বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের প্রভাব

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের প্রভাব

ইসতিয়াক রায়হান

করোনা ভাইরাস নানাভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো বাংলাদেশের মানুষকেও স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এরে মধ্যে যেমন অর্থনীতির বিভিন্ন দিক আছে তেমনি আছে মনস্তাত্বিক সুদূরপ্রসারী ক্ষতি। এই লেখায় অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষতি পর্যালোচনা করে একটি জরীপের মাধ্যমে মানুষের আতঙ্কের কারণ ও স্বরূপ চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

পুঁজিবাদী বিশ্বে  জনগণকে উন্নয়ন দেখানোর একটা অনেক বড় হাতিয়ার জিডিপির প্রবৃদ্ধি ও জিডিপির পরিমাণ। আর নাগরিকদের মধ্যেও এই তথাকথিত উন্নয়নের ভ্রমই প্রবল হয়ে থাকে। মানুষ ভাবে নিজের জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ মজুদ করতে পারলে আর কিছু লাগবে না। আর সরকারগুলোর কাছে ক্ষমতায় টিকে থাকার অন্যতম পথ মূলধারার অর্থনীতি অনুসরণ করে যেকোনোভাবে শুধু জিডিপি বাড়ানো এবং এই জিডিপি বাড়াতে পারার গল্প জনগণের কাছে ফলাও করে প্রচার করা। অথচ এই জিডিপি পরিমাপের একটা সমস্যা হলো এটি গুণগত উন্নয়ন বিচার করতে পারে না অনেক সময়। জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়াতে গিয়ে সমাজের বা দেশের কতটুকু ক্ষতি হলো তা পরিমাপ করতে পারে না এই পরিমাপ। একইভাবে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাওয়া মানেই যে একটি দেশের জনগণের আয় বেড়ে গেলো তা নয়। মাথাপিছু আয় হলো একটি গড় হিসাব। সুতরাং অনেক সময় এর বৃদ্ধি সামগ্রিক চিত্রকে প্রকাশ করে না। একটি দেশের মাত্র ১ শতাংশ মানুষের আয় যদি অনেক বাড়তে থাকে এবং বাকি ৯৯ শতাংশ মানুষের আয় একই থাকে, তাহলেও মাথাপিছু আয় বাড়তে থাকবে। তেমনি জিডিপিও বাড়ানো যায় নানা উপায়ে। যেমন, ধরা যাক একটি দেশে গুণগত মান সম্পন্ন একটি বাল্ব তৈরি করলো যা ১০ বছরেও নষ্ট হবে না, আরেকটি দেশ এমন একটি বাল্ব তৈরি করলো যেটি ৬ মাসেই নষ্ট হয়ে যাবে। এখন জিডিপির হিসাবে প্রথম দেশটির তুলনায় দ্বিতীয় দেশটির প্রবৃদ্ধি কিন্তু টানা ১০ বছরই বেশি থাকবে (যখন অন্যান্য সবকিছু অপরিবর্তিত থাকবে) কারণ বাল্ব নষ্ট হওয়ায় দরুণ প্রতিবছরই সে দেশে বেশি বেশি লাইট উৎপাদন ও বিক্রি হবে।

এই হলো জিডিপির সমস্যা, নানা ভাবেই একে বাড়ানো যায়। কিন্তু কোন দেশের মানুষের জীবনের গুণগত মান কেমন, কে কতটা আরামে এবং কে কতটা অসুখে আছে তা বোঝার উপার নেই জিডিপির হিসাব দেখে। যেমন, একটি দেশের মানুষের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য দরকার পর্যাপ্ত পরিমাণে গাছ, দরকার বনভূমি। কিন্তু গাছ বা বনভূমি কেটে যদি নানা ধরনের আসবাবপত্র তৈরি করে বাজারে বিক্রি করা হয় তাহলেও জিডিপি বাড়ে। কয়লা ব্যবহার করে মাটি পুড়িয়ে যত বেশি ইট তৈরি হবে জিডিপি তত বাড়বে। কয়লা পুড়িয়ে বায়ু দূষিত হওয়ায় দূষিত বায়ু থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মাস্ক এর বিক্রি অনেক বেড়ে গেলে জিডিপি বাড়বে, দূষিত বাতাসে ভালোভাবে নিশ্বাস নিতে না পেরে যদি বাতাস বা অক্সিজেন কেনা লাগে তাহলেও জিডিপি বাড়বে।নদী মেরে এবং নদীর চরের ভূমি দখল করে আবাসন প্রকল্প হলে জিডিপি বাড়বে। নদীর মাছ না থাকায় ছোট ছোট অনেক পুকুর হবে, পুকুরে হাইব্রিড মাছ চাষ হবে তাহলেও জিডিপি বাড়বে। মাছ দ্রুত বড় করার জন্য ফীড ব্যবহার করা হবে জিডিপি বাড়বে। মাছ এবং মুরগীকে নানা ধরনের এন্টিবায়োটিক খাওয়ানো হবে তাহলেও জিডিপি বাড়বে। আবার বাজে ফীড এবং অতিরিক্ত মাত্রায় এন্টিবায়োটিক দেয়া মাছ ও মাংস খেয়ে মানুষের নানা ধরনের জটিল রোগ হবে এবং এসব রোগের চিকিৎসার জন্য বহু কষ্টে উপার্জিত ও সঞ্চিত অর্থ মানুষ ব্যয় করবে- জিডিপি বাড়বে। সরকারি স্কুলের জায়গায় প্রচুর কিন্ডারগার্টেন হবে, মানুষ ছেলেমেয়েদের সেখানে পড়িয়ে কোচিং করিয়ে নোটবই পড়িয়ে অনেক অর্থ খরচ করবে, ফলে শিক্ষাখাতে ব্যক্তিগত ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং জিডিপি বাড়বে। সস্তা শ্রমের কারণে জীবিকা নির্বাহের জন্য নারী পুরুষ দিনরাত কাজ করায় বাসার স্বাথ্যসম্মত খাবারের বদলে বাইরের রেস্তোরায় প্রচুর খাবে, ভেজাল বাসি খাবার খাবে, পোড়া তেলে ভাজা খাবার খাবে- জিডিপি বাড়বে। আবার এসব খাবার খেয়ে অসুস্থ হলেও চিকিৎসা খরচ বাড়ার মাধ্যমে জিডিপি বাড়বে। শাকসবজিতে কীটনাশক, হরমোন ও খাদ্যে ভেজাল দেয়া হবে- জিডিপি বাড়বে। অনেকসময় ১ কোটি টাকার রাস্তা ৫ কোটি টাকা দিয়ে বানালেও জিডিপি বাড়ে, গুণগতমানহীন অবকাঠামো বানালেও জিডিপি বাড়ে। আবার দেশ অর্থনৈতিক ভাবে কিছুটা অগ্রসর হলেই প্রচুর অস্ত্র তৈরি করবে, সামরিক ব্যয় বাড়াবে, মানুষকে মারার জন্য পৃথিবী ধ্বংস করার জন্য বিভিন্ন মারণাস্ত্র তৈরি করবে পরীক্ষা করবে- জিডিপি বাড়বে। এভাবে নানা উপায়ে একটি দেশের জিডিপি বাড়ানো যায়। এমনকি জিডিপি বাড়াতে গিয়ে দূষিত বায়ুর কারণে ফুসফুসে নানা রোগ হয়ে কতজন আক্রান্ত হলো বা মারা গেলো, ভেজাল খাবার খেয়ে লিভার ও পাকস্থলির ক্যান্সারে বা নানা রোগে কতজন আক্রান্ত হলো বা মারা গেলো, স্ট্রোক আর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কতজন মারা গেলো, ডায়াবেটিস বৃদ্ধি পাওয়ায় কতজনের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেলো এসবের হিসাব কখনো করা হয় না।

একটি দেশের মানুষের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য দরকার পর্যাপ্ত পরিমাণে গাছ, দরকার বনভূমি। কিন্তু গাছ বা বনভূমি কেটে যদি নানা ধরনের আসবাবপত্র তৈরি করে বাজারে বিক্রি করা হয় তাহলেও জিডিপি বাড়ে। কয়লা ব্যবহার করে মাটি পুড়িয়ে যত বেশি ইট তৈরি হবে জিডিপি তত বাড়বে। কয়লা পুড়িয়ে বায়ু দূষিত হওয়ায় দূষিত বায়ু থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মাস্ক এর বিক্রি অনেক বেড়ে গেলে জিডিপি বাড়বে, দূষিত বাতাসে ভালোভাবে নিশ্বাস নিতে না পেরে যদি বাতাস বা অক্সিজেন কেনা লাগে তাহলেও জিডিপি বাড়বে।নদী মেরে এবং নদীর চরের ভূমি দখল করে আবাসন প্রকল্প হলে জিডিপি বাড়বে।

সরকারি পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত অনেক হাসপাতালেই উন্নত ও গুণগত মান সম্পন্ন চিকিৎসা সেবা পাওয়া যায় না, মানুষকে দারস্থ হতে হয় প্রাইভেট হাসপাতালে। আমলে নেয়া হয় না পরিবেশদূষণ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবী হুমকির মুখে পড়বে জেনেও এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ছিল অত্যন্ত সীমিত। সরকার কৌশলে এগুলো এড়িয়ে গিয়ে শুধু জিডিপি বাড়াতে পারার উল্লাসেই সবসময় মত্ত থাকে এবং প্রচার করতে থাকে নিজের গুণকথা। ব্যাপারটি এমন হয়ে গেছে যে পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে গেলেও জিডিপি বাড়াতে হবে। অন্যদিকে ঢাকা পরে থাকে প্রচণ্ড দুর্নীতির খবর, আইনের অনুশাসনের অভাবের খবর, ঋণ খেলাপির কারণে ব্যাংকগুলোর আইসিউতে থাকার খবর, অর্থ পাচারের কারণে দেশের অর্থনীতি কঙ্কালসার হতে থাকার খবর। কিছু অসৎ মানুষ ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য, দেশের ও সাধারণ মানুষের সম্পদ লুট ও কুক্ষিগত করার জন্য সমস্ত সিস্টেমটাকেই অসৎ করে দেয়ার চেষ্টা করে। অসৎ মানুষের টিকে থাকার জন্য, তাদের গুণকীর্তণ করার জন্য, চাটুকারিতার জন্য তাদের চারপাশে অনেক অসৎ মানুষের প্রয়োজন হয়। যার ফলে খুব নীরবে রাষ্ট্রের সমস্ত দেহে ছড়িয়ে পড়ে দুর্নীতির ক্যান্সার। এভাবেই সাধারণ মানুষের ও পৃথিবীর বারোটা বাজিয়ে চলছিল অনেক রাষ্ট্রব্যবস্থা। সেখানে হঠাৎ করেই দেখা দিলো করোনা ভাইরাস, যেটা ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে প্রচলিত রাষ্ট্র ব্যবস্থার।

চীনের উহান থেকে যাত্রা শুরু করা করোনা ভাইরাস ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর ২০০ টি দেশে, কেড়ে নিয়েছে বহু মানুষের প্রাণ। পৃথিবীতে এখনো কমেনি করোনা ভাইরাসের দাপট (যেহেতু এখনো ভ্যাকসিন বা কার্যকরী ওষুধ বাজারে আসেনি)। করোনা ভাইরাস শুধু প্রত্যক্ষভাবে মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েই ক্ষান্ত হবে না, পরোক্ষভাবেও এর প্রভাবে মারা পড়বে পৃথিবীর বহু দরিদ্র মানুষ, কারণ ইতোমধ্যে দুয়ারে কড়া নাড়ছে বৈশ্বিক মহামন্দা।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও করোনার প্রভাব হবে অত্যন্ত প্রকট। ইতোমধ্যে সামষ্টিক চাহিদা ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় এবং যোগানের অসচলতায় নানা জায়গায় ছেদ পড়ায় শুরু হয়ে গেছে মন্দা। করোনা নিয়ন্ত্রণের পর এই মন্দা মোকাবেলা করা রাষ্ট্রের জন্য হবে আরেকটি বড় অগ্নিপরীক্ষা। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে করোনার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই  আসে তৈরি পোশাক শিল্পের কথা। যদিও তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ শিল্প নয়, কারণ এই খাত থেকে যে রপ্তানী আয় হয় তার প্রায় ৭০ ভাগই আবার এ খাতের কাঁচামাল ও নানা যন্ত্রপাতি আমদানি করতে চলে যায়। আবার বিদেশে অর্থপাচারের সাথে সবচেয়ে বেশি সম্পৃক্ত এ খাতটি। কিন্তু বাংলাদেশে এটিই বর্তমানে প্রধান শিল্প হিসাবে বিদ্যমান আছে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে ৫০ বিলিয়ন ডলায় আয় করার টার্গেট নিয়ে চলছিল তৈরি পোশাক শিল্প। দেশের প্রায় ৪৫ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান এটি, যার মধ্যে ৬০ শতাংশই নারী শ্রমিক। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে মোট আয় হয় ৩৪,১৩৩.২৭ কোটি মার্কিন ডলার, যা ছিল মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪.২১ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বলতে গেলে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে আসা আয়কেই  প্রধানত বোঝায়,  একই সাথে এটি বাংলাদেশের অন্যান্য শিল্প ও তাদের রপ্তানির দৈন্যও প্রকাশ করে।

করোনা ভাইরাসের কারণে রপ্তানিমুখি এই খাত মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। কারণ বাংলাদেশ তৈরি পোশাক মূলত রপ্তানি করে থাকে ইউরোপ এবং আমেরিকায়। ২০১৯ সালের তথ্য মতে তৈরি পোশাক শিল্পের মোট রপ্তানির ৬১.৭৫ শতাংশই ছিল ইউরোপে এবং ১৮.২০ শতাংশই ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। করোনা ভাইরাসের কারণে ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মারাত্মক ভাবে আক্রান্ত হওয়ায় এবং লক ডাউন পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের রপ্তানিতে একটি ধস নেমেছে। ইতোমধ্যে ৪ এপ্রিল ২০২০ তারিখ পর্যন্ত প্রায় হাজারখানিক কারখানার প্রায় ৯৪৯ মিলিয়ন পোশাক পণ্যের অর্ডার বাতিল ও স্থগিত হয়েছে যার বাজারমূল্য প্রায় ৩.০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং এতে করে সরাসরি আক্রান্ত হবে ২১.৯ লক্ষ শ্রমিক। আবার বাংলাদেশেও করোনা পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকায় এই খাতের হুমকি আরো বেড়ে যাচ্ছে। সুতরাং করোনা ভাইরাসের কারণে একদিকে কমে যাবে রপ্তানি আয়,  অন্যদিকে অনেক শ্রমিক কাজ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। আবার যারা কাজ হারাবেন না তাদেরও বেতন না পাবার সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রকট, কারণ এমনিতে ভালো অবস্থাতেই শ্রমিকদের বেতন আটকে রাখার বহু নজির রয়েছে। সেইসাথে রয়েছে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি কারখানাগুলো চালু থাকে এবং কাজ চলতে থাকে তাহলে শ্রমিকদের মাঝে ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়তে পারে করোনা ভাইরাস, যার ফলে মারা যেতে পারেন বহু শ্রমিক। আবার কারখানা বন্ধ হবার পর যদি শ্রমিকরা বেতন না পান, সরকারি সাহায্য না পান তাহলেও অবস্থার আরো অবনতি হতে পারে। একদিকে যেমন বহু সংখ্যাক শ্রমিক ও তাদের পরিবার খাদ্য সংকটে পড়বে, সামাজিক অবক্ষয় বাড়বে, অপরদিকে এটি প্রভাব ফেলবে সামষ্টিক অর্থনীতিতে, সামষ্টিক চাহিদা আরো কমে যাওয়ার মাধ্যমে যার ফলে আরো গভীর হবে মন্দা পরিস্থিতি।

আবার আমাদের দেশে তৈরি পোশাক শিল্পের সাথে সরাসরি যুক্ত কিছু খাত আছে, যেমন; তৈরি পোশাক শিল্পের সাথে যুক্ত বিভিন্ন ধরনের গজ কাপড়, পেন্ট-শার্ট-টিশার্ট এর কাপড়, সুতা, আনুষাঙ্গিক উপকরণ ইত্যাদি প্রস্তুত ও সরবরাহকারক। এসবকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের গড়ে উঠেছে নানা ধরনের কারখানা ও ব্যবসা, এবং নিযুক্ত আছেন বহু শ্রমিক। করোনা ভাইরাসের কারণে তৈরি পোশাক শিল্প ক্ষতিগ্রস্থ হবার সাথে সাথে ক্ষতিগ্রস্থ হবে এসব খাত। এসব খাতের অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ক্ষতির সম্মুখীন হবেন, অনেক শ্রমিক কাজ হারাবেন। যার ফলে বহু পরিবার একটি অনিশ্চয়তার মাঝে পড়ে যাবেন, তাদের পারিবারিক ব্যয় অনেক সংকোচন করতে হবে, অনেক শ্রমিক পরিবারকে একবেলা খেলে দুইবেলা না খেয়ে থাকতে হবে। একদিকে সামাজিক সংকট তীব্র হবে, অন্যদিকে সামষ্টিক চাহিদা কমে যাওয়ায় মন্দা দীর্ঘায়িত হতে পারে।

প্রতি বছর বাংলাদেশে রপ্তানি থেকে আমদানি বেশি হওয়ায় আমদানি-রপ্তানিতে যে ঘাটতি থাকে তা পূরণ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর পিছনে অসাধারণ ভূমিকা পালন করে গেছে রেমিটেন্স। বলতে গেলে বাংলাদেশের অর্থনীতি টিকে ছিল এই প্রবাসী আয়ের জন্য। বর্তমানে প্রায় এককোটির বেশি বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন এবং জিডিপিতে তাদের পাঠানো অর্থের অবদান ১২ শতাংশের মত। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের প্রেরিত অর্থের পরিমাণ ছিল ১৬ দশমিক ৪২ বিলয়ন ডলার। বর্তমানে সরকার রেমিটেন্সে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা দিচ্ছে প্রবাসীদের। এখন ১০০ টাকা দেশে পাঠালে যার নামে টাকা পাঠাচ্ছেন তিনি ওই ১০০ টাকার সঙ্গে ২ টাকা যোগ করে ১০২ টাকা তুলতে পারছেন। বাজেটে এ জন্য ৩ হাজার ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সেজন্য ২০১৯-২০ অর্থ বছরের প্রথম ৭ মাসে রেমিটেন্স আসার পরিমাণ গত অর্থ বছরের তুলনায় অনেক বেশি ছিল এবং জানুয়ারি পর্যন্ত ৭ মাসে রেমিটেন্স এসেছিল ৫৪ হাজার কোটি টাকার। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে এই প্রবাসী আয়ে পড়বে বড়ধরনের প্রভাব। রেমিটেন্সের একটা বড় অংশ আসে সৌদিআরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং কুয়েত থেকে। করোনা ভাইরাসের কারণে এসব দেশে অবস্থানরত অনেক প্রবাসী বাংলাদেশির কাজ হারানোর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে এবং বৈশ্বিক মন্দার জন্য বিগত বছরগুলোর মত তারা বাংলাদেশে টাকা পাঠাতে পারবেননা। যার ফলে দেশে অবস্থানরত তাদের পরিবারবর্গ আগের মত ব্যয় করতে পাড়বেনা, ফলে কমে যাবে সামষ্টিক চাহিদা- যা মন্দাকে আরো ঘনীভূত করবে। ইতোমধ্যে ডিসেম্বরের তুলনায় ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে কমে গেছে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ। আবার প্রতিমাসে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ দেশের বাইরে যায় কাজের জন্য কিন্তু আগামি কয়েকমাস এইহারে মানুষ দেশের বাইরে যেতে পারবেননা, আবার গেলেও কাজ পাবেননা বৈশ্বিক মন্দার কারণে। যার ফলে পরবর্তী কয়েকমাসে কমে যাবে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ।

রেমিটেন্সের একটা বড় অংশ আসে সৌদিআরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং কুয়েত থেকে। করোনা ভাইরাসের কারণে এসব দেশে অবস্থানরত অনেক প্রবাসী বাংলাদেশির কাজ হারানোর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে এবং বৈশ্বিক মন্দার জন্য বিগত বছরগুলোর মত তারা বাংলাদেশে টাকা পাঠাতে পারবেননা। যার ফলে দেশে অবস্থানরত তাদের পরিবারবর্গ আগের মত ব্যয় করতে পাড়বেনা, ফলে কমে যাবে সামষ্টিক চাহিদা- যা মন্দাকে আরো ঘনীভূত করবে।

করোনা ভাইরাসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশের অন্যান্য সব রপ্তানি পণ্যও। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ইউরোপের দেশগুলোতে বাংলাদেশ চামড়া, হিমায়িত মাছ, চিংড়ি, প্লাস্টিকপণ্য, পাট ও পাটজাতপণ্য এবং শাক-সবজি রপ্তানি করে যেগুলো রপ্তানি এখন প্রায় বন্ধ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করেছিল প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং এই খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভর করছে দেশের প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষের জীবিকা। এছাড়াও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে মোট ৮০০ কোটি টাকার জীবিত কাঁকড়া ও কুচে রপ্তানি হয়েছিল এবং এই খাতেও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সংযুক্ত প্রায় ৪ লক্ষ মানুষ। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে ক্রয় আদেশ বাতিল হওয়ায় এবং রপ্তানি স্থগিত থাকায় ইতোমধ্যে হিমায়িত চিংড়ি, মাছ এবং জীবন্ত কাঁকড়া ও কুচে খাতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬০ কোটি টাকা। যার ফলে এসব খাতে নিয়োজিত অনেক শ্রমিক হারাবে কর্মসংস্থান এবং অনেক ব্যবসায়ী হবেন ক্ষতির সম্মুখীন, যেটি সামগ্রিক চাহিদাকে আরো কমিয়ে মন্দার অবনতি ঘটাবে।

গত ৬ মার্চ এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) এক প্রতিবেদনে বলা হয় যদি করোনা পরিস্থিতির খারাপ পর্যায়ের সম্মুখীন হয় বাংলাদেশ তাহলে জিডিপির ক্ষতি হতে পারে প্রায় ২৫ হাজার ৬৭০ কোটি টাকার১০। প্রতিবেদনে বলা হয় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে অভ্যন্তরীন ব্যবসা-বাণিজ্য-সেবা খাতে যার পরিমাণ হবে প্রায় ৯ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা১০। করোনা ভাইরাসের কারণে ঔষুধ ও খাবারের দোকান ছাড়া অন্যান্য দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অনেকদিন বন্ধ থাকায় এসবের সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, এবং যেহেতু মন্দার ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা অনেক কমে যাবে সেহেতু  তাদের এই লোকসানের পরিমাণ আরো বাড়বে। প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস, পহেলা বৈশাখ ও রোজার ঈদকে সামনে রেখে বাংলাদেশে নানা ধরনের যে রমরমা ব্যবসা হয়ে থাকে তা এই বছর আর হচ্ছে না। তার প্রভাবও পড়বে জিডিপিতে।

অভ্যন্তরীন ব্যবসা-বাণিজ্য-সেবা খাতের পর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কৃষিখাত। দেশের বহু অঞ্চল লক ডাউন থাকায়, পরিবহন ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় এবং সামগ্রিক চাহিদা কমে যাওয়ায় কৃষকরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, তারা তাদের পণ্যের যথাযথ দাম পাচ্ছেন না। অনেক পচনশীল কৃষি দ্রব্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এডিবির মতে কৃষিখাতে ক্ষতি হতে পারে প্রায় ৫ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা১০ কিন্তু বাস্তবে আরো বেশিও হতে পারে।  বাংলাদেশ কিছু কিছু কৃষি পণ্যের জন্য এখনো অন্য দেশের উপর নির্ভরশীল। এখন যদি করোনা ভাইরাসের কারণে সেসব পণ্যের আমদানি বন্ধ থাকে তাহলে দাম বেড়ে গিয়ে মন্দা পরিস্থিতি আরো গভীর করতে পারে। কৃষির পরই পর্যটন, হোটেল-রেস্তোরা সংক্রান্ত খাতে ক্ষতি হবে। এখন পর্যন্ত পর্যটন খাত বন্ধ আছে। হোটেল রেস্তোরাঁ খুলে দিলেও করোনা ভাইরাসের ভয়ে এ খাতের চাহিদা অনেক কমে গেছে। এডিপির মতে এ খাতে ক্ষতি হতে পারে প্রায় ৪ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। এছাড়াও উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং পরিবহন খাতে ক্ষতি হতে পারে প্রায় ২ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা১০

আমাদের মোট শ্রমশক্তি ৬ কোটি ৮ লাখ, যার মাত্র ১৪.৯ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত এবং বাকি ৮৫.১ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত১০। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের তথ্য মতে করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বাংলাদেশের শুধু প্রাতিষ্ঠানিক খাতেই প্রায় ৯ লাখ লোক কর্মহীন হবে১০। আর অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মহীন হবে আরো বহু লোক। কর্মহীন এসব লোকের কাজ তৈরি করা এবং কাজ না পাওয়া পর্যন্ত এসব পরিবারকে সাপোর্ট দেয়া সরকারের জন্য অনেক বড় একটা চ্যালেঞ্জ। সরকার যদি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয় তাহলে অর্থনীতি এবং সামাজিক সংকট আরো ভয়াবহ রূপ নেবার সম্ভাবনা আছে। সেজন্য করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সরকারকে খরচ করতে হবে বহু হাজার কোটি টাকা। কিন্তু ইতোমধ্যে সরকার আগেই ব্যাংক থেকে প্রচুর টাকা ঋণ নিয়ে ফেলেছে সুতরাং অতিরিক্ত এই অর্থ প্রাপ্তি সরকারের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। পক্ষান্তরে করোনা ভাইরাসের কারণে কমে যাচ্ছে সরকারের রাজস্ব। আমদানি কমে যাওয়ায় কমেছে আমদানি শুল্ক, রপ্তানি কমে যাওয়ায় কমেছে রপ্তানি শুল্ক, ব্যবসা বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় কমে গেছে ভ্যাট প্রাপ্তি, কমে গেছে ব্যাংকিং শুল্ক। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে সরকার যদি সাধারণ দরিদ্র মানুষকে যথেষ্ট সাপোর্ট না দেয় তাহলে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকেই যাবে। আর সরকার যে অর্থ ব্যয় করে সেটা রাজস্ব থেকেই আসুক বা দেশি বিদেশি ঋণ থেকেই আসুক, সেই অর্থ বা তাদের সুদ ও আসলের ভার দিন শেষে কিন্তু পরিশোধ করতে হয় সর্বজনকেই। তাই সরকারের উচিৎ সর্বজনকে রক্ষার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া। এখন পর্যন্ত তেমন পদক্ষেপ সরকারের পক্ষ থেকে আসছে না। গত ৫ এপ্রিল ২০২০ তারিখে সরকার ৭২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ৫ টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। সেগুলো হলোঃ

১. বিভিন্ন শিল্প ও সার্ভিস সেক্টরের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকার একটি ঋণ সুবিধা, যা ব্যাংকগুলোকে দিতে হবে এবং এর সুদের অর্ধেক সরকার ভর্তুকি হিসাবে প্রদান করবে।

২. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য রাখা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকার ঋণ সুবিধা, যার ৯ শতাংশ সুদের ৫ শতাংশ সরকার ভর্তুকী হিসাবে দিবে।

৩. বাংলাদেশ ব্যাংক প্রবর্তিত রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলে অতিরিক্ত ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা প্রদান।

৪. রপ্তানি প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইন্যান্স স্কিম নামে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ সুবিধা চালু করবে যেখানে সুদের হার হবে ৭ শতাংশ।

৫. তৈরি পোশাকখাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতনভাতা পরিশোধ করার জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ অব্যাহত থাকবে।

এই ৭২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের সাথে সম্পর্ক ব্যাংকের, সুতরাং যেসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকের সাথে যোগাযোগ ভালো তারা এখানে একটা সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করবে। সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় যেটি করোনা ভাইরাস আসার আগে এমনিতেই ব্যাংকগুলোর রুগ্ন দশা ছিল খেলাপি ঋণের কারণে। সরকার ইতোপূর্বে খেলাপ ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হয়েছে বলা যায়। তাই নতুন করে যে ঋণ দেয়া হবে, যার সুদের একটা অংশ সরকার তথা দেশের সাধারণ মানুষ বহন করবে সেই ঋণও যদি খেলাপি ঋণ হয়ে যায় করোনা ভাইরাসের অজুহাতে তাহলে তা সাধারণ মানুষের কি কাজে আসবে?

পক্ষান্তরে দেশের সাধারণ মানুষ ভেবেছিল এই দুর্দিনে তাদের টাকার একটা বড় অংশ তারা ফেরত পাবে নানা উপায়ে। কিন্তু তা হয় নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ প্রত্যাশা করে সরকার নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো নিবে –

১. স্বাস্থ্যখাতে বড় ধরনের বরাদ্দ। সাধারণ মানুষ যেনো সরকারি বেসরকারি যেকোন হাসপাতালে এখন করোনা ও অন্যান্য রোগের চিকিৎসা সেবা পায় তা নিশ্চিত করা। চিকিৎসক ও নার্সদের পর্যাপ্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা করা ও তাদেরকে বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা।

২. দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও বর্তমান পরিস্থিতিতে অসহায় হয়ে পড়া মানুষদের পর্যাপ্ত খাদ্যসামগ্রী ও ঔষধ বিনামূল্যে নিশ্চিত করা।

৩. দেশের করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সর্বোচ্চ পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

৪. কৃষিখাতে বিশেষ বরাদ্দের ব্যবস্থা করা যেনো মন্দা পরিস্থিতিতে কোনভাবেই কৃষি উৎপাদন না কমে। আর বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষক যেনো ন্যায্য মূল্য পায় তার ব্যবস্থা করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করা। কৃষকদের বিনা সুদে ঋণপ্রদান করা, আগামি এক বছর বিনামূল্যে সেচ সুবিধা প্রদান ও সারে ভর্তুকি বাড়ানো। যেহেতু এই বছর অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে অনেকেই কর্মহীন হয়ে যেতে পারে সেহেতু বেকারত্ব যেনো তৈরি না হয় সেজন্য কৃষিকে গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতি মাথায় রেখে কৃষি নীতিমালা করতে হবে।

৫. বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত যারা এবং সকল কারখানার শ্রমিকদের চাকুরী এবং বেতন-মজুরী নিশ্চিত রাখা।

৬. পূর্বের বড় বড় খেলাপি ঋণ আদায় করা এবং বিদেশে পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা। একইসাথে নতুন করে ঋণ সুবিধার যে প্যাকেজ দেয়া হয়েছে তা যেনো কোন নির্দিষ্ট শ্রেণি কুক্ষিগত করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখা।

৭. করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পর তা দ্রুততম সময়ে যেনো সকল মানুষকে দেয়া যায় সেজন্য এখন থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে রাখা।

করোনার আতঙ্ক পর্যালোচনা: একটি জরীপ  

করোনা ভাইরাস আসার পর আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠলো কতটা নাজুক ছিল আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। দেশের দুই-তৃতীয়াংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করতো বেসরকারিখাত। অথচ করোনা ভাইরাস আসার সাথে সাথেই অনেক বেসরকারি হাসপাতাল গুটিয়ে নিলো নিজেদের ব্যবসা। এই প্রথম বহু মানুষ হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটে বেড়িয়েছেন রোগী ভর্তির জন্য, অথচ রোগী ভর্তি নেয়নি হাসপাতাল। ভালো হবার বদলে অনেকে ফিরেছে লাশ হয়ে। যদি করোনা মহামারি হিসেবে আরও ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ে, যদি বহুমানুষ এতে আক্রান্ত হন তাহলে অনেকের ভাগ্যেই যে হাসপাতালের একটি সিট জুটবেনা তা ইতোমধ্যে দেশবাসী বুঝে ফেলেছে। আর সেজন্য সাধারণ মানুষের মনে বেড়েই চলেছে আতঙ্ক। আর আতঙ্ক এমন একটি মানসিক ব্যাধি যেটি মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়, বিঘ্ন ঘটায় স্বাভাবিক কাজ কর্মে, ঘুমে, মনোযোগে। করোনা ভাইরাসের ফলে মানুষের মনে সৃষ্ট আতঙ্কের অবস্থা জানার জন্য আমরা অনলাইনে (সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইমেইল) একটি জরীপ পরিচালনা করি০১-০৪-২০২০ থেকে ০৪-০৪-২০২০ তারিখ পর্যন্ত। সেই জরীপের ১৫০০ জনের দেয়া তথ্য থেকে আমরা যা পাই তা নিম্নরূপ:

করোনা ভাইরাসের ফলে মানুষের মনে সৃষ্ট আতঙ্কের অবস্থা জানার জন্য আমরা অনলাইনে (সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইমেইল) একটি জরীপ পরিচালনা করি০১-০৪-২০২০ থেকে ০৪-০৪-২০২০ তারিখ পর্যন্ত। সেই জরীপের ১৫০০ জনের দেয়া তথ্য থেকে আমরা যা পাই তা নিম্নরূপ:

১. আমাদের একটি প্রশ্ন ছিল যে গত ৭ দিনে আপনি করোনা ভাইরাস নিয়ে কতটুকু আতঙ্কিত ছিলেন? এর উত্তরে ৪৭.৮ শতাংশ জানান তারা খুবই আতঙ্কে আছেন, ৩৮.৮৭ শতাংশ জানান তারা মোটামুটি আতঙ্কে আছেন, ১২.৪৭ শতাংশ জানান তারা অল্প আতঙ্কে আছেন এবং ০.৮৭ শতাংশ জানান তারা একদমই আতঙ্কে নেই।

২. আমাদের পরের প্রশ্ন ছিল গত ৭ দিনে আপনার পরিবারের বা নিকট আত্নীয় কেউ করোনায় আক্রান্ত হতে পারে এ নিয়ে কতটা আতঙ্কে ছিলেন? এর উত্তরে ২৯.৮ শতাংশ জানান তারা খুবই আতঙ্কে আছেন, ৪৬.৮৭ শতাংশ জানান তারা মোটামুটি আতঙ্কে আছেন, ১৬.৮ শতাংশ জানান তারা অল্প আতঙ্কে আছেন এবং ৩.২ শতাংশ জানান তারা একদমই আতঙ্কে নেই।

৩. তারপর আমাদের প্রশ্ন ছিল বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতিদিন যে হারে করোনা পরীক্ষা করা হচ্ছে সেটাকে আপনি কি পর্যাপ্ত মনে করেন কিনা? তার উত্তরে ৫.২ শতাংশ বলেন যে তারা পর্যাপ্ত মনে করেন, ২৬ শতাংশ মনে করেন যে মোটামুটি চলে, আর ৬৮.৮ শতাংশ মনে করেন যে একেবারেই পর্যাপ্ত নয়।

৪. তারপর জানতে চাওয়া হয়, সরকার করোনা পরিস্থিতি এবং প্রকৃত করোনা রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে প্রতিদিন যে আপডেট দিচ্ছে সেটাকে আপনি কীভাবে দেখেন? তার উত্তরে ১৯.৬৭ শতাংশ মনে করেন যে সঠিক তথ্য দিচ্ছে, ১৭ শতাংশ মনে করেন যে সঠিক তথ্য লুকাচ্ছে এবং বাকি ৬৩.৩৩ শতাংশ বলেন যে তারা সন্দিহান।

৫. আমাদের একটি প্রশ্ন ছিল, করোনা আতঙ্কে কি গত ৭ দিনে আপনার ঘুমে সমস্যা হচ্ছে? যেমন সময়মত ঘুম হচ্ছে না, বারবার ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছে, ঘুম কম হচ্ছে? এর উত্তরে ১৪.৫৩ শতাংশ জানান তাদের এমন হচ্ছে না, ৪০.১৩ শতাংশ জানান যে ২/১ দিন এমন হয়েছে, ২৭.৩৩ শতাংশ জানান প্রায়ই এমন হচ্ছে এবং ১২.৬৭ শতাংশ জানান প্রতিদিনই এমন হচ্ছে।

৬. তারপর আমরা জানতে চাই করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আপনি কতটা বিষন্নতা অনুভব করছেন? এর উত্তরে ৪৭.৩৩ শতাংশ জানান যে তারা অনেক বিষন্নতা অনুভব করছেন, ৩২.৬৭ শতাংশ জানান মোটামুটি, ১৬.৩৩ শতাংশ জানান অল্প বিষন্নতা অনুভব করছেন এবং ৩.৬৭ শতাংশ জানান যে তারা একদমই বিষন্নতা অনুভব করছেন না।

৭. এরপরে আমরা জানতে চেয়েছি বর্তমান পরিস্থিতিতে আপনার স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা/ স্মৃতিশক্তি/ গৃহস্থালির কাজকর্ম/ পড়াশোনা/  কাজে মনোযোগ দিতে সমস্যা হচ্ছে কিনা? এর উত্তরে ১৭.৩৩ শতাংশ জানান অনেক সমস্যা হচ্ছে, ৪৫.৩৩ শতাংশ জানান মোটামুটি সমস্যা হচ্ছে, ২৭.৬৭ শতাংশ জানান অল্প সমস্যা হচ্ছে এবং ১০.৩৩ শতাংশ জানান কোন সমস্যা হচ্ছে না।

৮. সবশেষে আমরা জানতে চেয়েছি দেশের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মন্দ নিয়ে আপনি কতটা আতঙ্কিত? এর উত্তরে ৩২.৩৩ শতাংশ জানান তারা খুবই আতঙ্কিত, ৪১ শতাংশ জানান তারা মোটামুটি আতঙ্কিত, ২৪.৬৭ শতাংশ জানান তারা অল্প আতঙ্কিত এবং ২ শতাংশ জানান তারা একদমই আতঙ্কিত নন।

সুতরাং উপরোক্ত তথ্য থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি বাংলাদেশের মানুষের মনে এখন করোনা এবং ধেয়ে আসা মন্দা নিয়ে যথেষ্ট আতঙ্ক বিরাজ করছে। আতঙ্ক মানুষকে মরার আগেই অর্ধেক মেরে ফেলে, দুর্বল করে দেয় শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। তখন বাসা বাঁধতে পারে অন্যান্য নানা ধরনের রোগ। আতঙ্ক নানা উপায়ে দূর করা যায় তবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে অভয় দেয়ায় জন্য, আতঙ্ক দূর করার জন্য এখন প্রয়োজন সরকারের স্বচ্ছ সঠিক পদক্ষেপ।

ইসতিয়াক রায়হান: শিক্ষক, অর্থনীতি বিভাগ, বশেমুরবিপ্রবি।

 ইমেইলঃ istihakshuvo@gmail.com

তথ্যসূত্র

১. https://www.worldometers.info/coronavirus/

২.https://mincom.gov.bd/site/page/cf298df3-7b13-4bdd-ba02-898ab65c2c62/বস্ত্রসেল

৩.https://www.bgmea.com.bd/

৪.https://www.bgmea.com.bd/

৫.https://bangla.bdnews24.com/economy/article1673824.bdnews

৬.https://www.bb.org.bd/econdata/wageremitance.php

৭.http://www.bbarta24.net/finance-and-trade/112093

৮.https://www.kalerkantho.com/online/national/2020/03/31/893075

৯.https://thefinancialexpress.com.bd/economy/bangladesh-poised-to-see-sharp-fall-in-remittance-inflow-1585668863

১০. করোনার প্রভাবে বাংলাদেশে কর্মসংস্থান কমবে ৯ লাখ, প্রথম আলো, ২৮ মার্চ ২০২০।

Social Share
  • 133
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    133
    Shares
  •  
    133
    Shares
  • 133
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *