শিশু খায় না : সমস্যা কোথায়? কীভাবে তৈরি হচ্ছে? দায় কার?
বনানী চক্রবর্তী
‘শিশু খায় না’। অর্থনৈতিক সামাজিক শ্রেণি নির্বিশেষে দৈনন্দিন জীবনে বহু উৎকণ্ঠায় ভোগা অভিভাবকদের একটি অন্যতম সমস্যা। ঘরে-বাইরে, অফিসে, সামাজিক অনুষ্ঠানে, যোগাযোগমাধ্যমে এর চর্চা। যাদের পরিবারে শিশু আছে এমনকি যাদের নেই তারাও এই দুটো কথার সঙ্গে বহুল পরিচিত। এই দুটো কথা প্রায় একশ ভাগ শিশু রোগ চিকিৎসকের কানে প্রতিদিন অনুরণন হতে থাকে বললে অত্যুক্তি হবে না বোধহয়। শুনতে শুনতে ক্লান্তি আসে, বিরক্তি আসে, অভিভাবককে সন্তুষ্ট করার উপায় খুঁজে পাওয়া যায় না। এই লেখায় এই সমস্যার উৎস সন্ধান করেছেন একজন শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ।
অভিভাবকের অভিযোগ
‘আমার বাচ্চা কিচ্ছু খায় না, খাবার রুচি নেই, খাবার দেখলে বমি করে, হজম শক্তি নেই।’
‘ভালো রুচির ওষুধ দেন যেন সব খায়, বাসায় এত খাবার, বাচ্চাকে খাওয়াতে পারি না, মনে কষ্ট লাগে। টাকা-পয়সা তো বাচ্চার জন্যই, না খেলে কেমন লাগে!’
‘বাচ্চার পেছনে সারা দিন খাওয়া নিয়েই পড়ে থাকি। তারপরও স্বাস্থ্য হয় না। অন্যদের বাচ্চা কত খায়, আমার বাচ্চা খায় না। খেলাধুলা সব ঠিক শুধু খাবার খাওয়াতে গেলে পীড়াপীড়ি।’
‘দোকানের কেনা খাবার ভালোই খায়। ভাত খায় না।’
‘আমার একমাত্র নাতি যেন সব খায়। বাচ্চা হবে এমন, যা দেব সব খাবে, নাদুসনুদুস হবে।’
মানুষ কেন খায়
জীব হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য, শরীরের বৃদ্ধি, ক্ষয়ক্ষতি পূরণের জন্য, কাজ করার শক্তি পাওয়ার জন্য মানুষকে খেতে হয়। শুরুতে মানুষ দিন শুরু করেছে খাবারের খোঁজে, অন্য প্রাণীর মতোই। প্রতিদিনকার জীবনযাত্রার মূল উদ্দীপনাই ছিল খাদ্যসংস্থান। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে। অঞ্চলভেদে খাওয়ার যোগ্য যা-ই পাওয়া যেত তা-ই মানুষ খেয়ে ক্ষুধা মেটাত। খুব বেছে নেওয়ার উপায় ছিল না। সময়ের সঙ্গে চলতে চলতে সে খাদ্য উৎপাদন করতে শিখল, খাদ্যে বৈচিত্র্য আনল, স্বাদ সৌন্দর্য যোগ করল। খাদ্য আর পুষ্টি সম্পর্কে জানতে থাকল। খাদ্যের জোগান বাড়ল, যদিও খাদ্যের প্রাপ্যতা সব এলাকায় সব মানুষের জন্য এক হয়নি। আবার অঞ্চল গোষ্ঠীভেদে খাবারের ধরনও ভিন্ন ভিন্ন হলো। ধীরে ধীরে খাদ্য উদ্বৃত্ত হলো, খাদ্যের বাণিজ্যিকীকরণ হলো অর্থাৎ খাদ্য পণ্য হলো। কোম্পানির মনোহরণ মোড়কে অজস্র ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ভিড়ে মাথা ঠিক রাখা মুশকিল হলো। যেমন: ফলের ছবি আঁকা ‘ফলের রসের’ প্যাকেটের কাছে আসল ফলকে ম্লান দেখতে হয়ে গেল। যুক্ত হলো fast food, ready to eat food–এই শব্দগুলো। দৈনন্দিন টিকে থাকার ঊর্ধ্বশ্বাস দৌড়ের ফাঁকে ক্ষুধা মেটাতে, মানসিক ক্লান্তি কাটাতে এরা বেশ ভালো জায়গা করে নিল শহরের ঝলমলে শপিং মল থেকে গ্রামের বাজার পর্যন্ত সব জায়গায়। বাজারই ঠিক করে মানুষ কী খাবে না-খাবে–এমন বলা যায়।
বিশ্বায়নের ফলে এক দেশের খাবার আরেক দেশের খাবারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায়। বিদেশি কর্ন ফ্লেক্স না দেশি খই কোনটায় পুষ্টি বেশি–এ নিয়ে দ্বন্দ্বে ভুগলে কোনো মা-বাবাকে দোষ দেওয়া যাবে না। ফার্মের ডিম, দেশি ডিম, লাল ডিম, সাদা ডিম, মুরগির ডিম, হাঁসের ডিম, কোয়েলের ডিম–এরকম আরও কত কী! শহরের পিৎজা হাট-এর পাশাপাশি মফস্বলে, গ্রামে বাজারের কাচের বাক্সেও প্রতিদিন বিক্রি হচ্ছে পিৎজার দেশি সংস্করণ। অলিগলি, রাস্তায়, রেল স্টেশনে, জাহাজ ঘাটায়, ফেরিতে, ট্রাফিক সিগন্যালে কোথায় ‘খাবার’ নেই। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে মানুষ খাচ্ছে। কেউ-বা যা প্রয়োজন খেতে পাচ্ছে না না, কেউ-বা প্রয়োজন ছাড়াই খাচ্ছে।
কাজেই মানুষ শুধু ক্ষুধা মেটাতে খায় না। উদ্যাপনে খায়, আড্ডায় খায়, একঘেয়েমি কাটাতে খায়, অবসাদে খায়, আনন্দে খায়, কোনো কারণ ছাড়াই হাতের কাছে পাওয়া গেলেও খায়। কাজেই যত দিন গেল ক্ষুধা আর খাদ্যের সম্পর্ক খুব সহজ থাকল না। কিন্তু প্রজাতির টিকে থাকার মনস্তত্ত্বের ধারাবাহিকতায় যার খাবারের অভাব নেই, যার খাবার আনতে দিন ফুরায় প্রত্যেকেই একইভাবে চায় তার সন্তানের পুষ্টি নিশ্চিত করতে। তার সন্তান খাবে, বড় হবে, বাঁচবে। শিশুর যত্ন নিতে অনেক বিষয়ে নজর দেওয়ার কথা থাকলেও খাবার খাওয়ানো এত বড় জায়গা দখল করে আছে যে শিশুকে খাওয়ানো অনেকসময় একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে যায়। অন্য বিষয়গুলোর দিকে নজরই পড়ে না।
সাধারণভাবে শরীরে যখন শক্তির ঘাটতি হয় বা রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিচের দিকে থাকে তখন মস্তিষ্ক খাদ্যের চাহিদা জানিয়ে সংকেত পাঠায়, ক্ষুধা অনুভূত হয়। যথেষ্ট খাবার খাওয়া হলে সন্তুষ্টির সংকেত পাঠায় খাওয়ার ইচ্ছা কমে যায়। কিন্তু এই রাস্তা মানুষের ক্ষেত্রে এতটা সরলভাবে চলে না। ক্ষুধা লাগলে খাবার খাবেই যেমন সত্যি আবার ক্ষুধা লাগলেই যে খাবে অনেক ক্ষেত্রে সত্যি না-ও হতে পারে–শারীরিকভাবে আপাতসুস্থ থাকলেও। সবাই জানি ক্ষুধা আর রুচি এক নয়। ক্ষুধা লাগলেই রুচি হবে এমন নয়। পরিবেশের কারণে ক্ষুধা রুচি দুই-ই উধাও হয়ে যায়, সে অভিজ্ঞতাও হয়। আবার পছন্দের খাবার সামনে দেখলে বা অন্যের অনুরোধ বা চাপাচাপির কারণেও মানুষ খায়। সুস্বাদু খাবারের গন্ধ নাকে এলে ক্ষুধা না থাকলেও খেতে ইচ্ছা হয়, হাতের কাছে পেলে হয়তো খাওয়াও হয়। আসলে মানুষ কী খাবে, কীভাবে খাবে, কতটুকু খাবে নির্ধারিত হয় জিনগত অবস্থার সঙ্গে পরিবেশগত পরিস্থিতির (পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক, ভৌগোলিক) জটিল মিথস্ক্রিয়ার প্রভাবে।
শিশুরা খেতে চায় না কেন
শিশুর না খাওয়ার বেশ কিছু স্বাস্থ্যগত কারণ রয়েছে। যে কোনো অসুস্থতা বা অসুস্থতার পূর্বলক্ষণ হতে পারে না খাওয়া বা রুচি কমে যাওয়া। দাঁত ওঠার আগে ব্যথা বা অস্বস্তি, কোনো কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এরকম কিছু বিষয়। এ ছাড়া অপুষ্টি এবং বিভিন্ন খনিজ বা ভিটামিনের ঘাটতি ও রুচি কমে যাওয়ার কারণ হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে আনুষঙ্গিক উপসর্গগুলো সমস্যা খুঁজে পেতে সাহায্য করে আর কারণ খুঁজে নিয়ে তার সমাধান করলেই শিশু আবার খেতে শুরু করে, ওজন বাড়ে। আবার বৃদ্ধির বিভিন্ন পর্যায়ে ভারসাম্য রক্ষার জন্য শরীরে খাদ্যের চাহিদা কমে যেতে পারে, তবে এতে শিশুর কোনো অসুবিধা হয় না। মা-বাবার সঙ্গে বিচ্ছিন্নতার বোধ, নিরাপত্তাহীনতার বোধ, ভয়ভীতি এক কথায় পরিবারে বা পরিবেশে কোনো ধরনের মানসিক চাপ খাবার না খাওয়ার একটা বড় কারণ হতে পারে। বেশিরভাগ শিশুর ক্ষেত্রে আপাতদৃষ্টিতে কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। কখনো দেখা যায় শিশুর বৃদ্ধি, প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা স্বাভাবিক, শিশুও সুস্থ; কিন্তু খায় না বরং অনেক ক্ষেত্রে ওজন বয়সের হিসাবে বেশির দিকে। আবার কখনো শিশুর বৃদ্ধি আসলেই কম, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ঘাটতিও দেখা যাচ্ছে, ঘাটতি পূরণের পর তার খাওয়ার চাহিদা হওয়ার কথা কিন্তু অভিযোগ – খায় না। তাহলে শিশু কি আসলেই খাচ্ছে না? যদি না-ই খায় তাহলে কারণ কোথায়?
দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পুষ্টির গুণগত মান সব শিশুর জন্য একই রকম হলেও পরিমাণগত ভিন্নতা আছে। প্রথম যে খাদ্য মায়ের দুধ সেখান থেকেই এই প্রক্রিয়ার শুরু বলা যায়। একেক শিশুর দুধ খাওয়ার ধরনও ভিন্ন। কোনো কোনো মা বুকের দুধ খাওয়ার পরিমাণ নিয়েও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন, যদিও বাচ্চার বৃদ্ধি বিকাশ ঠিকই আছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু জন্মের পর থেকে প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ খায় তারা ছয় মাস বয়সের পর পারিবারিক খাবারগুলো সহজে নেয়। কারণ, মায়ের দুধের মাধ্যমে মা যেসব খাবার খায় সেসব খাবারের গন্ধের সঙ্গে সে আগেই কিছুটা পরিচিত হয়ে যায়। কাজেই মায়ের দুধ শিশুর খাদ্যাভ্যাসের প্রথম ধাপ। ছয় মাস থেকে অন্য খাবার অভ্যাস করার যথেষ্ট সুযোগ তাকে দেওয়া সম্ভব যদি দুই বছর পর্যন্ত মায়ের দুধের পুষ্টি পাশাপাশি চলতে থাকে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু জন্মের পর থেকে প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ খায় তারা ছয় মাস বয়সের পর পারিবারিক খাবারগুলো সহজে নেয়। কারণ, মায়ের দুধের মাধ্যমে মা যেসব খাবার খায় সেসব খাবারের গন্ধের সঙ্গে সে আগেই কিছুটা পরিচিত হয়ে যায়। কাজেই মায়ের দুধ শিশুর খাদ্যাভ্যাসের প্রথম ধাপ।
অন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে শিশু প্রাণীকে খুব একটা খাওয়ানো হয় না, হলেও খুব অল্প সময়। তারপর তারা নিজেই খাবার খুঁজে নেয় ক্ষুধা লাগলে, শুরু হয় মায়ের দুধ খুঁজে নেওয়া দিয়ে। মানুষের ক্ষেত্রে বিষয়টা আলাদা। মানুষের শিশু ক্ষুধা জানান দেয় বিভিন্ন শারীরিক ইঙ্গিত দিয়ে, কান্না দিয়ে। কিন্তু সে নিজে মায়ের কাছে গিয়ে খেতে পারে না। যখন মায়ের দুধের পাশাপাশি পারিবারিক খাবার খায় তখনও বছর দুই সে পুরো খাবার নিজে নিতে পারে না । তার সাহায্যের প্রয়োজন হয়। তার খাওয়া অন্যের ইচ্ছাধীন বা অন্যের ওপর নির্ভরশীল একটা বয়স পর্যন্ত যা বর্তমান আর্থ-সামাজিক অবস্থায় আরও দীর্ঘায়িত। অর্থাৎ সে কী খাবে, কী পরিমাণ খাবে সে বিষয়ে শিশুর বিশেষ মতামত দেওয়ার ক্ষমতা থাকে না, যদিও সে তার ইচ্ছা-অনিচ্ছা বোঝাতে চেষ্টা করে বিভিন্ন শারীরিক ভাষা দিয়ে। তবে প্রায় ক্ষেত্রে বিভিন্ন কারণে সেই ইচ্ছা-অনিচ্ছা অগোচরেই থেকে যায়। শিশুর ক্ষুধার বা পেট ভরে যাওয়ার, পছন্দের বা অপছন্দের ভাষা কতটুকু বোঝা হচ্ছে বা সে বিষয়ে কি প্রতিক্রিয়া হচ্ছে তার ওপরও নির্ভর করে খাওয়া-দাওয়ার বেলায় শিশুর আচরণ কিরকম হবে। অতিরিক্ত গুরুত্ব বা কোনো গুরুত্বই না দেওয়া দুই ক্ষেত্রেই শিশুকে খাওয়াতে গেলে বিভিন্ন অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। শিশু খাবার বিষয়ে খুঁতখুঁতে হয়, অভ্যাসের বাইরে নতুন খাবার নিতে চায় না। এসব ক্ষেত্রে অতি ওজন বা কম ওজন দু-ধরনের অসুবিধাই হতে পারে।
খাওয়া বা খাওয়ানোর সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। এই প্রক্রিয়ার বহুমুখী প্রভাব রয়েছে একটি শিশুর বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে । খাওয়া একটি rewarding process। খাওয়ার সময় যে কোনো প্রাণীর একটি সুখকর অনুভূতি হয়। খাবারের স্বাদ, দৃষ্টি বিনিময়, কথা, স্পর্শ–এসবের মাধ্যমে যোগাযোগের ফলে শরীরের পুষ্টির পাশাপাশি সামাজিক মানবিক বিকাশ, মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্ক, শিশুর আত্মনির্ভরতা, আত্মবিশ্বাস, আত্মসন্তুষ্টি–এই দিকগুলো বিকাশে বড় ধরনের ভূমিকা রাখে এই খাওয়ার সময়। খাওয়ানোর পরিবেশ, কী খাওয়ানো হচ্ছে, কীভাবে খাওয়ানো হচ্ছে, যিনি খাওয়াচ্ছেন তার মানসিক অবস্থা, শিশুর সঙ্গে সম্পর্ক, মানসিক যোগাযোগ, পারস্পরিক আদান-প্রদান, সামাজিক অবস্থা অবস্থান–এরকম আরও অনেক কিছু শিশুর খাদ্যাভ্যাস তৈরি হওয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। অন্যান্য জৈবনিক এবং বাহ্যিক কার্যকারণের পাশাপাশি সারা দিনের খাওয়া বা খাওয়ানোর সময়গুলোর গুণগত মান শিশুর পরবর্তী খাদ্য সম্পর্কিত এমনকি অন্যান্য আচরণেও ছাপ ফেলে।
নিঃসন্দেহে শারীরিক পুষ্টি খাবার খাওয়ানোর প্রাথমিক উদ্দেশ্য। সে ক্ষেত্রে যে কোনোভাবে খাবার শরীরে ঢুকলেই হওয়ার কথা। যেমন: অসুস্থ শিশুকে পরিপূর্ণ পুষ্টি দেওয়ার উদ্দেশ্যে পুষ্টিগুণসম্পন্ন তরল খাবার নাকে নল দিয়ে পেটে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু খাবার খাওয়া আর গেলার মধ্যে রয়েছে বিশাল একটা পার্থক্য। অসুস্থ শিশু যখন মুখে খেতে ইচ্ছা করে একে উন্নতির লক্ষণ ধরা হয়। খাবার মুখে নেওয়ার পর শিশু খাবারের স্বাদ পায়, এরপর জিবের মাধ্যমে খাবারের ঘনত্ব, দানা–এগুলোর সঙ্গে পরিচিত হয়। চিবোতে শেখে। খাবার যখন সামনে আনা হয় খাবারের রং গন্ধ, পরিবেশনের ধরন–এগুলোও তার প্রতিক্রিয়ায় প্রভাব রাখে। শিশু যখন নিজের হাতে খেতে শেখে তখন খাবার স্পর্শ করে বিভিন্ন খাবারের ধরন বুঝতে শেখে। খাবার সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা তৈরি হয় অর্থাৎ সে শুধু গেলে না। কতগুলো ধাপ পার হয়ে তারপর গেলে। প্রতিটি পর্যায়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ। এখানে শিশুকে সময় দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথম যখন খাবার দেওয়া হয় তখন একেকটি খাবার চিনে নিতে শিশুর কয়েক দিন সময় লাগে। যে কোনো নতুন খাবার বেশ কয়েকবার দেওয়ার পর সে খাবারটির সঙ্গে পরিচিত হয়, সিদ্ধান্তে আসা যায় সে সেটা পছন্দ করছে বা করছে না। কিন্তু অভিভাবক খুব অল্প সময়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছে যান যে শিশু খাচ্ছে না আর অস্থির হয়ে পড়েন। চাকরীজীবী, শ্রমজীবী পরিবারগুলোয় এই সময় দেওয়াটা আসলে কঠিন। তারা এটা-সেটা চেষ্টা করেই যান। প্রাথমিক অবস্থায় বিভিন্ন স্বাদের খাবার তাকে বিভ্রান্ত করতে পারে। কিন্তু অভিভাবক আশা করেন ফল, মাছ, ডিম সবকিছুই শিশু একসঙ্গে খাওয়া শুরু করবে রুটিন করে। তাদের আশা ভঙ্গ হয়। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের খাবারের প্রাপ্যতা, চারপাশের উপদেশ, আলাপ-আলোচনা অভিভাবককে প্রভাবিত করে।
প্রথম খাওয়া শুরু করার উদ্দেশ্য তাকে পরিচিত করা, পেট ভরানো বা পুরো পুষ্টি দেওয়া নয়। ছয় মাস বয়সে খাওয়া শুরু করার সময় দৈনিক দুবারের বেশি চেষ্টা করারও প্রয়োজন নেই। প্রথমবার নিতে না চাইলে একই সময় জোর করাও উচিত নয় যাতে কোনো খারাপ অভিজ্ঞতা না হয়, তবে পরের বেলা আবার দেওয়া দরকার যাতে সে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। মায়ের দুধের পর যখন পারিবারিক খাবার যোগ করা হয় পুরো খাবার হজম না-ও হতে পারে, ডায়রিয়া যদি না হয় উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। দেখা যায় মা-বাবা আগ্রহ হারিয়ে দুধ বাদে অন্য কিছু দেওয়াই বন্ধ করে দেন। রুচির ওষুধ আর হজমের ওষুধ খুঁজে বেড়ান। শিশুর খাবার চেনাও দূরে পড়ে যায়। নতুন নতুন খাবারের স্বাদ নিতে অনিচ্ছুক একটি শিশু বড় হতে থাকে।
বহু আগে থেকেই, বিশেষ করে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোয় চালের সুজি গরুর দুধ শিশুর জন্য বহুলপ্রচলিত খাবারের সঙ্গে তালমিছরি, যেখানে তাল আছে কি না সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। প্রায় দেখা যায়, শিশু সারা দিনে আধা কেজি গরুর দুধ খায়। গরুর দুধের প্রোটিন হজম হতে সময় লাগে, কাজেই ক্ষুধা লাগার কথা না। গরুর দুধে প্রয়োজনীয় আয়রন না থাকায় রক্তশূন্যতা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন ধরনের দেশি-বিদেশি শিশুখাদ্য। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমনও দেখা যায় হজম করতে পারবে না, গলায় লাগবে–এসব ভয় থেকে শিশুকে শুধু এক ধরনের খাবার দিয়ে যাওয়া হয়। আবার অর্থনৈতিক অবস্থাভেদে পরিবারে খাবারে খুব বৈচিত্র্য না-ও থাকতে পারে। অতি বৈচিত্র্য বা একঘেয়েমি দুই কারণেই শিশু আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ক্ষুধা লাগলে সে তার অভ্যস্ত মায়ের দুধ বা বোতলে দুধটাই সহজ মনে করে।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার একসঙ্গে ব্লেন্ড করে চামচ দিয়ে বা বোতলে ভরে শিশুকে খাওয়ানো হয়। এতে দু-ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। প্রথমত: ব্লেন্ড করে ফেলার ফলে শিশু সহজে গিলতে পারে, ইচ্ছা বা অনিচ্ছায়। পরিমাণে বেশি খাওয়ানো যায়, এতে তার ওজন বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। দ্বিতীয়ত: ব্লেন্ড করার ফলে বিভিন্ন খাবার মিশে যায়, খাবারের স্বাদ-গন্ধ আলাদা করে পাওয়া যায় না, একই স্বাদের খাবার বারবার খেতে শিশু আকৃষ্ট বোধ করে না। নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবার দিয়ে পুষ্টি নিশ্চিত করতে গিয়ে অনেকসময় অভিভাবক জোর করে খাওয়ান। এর প্রতিক্রিয়ায় শিশু বমি করতে পারে। এটা যেমন শারীরিক প্রতিক্রিয়া তেমনি একটা প্রতিরোধও বলা যায়। অভিভাবক বমির চিকিৎসা নেন কিন্তু সমস্যার সমাধান হয় না। শিশুর জন্য এটা খাবার সম্পর্কিত খুব খারাপ অভিজ্ঞতা। শিশু খাবার দেখলে মুখ ফেরায়।
মনভোলানো বাজার
প্রচারমাধ্যমগুলো শিশুর খাদ্যাভ্যাস তৈরিতে সরাসরি এবং বেশ বড়সড়ো ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন স্বাদযুক্ত সেরেলাক, একটু বেশি বয়সীদের জন্য হরলিকস বা এ-জাতীয় তথাকথিত হেলথ ড্রিঙ্কস, বিভিন্ন ready breakfast, দেশি-বিদেশি ফলের রস, বিভিন্ন ধরনের কর্নফ্লেক্স, আরও কত কী বাজারে পাওয়া যায় যেগুলোর দাম আকাশছোঁয়া। নিম্নবিত্ত মা-বাবাও এসব খাবার দু-এক প্যাকেট শিশুকে খাওয়ানোর চেষ্টা করেন বা চারপাশের প্রভাবে অনেকটা বাধ্য হয়েও খাওয়ান। এসব খাবারের পুষ্টিমান নিয়ে প্রশ্ন আছে। কখনো কখনো খাবারের প্যাকেটের সঙ্গে উপহার বা উপহারের কুপন থাকে যেগুলো নামমাত্র কিন্তু শিশুর কাছে এর গুরুত্ব অনেক। অভিভাবক এবং একটা বয়সে শিশু নিজেই আকৃষ্ট হয়। প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের বিজ্ঞাপনগুলো শিশুর বৃদ্ধি বিকাশ, শক্তি, বুদ্ধিমত্তা নিয়ে একটা বাস্তবতা বিবর্জিত স্বপ্নের জগতের ছবি নিয়ে হাজির হয়। এই স্বপ্নের দেখা মেলে প্রতিদিন ঘরে-বাইরে। পোস্টার, বিলবোর্ড তো আছেই, তা ছাড়া এসব পাওয়ার জন্য আলাদা করে দূরের বাজারে যেতে হয় না। বাজারই ঘরের দরজায়। এত ধরনের খাবারের ভিড়ে অভিভাবক এবং শিশু বিভ্রান্ত পুরোই। মফস্বলে গ্রামে প্রায় মোড়ে মোড়েই দোকান। রাস্তায় হাঁটতে গেলে চোখে পড়ে সকালে সদ্য ঘুম থেকে ওঠা শিশু, রঙিন প্যাকেটে তথাকথিত খাদ্য নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে অভিভাবকের হাত ধরে অথবা কোলে করে। ডাল, ভাত, রুটি, ডিম, ফলের পরিবর্তে তার ধারণায় এটাই সকালের খাবার হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে। প্রক্রিয়াজাত খাবারের নকল গন্ধ নকল স্বাদ তাকে প্রাকৃতিক খাবারের প্রতি বিরূপ করে তুলছে।
রাস্তায় হাঁটতে গেলে চোখে পড়ে সকালে সদ্য ঘুম থেকে ওঠা শিশু, রঙিন প্যাকেটে তথাকথিত খাদ্য নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে অভিভাবকের হাত ধরে অথবা কোলে করে। ডাল, ভাত, রুটি, ডিম, ফলের পরিবর্তে তার ধারণায় এটাই সকালের খাবার হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে। প্রক্রিয়াজাত খাবারের নকল গন্ধ নকল স্বাদ তাকে প্রাকৃতিক খাবারের প্রতি বিরূপ করে তুলছে।
মূল খাবারের মধ্যবর্তী সময়েও ‘মজা’ খেতে শিশুদের বায়না আছে, অভিভাবকরাও মেটাতে পারেন সহজলভ্য আর আপাতসস্তার বলে অর্থাৎ পাঁচ-দশ টাকার জিনিস বলে। বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার যখন সাধ্যের বাইরে তখন স্বল্প আয়ের মানুষ এসব রঙিন প্যাকেট দিয়ে শিশুকে একটু খুশি করতে চান। এসব খাবারের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে জানা না থাকা, বিজ্ঞাপনের ভালো ভালো কথা এসব কারণে তাদের মনে কোনো প্রশ্ন জন্ম নেয় না। যদিও মাস শেষে গড় অর্থনৈতিক খরচ, শরীরের ওপর প্রভাব চিকিৎসা খরচ হিসাব করলে ক্ষতির পরিমাণ প্রচুর।
নুডলস বর্তমানে খুব জনপ্রিয়। এ ছাড়া আছে নিম্নমানের কেক, বিস্কুট, চিপস। মাঝে মাঝেই টেলিভিশনে পত্র-পত্রিকায় দেখার-জানার সুযোগ হয় কোন পরিবেশে কীভাবে বা কী দিয়ে এগুলো বানানো হচ্ছে। এসব খাবারের কৃত্রিম গন্ধ, কড়া স্বাদ, অতিরিক্ত লবণ বা মিষ্টি, আকর্ষণীয় প্যাকেট শিশুদের মন ভোলায়। পুষ্টিমান কম হলেও চিনি তেলজাতীয় উপাদানের কারণে শিশুর পেট ভরে থাকে, শক্তি পায়, ওজনও বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু প্রোটিন ভিটামিন খনিজ এসব উপাদানের ঘাটতি হয় যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। জীবনের শুরু থেকে এগুলোর সঙ্গে পরিচিত হতে হতে পারিবারিক খাবারের স্বাদ গ্রহণযোগ্যতা হারায়। খাবার বিষয়ে শিশুর টালবাহানা চলতে থাকে।
এসব খাবারের কৃত্রিম গন্ধ, কড়া স্বাদ, অতিরিক্ত লবণ বা মিষ্টি, আকর্ষণীয় প্যাকেট শিশুদের মন ভোলায়। পুষ্টিমান কম হলেও চিনি তেলজাতীয় উপাদানের কারণে শিশুর পেট ভরে থাকে, শক্তি পায়, ওজনও বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু প্রোটিন ভিটামিন খনিজ এসব উপাদানের ঘাটতি হয় যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি।
তারপর রয়েছে শহরে গ্রামে অজস্র বেকারি, রেস্টুরেন্ট, স্কুলের গেটে ফুচকা, চটপটি আরও অনেক কিছু যেগুলোর খাদ্যমান, পরিচ্ছন্নতা প্রশ্নসাপেক্ষ। অভিভাবক কখনো স্বেচ্ছায় কখনো চাপে পড়ে স্কুলে খাওয়ার জন্য কেক, চিপস, ফাস্টফুড দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। আবার কর্মজীবী মায়েদের ক্ষেত্রে এসব তৈরি খাবার সুবিধাজনক মনে হয়। শিশুও এতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। এসব খাবারে ক্যালরি বেশি থাকে ফলে বাড়িতে এসে শিশুর খাওয়ার চাহিদা থাকে না। লক্ষ করলে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই শিশু খায় না বলতে ভাত খায় না বা পারিবারিক খাবার খায় না বোঝানো হয়।
তথাকথিত সোশ্যাল মিডিয়া youtube এসবের কল্যাণে অনেক ধরনের শিশুখাদ্য বিষয়ক আলোচনা, পরামর্শ, নতুন নতুন দেশি-বিদেশি রেসিপি, প্যাকেটে কৌটায় ভরা নানান দেশি-বিদেশি খাবারের ভিড়ে অভিভাবকরা চিন্তিত থাকেন; কী খাওয়াবেন। বর্তমানে ঘরে বসে অনলাইনেও হাতের কাছে পেয়ে যান, তাই শিশুর ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ প্রচুর। যেহেতু অ্যান্ড্রয়েড ফোন সবার হতে আর সস্তায় ‘জিবি’ কিনতে পাওয়া যায় তাই এসব খাবার শুধু উচ্চবিত্ত পরিবারে থেমে নেই। মায়েদের কাছে শোনা যায় হোমমেড সেরেলাক অনলাইনে কেনার কথা। হরেকরকম চাল-ডাল-বাদাম মেশানো রেসিপি দিয়ে তারা পেট ভরাতে চান যা সুষম পুষ্টি মানসম্পন্ন নয়। আবার এ ধরনের খাবার পরিপাকতন্ত্রে চাপ তৈরি করতে পারে। হজম করতেও শিশুর সময় লাগে। সেই সময়টা দেওয়া প্রয়োজন।
স্বাভাবিক অবস্থায় একজন সুস্থ মানুষ দু-বেলা মূল খাবার আর দু-বেলা হালকা খাবার খায় এটাই সাধারণ চর্চা। শিশুকেও এভাবেই অভ্যস্ত করার কথা পারিবারিক খাবারে। কোনো একটি পরিবারে সবাই যা খেয়ে পুষ্টি পায়, এলাকা বা দেশভেদে পরিবারের খাদ্য সংস্কৃতি যা বয়সের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিশুরও তাই খাওয়ার কথা। ঘণ্টা হিসাব করে খাওয়ানোর বা বাজারের শিশুখাদ্য খাওয়ানোর প্রয়োজন নেই। বাজারের শিশুখাদ্যে বা অন্যান্য রেডি খাবার সময়ের সাশ্রয় করে, শিশুর কাছে আকর্ষণীয় হয়; কিন্তু পারিবারিক খাবারের চেয়ে এগুলোর পুষ্টিমান বেশি হওয়ার কারণ নেই। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায় আর যাইহোক শিশুকে ভালোবেসে এগুলো বানানো হচ্ছে না, উদ্দেশ্য ব্যবসা, উদ্দেশ্য লাভ। আমের সর্বনিম্ন দাম যদি কেজিপ্রতি ৫০-ও ধরা হয়, ২০ টাকায় ২০০ এমএল আমের জুস পাওয়া গেলে সন্দেহ হওয়ার কথা। বড় বড় জুস কারখানা তাতে বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাজারের পাতা বিজ্ঞাপনী মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদে আটকে পড়া অপ্রস্তুত চিন্তাভাবনায় এই প্রশ্ন আসার কথা নয়। বড়দের পাশাপাশি সেই জালে আটকে পড়ে শিশু। কৃত্রিম রং-গন্ধ দিয়ে বানানো তথাকথিত ফ্রুট জুস দীর্ঘ মেয়াদে তার স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে।
পরিবর্তিত জীবনযাত্রা
খাবার খাওয়ার সময় শিশুর সামাজিকীকরণও হয়। একটি কাজ শেষ করার মতো শিশুকে খাওয়ানোর বিষয়টা যদি নেওয়া হয় তাহলে কাজ শেষ করার তাগিদ থেকে শিশু আর মুখ্য থাকে না। এই অঞ্চলে মা-দাদি-নানি বেশ বয়স পর্যন্ত শিশুকে খাইয়ে দিতে চান অর্থাৎ শিশুকে নিজে খেতে দেন না। পরিমাণমতো খাবে না, জামা-কাপড় নষ্ট করবে, কাজ বাড়বে–এরকম বিভিন্ন কারণে। আবার মা যখন চাকরিজীবী, সংসার সামলে কাজে যান বা বর্তমানের নাগরিক জীবনে একা সংসারের অন্য কাজের পাশাপাশি সীমিত সময়ে শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করতে চান–শিশুর ক্ষুধা থাক বা না থাক। এসব ক্ষেত্রে খাওয়াটা আর শিশুর নিজের কাজ থাকে না, চাপে পড়ে সে খায়। খাবারের অভিজ্ঞতা সুখকর হয় না। সে খেতে চায় না।
শিশু অনুকরণ করে। যখন যৌথ পরিবারে আরও অনেক শিশুর সঙ্গে বড় হয় সে, অন্যদের দেখে শেখে, বিভিন্ন খাবারের স্বাদ স্পর্শ পেয়ে বড় হয়, খাওয়া উপভোগ করে। একক পরিবারে সেই সুযোগ কম। তবে সেখানেও মা-বাবার খাদ্যাভ্যাস, ভাই-বোন যদি থাকে তাদের দেখে শিখতে পারার কথা। কিন্তু যান্ত্রিক জীবনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় শিশুর খাওয়ার সময় আলাদা, খাবার আলাদা, তাকে পরিবারের সঙ্গে খাওয়াতে বসানো হয় না। আবার মা-বাবাই হয়তো একসঙ্গে বসে খান না । চাকরি বা বিভিন্ন কারণে খাওয়ার সুযোগ হয় না, যে যার মতো খেয়ে নেন। ভাই-বোনও অনেক ক্ষেত্রে স্কুল-কোচিং-মাদরাসা করতে গিয়ে আলাদা সময় খায়। শিশু হয়তো দেখেই না তারা কী খান, কখন খান। কাজেই খাওয়ার যে পারিবারিক সামাজিক দিক, খাবার খাওয়ার আনন্দ–তার সঙ্গে শিশুর পরিচিতি হয় না। খাবার খাওয়া একটা কাজ হয়ে দাঁড়ায় শুধু।
সংখ্যা কম হলেও অনেক পেশাজীবী মা শিশুকে ডে-কেয়ারে রাখেন যেখানে দু-ধরনের ঘটনাই ঘটতে পারে ডে-কেয়ারের ধরন অনুযায়ী। অন্য শিশুদের সঙ্গে সে নিজের হাতে খাবার খেতে শেখে অথবা স্নেহহীন পরিবেশে খাবারের প্রতি বিতৃষ্ণা নিয়ে বড় হয়। কখনো দেখা যায় বেতন দিয়ে রাখা গৃহকর্মী বা প্রতিবেশী শিশুকে খাওয়ানোর দায়িত্বে। তারাও একটা অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন। শিশুর মনের ইচ্ছা-অনিচ্ছা এগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয় না। শিশুর ক্ষুধা বা পেট ভরে যাওয়া, কোনো ইঙ্গিতই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লক্ষ করা হয় না, করার কথাও নয়। আবার এমনও বিরল নয় যে আর একজন একটু বয়সে বড় শিশু বা কোনো একজন বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা শিশুর দেখাশোনা করেন। সে ক্ষেত্রে শিশু কী খেল না-খেল, খায় কি খায় না–এসব বিষয়ে তথ্য পাওয়া কোনো সহজ বিষয় নয়। emotional deprivation-এর এটিও একটি ধরন।
সাধারণভাবে এই সমাজে প্রচলিত ধারণামতো স্বাস্থ্যবান শিশুর অর্থ বেশি ওজনের শিশু। টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন, বিদেশি শিশুর বড়সড়ো ছবি এই ধারণাকে প্রতিদিন সতেজ করে রাখছে। তাই পরিবারের চাওয়া নাদুসনুদুস শিশু। মা-বাবা পরিবারের ভেতর থেকে, বাইরে থেকে এ ব্যাপারে চাপ অনুভব করেন। শিশু পালন মূলত মায়ের ওপর আরোপিত দায়িত্ব; মা চাকরিজীবী বা গৃহিণী যা-ই হোন-না কেন। শিশুর ওজন কম হওয়ার কারণে অনেক মাকে গঞ্জনা সহ্য করতে হয়, অন্যসব দিক থেকে শিশু সুস্থ থাকার পরও। অন্য কোনো বেশি ওজনের শিশু দেখলে হীনম্মন্যতায় ভুগতে পারেন মা, শিশুর যত্ন নেওয়ার বেলায় আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলতে পারেন। নিজেদের হতাশা শিশুর ওপর চাপিয়ে মা-বাবা মনে করতে পারেন তার শিশু হয়তো পরিমাণমতো খাচ্ছে না তাই ওজন বাড়ছে না। ‘শিশু খাচ্ছে না’–এই অভিযোগ নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে থাকেন।
ওজন বাড়ানোর দিকেই বেশিরভাগ অভিভাবকের নজর। আর ওজন বাড়ানোর উপায় নিঃসন্দেহে খাবার। এটাই ধারণা। ওজনের সঙ্গে খাবারের একটা সম্পর্ক থাকলেও শিশু কতটুকু বাড়বে তা সবসময় খাবারের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। আবার পুষ্টি অর্থও শুধু ওজন নয়, যদিও ওজন স্বাস্থ্যের একটা নির্ধারক। প্রতিটি শিশু আলাদা আলাদা শিশুমানুষ। তার বৃদ্ধি পরিবারভেদে আলাদা আলাদা, বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন রকম। এমনকি একই মা-বাবার দুজন শিশু ভিন্নভাবে বাড়তে পারে। শিশু সবসময় একই হারে বাড়ে না। জন্মের পর প্রথম বছর যতটুকু হারে বাড়ে পরবর্তী সময়ে এই বৃদ্ধির হার কমতে থাকে। তার বৃদ্ধি জিনগত অবস্থার সঙ্গে খাদ্যপুষ্টির পাশাপাশি পরিবেশের অন্যান্য উপাদানের ওপরও নির্ভর করে। আবার একেকটি শিশুর খাবার চাহিদাও শরীরের গঠন কার্যকলাপ হিসেবে আলাদা। সে তার চাহিদামতো খায়, তার ধরনমতো বাড়ে। কাজেই শুধু খাবার খাইয়ে নাদুসনুদুস করতে চাইলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে হতাশ হতে হবে।
অন্য পরিবারের শিশুর সঙ্গে তুলনা, অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে তুলনা, বিভিন্ন কারণে উদ্বিগ্ন হয়ে বাড়তি যত্ন নিতে গিয়ে শিশুর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করা হয়। ধরন না বুঝেই খুব ঘনঘন খাওয়ানো হয়। কখনো-বা মূল খাবারের মধ্যবর্তী সময়গুলোয় দুধ, ফলের রস-জাতীয় তরল খাবার দিয়ে মনে করা হয় এগুলো তো পানি, কাজেই হজম হতে সময় লাগবে না। কখনো-বা বেশি খাওয়ার জন্য, দ্রুত খাবার শেষ করার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়, কখনো-বা অজান্তেই শাস্তির ভয় দেখানো হয়। এসব কারণে খাবার দেখলে শিশুও উদ্বিগ্ন হয়ে যায়, খেতে চায় না। আবার পুরস্কার হিসেবে ‘মজা’র প্রলোভন হিতে বিপরীত হতে পারে।
আজকের সময়ে শিশুদের দিনের বেশিরভাগ কাটে ঘরের ভেতর। গ্রাম-মফস্বলেও এই চর্চা ঢুকে পড়ছে। খেলার জায়গার অভাব, মোবাইলের প্রাচুর্য শিশুর শারীরিক কার্যকলাপ কমিয়ে দিয়েছে। পরিশ্রম কম, ক্ষুধাও কম। আবার মোবাইল বা টেলিভিশন দেখতে দেখতে সে যে কখনো কখনো ‘মজা’ খায়। সচ্ছল বা উচ্চবিত্ত পরিবারে পৌঁছে যায় food panda, uberit। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলো হিসাবে থাকে না অভিভাবকের। তারা শুধু সময় ধরে খাওয়াতে চান।
যে শিশুটি ডে-কেয়ারে থাকে, যে শিশুটি বাসায় একা অথবা গৃহকর্মীর সঙ্গে থাকে, যে কঠোর শৃঙ্খলার শিশুবৈরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে থাকে তার মধ্যে বিষণ্নতা থাকতে পারে। যে শিশুটি চোখের সামনে পারিবারিক অস্থিরতা, সহিংসতা দেখতে পায়, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা বুঝতে পারে সে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে পারে। শিশু একটু বড় হলে তাকেও সাফল্যের প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দেওয়া হয়। তার জীবন চলে ঘড়ি ধরে। বিভিন্ন মানসিক চাপ, ইমোশনাল deprivation খাওয়ার আগ্রহ কমে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অগোচরেই রয়ে যায়।
শেষ কথা
অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জীবনযাত্রা, মনস্তত্ত্ব, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন হতে বাধ্য ভালোমন্দ মিলিয়েই। এই পরিবর্তন শিশুর খাদ্যাভ্যাস, পুষ্টি বৃদ্ধিবিকাশে কী প্রভাব রাখছে সেটা দেখার বিষয়। কারণ, শিশুই ভবিষ্যৎ নাগরিক। আমাদের মতো দেশে পরিবর্তনের অনিয়ন্ত্রিত স্রোতে যে প্রজন্ম বড় হচ্ছে সে শারীরিক, মানসিকভাবে অপুষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা। কাজেই শিশুর খাদ্যাভ্যাস তৈরির আর্থ-সামাজিক শর্তগুলো পূরণ, খাদ্যপুষ্টি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বাজার নিয়ন্ত্রণ–এই বিষয়গুলোই সামনে চলে আসছে। দৈনন্দিন এই সমস্যার সমাধানে ব্যক্তি চিকিৎসকের ভূমিকা মনে হয় সীমিত। এখানে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে চলে আসে রাষ্ট্র।
বনানী চক্রবর্তী: শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ। ইমেইল: cbanani24@gmail.com
