আকিরা কুরোসাওয়ার ‘ড্রিমস’

চলচ্চিত্র পর্যালোচনা

আকিরা কুরোসাওয়ার ‘ড্রিমস’

ইশতিয়াক মাহমুদ শাওন

কিছু কিছু ঘটনার পরে পৃথিবী আর আগের মত থাকে না। শিল্প বিপ্লব, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা অক্টোবর বিপ্লব যেমন পৃথিবীকে পালটে দিয়েছে, বর্তমান সময়ের এই করোনাভাইরাস মহামারি সেরকম বিশাল কিছু হতে যাচ্ছে, লক্ষণগুলো সব সে রকমই বার্তা দিচ্ছে। কিন্তু সব দুর্যোগই যেহেতু শেষ হয়, এটাও শেষ হবে। করোনা-পরবর্তী বিশ্ব কেমন হবে, সে বিষয়ে আমাদের সবারই কমবেশি ভাবনা আছে, স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্ন আছে। সেই ভাবনাগুলোর কিছু অংশ জুড়ে আছে আশাবাদী মানুষের স্বপ্ন এবং চিন্তাশীল মানুষের বিশ্লেষণ।

পৃথিবীজুড়ে ঘটতে থাকা ভয়াবহ সব মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়, যেগুলোকে আমরা খুব সাধারণভাবে দেখা শুরু করেছি, সেগুলো সম্পর্কে বিশ্লেষণ এবং চিন্তার খোরাক জোগানোর উপাদান সরবরাহ করার মত একটা ‘এনথোলজি’ বিখ্যাত জাপানি চিত্রপরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া তৈরি করেছেন তাঁর ‘ড্রিমস’ (১৯৯০) [জাপানি নাম ‘ইউমি’] সিনেমায়।

কুরোসাওয়া তাঁর কাজে পশ্চিমা সাহিত্য ও আর্ট দ্বারা বেশ প্রভাবিত ছিলেন, এটা একটা কারণ হতে পারে তাঁর জাপানের থেকে পশ্চিমা বিশ্বে বেশি খ্যাতি ও গ্রহণযোগ্যতা পাবার। কিন্তু তাঁর কয়েকটি সিনেমা দেখলেই এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে তাঁর কাজে একটা সর্বজনীনতা আছে। একান্তই জাপানি বিষয় নিয়ে কাজ করার চাইতে এমনভাবে তিনি গল্প বলতে আগ্রহী, যাতে তা দেশের গন্ডি অতিক্রম করে সারা পৃথিবীর গল্প হয়ে ওঠে, যদিও তার চরিত্র এবং গল্প পুরোপুরি জাপানকেই ধারণ করে।

সিনেমা শুরু হয় ‘ওয়ানস আই হ্যাড আ ড্রিম’, স্ক্রিনে এই লেখা ওঠার মধ্য দিয়ে। ‘রোদ হচ্ছে, বিয়ে হচ্ছে; খেঁকশিয়ালের বিয়ে হচ্ছে’-এই প্রবাদ আমরা সবাই জানি, কিন্তু কী ঘটে যদি কেউ খেঁকশিয়ালের বিয়ে দেখে ফেলে? রঙধনুর নিচে বাস করা খেঁকশিয়ালের কাছে গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে আসতে হয় তাকে, না হলে ফেরার পথ বন্ধ। প্রকৃতির গোপনীয়তা রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে মানুষের মৃত্যু ছাড়া পথ নেই, এটা কত চমৎকার রঙিনভাবে দেখানো হল-এই ভাবনা মাথায় ঘুরপাক খেতে খেতেই স্ক্রিনে লেখা ভেসে ওঠে ‘অ্যানাদার ড্রিম’, যেটার বিষয় ‘দ্য পিচ অরচার্ড’। গাছ যদি আমরা কেটে ফেলি, কী থাকে এই ন্যাড়া পৃথিবীতে? এটাই বিষয় এ স্বপ্নের।

পরের স্বপ্নের বিষয় তুষারপাত। মানুষের ভেতর ভালবাসা এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রবল স্পৃহা থাকলে মানুষ একসময় তার লক্ষ্যে পৌঁছায়, ব্লিজার্ডের ভেতর দিয়ে এক দুর্ধর্ষ অভিযানের মাধ্যমে সেটা দেখানো হয়েছে।

‘অ্যানাদার ড্রিম’, এবারের বিষয় যুদ্ধ। দায় স্বীকারের বদলে যুদ্ধ নামক কনসেপ্ট/ধারণার ওপর দায় চাপিয়ে দিয়ে ব্যক্তির দায়মুক্তি খুবই সাধারণ একটা শঠতা আমাদের বাস্তবতায়। যুদ্ধের দায় তো অবশ্যই আছে, কিন্তু যুদ্ধ পরিচালনাকারী ব্যক্তিবর্গ সরাসরি নির্দেশ প্রদানকারী, সুতরাং তাদের ভূমিকার বিষয়ে কোন ধোঁয়াশা থাকা উচিত নয়। যুদ্ধে মারা যাওয়া একজন সাধারণ সৈন্য বা এক প্লাটুন সৈনিক, একটা টানেলের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়া তাদের কমান্ডারের কাছে এসে জানতে চায়, কেন তাকে মরতে হল? তার মা তো তাকে মৃত দেখতে চায়নি! মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকের কথা এসময় মনে হওয়া খুবই স্বাভাবিক। ‘কবরে ফিরে যাও’, এখানে ধ্বনিত হয়েছে ‘গো ব্যাক অ্যান্ড রেস্ট ইন পিস’ হয়ে। এমনকি হিরো হিসাবে মনে রাখা সৈন্যদেরও কুকুরের মত মরতে হয়েছে, কমান্ডার যখন তার থার্ড প্লাটুনকে এই কথা বলে, তখন তার এই কথা শুধুমাত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত জাপানি সৈন্যদের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা হয়ে যায় পৃথিবীর সমস্ত যুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও যুদ্ধবিরোধী প্রতিটা মানুষের মনের কথা। এই টানেলের ভেতর দিয়ে কুরোসাওয়া আমাদের মনের টানেলে ঢুকে যান সহজেই, যুদ্ধবিরোধী মনোভাব তৈরি করতে।

ভিনসেন্ট ভ্যান গগকে স্বপ্নে দেখা গেল পরেরটাতে। ডেডিকেশন এবং প্রকৃতির প্রতি সংবেদনশীলতা যে শেখার আছে তাঁর কাছ থেকে, সেই ব্যাপারটিই দেখানো হয়েছে দারুণ স্বপ্ন স্বপ্ন আবহে, জাদুবাস্তবতার মোড়কে। একটা উজ্জ্বল পৃথিবীই তো আমরা চাই, যেখানে রঙ থাকবে, মানুষ তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার অধিকারী হবে, প্রকৃতির সৌন্দর্য প্রাণ ভরে দেখবে। ভ্যান গগের জীবন ও কাজের একটা ছোট কিন্তু দারুণ ভিজ্যুয়াল প্রেজেন্টেশন এই ‘ক্রো’ (কাক) শিরোনামের স্বপ্নটা।

পরের স্বপ্ন দুটি আসলে দুঃস্বপ্ন এবং তারা পরস্পর সম্পর্কিত। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টে বিস্ফোরণ হলে কী ভয়াবহ অবস্থা হবে তা অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে প্রথমটাতে, পর পর ছয়টি রিঅ্যাক্টরে বিস্ফোরণের ফলে ফুজি পর্বত চূড়ান্ত লাল বর্ণ ধারণ করেছে। মানুষ পালাচ্ছে, ছুটছে হন্যে হয়ে, কিন্তু যাবার পথ সমুদ্রে গিয়ে মিশেছে। এই সিনেমা যখন বানানো (১৯৯০), তখনও জাপান এ ধরনের বিস্ফোরণের সম্মুখীন হয়নি, যা ঘটেছে ২০১১ সালে ফুকুশিমাতে। কিন্তু চেরনোবিলে ১৯৮৬ সালেই দুর্ঘটনা ঘটে গেছে, সুতরাং সেই আতঙ্কের জায়গাটা ছিলই।

আমাদের রূপপুর নিয়ে যেসব বালিশকান্ডসহ মহা মহা কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে, তাতে সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে যাওয়া মধ্যবয়স্ক লোকটার বলা কথা,  `A slow death is even worse, I refuse to die slowly.’ [তর্জমা : ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যু এর থেকেও খারাপ, আমি নিজেকে সে পথে সঁপে দিতে পারি না] সম্ভবত আমাদের ভবিষ্যৎকেই নির্দেশ করছে।

এক মহিলা তার দুই বাচ্চা নিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘They told us that Nuclear plants were safe, human accident is the danger – not the nuclear plant itself. No accidents, no danger. That’s what they told us, what liars! If they’re not hanged for this, I’ll kill them myself.’

[তর্জমা : তারা বলেছিল যে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিরাপদ, মানুষ যদি ভুল না করে তবে কোন বিপদ ঘটবে না। কী মিথ্যুক! এই ভয়ংকর প্রতারণার জন্য তাদের যদি ফাঁসি না হয়, আমি নিজে তাদেরকে হত্যা করব।]

তার এই চিৎকার শুনে সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে উদ্যত লোকটা একটু থেমে বলে, ‘Don’t worry, the radioactivity will do that for you.’

[তর্জমা : চিন্তা কোরো না, তেজস্ক্রিয়তা তোমার হয়ে সে কাজ করে দেবে।]

[ছবির সাবটাইটেলের তর্জমা : মানুষ, বিশেষত বিজ্ঞানীরা এখন ভুলে গেছে যে তারা প্রকৃতির একটা অংশ মাত্র। তারা হয়ত বুদ্ধিমান, কিন্তু তারা প্রকৃতির হৃৎস্পন্দন অনুভব করতে জানে না। তারা এমন সব জিনিস বানায়, যা শেষমেশ মানুষকে অসুখী করে তোলে। তারা অবশ্য তাদের আবিষ্কার নিয়ে খুবই গর্ব করে, তার থেকেও খারাপ ব্যাপার হল, মানুষ বোকার মত তাতে সায় দেয়, এমনভাবে মানুষ এসব আবিষ্কারকে দেখে, যেন এগুলো একেকটা অত্যাশ্চর্য ঘটনা।]

আমরা কি দেখতে পাচ্ছি আমাদের ভবিষ্যৎ? আমাদেরও কি এরকম অভিসম্পাত দিতে এবং নিজেদের সাথে সাথে ওদেরও ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যু কামনা করতে হবে? এই ভবিতব্য ঠেকাতে হবে আমাদের, যে কোন সংগ্রামের ভেতর দিয়েই সেটা হোক। পরের স্বপ্নটিতে দেখা যাচ্ছে যে মানুষ তার পরিবেশের এবং মূল্যবোধের অপার ক্ষতিসাধনের ফলে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর কী হাল করে ফেলেছে। এক শিংওয়ালা দৈত্যে পরিণত হয়েছে অনেকে, দুই শিংওয়ালা দৈত্য তাদের কখন খেয়ে ফেলে-এই ভয়ে থাকছে তারা সব সময়। ড্যানডেলিয়ন হয়ে গেছে একমাত্র ফুল, গোলাপ দুষ্প্রাপ্য। জেনেটিক্যালি মডিফায়েড প্ল্যান্টস একমাত্র তাদের অস্তিত্ব ঘোষণা করছে, বাকি সব গাছপালা অদৃশ্য।

দৈত্য বলছে, ‘I was a farmer when I was a man. I dumped gallons of milk in the river to keep the prices up. I buried potatoes and cabbages with bulldozer. How stupid!’ [তর্জমা : মানুষ থাকা অবস্থায় আমি কৃষক ছিলাম। বাজারে ভাল দাম বজায় রাখতে প্রচুর দুধ আমি নদীতে ফেলে দিয়েছি, কী ভয়ংকর বোকামি করে আলু ও বাঁধাকপি বুলডোজার দিয়ে ধ্বংস করেছি!]

পুঁজিবাদ আমাদের চারপাশের যত রকম অন্যায়কে গা-সওয়া বানিয়ে ফেলেছে, কুরোসাওয়া বলছেন-এগুলোর ফল আমাদের ভোগ করতে হবে, যদি আমরা এখনই চোখ না খুলি।

সমস্যা এবং সমস্যার তীব্র রূপের এসব স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নের শেষভাগে, অষ্টম স্বপ্ন হিসাবে আসে ‘ভিলেজ অব দ্য ওয়াটারমিলস’। এক বৃদ্ধ বসে বসে বাঁশের একটা চাকা বানাচ্ছে, যখন তাকে যুবক জিজ্ঞাসা করল, আপনাদের গ্রামে বিদ্যুৎ নেই? তার উত্তর ছিল, ‘Don’t need it. People get too used to convenience; they think convenience is better; they throw out what’s really good.’

[তর্জমা : দরকার পড়ে না। মানুষ আরাম-আয়েশে খুব সহজেই অভ্যস্ত হয়ে যায়, তারা মনে করে যে আরাম-আয়েশই উন্নতি, এটা করতে গিয়ে তারা আসল গুরুত্বপূর্ণ ও ভাল জিনিসকে দূরে ঠেলে দেয়।]

বিস্মিত যুবককে এরপর সে জানায় যে এই গ্রামে কেউ গাছ কাটে না, এখানে কোন টেম্পল বা প্রিস্ট নেই, দীর্ঘজীবী হয়ে মৃত্যুর পর তারা মৃত্যুকে জীবনের মতই উদ্যাপন করে। বৃদ্ধ মনে করিয়ে দেয় যে মানুষ প্রকৃতির একটা ক্ষুদ্র অংশ মাত্র, যেটা সে প্রায়শই ভুলে যায়। এটা ভুলে যায় বলেই সে প্রকৃতি ধ্বংসের মহোৎসবে মেতে ওঠে, যার ওপর তার জীবন নির্ভরশীল।

বৃদ্ধ বলে যায়, ‘The most important things for human beings are clean air and clean water and the trees and grass that produce them. But now everything is being dirtied, polluted forever.’

[তর্জমা : মানুষের জন্য সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হল স্বচ্ছ বাতাস, পরিষ্কার পানি, গাছ এবং সেগুলো উৎপাদন করা মাটি; কিন্তু এখন সবকিছুই নোংরা, চিরতরে দূষিত।]

বিস্মিত যুবককে এরপর সে জানায় যে এই গ্রামে কেউ গাছ কাটে না, এখানে কোন টেম্পল বা প্রিস্ট নেই, দীর্ঘজীবী হয়ে মৃত্যুর পর তারা মৃত্যুকে জীবনের মতই উদ্যাপন করে। বৃদ্ধ মনে করিয়ে দেয় যে মানুষ প্রকৃতির একটা ক্ষুদ্র অংশ মাত্র, যেটা সে প্রায়শই ভুলে যায়। এটা ভুলে যায় বলেই সে প্রকৃতি ধ্বংসের মহোৎসবে মেতে ওঠে, যার ওপর তার জীবন নির্ভরশীল।

পৃথিবীর সব প্রান্তের সচেতন মানুষের মনের কথা যেন ধ্বনিত হল এই বৃদ্ধের মুখ দিয়ে। আমরা তো এরকম একটা পৃথিবীই চাই।

মানুষের জন্য সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হল স্বচ্ছ বাতাস, পরিষ্কার পানি, গাছ এবং সেগুলো উৎপাদন করা মাটি; কিন্তু এখন সবকিছুই নোংরা, চিরতরে দূষিত।

কুরোসাওয়া তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর পর্যবেক্ষণক্ষমতার গুণে এই স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নগুলো নির্মাণ করেছেন, কিন্তু যথার্থভাবেই সেইসব দুঃস্বপ্ন বর্তমান পৃথিবীর প্রাকৃতিক, সামাজিক ও মানসিক দূষণের বিষবাষ্পে চিন্তিত প্রতিটা মানুষের উদ্বেগকে ধারণ করে, এত বিপর্যয়ের ভেতরেও প্রতিটা আশাবাদী মানুষকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে উজ্জীবিত করে।

ইশতিয়াক মাহমুদ শাওন: চলচ্চিত্র পর্যালোচক।

ইমেইল: istiak.shaon@yahoo.com

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *