের গণ-আইন অমান্য এবং তাদের রাস্তার রাজনীতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি অভিজাত সমাবেশে যুক্তি উপস্থাপনকে অগ্রাধিকার দিলেন। কংগ্রেস নেতৃত্ব উপলব্ধি করেছিলেন– কথা যতই যুক্তিযুক্ত হোক, এবং যুক্তি যতই অখণ্ডনীয় হোক, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে প্রভাবিত করার জন্য তা উপযুক্ত অস্ত্র নয়। তাই তারা গণ-বিক্ষোভ প্রদর্শন এবং তাকে জাতীয় স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপান্তরিত করার প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দেন। সেই লক্ষ্যে কৃষকদের একত্রিত করা হচ্ছিল। হিন্দু ধর্মের নির্লজ্জ ব্যবহার করে গ্রামাঞ্চলকে উদ্দীপ্ত করার ক্ষেত্রে গান্ধীর সক্রিয়তা জিন্নাহকে চিন্তিত করে তুলল। তিনি অনুভব করলেন, ‘হিন্দু উপাদান’ তার মতো লোকদের অভিভূত করবে এবং শেষ পর্যন্ত তারা তার থেকে দূরে সরে যাবে। তাই তিনি মুসলিম লীগে যোগদান করেন। সংযুক্ত প্রদেশের সহযোগী জমিদার এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কবল থেকে সরিয়ে রূপান্তরের একটি অংশ হিসেবে সংগঠনটিকে একই কাজ করার জন্য অন্যান্য মুসলিম পেশাজীবীর কাছে আবেদন করেন। প্রথম দিকে অনেক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অবশেষে জিন্নাহর উদ্যোগ সফল হয়েছিল। মুসলিম লীগ নতুন নিয়োগে এগিয়ে গেল। কিন্তু অতীতকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হলো না। শোচনীয় আত্মসমর্পণের চেয়ে ব্রিটিশদের সঙ্গে ভদ্রভাবে সমঝোতা করাকে তারা অগ্রাধিকার দিয়েছিল।
মূলত মধ্যবিত্ত মুসলিম পেশাজীবী এবং ব্যবসায়ী পরিচালিত একটি সংগ্রাম থেকে পাকিস্তানের জন্মলাভ ঘটে। ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে যাওয়ার পর এতিম হয়ে যাবে–এমন একটি আশঙ্কা তাদের মধ্যে কাজ করছিল। রাজনীতি ও অর্থনীতিতে হিন্দুদের প্রাধান্য থাকলে এবং ক্ষমতা ও অর্থে প্রবেশাধিকার না থাকলে, ভারতীয় মুসলমানদের অবস্থা শোচনীয় হবে। তাই সাম্রাজ্যিক শক্তির কাছ থেকে সর্বাধিক ছাড় পেতে মুসলিম লীগ প্রাথমিকভাবে একটি দরকষাকষি হিসেবে পাকিস্তানের দাবিটি তৈরি করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কংগ্রেস পার্টির অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং ব্রিটেনের তাড়াহুড়ো করে চলে যাওয়ার কারণে পাকিস্তান অর্জিত হয়েছিল। যখন গান্ধী ও নেহেরু ব্রিটিশদের ‘ভারত ছাড়ো’ দাবিতে ‘আইন অমান্য’ আন্দোলন শুরু করেছিলেন, তখন মুসলিম লীগ ব্রিটিশদের যুদ্ধে সক্রিয় সমর্থন করছিল। যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ রাজের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সহযোগিতার জন্য সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে মুসলিম লীগ পাকিস্তান অর্জন করে। ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত, জিন্নাহ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের নীতি মেনে নিয়ে ভারতের ঐক্য রক্ষাকারী সাংবিধানিক বন্দোবস্তের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। গান্ধীও এই চুক্তির পক্ষে ছিলেন এবং এমনকি, জিন্নাহকে অখণ্ড ভারতের প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রস্তাব দিতেও তিনি প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্ব তা বাতিল করে দেয়।
১৯৪৬ সাল পর্যন্ত, জিন্নাহ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের নীতি মেনে নিয়ে ভারতের ঐক্য রক্ষাকারী সাংবিধানিক বন্দোবস্তের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। গান্ধীও এই চুক্তির পক্ষে ছিলেন এবং এমনকি, জিন্নাহকে অখণ্ড ভারতের প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রস্তাব দিতেও তিনি প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্ব তা বাতিল করে দেয়।
জিন্নাহর ধারণায় নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান একটি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘ছোট ভারত’ ছিল। অতীতের দিকে তাকালে তা সম্পূর্ণরূপে নির্বুদ্ধিতা মনে হবে। তবে এটি সত্য, উপমহাদেশটিকে খোদাই করা রেখা দিয়ে ভাগ করলে উভয় পক্ষ ধর্মীয় জাতিনিধনের দিকে পরিচালিত হবে তা জিন্নাহর ধারণাতীত ছিল। তার দৃষ্টিভঙ্গি ত্রুটিপূর্ণ হলেও তা কখনোই ধর্মতান্ত্রিক ছিল না। এবং এই কারণেই ভারতে ইসলামি মৌলবাদের শক্তি পাকিস্তান রাষ্ট্রের ধারণার প্রতি বিদ্বেষী ছিল। কারো কারো জন্য, একটি পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র তাদের বিশ্বাসের অন্তর্নিহিত বিশ্বজনীনতার সঙ্গে একটি লঙ্ঘন ছিল। গোঁড়া দৃষ্টিতে ‘মুসলিম’ জাতীয়তাবাদ ছিল একটি নিষিদ্ধ শংকর। অন্যদের জন্য, ভারত থেকে তৈরি একটি ইসলামি রাষ্ট্র গ্রহণযোগ্য ছিল, কিন্তু মুসলিম লীগকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী দল হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল। এবং তাই লীগের পাকিস্তান সংস্করণটি তাদের জন্য অসহনীয় ছিল।১
মাওলানা আবুল আলা মওদুদী (১৯০৩-৭৯), জামায়াত-ই-ইসলামী-র প্রতিষ্ঠাতা, জিন্নাহ এবং মুসলিম লীগ উভয়কেই ঘৃণা করতেন। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ/অভ্যুত্থানে পরাজয় ঘটার পর মুঘল দরবার আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে বার্মায় নির্বাসিত করা হয়। এই পরাজয়ের পর তার পরিবার আধ্যাত্মিক এবং বস্তুগতভাবে বঞ্চিত অনুভব করেন। আইনজীবী এবং আধুনিকতাবাদী, মওদুদীর পিতা, জাগতিক ব্যাপারে উদাসীন হয়ে একজন সুফি তপস্বী হয়ে যান। তিনি তার সন্তানদের পশ্চিমা সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার জন্য ছেলের শিক্ষা উর্দু ও আরবি ভাষায় সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। ইসলামের সম্পূর্ণরূপে গোঁড়া দেওবন্দি ব্যাখ্যাকে মওদুদী আত্মস্থ করেছিলেন, আধুনিকতাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং কোরানিক বার্তার ওপর জোর দিয়েছিলেন। কিন্তু এর পরেই তিনি ইংরেজি ভাষা এবং পশ্চিমা দার্শনিকদের চিন্তাধারা অধ্যয়ন করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথম দিকে, জিন্নাহর মতো, তিনি কংগ্রেসকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু ওসমানীয় খিলাফত ভেঙে যাওয়ার পর একুশ বছর বয়সী মওদুদী এই পরাজয় এবং ভারতে এর প্রভাবের চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন।
দেওবন্দি ব্যাখ্যাকে মওদুদী আত্মস্থ করেছিলেন, আধুনিকতাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং কোরানিক বার্তার ওপর জোর দিয়েছিলেন। কিন্তু এর পরেই তিনি ইংরেজি ভাষা এবং পশ্চিমা দার্শনিকদের চিন্তাধারা অধ্যয়ন করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথম দিকে, জিন্নাহর মতো, তিনি কংগ্রেসকে সমর্থন করেছিলেন।
এমনকি মুঘল সাম্রাজ্যের পরাজয় মেনে নেওয়া ভারতীয় মুসলমানরাও প্রায়ই ইস্তাম্বুলকে ভরসা করতেন। তাই ইস্তাম্বুলের পতনে তারা দিশাহারা বোধ করলেন। কবি দার্শনিক মুহাম্মদ ইকবালের (১৮৭৭-১৯৩৮) মতো পুরুষেরাও একই অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়েছিলেন। লাহোরের অভিজাত গভর্নমেন্ট কলেজের একজন স্নাতক হিসেবে, তিনি প্রতিভাবান এবং উদারমনা প্রাচ্যবিদ পণ্ডিত টমাস আর্নল্ডের অধীন দর্শন অধ্যয়ন করেন। টমাসই তরুণ কবিকে ইউরোপ সফরে, এবং তার চিন্তাকে আরও বিকশিত করতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। ইকবাল তার পরামর্শ গ্রহণ করেন এবং তিন বছর (১৯০৫-৮) হাইডেলবার্গে অতিবাহিত করেন। সেখানে দর্শনের প্রতি তার আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পায় এবং তার কবিতা সেই দর্শনে প্রভাবিত হতে থাকে।
সাধারণত বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ তার কাব্যিক গঠনের বাছাইকে প্রভাবিত করেছিল। তার ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী অবস্থানের পর্যায়ে, ভারতের জন্য তিনি একটি শক্তিশালী এবং উদ্দীপক স্তোত্র হিম ফর ইন্ডিয়া লিখেছিলেন। নেহেরুর প্রিয় সেই স্তোত্র এখনো ভারতে ধর্মনিরপেক্ষ মুসলিম নেতারা তাদের আনুগত্য প্রমাণ করার জন্য আবৃত্তি করেন। ১৯৬০ সালে চীন-ভারত সংঘর্ষের সময় অল-ইন্ডিয়া রেডিওতে স্তোত্রটি বিরামহীন পুনরাবৃত্তি করা হতো। কেবল মুসলমানদের জন্য রচিত স্তবটি ইকবাল প্রকাশ্যে প্রত্যাহার করলেও তীব্রতা এবং সত্যতা এর টিকে থাকা নিশ্চিত করেছিল। নিউ টেম্পল, আরেকটি কবিতা একই সময়ে লেখা হয়েছিল:
হে ব্রাহ্মণ, আমি সত্য বলব, তবে তা গ্রহণ করবে
আক্রমণ হিসেবে নয়:
তোমার মন্দিরের মূর্তিগুলো ক্ষয়ে গেছে।
অবয়বগুলো তোমাকে দ্রুত সহ্য করতে শিখিয়েছে
তোমার নিজের মানুষদের অমঙ্গল, এবং ঈশ্বর মোল্লাকে শিখিয়েছেন
বিবাদের উপায়
আমার হৃদয় অসুস্থ হয়ে গেল: আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম
মন্দির এবং কাবা উভয় থেকেই,
মোল্লাদের খুতবা থেকে এবং
তোমার রূপকথা থেকে, হে ব্রাহ্মণ।
তোমার কাছে পাথরের মূর্তিগুলো ঐশ্বরিক–
আমার জন্য, আমার দেশের প্রতিটি ধূলিকণা
একটি দেবতা … এসো, এই দেশে নতুন মন্দির গড়ি।
ইউরোপ থেকে ফেরার পরপরই তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অবসান দেখে তিনি আল্লাহকে উদ্দেশ্য করে তার বিখ্যাত অভিযোগপত্র লিখেছিলেন। যাদেরকে সম্বোধন করে লেখা হয়েছিল তাদের নজরে কবিতাটি দাম্ভিকতা, আত্ম-করুণা এবং হতাশায় ভরা ছিল। তার লেখায় প্রাচীন ইসলামের বিজয়কে উদ্যাপন, এবং এর অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল। মুসলমানরা একাই একেশ্বরবাদকে রক্ষা করেছিল এবং শুধু তরবারির ছায়াতলে তারা আল্লাহর বাণীকে সব পরিচিত মহাদেশে পৌঁছেছিল। তাহলে কেন আল্লাহ তাদের এত নিষ্ঠুরভাবে পরিত্যাগ করলেন?
‘তুমি প্রশংসা বাক্যে অভ্যস্ত; এখন প্রতিবাদের মন্তব্যও শোনো।’
যদিও সেলজুকদের সাম্রাজ্য ছিল,
তুরানীয়দের নিজেদের কর্তৃত্ব ছিল,
যদিও চীনারা চীনে শাসন করেছিল,
সাসানীয়রা ইরানে। যদিও বিস্তৃত, ফলপ্রসূ একর জুড়ে গ্রিকদের
বসবাস ছিল তাদের সময়ে
এবং ইহুদিরা তাদের একহস্তপরিমিত মাপ দখল করেছিল, এবং
খ্রিষ্টানরা তাদের সীমার মালিক ছিল, কারা তোমার যুদ্ধের তলোয়ার তুলেছিল
তোমার নামের সবচেয়ে পবিত্র কারণে
বা যারা বিনষ্ট পৃথিবীকে শুদ্ধ করার প্রচেষ্টা করেছিল
তোমার সবচেয়ে পবিত্র আইন দিয়ে?
সেটা আমরা এবং আমরা একাই মিছিলে
সৈন্যদের নিয়েছি যুদ্ধে
এখন জমির ওপর, এখন
সমুদ্রে যুদ্ধ করে,
ইউরোপে বিজয়ীদের প্রার্থনার আহ্বান
গির্জায় আবৃত্তি করতে। আফ্রিকার বর্জ্যের মাধ্যমে তলব করা
পুরুষকে তোমার পূজা করার জন্য। দারুণসব জমকালো জাঁকজমক
সম্রাটদের আমরা কেউই পাত্তা দিইনি; আমাদের জ্বলন্ত তরবারির ছায়ায়
আমরা চিৎকার করে উঠেছি ‘আল্লাহ এক’।
আমাদের বলুন, এবং সত্যিই বলুন – কারা
খায়বারের গেট উপড়ে ফেলেছিল? বা কারা উৎখাত করেছে সেই শহরকে যেখানে মহান
সিজার দম্ভের সঙ্গে রাজত্ব করছিলেন?
কারা ধ্বংস করেছে দেবতাদের যারা অন্যদের
হাতের পরিশ্রমে নির্মিত,
কারা অবিশ্বাসীদের শ্রেণিবদ্ধ বাহিনীকে
দূরে সরিয়ে দিয়েছে?
কারা নিভিয়েছিল ইরানের পূজাবেদির
সেই পবিত্র শিখা।
কারা পুনরুজ্জীবিত করেছে ম্লান স্মৃতি
ইয়াজদানের অমর নামের?
কবিতাটি ভারতীয় সাধারণ মুসলমানদের আকৃষ্ট করলেও ধর্মগুরুরা তাতে ধর্মত্যাগের চিহ্ন দেখতে পেয়েছিলেন। আওয়াজ উঠল: ইকবাল কাফের হয়ে গেছে। ইকবাল ধর্মের ক্ষয়িষ্ণুতায় হতাশাগ্রস্ত সম্প্রদায়কে কণ্ঠ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কবিকে এখন একটি নতুন কবিতা লিখতে হলো। অভিযোগের উত্তর যেখানে আল্লাহর জবাব প্রতিটি সন্দেহকে ধ্বংস করে। মুসলমানরা তাদের নিজেদের দোষে নিঃস্ব বোধ করে। পার্থিব সুখের প্রতি অতি আসক্তির কারণে তারা নবীর শিক্ষাকে পরিত্যাগ করেছিল। কিন্তু ইকবালের এই পর্ব বেশিদিন স্থায়ী হলো না। ইকবালের ক্লান্তিহীন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা চলতে থাকে।
কবিতাটি ভারতীয় সাধারণ মুসলমানদের আকৃষ্ট করলেও ধর্মগুরুরা তাতে ধর্মত্যাগের চিহ্ন দেখতে পেয়েছিলেন। আওয়াজ উঠল: ইকবাল কাফের হয়ে গেছে। ইকবাল ধর্মের ক্ষয়িষ্ণুতায় হতাশাগ্রস্ত সম্প্রদায়কে কণ্ঠ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কবিকে এখন একটি নতুন কবিতা লিখতে হলো।
সামাজিক-বিপ্লবের সময়ে তিনি লেনিন এবং আল্লাহর মধ্যে একটি কাল্পনিক বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন। বৈঠকে তারা একজন আরেকজনকে চমকিত করছিলেন। আল্লাহ খুব নিবিড়ভাবে লেনিনের থেকে পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তারকারী শ্রেণিযুদ্ধের ব্যাপার শুনে প্রভাবিত হলেন। আজ অবধি দক্ষিণ এশীয় সমাজতন্ত্রী এবং কমিউনিস্টদের উদ্ধৃতিতে উল্লিখিত গড’স কমান্ডমেন্ট-এর এই লাইনগুলোতে আল্লাহ তার ফেরেশতা জিবরাইলকে আদেশ করেন:
ওঠো, জাগাও এই পৃথিবীর হতভাগাদের
অট্টালিকার ভিত্তিমূল নাড়াও, দেয়াল কাঁপাও
যেখানে ধনীরা ঘুমায়;
এবং সেইসব ভূমিতে যেখানে একজন কৃষক অনাহারে থাকে।
সেখানে যাও এবং গমের প্রতিটি আঁটি পুড়িয়ে দাও।২
ইসলামের সংকটের প্রতি ইকবালের প্রতিক্রিয়া তার কবিতা ও দর্শনে সুস্পষ্ট ছিল। অবিরত ধারণা প্রবাহের অকপট প্রকাশে তিনি ছিলেন অসাধারণ। দ্য রিকনস্ট্রাকশন অব রিলিজিয়াস থট ইন ইসলাম-এ তিনি পুরাতন ধর্মের আধুনিকীকরণের পক্ষে যুক্তি দেন। ইসলামি সংস্কৃতির এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র উপায় হিসেবে তার দ্বান্দ্বিক এবং সাংশ্লেষিক হয়ে ওঠা, এবং তার যৌবনের মতো সসীম বাস্তবতার দিকে মনোনিবেশ করা দরকার ছিল। ইকবাল আর জিন্নাহর দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। সরকারি পাকিস্তান সংস্কৃতি ইকবালকে রাষ্ট্রের আধা-ঐশ্বরিক মূর্তি বানিয়ে তার সমালোচনামূলক সারাংশকে ধ্বংস করে। কবি এবং রাষ্ট্র, উভয়ের জন্য তা দুঃখদায়ক ঘটনা ছিল।

ইকবাল ও জিন্নাহর আধুনিকতা অবিসংবাদিত ছিল না। ইসলামের অবক্ষয়ের ব্যাপারে মওদুদীও একমত ছিলেন। তার মতে, এর প্রতিকার খুব সহজ একটি ব্যাপার এবং ভারতীয় ইসলামের পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে এই সহজ প্রতিকার সম্ভব। তবে ১৯৪৯ সালে যখন জিন্নাহর মুসলিম লীগ লাহোরে পাকিস্তান প্রস্তাব পাস করে, তখন মওদুদী তার বিরোধিতা করেন। মুসলিম লীগের উসকানির একমাত্র সম্ভাব্য প্রতিশোধ হিসেবে ‘পাল্টা-লীগ’ জামায়াত-ই-ইসলামী (জেআই)-এর ভিত্তি স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেন। পাকিস্তানকে সত্যিকারের মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে প্রধান নেতৃত্বে একজন মওদুদীর প্রয়োজন, জিন্নাহ নয়। ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ প্রচারের জন্য তিনি জিন্নাহ এবং মুসলিম লীগকে ইসলামের অপব্যবহারকারী হিসেবে নিন্দা করেছিলেন।
মওদুদীর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর আরব ধর্ম প্রচারক ইবনে ওয়াহহাবের মতবাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য পাওয়া যায়। তাদের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে কোরআনের পবিত্রতা পরিত্যাগ ছিল ইসলামের পতনের মূল কারণ। রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগের একমাত্র ভিত্তি ছিল কোরআনের পবিত্র বার্তা এবং প্রথম যুগীয় বিধান। বলা হয়েছে, শতাব্দীর পর শতাব্দী, বিদেশি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধারণ এবং এর মৌলিক লক্ষ্য পরিত্যাগ করে ইসলাম একটি বিকৃত পাণ্ডুলিপিতে পরিণত হয়েছিল। এখানেই ইসলামের বিয়োগান্তক কারণ নিহিত। তাই এর সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী সংস্কার হওয়া প্রয়োজন। একটি ‘ইসলামি রাষ্ট্রের’ মাধ্যমে সংশোধনমূলক ব্যবস্থাই কেবল এই পতনের পথ পাল্টাতে পারে।
শুধু প্রচার ও সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে এমন রাষ্ট্র অর্জন করা সম্ভব নয়। এর জন্য একটি যথাযথ রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন। রাজকীয় রাজ্য হায়দরাবাদে থাকাকালে মওদুদী অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে গোপনীয় কমিউনিস্ট পার্টির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তিনি এর কর্মীদের উৎসর্গীকরণ এবং মার্কসবাদের কোনো বোঝাপড়া থেকে দূরে থাকা কৃষক ও শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করা এবং তাদের প্রভাবিত করার ক্ষমতার প্রশংসা করেছিলেন। রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক দল-গঠন নিয়ে লেনিনের লেখা পড়েও তিনি মুগ্ধ হন। ইসলামের পার্টির নিজস্ব মতাদর্শ বজায় রেখে বলশেভিকদের আদলে এর অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল। তবে এটি বিদ্যমান সংবিধানের অভ্যন্তরে থেকে কাজ করার অঙ্গীকার করেছিল। লেনিনের মতো মওদুদীর পার্টি কখনোই রাষ্ট্রযন্ত্রকে উৎখাত ও রূপান্তরিত করার জন্য তৈরি করা হয়নি। কিন্তু সমাজের নেতৃত্বদানকারী এবং এর প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুপ্রবেশকারী, প্রাথমিকভাবে সর্বশক্তিমান জনপালনকৃত্যক এবং পরে সেনাবাহিনীকে ‘ইসলামিকরণ’ করার লক্ষ্যে দলের কাঠামো তৈরি হয়েছিল।
রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক দল-গঠন নিয়ে লেনিনের লেখা পড়েও তিনি মুগ্ধ হন। ইসলামের পার্টির নিজস্ব মতাদর্শ বজায় রেখে বলশেভিকদের আদলে এর অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল। তবে এটি বিদ্যমান সংবিধানের অভ্যন্তরে থেকে কাজ করার অঙ্গীকার করেছিল। লেনিনের মতো মওদুদীর পার্টি কখনোই রাষ্ট্রযন্ত্রকে উৎখাত ও রূপান্তরিত করার জন্য তৈরি করা হয়নি।
সতর্কভাবে নির্বাচিত পঁচাত্তরজন মুসলিম পুরুষ তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, এবং আগত নতুন দল ও সম্প্রদায়ের প্রতি আনুগত্যের অঙ্গীকার করতে ১৯৪১ সালের ২৬ আগস্ট, লাহোরের একটি ব্যক্তিগত বাড়িতে মিলিত হন। একটি শাসক পরিষদের অধীন ক্ষমতার সীমিতকরণ সাপেক্ষে তারা একজন আমির নির্বাচন করতে সম্মত হলেন। কিছু বিতর্কের পর মওদুদীকে প্রথম আমির হিসেবে নির্বাচিত করা হলেও প্রথম বছরের মধ্যেই দলে উত্তেজনা শুরু হয়। অসাম্প্রদায়িক লাহোরে ধর্মনিরপেক্ষতা খুব সুপ্রতিষ্ঠিত থাকায় নতুন দলটি শহরের বাইরে ঘাঁটি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিল।
মুহাম্মদ মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করেছিলেন। তেমনি মওদুদী এবং তার সহকর্মীরা লাহোর থেকে পূর্ব পাঞ্জাবের পাঠানকোটে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিলেন। তারা জীবন-রাজনীতির সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় অর্থ, উপস্থিতি এবং শৈলী সম্পর্কে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তহবিল সীমিত থাকায় নতুন মুসলিম দলটি মিতব্যয়ী জীবনযাপন করা শুরু করলেন। একটি কোয়ার্টারে তারা একসঙ্গে থাকতেন। নিজেরা রান্না করে ভাগাভাগি করে খেতেন। কিন্তু আমির মওদুদী তার স্ত্রীর সঙ্গে আলাদাভাবে একটি ছোট বাড়িতে থাকতেন। দম্পতির পরিবারে একজন পুরুষ চাকর অন্তর্ভুক্ত ছিল। মওদুদী তার রচিত বইয়ের রয়্যালটি এবং ম্যাগাজিন বিক্রি থেকে পর্যাপ্ত আয় করতেন। দলে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, মাওলানা নুমানি, লক্ষ্ণৌর একজন ধর্মপ্রাণ পণ্ডিত-সাংবাদিক ছিলেন। নুমানির মতে, তাদের সবার সমস্ত উপার্জন সম্প্রদায়ের সাধারণ সম্পত্তি হওয়া উচিত। একই সম্প্রদায়ের মধ্যে বৈষম্যপূর্ণ জীবনযাপন তার কাছে অগ্রহণযোগ্য ছিল। মওদুদী কোরানিক আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে তার ব্যক্তিগত মালিকানার পক্ষে আত্মরক্ষা করার চেষ্টা করেন। মতবাদিক সমস্যাটির ব্যাপারে তিনি তার অবস্থানে অনড় থেকে জানালেন যে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তির মালিকানা পার্টির, বা পার্টির তৈরি কোনো রাষ্ট্রের হতে পারে না। এটা তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি। নুমানি দ্বিমত পোষণ করলেও পিছু হটতে বাধ্য হন। সংক্ষেপে, এটি এমন একটি দ্বন্দ্ব যা আজ অবধি ইসলামি মৌলবাদীদের দংশিত করছে।৩
সবার সম্পত্তির সমান অধিকারের মূল বিতর্কে মওদুদীকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হয়ে নুমানি আমিরের তাকওয়ার অভাবের দিকে তার আক্রমণ প্রসারিত করেন। তিনি তিনটি নতুন অভিযোগ উত্থাপন করেন: (ক) মওদুদীর দাড়ির আকার (অর্থাৎ ৭ সেন্টিমিটার নয়) এবং আকৃতি ভুল ছিল; (খ) মওদুদী সাধারণত ফজরের নামাজ পড়তে দেরি করতেন; এবং (গ) তার স্ত্রী একজন পুরুষ ভৃত্যের উপস্থিতিতে অভদ্র পোশাক পরেছিলেন, অর্থাৎ, তিনি নিজেকে পর্দায় আবৃত করেননি।
এই অভিযোগগুলোতে আমির যদিও যথেষ্ট সমঝোতামূলক ছিলেন এবং বিড়বিড় করে কিছুটা আত্মসমালোচনা করেছিলেন, কিন্তু তিনি অনুতপ্ত হননি বা পদত্যাগ করতে অস্বীকার করেন। নুমানি কাউন্সিল কমিটির একটি বিশেষ সভা আহ্বান করেন এবং উপদলীয় লড়াইয়ে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠের ওপর জয়লাভ করেন। মওদুদী তখন আমির পদ থেকে পদত্যাগ করার, অথবা পার্টি বিলুপ্ত করে যার যার পথ বেছে নেওয়ার প্রস্তাব দেন। নুমানি কেবল পদত্যাগের দাবিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখলে হয়তো জয়ী হতেন। তাই তিনি ফাঁদে পড়েন এবং জামায়াত ভেঙে দেওয়ার জন্য জোর দেন। এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়। অতঃপর নুমানি এবং তার দল বিভক্ত হয়ে যায় এবং প্রকাশ্যে মওদুদীর সমালোচনা করেন। এর ফলে পার্টির কাঠামো পুনর্বিবেচনা করতে আমির বাধ্য হন। কয়েক বছর পর কাউন্সিলটি নিষ্ক্রিয় করা হয়। আমির স্ট্যালিন এবং খোমেনির সংমিশ্রণে প্রধান ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
জামায়াত প্রতিষ্ঠার আগেই, এর ভবিষ্যৎ আমির ইসলামের ইতিহাসে তার স্থান সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। ১৯৪০ সালে তিনি একটি আরবীয় চাকরিতে নিয়োজিত হন। মুসলিম বিশ্বকে তার ধারণা থেকে উপকৃত করার জন্য তিনি তার রচিত লেখাগুলো আরবিতে অনুবাদ করা শুরু করেন। অচিরেই কায়রো ও জিদ্দায় মওদুদীর ধারণা প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। মুসলিম ব্রাদারহুড তার লেখা ব্যাবহার করতে থাকে: সাইয়্যেদ কুতব প্রকাশ্যে এই ভারতীয় পণ্ডিতের প্রতি তার ঋণ স্বীকার করেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান গঠনের পরপরই মওদুদী এবং সৌদি ধর্মগুরুদের মধ্যে সম্পর্ক একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। পঞ্চাশের দশকে ওয়াহাবিজম, মওদুদীর জামায়াত এবং মুসলিম ব্রাদার্সের সমন্বয়ে একটি ‘ইসলামি ত্রিভুজ’ ইসলামি আলোচনায় আধিপত্য বিস্তার করে। ওয়াশিংটন এই দলগুলোকে মুসলিম বিশ্বে কমিউনিজম ও উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে একটি অপরিহার্য আদর্শিক প্রাচীর হিসেবে গণ্য করছিল।৪
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান গঠনের পরপরই মওদুদী এবং সৌদি ধর্মগুরুদের মধ্যে সম্পর্ক একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। পঞ্চাশের দশকে ওয়াহাবিজম, মওদুদীর জামায়াত এবং মুসলিম ব্রাদার্সের সমন্বয়ে একটি ‘ইসলামি ত্রিভুজ’ ইসলামি আলোচনায় আধিপত্য বিস্তার করে।
আমার লেখার সময় অন্যান্য মুসলমান এবং মহান শয়তানের বিরুদ্ধে যেসব সশস্ত্র সুন্নি-ইসলামি দল জিহাদে নিয়োজিত আছে, তারা এই নক্ষত্রেরই সন্তান।
নতুন পাকিস্তানে মওদুদীর দল বিকশিত হতে পারেনি। সরকারি কর্মচারীদের জন্য রাজনৈতিক দলে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ হয়েছিল। তাই জামায়াতে ইসলামীকে নিকটবর্তী সময়ে তার কর্মসূচিতে বাস্তবসম্মত সমন্বয় সাধন করতে হয়। তারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে অনুপ্রবেশ করা থেকে নিজেদের বিরত রাখে। তবে নতুন রাষ্ট্রে ইসলামের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে তারা নিজেদের নিয়োগ দেয়। তখন কারা ইসলামের শত্রু ছিল? শিখ এবং সিংহভাগ হিন্দু তখন পাকিস্তানের এলাকা ছেড়ে চলে গিয়েছিল। ফলে, ইসলামপন্থিদের জন্য একটি কাফের শত্রুর অভাব হলো। তাই নিজ ধর্মের দিকেই ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার মনোযোগ ধাবিত হলো। প্রচলিত ধারণায় মওদুদী তখন পর্যন্ত ইসলামের মধ্যে আহমদিয়া সম্প্রদায়কে নিষিদ্ধ করার দাবি উপেক্ষা করছিলেন। মির্জা গোলাম আহমদ (সি. ১৮৩৫-১৯০৮), একজন মুসলিম প্রচারক এবং আহমদিয়াদের গুরু, ঐশ্বরিক ওহি লাভ করার দাবি করলেন। কিন্তু কোরআনের স্পষ্ট উল্লেখ অনুযায়ী মুহাম্মদ ছিলেন আল্লাহ প্রেরিত শেষ নবী। তাই দেওবন্দ বিদ্যাক্ষেত্রের গোঁড়া পণ্ডিতরা মির্জা গোলাম আহমদের দাবিকে একটি জঘন্য ব্লাসফেমি হিসেবে ঘোষণা দিলেন। মির্জার অনুসারী বৃদ্ধি পেতে থাকলে ক্ষিপ্ত দেওবন্দিরা নতুন ধর্মদ্রোহিতার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালায়। অবশ্য বিতর্কিত ঐশ্বরিক দাবির অংশটি বাদ দিলে বাকি সমস্ত বিষয়ে আঞ্চলিক ভিন্নতাসহ আহমদিয়ারা অন্য মুসলিমদের মতোই বিশ্বাসী ছিলেন।
ফাতেমা বেগম: লেখক শিক্ষক অনুবাদক। ই-মেইল: fatemaorama@gmail.com
আগের পর্ব: মৌলবাদের সংঘর্ষ: ক্রুসেড, জিহাদ এবং আধুনিকতা-১১
পাদটীকা
১। তিনি আবারও ইসরায়েলের সঙ্গে লীগের সাদৃশ্যের কথা মনে করিয়ে দেন। কারণ, মুসলিম লীগের নেতৃত্বের মতো, ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠাতারা ধর্মনিরপেক্ষ ইহুদি জাতীয়তাবাদী ছিলেন। গোঁড়া ইহুদিরা ‘ইহুদি রাষ্ট্র’-এর ধারণা কখনোই গ্রহণ করেননি। বেন-গুরিয়ন তাদের কাছে নিন্দিত ব্যক্তি ছিল।
২। ইকবালের অনুবাদগুলো করেছেন যথাক্রমে এম. মুজিব, এ. জে. আরবেরি এবং লেখক।
৩। ওসামা বিন লাদেনের ভিডিওগুলো গোপনে সমগ্র আরব উপদ্বীপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি ভিডিওতে সৌদি আরবের তেল অর্জিত আয় লুটপাটের নিন্দা করেন। তিনি তেলকে মুসলিম সম্প্রদায়ের সাধারণ সম্পত্তি হিসেবে দাবি করেন। তাই এই সম্পত্তি বেসরকারিকরণ এবং সমগ্র অঞ্চলে ছোট গোষ্ঠীর কাছে হস্তান্তর করার দাবি করা হয়। সৌদি আরবে জাতীয়করণ বলতে শুধু রাজকীয় ক্ষমতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত থাকা বোঝায়। তবে রাজপরিবারকে উৎখাত করার পর, তেলের রাজস্ব সম্মিলিত মালিকানাধীন এবং একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দ্বারা পরিচালিত হবে–এমন কোনো দাবি করা হয়নি। ওসামা বিন লাদেন এবং তার আগে মওদুদীর মতবাদে ব্যক্তিস্বার্থ যুক্ত হতে পারে, কিন্তু তাদের ধর্মগ্রন্থের ব্যাখ্যা বেশ সঠিক ছিল।
৪। জামায়াত-ই-ইসলামী এবং অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠী পাকিস্তানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে অগ্রহণযোগ্য দাবি করে একটি ইসলামি সংবিধানের পক্ষে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়। তখন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ওয়াশিংটনে পাঠানো একটি বার্তায় মৌলবাদী ‘সংবিধান দিবস’ প্রতিবাদকে ‘সংবিধানের পক্ষে করাচিতে একমাত্র প্রচেষ্টা’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। আমার বাবা তখন দেশের সবচেয়ে বড় একটি বামপন্থি গ্রুপ, প্রোগ্রেসিভ পেপারস লিমিটেড-এর দ্য পাকিস্তান টাইমস পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। পত্রিকার কর্মীদের বেশিরভাগই ছিলেন সমাজতন্ত্রী বা কমিউনিস্ট। ইস্কান্দার মির্জা, মোল্লাদের প্রতিরোধকারী সিনিয়র আমলাদের একজন, পরে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে আমার বাবার সঙ্গে তার দেখা হয়। তিনি আমার বাবাকে উপদেশ দিয়েছিলেন: ‘সংবিধান নিয়ে বিতর্কের প্রতিবেদন করার ক্ষেত্রে আপনার আরও ধারালো হওয়া উচিত। এই জারজরা যা চায় আমরা যদি তাতে কখনো রাজি হই তাহলে মোল্লারা, যারা এই মুহূর্তে তাদের মসজিদের পেছনে ছোট ছোট ছেলেদের উৎপীড়ন করে আনন্দিত, তারা দেশ চালাতে চাইবে।’
