করোনাকালীন মানবাধিকার পরিস্থিতি

করোনাকালীন মানবাধিকার পরিস্থিতি

সময়কাল : ১ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল ২০২০ (সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন)

করোনা ভাইরাস মহাসংকটকালে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের বিষয়। গত ১ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুসন্ধান করে যে প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয় তার একটি সংক্ষিপ্ত রূপ প্রকাশ করা হয় গত ১৩ এপ্রিল। এটি এখানে প্রকাশ করা হল। এই গবেষকদলে ছিলেন: আনু মুহাম্মদ, ডক্টর শহিদুল আলম, ফরিদা আক্তার, ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, ডক্টর রুশাদ ফরিদী, ডক্টর সায়দিয়া গুলরুখ, এবং রেজাউর রহমান লেনিন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ৩০ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে করোনাভাইরাসের নতুন স্ট্রেইন ‘নভেল কোভিড-১৯’-কে ‘জনস্বাস্থ্যের জন্য আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয়’ (Public Health Emergency of International Concern) হিসাবে ঘোষণা করে। পরবর্তীতে এর সম্ভাব্য ভয়াবহ পরিণতির কথা ভেবে ১১ মার্চ ২০২০ এটিকে ‘বৈশ্বিক মহামারি’ (Pandemic) হিসাবে ঘোষণা করা হয়।

বাংলাদেশ সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে : “আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা হইতে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।” এছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসাবে বাংলাদেশের সংবিধানও অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করাকেও রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব বলে স্বীকার করে। এই দায়িত্ব পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে রাষ্ট্র পালন করবার অঙ্গীকার করেছে বটে, কিন্তু দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলো নয়াউদারবাদী ব্যবসা ও মুনাফাসর্বস্ব অবাধ বাজারব্যবস্থা কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক নীতি আরোপ করবার ফলে সংবিধানের প্রতিশ্রুতি পালনের ক্ষমতা রাষ্ট্র হারিয়েছে অনেক আগেই। ফলে স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও খাদ্যব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই কার্যত ভঙ্গুর। বাংলাদেশ তার সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন নীতির জন্য পালন করতে ব্যর্থ। কোভিড-১৯ মহামারির মুখে এই সত্য ভয়ংকর বিপজ্জনক বাস্তবতা হিসাবে সামনে হাজির হয়েছে। তা সত্ত্বেও আমরা মনে করি, স্বাস্থ্য অধিকার সংক্রান্ত যে সকল আন্তর্জাতিক আইন রয়েছে তাকে বলবৎ করবার সুযোগ বাংলাদেশের রয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তি-১৯৬৬, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক চুক্তি-১৯৬৬, নারীর বিরুদ্ধে সকল প্রকার বৈষম্য নির্মূল করার বিষয়ে কনভেনশন-১৯৭৯, নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক অথবা মর্যাদা হানিকর আচরণ বা শাস্তির বিরুদ্ধে চুক্তি-১৯৮৪, অভিবাসী শ্রমিক ও তাদের পরিবারের অধিকার সুরক্ষায় গৃহীত আন্তর্জাতিক চুক্তি-১৯৯০, জাতিসংঘের জাতিগত বৈষম্য দূরীকরণে চুক্তি-১৯৬৫, আন্তর্জাতিক রোম সংবিধি-১৯৯৮ ইত্যাদি। এইসব আন্তর্জাতিক বিধি-বিধানের মূলকথা হচ্ছে ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষেরই স্বাস্থ্য, পুষ্টি, চিকিৎসা, ওষুধ- অর্থাৎ সুস্থ, সবল ও রোগমুক্ত জীবনযাপনের অধিকার রয়েছে। খাদ্য, পুষ্টি ও স্বাস্থ্য- রোগমুক্ত জীবনধারণের জন্য যা দরকার তার অধিকার প্রতিটি মানুষের রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দায়িত্ব অধিক। কারণ এই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠবার মূলে রয়েছে মানুষের স্বাস্থ্যের অধিকার নিশ্চিত করবার জন্য ভূমিকা রাখা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১৯৪৬ সালের কনস্টিটিউশনেই রয়েছে, তার কাজই হচ্ছে  ‘মানুষের মৌলিক অধিকার হিসাবে অর্জনযোগ্য সবচেয়ে উচ্চ মানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।

এইসব আন্তর্জাতিক বিধি-বিধানের মূলকথা হচ্ছে ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষেরই স্বাস্থ্য, পুষ্টি, চিকিৎসা, ওষুধ- অর্থাৎ সুস্থ, সবল ও রোগমুক্ত জীবনযাপনের অধিকার রয়েছে। খাদ্য, পুষ্টি ও স্বাস্থ্য- রোগমুক্ত জীবনধারণের জন্য যা দরকার তার অধিকার প্রতিটি মানুষের রয়েছে।

কোভিড-১৯ মহামারির পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রেক্ষাপটগুলো মনে রাখলে মানবাধিকারের আলোকে আমরা এখানে যে প্রতিবেদন পেশ করছি তার গুরুত্ব বুঝতে সুবিধা হবে। সরকারি ঘোষণা মতে, বাংলাদেশে প্রথম রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ ২০২০। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কবাণী সত্ত্বেও বাংলাদেশ সরকার কোভিড-১৯ মহামারি প্রতিরোধের প্রস্তুতিতে অন্তত দুই মাস সময় হাতে পেয়েছিল, কিন্তু এই সময়টাতে সরকার যথাযথ সাড়া দেয়নি এবং প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে নাগরিকদের নিকট থেকে অভিযোগ এসেছে। এই মহামারি পরিস্থিতি শুধুমাত্র জনস্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলেছে তা নয়, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মৌলিক মানবাধিকার এবং বাংলাদেশের সংবিধানও যতটুকু অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে তা বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। মানবাধিকারের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতা এবং প্রেক্ষাপট সামনে রেখে কোভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারি চলাকালে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে গবেষণামূলক প্রতিবেদনটি প্রতিদিনের ঘটনাবলি যথাসম্ভব সংগ্রহ, নিরীক্ষণ ও পর্যালোচনার ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। গবেষণার উদ্দেশ্য হল বাংলাদেশের বিশেষ বাস্তবতায় বৈশ্বিক মহামারি প্রতিরোধের অভিজ্ঞতা মানবাধিকারের আলোকে তুলে ধরা। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কাঠামোগত সংস্কার ও নয়া-উদারবাদী অর্থনীতি চাপিয়ে দেবার ফলে বাংলাদেশ যে উন্নয়নের রাস্তা নিয়েছে, সেখানে অল্প কিছু পরিবার সম্পদশালী হলেও অধিকাংশই গরিব এবং দেশে ও বিদেশে সস্তা শ্রমের জোগানদার। বাজারমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থার ফলে জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা কার্যত ভঙ্গুর; সর্বোপরি গণমুখী রাজনৈতিক চর্চা ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতা বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি চরম বিপন্ন করে তুলেছে।

এই বাস্তবতার আলোকে যদি বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইতিহাস আমরা মনে রাখি, তাহলে বোঝা যাবে বাংলাদেশের কোভিড-১৯ মোকাবিলা বাংলাদেশের জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। সে কথা মনে রেখেই নাগরিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক অধিকারের পর্যালোচনা, ক্ষেত্রবিশেষে আইনি পর্যালোচনা এবং বিশ্লেষণ, এবং মানবাধিকার হরণকারীদের ভূমিকা ও প্রতিক্রিয়াগুলো শনাক্ত ও মূল্যায়ন করা আমরা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছি, যাতে ভুক্তভোগীদের মানবাধিকার এবং পরবর্তীতে ন্যায়বিচার যেমন নিশ্চিত করা যায়, একই সঙ্গে মানবাধিকারকর্মী হিসাবে বাস্তব পরিস্থিতির আলোকে আমরা আমাদের কর্তব্য নির্ধারণ করতে পারি। এই প্রতিবেদনটি মূলত ১ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল ২০২০ তারিখ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ১২টি জাতীয় দৈনিক এবং অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত মানবাধিকার হরণের ঘটনাবলির ওপর নজর রেখে ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ, পর্যালোচনা ও সমালোচনার ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার

ক. করোনা নির্ণয় পরীক্ষা নিয়ে টালবাহানা এবং মহামারি মোকাবিলা প্রস্তুতিতে কালক্ষেপণ

বাংলাদেশ স্থল-জল-বিমান বন্দরগুলোতে চলাচলের ক্ষেত্রে ন্যূনতম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে কালক্ষেপণ করেছে। এখনও প্রতিদিন বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে বিশেষ প্রয়োজনে ভারত থেকে মানুষ ফিরছে, যাদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা কিংবা সংক্রমণের পরীক্ষা অপ্রতুল, কমিউনিটি সংক্রমণের ঝুঁকি প্রতিরোধে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট তৎপর নয়। ৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করতে সরকার আরও এক সপ্তাহ সময় নেয়। ১৪ মার্চ মন্ত্রিসভার সদস্য ওবায়দুল কাদের বলেন, “স্কুল-কলেজ বন্ধের পরিস্থিতি এখনও হয়নি” (১৪ মার্চ ২০২০, সমকাল)। প্রাথমিক পর্যায়ে সরকার জনগণকে নিজের ঘরে (হোম) কিংবা সরকারিভাবে ব্যবস্থা করা প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করার ব্যাপারেও ছিল চরম উদাসীন। এই করোনা মহামারি সংক্রমণ থেকে বাঁচতে ব্যবস্থা নিতে হত সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন-২০১৮ এর ধারা ৪(ভ) অনুযায়ী গেজেট প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে; উক্ত আইনের আওতাভুক্ত করতে হত, যা করা হয়নি। পরবর্তীতে এক রিট মামলার পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট এক দিনের মধ্যে গেজেট প্রকাশ করার আদেশ দিলে সরকার (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়) বিগত ১৯ মার্চ প্রজ্ঞাপন জারি করে এবং ২৩ মার্চ তা গেজেট আকারে প্রকাশ করে। এর আগ পর্যন্ত উক্ত আইনের অধীনে কোন পদেক্ষেপ নেয়ার আইনগত ভিত্তি ছিল না। কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন, লকডাউন- সব এ আইনেই বলা আছে।

এই করোনা মহামারি সংক্রমণ থেকে বাঁচতে ব্যবস্থা নিতে হত সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন-২০১৮ এর ধারা ৪(ভ) অনুযায়ী গেজেট প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে; উক্ত আইনের আওতাভুক্ত করতে হত, যা করা হয়নি। পরবর্তীতে এক রিট মামলার পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট এক দিনের মধ্যে গেজেট প্রকাশ করার আদেশ দিলে সরকার (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়) বিগত ১৯ মার্চ প্রজ্ঞাপন জারি করে এবং ২৩ মার্চ তা গেজেট আকারে প্রকাশ করে। এর আগ পর্যন্ত উক্ত আইনের অধীনে কোন পদেক্ষেপ নেয়ার আইনগত ভিত্তি ছিল না। কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন, লকডাউন- সব এ আইনেই বলা আছে।

আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য চিকিৎসাব্যবস্থা অপর্যাপ্ত। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দেয়া সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, এই মুহ‚র্তে শুধু করোনার জন্য নিবেদিত আইসিইউ প্রস্তুত রাখা আছে ১০০-১৫০টি। জেলা ও উপজেলা সরকারি হাসপাতালের মোট ৬৫৪টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বর্তমানে শয্যাসংখ্যা ৫১ হাজার ৩১৬ এবং প্রাইভেট হাসপাতালের মোট ৫ হাজার ৫৫টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৯০ হাজার ৫৮৭টি শয্যা রয়েছে। এদের মধ্য থেকে দেশব্যাপী ৬ হাজার ৬৯৩টি শয্যা শুধু করোনার জন্যই আলাদাভাবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে (৯ এপ্রিল ২০২০, প্রথম আলো)। করোনা সংক্রমণের চতুর্থ পর্যায়ে আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা দেয়ার জন্য এই প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়।

২৩ মার্চ পর্যন্ত সারা দেশের সকলের কোভিড-১৯ শনাক্তকরণ পরীক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান- রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। এখানে প্রধানত ‘নো টেস্ট নো করোনা’পলিসিতেই চলেছে টেস্টিং প্রক্রিয়া। এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের মতে, তাঁদের দিনে ১০০০ নমুনা পরীক্ষা করার সামর্থ্য আছে (১৬ মার্চ ২০২০, বিবিসি বাংলা), যদিও বাস্তবে তাঁরা মার্চ মাসে ১০০টির বেশি পরীক্ষা করতে পারেননি এবং সর্বপ্রথম ৮ এপ্রিল সর্বাধিক নমুনা পরীক্ষা হয়েছে- ৯৮১টি (৮ এপ্রিল ২০২০, বাংলা নিউজ) এবং ৯ এপ্রিল থেকে সারা দেশে নমুনা পরীক্ষা চলছে এক হাজারের ওপর। সর্বস্তরের জনগণের ব্যাপক সমালোচনার প্রেক্ষিতে সরকার সম্প্রতি কোভিড-১৯ পরীক্ষার ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ করেছে। এই মুহুর্তে সারা দেশে ঢাকার ভেতরের নয়টি এবং ঢাকার বাইরের আটটিসহ মোট ১৭টি প্রতিষ্ঠান কোভিড-১৯ পরীক্ষাকেন্দ্র আছে। জানুয়ারি মাসের ২১ তারিখ থেকে এ পর্যন্ত (১০ এপ্রিল) সর্বমোট ৮ হাজার ৩১৩ জনের কোভিড-১৯ শনাক্তকরণ পরীক্ষা করা হয়েছে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় পরিসংখ্যানগতভাবে অগণ্য।

কোভিড-১৯ শনাক্তকরণ পরীক্ষার পুরো বিষয়টি সরকার শুরু থেকেই নিয়ন্ত্রণ করে রেখেছে, এমনকি সরকারি অন্য সংস্থাকে দায়িত্ব দেয়ার ক্ষেত্রেও গড়িমসি করেছে। করোনা আক্রান্ত দেশ থেকে আগত দেশি ও বিদেশি নাগরিকরাই করোনা সংক্রমণের শিকার বা এ ভাইরাসটির বাহকÑএই পূর্বানুমানের ওপর ভিত্তি করেই আইইডিসিআরের বিশেষজ্ঞরা তাঁদের টেস্টিং নীতি নির্ধারণ করেন। এই পূর্বানুমানের ফলে বিদেশে অবস্থিত অভিবাসীদের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে এমং অনেকের ওপর গুজবনির্ভর আক্রমণ ও নির্যাতন হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশে স্বাস্থ্য আন্দোলনের অগ্রগামী সংগঠন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র যখন সংবাদ সম্মেলন করে জানায় যে তাদের বিশেষজ্ঞরা স্বল্প খরচে করোনা টেস্টিং কিট তৈরি করেছে, তখন তাদের এই কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে না দিয়ে বরং প্রাথমিক পর্যায়ে সরকার প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। কিট তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আনার অনুমতি দিতে সময় লেগে যায় এক সপ্তাহেরও অধিককাল। অন্যদিকে বাংলাদেশ ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের কোন অনুমোদন ছাড়া এবং মান সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে সরকারি দলের নেতারা অবৈধভাবে চীন থেকে অনির্ভরযোগ্য র‌্যাপিড টেস্টিং কিট আমদানি করে বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহ করেছে (৬ এপ্রিল ২০২০, নিউ এইজ)।

কোভিড-১৯ পরীক্ষার যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় এবং স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য যথাসময়ে পারসোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট (পিপিই) সরবরাহ না করার কারণে কোভিড-১৯-এর মত উপসর্গ নিয়ে রোগী ও তার স্বজনরা ভয়াবহ ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। জনস্বার্থে গবেষণায় নিয়োজিত একটি গবেষকদলের (গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল) হিসাব মতে, সারা দেশে ৮ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত কোভিড-১৯-এর লক্ষণ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩০। এই মৃত্যুগুলো সম্পর্কে সরকারিভাবে মৌন অবলম্বন কিংবা   ‘নিউমোনিয়া’, ‘সাধারণ জ্বর’ ও ‘শ্বাসকষ্ট’ কিংবা    হার্ট অ্যাটাক’ বলা হচ্ছে। কোভিড-১৯-এর লক্ষণে মৃত্যুর বেসরকারি তালিকায় এমন মানুষ আছেন, যাঁরা নির্ধারিত হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে আইইডিসিআর থেকে নমুনা সংগ্রহের অপেক্ষায় থাকাকালে মারা গেছেন। আবার এমনও ব্যক্তি আছেন, যাঁরা থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে সদর হাসপাতালে এসেছেন, সেখান থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে বেসরকারি হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন, পরিশেষে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন।

খ. করোনার প্রভাব : কৃষি ও খাদ্য

কোভিড-১৯ বা করোনাভাইরাসের কারণে সারা দেশে প্রায় লকডাউন পরিস্থিতিতে কৃষি খাত ভয়ংকর দুর্যোগের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাবে বাংলাদেশে খাদ্যের অভাব ঘটবে। লকডাউন ও ঘরবন্দি পরিস্থিতিতে গ্রাম থেকে শহরে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং শহরে খাদ্য সরবরাহের স্থানগুলো থেকে ঘরবন্দি মানুষ কিভাবে খাদ্য পাবে কিংবা কিনবে তার কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। খাদ্য নিরাপত্তা মানবাধিকারও বটে।

বিস্ময়কর হল, গত ৫ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন, কিন্তু কৃষি ও কৃষকের জন্য আলাদা করে কোন প্রণোদনার ব্যবস্থাই সেখানে নেই! অথচ বৈশ্বিক মহামারি মোকাবিলা পরিকল্পনায় জনগণের খাদ্য নিশ্চিত করতে চাইলে কৃষি খাতের প্রতি সবার আগে নজর দেয়া জরুরি ছিল। ইতিমধ্যেই ১ মার্চ থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত কৃষি খাতে করোনার প্রভাব নিয়ে যেসব প্রতিবেদন পত্রিকা ও নিউজ চ্যানেলগুলোতে আসা শুরু করেছে সেটা খুবই উদ্বেগজনক। কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের দাম না পাওয়ার অর্থ কৃষিকাজে কৃষককে নিরুৎসাহ করা। অন্যদিকে কৃষককে করোনা সংক্রমণ থেকে নিরাপত্তা দানের বিষয়টি সরকার কিভাবে দেখছে সেটি নিয়ে বিস্তারিত কোন পরিকল্পনা জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়নি। কৃষকের কাছে কিভাবে সঠিক তথ্য পৌঁছাবে, কিভাবে তারা সংক্রমণ থেকে দূরে থেকে মাঠে কাজ করবে বা আদৌ কাজ করতে পারবে কি না সেটা নিয়েও আলাদা করে কোন বিস্তারিত নির্দেশাবলি নেই। অবশেষে যদিও অনেক দেরিতে হলেও ১২ এপ্রিল করোনা অভিঘাত সামাল দিতে দেশের কৃষি ও কৃষকের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার ‘প্রণোদনা তহবিল’ করার ঘোষণা দিয়েছে রাষ্ট্র এবং ‘প্রণোদনা’ আসলে কতটুকু ‘প্রণোদনা’ আর কতটুকু আসলে ঋণ? আবার সন্দেহ আছে, আসলে কৃষক কতটা পাবে? ‘প্রণোদনা’র সাথে যুক্ত অন্তত দুটো মন্ত্রণালয়, যেমন- কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও পশুপালন মন্ত্রণালয়। কে কাকে দেবে? বেশির ভাগ অংশই কি পোলট্রি খামারি, দুগ্ধ খামারি, মাছ চাষি এবং ফল উৎপাদনকারীদের জন্য? তবু সেটা গ্রামে যাবে, হয়ত এর ফল কিছুটা সাধারণ কৃষক পাবে।

বাংলাদেশের পোলট্রি সেক্টর বার্ড ফ্লুর দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে বার বার, ভাইরাস মহামারির সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পোলট্রির সম্বন্ধ নিয়ে বিজ্ঞানীরা উদ্বিগ্ন। গত বছরের শেষের দিক থেকে বাংলাদেশের পোলট্রি সেক্টরে বার্ড ফ্লু সংক্রমণে বিশেষ স্ট্রেইন ধরা পড়েছে, এতে শুধু পোলট্রি মারাত্মক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়নি, একই সাথে মানুষের স্বাস্থ্য বিপন্ন হবার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

গ. অভুক্ত বেতনহীন করোনায় খরচযোগ্য শ্রমিক শ্রেণি এবং সরকার ও গার্মেন্টস মালিকদের অপরাধমূলক কর্মকান্ড

এই ভয়াবহ করোনাকালীন পরিস্থিতিতে সরকার ও গার্মেন্টস মালিকরা মিলে শ্রমিকদের পিংপং বলের মত একবার ঢাকা থেকে বাইরে এবং পরে বাইরে থেকে ঢাকায় ছুড়ে ফেলার যে দৃষ্টান্ত রেখেছে, তা ছিল অমানবিক ও নিষ্ঠুর।

২১ মার্চ জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতিকে সাথে নিয়ে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সভাপতি ও নেতাদের সাথে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান সুফিয়ান, বাণিজ্য সচিব ও শ্রম সচিব। সেই সভায় শ্রমিক লীগের সভাপতি ও গার্মেন্টস মালিকদের নেতারা কারখানা খোলা রাখার পক্ষে মত দেন। সরকার সারা দেশে ‘সাধারণ ছুটি’ ঘোষণা করে ২৩ মার্চ। তাতে কার্যত ছুটির মোট মেয়াদ দাঁড়ায় ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত এবং এখন তা ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত করতে হয়েছে এবং এর মাঝে জরুরি পণ্য শিপমেন্ট এবং মাস্ক ও চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামসহ (পিপিই) করোনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সামগ্রী তৈরির কাজে নিয়োজিত ৪১টি পোশাক কারখানা খোলা রয়েছে (৮ এপ্রিল ২০২০, যুগান্তর)। কিন্তু এই ছুটির আওতা থেকে গার্মেন্টস কারখানাসহ অন্যান্য কারখানাকে বাইরে রাখা রীতিমত অপরাধ। কারণ সংক্রমণের আশঙ্কা থাকলেও সজ্ঞানেই শ্রমিকদের কারখানায় গাদাগাদি করে কাজ করানো হয়েছে। সরকারও সুস্পষ্টভাবে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করে জানিয়েছে যে প্রয়োজনীয় রফতানিমুখী শিল্প-কারখানা মালিকরা চালু রাখতে পারবেন (প্রজ্ঞাপন নং ০৫ ০০০০০০ ১৭৩ ০৮ ০১৪ ০৭ ৭৬)। শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও শরীর মালিকদের ওপরই ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

সংক্রমণের আশঙ্কা থাকলেও সজ্ঞানেই শ্রমিকদের কারখানায় গাদাগাদি করে কাজ করানো হয়েছে। সরকারও সুস্পষ্টভাবে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করে জানিয়েছে যে প্রয়োজনীয় রফতানিমুখী শিল্প-কারখানা মালিকরা চালু রাখতে পারবেন (প্রজ্ঞাপন নং ০৫ ০০০০০০ ১৭৩ ০৮ ০১৪ ০৭ ৭৬)। শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও শরীর মালিকদের ওপরই ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

২ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে যে ৩১ দফা নির্দেশনা আসে, সেখানে ২৯ নম্বর নির্দেশনাটি ছিল : শিল্প মালিকরা শ্রমিকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে উৎপাদন অব্যাহত রাখবেন (যুগান্তর প্রিন্ট সংস্করণ, ৩ এপ্রিল ২০২০)। ৪ এপ্রিল রাতে শ্রমিকদের ঢাকা আসতে বাধ্য করা হয়, কারণ কাজে যোগদান না করলে তাদের চাকরি হারাবার ভয় থাকে। অচল পরিবহন ব্যবস্থা সত্ত্বেও অনেকে আবার হেঁটে বাড়ি গেলেন আর অনেকেই যেতে পারলেন না। এরপর সমালোচনার মুখে বিজিএমইএ যথারীতি কোন নির্দেশ না দিয়ে নতুন করে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত ফ্যাক্টরি বন্ধ রাখার আবারও অনুরোধ জানায়। রাত ১২টায় কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত জানায় বিকেএমইএ।

করোনা মহামারি মোকাবিলায় দেশের সাধারণ ছুটিতে সারা দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে দুই লাখের মত চা বাগানে কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা ছুটি পায়নি, যদিও ১ এপ্রিল ২০২০ চা শ্রমিকদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল। গত ৮ এপ্রিল কমলগঞ্জের রহিমপুরে চা শ্রমিকের ১৩ বছরের শিশু করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যায় এবং মৃত শিশু ও তার মায়ের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে; কিন্তু পরীক্ষার রিপোর্ট এখনও হাতে পাওয়া যায়নি। ঝুঁকিপূর্ণ, আতঙ্কিত ও নিপীড়িত চা শ্রমিকরা এই অব্যবস্থাপনা ও উদাসীনতার জন্য মালিকপক্ষ এবং কিছু শ্রমিক নেতাকে দায়ী করেছে। গার্মেন্টস শ্রমিকদের মত চা বাগানের শ্রমিকদের কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে অথচ বেতন দেয়া হচ্ছে না। একই সাথে মেগা প্রজেক্টগুলোতে, বিশেষ করে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে শ্রমিকদের কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো কোন এক অজানা কারণে খুব দ্রুত গতিতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এরা সরকারি নির্দেশ মানছে না এবং সরকারও কিছুই বলছে না এদের বিষয়ে।

গার্মেন্টস শ্রমিকদের মত চা বাগানের শ্রমিকদের কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে অথচ বেতন দেয়া হচ্ছে না। একই সাথে মেগা প্রজেক্টগুলোতে, বিশেষ করে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে শ্রমিকদের কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো কোন এক অজানা কারণে খুব দ্রুত গতিতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

দিনমজুরদের মধ্যে কমপক্ষে তিনজন অভাবের কারণে আত্মহত্যা করেছে। লক্ষ লক্ষ শ্রমিক এখন অভুক্ত, বেতনহীন এবং আটকে পড়ে আছে রাজধানীতে। এখন পর্যন্ত গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন বুঝিয়ে দিয়ে কারখানা বন্ধ রাখার কোন সুস্পষ্ট সরকারি নির্দেশ নেই। এই পরিস্থিতিতে গার্মেন্টস শ্রমিকরা সংক্রমণের ঝুঁকি সত্তে¡ও প্রতিবাদে রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছে। মহামারি মোকাবিলার কোন প্রকার পরিকল্পনা ছাড়া ‘সরকারি ছুটি’ দিয়ে কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা এবং রাজধানী থেকে শ্রমিকদের গ্রামে যেতে বাধ্য করা, আবার কারখানা মালিকরা তাদের মহামারি চলাকালে আবার পরিবহনব্যবস্থা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ পথ হেঁটে আসতে বাধ্য করার মধ্য দিয়ে রাজধানীতে যেভাবে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করল সেটা এই বিশ্বমারী চলাকালে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। অর্থাৎ শুধু শ্রমিক নয়, সারা দেশে সংক্রমণ ছড়িয়ে দেবার ব্যবস্থা করা হল। এই অপরাধের কোন ক্ষমা হয় না। বাংলাদেশের নাগরিকরা কোথায় এই অপরাধের বিচার চাইবে?

মহামারি মোকাবিলার কোন প্রকার পরিকল্পনা ছাড়া ‘সরকারি ছুটি’ দিয়ে কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা এবং রাজধানী থেকে শ্রমিকদের গ্রামে যেতে বাধ্য করা, আবার কারখানা মালিকরা তাদের মহামারি চলাকালে আবার পরিবহনব্যবস্থা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ পথ হেঁটে আসতে বাধ্য করার মধ্য দিয়ে রাজধানীতে যেভাবে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করল সেটা এই বিশ্বমারী চলাকালে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।

ঘ. করোনা সংক্রমণকালে পাহাড়ে হাম, খাদ্যঘাটতি এবং দেশব্যাপী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ

পার্বত্য চট্টগ্রামে করোনা সংক্রমণের আতঙ্কের পাশাপাশি চলছে হামের সংক্রমণ। আদিবাসী ফোরাম ও কাপায়েং ফাউন্ডেশনের একটি বিবৃতি (২৮ মার্চ ২০২০) থেকে জানা যায়, এ পর্যন্ত সাজেকের তুইছুই মৌজার অরুণপাড়া, লংথিয়ারপাড়া, কমলাপুর, চাকমাপাড়া, নিউথাং/নতুনপাড়া, হাইচ্যাপাড়াসহ সাজেকের প্রায় ৬টি গ্রামের ২৫০-র বেশি শিশু এই হামে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৯টি শিশু মৃত্যুবরণ করেছে। কেবল সাজেক নয়, বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার ম্রো অধ্যুষিত লাল্যেপাড়ায় ৪২ জন এই রোগে আক্রান্ত এবং এযাবৎ ৪ মাস বয়সী একটি শিশু মারা গেছে। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে হাম ও রুবেলার টিকা দেশের সকল শিশুকে দেয়ার বিধান রয়েছে, কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুরা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এই ব্যর্থতার দায় এড়াতে খাগড়াছড়ি জেলার কমিশনার ও সিভিল সার্জন ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীকে দোষারোপ করে বলেন, ‘কুসংস্করাচ্ছন্ন’ আদিবাসীরা টিকা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে না।

এ পর্যন্ত সাজেকের তুইছুই মৌজার অরুণপাড়া, লংথিয়ারপাড়া, কমলাপুর, চাকমাপাড়া, নিউথাং/নতুনপাড়া, হাইচ্যাপাড়াসহ সাজেকের প্রায় ৬টি গ্রামের ২৫০-র বেশি শিশু এই হামে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৯টি শিশু মৃত্যুবরণ করেছে।

করোনার মহামারিজনিত কারণে খাদ্যসংকটে দেশের হাজার হাজার আদিবাসী পরিবার। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ ও কাপেং ফাউন্ডেশনের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে বিশেষ করে গাইবান্ধার প্রায় ১২০০টি সাঁওতাল পরিবার এবং রাজশাহীতে ২০০০টি সাঁওতাল, পাহাড়িয়া ও ওঁরাও পরিবার; ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়ায় ৩০০ কোচ-বর্মণ পরিবার; সিলেট অঞ্চলের মৌলভীবাজার জেলাধীন শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালীঘাট ইউনিয়নের দুই শতাধিক গারো জনগোষ্ঠী; কক্সবাজারের রামু উপজেলার ঈদগড় ইউনিয়নের দুর্গম গ্রাম বৈদ্যপাড়ার অর্ধশতাধিক রাখাইন পরিবার; বান্দরবান জেলার লামা, থানচি, আলীকদম, রুমা, নাইক্ষ্যংছড়ি ও রোয়াংছড়ি উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের ম্রো, খুমি, চাক, ত্রিপুরা ও মারমা সম্প্রদায়ের অন্তত ৫০০০ পরিবার; চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন পাহাড়ে বসবাসকারী প্রায় ৮০০ ত্রিপুরা পরিবার; রাঙামাটির সাজেকের হতদরিদ্র ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীসহ খাগড়াছড়ির পানছড়ি, মাটিরাঙ্গা, গুইমারা, মহালছড়ি, রামগড় প্রভৃতি উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের ত্রিপুরা, মারমা ও চাকমা জনগোষ্ঠীর ৭০০০ পরিবার জীবন কাটাচ্ছে অনাহারে-অর্ধাহারে।

ঙ. করোনাকালীন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী পরিস্থিতি

চলমান করোনা মহামারি, অপর্যাপ্ত প্রয়োজনীয় সংস্থানসমূহের কারণে রোহিঙ্গা জনসাধারণের সুরক্ষা সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যে প্রধানতম হল বিপর্যস্ত রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে মারাত্মক রোগের বিস্তার প্রতিরোধ। মার্চ ও এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত আইইডিসিআরের তথ্য মতে, কক্সবাজারে একজন রোগী আক্রান্ত হয়েছেন এবং ১৫০ জনের মত ব্যক্তিকে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। এর আগে ৫০০ জনের মত ব্যক্তি নিজ আইসোলেশন থেকে মুক্ত হয়েছেন। মহামারি ছড়িয়ে পড়লে রোহিঙ্গাদের পরীক্ষার সুবিধার অভাব বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এবং দক্ষ চিকিৎসা পেশাদারদের অভাব রয়েছে।

সমস্যা যথেষ্ট জটিল কারণ গণহত্যা, নিপীড়ন এবং উপেক্ষা ও তাচ্ছিল্যের কঠিন সময়ের মধ্যে থাকার ফলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত থাকার জন্য বিভিন্ন প্রকার গুজবে নির্ভর করছে, কারণ তাদের আস্থার জায়গা নেই বললেই চলে। এই পরিস্থিতিতে আমরা মনে করি, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সঠিক তথ্য প্রদান জরুরি এবং তার জন্য অবিলম্বে সঠিক বিন্যাসে তথ্য সংরক্ষণের জন্য কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। মহামারির গতিপথ চেনা এবং বিস্তারের পথগুলো বিচ্ছিন্ন করে দেবার জন্য তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ জরুরি। এগুলো সবই সম্ভব, কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে চলমান মোবাইল ইন্টারনেট নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নিলে এবং চারপাশে বেড়া নির্মাণ বন্ধ করে দিলে।

গণহত্যা, নিপীড়ন এবং উপেক্ষা ও তাচ্ছিল্যের কঠিন সময়ের মধ্যে থাকার ফলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত থাকার জন্য বিভিন্ন প্রকার গুজবে নির্ভর করছে, কারণ তাদের আস্থার জায়গা নেই বললেই চলে।

অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের শিবিরগুলোতে করোনভাইরাসটি যাতে ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার শিবিরের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সংস্থার অতিরিক্ত কার্যক্রম সীমাবদ্ধ করাসহ বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। শরণার্থী ত্রাণ এবং প্রত্যাবাসন কমিশন (আরআরআরসি) সূত্র জানিয়েছে যে স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, জরুরি খাদ্য, পানি এবং নর্দমা ব্যবস্থা সংক্রান্ত সুরক্ষা ব্যতীত পরবর্তী বিজ্ঞপ্তি না হওয়া পর্যন্ত কাজ বন্ধ থাকবে এবং একই সাথে মানবিক সহয়তাকারীরা নানা ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছে। সাথে আমরা প্রশ্ন করতে চাই, আরআরআরসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যাঁরা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানবিক সহায়তায় যুক্ত তাঁদের পারসোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট সরবরাহ কি করা হয়েছে এবং হয়ে থাকলে তা কি পর্যাপ্ত এবং যথাযথ?

চ. করোনাকালীন উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী অধিকার এবং বাস্তবতা

“করোনাভাইরাস জো হ্যায়- অ্যা বড়া আদমি কা বিমার হ্যায়, হামতো অ্যাছি করোনা জিন্দেগি জিইয়ে রাহে হ্যায়”- এমন করে একটি দৈনিক পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে বলছিলেন রাজধানী ঢাকার উর্দুভাষী একজন অধিবাসী (বাংলাদেশ সময় ৮ এপ্রিল ২০২০)। বাংলাদেশে কয়েক লাখ উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় স্থায়ী এবং অস্থায়ী ক্যাম্প করে বসবাস করছে, পেশায় প্রায় সকলে দিনমজুর-শ্রমজীবী মানুষ। করোনাকালীন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার তাদের জনগোষ্ঠীর জন্য করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকাবিলায় কী ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে তা গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে আমরা জানতে পারিনি। এ ব্যাপারে কোন প্রকার দিকনির্দেশনা আছে কি না জানা যায়নি। মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ বলে আমাদের মনে হয়েছে-

১) করোনাভাইরাসজনিত কারণে তাদের দোকানপাট, ক্ষুদ্র কারখানা সব বন্ধ, রুদ্ধ হয়েছে অন্য সব আয়ের পথও। খাবারের অভাবে তারা অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে।

২) ক্ষুব্ধ ক্যাম্প বাসিন্দারা অভিযোগ করে, “ক্যাম্প এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলররা প্রায় প্রতিদিনই হাজার হাজার বিহারি পরিবারে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছেন বলে প্রচার করে বেড়ান। কিন্তু বিহারি ক্যাম্পে ত্রাণের বস্তা কিংবা তৈরি খাবারের প্যাকেট আজ পর্যন্ত দিতে আসেননি কেউ” (৮ এপ্রিল ২০২০, বাংলাদেশ প্রতিদিন)।

“ক্যাম্প এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলররা প্রায় প্রতিদিনই হাজার হাজার বিহারি পরিবারে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছেন বলে প্রচার করে বেড়ান। কিন্তু বিহারি ক্যাম্পে ত্রাণের বস্তা কিংবা তৈরি খাবারের প্যাকেট আজ পর্যন্ত দিতে আসেননি কেউ”

অন্যদিকে তৃতীয় লিঙ্গ ও যৌনকর্মীদের জন্য ত্রাণ দেয়ার কাজে নিয়োজিত একজন স্বেচ্ছাসেবক ও মানবাধিকারকর্মী বলেন, “কাজে বের হতে না পেরে এই জনগোষ্ঠী মূলধারার দরিদ্রদের মতই বিপদে আছে, কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্র পর্যাপ্ত মানবিক হয়ে তাদের পাশে দাঁড়ায়নি।” যদিও সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে তৃতীয় লিঙ্গ, প্রতিবন্ধী এবং যৌনকর্মীদের আর্থিক সাহায্য ও সহযোগিতার কার্যক্রমে যুক্ত করবার, কিন্তু করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে সার্বিকভাবে সরকার দলিত, জেলে, হাওরের অধিবাসীদের, পাহাড়ের এবং সমতলের আদিবাসী, এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি তার চিরায়ত অবহেলা, অবজ্ঞা ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণই অব্যাহত রেখেছে।

আমরা মনে করি, করোনাভাইরাস মহামারি পরিস্থিতিতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এবং অপরাপর নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর জন্য বাংলাদেশ সরকারের উচিত আন্তর্জাতিক চুক্তি দ্বারা নির্ধারিত বাধ্যবাধকতাগুলো সঠিকভাবে মেনে চলা এবং নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীসহ স্থানীয়দের সর্বোচ্চ মানের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সম্পর্কিত মানবাধিকার সমুন্নত রাখা। একই সাথে মানবিক সহায়তার জন্য যাঁরা নিয়োজিত-সরকারি কিংবা বেসরকারি- তাঁরা যেন সঠিক সময় প্রয়োজনীয় এবং জরুরি সেবা প্রদান করতে পারেন। এটা নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশ সরকারের রয়েছে। সেই সাথে মানবিক সহায়তা এবং মানবাধিকারকর্মীদের সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে।

নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার

ছ. জোরপূর্বক গুম, খুন এবং বিচারবহির্ভত হত্যাকাণ্ড

করোনাকালীন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গুম, খুন ও নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড এবং মৌলিক অধিকারের হরণ প্রতিনিয়ত চলেছে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয়, বিভিন্ন পত্রিকার তথ্য মতে করোনাকালীন পরিস্থিতিতে ১ মার্চ থেকে ৮ এপ্রিল ২০২০ পর্যন্ত বিচারবহির্ভ‚ত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ৪৪ জন। এই সকল বিচারবহির্ভ‚ত হত্যাকাণ্ডে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের হাতে ১১ জন, পুলিশের হাতে ২৪ জন, পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের হাতে ৯ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এই বিচারবহির্ভ‚ত হত্যাকাণ্ডের শিকার ৪৪ জনের মধ্যে ৫ জন পুলিশি হেফাজতে ছিলেন, ৩ জনকে নির্মম নির্যাতন ও পিটিয়ে আহত করে মেরে ফেলেছে (ফেলা হয়েছে) বলে অভিযোগ রয়েছে এবং অপরজন বিমানবন্দর এলাকা থেকে গ্রেফতারের কয়েক ঘণ্টা পর খিলগাঁও এলাকায় বন্দুকযুদ্ধের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।

এখানে উলে­খ্য, ১ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল ২০২০ তারিখ পর্যন্ত পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে ‘অপহরণ’ কিংবা জোরপূর্বক গুম হয়েছেন ২ জন। গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের চুপাইর গ্রামে সাদা পোশাকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে সরকারি কলেজের শিক্ষক মোতাহার হোসেনকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন তাঁর ভাই মহসিন কবির (১৭ মার্চ ২০২০, প্রথম আলো)। অন্যদিকে মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুজ্জামান শিখরের ডিজিটাল নিরাপত্তা মামলা দায়ের করার পর থেকে সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল গত ১০ মার্চ সন্ধ্যা থেকে নিখোঁজ এবং তাঁর পরিবার মনে করে, তাঁকে লেখালেখির কারণে ‘অপহরণ’ কিংবা ‘জোরপূর্বক গুম’ করা হয়েছে।

মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুজ্জামান শিখরের ডিজিটাল নিরাপত্তা মামলা দায়ের করার পর থেকে সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল গত ১০ মার্চ সন্ধ্যা থেকে নিখোঁজ এবং তাঁর পরিবার মনে করে, তাঁকে লেখালেখির কারণে ‘অপহরণ’ কিংবা ‘জোরপূর্বক গুম’ করা হয়েছে।

জ. আইন-শৃঙ্খলা এবং বাহিনীর দ্বারা নির্যাতন

করোনাকালীন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারা নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক অথবা মর্যাদা হানিকর আচরণ বা শাস্তির আচরণ পরিলক্ষিত হয়েছে। এই ঘটনাগুলো কমবেশি গণমাধ্যমে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে, মূলত আইন-শৃঙ্খলা এবং প্রয়োগকারীদের নির্যাতনের শিকার হয়েছে দিনমজুর, সাংবাদিক, আইনজীবী এবং ঠিক কী পরিমাণ মানুষ নির্মম নির্যাতনের এবং অবমাননাকর শাস্তির শিকার হয়েছে তার পরিসংখ্যান পত্রিকা কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দ্বারা নিরূপণ করা কঠিন। এর মধ্যে আলোচিত ঘটনাগুলো হল : ১৫ মার্চ অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম রিগ্যান কুড়িগ্রামের সদ্য সাবেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) সুলতানা পারভীনের নির্দেশে সিনিয়র সহকারী কমিশনার, রাজস্ব (আরডিসি) নাজিম উদ্দিন, সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা ও এস এম রাহাতুল ইসলাম দ্বারা নির্যাতন; ২৭ মার্চ যশোরের মণিরামপুর উপজেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইয়েমা হাসান দ্বারা তিন বৃদ্ধকে মুখে মাস্ক ছিল না বলে কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখার পর সেইগুলোর ছবি মোবাইলে ধারণ করেন।

একই রকমভাবে ২৮ মার্চ যশোরের মণিরামপুরের পর সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে ইউএনও সিফাত-ই-জাহান কর্তৃক ৫ জনকে কান ধরিয়ে উঠবস করানোর ছবি স্থানীয়দের মাধ্যমে গণমাধ্যমে ফাঁস হয়েছে এবং কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিদা আক্তারের অফিস সহায়ক (পিয়ন) মো. সাইফুল ইসলাম এবং তাঁদের সাথে যুক্ত পুলিশ সদস্যবৃন্দ লাঠি হাতে নিয়ে একাধিক লোককে পিটুনি, কানে ধরানো ও ধাওয়া এবং ২৮ মার্চ ২০২০ শুক্রবার সন্ধ্যায় ঠাকুরগাঁওয়ে উপজেলার কালুপীর বাজারে পীরগঞ্জের এসি ল্যান্ডের (সহকারী কমিশনার ভূমি) তরিকুল ইসলাম এক ইউপি সদস্য গাজিউর রহমানকে জনসমক্ষে পেটানো। ওপরের উলে­খিত প্রত্যেকটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জনপ্রশাসন এবং আইন প্রয়োগকারী সংগঠনের উচিত ছিল খুব দ্রুত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া, কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার, তদন্ত, বেতন ও অন্যান্য সুবিধা বাতিল, এবং নাগরিকদের নির্যাতনের ফলে বাংলাদেশের সংবিধান, অপরাধ আইনসমূহ এবং ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা করা।

গত ২৮ মার্চ ২০২০ তৎকালীন পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. জাবেদ পাটোয়ারী নির্দেশনা দেন যে দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে রাস্তাঘাটে চলাচল সীমিত করার সরকারি নির্দেশ রয়েছে, দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ সদস্যদের তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিনয়ী, সহিষ্ণু ও পেশাদার আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তার পরও আমরা গণমাধ্যমে খবর পেয়েছি, নড়াইল সদর উপজেলার শেখহাটি ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এবং বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা তরিকুল ইসলামকে মাস্ক না পরায় পেটান স্থানীয় ফাঁড়ির পুলিশ সদস্য মো. আলমগীর, মাসুদ, নাঈম, বিপ্লবসহ সাত-আটজনের একটি দল এবং টাঙ্গাইল পৌরসভার ১২ নং ওয়ার্ড কমিশনার মো. আমিনুর রহমান আমিনের ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, তিনি নিজেই কমপক্ষে ২০ জন নাগরিককে লাঠি দিয়ে পিটিয়েছেন তাঁর সহযোগীদের সহায়তায়।

ঝ. চিন্তা, বিবেক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা, নজরদারি এবং গুজব

বাংলাদেশ সরকার করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই তথ্যপ্রবাহ রোধ করার উদ্দেশ্যে চিন্তা, বিবেক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত করছে। করোনাভাইরাস মহামারি সম্পর্কে অবাধ তথ্য ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য কর্তৃপক্ষের উচিত, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, আইনজীবী, সাংবাদিক এবং মানবাধিকারকর্মীদের মানবাধিকার হরণের লক্ষ্যবস্তু না করা কিংবা আটক/গ্রেফতার না করা এবং ভাইরাস সম্পর্কে সঠিক ও সময়োপযোগী তথ্য প্রকাশ ও প্রদানের ব্যবস্থা করা এবং তা যেন সকলের নিকট উপলব্ধ হয় তা নিশ্চিত করা।

২০২০ সালের মার্চের মাঝামাঝি থেকে কর্তৃপক্ষগুলো করোনাভাইরাস সম্পর্কে তাদের মন্তব্যের জন্য স্পষ্টতই একজন চিকিৎসক, বিরোধী নেতা-কর্মী, আইনজীবী, শিক্ষার্থীসহ কমপক্ষে ৩০ জনকে গ্রেফতার করেছে, তাদের বেশির ভাগের মামলা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে। অন্যদিকে ২৫ মার্চ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় স্মারক জারি করে ঘোষণা করেছে যে কোভিড-১৯ সম্পর্কিত ‘অপ্রচার এবং গুজব প্রচার’ বন্ধের জন্য ৩০টি বেসরকারি টেলিভিশন (বিটিভি নয়) চ্যানেল পর্যবেক্ষণ করার জন্য ১৫ জন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়েছিল; কিন্তু পরের দিন জারিকৃত প্রজ্ঞাপনপত্রটিতে ‘ভুলভ্রান্তি থাকায় তা কর্তৃপক্ষের নির্দেশে’ প্রত্যাহার করা হয়। তথ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মিজান উল আলম ব্যাখ্যা দিয়ে প্রজ্ঞাপনটি সম্প্রসারণ করেছেন বলে আমরা মনে করি, কেননা এখানে বলা হয়েছে : “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে কোভিড-১৯ (করোনাভাইরাস) বিষয়ে কোন গুজব বা ভুল তথ্য প্রচার হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রচারমাধ্যমকে সহায়তা করার জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়ে একটি সেল গঠন করা হয়” (তথ্য মন্ত্রণালয় স্মারক নং- ১৫ ০০০০০ ০২৪ ১৮ ১২৩ ১৩-১৪০)।

পুলিশের এআইজি (মিডিয়া ও জনসংযোগ) মো. সোহেল রানা এক খুদে বার্তায় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, “করোনাভাইরাস সম্পর্কে গুজব ছড়ানোয় ৫০টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধের জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিকে তালিকা দিয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া গুজব ছড়ানোর সঙ্গে জড়িত আরও ৮২টি সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট, পেইজ ও সাইটে গুজব ছড়ানোর পেছনে কারা রয়েছে, তাদের খুঁজে বের করতে অনুসন্ধান চলছে বলে জানিয়েছে (১ এপ্রিল ২০২০, সময় টিভি)। অন্যদিকে ২৮ মার্চ ২০২০ তারিখে বাংলাদেশ সরকার সুইডেনভিত্তিক অনলাইন পত্রিকা নেত্র নিউজ তৃতীয়বারের মত বাংলাদেশে প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে, যদিও আগে দুইবার বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল এবং ৯ এপ্রিল ২০২০ তারিখে নেত্র নিউজের সম্পাদক তাসনিম খলিলের মা নাজনিন খলিলের সিলেটের বাড়িতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তিন গোয়েন্দা সদস্য যান এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে চলে যান, “প্রথমে তাঁরা আমার মায়ের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং পরে সাংবাদিক হিসেবে আমার কাজকর্ম সম্পর্কেও জানতে চান। তাঁরা তাঁকে বলেন আমি যা করছি সেটা দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে” (৯ এপ্রিল ২০২০, বিবিসি বাংলা)।

শিক্ষাঙ্গনের স্বাধীনতাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়েছে। ভাইরাস সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখার কারণে তিনজন সরকারি কলেজের শিক্ষককে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে করোনা সংক্রান্ত গবেষণা করবার কারণে তদন্ত চলছে এবং অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আংশিক বেতন কেটে রাখা হচ্ছে। অন্যদিকে ১০ এপ্রিল আইন প্রয়োগকারী সংস্থা শিকার করে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখির কারণে প্রায় ৫০ জনকে আটক করা হয়েছে এবং অনেক অভিযুক্তর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৮৬০ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮-এ মামলা হয়েছে।

ঞ. শিক্ষক-সাংবাদিক নির্যাতন ও নিপীড়নমূলক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাসের সময় প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও তথ্য-প্রযুক্তিমন্ত্রী বলেছিলেন, এ আইনটি সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে প্রয়োগের জন্য নয়। বাংলাদেশে প্রথম যেদিন করোনাভাইরাসে রোগী শনাক্ত হয়, ৮ মার্চ ২০২০, ঠিক সেই দিনই নিপীড়নমূলক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮-এর আইনবলে বাংলাদেশ সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা বিধিমালা-২০২০ জারি করে। ১০ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল ২০২০ পর্যন্ত কমপক্ষে ৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কমপক্ষে তিনটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলা দায়ের করা হয়েছে। এখানে উল্লেখযোগ্য তিনটি মামলা হল-

১. ঢাকা থেকে প্রকাশিত জাতীয় দৈনিক মানবজমিনের সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী এবং সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলসহ আরও ৩০ জনকে অভিযুক্ত করে মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুজ্জামান শিখরের মামলা (১১ মার্চ ২০২০, বাংলা ট্রিবিউন)।

২. ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন ক্র্যাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহবুব আলম লাভলু ও সদস্য আল আমিনের বিরুদ্ধে আশিকুর রহমান বাদী হয়ে চকবাজার থানায় মামলা (১৫ মার্চ ২০২০, দেশ রূপান্তর) এবং

৩. সোনারগাঁওয়ে সাংবাদিক পনির ভ‚ইয়ার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদের সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খন্দকার মুহাম্মদ মিকাইলের মামলাসমূহ (২৬ মার্চ ২০২০, পরিবর্তন অনলাইন)।

বাংলাদেশে প্রথম যেদিন করোনাভাইরাসে রোগী শনাক্ত হয়, ৮ মার্চ ২০২০, ঠিক সেই দিনই নিপীড়নমূলক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮-এর আইনবলে বাংলাদেশ সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা বিধিমালা-২০২০ জারি করে। ১০ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল ২০২০ পর্যন্ত কমপক্ষে ৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কমপক্ষে তিনটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এখানে আরওউল্লেখ্য, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮-এর চারটি ধারা (২৫, ২৮, ২৯ ও ৩১ ধারা) চ্যালেঞ্জ করে রিট করেন আইনজীবী ও শিক্ষকবৃন্দ ১৯ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে এবং ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ তারিখে বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি মো. মাহমুদ হাসান তালুকদারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২৫ ও ৩১ ধারা কেন অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন এবং সরকারের আইন সচিব, তথ্য সচিবসহ সরকারের সংশ্লিষ্টদের চার সপ্তাহের মধ্যে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে (২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২০, সমকাল)।

আমরা মনে করি, নিপীড়নমূলক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮-এর বেশ কয়েকেটি ধারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি, নৈতিকতা এবং মানদণ্ডের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং মানুষকে হয়রানির উদেশ্যে সহজে ব্যবহার করা যায় এবং আইনটি ব্যবহার করে করা প্রতিটি মামলা গণমাধ্যমসহ নাগরিকদের চিন্তা, বিবেক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হল সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা। মহামারি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সরকারের নীতি ও পদক্ষেপের ভুলভ্রান্তি তুলে ধরাসহ সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ মহামারি মোকাবিলার অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ দিক। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মহামারি মোকাবিলার প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা মনে করি, বাংলাদেশ সরকারকে অবিলম্বে করোনা ঝুঁকির কারণে জামিনযোগ্য মামলায় অভিযুক্ত, নিপীড়নমূলক আইনের দ্বারা হয়রানি, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার আটক ও বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। একই সাথে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের সরকার উদ্ধার করে পরিবারের নিকট ফিরিয়ে দেবে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হল সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা। মহামারি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সরকারের নীতি ও পদক্ষেপের ভুলভ্রান্তি তুলে ধরাসহ সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ মহামারি মোকাবিলার অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ দিক। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মহামারি মোকাবিলার প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২৯ মার্চ ২০২০ বরিশালে করোনাভাইরাস সংক্রমণ সংক্রান্ত সরকারি প্রচারণার ছবি তুলতে গিয়ে দৈনিক দেশ জনপদ পত্রিকার ফটোসাংবাদিক সাফিন আহমেদ রাতুল এবং দৈনিক দখিনের মুখ পত্রিকার ফটোসাংবাদিক নাছির উদ্দিন পুলিশের পিটুনির শিকার হন (২৯ মার্চ ২০২০, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম); ৮ এপ্রিল ২০২০ দুই সাংবাদিক শওকত হায়দার ও মো. জিহাদকে বাইরে বের হওয়ার কারণে মারধর করেছে পুলিশ (৭ এপ্রিল ২০২০, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম)। হাসপাতালে এক রোগীকে রক্ত দিয়ে বাসায় ফেরার সময় বেলা ৩টার দিকে রূপনগর আবাসিক মোড়ে এই ঘটনা ঘটে (৭ এপ্রিল ২০২০, বাংলা ট্রিবিউন)।

এ ছাড়াও করোনাকালীন পরিস্থিতিতে ত্রাণ বিতরণে বেশ কিছু অনিয়ম হবার খবর পাওয়া গিয়েছে। এই সকল বিষয়ে প্রতিবেদন করায় সাংবাদিক নির্যাতনের খবর পত্রিকায় এসেছে। ১ এপ্রিল ২০২০ হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে সরকারি ত্রাণ বিতরণে অনিয়মের খবর প্রচার করায় সাংবাদিক সুলতান আহমদকে মারধর করেছেন ইউপি চেয়ারম্যান মুহিবুর রহমান হারুন ও ২০-২৫ জন লোক। বিকালে আউশকান্দি বাজারে এই ঘটনায় সুলতানকে বাঁচাতে গিয়ে আহত হন সাংবাদিক মুজিবুর রহমান ও বুলবুল আহমেদ। (১ এপ্রিল ২০২০, মানবজমিন)। একই দিনে জেলেদের নামে বরাদ্দকৃত চাল বিতরণে অনিয়মের ঘটনা এবং রাতের আঁধারে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে চাল সরিয়ে নেয়ার বিষয়টি ইউএনওকে জানানোর কারণে ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় ফোন করে ডেকে নিয়ে মোবাইল চুরির অপবাদে সাংবাদিক সাগর চৌধুরীকে নির্যাতন করেন উপজেলার বড় মানিকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের ছেলে নাবিল হায়দার। পুলিশ এ ঘটনায় নাবিলকে গ্রেফতার করেছে। (১ এপ্রিল ২০২০, দেশ রূপান্তর)।

ট. করোনাকালীন জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা এবং অধিকারের বাস্তবতা

করোনাকালীন পরিস্থিতিতে নারী ও শিশু নির্যাতন ব্যাপক হারে চলেছে। ১ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল ২০২০ পর্যন্ত কমপক্ষে ১০২ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষণের ফলে আত্মহত্যা করেছেন কমপক্ষে ২ জন এবং আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন ২ জন। স্বামী দ্বারা যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ১২ জন। ৭ এপ্রিল ২০২০ এখানে করোনাকালীন পরিস্থিতিতে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রভাবের কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া এক দিনমজুরের মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে বরগুনার আনোয়ার খান নামের এক ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে। আগের দিন ৬ এপ্রিল ঢাকার কেরানীগঞ্জ থানার খেজুরবাগ এলাকায় ত্রাণ নিতে গিয়ে ১০ বছরের এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে এবং এ ঘটনায় অভিযুক্ত ধর্ষক মীর খলিলকে (৪৫) আটক করেছে পুলিশ। এলাকাবাসী ও পরিবারের অভিযোগ, ত্রাণ দেয়ার নাম করে ওই শিশুকে বাড়িতে নিয়ে প্রায় চার ঘণ্টা আটকে রেখে ধর্ষণ করা হয়। অন্যদিকে ৩০ মার্চ ২০২০ জামালপুরে পুলিশ পরিচয়ে করোনাভাইরাসের রোগী তল্লাশির কথা বলে এক শিশুকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে দল বেঁধে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে।

করোনাকালীন পরিস্থিতিতে নারী ও শিশু নির্যাতন ব্যাপক হারে চলেছে। ১ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল ২০২০ পর্যন্ত কমপক্ষে ১০২ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষণের ফলে আত্মহত্যা করেছেন কমপক্ষে ২ জন এবং আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন ২ জন।

ঠ. মানবিক সহায়তা তছরুপ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং স্বচ্ছতা

বাংলাদেশ সরকার করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে প্রথম ধাপে ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সব অফিস-আদালত ও যানবাহন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে এবং পরবর্তীতে পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় তিন দফায় এই ‘ছুটি’ বাড়িয়ে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত করা হয়েছে। এ অবস্থায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি কর্মহীনদের তাৎক্ষণিক মানবিক সহায়তা দিতে ৬৪ জেলায় সরকার চার দফায় ৬৫ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন চাল এবং ২৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা এবং শিশুখাদ্যের জন্য তিন কোটি ১৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে (১০ এপ্রিল ২০২০, বিডি নিউজ)। কিন্তু এই বরাদ্দের অর্থ কিভাবে খরচ হচ্ছে তা নিয়ে কোন সরকারি ঘোষণা নেই। ফলে নাগরিকরা জানতে পারছেন না বরাদ্দের টাকা কিভাবে খরচ হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ১০ টাকা কেজি দরের চালও হতদরিদ্রদের দেয়া হচ্ছে। যদিও প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যারা এই সময়ে সহায়তা নিয়ে দুর্নীতি করবে তাদের বিরুদ্ধে তিনি কঠোর ব্যবস্থা নেবেন, কিন্তু মার্চ মাসের ২৬ তারিখ থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত অনেকগুলো জেলা শহরে চাল চুরি, মানবিক সহায়তা বিতরণের সময় অমানবিক আচরণ এবং চট্টগ্রাম, যশোর, বগুড়া, নোয়াখালী, ঝালকাঠি, খাগড়াছড়ি, গাইবান্ধা, কিশোরগঞ্জ, নাটোর জেলায় অভিযুক্ত অপরাধীর গ্রেফতারের খবর গণমাধ্যমে এসেছে। চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে চেয়ারম্যান মো. নুরুল আবছার কর্তৃক ২৭ জনকে ত্রাণ দেয়ার ছবি তুলে আবার ত্রাণ কেড়ে নেয়ার ঘটনা ঘটেছে। তদন্তে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হওয়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করে ১২ এপ্রিল প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। ফৌজদারি অপরাধে বিভাগীয় ব্যবস্থা যথার্থ নয়। এদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হওয়া উচিত।

উল্লেখযোগ্য তছরুপের ঘটনায় আটক হয়েছেন : নাটোরের সিংড়ায় ত্রাণের ১৩ বস্তা চাল চুরি; কিশোরগঞ্জের ভৈরবে ত্রাণের তালিকা তৈরিতে টাকা নেয়ায় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যসহ দুইজন গ্রেফতার; চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে ত্রাণের খাদ্যসামগ্রী কেড়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে ৩ নং মির্জাপুর ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল আবছারের বিরুদ্ধে; যশোরের একটি গুদামে অভিযান চালিয়ে সরকারি ৮০ বস্তা চাল জব্দ; বগুড়ায় ১০ টাকা কেজি দরের চাল নিয়ে মহিষাবান ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. ওয়াজেদ হোসেন এবং কুতুবপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি গাজিউল হকের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ; ঝালকাঠির বাসন্ডা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনিরের বাসা থেকে মজুদ করা ত্রাণের আড়াই টন চাল জব্দ করা হয়। এই সকল খাদ্যসামগ্রী চুরির অভিযোগে আটক ব্যক্তিদের দিকে নজর দিলে দেখা যাবে, প্রায় সকলে ক্ষমতাসীন দলের সদস্য এবং আমরা আশা করি সরকার এই সকল অভিযুক্ত ব্যক্তির বিচার নিশ্চিত করবার মধ্য দিয়ে মানবিক সহায়তা, ক্ষমতার অপব্যবহার সীমাবদ্ধ, দুর্নীতির নিয়ন্ত্রণ এবং স্বচ্ছতা আনয়নে সচেষ্টও হবে। বিচার করবার ক্ষেত্রে অবশ্যই সরকার আইনের মৌলিক নীতিগুলো, যেমন- আইনি বৈধতা, বৈধ উদ্দেশ্যে, প্রয়োজনীয়, সমানুপাতিক এবং অবৈষম্যমূলক নীতির আলোকে তাদের দায়দায়িত্ব পালন করবে।

এই সকল খাদ্যসামগ্রী চুরির অভিযোগে আটক ব্যক্তিদের দিকে নজর দিলে দেখা যাবে, প্রায় সকলে ক্ষমতাসীন দলের সদস্য এবং আমরা আশা করি সরকার এই সকল অভিযুক্ত ব্যক্তির বিচার নিশ্চিত করবার মধ্য দিয়ে মানবিক সহায়তা, ক্ষমতার অপব্যবহার সীমাবদ্ধ, দুর্নীতির নিয়ন্ত্রণ এবং স্বচ্ছতা আনয়নে সচেষ্টও হবে।

৮ এপ্রিল ২০২০ দেশের সব কটি জেলা-উপজেলায় ত্রাণ বিতরণের কার্যক্রম দেখভাল করার জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিব পদমর্যাদার ৫৩ জন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা লক্ষ করেছি, দুর্নীতি দমন কমিশন এই সকল বিষয়ে কোন নির্দেশনা দেয়নি এবং ব্যবস্থা নেয়নি। এই করোনাকালীন পরিস্থিতিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের ওয়েব পেইজে শুধু দুটি বিজ্ঞপ্তি দেখা গেছে : দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক (উপসচিব) জালাল সাইফুর রহমানের অকালমৃত্যুতে কমিশনের শোকবার্তা এবং নির্ধারিত মৌখিক পরীক্ষা বাতিল সংক্রান্ত।

ড. নাগরিক অধিকার রক্ষায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

করোনাকালীন পরিস্থিতিতে ১ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) পদে কর্মরত জনাব আরফান আশিক স্বাক্ষরিত অনেকগুলো প্রশংসনীয় স্মারকপত্র বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহের নিকট প্রেরণ করেন। এদের মধ্যে নাগরিকদের নিকট করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে করণীয় বিষয়ক সচেতনতামূলক বিজ্ঞপ্তি এবং আইইডিসিআরের হটলাইন নম্বর সার্বক্ষণিক চালু রাখতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে স্বাস্থ্য সচিব বরাবর স্মারকপত্র লেখেন এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বরাবর জনগণের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিতকল্পে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পত্রসমূহ প্রেরণ করেছেন। এছাড়া ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ দুই সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর করোনাভাইরাসের বিস্তার প্রতিরোধের পাশাপাশি এডিস মশা নিধনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এবং নগরীর পরিবেশ সুরক্ষার জন্য পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণের নিমিত্ত তাঁদের ব্যক্তিগত সুরক্ষার সরঞ্জাম সরবরাহ এবং এর ব্যবহার তদারকিকরণে স্মারকপত্র প্রেরণ করেন। তবে প্রশংসনীয় স্মারকপত্রের মাঝে রয়েছে ধর্ষণের শিকার নারী ও শিশুর স্বাভাবিক জীবনযাপন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণে পত্র এবং বরগুনার আমতলী থানা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার অগ্রগতি অবহিতকরণের স্মারকপত্র।

এই সকল প্রশংসনীয় স্মারকপত্র প্রেরণ ছাড়াও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকে দলিতদের জন্য ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছেন, কিন্তু ভাষাভিত্তিক উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, আদিবাসী, দিনমজুর, হাওরের অধিবাসী, যৌনকর্মী, তৃতীয় লিঙ্গ এবং দেশব্যপী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ বিষয়ে কোন প্রকার বক্তব্য এবং কার্যক্রম গ্রহণ করতে দেখা যায়নি।

এই সকল প্রশংসনীয় স্মারকপত্র প্রেরণ ছাড়াও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকে দলিতদের জন্য ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছেন, কিন্তু ভাষাভিত্তিক উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, আদিবাসী, দিনমজুর, হাওরের অধিবাসী, যৌনকর্মী, তৃতীয় লিঙ্গ এবং দেশব্যপী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ বিষয়ে কোন প্রকার বক্তব্য এবং কার্যক্রম গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। এমনকি গুম, খুন, নির্যাতন, বিচারবহির্ভ‚ত হত্যাকাণ্ড, শিক্ষাঙ্গনের স্বাধীনতায় আক্রমণ ও চিন্তা, বিবেক, মত প্রকাশের এবং চলাফেরার স্বাধীনতায় আঘাতসহ অন্যান্য নাগরিক অধিকারে আক্রমণের বিষয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ভ‚মিকা খুবই অপ্রতুল এবং কতটুকু কার্যকর তা প্রশ্নসাপেক্ষও। একই সাথে আমরা প্রশ্ন করতে চাই, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কী পরিমাণ মানবিক সাহায্য-সহযোগিতা প্রদানের জন্য সচেষ্ট আছে এবং করোনাভাইরাস সংক্রামক প্রতিরোধে সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে এবং সরকার কর্তৃক সুষ্ঠু, যথাযথ এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, রোগ নির্ণয়, স্বাস্থ্যসেবা বা ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রে তথা দায়দায়িত্বশীল মানবাধিকারবান্ধব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবার স্বার্থে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মীরা কি নিযুক্ত হয়েছেন এবং হয়ে থাকলে তাঁদের কর্মপরিকল্পনা কী?

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *